📄 (ছয়) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন ও সত্তার শপথ গ্রহণ
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বক্তব্যকে সুদৃঢ় করার জন্য সৃষ্টির বহু কিছুর শপথ করিয়াছেন [আল্লাহর জন্য সৃষ্টির শপথ করা জায়েয। কিন্তু কোন সৃষ্টির জন্য আল্লাহ্র যাত (সত্তা) ও সিফাত (গুণাবলী) ব্যতীত অন্য কিছুর শপথ করা জায়েয নয়। এই ব্যাপারে বহু দলীল-প্রমাণ রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কেহ যদি শপথ করে তবে সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা নীরব থাকে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১ খণ্ড, হাদীছ নং ৬৬৪৬; মুসলিম, ৩য় খণ্ড, হাদীছ নং ১৬৪৬)। হাফিয ইব্ন হাজার (র) বলেন, আলিমগণ বলিয়াছেন, গায়রুল্লাহ্র নামে শপথ করা নিষিদ্ধ হওয়ার পিছনে রহস্য হইল, কোন বস্তুর নামে শপথ করা হইলে ইহাতে উহাকে সম্মান করা হয়। আর সম্মান তো একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস (দ্র. ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৪০)। ইহাতে তাঁহার কামাল বা পূর্ণতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পাইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা চন্দ্র, সূর্য, ভোরবেলা, আকাশ ইত্যাদির শপথ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া কোন মানুষের নামে আল্লাহ তা'আলা শপথ করেন নাই। মহান আল্লাহ বলেন : لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. "তোমার জীবনের শপথ! উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়া আছে” (১৫ : ৭২)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, মুহাম্মাদ (স)-এর তুলনায় অধিক সম্মানিত কোন মাখলুক আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেন নাই। আর তিনি ছাড়া কোন মানুষের জীবনের শপথ করিতে আমি আল্লাহ তা'আলাকে শুনি নাই অর্থাৎ পাই নাই। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জীবনের শপথ করিয়া বলেন : لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. "তোমার জীবনের শপথ উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়া আছে" (১৫ : ৭২)। ইহার মর্ম এই যে, আপনার জীবন, আপনার বয়স এবং দুনিয়ায় আপনার অবস্থান ইত্যাদির শপথ (তাফসীর ইবন জারীর, ১৪ খ., পৃ. ৩০; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৭৫ দ্র.)।
শায়খ ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জীবনের কসম করিয়া বলিয়াছেন: لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. উল্লেখ্য যে, এই শপথের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শপথকারীর নিকট যাঁহার জীবনের শপথ করা হয় তিনি মহা সম্মানিত। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের শপথ করাই অধিক বাঞ্ছনীয়। কেননা তাঁহার জীবনের মধ্যে ব্যাপক বা সাধারণ ও বিশেষ উভয় প্রকারের বরকত নিহিত আছে যাহা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত (বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৭ দ্র.)।
📄 (সাত) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন
আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে তাঁহাকে কুরআন মজীদে নবী-রাসূল বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, তাঁহার নাম ধরিয়া সম্বোধন করেন নাই (আল-ওয়াফা বি-আহ্ওয়ালিল মুসতাফা, পৃ. ৩৬২, ৩৬৩; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩২৪; বিদায়াতুস সুউল, পৃ. ৩৭-৩৮)। পক্ষান্তরে অন্যান্য নবী-রাসূলকে তাঁহাদের নাম ধরিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : يَأَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ. ৪৩১ "হে রাসূল! তোমাকে যেন দুঃখ না দেয় যাহারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়" (৫:৪১)।
মহান আল্লাহ আরও বলেন: يأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ. "হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহা প্রচার কর” (৫:৬৭)।
يأَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ. “হে নবী! তোমার জন্য ও তোমার অনুসারী মু'মিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট” (৮: ৬৪)। পক্ষান্তরে আল্লাহ অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ব্যাপারে বলিয়াছেন:
"হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর" (২: ৩৫)। "হে নূহ্! অবতরণ কর শান্তি ও কল্যাণসহ” (১১:৪৮)। "হে-মূসা! আমি তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি" (৭:১৪৪) • আরও বলা হইয়াছে:
يادَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ.
