📄 (এগার) পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁহারই হাতে
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মহাসম্মানে ভূষিত করিয়াছেন এবং অন্যান্য নবীগণ অপেক্ষা তাঁহাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি দান করিয়াছেন (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩১ দ্র.)। অর্থাৎ তাঁহার এবং তাঁহার উম্মতের জন্য রাজ্যজয়, পৃথিবীর ধনভাণ্ডার হস্তগত করা, গনীমতের মাল প্রাপ্ত হওয়া এবং সোনা-রূপার গুপ্ত সম্পদ ভূগর্ভ হইতে উত্তোলন করা ইত্যাদিকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। আল্লামা খাত্তাবী অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ২খ., হাদীছ নং ৪৪২; ইব্দুল আছীর, জামিউল উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩২ দ্র.)। হাদীছে অনুরূপ বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে:
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: জামে কালাম দিয়া আমাকে প্রেরণ করা হইয়াছে; রু'ব বা ভীতি দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে। একদা আমি যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম তখন আমাকে পৃথিবীর খাযানা প্রদান করা হয় এবং আমার হাতে স্বর্ণের বলয় পরাইয়া দেওয়া হয়। এই বলয় দুইটি আমার অপসন্দ লাগে এবং ইহাতে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হইয়া পড়ি। তখন আমার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়, তুমি ইহাতে ফুক দাও। আমি তাহাতে ফুক দিলে বলয় দুইটি উধাও হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমার মতে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হইল, দুই মিথ্যাবাদী এবং তাহাদের মধ্যে আমার অবস্থান। একজন হইল সানআর অধিবাসী, আর অপরজন হইল ইয়ামামার অধিবাসী। সানআর অধিবাসী হইল আসওয়াদ আনাসী এবং ইয়ামামার অধিবাসী হইল মুসায়লামাতুল কায্যাব (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৯০; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ২২৭৪)।
'উকবা (রা) বলেন, একদা নবী কারীম (স) বাড়ি হইতে বাহির হইয়া উহুদের শহীদগণের জানায় নামায আদায় করিলেন। অতঃপর আসিয়া মিম্বরে আরোহণ করিয়া বলিলেন: আমি তোমাদের জন্য অগ্রগামী এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী হইব। আল্লাহর শপথ! আমি এখান হইতে হাওয দেখিতে পাইতেছি। পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে প্রদান করা হইয়াছে। আল্লাহর শপথ। আমার পর তোমাদের শিরকে লিপ্ত হওয়ার কোন আশংকা আমি করি না। তবে আমার আশংকা হইল, তোমরা দুনিয়ার ঐ সমস্ত ধনভাণ্ডার হাসিলের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া পড়িবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., হাদীছ নং ৭০৩৭; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ১২২৯৬)।
📄 (বার) রাসূলুল্লাহ (স)-এর যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করা হইয়াছে
মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স)-কে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তিনি তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন এবং তাঁহার জীবদ্দশায়ই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে এই মাগফিরাতের সুসংবাদ জানাইয়া দিয়াছেন (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩৬)।
শায়খ ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে তাঁহার জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়ার সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন নবী সম্বন্ধে এই জাতীয় সুসংবাদ প্রদান করা হয় নাই। হাশরের ময়দানে নবীগণের "নাফসী নাফসী" বলা হইতে একথাই প্রতীয়মান হয় (বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৫ দ্র.)।
