📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (দশ) শ্রদ্ধা ও ভক্তি মিশ্রিত ভয় বা ব্যক্তিত্বের প্রভাব

📄 (দশ) শ্রদ্ধা ও ভক্তি মিশ্রিত ভয় বা ব্যক্তিত্বের প্রভাব


রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি মিশ্রিত ভীতি (رعب) অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের প্রভাব দ্বারা সাহায্য করিয়াছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর শত্রুদের হৃদয়ে ভয় ঢালিয়া দিতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (স) ও শত্রুদের মধ্যে এক মাস বা দুই মাসের পথের দূরত্ব থাকা অবস্থায়ই তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যাইত এবং তাঁহার মুকাবিলায় আসিতে সাহস করিত না (ইবনুল আছীর আল-জাযারী, জামি'উল 'উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩১)। আল্লামা ইবন হাজার (র) বলেন, এই বৈশিষ্ট্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে সর্বাবস্থায় পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এমনকি একাকী থাকা অবস্থায়ও তাঁহার এই বৈশিষ্ট্যের বহিপ্রকাশ ঘটিয়াছে (ফাতহুল বারী, ১খ., নং ৫২১ দ্র.)। হাদীছে এই সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে।

আবূ উমামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: চারটি বিষয়ের দ্বারা আমাকে অন্যান্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। আমার উম্মতের কোন ব্যক্তির যদি নামাযের ওয়াক্ত হয় এবং কিসের উপর দাঁড়াইয়া নামায পড়িবে এমন কিছু-না পাইলে সে মাটিকে মসজিদ এবং পবিত্রকারী বন্ধু হিসাবে ব্যবহার করিবে। আমি সমগ্র বিশ্ববাসীর প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। এক মাস বা দুই মাসের পথের পর্যন্ত আমাকে রু'ব (ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয় মিশ্রিত ভীতি) দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে। আর আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, ১খ., হাদীছ নং ২১২; নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ। সহীহ জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ৪০৯৬ দ্র.)।

সাইব ইব্‌ন ইয়াযীদ (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: আমাকে পাঁচটি বিষয়ের দ্বারা অন্যান্য নবীগণের উপর শেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছেঃ আমি সমস্ত মানুষের প্রতি নষী হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি; আমি আমার উম্মতের জন্য সুপারিশকে সংরক্ষণ করিয়াছি; রু'ব দ্বারা আমার সামনে এক মাসের পথ এবং পেছনে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্যপ্রাপ্ত হইয়াছি; আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে; আর আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী কাহারও জন্য তাহা হালাল ছিল না (তাবারানী, মু'জামুল কাবীর, হাদীছ নং ৬৬৭৪; নাসিরুদ্দীন আলবানী দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে হাদীছটিকে সহীহ্ প্রমাণিত করিয়াছেন। সহীহ জামে সাগীর, হাদীছ নং ৪০৯৭ দ্র.)।

আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: ছয়টি বিষয়ের দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে: আমার জন্য গনীমতের মাল হালা করা হইয়াছে, পৃথিবীকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে, আমাকে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হইয়াছে এবং আমার দ্বারা নবুওয়াতের সিলসিলা খতম করা হইয়াছে। আল্লামা তীবি (র) বলেন, কোন বর্ণনায় ছয়টি, কোন বর্ণনায় পাঁচটি এবং কোন বর্ণনায় চারটি বিষয়ের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। মূলত এগুলির মধ্যে কোন বৈপরীত্য নাই। কেননা এক সংখ্যা উল্লেখ করার দ্বারা অন্য সংখ্যাকে অস্বীকার হয় না। অথবা বর্ণনাকারী প্রথমে কমের ব্যাপারে জ্ঞাত হইয়াছেন এবং পরে বেশির ব্যাপারে জ্ঞাত হইয়াছেন (উমদাতুল কারী, ৪খ., হাদীছ নং ৮; ফাতহুল কাদীর, ৪খ., হাদীছ নং ৪৩৯ দ্র.)।

আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) নামায আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হইলে কতিপয় সাহাবী তাঁহার পাহারাদানের উদ্দেশ্যে তাঁহার পিছনে একত্র হন। রাসূলুল্লাহ (স) নামাযশেষে তাঁহাদের বলেন, আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেওয়া হইয়াছে, যাহা পূর্ববর্তী কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। আমি সমস্ত মানুষের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি; কিন্তু আমার পূর্বে বিশেষ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হইত। রু'ব দ্বারা আমাকে শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে; কিন্তু আমার পূর্বে গনীমতের মাল ভোগ করাকে হারাম মনে করা হইত এবং তাহা জ্বালাইয়া দেওয়া হইত। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। কাজেই যেখানেই আমার নামাযের ওয়াক্ত হয়, সেখানেই আমি তায়াম্মুম করিয়া নামায আদায় করিতে পারি। কিন্তু পূর্ববর্তী উম্মতগণকে গীর্জা ও ইবাদতখানায় নামায আদায় করিতে হইত। আমাকে বলা হইয়াছে, আপনি দু'আ করুন। কেননা পূর্ববর্তী নবীগণ সকলেই বিশেষ ধরনের দু'আ করিয়াছেন। অবশ্য আমি কিয়ামত দিবসের জন্য আমার দু'আর বিষয়টিকে স্থগিত রাখিয়াছ। আর তাহা তোমাদের জন্য এবং ঐ সমস্ত লোকের জন্য যাহারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., হাদীছ নং ২২২; হাফিয হায়ছামী বলেন, ইহার রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃষ্ঠা নং ৩৬৭ দ্র.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (এগার) পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁহারই হাতে

📄 (এগার) পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁহারই হাতে


আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মহাসম্মানে ভূষিত করিয়াছেন এবং অন্যান্য নবীগণ অপেক্ষা তাঁহাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি দান করিয়াছেন (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩১ দ্র.)। অর্থাৎ তাঁহার এবং তাঁহার উম্মতের জন্য রাজ্যজয়, পৃথিবীর ধনভাণ্ডার হস্তগত করা, গনীমতের মাল প্রাপ্ত হওয়া এবং সোনা-রূপার গুপ্ত সম্পদ ভূগর্ভ হইতে উত্তোলন করা ইত্যাদিকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। আল্লামা খাত্তাবী অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ২খ., হাদীছ নং ৪৪২; ইব্‌দুল আছীর, জামিউল উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩২ দ্র.)। হাদীছে অনুরূপ বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে:

আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: জামে কালাম দিয়া আমাকে প্রেরণ করা হইয়াছে; রু'ব বা ভীতি দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে। একদা আমি যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম তখন আমাকে পৃথিবীর খাযানা প্রদান করা হয় এবং আমার হাতে স্বর্ণের বলয় পরাইয়া দেওয়া হয়। এই বলয় দুইটি আমার অপসন্দ লাগে এবং ইহাতে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হইয়া পড়ি। তখন আমার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়, তুমি ইহাতে ফুক দাও। আমি তাহাতে ফুক দিলে বলয় দুইটি উধাও হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমার মতে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হইল, দুই মিথ্যাবাদী এবং তাহাদের মধ্যে আমার অবস্থান। একজন হইল সানআর অধিবাসী, আর অপরজন হইল ইয়ামামার অধিবাসী। সানআর অধিবাসী হইল আসওয়াদ আনাসী এবং ইয়ামামার অধিবাসী হইল মুসায়লামাতুল কায্যাব (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৯০; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ২২৭৪)।

'উকবা (রা) বলেন, একদা নবী কারীম (স) বাড়ি হইতে বাহির হইয়া উহুদের শহীদগণের জানায় নামায আদায় করিলেন। অতঃপর আসিয়া মিম্বরে আরোহণ করিয়া বলিলেন: আমি তোমাদের জন্য অগ্রগামী এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী হইব। আল্লাহর শপথ! আমি এখান হইতে হাওয দেখিতে পাইতেছি। পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে প্রদান করা হইয়াছে। আল্লাহর শপথ। আমার পর তোমাদের শিরকে লিপ্ত হওয়ার কোন আশংকা আমি করি না। তবে আমার আশংকা হইল, তোমরা দুনিয়ার ঐ সমস্ত ধনভাণ্ডার হাসিলের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া পড়িবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., হাদীছ নং ৭০৩৭; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ১২২৯৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (বার) রাসূলুল্লাহ (স)-এর যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করা হইয়াছে

