📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (তিন) খতমে নবৃওয়াত

📄 (তিন) খতমে নবৃওয়াত


আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দাদের প্রতি যেসব অনুগ্রহ করিয়াছেন ইহার অন্যতম হইল হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাহাদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বিশেষ সম্মান হইল, তিনি তাঁহার মাধ্যমে নবুওয়াত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত করিয়াছেন এবং তাঁহার মাধ্যমেই তিনি দীন ইসলামের পূর্ণতা বিধান করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন মজীদে এবং রাসূলুল্লাহ্ (স) হাদীছ শরীফে পরিষ্কারভাবে এই কথা জানাইয়া দিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পর নূতনভাবে আর কোন নবী বা রাসূল এই পৃথিবীতে আসিবেন না যাহাতে মানুষ একথা বুঝিতে পারে যে, তাঁহার পর যদি কেহ নবুওয়াতের দাবি করে তবে সে মিথ্যাবাদী, প্রতারক এবং দাজ্জাল। খতমে নবুওয়াত তথা নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا . "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নহে; বরং সে আল্লাহ্র রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ” (৩৩:৪০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খতমে নবৃওয়াত সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য

📄 খতমে নবৃওয়াত সম্পর্কে হাদীছের ভাষ্য


এই সম্বন্ধে হাদীছেও বিশদ বিবরণ বিদ্যমান রহিয়াছে। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে, বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, পূর্ববর্তী নবীগণের সহিত আমার দৃষ্টান্ত এরূপ— যেমন এক ব্যক্তি একটি বালাখানা তৈরি করিয়াছে এবং সে উহা খুব সুন্দর ও মনোরম করিয়া তৈরি করিয়াছে কিন্তু একটি ইটের জায়গা শূন্য রাখিয়া দিয়াছে। লোকজন ইহার চতুর্দিকে ঘুরিয়া ইহার সৌন্দর্য অবলোকন করিয়া এবং আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিয়াছে, এই একটি ইট কেন সংযোজন করা হইল না (তাহা হইলে তো নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হইত)? আমিই শূন্যস্থানের সেই ইট এবং আমি খাতামুন্নাবিয়্যীন। অর্থাৎ নবৃওয়াতের ইমারত আমার দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করিয়াছে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., হাদীছ নং ৩৫৩৫, মুসলিম, হাদীছ নং ২২৮৬)।

মুসলিম শরীফে হাদীছটি এইভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে, আমিই সেই ইটের জায়গাটি। আমি আবির্ভূত হইয়া নবৃওয়াতের সিলসিলার পরিসমাপ্তি ঘটাইয়াছি (মুসলিম, হাদীছ নং ৫২৩)। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর সামনে বান্দার উপস্থিত হওয়া এবং মানুষের ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া নবীগণের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করার ঘটনা বর্ণনা প্রসংঙ্গে বলিয়াছেন, আমি আদম সন্তানের নেতা। তাহার পর হযরত ঈসা (আ) বলিবেন, তোমরা আমি ছাড়া অন্য কাহারও কাছে যাও। তোমরা হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর কাছে যাও। তখন মানুষ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিবে এবং বলিবেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আখিরী নবী (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮খ., হাদীছ নং ৪৭১২; মুসলিম, হাদীছ ১৯৪)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, ছয়টি বিষয়ের দ্বারা আমাকে অন্যান্য নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে: আমাকে ব্যাপক অর্থবোধক কালাম দান করা হইয়াছে, রু'ব (ব্যক্তিত্বের প্রভাব বা ভীতি দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে, গনীমতের মাল আমার জন্য হালাল করা হইয়াছে, আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রতা অর্জনের বস্তু বানানো হইয়াছে এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রতি আমি রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। আর আমার দ্বারা নবৃওয়াতের সিলসিলা সমাপ্ত করা হইয়াছে (মুসলিম, হাদীছ নং ৫২৩)।

হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, নবুওয়াত ও রিসালাতের সিলসিলা শেষ হইয়া গিয়াছে। সুতরাং আমার পর আর কোন নবী-রাসূল আসিবেন না। কথাটি সাহাবীগণের নিকট জটিল মনে হইলে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, উহার সুসংবাদ বাকী রহিয়া গিয়াছে। এই কথায় সাহাবীগণ বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সুসংবাদ কি? তিনি বলিলেন, তাহা হইল, মুসলিম ব্যক্তির স্বপ্ন নবৃওয়াতের অংশসমূহের একটি বিশেষ অংশ [তিরমিযী, হাদীছ নং ২২৭২; তাঁহার মতে হাদীছটি হাসান, মুসনাদে ইমাম আহমাদ, ৩খ., পৃ. ২৬৭; মুসতাদরাক হাকেম, ৪খ., পৃ. ৩৯১; তিনি বলেন, হাদীছটি ইমাম মুসলিম (র)-এর সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। তবে ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীছটি বর্ণনা করেন নাই। ইমাম যাহাবীও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। নাসিরুদ্দীন আলবানীও হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন; সহীহুল জামে, হাদীছ নং ১১২৭ দ্রষ্টব্য। মূল হাদীছটি বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত রহিয়াছে।।

মুহাম্মাদ ইব্‌ন জুবায়র ইবন মুত'ইম তাঁহার পিতা জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা) হইতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী কারীম (স) বলেন, আমার অনেকগুলি নাম রহিয়াছে। আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি মাহী, আমার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা কুফরকে ধ্বংস করিয়াছেন; আমি হাশির, সমস্ত মানুষ আমার পদতলে একত্র হইবে এবং আমি আকিব; আমার পর এই পৃথিবীতে আর কেহ নবী হিসাবে আসিবে না (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., হাদীছ নং ৩৪৫৫; মুসলিম, হাদীছ নং ১৮৪২)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আম্বিয়ায়ে কিরামই বনী ইসরাঈলের নেতৃত্ব দিতেন। যখনই কোন নবী ইনতিকাল করিতেন তখনই পরবর্তী নবী তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইতেন। কিন্তু আমার পর আর কোন নূতন নবী আসিবে না (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৬খ., হাদীছ নং ৩৪৫৫; মুসলিম, হাদীছ নং ১৮৪২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (চার) বিশ্বজগতের জন্য রহমত

📄 (চার) বিশ্বজগতের জন্য রহমত


আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ এ পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন। মু'মিন-কাফির, জিন-ইনসান সকলের জন্য তিনি রহমত (বিদায়াতুল সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৬৫, ৫৬; খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩২২)। বিশেষভাবে তিনি মু'মিনদের প্রতি দয়াময় ও পরম দয়ালু। যে ব্যাক্তি এই রহমত গ্রহণ করিয়া ইহার শোকর আদায় করিবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যবান হইবে। আর যে তাহা প্রত্যাখ্যান করিবে ও অস্বীকার করিবে সে উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতে ইহার প্রতি সমর্থন রহিয়াছে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ بَدَّلُوا نِعْمَتَ اللهِ كُفْرًا وَأَحَلُّوا قَوْمَهُمْ دَارَ الْبَوَارِ جَهَنَّمَ يَصْلُونَهَا وَبِئْسَ الْقَرَارُ. "তুমি কি উহাদেরকে লক্ষ্য কর না যাহারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং উহারা উহাদের সম্প্রদায়কে নামাইয়া আনে ধ্বংসের ক্ষেত্রে জাহান্নামে, যাহার মধ্যে উহারা প্রবেশ করিবে! কত নিকৃষ্ট এই আবাসস্থল” (১৪: ২৮-২৯)।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত উমার ও ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, এখানে نِعْمَةَ বলিয়া মুহাম্মাদ (স) এবং الَّذِينَ بَدَّلُوا দ্বারা কাফির সম্প্রদায়কে বুঝানো হইয়াছে (তাফসীরে ইব্‌ন জারীর, ১৩খ., পৃ. ১৪৫-১৪৭; তাফসীরে বাগাবী, ৩খ., পৃ. ৩৫; শামাইলে ইব্‌ন কাছীর, পৃ. ৫৫৯)।

وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعُلَمِينَ. "আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করিয়াছি" (২১:১০৭)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলা হইল, হে আল্লাহ্র রাসূল! মুশরিকদের জন্য বদদু'আ করুন। তিনি বলিলেন, আমি অভিশাপকারী হিসাবে প্রেরিত হই নাই। আমি তো রহমতস্বরূপ প্রেরিত হইয়াছি (মুসলিম, হাদীছ নং ২৫৯৯)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে আরও বর্ণিত রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ হে লোকসকল! আমি রহমতস্বরূপ প্রেরিত হইয়াছি (মুসতাদরাক হাকেম, ১খ., পৃ. ৩৫)। ইমাম হাকেম (র)-এর মতে হাদীছটি বুখারী ও মুসলিম-এর শর্তে উত্তীর্ণ। আল্লামা যাহাবী (র)ও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছেন। হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি বাযযার ও তাবারানী সাগীর ও আওসাতে উদ্ধৃত করিয়াছেন। বাযযার-এর রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। প্রকৃতপক্ষে হাদীছের শব্দমালা انما بعثت رحمة مهداة يا ايها الناس انما انا رحمة (যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৫৭ দ্র.)।

হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) নিজে আমাদের সামনে তাঁহার কতিপয় নাম উল্লেখ করিলেন। তিনি বলেন, আমি আহমাদ, আখিরী নবী, হাশির, নবীয্যুত তাওবা ও নবীয্যুর রহমত (মুসলিম, হাদীছ নং ২৩৫৫)।

হযরত সালমান (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, রাগান্বিত হইয়া আমি হয়ত আমার উম্মতের কাহাকেও গালি দেই বা কাহারও প্রতি অভিসম্পাত করি (তাহা হইতে পারে)। কেননা আমি আদম সন্তান। তাহারা যেমন রাগান্বিত হয় আমিও তদ্রূপ রাগান্বিত হই। বস্তুত আমি জগতসমূহের জন্য রহমত হিসাবে প্রেরিত হইয়াছি। সুতরাং হে আল্লাহ্! আপনি এই গালি বা অভিশাপকে কিয়ামতের দিন তাহাদের জন্য রহমতে পরিণত করিয়া দিন (আবু দাউদ, হাদীছ নং ৪৬৫৯; মুসনাদে আহমাদ, ৫খ., পৃ. ৪৩৭; মূল হাদীছটি মুসলিম শরীফে উদ্বৃত হইয়াছে, নং ২৬০১)।

হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) আল্লাহ্ বাণী: وَمَا أَرْسَلْتُكَ الْأَرَحْمَةً لِلْعُلَمِينَ. "আমি তো তোমাকে জগতসমূহের জন্য কেবল রহমতস্বরূপই প্রেরণ করিয়াছি" -এর ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত মুহাম্মাদ (স) সমস্ত মানুষের জন্য রহমত। যে তাঁহার অনুসরণ ও অনুকরণ করিবে তাহার জন্য তিনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে রহমত হইবেন। আর যে তাঁহার অনুসরণ করে না তাহাকে নবী (স)-এর উসিলায় ভূমি ধ্বসে যাওয়া, আকৃতি বিকৃত হওয়া ও প্রস্তর বর্ষণ ইত্যাদি বিপদ, যাহাতে পূর্ববর্তী উম্মতরা আক্রান্ত হইয়াছে, তাহা হইতে মুক্তি দেওয়া হইবে। ইব্‌ন জারীর ও ইব্‌ন আবু হাতিম (র) হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন (তাফসীরে ইবন জারীর, ১৭খ., পৃ. ৮৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১১খণ্ড, পৃ. ৩৫০; তাফসীরে ইবন কাছীর, ৩খ., পৃ.২১১-২১২)।

কোন কোন ব্যাখ্যাকার وَمَا أَرْسَلْتُكَ الْأَرَحْمَةً لِّلْعُلَمِينَ -এর ব্যাখ্যায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সমস্ত সৃষ্টির জন্য রহমত। মু'মিনদের জন্য হিদায়াতের বাণী প্রচার করার ভিত্তিতে, মুনাফিকদের জন্য মৃত্যুদণ্ড হইতে নিরাপত্তা দানের ভিত্তিতে এবং কাফিরদের জন্য আযাব বিলম্বিত করার ভিত্তিতে তিনি রহমত (শিফা, কাযী ইয়ায, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৭)। অবশ্য তিনি মু'মিনদের জন্য বিশেষভাবে রহমতস্বরূপ প্রেরিত হইয়াছেন। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ. "অবশ্যই তোমাদের মধ্য হইতেই তোমাদের নিকট এক রাসূল আসিয়াছে। তোমাদেরকে যাহা বিপন্ন করে উহা তাহার জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মংগলকামী, মু'মিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু" (৯:১২৮)।

