📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (তিন) চাচা আবূ তালিবের আযাব লঘু করার সুপারিশ

📄 (তিন) চাচা আবূ তালিবের আযাব লঘু করার সুপারিশ


চাচা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন, তাঁহার প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখিতেন, তাঁহাকে সাহায্য করিতেন, মহব্বত করিতেন এবং বিপদে তাঁহাকে সহায়তা করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি তাঁহার এই ভালবাসা স্বভাবজাত ও আত্মীয়সুলভ, দীনি ভালবাসা নয়। তাঁহার মুমূর্ষু অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) শেষবারের মত তাহাকে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, তাহার ঈমান নসিব হয় নাই। আল্লাহ্র ভেদ-রহস্য সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। অবশ্য তিনি যেহেতু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে সদাচার করিয়াছেন, এই উসীলায় তাহাকে হালকা ধরনের শাস্তি প্রদান করা হইবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের ব্যাপারে কোন সুপারিশকারীর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হইবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে এবং তাঁহার হৃদয়ে স্বস্তি প্রদানের নিমিত্ত আল্লাহ্ তা'আলা তাহার শাস্তিকে লঘু করিয়া দিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা প্রসঙ্গে তাঁহার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন, খাজা আবূ তালিবের জন্য সুপারিশ করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৩৯)।

হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা) হইতে বর্ণিত। একদা তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আবু তালিবের কোন উপকার করিতে পারিয়াছেন কি? তিনি তো আপনার প্রতি লক্ষ্য রাখিতেন, আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতেন এবং আপনার কারণে অন্যের প্রতি অসন্তুষ্ট হইতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: হাঁ, তাহার কেবল পায়ের গোছা পর্যন্ত জাহান্নামের আগুন থাকিবে। আর যদি আমি না হইতাম, তবে জাহান্নামের অতলে তাহাকে অবস্থান করিতে হইত (মুসলিম, নং ২০৯)।

আব্বাস (রা) আরও বলেন, একদা আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব তো আপনাকে হিফাযত করিতেন এবং আপনাকে সাহায্য করিতেন। এই সমস্ত কাজ তাহার কোন উপকারে আসিবে কি? জবাবে তিনি বলেন: হাঁ, আমি তাহাকে জাহান্নামের গভীরে পাইয়াছিলাম এবং সেখান হইতে (তাহার পায়ের) গোছা পর্যন্ত বাহির করিয়া আনিয়াছি (মুসলিম, নং ২১০, ৩৫৮)।

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাঁহার চাচা আবু তালিবের কথা আলোচিত হইলে তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন তাহার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কাজে আসিবে বলিয়া আশা রহিয়াছে। তাহাকে জাহান্নামের উপরিভাগে এমনভাবে রাখা হইবে যে, আগুন তাহার পায়ের গিরা পর্যন্ত পৌঁছিবে। ইহাতেই তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৬৪; মুসলিম, নং ২১০)।

ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হইবে আবু তালিবের। তাহাকে একজোড়া জুতা পরাইয়া দেওয়া হইবে। এই জুতা জোড়ার কারণে তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (মুসলিম, নং ২১২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (চার) উম্মতের জন্য নবী কারীম (স)-এর দু'আ ও তাহা কবুল হওয়া

📄 (চার) উম্মতের জন্য নবী কারীম (স)-এর দু'আ ও তাহা কবুল হওয়া


আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দু'আর অনুমতি প্রদান করিয়াছেন এবং তাঁহাকে জানাইয়াও দিয়াছেন যে, তাঁহার এই দু'আ কবুল হইবে। বস্তুত নবী-রাসূলগণের সব দু'আই আল্লাহ্ দরবারে গ্রহণযোগ্য হইয়াছে। আমাদের নবীজীর দু'আও আল্লাহ্র দরবারে গ্রহণযোগ্য হইয়াছে এবং এসবের সংখ্যা অগণিত। এইসব দু'আ আশা ও নিরাশার মাঝে আবর্তিত ছিল। কিন্তু আলোচ্য দু'আর বিষয়টি তদ্রূপ নয়, বরং এই দু'আর ব্যাপারে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রত্যেক নবীকে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছে যে, ইহা অবশ্যই কবুল করা হইবে। পূর্ববর্তী নবীগণ সকলেই সেই দু'আ দুনিয়াতেই করিয়াছেন এবং উহার ফলও পাইয়াছেন। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স) কিয়ামত দিবসের কঠিন বিপদকালে উম্মতের শাফা'আতের জন্য সেই দু'আ স্থগিত রাখিয়াছেন। নবী-রাসূলগণকে উম্মতের পক্ষ হইতে আল্লাহ তা'আলা যে বিনিময় প্রদান করিবেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে ঐসব বিনিময়ের তুলনায় সর্বোত্তম বিনিময় প্রদান করুন।

বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স) উম্মতের প্রতি চরম মমত্ববোধের ভিত্তিতেই এমনটি করিয়াছেন। কেননা সেদিন তাঁহার গুনাহগার উম্মতগণ এই জাতীয় দু'আর খুবই মুখাপেক্ষী থাকিবে। উল্লেখ্য যে, উম্মতের জন্য এই জাতীয় দু'আর ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) হইবেন স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। এক্ষেত্রে তাঁহার দু'আয় কেহ শরীক থাকিবে না। আর ইহাই হইবে তাঁহার পক্ষ হইতে উম্মতের জন্য সুপারিশ। হাদীছেও এই সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে।

আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দু'আর অনুমতি প্রদান করা হইয়াছে এই সুযোগে তিনি যেই দু'আ করিবেন তাহা অবশ্যই কবূল হইবে। সকল নবী তাঁহাদের দু'আটি পৃথিবীতে করিয়াছেন। আর আমি আমার দু'আটি কিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের শাফা'আতের জন্য মুলতবি রাখিয়া দিয়াছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি কোন প্রকার শিরক করে নাই, সে এই দু'আর বরকত লাভ করিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৩০৪; মুসলিম, নং ১৯৯)।

আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য উঠিলেন। তখন বহু সাহাবী তাঁহার পিছনে দাঁড়াইয়া তাঁহার পাহারাদারী করিয়াছিলেন। নামাযান্তে তিনি তাঁহাদের প্রতি তাকাইয়া বলিলেন: আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্বে আর কাহাকেও দান করা হয় নাই। হাদীছ শরীফে ইহাও উল্লেখ রহিয়াছে, আমাকে বলা হইবে: আপনি দু'আ করুন। কেননা প্রত্যেক নবীই একটি বিশেষ দু'আ করিয়াছেন। কিন্তু কিয়ামত দিবসের জন্য আমি আমার দু'আটি মুলতবি রাখিয়াছি। তাহা তোমাদের জন্য আমি প্রয়োগ করিব এবং ঐ সমস্ত লোকদের জন্যও যাহারা لا اله الا الله "আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই" বলিয়া সাক্ষ্য দিয়াছে (প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তৃতীয় প্রকার: যেসব বৈশিষ্ট্য দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট

📄 তৃতীয় প্রকার: যেসব বৈশিষ্ট্য দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট


আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতকে অন্যান্য সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন এবং দুনিয়াতে তাহাদেরকে এমন সব সম্মানে ভূষিত করিয়াছেন যাহা তিনি অন্য কোন উম্মতকে দেন নাই। বস্তুত এসব মর্যাদা সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল-আখিরীন মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মানার্থেই মহান আল্লাহ তাহাদেরকে দান করিয়াছেন। এই উম্মত কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমেই ঐ দুর্লভ মর্যাদা লাভ করিতে সক্ষম হইবে, বিকল্প কোন পথে নয়। এই উম্মতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল- তাহারা শ্রেষ্ঠতম উম্মত; তাহাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল, পৃথিবী মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু এবং তাহাদের নামাযের কাতারকে ফেরেশতাদের কাতারতুল্য বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে ইত্যাদি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (এক) শ্রেষ্ঠতম উম্মত

📄 (এক) শ্রেষ্ঠতম উম্মত


আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতকে বহু শরাফত ও মর্যাদা দান করিয়াছেন, তাহাদের আলোচনাকে সমুন্নত করিয়াছেন এবং অন্যান্য উম্মতের তুলনায় তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী করিয়াছেন (আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৬১)। আর কুরআন মজীদে তিনি তাহাদেরকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। যেমন আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠই উম্মত, তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে মানবজাতির জন্য। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে ঈমান আন" (৩: ১১০) বস্তুত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উসীলাতেই এই উম্মত মর্যাদার উচ্চ শিখরে আরোহণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। তিনি আল্লাহ্র সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাবান ব্যক্তি এবং রাসূলগণের মধ্যে তিনি হইলেন সর্বাধিক সম্মানিত রাসূল। এক পরিপূর্ণ শারী'আতসহ আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন। ইতোপূর্বে কোন নবী-রাসূলকে তাহা প্রদান করা হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তরীকায় অল্প আমলও অন্যের তরীকার অধিক আমল হইতে উত্তম। কুরআন-হাদীছ এবং সাহাবী ও তাবিঈনের বাণীতে অনুরূপ কথা বিবৃত হইয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: هُوَ اجْتَبْكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّيْنِ مِنْ حَرَجٍ "তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করিয়াছেন তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেন নাই" (২২: ৭৮)।