📄 (বার) রাসূলুল্লাহ (স)-এর যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করা হইয়াছে


মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স)-কে বহু মর্যাদা দান করিয়াছেন। তিনি তাঁহার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন এবং তাঁহার জীবদ্দশায়ই আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে এই মাগফিরাতের সুসংবাদ জানাইয়া দিয়াছেন (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩৬)।

শায়খ ইব্‌ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপর একটি বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে তাঁহার জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়ার সুসংবাদ দান করিয়াছেন। তিনি ব্যতীত অন্য কোন নবী সম্বন্ধে এই জাতীয় সুসংবাদ প্রদান করা হয় নাই। হাশরের ময়দানে নবীগণের "নাফসী নাফসী" বলা হইতে একথাই প্রতীয়মান হয় (বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৫ দ্র.)।

আল্লামা ইন্ন কাছীর (র) আল্লাহ্র বাণী: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ . -এর ব্যাখ্যায় বলেন, ইহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অন্য কোন নবী-রাসূল শরীক নাই (তাফসীর ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৯৮)।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর উক্ত বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীছে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলিয়াছেন: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا . لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا. ৪৩৯ "নিশ্চয় আমি আপনাকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ্ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং আপনার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন" (৪৮ : ১-২)।

তিনি আরও বলিয়াছেন: أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ. وَوَضَعْنَا عَنْكَ وِزْرَكَ الَّذِي أَنْقَضَ ظَهْرَكَ. وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ. "আমি কি আপনার বক্ষ আপনার কল্যাণে প্রশস্ত করিয়া দেই নাই? আমি অপসারণ করিয়াছি আপনার ভার, যাহা ছিল আপনার জন্য অতিশয় কষ্টদায়ক এবং আমি আপনার খ্যাতিকে সমুন্নত করিয়াছি" (৯৪: ১-৪)।

শাফা'আতের বর্ণনা প্রসঙ্গে আনাস (রা) বলেন, ..... তাহার পর লোকেরা ঈসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, আমি এই কাজের উপযুক্ত নই বরং তোমরা আল্লাহ্র বান্দা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট যাও। তাঁহার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইয়াছে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১২; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯৪)। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে শাফাআতের বর্ণনা প্রসঙ্গে অপর হাদীছে আছে: তখন লোকেরা ঈসা (আ)-এর নিকট আসিবে। তিনি বলিবেন, তোমরা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট যাও। তাহারা মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট আসিবে এবং বলিবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। আল্লাহ্ তা'আলা আপনার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১২; মুসলিম, হাদীস নং ১৯৪)।

আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) রাত্রে তাহাজ্জুদের নামায পড়িতেন। ইহাতে তাঁহার উভয় পা ফুলিয়া যাইত। আইশা (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এইরূপ কষ্ট করেন কেন? আল্লাহ্ তো আপনার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন। তিনি বলেন: আমি কি আল্লাহর শোকরগুজার বান্দা হওয়া কামনা করিব না? শেষ জীবনে তাঁহার স্বাস্থ্য মোটা হইয়া গেলে তিনি বসিয়া নফল নামায পড়িতেন (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৮৩৭; মুসলিম, হাদীছ নং ২৮২০)। আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: ছয়টি বিষয়ের দ্বারা আমাকে অন্যান্য নবী-রাসূলগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হইয়াছে, যাহা আমার পূর্ববর্তী অন্য কাহাকেও প্রদান করা হয় নাই। আমার জীবনের পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইয়াছে.... আল্লাহ্র শপথ! যাঁহার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ, নিশ্চয় কিয়ামতের দিন তোমাদের সাথী তথা নবীর হাতেই থাকিবে লিওয়াউল হামদ' (لواء الحمد = প্রশংসার ঝাণ্ডা)। আর এইঝাণ্ডার ছায়াতলে থাকিবেন আদম (আ)-সহ সমস্ত নবী-রাসূল [ইমাম বাযযার হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। হাফিয হায়ছামী বলেন, ইহার সূত্র খুবই মযবুত, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৬৯; আল্লামা সুয়ূতীর মতেও হাদীছটির সূত্র মযবুত; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., হাদীছ নং ৩৩৬০)।

