📄 (আট) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নাম ধরিয়া ডাকা নিষেধ
রাসূলুল্লাহ (স)-কে কিভাবে সম্বোধন করিতে হইবে এবং তাঁহার সহিত কিভাবে কথা বলিতে হইবে এই বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার মু’মিন বান্দাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়াছেন। উদ্দেশ্য হইল, তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদেরকে আদেশ করিয়াছেন, তোমরা তাঁহাকে নাম ধরিয়া ডাকিবে না, বরং তাঁহাকে “হে নবী বা হে রাসূল” বলিয়া সম্বোধন করিবে (আল-ওয়াফা, ২ খ., পৃ. ৭-৮; আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩২৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেব লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা’আলা যেহেতু কুরআন মজীদে তাঁহাকে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, সেহেতু ঈমানদার লোকদের জন্য অপরিহার্য হইল তাঁহাকে এভাবেই সম্বোধন করা। ডাকার এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (স)-এরই একমাত্র বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য নবী-রাসূলের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। কেননা তাঁহাদেরকে তাঁহাদের উম্মতগণ নাম ধরিয়াও ডাকিত। মহান আল্লাহ বলেন : لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُول بَيْنَكُمْ كَدُعَاء بَعْضُكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذَا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. "রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহ্বানের মত গণ্য করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা অলক্ষ্যে সরিয়া পড়ে আল্লাহ তো তাহাদেরকে জানেন। সুতরাং যাহারা তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহারা সতর্ক হউক যে, বিপর্যয় তাহাদের উপর আপতিত হইবে অথবা আপতিত হইবে তাহাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি” (২৪:৬৩)।
ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) প্রমুখ বলেন, প্রথমে লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হে মুহাম্মাদ! হে আবুল কাসিম! বলিয়া সম্বোধন করিত। পরে নবী কারীম (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা'আলা এভাবে ডাকিতে তাহাদের নিষেধ করেন এবং হে আল্লাহ্ নবী! হে আল্লাহর রাসূল! বলিয়া ডাকিতে হুকুম করেন, (দ্র. তাফসীরে ইবন জারীর, ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।
কাতাদা (র) উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা নবী কারীম (স)-কে তা'যীম করা এবং তাঁহার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার আদেশ দিয়াছেন এবং তাঁহাকে নেতা হিসাবে বরণ করারও হুকুম দিয়াছেন, (দ্র. তাফসীর ইন জারীর ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।
পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতগণের সম্বোধনের ভাষা ইহার ব্যতিক্রম। তাহারা যে ভাষায় তাহাদের নবীকে সম্বোধন করিয়াছে তাহা উল্লেখপূর্বক বলা হইয়াছে: قَالُوا يَا مُوسَى ادْعُ لَنَا رَبَّكَ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর" (৭:১৩৪)।
قَالُوا يَمُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ أَلِهَةٌ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তাহাদের দেবতার ন্যায় আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়িয়া দাও” (৭ঃ ১৩৮)।
إِذْ قَالَ الْحَوَارِثُونَ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ. "স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মারইয়াম-তনয় 'ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও” (৫: ১১২)।
📄 (নয়) ব্যাপক অর্থবোধক কালাম
আল্লাহ্ তা'আলা রাসুলুল্লাহ (স)-কে অন্যান্য নবী-রাসূলগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। এবং তিনি তাঁহাকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার ক্ষমতা দান করিয়াছেন (দ্র. আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ১৪; শামাইলে ইব্ন কাছীর, পৃ. ৬০৫ ও খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩১-৩৩৩)। তিনি কথা বলার সময় এমন বাক্য ব্যবহার করিতেন যাহা শব্দগত দিক হইতে সংক্ষিপ্ত হইলেও ইহার অর্থ ছিল ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ (হাফিয ইব্ন হাজার, ফাতহুল বারী, ১৩ খ., পৃ. ২৬১; ইমাম যুহরী (র)-ও অনুরূপ বলিয়াছেন; ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ৪১৮; ইবনুল আছীর, জামি'উল উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩১)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে ভাষার কুঞ্জি দান করিয়াছেন। ভাষার অলংকার, সাহিত্যের লালিত্য, বক্তব্যের গভীরতা এবং শব্দ প্রয়োগের পাণ্ডিত্যে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে শীর্ষস্থানীয় করিয়াছেন, যাহা অন্যদের জন্য ছিল খুবই দুষ্কর, এমনকি অসম্ভবও বটে (ইবন মানযূর, লিসানুল 'আরাব, ২খ., পৃ. ৫৩৭)। ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম হইল, আল্লাহ্ তাঁহাকে ব্যাপক অর্থবোধক ভাষা দান করিয়াছেন। ফলে তিনি অল্প কথায় অনেক তথ্য তুলিয়া ধরিতে পারিতেন। ভাষার অলংকার ও বাগ্মিতায় তিনি ছিলেন আরবদের শীর্ষস্থানীয় (গায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৪৭)।