وَمِنْهُمُ الَّذِينَ يُؤْذُونَ النَّبِيَّ وَيَقُولُونَ هُوَ أُذُنٌ قُلْ أَذُنُ خَيْرٍ لَكُمْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِينَ وَرَحْمَةً لِّلَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ رَسُولَ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. "এবং উহাদের মধ্যে এমনও লোক আছে যাহারা নবীকে ক্লেশ দেয় এবং বলে, সে তো কর্ণপাতকারী। বল, 'তাহার কান তোমাদের জন্য যাহা মংগল তাহাই শুনে'। সে আল্লাহে ঈমান আনে এবং মু'মিনদেরকে বিশ্বাস করে। তোমাদের মধ্যে যাহারা মু'মিন সে তাহাদের জন্য রহমত এবং যাহারা আল্লাহর রাসূলকে ক্লেশ দেয় তাহাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি” (৯:৬১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (পাঁচ) তিনি নিজ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ

📄 (পাঁচ) তিনি নিজ উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ


আল্লাহ তা'আলা প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মহাসম্মানে ভূষিত করিয়াছেন। তাঁহার অস্তিত্বকে তাঁহার উম্মতের জন্য আযাব হইতে বাঁচার রক্ষাকবচ বানাইয়াছেন (খাসাইসুল কুবরা, ২ খ., পৃ. ৩২২)। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী উম্মতদের অনেককে তাহাদের নবীর জীবদ্দশায়ই শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে। অথচ রাসূলুল্লাহ (স)-এর অস্তিত্ব তাঁহার উম্মতের জন্য ছিল রক্ষাকবচ। অনুরূপভাবে তাঁহার অস্তিত্ব তামাম ফিতনা-ফাসাদ, লড়াই, ইরতিদাদ ও মনের গরমিল ইত্যাদি সবকিছু হইতেই তাঁহার সাহাবীগণকে রক্ষা করিয়াছে। অবশ্য তাঁহার ইনতিকালের পর এই ধরনের কিছু বিষয় সংঘটিত হইয়াছে। শায়খ 'ইযয্যুদ্দীন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বৈশিষ্ট্যসমূহের অন্যতম হইল, আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছেন। এই কারণে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নাফরমান উম্মতকে সুযোগ দিয়াছেন এবং তাহাদের অস্তিত্ব বাকী রাখার লক্ষ্যে আযাব তরান্বিত করেন নাই। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী নবীগণের বিষয়টি ইহার ব্যতিক্রম। অর্থাৎ যখনই উম্মতরা তাঁহাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়াছে তখনই তাহাদেরকে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে। উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের বিবরণ কুরআন, হাদীছ এবং পূর্ববর্তী মনীষীবৃন্দের আলোচনায় উল্লেখ রহিয়াছে। বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায়ও এই কথা উক্ত হইয়াছে (বুখারী, ফাতহুল বারী, ৮ম খণ্ড, হাদীছ নং ৪৬৪৮; শব্দমালা বুখারীরই; মুসলিম, হাদীছ নং ২৭৯৬)।

হযরত আনাস (রা) বলেন, একদা আবু জাহল বলিল, হে আল্লাহ! ইহা যদি তোমার পক্ষ হইতে সত্য হয় তবে আমাদের উপর আকাশ হইতে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দাও। তখন নাযিল হইল: وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبُهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ. وَمَا لَهُمْ أَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللهُ وَهُمْ يَصُدُّوْنَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ . "আল্লাহ এমন নহেন যে, তুমি তাহাদের মধ্যে থাকিবে অথচ তিনি তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং আল্লাহ এমনও নহেন যে, তাহারা ক্ষমা প্রার্থনা করিবে অথচ তিনি তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন। এবং তাহাদের কী বা বলিবার আছে যে, আল্লাহ্ তাহাদেরকে শাস্তি দিবেন না, যখন তাহারা লোকজনকে মসজিদুল হারাম হইতে নিবৃত্ত করে? তাহারা উহার তত্ত্বাবধায়ক নহে, শুধু মুত্তাকীগণই উহার তত্ত্বাবধায়ক; কিন্তু তাহাদের অধিকাংশ ইহা অবগত নহে” (৮:৩৩-৩৪)।

