📄 (দুই) যাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না তাহাদেরকে আগে জান্নাতে দাখিল করার সুপারিশ
শাফা'আতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, হাশরের ময়দানে তাঁহার যেসব উম্মতের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না, তিনি তাহাদেরকে সকলের আগে জান্নাতে দাখিল করার জন্য সুপারিশ করিবেন। আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে তাঁহার কত যে মর্যাদা ইহাতেও তাহা প্রতীয়মান হয়। এই সম্বন্ধে হাদীছেও স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। শাফা'আত সম্পর্কিত এক দীর্ঘ হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত যে, সেদিন আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠান এবং আপনার উম্মতের মধ্যে যাঁহাদের কোন হিসাব নাই তাহাদেরকে জান্নাতের ডান দরজা দিয়া প্রবেশ করাইয়া দিন। অবশ্য অন্য তোরণ দিয়াও অন্যান্য লোকদের সঙ্গে তাহারা জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., নং ৪৭১২; মুসলিম, নং ১৯৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমি আমার মহান রবের নিকট প্রার্থনা করিয়াছি এবং তিনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার ব্যক্তিকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হইবে। তারপর আমি আরও অধিক সংখ্যকের জন্য আবেদন করিলে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার বাড়াইয়া দেন। তখন আমি আরয করিলাম, হে আমার রব! আমার মুহাজির উম্মতের সংখ্যা যদি এই পরিমাণ না হয় তাহা হইলে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তাহা হইলে বেদুঈনদের দ্বারা আমি এই সংখ্যা পূর্ণ করিয়া দিব (মুসনাদে আহমাদ, ২খ., পৃ. ৩৫৯; হাফিয ইবন হাজার (র) বলেন, হাদীছটির সনদ খুবই উত্তম; ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪১৮; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন, ইহার রাবী সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৪০৪)।
আবূ উমামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। রাবী ইয়াযীদ ইব্ন আখনাস আস-সুলামী (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! তাহাদের অবস্থানটি হইবে অসংখ্য মধুমক্ষিকার মধ্যে একটি লালচে সাদা মাছির মত। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার রব ঐ সত্তর হাজারের প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন বলিয়া আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন। ইহা ছাড়াও মহান আল্লাহ্ তাঁহার কুদরতের অঞ্জলিতে আরও তিন অঞ্জলি মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন (তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪৩৭; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান ও গরীব; ইবন মাজা, হাদীছ নং ৪২৮৬; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২৫০; হাফিয ইন্ন কাছীর (র) বলেন, হাদীছের সূত্রটি হাসান, তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০২)। হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার রাবীগণ সকলেই সহীহয়ানের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; ইমাম তিরমিযী ও ইবন মাজা হাদীছটিকে আংশিকভাবে উল্লেখ করিয়াছেন; মাজমা'উয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৩৬২, ৩৬৩)।
📄 (তিন) চাচা আবূ তালিবের আযাব লঘু করার সুপারিশ
চাচা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন, তাঁহার প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখিতেন, তাঁহাকে সাহায্য করিতেন, মহব্বত করিতেন এবং বিপদে তাঁহাকে সহায়তা করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি তাঁহার এই ভালবাসা স্বভাবজাত ও আত্মীয়সুলভ, দীনি ভালবাসা নয়। তাঁহার মুমূর্ষু অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) শেষবারের মত তাহাকে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, তাহার ঈমান নসিব হয় নাই। আল্লাহ্র ভেদ-রহস্য সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। অবশ্য তিনি যেহেতু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে সদাচার করিয়াছেন, এই উসীলায় তাহাকে হালকা ধরনের শাস্তি প্রদান করা হইবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের ব্যাপারে কোন সুপারিশকারীর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হইবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে এবং তাঁহার হৃদয়ে স্বস্তি প্রদানের নিমিত্ত আল্লাহ্ তা'আলা তাহার শাস্তিকে লঘু করিয়া দিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা প্রসঙ্গে তাঁহার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন, খাজা আবূ তালিবের জন্য সুপারিশ করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৩৯)।
হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) হইতে বর্ণিত। একদা তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আবু তালিবের কোন উপকার করিতে পারিয়াছেন কি? তিনি তো আপনার প্রতি লক্ষ্য রাখিতেন, আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতেন এবং আপনার কারণে অন্যের প্রতি অসন্তুষ্ট হইতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: হাঁ, তাহার কেবল পায়ের গোছা পর্যন্ত জাহান্নামের আগুন থাকিবে। আর যদি আমি না হইতাম, তবে জাহান্নামের অতলে তাহাকে অবস্থান করিতে হইত (মুসলিম, নং ২০৯)।