হুযায়ফা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের নিকট হইতে চলিয়া গেলেন। আমরা মনে করিলাম, হয়ত তিনি আসিবেন না। কিন্তু পরে তিনি আসিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরিয়া সিজদা করিলেন আমরা ধারণা করিলাম, হয়ত তাঁহার জান কবয করা হইয়াছে। তাহার পর তিনি মাথা তুলিয়া বলিলেন: আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের ব্যাপারে আমার সহিত পরামর্শ করার নিমিত্ত জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, আমি তাহাদের সহিত কিরূপ আচরণ করিব? আমি বলিলাম, আপনার যেরূপ ইচ্ছা। তাঁহারা তো আপনারই সৃষ্টি এবং আপনারই বান্দা। দ্বিতীয়বার তিনি এই ব্যাপারে আমার পরামর্শ চাহিলে আমি অনুরূপ জবাব দিলাম। তখন আল্লাহ বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের ব্যাপারে আমি আপনাকে লাঞ্ছিত করিব না। ইহার পর তিনি আমাকে এই মর্মে সুসংবাদ দিলেন যে, আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। এই সত্তর হাজারের প্রত্যেক হাজারের সঙ্গে থাকিবে আরও সত্তর হাজার। তাহাদের কোন হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করা হইবে না। তারপর আল্লাহ তা'আলা কোন এক ফেরেশতাকে আমার নিকট পাঠাইবেন। তিনি বলিবেন, আপনি দু'আ করুন, ককূল করা হইবে এবং প্রার্থনা করুন, মঞ্জুর করা হইবে। আমি তাহাকে বলিব: আমি যাহা চাহিব তাহাই কি আমাকে প্রদান করা হইবে? ফেরেশতা বলিবেন, আপনাকে দেওয়ার জন্যই তো আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আল্লাহ তা'আলা আমাকে সব কিছুই দান করিয়াছেন। ইহাতে আমার কোন অহংকার নাই। আমার জীবদ্দশায়ই তিনি আমার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন। তিনি আমাকে এই অঙ্গীকার প্রদান করিয়াছেন যে, আমার উম্মত কখনও দুর্ভিক্ষে পড়িবে না এবং তাহারা পরাজিত হইবে না। আল্লাহ তা'আলা আমাকে হাওযে কাওছার দান করিয়াছেন। বস্তুত জান্নাতেরই একটি নহর প্রবাহিত হইয়া হাওযে কাওছার পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে। তিনি আমাকে ইজ্জত দান করিয়াছেন ও বিশেষভাবে সাহায্য করিয়াছেন। পূর্ববর্তী নবীগণের উপর কিছু কঠোর বিধান ছিল, সেগুলিকে তিনি আমার উম্মতের জন্য সহজ করিয়া দিয়াছেন এবং আমাদের জন্য দীনি বিষয়ে কোন জটিলতা রাখেন নাই (মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৩; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম আহমাদ (র) বর্ণনা করিয়াছেন; হাদীছের সনদ হাসান; মাজমা উয-যাওয়াইদ, ১০খ., হাদীছ নং ৬৮৬৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (তের) তাঁহাকে চিরন্তন কিতাব দান করা হইয়াছে

