📄 তৃতীয় প্রকার: যেসব বৈশিষ্ট্য দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট
আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতকে অন্যান্য সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন এবং দুনিয়াতে তাহাদেরকে এমন সব সম্মানে ভূষিত করিয়াছেন যাহা তিনি অন্য কোন উম্মতকে দেন নাই। বস্তুত এসব মর্যাদা সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল-আখিরীন মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মানার্থেই মহান আল্লাহ তাহাদেরকে দান করিয়াছেন। এই উম্মত কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমেই ঐ দুর্লভ মর্যাদা লাভ করিতে সক্ষম হইবে, বিকল্প কোন পথে নয়। এই উম্মতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল- তাহারা শ্রেষ্ঠতম উম্মত; তাহাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল, পৃথিবী মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু এবং তাহাদের নামাযের কাতারকে ফেরেশতাদের কাতারতুল্য বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে ইত্যাদি।
📄 (এক) শ্রেষ্ঠতম উম্মত
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে বহু শরাফত ও মর্যাদা দান করিয়াছেন, তাহাদের আলোচনাকে সমুন্নত করিয়াছেন এবং অন্যান্য উম্মতের তুলনায় তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করিয়াছেন (আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৬১)। আর কুরআন মজীদে তিনি তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। যেমন আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠই উম্মত, তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে মানবজাতির জন্য। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে ঈমান আন" (৩: ১১০) বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উসীলাতেই এই উম্মত মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। তিনি আল্লাহ্র সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি এবং রাসূলগণের মধ্যে তিনি হইলেন সর্বাধিক সম্মানিত রাসূল। এক পরিপূর্ণ শারী'আতসহ আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন। ইতোপূর্বে কোন নবী-রাসূলকে তাহা প্রদান করা হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তরীকায় অল্প আমলও অন্যের তরীকার অধিক আমল হইতে উত্তম। কুরআন-হাদীছ এবং সাহাবী ও তাবিঈনের বাণীতে অনুরূপ কথা বিবৃত হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: هُوَ اجْتَبْكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ "তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করিয়াছেন তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই" (২২: ৭৮)।
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيداً . "এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বারূপ হয়" (২: ১৪৩)।
বাহ্য ইব্ন হাকীম (রা) তাঁহার পিতা হইতে এবং তাঁহার পিতা তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মহান আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أَخْرِجَتْ لِلنَّاسِ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩: ১১০)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, “ তোমরা হইলে সত্তরমত উম্মত; তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে অন্য সকল উম্মতের উপর মর্যাদা দান করিয়াছেন" (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩০০১; তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৩; ইব্ন মাজা, নং ৪২৮৮; মুসতাদরাক হাকেম, ৪খ., পৃ. ৮৪; তাঁহার মতে ইহার সনদ সহীহ, তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাফিয ইবন কাছীর বলেন, হাদীছটি প্রসিদ্ধ, তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৩৯৯)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, আমাকে ছয়টি বিষয়ের দ্বারা অন্যান্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে, আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও তাহা প্রদান করা হয় নাই। ইহার মধ্যে একটি হইল, আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বানানো হইয়াছে (হাফিয হায়ছামী, মুসনাদে বাযযার; ইমাম বাযযার-এর মতে হাদীছটির সূত্র খুবই মজবুত; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬৯; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩৬)।
'আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমাকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী-রাসূলকে দান করা হয় নাই। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কি? তিনি বলিলেন: আমাকে রু'ব দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে; পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে দান করা হইয়াছে, আমাকে আহমাদ নামকরণ করা হইয়াছে, পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে এবং আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত ঘোষণা করা হইয়াছে (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ৯৮; হাফিয ইব্ন কাছীর বলেন, এই সনদে হাদীছটি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল নিঃসঙ্গ। তাঁহার সূত্রটি হাসান। তাফসীরে ইবন্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০০; হাফিয ইব্ন হাজার বলেন, ইহার সনদ হাসান, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫২২; অনুরূপভাবে- হাফিয হায়ছামী ইহাকে হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ২৬১)।
আবু দারদা (রা) বলেন, আমি আবুল কাসিম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আল্লাহ্ তা'আলা ঈসা (আ)-কে বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার পর এক উম্মত সৃষ্টি করিব যাহাদের অবস্থা হইবে- যদি কোন পসন্দনীয় জিনিস তাহাদের হস্তগত হয়, তবে তাহারা আল্লাহর হাম্দ-শোকর করিবে। আর যদি তাহারা কোন অপসছন্দনীয় অবস্থার শিকার হয় তবে তাহারা ধৈর্য ধারণ করিবে। অথচ তাহাদের কোন হিল্ম (ধৈর্য) নাই এবং ইল্মও নাই। একথা শুনিয়া ঈসা (আ) বলেন, হে আমার রব! ইল্ম ও হিল্ল্ম ছাড়া কেমন করিয়া তাহারা এরূপ করিবে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, আমি আমার ইল্ল্ম ও হিল্ল্ম হইতে তাহাদেরকে দান করিব (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ৪৫০; হাফিয হায়ছামী বলেন, ইমাম আহমাদ, বাযযার ও ইমাম তাবারানী হাদীছটি মু'জামুল কাবীর ও মু'জামুল আওসাতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত সূত্রের রাবীগণ সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৬৭-৬৮; শু'আয়ব এবং আবদুল কাদির আরনাউত হাদীছের সূত্রটি হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪৬)।
وَلَمَّا سَكَتَ عَنْ مُوسَى الْغَضَبُ أَخَذَ الْأَلْوَاحَ وَفِي نُسْخَتِهَا هُدًى وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ. "মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হইল তখন সে ফলকগুলি তুলিয়া নিল। যাহারা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করে তাহাদের জন্য উহাতে যাহা লেখা ছিল তাহাতে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত" (৭: ১৫৪)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা (র) বলেন, তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! এই ফলকগুলিতে আমি এমন এক উম্মতের সন্ধান পাইয়াছি যাহাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলা হইয়াছে, যাহাদের আবির্ভাব হইবে মানুষের কল্যাণের জন্য। তাহারা লোকজনকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে বাধা দিবে। হে আল্লাহ্! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে মহান আল্লাহ্ বলেন, তাহারা আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। তারপর মূসা (আ) বলেন, আমি ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখ পাইয়াছি যাহারা হইবে আখিরী উম্মত অর্থাৎ সৃষ্টির দিক হইতে আখিরী উম্মত হইবে, কিন্তু জান্নাতে যাইবে সর্বাগ্রে; তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। মূসা (আ) পুনরায় বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহাদের বক্ষে তাহাদের ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাহা হইতে তাহারা পাঠ করিবে। অথচ তাহাদের পূর্ববর্তী উম্মতের অবস্থা এমন ছিল যে, তাহারা তাহাদের ধর্মগ্রন্থ দেখিয়া দেখিয়া পাঠ করিত। তারপর ঐ ধর্মগ্রন্থ তাহাদের হইতে উঠাইয়া নেওয়ার পর তাহারা আর তাহা হিফাযত করিয়া রাখিতে পারে নাই। পরবর্তী উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা এমন স্মৃতিশক্তি দান করিবেন যাহা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেওয়া হয় নাই। হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। এবারও আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারা হইবে আহমাদ নবীর উম্মত। মূসা (আ) আরও বলেন, হে আমার রব! ফলকসমূহে আমি এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করাও জায়েয হইবে; অথচ পূর্ববর্তী উম্মতগণ সাদাকা করার পর তাহা কবূল হইলে আল্লাহ্ তা'আলা আকাশ হইতে আগুন নাযিল করিতেন এবং সেই আগুন তাহা গ্রাস করিত। আর সাদাকা গ্রহণযোগ্য না হইলে তাহা অমনি রাখিয়া দেওয়া হইত। অবশেষে জীব-জন্তু ও পাখি আসিয়া তাহা খাইয়া ফেলিত। কিন্তু পরবর্তী উম্মতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ভিন্ন ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। তিনি ধনীদের হইতে গরীবদের জন্য সাদাকা গ্রহণ করেন। তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! তাহাদেরকেও আমার উম্মত বানাইয়া দিন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। মূসা (আ) আবারও বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহারা কোন নেক আমলের ইচ্ছা করিয়া তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করিলেও