📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (পাঁচ) তিনি নিজ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ

📄 (পাঁচ) তিনি নিজ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ


আল্লাহ তা'আলা প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মহাসম্মানে ভূষিত করিয়াছেন। তাঁহার অস্তিত্বকে তাঁহার উম্মতের জন্য আযাব হইতে বাঁচার রক্ষাকবচ বানাইয়াছেন (খাসাইসুল কুবরা, ২ খ., পৃ. ৩২২)। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী উম্মতদের অনেককে তাহাদের নবীর জীবদ্দশায়ই শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর অস্তিত্ব তাঁহার উম্মতের জন্য ছিল রক্ষাকবচ। অনুরূপভাবে তাঁহার অস্তিত্ব তামাম ফিতনা-ফাসাদ, লড়াই, ইরতিদাদ ও মনের গরমিল ইত্যাদি সবকিছু হইতেই তাঁহার সাহাবীগণকে রক্ষা করিয়াছে। অবশ্য তাঁহার ইনতিকালের পর এই ধরনের কিছু বিষয় সংঘটিত হইয়াছে। শায়খ 'ইযয্যুদ্দীন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছেন। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নাফরমান উম্মতকে সুযোগ দিয়াছেন এবং তাহাদের অস্তিত্ব বাকী রাখার লক্ষ্যে আযাব তরান্বিত করেন নাই। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী নবীগণের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। অর্থাৎ যখনই উম্মতরা তাঁহাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছে তখনই তাহাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে। উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের বিবরণ কুরআন, হাদীছ এবং পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দের আলোচনায় উল্লেখ রহিয়াছে। বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায়ও এই কথা উক্ত হইয়াছে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, হাদীছ নং ৪৬৪৮; শব্দমালা বুখারীরই; মুসলিম, হাদীছ নং ২৭৯৬)।

হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা আবু জাহল বলিল, হে আল্লাহ! ইহা যদি তোমার পক্ষ হইতে সত্য হয় তবে আমাদের উপর আকাশ হইতে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দাও। তখন নাযিল হইল: وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبُهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ. وَمَا لَهُمْ أَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللهُ وَهُمْ يَصُدُّوْنَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ . "আল্লাহ এমন নহেন যে, তুমি তাহাদের মধ্যে থাকিবে অথচ তিনি তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং আল্লাহ এমনও নহেন যে, তাহারা ক্ষমা প্রার্থনা করিবে অথচ তিনি তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন। এবং তাহাদের কী বা বলিবার আছে যে, আল্লাহ্ তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন না, যখন তাহারা লোকজনকে মসজিদুল হারাম হইতে নিবৃত্ত করে? তাহারা উহার তত্ত্বাবধায়ক নহে, শুধু মুত্তাকীগণই উহার তত্ত্বাবধায়ক; কিন্তু তাহাদের অধিকাংশ ইহা অবগত নহে” (৮:৩৩-৩৪)।

হযরত আবূ মূসা (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে মাগরিবের নামায আদায় করার পর বলিলাম, আমরা যদি বসিয়া থাকিতাম তাঁহার সঙ্গে ইশার নামায আদায় করা পর্যন্ত! এই বলিয়া আমরা বসিয়া রহিলাম। এমতাবস্থায় তিনি আমাদের সামনে আসিয়া বলিলেন, তোমরা কি এখানেই ছিলে? আমরা বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার সহিত মাগরিবের নামায আদায় করিবার পর বলিলাম, ইশা পর্যন্ত আমরা এখানেই উপবিষ্ট থাকিব। একথা শুনিয়া তিনি বলিলেন, ভাল করিয়াছ অথবা বলিলেন, তোমরা ঠিক করিয়াছ। তাহার পর তিনি আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করিলেন। আর তিনি প্রায়ই আকাশের দিকে তাকাইতেন। ইহার পর বলিলেন, নক্ষত্ররাজি আকাশের রক্ষাকবচ। যখন নক্ষত্রসমূহ ধ্বংস হইয়া যাইবে তখন আকাশের ব্যাপারে কুরআন মজীদে যাহা ঘোষণা করা হইয়াছে তাহা সংঘটিত হইতে থাকিবে। আমি আমার সাহাবীদের জন্য রক্ষাকবচ। যখন আমি বিদায় লইব তখন আমার সাহাবীদের উপর ঐ সমস্ত বিপদ-আপদ আসিতে থাকিবে যাহার অঙ্গীকার করা হইয়াছে। আর আমার সাহাবীগণ আমার উম্মতের জন্য রক্ষাকবচ। যখন তাহারা চলিয়া যাইবে তখন আমার উম্মতের মধ্যে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটিবে যাহা তাহাদের ব্যাপারে অঙ্গীকার করা হইয়াছে (শারহুন--নাবাবী, মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ৮৩; মুসলিম, হাদীছ নং ২৫৩১)।

হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবনুল আস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে "সালাতুল কুসূফ"- এর আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন নাই, আমি তাহাদের মধ্যে জীবিত থাকা অবস্থায় আপনি তাহাদের শাস্তি দিবেন না? আপনি কি এই ওয়াদা করেন নাই, তাহারা ক্ষমা প্রার্থনারত থাকিলে আপনি তাহাদের শাস্তি দিবেন না [আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১১৯; নাসাঈ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৮-১৪৯; নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন। সহীহ সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১০৫৫; নাসাঈ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৮৩; মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৯; আহমাদ শাকির-এর মতে হাদীছটি সহীহ। অপর এক বর্ণনায়ও অনুরূপ কথা উল্লেখ রহিয়াছে। ইব্‌ন আবূ হাতিম ও ইন জারীর হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাফসীর ইবন জারীর, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৫৪; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩১৭]।

হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের আমান ও নিরাপত্তার জন্য দুইটি ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। যতদিন পর্যন্ত তাহা তোমাদের মধ্যে থাকিবে তোমরা আযাব হইতে নিরাপদ থাকিবে। একটি আল্লাহ তা'আলা উঠাইয়া নিয়াছেন এবং অপরটি বাকী রহিয়াছে। তাহা হইল আল্লাহর বাণী: وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبُهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ছয়) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন ও সত্তার শপথ গ্রহণ

📄 (ছয়) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন ও সত্তার শপথ গ্রহণ


আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বক্তব্যকে সুদৃঢ় করার জন্য সৃষ্টির বহু কিছুর শপথ করিয়াছেন [আল্লাহর জন্য সৃষ্টির শপথ করা জায়েয। কিন্তু কোন সৃষ্টির জন্য আল্লাহ্র যাত (সত্তা) ও সিফাত (গুণাবলী) ব্যতীত অন্য কিছুর শপথ করা জায়েয নয়। এই ব্যাপারে বহু দলীল-প্রমাণ রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন: কেহ যদি শপথ করে তবে সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা নীরব থাকে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১১ খণ্ড, হাদীছ নং ৬৬৪৬; মুসলিম, ৩য় খণ্ড, হাদীছ নং ১৬৪৬)। হাফিয ইব্‌ন হাজার (র) বলেন, আলিমগণ বলিয়াছেন, গায়রুল্লাহ্র নামে শপথ করা নিষিদ্ধ হওয়ার পিছনে রহস্য হইল, কোন বস্তুর নামে শপথ করা হইলে ইহাতে উহাকে সম্মান করা হয়। আর সম্মান তো একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস (দ্র. ফাতহুল বারী, ১১খ., পৃ. ৫৪০)। ইহাতে তাঁহার কামাল বা পূর্ণতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পাইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা চন্দ্র, সূর্য, ভোরবেলা, আকাশ ইত্যাদির শপথ করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া কোন মানুষের নামে আল্লাহ তা'আলা শপথ করেন নাই। মহান আল্লাহ বলেন : لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. "তোমার জীবনের শপথ! উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়া আছে” (১৫ : ৭২)।

ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, মুহাম্মাদ (স)-এর তুলনায় অধিক সম্মানিত কোন মাখলুক আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেন নাই। আর তিনি ছাড়া কোন মানুষের জীবনের শপথ করিতে আমি আল্লাহ তা'আলাকে শুনি নাই অর্থাৎ পাই নাই। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জীবনের শপথ করিয়া বলেন : لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. "তোমার জীবনের শপথ উহারা তো মত্ততায় বিমূঢ় হইয়া আছে" (১৫ : ৭২)। ইহার মর্ম এই যে, আপনার জীবন, আপনার বয়স এবং দুনিয়ায় আপনার অবস্থান ইত্যাদির শপথ (তাফসীর ইবন জারীর, ১৪ খ., পৃ. ৩০; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৭৫ দ্র.)।