📄 (তের) তাঁহাকে চিরন্তন কিতাব দান করা হইয়াছে


আল্লাহ তা'আলা নবী-রাসূলগণের প্রত্যেককেই এমন কিছু মু'জিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দান করিয়াছেন, যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে তাঁহাদের আনীত আদর্শের সত্যতা ও বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং যে সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁহারা প্রেরিত হইয়াছিলেন, তাহাদের জন্য ছিল তাহাতে বিশদ যুক্তি ও প্রমাণ। তবে এই মু'জিযা ছিল সাময়িক। নবী-রাসূলগণের জীবদ্দশায়ই ঐসব মু'জিযার স্থায়িত্ব শেষ হইয়া গিয়াছে। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর সবচেয়ে বড় মু'জিযা, যাহা তাঁহারই একমাত্র বৈশিষ্ট্য, তাহা হইল মহাগ্রন্থ কুরআন মজীদ। এই কুরআন শাশ্বত ও চিরন্তন। কিয়ামত পর্যন্ত এই কিতাব সর্বকালের সর্বযুগের সকল স্তরের মানুষের জন্য সমভাবে অনুসরণীয়। ইহার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া শেষ করা যাইবে না। ইহার আশ্চর্যাবলী ও উপকারিতা বর্ণনা করিয়াও খতম করা যাইবে না। আল্লাহ তা'আলা নিজেই এই কিতাবের হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। তাই এই কিতাব সকল প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও রদবদল হইতে চিরসংরক্ষিত (ফুসূল, পৃ. ২৮৭; খাসাইস আফদালিল মাখলুকীন, পৃ. ৩৯৮; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩১৫-১৮)।

শায়খ ইব্‌ন আবদুস সালাম (র) বলেন, প্রত্যেক নবীর মু'জিযা তাঁহার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আমাদের নবী সায়্যিদুল আওয়ালীন ওয়াল-আখিরীন-এর মু'জিযা হইল কুরআন মজীদ। এই মু'জিযা শাশ্বত, চিরন্তন। তাহা কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকিবে (গায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৯)। এই কারণেই আল্লাহ্ তা'আলা ইহার প্রতিটি শব্দ সংরক্ষণ করিয়াছেন। যদি দুনিয়ার সমস্ত মানুষ একত্র হইয়া চেষ্টা করিয়া ইহার মধ্যে কোন অক্ষর বাড়াইতে বা কমাইতে চায় তবে তাহারা তাহা করিতে সক্ষম হইবে না। পক্ষান্তরে তাহারা ইনজীলে কি পরিমাণ রদবদল করিয়াছে; তাহা কাহারও নিকট অস্পষ্ট নয় (ঐ, পৃ. ৭০)। কুরআন মজীদে এই বিষয়ে মহান আল্লাহর বাণী: إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ. "আমিই কুরআন নাযিল করিয়াছি এবং অবশ্যই আমি ইহার সংরক্ষক” (১৫ঃ ৯)।

আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: প্রত্যেক নবীকে কিছু আয়াত বা নিদর্শন প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি নাযিলকৃত আয়াতের উপর যে পরিমাণ মানুষ ঈমান আনিয়াছে, কোন নবীর উপর নাযিলকৃত আয়াতের উপর সে পরিমাণ মানুষ ঈমান আনে নাই। আমাকে যাহা দেওয়া হইয়াছে, তাহা তো ওহী, যাহা আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি প্রত্যাদেশ করিয়াছেন। কিয়ামতের দিন আমার অনুসারীদের সংখ্যা অন্যান্যদের তুলনায় অধিক হইবে বলিয়া আমি আশাবাদী, বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, হাদীছ নং ৪৯৭১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৫২)।

হাফিয ইবন হাজার আসকালানী (র) বলেন, নবী কারীম (স) বলিয়াছেন: "কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অধিক হইবে বলিয়া আমি আশাবাদী"। এই বাক্য দ্বারা কুরআন মজীদের চিরন্তন মু'জিযার কথা প্রতীয়মান হয়। যেহেতু কুরআনের মধ্যে দাওয়াত, প্রমাণাদি এবং ভবিষ্যত সম্পর্কীয় ঘটনাবলীর উল্লেখ রহিয়াছে, তাই উপস্থিত ও অনুপস্থিত সকলের জন্যই ইহার উপকারিতা অনেক ও ব্যাপক। ইহাতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুসারীর সংখ্যা বেশি হওয়াই যুক্তিযুক্ত (ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৬২৩)।

হাসান বসরী (র) আল্লাহ্র বাণী- لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ. -এর ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদকে শয়তান হইতে সংরক্ষণ করিয়াছেন। ফলে শয়তান ইহাতে কোন বাতিল কথা সংযোজন করিতে এবং কোন হক কথা কমাইতে সক্ষম নয় (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩১৬; তাফসীর ইবন জারীর, ২৪খ., পৃ. ৭৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00