আল্লামা ইন্ন কাছীর (র) আল্লাহ্র বাণী: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ . -এর ব্যাখ্যায় বলেন, ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অন্য কোন নবী-রাসূল শরীক নাই (তাফসীর ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৯৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্ত বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীছে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا. ৪৩৯ "নিশ্চয় আমি আপনাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ্ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং আপনার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন" (৪৮ : ১-২)।
তিনি আরও বলিয়াছেন: أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ. وَوَضَعْنَا عَنْكَ وِزْرَكَ الَّذِي أَنْقَضَ ظَهْرَكَ. وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ. "আমি কি আপনার বক্ষ আপনার কল্যাণে প্রশস্ত করিয়া দেই নাই? আমি অপসারণ করিয়াছি আপনার ভার, যাহা ছিল আপনার জন্য অতিশয় কষ্টদায়ক এবং আমি আপনার খ্যাতিকে সমুন্নত করিয়াছি" (৯৪: ১-৪)।
শাফা'আতের বর্ণনা প্রসঙ্গে আনাস (রা) বলেন, ..... তাহার পর লোকেরা ঈসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই বরং তোমরা আল্লাহ্র বান্দা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট যাও। তাঁহার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইয়াছে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১২; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯৪)। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে শাফাআতের বর্ণনা প্রসঙ্গে অপর হাদীছে আছে: তখন লোকেরা ঈসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, তোমরা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট যাও। তাহারা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট আসিবে এবং বলিবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ্ তা'আলা আপনার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১২; মুসলিম, হাদীস নং ১৯৪)।
আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) রাত্রে তাহাজ্জুদের নামায পড়িতেন। ইহাতে তাঁহার উভয় পা ফুলিয়া যাইত। আইশা (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এইরূপ কষ্ট করেন কেন? আল্লাহ্ তো আপনার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলেন: আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হওয়া কামনা করিব না? শেষ জীবনে তাঁহার স্বাস্থ্য মোটা হইয়া গেলে তিনি বসিয়া নফল নামায পড়িতেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৮৩৭; মুসলিম, হাদীছ নং ২৮২০)। আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: ছয়টি বিষয়ের দ্বারা আমাকে অন্যান্য নবী-রাসূলগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে, যাহা আমার পূর্ববর্তী অন্য কাহাকেও প্রদান করা হয় নাই। আমার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইয়াছে.... আল্লাহ্র শপথ! যাঁহার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ, নিশ্চয় কিয়ামতের দিন তোমাদের সাথী তথা নবীর হাতেই থাকিবে লিওয়াউল হামদ' (لواء الحمد = প্রশংসার ঝাণ্ডা)। আর এইঝাণ্ডার ছায়াতলে থাকিবেন আদম (আ)-সহ সমস্ত নবী-রাসূল [ইমাম বাযযার হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। হাফিয হায়ছামী বলেন, ইহার সূত্র খুবই মযবুত, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬৯; আল্লামা সুয়ূতীর মতেও হাদীছটির সূত্র মযবুত; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., হাদীছ নং ৩৩৬০)।
হুযায়ফা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের নিকট হইতে চলিয়া গেলেন। আমরা মনে করিলাম, হয়ত তিনি আসিবেন না। কিন্তু পরে তিনি আসিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরিয়া সিজদা করিলেন আমরা ধারণা করিলাম, হয়ত তাঁহার জান কবয করা হইয়াছে। তাহার পর তিনি মাথা তুলিয়া বলিলেন: আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের ব্যাপারে আমার সহিত পরামর্শ করার নিমিত্ত জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, আমি তাহাদের সহিত কিরূপ আচরণ করিব? আমি বলিলাম, আপনার যেরূপ ইচ্ছা। তাঁহারা তো আপনারই সৃষ্টি এবং