শায়খ ইব্‌ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জীবনের কসম করিয়া বলিয়াছেন: لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ. উল্লেখ্য যে, এই শপথের দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শপথকারীর নিকট যাঁহার জীবনের শপথ করা হয় তিনি মহা সম্মানিত। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের শপথ করাই অধিক বাঞ্ছনীয়। কেননা তাঁহার জীবনের মধ্যে ব্যাপক বা সাধারণ ও বিশেষ উভয় প্রকারের বরকত নিহিত আছে যাহা অন্যদের মধ্যে অনুপস্থিত (বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৭ দ্র.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (সাত) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন

📄 (সাত) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন


আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে তাঁহাকে কুরআন মজীদে নবী-রাসূল বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, তাঁহার নাম ধরিয়া সম্বোধন করেন নাই (আল-ওয়াফা বি-আহ্ওয়ালিল মুসতাফা, পৃ. ৩৬২, ৩৬৩; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩২৪; বিদায়াতুস সুউল, পৃ. ৩৭-৩৮)। পক্ষান্তরে অন্যান্য নবী-রাসূলকে তাঁহাদের নাম ধরিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন : يَأَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ. ৪৩১ "হে রাসূল! তোমাকে যেন দুঃখ না দেয় যাহারা কুফরীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়" (৫:৪১)।

মহান আল্লাহ আরও বলেন: يأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ. "হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহা প্রচার কর” (৫:৬৭)।

يأَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللَّهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ. “হে নবী! তোমার জন্য ও তোমার অনুসারী মু'মিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট” (৮: ৬৪)। পক্ষান্তরে আল্লাহ অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ব্যাপারে বলিয়াছেন:

"হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর" (২: ৩৫)। "হে নূহ্! অবতরণ কর শান্তি ও কল্যাণসহ” (১১:৪৮)। "হে-মূসা! আমি তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি" (৭:১৪৪) • আরও বলা হইয়াছে:

يادَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ.

يَا نُوحُ اهْبِطَ بِسَلَم

يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ.

يا بْرِهِيمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا . "হে ইব্রাহীম! 'তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করিলে" (৩৭: ১০৪-১০৫)।

يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ. "হে মারইয়াম-তনয় 'ঈসা! তোমার প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর" (৫: ১১০) ইহা ছাড়া আরও বহু আয়াতে এরূপ উল্লেখ রহিয়াছে।

শায়খ ইব্‌ন আবদুস সালাম (র) বলেন, এই কথা সকলের নিকটই স্পষ্ট যে, মনিব যদি তাহার কোন গোলামকে বিশেষ বিশেষণে সম্বোধন করে এবং অন্যদেরকে নাম ধরিয়া সম্বোধন করে তবে ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, যাহাকে বিশেষ বিশেষণে সম্বোধন করা হইয়াছে, তিনি অন্যদের তুলনায় তাহার নিকট অধিক সম্মানিত (দ্র. বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৩৮)।

আল্লামা ইবনুল জাওযী (র) বলেন, পরিচিতির জন্য যেখানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নাম উল্লেখ করা হইয়াছে, সেখানে ‘রাসূল’ শব্দটিও যোগ করা হইয়াছে (আল-ওয়াফা, পৃ. ৩৬৩)। যেমন মহান আল্লাহ বলেন : وَمَا مُحَمَّدٌ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ. "মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র; তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে” (৩: ১৪৪)।

مُحَمَّدٌ رَسُولُ الله. “মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল” (৪৮: ২৯)।

وَآمَنُوا بِمَا نُزِّلَ عَلَى مُحَمَّدٍ. “এবং যাহারা ঈমান আনে মুহাম্মাদের প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে তাহাতে” (৪৭ঃ ২)।