يَا نُوحُ اهْبِطَ بِسَلَم
يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ.
يا بْرِهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا . "হে ইব্রাহীম! 'তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করিলে" (৩৭: ১০৪-১০৫)।
يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ. "হে মারইয়াম-তনয় 'ঈসা! তোমার প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর" (৫: ১১০) ইহা ছাড়া আরও বহু আয়াতে এরূপ উল্লেখ রহিয়াছে।
শায়খ ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, এই কথা সকলের নিকটই স্পষ্ট যে, মনিব যদি তাহার কোন গোলামকে বিশেষ বিশেষণে সম্বোধন করে এবং অন্যদেরকে নাম ধরিয়া সম্বোধন করে তবে ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, যাহাকে বিশেষ বিশেষণে সম্বোধন করা হইয়াছে, তিনি অন্যদের তুলনায় তাহার নিকট অধিক সম্মানিত (দ্র. বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৮)।
আল্লামা ইবনুল জাওযী (র) বলেন, পরিচিতির জন্য যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নাম উল্লেখ করা হইয়াছে, সেখানে ‘রাসূল’ শব্দটিও যোগ করা হইয়াছে (আল-ওয়াফা, পৃ. ৩৬৩)। যেমন মহান আল্লাহ বলেন : وَمَا مُحَمَّدٌ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ. "মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে” (৩: ১৪৪)।
مُحَمَّدٌ رَسُولُ الله. “মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল” (৪৮: ২৯)।
وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ. “এবং যাহারা ঈমান আনে মুহাম্মাদের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে” (৪৭ঃ ২)।
উল্লেখ্য যে, কুরআন মজীদের যে স্থানে ইব্রাহীম (আ)-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে সেখানে ইব্রাহীম (আ)-কে তাঁহার নাম সহকারে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার উপাধিতে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন আল্লাহর বাণী : إِنَّ أولَى النَّاسِ بِابْراهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهُذَا النَّبِيُّ. “নিশ্চয় মানুষের মধ্যে তাহারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছে এবং এই নবীরও” (৩:৬৮)।
📄 (আট) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নাম ধরিয়া ডাকা নিষেধ
রাসূলুল্লাহ (স)-কে কিভাবে সম্বোধন করিতে হইবে এবং তাঁহার সহিত কিভাবে কথা বলিতে হইবে এই বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার মু’মিন বান্দাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়াছেন। উদ্দেশ্য হইল, তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদেরকে আদেশ করিয়াছেন, তোমরা তাঁহাকে নাম ধরিয়া ডাকিবে না, বরং তাঁহাকে “হে নবী বা হে রাসূল” বলিয়া সম্বোধন করিবে (আল-ওয়াফা, ২ খ., পৃ. ৭-৮; আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩২৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেব লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা’আলা যেহেতু কুরআন মজীদে তাঁহাকে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, সেহেতু ঈমানদার লোকদের জন্য অপরিহার্য হইল তাঁহাকে এভাবেই সম্বোধন করা। ডাকার এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (স)-এরই একমাত্র বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য নবী-রাসূলের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। কেননা তাঁহাদেরকে তাঁহাদের উম্মতগণ নাম ধরিয়াও ডাকিত। মহান আল্লাহ বলেন : لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُول بَيْنَكُمْ كَدُعَاء بَعْضُكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذَا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. "রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহ্বানের মত গণ্য করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা অলক্ষ্যে সরিয়া পড়ে আল্লাহ তো তাহাদেরকে জানেন। সুতরাং যাহারা তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহারা সতর্ক হউক যে, বিপর্যয় তাহাদের উপর আপতিত হইবে অথবা আপতিত হইবে তাহাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি” (২৪:৬৩)।
ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও সাঈদ ইব্ন জুবায়র (র) প্রমুখ বলেন, প্রথমে লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হে মুহাম্মাদ! হে আবুল কাসিম! বলিয়া সম্বোধন করিত। পরে নবী কারীম (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা'আলা এভাবে ডাকিতে তাহাদের নিষেধ করেন এবং হে আল্লাহ্ নবী! হে আল্লাহর রাসূল! বলিয়া ডাকিতে হুকুম করেন, (দ্র. তাফসীরে ইবন জারীর, ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।
কাতাদা (র) উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা নবী কারীম (স)-কে তা'যীম করা এবং তাঁহার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার আদেশ দিয়াছেন এবং তাঁহাকে নেতা হিসাবে বরণ করারও হুকুম দিয়াছেন, (দ্র. তাফসীর ইন জারীর ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।
পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতগণের সম্বোধনের ভাষা ইহার ব্যতিক্রম। তাহারা যে ভাষায় তাহাদের নবীকে সম্বোধন করিয়াছে তাহা উল্লেখপূর্বক বলা হইয়াছে: قَالُوا يَا مُوسَى ادْعُ لَنَا رَبَّكَ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর" (৭:১৩৪)।
قَالُوا يَمُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ أَلِهَةٌ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তাহাদের দেবতার ন্যায় আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়িয়া দাও” (৭ঃ ১৩৮)।
إِذْ قَالَ الْحَوَارِثُونَ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ. "স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মারইয়াম-তনয় 'ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও” (৫: ১১২)।
📄 (নয়) ব্যাপক অর্থবোধক কালাম
আল্লাহ্ তা'আলা রাসুলুল্লাহ (স)-কে অন্যান্য নবী-রাসূলগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। এবং তিনি তাঁহাকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার ক্ষমতা দান করিয়াছেন (দ্র. আল-ওয়াফা, ২খ., পৃ. ১৪; শামাইলে ইব্ন কাছীর, পৃ. ৬০৫ ও খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩৩১-৩৩৩)। তিনি কথা বলার সময় এমন বাক্য ব্যবহার করিতেন যাহা শব্দগত দিক হইতে সংক্ষিপ্ত হইলেও ইহার অর্থ ছিল ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ (হাফিয ইব্ন হাজার, ফাতহুল বারী, ১৩ খ., পৃ. ২৬১; ইমাম যুহরী (র)-ও অনুরূপ বলিয়াছেন; ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ৪১৮; ইবনুল আছীর, জামি'উল উসূল, ৮খ., পৃ. ৫৩১)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে ভাষার কুঞ্জি দান করিয়াছেন। ভাষার অলংকার, সাহিত্যের লালিত্য, বক্তব্যের গভীরতা এবং শব্দ প্রয়োগের পাণ্ডিত্যে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাকে শীর্ষস্থানীয় করিয়াছেন, যাহা অন্যদের জন্য ছিল খুবই দুষ্কর, এমনকি অসম্ভবও বটে (ইবন মানযূর, লিসানুল 'আরাব, ২খ., পৃ. ৫৩৭)। ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম হইল, আল্লাহ্ তাঁহাকে ব্যাপক অর্থবোধক ভাষা দান করিয়াছেন। ফলে তিনি অল্প কথায় অনেক তথ্য তুলিয়া ধরিতে পারিতেন। ভাষার অলংকার ও বাগ্মিতায় তিনি ছিলেন আরবদের শীর্ষস্থানীয় (গায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৪৭)।
এই সম্বন্ধে হাদীছে বিশদ বিবরণ রহিয়াছে। আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন: ছয়টি বিষয়ের মাধ্যমে আমাকে নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছেঃ আমাকে ব্যাপক কালাম দান করা হইয়াছে; রু'ব তথা ভীতির দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে; গনীমতের মাল আমার জন্য হালাল করা হইয়াছে; আমার জন্য পৃথিবীকে পবিত্রতা হাসিলের বস্তু ও মসজিদ করা হইয়াছে; আমাকে সমস্ত সৃষ্টির প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করা হইয়াছে এবং নবুওয়াত ও রিসালাতের সিলসিলা আমার দ্বারা সমাপ্ত করা হইয়াছে (মুসলিম, হাদীছ নং ৫২৩)।