এই সম্বন্ধে হাদীছে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন: ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে আমাকে নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছেঃ আমাকে ব্যাপক কালাম দান করা হইয়াছে; রু'ব তথা ভীতির দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে; গনীমতের মাল আমার জন্য হালাল করা হইয়াছে; আমার জন্য পৃথিবীকে পবিত্রতা হাসিলের বস্তু ও মসজিদ করা হইয়াছে; আমাকে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হইয়াছে এবং নবুওয়াত ও রিসালাতের সিলসিলা আমার দ্বারা সমাপ্ত করা হইয়াছে (মুসলিম, হাদীছ নং ৫২৩)।
আবু মূসা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : আমাকে ভাষার কুঞ্জি, জামে' কালাম এবং সাহিত্য ও কাব্যজ্ঞান দান করা হইয়াছে (মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ৪০৮-৪০৭; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা, ৪খ., নং ১৭৩৭)।
হাফিয ইব্ন রাজাব হাম্বালী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে যে জামে' কালাম দান করা হইয়াছে তাহা দুই প্রকার : (১) এমন জামে কালাম যাহা কুরআন মজীদে উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ্ বাণী: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَائِي ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ والبغى "আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাহাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর" (১৬ : ৯০)।
হাসানী বসরী (র) বলেন, এই আয়াতে যাবতীয় কল্যাণের হুকুম দেওয়া হইয়াছে এবং যারতীয় অকল্যাণ হইতে নিষেধ করা হইয়াছে। (২) এমন জামে কালাম যাহা হাদীছ শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে। এই জাতীয় কালাম হাদীছের মধ্যে ছড়াইয়া আছে (জামি'উল 'উলূম ওয়াল-হিকাম, আল্লামা ইব্ন রাজাব (র), পৃ. ৩ দ্র.)। যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী: আমলের বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর যে যাহা নিয়ত করিবে সে তাহাই পাইবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১খ., নং ১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯০৭)।
ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, এই হাদীছে ইলমের তিন ভাগের এক ভাগ নিহিত রহিয়াছে এবং তাহা ফিক্হ-এর সত্তরটি অধ্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (জামি'উল 'উলূম ওয়াল-হিকাম, পৃ. ৫)।
কাযী ইয়ায (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বাভাবিক কথা, তাঁহার বাগ্মিতা, জামে কালাম ও হিকমত ইত্যাদিকে কেন্দ্র করিয়া মানুষ হাজার হাজার গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। ইহাতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তাঁহার ফাসাহাত, বাগ্মিতা, পাণ্ডিত্যের কোন তুলনা হয় না। এই প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণস্বরূপ কিছু হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন তিনি বলিয়াছেন: তুমি যেখানেই থাকিবে আল্লাহকে ভয় করিবে; কোন মন্দ কাজ হইয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে কোন নেক আমল করিবে; তাহা হইলে নেকী বদীকে মিটাইয়া দিবে এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করিবে (তিরমিযী, হাদীছ নং ১৯৮৭; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান, সহীহ। মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., হাদীছ নং ৫৪। হাকেমের মতে হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ)।
তিনি আরও বলেন: কল্যাণকামিতাই দীন। সাহাবীগণ বলেন, আমরা প্রশ্ন করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাহার জন্য? তিনি বলিলেন: আল্লাহ্, তাঁহার কিতাব, রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সকল মানুষের জন্য" (মুসলিম, হাদীছ নং ৫৫)।