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيداً . "এইভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মতরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বারূপ হয়" (২: ১৪৩)।

বাহ্য ইব্‌ন হাকীম (রা) তাঁহার পিতা হইতে এবং তাঁহার পিতা তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মহান আল্লাহর বাণী : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أَخْرِجَتْ لِلنَّاسِ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩: ১১০)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, “ তোমরা হইলে সত্তরমত উম্মত; তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত এবং আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদেরকে অন্য সকল উম্মতের উপর মর্যাদা দান করিয়াছেন" (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩০০১; তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৩; ইব্‌ন মাজা, নং ৪২৮৮; মুসতাদরাক হাকেম, ৪খ., পৃ. ৮৪; তাঁহার মতে ইহার সনদ সহীহ, তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাফিয ইবন কাছীর বলেন, হাদীছটি প্রসিদ্ধ, তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৩৯৯)।

আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন, আমাকে ছয়টি বিষয়ের দ্বারা অন্যান্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে, আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও তাহা প্রদান করা হয় নাই। ইহার মধ্যে একটি হইল, আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত বানানো হইয়াছে (হাফিয হায়ছামী, মুসনাদে বাযযার; ইমাম বাযযার-এর মতে হাদীছটির সূত্র খুবই মজবুত; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬৯; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩৬)।

'আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমাকে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কোন নবী-রাসূলকে দান করা হয় নাই। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কি? তিনি বলিলেন: আমাকে রু'ব দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে; পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে দান করা হইয়াছে, আমাকে আহমাদ নামকরণ করা হইয়াছে, পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে এবং আমার উম্মতকে শ্রেষ্ঠতম উম্মত ঘোষণা করা হইয়াছে (মুসনাদে আহমাদ, ১খ., পৃ. ৯৮; হাফিয ইব্‌ন কাছীর বলেন, এই সনদে হাদীছটি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল নিঃসঙ্গ। তাঁহার সূত্রটি হাসান। তাফসীরে ইবন্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০০; হাফিয ইব্‌ন হাজার বলেন, ইহার সনদ হাসান, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫২২; অনুরূপভাবে- হাফিয হায়ছামী ইহাকে হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১খ., পৃ. ২৬১)।

আবু দারদা (রা) বলেন, আমি আবুল কাসিম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আল্লাহ্ তা'আলা ঈসা (আ)-কে বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার পর এক উম্মত সৃষ্টি করিব যাহাদের অবস্থা হইবে- যদি কোন পসন্দনীয় জিনিস তাহাদের হস্তগত হয়, তবে তাহারা আল্লাহর হাম্দ-শোকর করিবে। আর যদি তাহারা কোন অপসছন্দনীয় অবস্থার শিকার হয় তবে তাহারা ধৈর্য ধারণ করিবে। অথচ তাহাদের কোন হিল্ম (ধৈর্য) নাই এবং ইল্মও নাই। একথা শুনিয়া ঈসা (আ) বলেন, হে আমার রব! ইল্ম ও হিল্ল্ম ছাড়া কেমন করিয়া তাহারা এরূপ করিবে? আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, আমি আমার ইল্ল্ম ও হিল্ল্ম হইতে তাহাদেরকে দান করিব (মুসনাদে আহমাদ, ৬খ., পৃ. ৪৫০; হাফিয হায়ছামী বলেন, ইমাম আহমাদ, বাযযার ও ইমাম তাবারানী হাদীছটি মু'জামুল কাবীর ও মু'জামুল আওসাতে বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত সূত্রের রাবীগণ সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৬৭-৬৮; শু'আয়ব এবং আবদুল কাদির আরনাউত হাদীছের সূত্রটি হাসান বলিয়া অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন, যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৪৬)।