আপনারই বান্দা। দ্বিতীয়বার তিনি এই ব্যাপারে আমার পরামর্শ চাহিলে আমি অনুরূপ জবাব দিলাম। তখন আল্লাহ বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের ব্যাপারে আমি আপনাকে লাঞ্ছিত করিব না। ইহার পর তিনি আমাকে এই মর্মে সুসংবাদ দিলেন যে, আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। এই সত্তর হাজারের প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে থাকিবে আরও সত্তর হাজার। তাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করা হইবে না। তারপর আল্লাহ তা'আলা কোন এক ফেরেশতাকে আমার নিকট পাঠাইবেন। তিনি বলিবেন, আপনি দু'আ করুন, ককূল করা হইবে এবং প্রার্থনা করুন, মঞ্জুর করা হইবে। আমি তাহাকে বলিব: আমি যাহা চাহিব তাহাই কি আমাকে প্রদান করা হইবে? ফেরেশতা বলিবেন, আপনাকে দেওয়ার জন্যই তো আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমাকে সব কিছুই দান করিয়াছেন। ইহাতে আমার কোন অহংকার নাই। আমার জীবদ্দশায়ই তিনি আমার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন। তিনি আমাকে এই অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছেন যে, আমার উম্মত কখনও দুর্ভিক্ষে পড়িবে না এবং তাহারা পরাজিত হইবে না। আল্লাহ তা'আলা আমাকে হাওযে কাওছার দান করিয়াছেন। বস্তুত জান্নাতেরই একটি নহর প্রবাহিত হইয়া হাওযে কাওছার পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। তিনি আমাকে ইজ্জত দান করিয়াছেন ও বিশেষভাবে সাহায্য করিয়াছেন। পূর্ববর্তী নবীগণের উপর কিছু কঠোর বিধান ছিল, সেগুলিকে তিনি আমার উম্মতের জন্য সহজ করিয়া দিয়াছেন এবং আমাদের জন্য দীনি বিষয়ে কোন জটিলতা রাখেন নাই (মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৩; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন; হাদীছের সনদ হাসান; মাজমা উয-যাওয়াইদ, ১০খ., হাদীছ নং ৬৮৬৯)।
📄 (তের) তাঁহাকে চিরন্তন কিতাব দান করা হইয়াছে
আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণের প্রত্যেককেই এমন কিছু মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দান করিয়াছেন, যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে তাঁহাদের আনীত আদর্শের সত্যতা ও বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং যে সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁহারা প্রেরিত হইয়াছিলেন, তাহাদের জন্য ছিল তাহাতে বিশদ যুক্তি ও প্রমাণ। তবে এই মু'জিযা ছিল সাময়িক। নবী-রাসূলগণের জীবদ্দশায়ই ঐসব মু'জিযার স্থায়িত্ব শেষ হইয়া গিয়াছে। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা, যাহা তাঁহারই একমাত্র বৈশিষ্ট্য, তাহা হইল মহাগ্রন্থ কুরআন মজীদ। এই কুরআন শাশ্বত ও চিরন্তন। কিয়ামত পর্যন্ত এই কিতাব সর্বকালের সর্বযুগের সকল স্তরের মানুষের জন্য সমভাবে অনুসরণীয়। ইহার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া শেষ করা যাইবে না। ইহার আশ্চর্যাবলী ও উপকারিতা বর্ণনা করিয়াও খতম করা যাইবে না। আল্লাহ তা'আলা নিজেই এই কিতাবের হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। তাই এই কিতাব সকল প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও রদবদল হইতে চিরসংরক্ষিত (ফুসূল, পৃ. ২৮৭; খাসাইস আফদালিল মাখলুকীন, পৃ. ৩৯৮; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩১৫-১৮)।
শায়খ ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, প্রত্যেক নবীর মু'জিযা তাঁহার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আমাদের নবী সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল-আখিরীন-এর মু'জিযা হইল কুরআন মজীদ। এই মু'জিযা শাশ্বত, চিরন্তন। তাহা কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকিবে (গায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৯)। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা ইহার প্রতিটি শব্দ সংরক্ষণ করিয়াছেন। যদি দুনিয়ার সমস্ত মানুষ একত্র হইয়া চেষ্টা করিয়া ইহার মধ্যে কোন অক্ষর বাড়াইতে বা কমাইতে চায় তবে তাহারা তাহা করিতে সক্ষম হইবে না। পক্ষান্তরে তাহারা ইনজীলে কি পরিমাণ রদবদল করিয়াছে; তাহা কাহারও নিকট অস্পষ্ট নয় (ঐ, পৃ. ৭০)। কুরআন মজীদে এই বিষয়ে মহান আল্লাহর বাণী: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ. "আমিই কুরআন নাযিল করিয়াছি এবং অবশ্যই আমি ইহার সংরক্ষক” (১৫ঃ ৯)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: প্রত্যেক নবীকে কিছু আয়াত বা নিদর্শন প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি নাযিলকৃত আয়াতের উপর যে পরিমাণ মানুষ ঈমান আনিয়াছে, কোন নবীর উপর নাযিলকৃত আয়াতের উপর সে পরিমাণ মানুষ ঈমান আনে নাই। আমাকে যাহা দেওয়া হইয়াছে, তাহা তো ওহী, যাহা আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছেন। কিয়ামতের দিন আমার অনুসারীদের সংখ্যা অন্যান্যদের তুলনায় অধিক হইবে বলিয়া আমি আশাবাদী, বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, হাদীছ নং ৪৯৭১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৫২)।
হাফিয ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন, নবী কারীম (স) বলিয়াছেন: "কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অধিক হইবে বলিয়া আমি আশাবাদী"। এই বাক্য দ্বারা কুরআন মজীদের চিরন্তন মু'জিযার কথা প্রতীয়মান হয়। যেহেতু কুরআনের মধ্যে দাওয়াত, প্রমাণাদি এবং ভবিষ্যত সম্পর্কীয় ঘটনাবলীর উল্লেখ রহিয়াছে, তাই উপস্থিত ও অনুপস্থিত সকলের জন্যই ইহার উপকারিতা অনেক ও ব্যাপক। ইহাতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুসারীর সংখ্যা বেশি হওয়াই যুক্তিযুক্ত (ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৬২৩)।
হাসান বসরী (র) আল্লাহ্র বাণী- لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ. -এর ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদকে শয়তান হইতে সংরক্ষণ করিয়াছেন। ফলে শয়তান ইহাতে কোন বাতিল কথা সংযোজন করিতে এবং কোন হক কথা কমাইতে সক্ষম নয় (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩১৬; তাফসীর ইবন জারীর, ২৪খ., পৃ. ৭৯)।
📄 (চৌদ্দ) ইস্রা ও মি'রাজ
রাসূলুল্লাহ (স) যেসব বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে অন্যান্য নবী-রাসূল হইতে স্বতন্ত্র, উহার মধ্যে মি'রাজের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত (শিফা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৩; ফুসূল, পৃ. ২৮৭; খাসাইসুল কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৫২)। বস্তুত পবিত্র মক্কা শরীফের মসজিদুল হারাম হইতে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সফর রজনীযোগে সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হইয়াছিল। ইহাকে বলা হয় ইস্রা। তারপর সেখান হইতে তাঁহাকে সিদরাতুল মুনতাহায় এবং তথা হইতে আল্লাহ্র ইচ্ছামত আরও উর্ধ্বলোকে আরোহণ করানো হয়। পরিভাষায় ইহাকে মি'রাজ বলা হয়। আর তিনি ঐ রাত্রেই সফর শেষ করিয়া পুনরায় মক্কা ফিরিয়া আসেন। মি'রাজ গমনের এই মহান সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিভিন্ন ধরনের অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলার সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন, তাঁহার উপর নামায ফরয হওয়া, আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষকরণ এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে নবী-রাসূলগণের নামাযে ইমামতি করা। ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনিই হইলেন নবী-রাসূল সকলের ইমাম (তাফসীরে ইব্ন কাছীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩)।
