📄 যেসব বৈশিষ্ট্য দুনিয়াতে কেবল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
আল্লাহ্ তা'আলা দুনিয়াতে হযরত মুহাম্মদ (স)-কে কতিপয় বৈশিষ্ট্য দ্বারা অভিষিক্ত করিয়াছেন- যাহা অন্য কোন নবী-রাসূলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নিম্নে তাহা প্রদত্ত হইল:
📄 (এক) নবী-রাসূলগণের নিকট হইতে অঙ্গীকার গ্রহণ
আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম (আ) হইতে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত যত নবী-রাসূল এই পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন তাহাদের সকলের নিকট হইতেই তিনি এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছেন: তোমাদের কাহারও যমানায় যদি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব হয় তবে অবশ্যই তোমরা তাঁহার উপর ঈমান আনিবে এবং তাঁহাকে সাহায্য-সহযোগিতা করিবে, নিজেদের ইলম ও নবুওয়াতের কারণে তাঁহার আনুগত্য ও সাহায্য করা হইতে বিরত থাকিবে না। এমনিভাবে আল্লাহ্ তা'আলা নবী-রাসূলগণকে তাহাদের নিজ নিজ উম্মত হইতেও অনুরূপ অঙ্গীকার গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়াছিলেন (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৩৮৬; (আল-ওয়াফা বি আহওয়ালিল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৬; শামাইলুর রাসূল, পৃ. ৫৪৫; খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৬)। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِّنْ كتب وحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَ كُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لَّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرَنَّهُ قَالَ أَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ اِصْرِي قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِّنَ الشَّهِدِينَ. "স্মরণ কর, যখন আল্লাহ্ নবীদের অংগীকার লইয়াছিলেন, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যাহা কিছু দিয়াছি অতঃপর তোমাদের কাছে যাহা আছে তাহার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসিবে তখন তোমরা অবশ্যই তাহার প্রতি ঈমান আনিবে এবং তাহাকে সাহায্য করিবে। তিনি বলিলেন, তোমরা কি স্বীকার করিলে? এবং এই সম্পর্কে আমার অংগীকার কি তোমরা গ্রহণ করিলে? তাহারা বলিল, আমরা স্বীকার করিলাম। তিনি বলিলেন, তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সহিত সাক্ষী রহিলাম” (৩ঃ ৮১)।
হযরত আলী ও ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত নবী-রাসূল হইতেই এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করিয়াছেন যে, তাঁহার জীবদ্দশায় যদি আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মাদ (স)-কে প্রেরণ করেন তবে অবশ্যই যেন তিনি তাঁহার উপর ঈমান আনেন এবং তাঁহাকে সাহায্য করেন। তিনি নবী-রাসূলগণকে এই মর্মেও হুকুম দিয়াছেন যে, তাঁহারা যেন নিজ নিজ উম্মত হইতেও অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, যদি তাহাদের জীবদ্দশায় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব হয় তবে তাহারা তাঁহার উপর ঈমান আনিবে এবং তাঁহাকে সাহায্য করিবে। একাধিক তাফসীর বিশারদ হইতে এই ব্যাখ্যা উদ্বৃত রহিয়াছে (তাফসীর ইবন জারীর তাবারী, ২খ., পৃ. ২৩৬; তাফসীর ইব্ন কাছীর ১খ., পৃষ্ঠা ৩৮৬; তাফসীর বাগাবী, ১খ., পৃ. ৩২২)।
হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন, একদা হযরত উমর (রা) তাওরাতের একটি পৃষ্ঠা হইতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সামনে পাঠ করেন। ইহাতে রাসূলুল্লাহ্ (স) অসন্তুষ্ট হইয়া বলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি উদ্ভ্রান্ত হইয়া গিয়াছ? যাঁহার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তাঁহার শপথ! আমি তোমাদের নিকট এক স্পষ্ট দান লইয়া আসিয়াছি। তোমরা যদি তাহাদেরকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর এবং তাহারা তোমাদেরকে যথার্থ সংবাদ প্রদান করে তাহা হইলে এই কারণে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হইবে। আর যদি তাহারা তোমাদেরকে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে তবে তোমাদেরকে সত্যবাদী বলিয়া জ্ঞান করা হইবে। আল্লাহ্র শপথ! হযরত মূসা (আ) জীবিত থাকিলে তাঁহার জন্যও আমার অনুসরণ ব্যতীত গত্যন্তর ছিল না (মুসনাদ আহমাদ ৩খ., পৃ. ৩৮৭; দারিমী, মুকাদ্দিমা, বাব ৪০, নং ৪০৫১; নাসিরুদ্দীন আল-আলবানীর মতে হাদীছটি হাসান; মিশকাতুল মাসাবীহ, ১খ., পৃ. ৬৩)।