وَلَمَّا سَكَتَ عَنْ مُوسَى الْغَضَبُ أَخَذَ الْأَلْوَاحَ وَفِي نُسْخَتِهَا هُدًى وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ. "মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হইল তখন সে ফলকগুলি তুলিয়া নিল। যাহারা নিজেদের প্রতিপালককে ভয় করে তাহাদের জন্য উহাতে যাহা লেখা ছিল তাহাতে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত" (৭: ১৫৪)।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা (র) বলেন, তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! এই ফলকগুলিতে আমি এমন এক উম্মতের সন্ধান পাইয়াছি যাহাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলা হইয়াছে, যাহাদের আবির্ভাব হইবে মানুষের কল্যাণের জন্য। তাহারা লোকজনকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে বাধা দিবে। হে আল্লাহ্! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে মহান আল্লাহ্ বলেন, তাহারা আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। তারপর মূসা (আ) বলেন, আমি ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখ পাইয়াছি যাহারা হইবে আখিরী উম্মত অর্থাৎ সৃষ্টির দিক হইতে আখিরী উম্মত হইবে, কিন্তু জান্নাতে যাইবে সর্বাগ্রে; তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ (স)-এর উম্মত হইবে। মূসা (আ) পুনরায় বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহাদের বক্ষে তাহাদের ধর্মগ্রন্থ সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাহা হইতে তাহারা পাঠ করিবে। অথচ তাহাদের পূর্ববর্তী উম্মতের অবস্থা এমন ছিল যে, তাহারা তাহাদের ধর্মগ্রন্থ দেখিয়া দেখিয়া পাঠ করিত। তারপর ঐ ধর্মগ্রন্থ তাহাদের হইতে উঠাইয়া নেওয়ার পর তাহারা আর তাহা হিফাযত করিয়া রাখিতে পারে নাই। পরবর্তী উম্মতকে আল্লাহ্ তা'আলা এমন স্মৃতিশক্তি দান করিবেন যাহা পূর্ববর্তী কোন উম্মতকে দেওয়া হয় নাই। হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মত বানাইয়া দিন। এবারও আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারা হইবে আহমাদ নবীর উম্মত। মূসা (আ) আরও বলেন, হে আমার রব! ফলকসমূহে আমি এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করাও জায়েয হইবে; অথচ পূর্ববর্তী উম্মতগণ সাদাকা করার পর তাহা কবূল হইলে আল্লাহ্ তা'আলা আকাশ হইতে আগুন নাযিল করিতেন এবং সেই আগুন তাহা গ্রাস করিত। আর সাদাকা গ্রহণযোগ্য না হইলে তাহা অমনি রাখিয়া দেওয়া হইত। অবশেষে জীব-জন্তু ও পাখি আসিয়া তাহা খাইয়া ফেলিত। কিন্তু পরবর্তী উম্মতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা ভিন্ন ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। তিনি ধনীদের হইতে গরীবদের জন্য সাদাকা গ্রহণ করেন। তখন মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব! তাহাদেরকেও আমার উম্মত বানাইয়া দিন। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। মূসা (আ) আবারও বলেন, হে আমার রব! আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন এক উম্মতের উল্লেখও পাইয়াছি যাহারা কোন নেক আমলের ইচ্ছা করিয়া তাহা বাস্তবে রূপায়িত না করিলেও তাহাদেরকে একটি ছওয়াব দান করা হইবে। আর যদি তাহারা তাহা বাস্তবে রূপায়িত করে তবে দশ হইতে সাত শত পর্যন্ত ছওয়াব তাহাদেরকে দেওয়া হইবে। সুতরাং হে আমার রব! তাহাদেরকে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। ইহার পর মূসা (আ) বলেন, হে আমার রব। আমি তাওরাতের ফলকগুলিতে এমন উম্মতেরও সন্ধান পাইয়াছি যাহাদের জন্য সুপারিশ করা হইবে এবং তাহাদের ব্যক্তিগত সুপারিশও গ্রহণযোগ্য হইবে। তাহাদেরকে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল করিয়া দিন। জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তাহারাও আহমাদ নবীর উম্মত হইবে। বর্ণনাকারী কাতাদা (র) বলেন, তখন আল্লাহ্ নবী মূসা (আ) ফলকগুলি ছুড়িয়া মারেন এবং বলেন, হে আল্লাহ্! তাহা হইলে আমাকেও আহমাদ (স)-এর উম্মত হিসাবে কবূল করিয়া নিন (তাফসীর ইন জারীর, ৯খ., পৃ. ৪৫; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২খ., ২৫৯)।

রবী' ইব্‌ন খাছ'আম (র) বলেন, ইসলাম ধর্মে মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতেরা তুলনায় আর কাহারও দু'আই অধিক পরিমাণে আল্লাহ্র দরবারে গৃহীত হইবে না। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন : كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ. "তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হইয়াছে" (৩:১১০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00