আরও ইরশাদ হইয়াছে: সন্দেহজনক কাজ ছাড়িয়া সন্দেহমুক্ত কাজ করিবে (তিরমিযী, হাদীছ নং ২৫১৮, ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান-সহীহ। মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ১ম খণ্ড, হাদীছ নং ২০০; নাসাঈ, ৮খ., হাদীছ নং ৩২৭-৩২৮; হাকেম, ২খ., হাদীছ নং ১৩; তাহার মতে হাদীছটির সূত্র সহীহ। তবে বুখারী ও মুসলিম তাহা বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহাবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন)।
আরও বহু হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা, তাঁহার কথোপকথন, বক্তৃতা, দু'আ ও অঙ্গীকারমূলক কথার উল্লেখ রহিয়াছে। এসব কিছু এমনভাবে বিন্যস্ত যাহার সহিত অন্য কোন মানুষের কথাবার্তা ইত্যাদিকে তুলনা করা যায় না এবং এই বিষয়ে তাঁহার অগ্রগামী বা তাঁহার সমকক্ষ হওয়াও কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় (শিফা, কাযী ইয়ায, ১খ., হাদীছ নং ১৭৩-১৭৬)।
📄 (দশ) শ্রদ্ধা ও ভক্তি মিশ্রিত ভয় বা ব্যক্তিত্বের প্রভাব
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি মিশ্রিত ভীতি (رعب) অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের প্রভাব দ্বারা সাহায্য করিয়াছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর শত্রুদের হৃদয়ে ভয় ঢালিয়া দিতেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (স) ও শত্রুদের মধ্যে এক মাস বা দুই মাসের পথের দূরত্ব থাকা অবস্থায়ই তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যাইত এবং তাঁহার মুকাবিলায় আসিতে সাহস করিত না (ইবনুল আছীর আল-জাযারী, জামি'উল 'উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩১)। আল্লামা ইবন হাজার (র) বলেন, এই বৈশিষ্ট্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে সর্বাবস্থায় পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। এমনকি একাকী থাকা অবস্থায়ও তাঁহার এই বৈশিষ্ট্যের বহিপ্রকাশ ঘটিয়াছে (ফাতহুল বারী, ১খ., নং ৫২১ দ্র.)। হাদীছে এই সম্বন্ধে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে।
আবূ উমামা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: চারটি বিষয়ের দ্বারা আমাকে অন্যান্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। আমার উম্মতের কোন ব্যক্তির যদি নামাযের ওয়াক্ত হয় এবং কিসের উপর দাঁড়াইয়া নামায পড়িবে এমন কিছু-না পাইলে সে মাটিকে মসজিদ এবং পবিত্রকারী বন্ধু হিসাবে ব্যবহার করিবে। আমি সমগ্র বিশ্ববাসীর প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। এক মাস বা দুই মাসের পথের পর্যন্ত আমাকে রু'ব (ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভয় মিশ্রিত ভীতি) দ্বারা সাহায্য করা হইয়াছে। আর আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে (বায়হাকী, সুনানুল কুবরা, ১খ., হাদীছ নং ২১২; নাসিরুদ্দীন আলবানীর মতে হাদীছটি সহীহ। সহীহ জামিউস সাগীর, হাদীছ নং ৪০৯৬ দ্র.)।
সাইব ইব্ন ইয়াযীদ (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: আমাকে পাঁচটি বিষয়ের দ্বারা অন্যান্য নবীগণের উপর শেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছেঃ আমি সমস্ত মানুষের প্রতি নষী হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি; আমি আমার উম্মতের জন্য সুপারিশকে সংরক্ষণ করিয়াছি; রু'ব দ্বারা আমার সামনে এক মাসের পথ এবং পেছনে এক মাসের পথ পর্যন্ত সাহায্যপ্রাপ্ত হইয়াছি; আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে; আর আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে। আমার পূর্ববর্তী কাহারও জন্য তাহা হালাল ছিল না (তাবারানী, মু'জামুল কাবীর, হাদীছ নং ৬৬৭৪; নাসিরুদ্দীন আলবানী দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে হাদীছটিকে সহীহ্ প্রমাণিত করিয়াছেন। সহীহ জামে সাগীর, হাদীছ নং ৪০৯৭ দ্র.)।
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: ছয়টি বিষয়ের দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে: আমার জন্য গনীমতের মাল হালা করা হইয়াছে, পৃথিবীকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে, আমাকে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হইয়াছে এবং আমার দ্বারা নবুওয়াতের সিলসিলা খতম করা হইয়াছে। আল্লামা তীবি (র) বলেন, কোন বর্ণনায় ছয়টি, কোন বর্ণনায় পাঁচটি এবং কোন বর্ণনায় চারটি বিষয়ের কথা উল্লেখ রহিয়াছে। মূলত এগুলির মধ্যে কোন বৈপরীত্য নাই। কেননা এক সংখ্যা উল্লেখ করার দ্বারা অন্য সংখ্যাকে অস্বীকার হয় না। অথবা বর্ণনাকারী প্রথমে কমের ব্যাপারে জ্ঞাত হইয়াছেন এবং পরে বেশির ব্যাপারে জ্ঞাত হইয়াছেন (উমদাতুল কারী, ৪খ., হাদীছ নং ৮; ফাতহুল কাদীর, ৪খ., হাদীছ নং ৪৩৯ দ্র.)।
আবদুল্লাহ ইব্ন আমর (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধের সময় এক রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স) নামায আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হইলে কতিপয় সাহাবী তাঁহার পাহারাদানের উদ্দেশ্যে তাঁহার পিছনে একত্র হন। রাসূলুল্লাহ (স) নামাযশেষে তাঁহাদের বলেন, আজ রাত্রে আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেওয়া হইয়াছে, যাহা পূর্ববর্তী কাহাকেও দেওয়া হয় নাই। আমি সমস্ত মানুষের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি; কিন্তু আমার পূর্বে বিশেষ সম্প্রদায়ের নিকট রাসূল প্রেরণ করা হইত। রু'ব দ্বারা আমাকে শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করা হইয়াছে। আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে; কিন্তু আমার পূর্বে গনীমতের মাল ভোগ করাকে হারাম মনে করা হইত এবং তাহা জ্বালাইয়া দেওয়া হইত। আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রকারী বস্তু বানানো হইয়াছে। কাজেই যেখানেই আমার নামাযের ওয়াক্ত হয়, সেখানেই আমি তায়াম্মুম করিয়া নামায আদায় করিতে পারি। কিন্তু পূর্ববর্তী উম্মতগণকে গীর্জা ও ইবাদতখানায় নামায আদায় করিতে হইত। আমাকে বলা হইয়াছে, আপনি দু'আ করুন। কেননা পূর্ববর্তী নবীগণ সকলেই বিশেষ ধরনের দু'আ করিয়াছেন। অবশ্য আমি কিয়ামত দিবসের জন্য আমার দু'আর বিষয়টিকে স্থগিত রাখিয়াছ। আর তাহা তোমাদের জন্য এবং ঐ সমস্ত লোকের জন্য যাহারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই (মুসনাদে আহমাদ, ৩খ., হাদীছ নং ২২২; হাফিয হায়ছামী বলেন, ইহার রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০খ., পৃষ্ঠা নং ৩৬৭ দ্র.)।
📄 (এগার) পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি তাঁহারই হাতে
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দা ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মহাসম্মানে ভূষিত করিয়াছেন এবং অন্যান্য নবীগণ অপেক্ষা তাঁহাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি দান করিয়াছেন (খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩১ দ্র.)। অর্থাৎ তাঁহার এবং তাঁহার উম্মতের জন্য রাজ্যজয়, পৃথিবীর ধনভাণ্ডার হস্তগত করা, গনীমতের মাল প্রাপ্ত হওয়া এবং সোনা-রূপার গুপ্ত সম্পদ ভূগর্ভ হইতে উত্তোলন করা ইত্যাদিকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। আল্লামা খাত্তাবী অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ২খ., হাদীছ নং ৪৪২; ইব্দুল আছীর, জামিউল উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩২ দ্র.)। হাদীছে অনুরূপ বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে:
আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: জামে কালাম দিয়া আমাকে প্রেরণ করা হইয়াছে; রু'ব বা ভীতি দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে। একদা আমি যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম তখন আমাকে পৃথিবীর খাযানা প্রদান করা হয় এবং আমার হাতে স্বর্ণের বলয় পরাইয়া দেওয়া হয়। এই বলয় দুইটি আমার অপসন্দ লাগে এবং ইহাতে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হইয়া পড়ি। তখন আমার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়, তুমি ইহাতে ফুক দাও। আমি তাহাতে ফুক দিলে বলয় দুইটি উধাও হইয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমার মতে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা হইল, দুই মিথ্যাবাদী এবং তাহাদের মধ্যে আমার অবস্থান। একজন হইল সানআর অধিবাসী, আর অপরজন হইল ইয়ামামার অধিবাসী। সানআর অধিবাসী হইল আসওয়াদ আনাসী এবং ইয়ামামার অধিবাসী হইল মুসায়লামাতুল কায্যাব (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১খ., হাদীছ নং ৬৫৯০; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ২২৭৪)।
'উকবা (রা) বলেন, একদা নবী কারীম (স) বাড়ি হইতে বাহির হইয়া উহুদের শহীদগণের জানায় নামায আদায় করিলেন। অতঃপর আসিয়া মিম্বরে আরোহণ করিয়া বলিলেন: আমি তোমাদের জন্য অগ্রগামী এবং আমি তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষী হইব। আল্লাহর শপথ! আমি এখান হইতে হাওয দেখিতে পাইতেছি। পৃথিবীর ধনভাণ্ডারের চাবি আমাকে প্রদান করা হইয়াছে। আল্লাহর শপথ। আমার পর তোমাদের শিরকে লিপ্ত হওয়ার কোন আশংকা আমি করি না। তবে আমার আশংকা হইল, তোমরা দুনিয়ার ঐ সমস্ত ধনভাণ্ডার হাসিলের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়া পড়িবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১২খ., হাদীছ নং ৭০৩৭; মুসলিম, ২২খ., হাদীছ নং ১২২৯৬)।