📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (তিন) শাফা'আতে কুরা ও অন্যান্য শাফা'আত

📄 (তিন) শাফা'আতে কুরা ও অন্যান্য শাফা'আত


কিয়ামতের দিন পৃথিবীর শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানুষকে একটি ময়দানে একত্র করা হইবে। সূর্য মাথার নিকটবর্তী হইয়া যাইবে, ইহার তাপমাত্রা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাইবে এবং পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হইবে। ঘাম এত বেশী হইবে যে, সত্তর গজ নীচ পর্যন্ত এই ঘাম ঢুকিয়া পড়িবে। আর মাটির উপরে কাহারও মুখ পর্যন্ত, কাহারও কান পর্যন্ত ঘাম পৌঁছিয়া যাইবে। সেই দিনটি পঞ্চাশ হাজার বৎসরের সমান হইবে। মানুষ পায়ের উপর দাঁড়াইয়া অপলক নেত্রে তাকাইয়া থাকিবে এবং হৃদয় ফাটিয়া পড়ার উপক্রম হইবে। কেহ কোন কথা বলিবে না এবং নিজের প্রতি কাহারও লক্ষ্য থাকিবে না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছিবে। তখন তাহারা পরস্পর আলোচনা করিবে যেন কেহ তাহাদের জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু কোন নবীই তাহাদের জন্য সুপরিশ করিতে উদ্যোগী হইবেন না। সকলেই তাহাদেরকে ফেরত দিবেন এবং নিজেরা নাফসী নাফসী বলিতে থাকিবেন। তাঁহারা ইহাও বলিবেন, তোমরা অন্য কাহারও কাছে যাও। এমনি করিয়া শাফা'আতের বিষয়টি তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া পৌঁছিবে। তখন তিনি এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবেন এবং শাফা'আত করিবেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা বিচারের ব্যবস্থা করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শাফাআতে কুবরা একমাত্র নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য। ইহাকেই মাকামে মাহমূদ বলে। আল্লামা ইব্‌ন হাজার আসকালানী (র) অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। এই শাফা'আতের মাধ্যমেই হাশরের ময়দানে উপস্থিত মানুষ বিচারের বিভীষিকা ও হিসাবের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখিয়া পরিত্রাণ পাইবে (দ্র. ফাতহুল বারী, ৩খ., পৃ. ৩৯৮; হাদীছে এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (এক) জান্নাতের দরজা খোলার জন্য শাফা'আত

📄 (এক) জান্নাতের দরজা খোলার জন্য শাফা'আত


হাশরের ময়দানে মানুষ এক বিপদ হইতে আরেক বিপদে আক্রান্ত হইতে থাকিবে। বিচার আরম্ভ হওয়ার পূর্বে ভয়াবহ অবস্থা হইবে; তাহারপর শাফা'আতে কুবরা, তাহারপর হিসাব-নিকাশ শুরু হইবে। তখনই মীযান (কৃতকর্মের ওজনদণ্ড) স্থাপন করা হইবে, আমলনামা (কৃতকর্মের বিবরণী) পেশ করা হইবে এবং মু'মিন ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য করা হইবে। তাহারপর পুলসিরাত স্থাপন করা হইবে এবং লোকজনকে তাহা অতিক্রম করিতে হইবে। এসব কিছু শেষ হইলে পর মু'মিন লোকেরা সকলেই দণ্ডায়মান হইবে। তখন জান্নাতকে তাহাদের নিকটবর্তী করা হইবে। এই অবস্থায় তাহারা এমন ব্যক্তির অনুসন্ধান করিবে যিনি তাহাদের রবের নিকট সুপারিশ করিবের জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার জন্য। এই লক্ষ্যে তাহারা পর্যায়ক্রমে আদম, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)-এর নিকট যাইবে। তাঁহারা সকলেই এই গুরুদায়িত্ব আনজাম দিতে অপারগতা জ্ঞাপন করিবে। তখন তাহারা সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিবে। তিনি তাহাদের জন্য মহান আল্লাহ্র দরবারে সুপারিশ করিবেন। হাদীছে এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ রহিয়াছে।