আবু মূসা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : আমাকে ভাষার কুঞ্জি, জামে' কালাম এবং সাহিত্য ও কাব্যজ্ঞান দান করা হইয়াছে (মুসনাদ আহমাদ ইবন হাম্বল, ১খ., পৃ. ৪০৮-৪০৭; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা, ৪খ., নং ১৭৩৭)।
হাফিয ইব্ন রাজাব হাম্বালী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে যে জামে' কালাম দান করা হইয়াছে তাহা দুই প্রকার : (১) এমন জামে কালাম যাহা কুরআন মজীদে উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন আল্লাহ্ বাণী: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَائِي ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ والبغى "আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাহাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর" (১৬ : ৯০)।
হাসানী বসরী (র) বলেন, এই আয়াতে যাবতীয় কল্যাণের হুকুম দেওয়া হইয়াছে এবং যারতীয় অকল্যাণ হইতে নিষেধ করা হইয়াছে। (২) এমন জামে কালাম যাহা হাদীছ শরীফে বর্ণিত রহিয়াছে। এই জাতীয় কালাম হাদীছের মধ্যে ছড়াইয়া আছে (জামি'উল 'উলূম ওয়াল-হিকাম, আল্লামা ইব্ন রাজাব (র), পৃ. ৩ দ্র.)। যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী: আমলের বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর যে যাহা নিয়ত করিবে সে তাহাই পাইবে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১খ., নং ১; মুসলিম, হাদীছ নং ১৯০৭)।
ইমাম শাফি'ঈ (র) বলেন, এই হাদীছে ইলমের তিন ভাগের এক ভাগ নিহিত রহিয়াছে এবং তাহা ফিক্হ-এর সত্তরটি অধ্যায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (জামি'উল 'উলূম ওয়াল-হিকাম, পৃ. ৫)।
কাযী ইয়ায (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্বাভাবিক কথা, তাঁহার বাগ্মিতা, জামে কালাম ও হিকমত ইত্যাদিকে কেন্দ্র করিয়া মানুষ হাজার হাজার গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। ইহাতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তাঁহার ফাসাহাত, বাগ্মিতা, পাণ্ডিত্যের কোন তুলনা হয় না। এই প্রসঙ্গে তিনি উদাহরণস্বরূপ কিছু হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন তিনি বলিয়াছেন: তুমি যেখানেই থাকিবে আল্লাহকে ভয় করিবে; কোন মন্দ কাজ হইয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে কোন নেক আমল করিবে; তাহা হইলে নেকী বদীকে মিটাইয়া দিবে এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করিবে (তিরমিযী, হাদীছ নং ১৯৮৭; ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান, সহীহ। মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., হাদীছ নং ৫৪। হাকেমের মতে হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে উত্তীর্ণ)।
তিনি আরও বলেন: কল্যাণকামিতাই দীন। সাহাবীগণ বলেন, আমরা প্রশ্ন করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কাহার জন্য? তিনি বলিলেন: আল্লাহ্, তাঁহার কিতাব, রাসূল, মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও সকল মানুষের জন্য" (মুসলিম, হাদীছ নং ৫৫)।
আরও ইরশাদ হইয়াছে: সন্দেহজনক কাজ ছাড়িয়া সন্দেহমুক্ত কাজ করিবে (তিরমিযী, হাদীছ নং ২৫১৮, ইমাম তিরমিযীর মতে হাদীছটি হাসান-সহীহ। মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ১ম খণ্ড, হাদীছ নং ২০০; নাসাঈ, ৮খ., হাদীছ নং ৩২৭-৩২৮; হাকেম, ২খ., হাদীছ নং ১৩; তাহার মতে হাদীছটির সূত্র সহীহ। তবে বুখারী ও মুসলিম তাহা বর্ণনা করেন নাই। আল্লামা যাহাবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন)।
আরও বহু হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মর্যাদা, তাঁহার কথোপকথন, বক্তৃতা, দু'আ ও অঙ্গীকারমূলক কথার উল্লেখ রহিয়াছে। এসব কিছু এমনভাবে বিন্যস্ত যাহার সহিত অন্য কোন মানুষের কথাবার্তা ইত্যাদিকে তুলনা করা যায় না এবং এই বিষয়ে তাঁহার অগ্রগামী বা তাঁহার সমকক্ষ হওয়াও কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় (শিফা, কাযী ইয়ায, ১খ., হাদীছ নং ১৭৩-১৭৬)।