আব্বাস (রা) আরও বলেন, একদা আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব তো আপনাকে হিফাযত করিতেন এবং আপনাকে সাহায্য করিতেন। এই সমস্ত কাজ তাহার কোন উপকারে আসিবে কি? জবাবে তিনি বলেন: হাঁ, আমি তাহাকে জাহান্নামের গভীরে পাইয়াছিলাম এবং সেখান হইতে (তাহার পায়ের) গোছা পর্যন্ত বাহির করিয়া আনিয়াছি (মুসলিম, নং ২১০, ৩৫৮)।
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাঁহার চাচা আবু তালিবের কথা আলোচিত হইলে তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন তাহার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কাজে আসিবে বলিয়া আশা রহিয়াছে। তাহাকে জাহান্নামের উপরিভাগে এমনভাবে রাখা হইবে যে, আগুন তাহার পায়ের গিরা পর্যন্ত পৌঁছিবে। ইহাতেই তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৬৪; মুসলিম, নং ২১০)।
ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হইবে আবু তালিবের। তাহাকে একজোড়া জুতা পরাইয়া দেওয়া হইবে। এই জুতা জোড়ার কারণে তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (মুসলিম, নং ২১২)।
📄 (চার) উম্মতের জন্য নবী কারীম (স)-এর দু'আ ও তাহা কবুল হওয়া
আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দু'আর অনুমতি প্রদান করিয়াছেন এবং তাঁহাকে জানাইয়াও দিয়াছেন যে, তাঁহার এই দু'আ কবুল হইবে। বস্তুত নবী-রাসূলগণের সব দু'আই আল্লাহ্ দরবারে গ্রহণযোগ্য হইয়াছে। আমাদের নবীজীর দু'আও আল্লাহ্র দরবারে গ্রহণযোগ্য হইয়াছে এবং এসবের সংখ্যা অগণিত। এইসব দু'আ আশা ও নিরাশার মাঝে আবর্তিত ছিল। কিন্তু আলোচ্য দু'আর বিষয়টি তদ্রূপ নয়, বরং এই দু'আর ব্যাপারে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রত্যেক নবীকে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছে যে, ইহা অবশ্যই কবুল করা হইবে। পূর্ববর্তী নবীগণ সকলেই সেই দু'আ দুনিয়াতেই করিয়াছেন এবং উহার ফলও পাইয়াছেন। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স) কিয়ামত দিবসের কঠিন বিপদকালে উম্মতের শাফা'আতের জন্য সেই দু'আ স্থগিত রাখিয়াছেন। নবী-রাসূলগণকে উম্মতের পক্ষ হইতে আল্লাহ তা'আলা যে বিনিময় প্রদান করিবেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে ঐসব বিনিময়ের তুলনায় সর্বোত্তম বিনিময় প্রদান করুন।
বস্তুত রাসূলুল্লাহ (স) উম্মতের প্রতি চরম মমত্ববোধের ভিত্তিতেই এমনটি করিয়াছেন। কেননা সেদিন তাঁহার গুনাহগার উম্মতগণ এই জাতীয় দু'আর খুবই মুখাপেক্ষী থাকিবে। উল্লেখ্য যে, উম্মতের জন্য এই জাতীয় দু'আর ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স) হইবেন স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। এক্ষেত্রে তাঁহার দু'আয় কেহ শরীক থাকিবে না। আর ইহাই হইবে তাঁহার পক্ষ হইতে উম্মতের জন্য সুপারিশ। হাদীছেও এই সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দু'আর অনুমতি প্রদান করা হইয়াছে এই সুযোগে তিনি যেই দু'আ করিবেন তাহা অবশ্যই কবূল হইবে। সকল নবী তাঁহাদের দু'আটি পৃথিবীতে করিয়াছেন। আর আমি আমার দু'আটি কিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের শাফা'আতের জন্য মুলতবি রাখিয়া দিয়াছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি কোন প্রকার শিরক করে নাই, সে এই দু'আর বরকত লাভ করিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৩০৪; মুসলিম, নং ১৯৯)।
আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য উঠিলেন। তখন বহু সাহাবী তাঁহার পিছনে দাঁড়াইয়া তাঁহার পাহারাদারী করিয়াছিলেন। নামাযান্তে তিনি তাঁহাদের প্রতি তাকাইয়া বলিলেন: আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস প্রদান করা হইয়াছে যাহা আমার পূর্বে আর কাহাকেও দান করা হয় নাই। হাদীছ শরীফে ইহাও উল্লেখ রহিয়াছে, আমাকে বলা হইবে: আপনি দু'আ করুন। কেননা প্রত্যেক নবীই একটি বিশেষ দু'আ করিয়াছেন। কিন্তু কিয়ামত দিবসের জন্য আমি আমার দু'আটি মুলতবি রাখিয়াছি। তাহা তোমাদের জন্য আমি প্রয়োগ করিব এবং ঐ সমস্ত লোকদের জন্যও যাহারা لا اله الا الله "আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই" বলিয়া সাক্ষ্য দিয়াছে (প্রাগুক্ত)।
📄 তৃতীয় প্রকার: যেসব বৈশিষ্ট্য দুনিয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের জন্য নির্দিষ্ট
আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ (স)-এর উম্মতকে অন্যান্য সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন এবং দুনিয়াতে তাহাদেরকে এমন সব সম্মানে ভূষিত করিয়াছেন যাহা তিনি অন্য কোন উম্মতকে দেন নাই। বস্তুত এসব মর্যাদা সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল-আখিরীন মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মানার্থেই মহান আল্লাহ তাহাদেরকে দান করিয়াছেন। এই উম্মত কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণের মাধ্যমেই ঐ দুর্লভ মর্যাদা লাভ করিতে সক্ষম হইবে, বিকল্প কোন পথে নয়। এই উম্মতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল- তাহারা শ্রেষ্ঠতম উম্মত; তাহাদের জন্য গনীমতের মাল হালাল, পৃথিবী মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু এবং তাহাদের নামাযের কাতারকে ফেরেশতাদের কাতারতুল্য বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে ইত্যাদি।