আবু হুরায়রা ও হুযায়ফা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা সকল মানুষকে একত্র করিবেন। মু'মিনগণ দাঁড়াইয়া থাকিবে। জান্নাত তাহাদের নিকটবর্তী করা হইবে। অবশেষে সকলে আদম (আ)-এর নিকট আসিয়া বলিবে, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার দু'আ করুন। আদম (আ) বলিবেন, তোমাদের পিতা আদমের ত্রুটির কারণেই তো তোমাদেরকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। সুতরাং আমি ইহার যোগ্য নই। তোমরা আমার পুত্র ইবরাহীমের নিকট যাও। তিনি আল্লাহ্র বন্ধু।

তাহারা সবাই ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আসিলে তিনি বলিবেন, আমিও ইহার যোগ্য নই। আমি আল্লাহ্র বন্ধু ছিলাম, কিন্তু তাহা ছিল অন্তরাল হইতে। এই কথাটি তিনি বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন অথবা ইহার মর্ম হইল, সরাসরি আল্লাহ্র সঙ্গে আমার কথা হয় নাই যেমন মূসার হইয়াছিল (সহীহ মুসলিম, শরহে নববী, ৩খ., পৃ. ৭১)। সুতরাং তোমরা মূসার নিকট যাও। কারণ তিনি আল্লাহ্র সঙ্গে সরাসরি বাক্যালাপ করিতেন। তখন তাহারা সবাই মূসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, আমিও ইহার যোগ্য নই; বরং তোমরা ঈসার নিকট যাও। তিনি আল্লাহ্ দেওয়া কলেমা ও তাঁহার রূহ। তখন তিনিও বলিবেন, আমিও ইহার উপযুক্ত নই। তখন সকলে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট আসিবে। তিনি দাঁড়াইবেন এবং তাঁহাকে অনুমতি প্রদান করা হইবে। তখন আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক পুলসিরাতের ডানে-বাঁয়ে আসিয়া দাঁড়াইবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এই সিরাত বিজলীর গতিতে পার হইয়া যাইবে। সাহাবী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হউক! আমাকে বলিয়া দিন, "বিজলীর গতির ন্যায়" কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনও দেখ নাই? চোখের পলকে কিভাবে এখান হইতে সেখানে চলিয়া যায়, আবার ফিরিয়া আসে? তাহারপর রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: ইহার পরবর্তী দলগুলি যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখীর গতিতে, তাহারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হইয়া যাইবে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমল অনুপাতে তাহা অতিক্রম করিবে। আর তোমাদের নবী সেই অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়াইয়া এই দু'আ করিতে থাকিবেন, "আল্লাহ ইহাদেরকে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিন, ইহাদেরকে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিন"। এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলিতে অক্ষম করিয়া দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা এই সিরাত অতিক্রম করিতে থাকিবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাইবে, সে নিতম্বের উপর ভর করিয়া উহা অতিক্রম করিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলেন, সীরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকিবে কাঁটাযুক্ত লৌহ শলাকা। ইহারা আল্লাহ্র নির্দেশক্রমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করিবে। তন্মধ্যে কাহাকেও তো ক্ষত-বিক্ষত করিয়াই ছাড়িবে; সে নাজাত পাইবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হইবে। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, শপথ সেই সত্তার যাঁহার হাতে আবু হুরায়রার প্রাণ! জানিয়া রাখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ অর্থাৎ সত্তর হাজার বৎসরের পথ (মুসলিম, নং ১৯৫)।

আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: যে ব্যক্তি মানুষের নিকট ভিক্ষার হাত সম্প্রসারিত করে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় হাশরের ময়দানে উপস্থিত হইবে যে, তাহার মুখমণ্ডলে কোন গোশত থাকিবে না। সেদিন সূর্য নিকটবর্তী হইতে থাকিবে। ফলে ঘাম মানুষের অর্ধকান পর্যন্ত পৌঁছিয়া যাইবে। এমতাবস্থায় লোকেরা পর্যায়ক্রমে আদম, মূসা ও পরে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট ফরিয়াদ করিবে। তখন তিনি সৃষ্টি তথা মানুষের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য সুপারিশ করিবেন এবং সেই নিমিত্ত সামনে অগ্রসর হইয়া দরজার হলকা ধরিয়া দাঁড়াইবেন। তখনই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে মাকামে মাহমূদে প্রতিষ্ঠিত করিবেন এবং সমস্ত মানুষ তাঁহার প্রশংসা করিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৩খ., হাদীছ নং ১৪৭৪)।

উক্ত হাদীছে দুই ধরনের শাফা'আতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রথম শাফা'আত হইল, বিচারকার্য শুরু করার লক্ষ্যে, আর দ্বিতীয় শাফা'আত হইবে জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার জন্য। উক্ত উভয়বিধ শাফা'আতই হইবে মাকামে মাহমূদের অন্তর্ভুক্ত (মাআরিজুল কবুল, শায়খ হাফিয হিকামী, ২খ., পৃ. ৩১৪)।

আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজার নিকট পৌঁছিয়া তাহা খুলিয়া দেওয়ার জন্য বলিলে আমাকে জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা বলিবেন, আপনি কে? আমি বলিব: মুহাম্মাদ। ফেরেশতা বলিবেন, আপনার নিমিত্তই দরজা খুলিয়া দিতে আমি আদিষ্ট হইয়াছি। আপনার আগে কাহারও জন্য আমি তাহা খুলিব না (মুসলিম, নং ১৯৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (দুই) যাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না তাহাদেরকে আগে জান্নাতে দাখিল করার সুপারিশ

📄 (দুই) যাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না তাহাদেরকে আগে জান্নাতে দাখিল করার সুপারিশ


শাফা'আতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, হাশরের ময়দানে তাঁহার যেসব উম্মতের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না, তিনি তাহাদেরকে সকলের আগে জান্নাতে দাখিল করার জন্য সুপারিশ করিবেন। আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে তাঁহার কত যে মর্যাদা ইহাতেও তাহা প্রতীয়মান হয়। এই সম্বন্ধে হাদীছেও স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। শাফা'আত সম্পর্কিত এক দীর্ঘ হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত যে, সেদিন আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠান এবং আপনার উম্মতের মধ্যে যাঁহাদের কোন হিসাব নাই তাহাদেরকে জান্নাতের ডান দরজা দিয়া প্রবেশ করাইয়া দিন। অবশ্য অন্য তোরণ দিয়াও অন্যান্য লোকদের সঙ্গে তাহারা জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., নং ৪৭১২; মুসলিম, নং ১৯৪)।

আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমি আমার মহান রবের নিকট প্রার্থনা করিয়াছি এবং তিনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার ব্যক্তিকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হইবে। তারপর আমি আরও অধিক সংখ্যকের জন্য আবেদন করিলে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার বাড়াইয়া দেন। তখন আমি আরয করিলাম, হে আমার রব! আমার মুহাজির উম্মতের সংখ্যা যদি এই পরিমাণ না হয় তাহা হইলে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তাহা হইলে বেদুঈনদের দ্বারা আমি এই সংখ্যা পূর্ণ করিয়া দিব (মুসনাদে আহমাদ, ২খ., পৃ. ৩৫৯; হাফিয ইবন হাজার (র) বলেন, হাদীছটির সনদ খুবই উত্তম; ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪১৮; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন, ইহার রাবী সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৪০৪)।

আবূ উমামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। রাবী ইয়াযীদ ইব্‌ন আখনাস আস-সুলামী (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! তাহাদের অবস্থানটি হইবে অসংখ্য মধুমক্ষিকার মধ্যে একটি লালচে সাদা মাছির মত। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার রব ঐ সত্তর হাজারের প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন বলিয়া আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন। ইহা ছাড়াও মহান আল্লাহ্ তাঁহার কুদরতের অঞ্জলিতে আরও তিন অঞ্জলি মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন (তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪৩৭; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান ও গরীব; ইবন মাজা, হাদীছ নং ৪২৮৬; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২৫০; হাফিয ইন্ন কাছীর (র) বলেন, হাদীছের সূত্রটি হাসান, তাফসীরে ইব্‌ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০২)। হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার রাবীগণ সকলেই সহীহয়ানের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; ইমাম তিরমিযী ও ইবন মাজা হাদীছটিকে আংশিকভাবে উল্লেখ করিয়াছেন; মাজমা'উয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৩৬২, ৩৬৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (তিন) চাচা আবূ তালিবের আযাব লঘু করার সুপারিশ

📄 (তিন) চাচা আবূ তালিবের আযাব লঘু করার সুপারিশ


চাচা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন, তাঁহার প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখিতেন, তাঁহাকে সাহায্য করিতেন, মহব্বত করিতেন এবং বিপদে তাঁহাকে সহায়তা করিতেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি তাঁহার এই ভালবাসা স্বভাবজাত ও আত্মীয়সুলভ, দীনি ভালবাসা নয়। তাঁহার মুমূর্ষু অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) শেষবারের মত তাহাকে ঈমান ও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, তাহার ঈমান নসিব হয় নাই। আল্লাহ্র ভেদ-রহস্য সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন। অবশ্য তিনি যেহেতু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে সদাচার করিয়াছেন, এই উসীলায় তাহাকে হালকা ধরনের শাস্তি প্রদান করা হইবে। পক্ষান্তরে কাফিরদের ব্যাপারে কোন সুপারিশকারীর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হইবে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে এবং তাঁহার হৃদয়ে স্বস্তি প্রদানের নিমিত্ত আল্লাহ্ তা'আলা তাহার শাস্তিকে লঘু করিয়া দিবেন। ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা প্রসঙ্গে তাঁহার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন, খাজা আবূ তালিবের জন্য সুপারিশ করা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৩৯)।

হাদীছে এই সম্বন্ধে স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব (রা) হইতে বর্ণিত। একদা তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আবু তালিবের কোন উপকার করিতে পারিয়াছেন কি? তিনি তো আপনার প্রতি লক্ষ্য রাখিতেন, আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিতেন এবং আপনার কারণে অন্যের প্রতি অসন্তুষ্ট হইতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: হাঁ, তাহার কেবল পায়ের গোছা পর্যন্ত জাহান্নামের আগুন থাকিবে। আর যদি আমি না হইতাম, তবে জাহান্নামের অতলে তাহাকে অবস্থান করিতে হইত (মুসলিম, নং ২০৯)।

আব্বাস (রা) আরও বলেন, একদা আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবূ তালিব তো আপনাকে হিফাযত করিতেন এবং আপনাকে সাহায্য করিতেন। এই সমস্ত কাজ তাহার কোন উপকারে আসিবে কি? জবাবে তিনি বলেন: হাঁ, আমি তাহাকে জাহান্নামের গভীরে পাইয়াছিলাম এবং সেখান হইতে (তাহার পায়ের) গোছা পর্যন্ত বাহির করিয়া আনিয়াছি (মুসলিম, নং ২১০, ৩৫৮)।

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট তাঁহার চাচা আবু তালিবের কথা আলোচিত হইলে তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন তাহার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কাজে আসিবে বলিয়া আশা রহিয়াছে। তাহাকে জাহান্নামের উপরিভাগে এমনভাবে রাখা হইবে যে, আগুন তাহার পায়ের গিরা পর্যন্ত পৌঁছিবে। ইহাতেই তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৬৪; মুসলিম, নং ২১০)।

ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হইবে আবু তালিবের। তাহাকে একজোড়া জুতা পরাইয়া দেওয়া হইবে। এই জুতা জোড়ার কারণে তাহার মগজ টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে (মুসলিম, নং ২১২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00