হযরত আবূ মূসা (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে মাগরিবের নামায আদায় করার পর বলিলাম, আমরা যদি বসিয়া থাকিতাম তাঁহার সঙ্গে ইশার নামায আদায় করা পর্যন্ত! এই বলিয়া আমরা বসিয়া রহিলাম। এমতাবস্থায় তিনি আমাদের সামনে আসিয়া বলিলেন, তোমরা কি এখানেই ছিলে? আমরা বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার সহিত মাগরিবের নামায আদায় করিবার পর বলিলাম, ইশা পর্যন্ত আমরা এখানেই উপবিষ্ট থাকিব। একথা শুনিয়া তিনি বলিলেন, ভাল করিয়াছ অথবা বলিলেন, তোমরা ঠিক করিয়াছ। তাহার পর তিনি আকাশের দিকে মাথা উত্তোলন করিলেন। আর তিনি প্রায়ই আকাশের দিকে তাকাইতেন। ইহার পর বলিলেন, নক্ষত্ররাজি আকাশের রক্ষাকবচ। যখন নক্ষত্রসমূহ ধ্বংস হইয়া যাইবে তখন আকাশের ব্যাপারে কুরআন মজীদে যাহা ঘোষণা করা হইয়াছে তাহা সংঘটিত হইতে থাকিবে। আমি আমার সাহাবীদের জন্য রক্ষাকবচ। যখন আমি বিদায় লইব তখন আমার সাহাবীদের উপর ঐ সমস্ত বিপদ-আপদ আসিতে থাকিবে যাহার অঙ্গীকার করা হইয়াছে। আর আমার সাহাবীগণ আমার উম্মতের জন্য রক্ষাকবচ। যখন তাহারা চলিয়া যাইবে তখন আমার উম্মতের মধ্যে ঐ সমস্ত ঘটনা ঘটিবে যাহা তাহাদের ব্যাপারে অঙ্গীকার করা হইয়াছে (শারহুন--নাবাবী, মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ, ১৬তম খণ্ড, পৃ. ৮৩; মুসলিম, হাদীছ নং ২৫৩১)।

হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইবনুল আস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে "সালাতুল কুসূফ"- এর আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হে আমার প্রতিপালক! আপনি কি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন নাই, আমি তাহাদের মধ্যে জীবিত থাকা অবস্থায় আপনি তাহাদের শাস্তি দিবেন না? আপনি কি এই ওয়াদা করেন নাই, তাহারা ক্ষমা প্রার্থনারত থাকিলে আপনি তাহাদের শাস্তি দিবেন না [আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১১৯; নাসাঈ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৮-১৪৯; নাসিরুদ্দীন আলবানী হাদীছটিকে সহীহ বলিয়াছেন। সহীহ সুনানে আবূ দাউদ, হাদীছ নং ১০৫৫; নাসাঈ, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৮৩; মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫৯; আহমাদ শাকির-এর মতে হাদীছটি সহীহ। অপর এক বর্ণনায়ও অনুরূপ কথা উল্লেখ রহিয়াছে। ইব্‌ন আবূ হাতিম ও ইন জারীর হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন। তাফসীর ইবন জারীর, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৫৪; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩১৭]।

হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের আমান ও নিরাপত্তার জন্য দুইটি ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। যতদিন পর্যন্ত তাহা তোমাদের মধ্যে থাকিবে তোমরা আযাব হইতে নিরাপদ থাকিবে। একটি আল্লাহ তা'আলা উঠাইয়া নিয়াছেন এবং অপরটি বাকী রহিয়াছে। তাহা হইল আল্লাহর বাণী: وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبُهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00