উল্লেখ্য যে, কুরআন মজীদের যে স্থানে ইব্রাহীম (আ)-এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা উল্লেখ করা হইয়াছে সেখানে ইব্রাহীম (আ)-কে তাঁহার নাম সহকারে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাঁহার উপাধিতে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন আল্লাহর বাণী : إِنَّ أولَى النَّاسِ بِابْراهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهُذَا النَّبِيُّ. “নিশ্চয় মানুষের মধ্যে তাহারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম যাহারা তাহার অনুসরণ করিয়াছে এবং এই নবীরও” (৩:৬৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (আট) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নাম ধরিয়া ডাকা নিষেধ

📄 (আট) রাসূলুল্লাহ (স)-কে নাম ধরিয়া ডাকা নিষেধ


রাসূলুল্লাহ (স)-কে কিভাবে সম্বোধন করিতে হইবে এবং তাঁহার সহিত কিভাবে কথা বলিতে হইবে এই বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার মু’মিন বান্দাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়াছেন। উদ্দেশ্য হইল, তাঁহার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদেরকে আদেশ করিয়াছেন, তোমরা তাঁহাকে নাম ধরিয়া ডাকিবে না, বরং তাঁহাকে “হে নবী বা হে রাসূল” বলিয়া সম্বোধন করিবে (আল-ওয়াফা, ২ খ., পৃ. ৭-৮; আল-খাসাইস, ২খ., পৃ. ৩২৪)।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেব লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা’আলা যেহেতু কুরআন মজীদে তাঁহাকে নবী ও রাসূল বলিয়া সম্বোধন করিয়াছেন, সেহেতু ঈমানদার লোকদের জন্য অপরিহার্য হইল তাঁহাকে এভাবেই সম্বোধন করা। ডাকার এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (স)-এরই একমাত্র বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য নবী-রাসূলের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। কেননা তাঁহাদেরকে তাঁহাদের উম্মতগণ নাম ধরিয়াও ডাকিত। মহান আল্লাহ বলেন : لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُول بَيْنَكُمْ كَدُعَاء بَعْضُكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذَا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُوْنَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. "রাসূলের আহ্বানকে তোমরা তোমাদের পরস্পরের প্রতি আহ্বানের মত গণ্য করিও না। তোমাদের মধ্যে যাহারা অলক্ষ্যে সরিয়া পড়ে আল্লাহ তো তাহাদেরকে জানেন। সুতরাং যাহারা তাঁহার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তাহারা সতর্ক হউক যে, বিপর্যয় তাহাদের উপর আপতিত হইবে অথবা আপতিত হইবে তাহাদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি” (২৪:৬৩)।

ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ ও সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (র) প্রমুখ বলেন, প্রথমে লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হে মুহাম্মাদ! হে আবুল কাসিম! বলিয়া সম্বোধন করিত। পরে নবী কারীম (স)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা'আলা এভাবে ডাকিতে তাহাদের নিষেধ করেন এবং হে আল্লাহ্ নবী! হে আল্লাহর রাসূল! বলিয়া ডাকিতে হুকুম করেন, (দ্র. তাফসীরে ইবন জারীর, ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।

কাতাদা (র) উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা নবী কারীম (স)-কে তা'যীম করা এবং তাঁহার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার আদেশ দিয়াছেন এবং তাঁহাকে নেতা হিসাবে বরণ করারও হুকুম দিয়াছেন, (দ্র. তাফসীর ইন জারীর ১৮ খ., পৃ. ১৩৪; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ৩১৮)।

পূর্ববর্তী নবীগণের উম্মতগণের সম্বোধনের ভাষা ইহার ব্যতিক্রম। তাহারা যে ভাষায় তাহাদের নবীকে সম্বোধন করিয়াছে তাহা উল্লেখপূর্বক বলা হইয়াছে: قَالُوا يَا مُوسَى ادْعُ لَنَا رَبَّكَ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর" (৭:১৩৪)।

قَالُوا يَمُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ أَلِهَةٌ. "তাহারা বলিল, হে মূসা! তাহাদের দেবতার ন্যায় আমাদের জন্যও এক দেবতা গড়িয়া দাও” (৭ঃ ১৩৮)।

إِذْ قَالَ الْحَوَارِثُونَ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَنْ يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ قَالَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ. "স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলিয়াছিল, হে মারইয়াম-তনয় 'ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করিতে সক্ষম? সে বলিয়াছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মু'মিন হও” (৫: ১১২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00