তাহাদেরকে একটি ছওয়াব দান করা হইবে। আর যদি তাহারা তাহা বাস্তবে রূপায়িত করে তবে দশ হইতে সাত শত পর্যন্ত ছওয়াব তাহাদেরকে দেওয়া হইবে। সুতরাং হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। ইহার পর মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব। আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সুপারিশ করা হইবে এবং তাহাদের ব্যক্তিগত সুপারিশও গ্রহণযোগ্য হইবে। তাহাদেরকে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল করিয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। বর্ণনাকারী কাতাদা (র) বলেন, তখন আল্লাহ্ নবী মূসা (আ) ফলকগুলি ছুড়িয়া মারেন এবং বলেন, হে আল্লাহ্! তাহা হইলে আমাকেও আহমাদ (স)-এর উম্মত হিসাবে কবূল করিয়া নিন (তাফসীর ইন জারীর, ৯খ., পৃ. ৪৫; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২খ., ২৫৯)।
রবী' ইব্ন খাছ'আম (র) বলেন, ইসলাম ধর্মে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতেরা তুলনায় আর কাহারও দু'আই অধিক পরিমাণে আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হইবে না। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩:১১০)।
📄 (দুই) গনীমতের মাল হালাল করা
আমাদের পূর্বে যেসব নবী-রাসূল গত হইয়াছেন, তাহাদের উম্মতের অবস্থা দুই ধরনের ছিল। (এক) কোন কোন নবীর উম্মতের উপর জিহাদ ফরয ছিল না এবং গনীমতের মাল হস্তগত হওয়ারও কোন ব্যবস্থা ছিল না। (দুই) কোন কোন উম্মতের উপর জিহাদ ফরয ছিল। তাহারা জিহাদ করিত এবং আল্লাহ্র দুশমন হইতে অর্থ-সম্পদ হস্তগত করিত। তবে এই মাল তাহারা নিজেরা ভোগ করিত না। সেই যুগের মানুষের জিহাদ কবূল হওয়ার নিদর্শন এই ছিল যে, মাল জমা করার পর আসমান হইতে আগুন আসিয়া তাহা ভস্মীভূত করিয়া দিত। আর কোন যুদ্ধ আল্লাহ্র দরবারে গ্রহণযোগ্য না হইলে আসমান হইতে আগুন নাযিল হইত না। যুদ্ধের পর গনীমতের মাল আত্মসাত করিলে সেই যুদ্ধ আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হইত না। এই নিয়ম দীর্ঘকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তারপর আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের দুর্বলতা লক্ষ্য করিয়া তাহাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল করিয়া দেন। এমনি করিয়া তিনি জিহাদ কবুল না করার লজ্জাজনক অবস্থা হইতেও এই উম্মতকে মুক্তিদান করেন। এই অসংখ্য ও অগণিত নিয়ামত দানের কারণে আল্লাহ্ জন্যই সকল প্রশংসা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ لَوْلا كِتَبٌ مِّنَ اللهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. فَكُلُوا مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَلاً طيِّبًا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. "আল্লাহ্র পূর্ব-বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত। তোমরা যে গনীমত (যুদ্ধলব্ধ মাল) লাভ করিয়াছ তাহা হালাল ও উত্তম বলিয়া ভোগ-ব্যবহার কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৮:৬৮-৬৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় জমহুর মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, لَوْلا كَتْبٌ مِّنَ الله سبق মর্ম হইল, উম্মুল কিতাব তথা লাওহে মাহফুযে এই বিধান যদি লিখিত না থাকিত যে, গনীমতের মাল এই উম্মতের জন্য হালাল (তাফসীরে ইবন জারীর তাবারী, ১০খ., পৃ. ৩২-৩৮; তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৯)। নিম্নোক্ত হাদীছ হইতেও উক্ত বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, নবী কারীম (স) বলেন: আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দান করা হইয়াছে যাহা পূর্ববর্তী আর কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। রু'ব দ্বারা আমাকে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। সুতরাং আমার উম্মতের যাহার যেখানে নামাযের ওয়াক্ত হইবে সে যেন সেখানেই নামায আদায় করিয়া নেয়। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে, কিন্তু আমার পূর্ববর্তী কাহারও জন্য তাহা হালাল ছিল না। আমাকে শাফা'আতে কুবরার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী নবীগণকে প্রেরণ করা হইত বিশেষ গোত্রের প্রতি; আর আমি প্রেরিত হইয়াছি সমস্ত সৃষ্টির প্রতি (বুখারী, ফাতহুল বারী, পৃ. ৩৩৫; মুসলিম, নং ৫১১)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কোন একজন নবী জিহাদ করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে বলেন, এমন কোন ব্যক্তি আমার অনুসরণ করিবে না যে কোন নারীকে বিবাহ করিয়াছে এবং তাহার সঙ্গে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা রাখে, কিন্তু সে এখনও মিলিত হয় নাই। আর এমন ব্যক্তিও না, যে ঘর তৈরি করিয়াছে; কিন্তু উহার ছাদ তোলে নাই। এমন ব্যক্তিও না, যে গর্ভবতী ছাগল কিম্বা উষ্ট্রী কিনিয়াছে এবং সে উহার প্রসবের অপেক্ষা করিতেছে। তারপর তিনি জিহাদে গেলেন এবং একটি জনপদের নিকটবর্তী হইলেন। তখন আসরের নামাযের ওয়াক্ত হইয়াছে কিংবা সময়টি ছিল ইহার কাছাকাছি। এই অবস্থায় তিনি সূর্যকে বলেন, তুমিও আদিষ্ট এবং আমিও আদিষ্ট। ইয়া আল্লাহ্! সূর্যকে কিছুক্ষণের জন্য থামাইয়া দিন। তখন উহাকে থামাইয়া দেওয়া হয়। অবশেষে তিনি বিজয় অর্জন করেন এবং গনীমতের মাল একত্র করেন। তখন সেগুলি জ্বালাইয়া দিতে আগুন আসে, কিন্তু আগুন তাহা জ্বালায় নাই। ইহাতে সেই নবী বলেন, তোমাদের মধ্যে কেহ গনীমত আত্মসাৎ করিয়াছে। প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন আমার কাছে বায়'আত গ্রহণ করুক। ইহাতে তাহারা সকলেই তাঁহার হাতে বায়'আত গ্রহণ করিল। কিন্তু একজনের হাত নবীর হাতের সঙ্গে আটকাইয়া গেল। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রহিয়াছে। সুতরাং তোমার গোত্রের লোকেরা আমার কাছে বায়'আত গ্রহণ করুক। তাহারা তাঁহার হাতে বায়'আত গ্রহণ করিল। তখন দুই বা তিন ব্যক্তির হাত নবীর হাতের সঙ্গে আটকাইয়া গেল। নবী বলেন, তোমাদের মধ্যেই আত্মসাৎকারী রহিয়াছে। তোমরাই গনীমতের মালে খিয়ানত করিয়াছ। অবশেষে তাহারা একটি গাভীর মস্তক সমতুল্য স্বর্ণ উপস্থিত করিল এবং তাহা গনীমতের মালের সঙ্গে রাখিয়া দিল। বস্তুত এসব মাল মাটির উপরিভাগেই রাখা হইয়াছিল। তারপর আগুন আসিয়া সব জ্বালাইয়া দিল। আমাদের পূর্ববর্তী লোকদের জন্য গনীমতের মাল হালাল ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা লক্ষ্য করিয়া আমাদের জন্য তাহা হালাল করিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., নং ৩১২৪; মুসলিম, নং ১৭৪৭)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: তোমাদের পূর্ববর্তী কোন আদম সন্তানের জন্য গনীমতের মাল হালাল ছিল না। পূর্ববর্তী যমানায় নিয়ম ছিল, আসমান হইতে আগুন আসিয়া তাহা জ্বালাইয়া দিত। রাবী সুলায়মান আল-আ'মাশ বলেন, আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, বদর যুদ্ধের দিন গনীমতের মাল হালাল হওয়া তথা বণ্টন করার পূর্বে সাহাবীগণ তাহা গ্রহণ করিলে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন: لَوْلَا كِتُبٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ. "আল্লাহ্র পূর্ব-বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ, ইহার জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হইত" (৮ঃ ৬৮)।
📄 (তিন) পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারীরূপে গণ্য করা
আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে বহু বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। উহার একটি হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তুরূপে সাব্যস্ত করিয়াছেন। সুতরাং নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর যদি পানি না পাওয়া যায় এবং মসজিদও না মিলে, তবে মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিয়া মাটিতে দাঁড়াইয়া নামায আদায় করিবে। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী উম্মতের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম ছিল। তাহাদের জন্য ইবাদতখানা ও গীর্জা ছাড়া অন্য কোথায়ও নামায আদায় করা জায়েয ছিল না।
হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও দান করা হয় নাই। রু'ব (ব্যক্তিত্বের ভীতি) দ্বারা আমাকে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু সাব্যস্ত করা হইয়াছে। সুতরাং আমার উম্মতের যাহার যেখানে নামাযের ওয়াক্ত হইবে, সে যেন সেখানে নামায আদায় করে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে, কিন্তু আমার পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য তাহা হালাল ছিল না। আমাকে শাফা'আতে কুবরার অধিকার প্রদান করা হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইতেন আর আমি প্রেরিত হইয়াছি সমস্ত সৃষ্টির প্রতি (প্রাগুক্ত)।
'আবদুল্লাহ ইব্ন আম্র (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাজ্জুদের নামায আদায় করার জন্য দাঁড়াইলেন। নামাযশেষে তিনি বলিলেন, আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দেওয়া হইয়াছে যাহা আমার পূর্বে আর কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। আমর জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। সুতরাং যেখানেই নামাযের ওয়াক্ত হইবে, তায়াম্মুম করিয়া আমি নামায আদায় করিতে পারিব। পক্ষান্তরে আমার পূর্ববর্তী উম্মতগণ 'এইরূপ করাকে গুনাহের কাজ মনে করিত। তাই তাহারা উপাসনালয় ও গীর্জায় নামায আদায় করিত (প্রাগুক্ত)।
আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আমাকে এমন কিছু বিষয় দেওয়া হইয়াছে যাহা কোন নবী-রাসূলকে দেওয়া হয় নাই। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কী? তিনি বলিলেন: আমাকে রু'ب দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে, আমাকে পৃথিবীর তাবৎ ধনভাণ্ডারের চাবি প্রদান করা হইয়াছে, আমার নাম আহমাদ সাব্যস্ত করা হইয়াছে, আমার জন্য মাটিকে পবিত্রকারী বস্তু সাব্যস্ত করা হইয়াছে, আর আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে।