📄 (দুই) মাকামে মাহমূদ
কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (স)-কে নানাভাবে সম্মানিত করা হইবে। এসব মর্যাদার ক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্র। নবী-রাসূলগণের কেহ এই ক্ষেত্রে তাঁহার অংশীদার নাই এবং কেহ তাঁহার সমকক্ষও নহেন। ইহার মধ্যে একটি হইল মাকামে মাহমুদ। এই স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) দণ্ডায়মান থাকিবেন। তাহারপর স্রষ্টা ও সৃষ্টি সকলে মিলিয়া তাঁহার প্রশংসা ও স্তুতি করিবেন। যেমন মহান আল্লাহ্ মহান বাণী : وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوداً . "এবং রাত্রির কিছু অংশে তুমি তাহাজ্জুদ কায়েম করিবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করিবেন প্রশংসিত স্থানে” (১৭ঃ ৭৯)।
মাকামে মাহমুদের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারদের একাধিক অভিমত রহিয়াছে। ইবন জারীর তাবারী (র) বলেন, অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, মাকামে মাহমূদ হইল সেই স্থান যেখানে রাসূলুল্লাহ (স) কিয়ামতের দিন শাফা'আত করার জন্য দণ্ডায়মান হইবেন। এই শাফা'আতের উদ্দেশ্য হইল, আল্লাহ তা'আলা যেন কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ অবস্থা হইতে লোকদেরকে নিষ্কৃতি দেন (তাফসীরে ইবন জারীর, ১৫খ., পৃ. ৯৭)।
ইবন বাত্তাল (র) বলেন, জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে, মাকামে মাহমূদ দ্বারা “শাফা'আত” বুঝানো হইয়াছে। আল্লামা ওয়াহিদী (র) এই ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করিয়া বলেন, এই বিষয়ে আলিমগণের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৩৪)। ইবন হাজার আসকালানী (র) “মাকামে মাহমূদ”-এর উভয়বিধ ব্যাখ্যা উল্লেখ করিয়া বলেন, অগ্রগণ্য মতানুসারে “মাকামে মাহমূদ” অর্থ ‘শাফা'আত' (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৩৫)।
হুযায়ফা ইনুল ইয়ামান (রা) মহান আল্লাহর বাণী : عَسَى أَنْ يُبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوداً -এর ব্যাখ্যায় বলেন, কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষকে একই ময়দানে একত্র করা হইবে এবং একজন আহ্বানকারী এমনভাবে আহ্বান করিবে যে, সকলে তাহা শুনিতে পাইবে। এমনকি চোখ তাহাদেরকে উলঙ্গ মাথা ও খালি পা দেখিতে পাইবে, যেমন জন্মলগ্নে তাহাদের অবস্থা ছিল। তখন তাহারা নীরব থাকিবে। আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়া কেহ কথা বলিতে সাহস করিবে না। এই অবস্থায় আহ্বানকারী বলিবে, হে মুহাম্মাদ! আমি বলিব, লাব্বায়ক, লাব্বায়ক। হে আল্লাহ! সমস্ত কল্যাণ তোমারই হাতে। কোন অকল্যাণের সংযোগ তোমার সহিত করা যায় না। তুমি যাহাকে হিদায়াত দান কর সে-ই হিদায়াত প্রাপ্ত হয়। তোমার আশ্রয় ব্যতীত নাজাতের জায়গা নাই। তুমি বরকতময় ও মহান। হে কা'বা গৃহের মালিক! তুমি মহিমান্বিত। বস্তুত ইহাই হইল মাকামে মাহমূদ, যে সম্বন্ধে আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন : عسى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوداً . "অচিরে আপনার রব আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করিবেন মাকামে মাহমূদে" [মুসতাদরাক হাকেম, ২খ., পৃ. ৩৬৩; তাহার মতে হাদীছটি শায়খায়নের শর্তে উত্তীর্ণ। তবে তাঁহারা তাঁহাদের কিতাবে ইহা বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহাবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লামা তাবারী তৎপ্রণীত তাফসীর গ্রন্থে এই মতটি সমর্থন করিয়াছেন, ১৫খ., পৃ. ৯৮)। হাফিয ইব্ন হাজার (র) বলেন, ইমাম নাসাঈ (র) হাদীছটি সহীহ সনদে বর্ণনা করিয়াছেন; ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ২৫১)। মুসান্নাফ আবদুর রায্যাক মু'জামুত-তাবারানী, ইব্ন মান্দা প্রমুখ কিতাবুল ঈমানে বলেন, এই হাদীছের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে ইমামগণের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। অধিকন্তু ইহার রাবীগণ নির্ভরযোগ্য (ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪৪৫]।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, "মাকামে মাহমূদ" হইল মাকামে শাফা'আত (শাফা'আতের স্থান)। এই হাদীছটি ইমাম ইব্ন জারীর তাবারী বর্ণনা করিয়াছেন (তাফসীরে তাবারী, ১১খ., পৃ. ৯৭; ইব্ন কাছীর, তাফসীর, ৩খ., পৃ. ৫৮; মুজাহিদ (র) ও হাসান (র)-ও অনুরূপ মতামত বর্ণনা করিয়াছেন)।
হাদীছে মাকামে মাহমূদের কথা কোথাও স্পষ্টভাবে, আবার কোথাও ইঙ্গিতে বর্ণনা করা হইয়াছে। জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: যদি কোন ব্যক্তি আযানের আওয়াজ শুনিয়া নিম্নের দু'আটি পড়ে, তবে তাহার জন্য শাফা'আত করা আমার উপর ওয়াজিব হইবে। اللهم رب هذه الدعوة التامة والصلاة القائمة ات محمدا الوسيلة والفضيلة وابعثه مقاما محمودا الذي وعدته. আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কিয়ামতের দিন সূর্য নিকটবর্তী হইবে। ফলে ঘাম মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছিয়া যাইবে। এই অবস্থায় লোকেরা ক্রমান্বয়ে আদম (আ), মূসা (আ), মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করিবে। তখন তিনি শাফা'আত করিবেন যাহাতে বিচারকার্য শুরু করা হয়। তাহারপর রাসূলুল্লাহ (স) সামনে অগ্রসর হইয়া দরজার চৌকাঠ ধরিবেন। তখনই আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে মাকামে মাহমূদে প্রতিষ্ঠিত করিবেন এবং সমবেত সকলেই তাঁহার প্রশংসা করিবেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৩খ., হাদীছ ১৪৭৫)।
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) হইতে আরও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামতের দিন লোকেরা দলে দলে উপস্থিত হইবে। প্রত্যেক উম্মত তাহাদের নিজ নিজ নবীর অনুসরণ করিবে। তাহারা বলিবে, হে অমুক নবী! আমাদের জন্য শাফা'আত করুন। অবশেষে বিষয়টি যাইতে যাইতে মহানবী (স) পর্যন্ত পৌঁছিবে। ইহা সেদিন হইবে যেদিন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে মাকামে মাহমূদে প্রতিষ্ঠিত করিবেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১৮)।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে ১৭: ৭৯ আয়াতে বর্ণিত "মাকামে মাহমূদ"-এর ব্যাখ্যা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি বলেন, ইহার মর্ম হইল শাফা'আত (তিরমিযী, হাদীছ নং ৩১৩৭; তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান। মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ২খ., পৃ. ৪৪৪-৪৭৮; তাফসীরে তাবারী, ১৫খ., পৃ. ৯৮)।
কা'ব ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: কিয়ামতের দিন লোকদেরকে হাশরের ময়দানে উঠানো হইবে। তখন আমি এবং আমার উম্মত টিলার উপর থাকিব। এই অবস্থায় আমার রব আমাকে এক জোড়া সবুজ কাপড় পরিধান করিতে দিবেন। তাহারপর আমাকে শাফা'আতের জন্য অনুমতি প্রদান করা হইবে। এই পর্যায়ে আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা করিবেন আমি তাহা বলিব। আর ইহাই হইল মাকামে মাহমূদ (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৫; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাফিয হায়ছামী, ৭খ., পৃ. ৫১; ইমাম আহমাদ যাহাদের সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন তাঁহারা সকলেই নির্ভরযোগ্য। হাফিয হায়ছামী অন্যত্রও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন, ১০খ., পৃ. ৩৭৭; তাবারানী, মু'জামুল আওসাত ও মুজামুল কাবীর, মুসতাদরাক হাকেম, ৩খ., পৃ. ৩৬৩; তাঁহার মতে হাদীছটি সহীহ, বুখারী- মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ। তবে তাঁহারা ইহা বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন)।
📄 (তিন) শাফা'আতে কুরা ও অন্যান্য শাফা'আত
কিয়ামতের দিন পৃথিবীর শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত মানুষকে একটি ময়দানে একত্র করা হইবে। সূর্য মাথার নিকটবর্তী হইয়া যাইবে, ইহার তাপমাত্রা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাইবে এবং পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হইবে। ঘাম এত বেশী হইবে যে, সত্তর গজ নীচ পর্যন্ত এই ঘাম ঢুকিয়া পড়িবে। আর মাটির উপরে কাহারও মুখ পর্যন্ত, কাহারও কান পর্যন্ত ঘাম পৌঁছিয়া যাইবে। সেই দিনটি পঞ্চাশ হাজার বৎসরের সমান হইবে। মানুষ পায়ের উপর দাঁড়াইয়া অপলক নেত্রে তাকাইয়া থাকিবে এবং হৃদয় ফাটিয়া পড়ার উপক্রম হইবে। কেহ কোন কথা বলিবে না এবং নিজের প্রতি কাহারও লক্ষ্য থাকিবে না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছিবে। তখন তাহারা পরস্পর আলোচনা করিবে যেন কেহ তাহাদের জন্য সুপারিশ করেন। কিন্তু কোন নবীই তাহাদের জন্য সুপরিশ করিতে উদ্যোগী হইবেন না। সকলেই তাহাদেরকে ফেরত দিবেন এবং নিজেরা নাফসী নাফসী বলিতে থাকিবেন। তাঁহারা ইহাও বলিবেন, তোমরা অন্য কাহারও কাছে যাও। এমনি করিয়া শাফা'আতের বিষয়টি তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া পৌঁছিবে। তখন তিনি এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবেন এবং শাফা'আত করিবেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা বিচারের ব্যবস্থা করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শাফাআতে কুবরা একমাত্র নবী কারীম (স)-এর বৈশিষ্ট্য। ইহাকেই মাকামে মাহমূদ বলে। আল্লামা ইব্ন হাজার আসকালানী (র) অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। এই শাফা'আতের মাধ্যমেই হাশরের ময়দানে উপস্থিত মানুষ বিচারের বিভীষিকা ও হিসাবের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখিয়া পরিত্রাণ পাইবে (দ্র. ফাতহুল বারী, ৩খ., পৃ. ৩৯৮; হাদীছে এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে)।
📄 (এক) জান্নাতের দরজা খোলার জন্য শাফা'আত
হাশরের ময়দানে মানুষ এক বিপদ হইতে আরেক বিপদে আক্রান্ত হইতে থাকিবে। বিচার আরম্ভ হওয়ার পূর্বে ভয়াবহ অবস্থা হইবে; তাহারপর শাফা'আতে কুবরা, তাহারপর হিসাব-নিকাশ শুরু হইবে। তখনই মীযান (কৃতকর্মের ওজনদণ্ড) স্থাপন করা হইবে, আমলনামা (কৃতকর্মের বিবরণী) পেশ করা হইবে এবং মু'মিন ও মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য করা হইবে। তাহারপর পুলসিরাত স্থাপন করা হইবে এবং লোকজনকে তাহা অতিক্রম করিতে হইবে। এসব কিছু শেষ হইলে পর মু'মিন লোকেরা সকলেই দণ্ডায়মান হইবে। তখন জান্নাতকে তাহাদের নিকটবর্তী করা হইবে। এই অবস্থায় তাহারা এমন ব্যক্তির অনুসন্ধান করিবে যিনি তাহাদের রবের নিকট সুপারিশ করিবের জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার জন্য। এই লক্ষ্যে তাহারা পর্যায়ক্রমে আদম, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)-এর নিকট যাইবে। তাঁহারা সকলেই এই গুরুদায়িত্ব আনজাম দিতে অপারগতা জ্ঞাপন করিবে। তখন তাহারা সকলেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিবে। তিনি তাহাদের জন্য মহান আল্লাহ্র দরবারে সুপারিশ করিবেন। হাদীছে এই সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ রহিয়াছে।
আবু হুরায়রা ও হুযায়ফা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: আল্লাহ্ তা'আলা সকল মানুষকে একত্র করিবেন। মু'মিনগণ দাঁড়াইয়া থাকিবে। জান্নাত তাহাদের নিকটবর্তী করা হইবে। অবশেষে সকলে আদম (আ)-এর নিকট আসিয়া বলিবে, হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার দু'আ করুন। আদম (আ) বলিবেন, তোমাদের পিতা আদমের ত্রুটির কারণেই তো তোমাদেরকে জান্নাত হইতে বহিষ্কার করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। সুতরাং আমি ইহার যোগ্য নই। তোমরা আমার পুত্র ইবরাহীমের নিকট যাও। তিনি আল্লাহ্র বন্ধু।
তাহারা সবাই ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আসিলে তিনি বলিবেন, আমিও ইহার যোগ্য নই। আমি আল্লাহ্র বন্ধু ছিলাম, কিন্তু তাহা ছিল অন্তরাল হইতে। এই কথাটি তিনি বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন অথবা ইহার মর্ম হইল, সরাসরি আল্লাহ্র সঙ্গে আমার কথা হয় নাই যেমন মূসার হইয়াছিল (সহীহ মুসলিম, শরহে নববী, ৩খ., পৃ. ৭১)। সুতরাং তোমরা মূসার নিকট যাও। কারণ তিনি আল্লাহ্র সঙ্গে সরাসরি বাক্যালাপ করিতেন। তখন তাহারা সবাই মূসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, আমিও ইহার যোগ্য নই; বরং তোমরা ঈসার নিকট যাও। তিনি আল্লাহ্ দেওয়া কলেমা ও তাঁহার রূহ। তখন তিনিও বলিবেন, আমিও ইহার উপযুক্ত নই। তখন সকলে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট আসিবে। তিনি দাঁড়াইবেন এবং তাঁহাকে অনুমতি প্রদান করা হইবে। তখন আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক পুলসিরাতের ডানে-বাঁয়ে আসিয়া দাঁড়াইবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এই সিরাত বিজলীর গতিতে পার হইয়া যাইবে। সাহাবী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হউক! আমাকে বলিয়া দিন, "বিজলীর গতির ন্যায়" কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনও দেখ নাই? চোখের পলকে কিভাবে এখান হইতে সেখানে চলিয়া যায়, আবার ফিরিয়া আসে? তাহারপর রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: ইহার পরবর্তী দলগুলি যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখীর গতিতে, তাহারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হইয়া যাইবে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমল অনুপাতে তাহা অতিক্রম করিবে। আর তোমাদের নবী সেই অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়াইয়া এই দু'আ করিতে থাকিবেন, "আল্লাহ ইহাদেরকে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিন, ইহাদেরকে নিরাপদে পৌঁছাইয়া দিন"। এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলিতে অক্ষম করিয়া দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাহারা এই সিরাত অতিক্রম করিতে থাকিবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাইবে, সে নিতম্বের উপর ভর করিয়া উহা অতিক্রম করিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলেন, সীরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকিবে কাঁটাযুক্ত লৌহ শলাকা। ইহারা আল্লাহ্র নির্দেশক্রমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করিবে। তন্মধ্যে কাহাকেও তো ক্ষত-বিক্ষত করিয়াই ছাড়িবে; সে নাজাত পাইবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হইবে। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, শপথ সেই সত্তার যাঁহার হাতে আবু হুরায়রার প্রাণ! জানিয়া রাখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ অর্থাৎ সত্তর হাজার বৎসরের পথ (মুসলিম, নং ১৯৫)।
আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: যে ব্যক্তি মানুষের নিকট ভিক্ষার হাত সম্প্রসারিত করে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় হাশরের ময়দানে উপস্থিত হইবে যে, তাহার মুখমণ্ডলে কোন গোশত থাকিবে না। সেদিন সূর্য নিকটবর্তী হইতে থাকিবে। ফলে ঘাম মানুষের অর্ধকান পর্যন্ত পৌঁছিয়া যাইবে। এমতাবস্থায় লোকেরা পর্যায়ক্রমে আদম, মূসা ও পরে মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট ফরিয়াদ করিবে। তখন তিনি সৃষ্টি তথা মানুষের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য সুপারিশ করিবেন এবং সেই নিমিত্ত সামনে অগ্রসর হইয়া দরজার হলকা ধরিয়া দাঁড়াইবেন। তখনই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে মাকামে মাহমূদে প্রতিষ্ঠিত করিবেন এবং সমস্ত মানুষ তাঁহার প্রশংসা করিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৩খ., হাদীছ নং ১৪৭৪)।
উক্ত হাদীছে দুই ধরনের শাফা'আতের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রথম শাফা'আত হইল, বিচারকার্য শুরু করার লক্ষ্যে, আর দ্বিতীয় শাফা'আত হইবে জান্নাতের দরজা খুলিয়া দেওয়ার জন্য। উক্ত উভয়বিধ শাফা'আতই হইবে মাকামে মাহমূদের অন্তর্ভুক্ত (মাআরিজুল কবুল, শায়খ হাফিয হিকামী, ২খ., পৃ. ৩১৪)।
আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজার নিকট পৌঁছিয়া তাহা খুলিয়া দেওয়ার জন্য বলিলে আমাকে জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতা বলিবেন, আপনি কে? আমি বলিব: মুহাম্মাদ। ফেরেশতা বলিবেন, আপনার নিমিত্তই দরজা খুলিয়া দিতে আমি আদিষ্ট হইয়াছি। আপনার আগে কাহারও জন্য আমি তাহা খুলিব না (মুসলিম, নং ১৯৭)।
📄 (দুই) যাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না তাহাদেরকে আগে জান্নাতে দাখিল করার সুপারিশ
শাফা'আতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, হাশরের ময়দানে তাঁহার যেসব উম্মতের কোন হিসাব-নিকাশ হইবে না, তিনি তাহাদেরকে সকলের আগে জান্নাতে দাখিল করার জন্য সুপারিশ করিবেন। আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে তাঁহার কত যে মর্যাদা ইহাতেও তাহা প্রতীয়মান হয়। এই সম্বন্ধে হাদীছেও স্পষ্ট বিবরণ রহিয়াছে। শাফা'আত সম্পর্কিত এক দীর্ঘ হাদীছে আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত যে, সেদিন আল্লাহ্ তা'আলা বলিবেন, হে মুহাম্মাদ। মাথা উঠান এবং আপনার উম্মতের মধ্যে যাঁহাদের কোন হিসাব নাই তাহাদেরকে জান্নাতের ডান দরজা দিয়া প্রবেশ করাইয়া দিন। অবশ্য অন্য তোরণ দিয়াও অন্যান্য লোকদের সঙ্গে তাহারা জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., নং ৪৭১২; মুসলিম, নং ১৯৪)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমি আমার মহান রবের নিকট প্রার্থনা করিয়াছি এবং তিনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার ব্যক্তিকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। তাহাদের চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হইবে। তারপর আমি আরও অধিক সংখ্যকের জন্য আবেদন করিলে আল্লাহ্ তা'আলা প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজার বাড়াইয়া দেন। তখন আমি আরয করিলাম, হে আমার রব! আমার মুহাজির উম্মতের সংখ্যা যদি এই পরিমাণ না হয় তাহা হইলে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তাহা হইলে বেদুঈনদের দ্বারা আমি এই সংখ্যা পূর্ণ করিয়া দিব (মুসনাদে আহমাদ, ২খ., পৃ. ৩৫৯; হাফিয ইবন হাজার (র) বলেন, হাদীছটির সনদ খুবই উত্তম; ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৪১৮; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন, ইহার রাবী সকলেই সহীহ-এর মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৪০৪)।
আবূ উমামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করিয়াছেন যে, তিনি আমার উম্মতের সত্তর হাজার মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন। রাবী ইয়াযীদ ইব্ন আখনাস আস-সুলামী (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ! তাহাদের অবস্থানটি হইবে অসংখ্য মধুমক্ষিকার মধ্যে একটি লালচে সাদা মাছির মত। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আমার রব ঐ সত্তর হাজারের প্রতি হাজারের সঙ্গে আরও সত্তর হাজারকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন বলিয়া আমার সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন। ইহা ছাড়াও মহান আল্লাহ্ তাঁহার কুদরতের অঞ্জলিতে আরও তিন অঞ্জলি মানুষকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করিবেন (তিরমিযী, হাদীছ নং ২৪৩৭; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান ও গরীব; ইবন মাজা, হাদীছ নং ৪২৮৬; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২৫০; হাফিয ইন্ন কাছীর (র) বলেন, হাদীছের সূত্রটি হাসান, তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৪০২)। হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার রাবীগণ সকলেই সহীহয়ানের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ; ইমাম তিরমিযী ও ইবন মাজা হাদীছটিকে আংশিকভাবে উল্লেখ করিয়াছেন; মাজমা'উয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃ. ৩৬২, ৩৬৩)।