ইস্রার বিষয়টি যেমন কুরআন মজীদের স্পষ্ট বর্ণনার দ্বারা প্রমাণিত, তেমনি মি'রাজের বিষয়টিও মুতাওয়াতির হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: سُبْحَنَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بُرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ. "পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁহার বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করাইয়াছিলেন আল-মসজিদুল হারাম হইতে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যাহার পরিবেশ আমি করিয়াছিলাম বরকতময়, তাহাকে আমার নিদর্শন দেখাইবার জন্য; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা" (১৭:১)। وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى عَلَمَهُ شَدِيدُ الْقُوى. ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى. وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى. فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى وَلَقَدْ رَأَهُ نَزَّلَةً أُخْرَى عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَاوَى إِذْ يَغْشَى السَّدْرَةَ مَا يَغْشَى مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى. لَقَدْ رَأَى مِنْ أَيْتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى. "এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন। সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা ওহী করিবার তাহা ওহী করিলেন। যাহা সে দেখিয়াছে, তাহার অন্তঃকরণ তাহা অস্বীকার করে নাই। সে যাহা দেখিয়াছে তোমরা কি সেই বিষয়ে তাহার সংগে বিতর্ক করিবে? নিশ্চয় সে তাহাকে আরেকবার দেখিয়াছিল প্রান্তবর্তী বদরী বৃক্ষের নিকট, যাহার নিকট অবস্থিত জান্নাতুল মা'ওয়া। যখন বৃক্ষটি যদ্দ্বারা আচ্ছাদিত হইবার তদ্দ্বারা ছিল আচ্ছাদিত; তাহার দৃষ্টিবিভ্রম হয় নাই, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয় নাই। সে তো তাহার প্রতিপালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখিয়াছিল" (৫৩:৩-১৮)।"
আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত। মালিক ইবন সা'সা'আ (রা) তাঁহাকে বলিয়াছেন, নবী কারীম (স) তাহাদেরকে সেই রাতের ঘটনাবলী বর্ণনা করিয়াছেন যে রাতে তাহাকে ভ্রমণ করানো হইয়াছিল। তিনি বলেন, একদা আমি কা'বার হাতীমে ছিলাম, বা হিজরে শুইয়াছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট আসেন এবং আমার এই স্থান হইতে সেই স্থানের মধ্যবর্তী অংশটি চিরিয়া ফেলেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ (র)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহার দ্বারা কি বুঝিয়াছেন? তিনি বলেন, কণ্ঠনালীর নিম্নদেশ হইতে নাভী পর্যন্ত। কাতাদা (র) বলেন, আমি আনাস (রা)-কে বলিতে শুনিয়াছি, বুকের উপরিভাগ হইতে নাভীর নীচ পর্যন্ত। তাহার পর নবী (স) বলেন, আগন্তুক আমার হৃদপিণ্ডটি বাহির করিলেন। তাহার পর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হয় যা ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তাহার পর আমার হৃদপিণ্ডটি যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করা হয় এবং ঈমান দ্বারা পূর্ণ করিয়া তাহা যথাস্থানে পুনরায় রাখিয়া দেওয়া হয়। তাহার পর সাদা রং-এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হয় যাহা আকারে খচ্চর হইতে ছোট ও গাধা হইতে বড় ছিল। জারূদ (র) তাঁহাকে বলিলেন, হে আবু হামযা! ইহাই কি বুরাক? জবাবে আনাস (রা) বলিলেন, হাঁ। সে প্রতি কদম রাখে দৃষ্টির শেষ প্রান্তে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, তাহার পর আমাকে সওয়ার করানো হয়। ইহার পর জিবরাঈল (আ) আমাকে নিয়া চলিলেন। প্রথম আসমানের নিকট আসিয়া দরজা খুলিয়া দিতে বলিলে জিজ্ঞাসা করা হয়, কে? তিনি বলিলেন, জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (স)। আবার জিজ্ঞাসা করা হয়, তাঁহাকে কি ডাকিয়া পাঠানো হইয়াছে? তিনি বলেন, হাঁ। তখন বলা হয়, তাঁহার জন্য খোশআমদেদ! উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটিয়াছে। তাহারপর দরজা খুলিয়া দেওয়া হইল। আমি যখন প্রথম আকাশে পৌঁছিলাম তখন তথায় হযরত আদম (আ)-এর সাক্ষাত পাইলাম। জিবরাঈল (আ) আমাকে বলিলেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম (আ)। আপনি তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার পুত্র নেককার নবীকে খোশআমদেদ! তাহারপর তিনি উপরের দিকে চলিয়া দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছিয়া দরজা খুলিয়া দিতে বলিলেন। জিজ্ঞাসা করা হইল, কে? তিনি বলিলেন, জিবরাঈল। বলা হইল, সঙ্গে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মাদ (স)। বলা হইল, তাঁহাকে কি ডাকিয়া পাঠানো হইয়াছে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ! তাহারপর বলা হইল, তাহাকে খোশআমদেদ! উত্তম আগমনকারীর আগমন হইয়াছে। তাহারপর দরজা খুলিয়া দেওয়া হইল। আমি যখন তথায় পৌঁছিলাম তখন ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আ)-এর সাক্ষাত পাইলাম। তাঁহারা দুইজন ছিলেন খালাত ভাই। তিনি বলিলেন, তাঁহারা হইলেন ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ)। তাঁহাদের প্রতি সালাম করুন। আমি সালাম করিলাম। তাঁহারা আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার ভাই এবং নেককার নবীকে খোশআমদেদ।
অতঃপর তিনি আমাকে লইয়া তৃতীয় আসমানের দিকে চলিলেন। সেখানে পৌঁছিয়া জিবরাঈল (আ) বলিলেন, দরজা খুলিয়া দাও। তাঁহাকে বলা হইল, আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মাদ (স)। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাঁহাকে কি ডাকিয়া পাঠানো হইয়াছে? তিনি বলিলেন, হাঁ। বলা হইল, তাঁহাকে খোশআমদেদ! উত্তম আগমনকারীর আগমন হইয়াছে। অতঃপর দরজা খুলিয়া দেওয়া হইল। আমি তথায় পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-কে দেখিতে পাইলাম। সালাম বিনিময়ের পর ইউসুফ বলিলেন, নেককার ভাই এবং নেককার নবীকে খোশআমদেদ। অতঃপর জিবরাঈল (আ) আমাকে নিয়া ঊর্ধ্ব যাত্রা করিলেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছিলেন, আর (ফেরেশতাকে) দরজা খুলিয়া দিতে বলিলেন। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনি কে? তিনি বলিলেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মাদ (স)। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাঁহাকে কি ডাকিয়া পাঠানো হইয়াছে? তিনি বলিলেন, হাঁ। তখন বলা হইল, তাঁহাকে খোশআমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হইয়াছে। তখন দরজা খুলিয়া দেওয়া হইল। আমি তথায় পৌঁছিলে ইদরীস (আ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, তিনি ইদরীস (আ), তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার ভাই এবং নেককার নবীকে খোশআমদেদ। অতঃপর তিনি আমাকে লইয়া ঊর্ধ্বযাত্রা করিয়া পঞ্চম আসমানে পৌঁছিয়া দরজা খুলিতে বলিলেন। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনি কে? তিনি বলিলেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ (স)। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাঁহার জন্য কি পাঠানো হইয়াছিল? তিনি বলিলেন, হাঁ। তখন বলা হইল, তাঁহার প্রতি খোশআমদেদ। উত্তম আগমনকারী আগমন করিয়াছেন। তখন দবজা খুলিয়া দেয়া হইল। আমি তথায় পৌঁছিয়া হারূন (আ)-এর সাক্ষাৎ পাইলাম। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, ইনি হারুন (আ)। তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনিও জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার ভাই এবং নেককার নবীর প্রতি খোশআমদেদ। তারপর তিনি আমাকে লইয়া যাত্রা করিয়া ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছিয়া দরজা খুলিতে বলিলেন। তাঁহাকে বলা হইল, আপনি কে? তিনি বলিলেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মাদ (স)। বলা হইল, তাঁহার জন্য কি পাঠানো হইয়াছিল? তিনি বলিলেন, হাঁ। ফেরেশতা বলিলেন, তাঁহার প্রতি খোশআমদেদ। উত্তম আগমনকারী আগমন করিয়াছেন। তথায় পৌঁছিয়া আমি মূসা (আ)-কে দেখিতে পাইলাম। জibraील (আ) বলিলেন, তিনি মূসা (আ)। তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার ভাই ও নেককার নবীর প্রতি খোশআমদেদ। তারপর আমি যখন সামনে অগ্রসর হইলাম, তখন তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনি কিসের জন্য কাঁদিতেছেন? তিনি বলিলেন, আমি এজন্য কাঁদিতেছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানাইয়া পাঠানো হইয়াছে; যাঁহার উম্মত আমার উম্মত হইতে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করিবে।
তারপর জিবরাঈল (আ) আমাকে লইয়া সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলিয়া দিতে বলিলেন। জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনি কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞাসা করা হইল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বলিলেন, মুহাম্মাদ (স)। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাঁহার জন্য পাঠানো হইয়াছিল কি? তিনি বলিলেন, হাঁ। বলা হইল, তাঁহার প্রতি খোশআমদেদ। উত্তম আগমনকারী আগমন করিয়াছেন। আমি সেখানে পৌঁছিয়া ইবরাহীম (আ)-কে দেখিতে পাইলাম। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, তিনি আপনার পিতা ইবরাহীম। তাঁহাকে সালাম করুন। আমি তাঁহাকে সালাম করিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বলিলেন, নেককার পুত্র ও নেককার নবীর প্রতি খোশআমদেদ। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় উঠানো হইল। দেখিতে পাইলাম, ইহার ফল হাজার অঞ্চলের মশকের ন্যায় বৃহৎ এবং পাতাগুলি হাতির কানের মত। আমাকে বলা হইল, ইহা সিদরাতুল মুনতাহা (জড় জগতের শেষ প্রান্ত)। সেখানে আমি চারটি নহর দেখিতে পাইলাম—যাহাদের দুইটি ছিল অপ্রকাশ্য এবং দুইটি ছিল প্রকাশ্য। আমি জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই নহরগুলি কি? তিনি বলিলেন, অপ্রকাশ্য দুইটি হইল জান্নাতের দুইটি নহর। আর প্রকাশ্য দুইটি হইল নীল ও ফুরাত নদী।
তারপর আমার সামনে বায়তুল মা'মূর প্রকাশ করা হইল। অতঃপর আমার সামনে একটি মদের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র পরিবেশন করা হইল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করিলাম। তখন জিবরাঈল (আ) বলিলেন, ইহাই ফিতরাত (দীন ইসলাম)। আপনি এবং আপনার উম্মতগণ ইহার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাহার পর আমার উপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হইল। অতঃপর আমি ফিরিয়া আসিলাম। পথিমধ্যে মূসা (আ)-এর সামনে দিয়া যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনাকে কি আদেশ করা হইয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায আদায়ের আদেশ করা হইয়াছে। তিনি বলিলেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায আদায় করিতে সক্ষম হইবে না। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনার আগে লোকদেরকে পরীক্ষা করিয়াছি এবং বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়াছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মতের বোঝা হালকা করার জন্য আবেদন করুন। অতএব আমি ফিরিয়া গেলাম। ফলে তিনি আমার উপর হইতে দশ ওয়াক্ত নামায হ্রাস করিয়া দিলেন।
আমি আবার মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলাম। তিনি আবার আগের মত বলিলেন। আমি আবার ফিরিয়া গেলাম। ফলে আল্লাহ্ তা'আলা আরও দশ ওয়াক্ত নামায কমাইয়া দিলেন। ফেরার পথে মূসা (আ)-এর নিকট পৌঁছিলে তিনি আবার পূর্বোক্ত কথা বলিলেন। আমি পুনরায় ফিরিয়া গেলাম। আল্লাহ্ তা'আলা আরও দশ ওয়াক্ত হ্রাস করিলেন। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বলিলেন। আমি আবার ফিরিয়া গেলাম। তখন আমাকে প্রতি দিন দশ ওয়াক্ত নামায আদায়ের আদেশ দেওয়া হইল। আমি মূসা (আ)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলে তিনি বলিলেন, আপনাকে কি আদেশ দেওয়া হইয়াছে? আমি বলিলাম: আমাকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আদেশ দেওয়া হইয়াছে। মূসা (আ) বলিলেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করিতেও সক্ষম হইবে না। আমি আপনার পূর্বে লোকদেরকে পরীক্ষা করিয়াছি এবং বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াছি। সুতরাং আপনি আপনার রবের নিকট ফিরিয়া যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরও হালকা করার আবেদন করুন। রাসূলুল্লাহ (স), বলিলেন, আমি আমার রবের নিকট অনেকবার প্রার্থনা করিয়াছি। এখন আমি লজ্জাবোধ করিতেছি। আমি ইহাতেই সন্তুষ্ট হইয়াছি এবং তাহা মানিয়া লইয়াছি। তাহার পর তিনি বলিলেন, আমি যখন মূসা (আ)-কে অতিক্রম করিয়া অগ্রসর হইলাম তখন জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা করিল, আমি আমার অবশ্য পালনীয় আদেশটি জারী করিয়া দিলাম (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৭খ., হাদীছ নং ৩৮৮৭; মুসলিম, হাদীছ নং ১৬৪)।