হাফিয ইব্ন কাছীর (র) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স) খাতামুল আম্বিয়া, আখিরী নবী এবং তিনি কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির জন্য নবী। তিনি ইমামে আজম— সকলের মহান ইমাম। সর্বকালের মানুষের উপর অপরিহার্য কর্তব্য হইল তাঁহার আনুগত্য করা। তিনি নবী-রাসূলগণেরও ইমাম। এই কারণেই মি'রাজ রজনীতে নবী-রাসূলগণ সকলেই বায়তুল মুকাদ্দাসে একত্র হইলে তিনি তাহাদের নামাযের ইমামতি করেন (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ৩৮৬)।
📄 (দুই) বিশ্বব্যাপী তাঁহার রিসালাত
পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ বিশেষ কওম, বিশেষ এলাকা এবং বিশেষ গোত্রের প্রতি প্রেরিত হইয়াছিলেন। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে : لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ.... "আমি তো নূহকে পাঠাইয়াছিলাম তাহার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র 'ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করিতেছি” (৭:৫৯-৬১)।
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا .... "আদ জাতির নিকট আমি উহাদের ভ্রাতা হুদকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্ 'ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তোমরা কি সাবধান হইবে না” (৭:৬৫)।
والى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ... "ছামূদ জাতির নিকট আমি তাহাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, 'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র 'ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালক হইতে স্পষ্ট নিদর্শন আসিয়াছে। আল্লাহর এই উষ্ট্রী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। অতএব তোমরা ইহাকে আল্লাহর জমিতে চরিয়া খাইতে দাও এবং ইহাকে কোন ক্লেশ দিও না, দিলে মর্মন্তুদ শাস্তি তোমাদের উপর আপতিত হইবে" (৭:৭৩)।
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ. "আর আমি লূতকেও পাঠাইয়াছিলাম। সে 'তাহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, তোমরা এমন কুকর্ম করিতেছ যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই" (৭ঃ ৮০)।
وَإِلَى مَدينَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا . "আমি মাদ্য়ানবাসীদের নিকট তাহাদের ভ্রাতা শু'আয়বকে পাঠাইয়াছিলাম। সে বলিয়াছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর 'ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ্ নাই : তোমাদের প্রতিপালক হইতে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসিয়াছে। সুতরাং তোমরা মাপ ও ওজন ঠিকভাবে দিবে, লোকদেরকে তাহাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিবে না এবং দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের পর উহাতে বিপর্যয় ঘটাইবে না। তোমরা মু'মিন হইলে তোমাদের জন্য ইহা কল্যাণকর" (৭:৮৫)।
আর আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর রিসালাত ও নবৃওয়াত হইতেছে বিশ্বব্যাপী। তথা আরব-অনারব এবং মানুষ ও জিন সকলের জন্যই তাহা সমভাবে প্রযোজ্য। ইহা তাঁহার একক বৈশিষ্ট্য। ইয়্যুদ্দীন ইব্ন আবদুস সালাম (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইল, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার পূর্ববর্তী নবীগণকে বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করিয়াছেন, আর আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তিনি প্রেরণ করিয়াছেন সমস্ত মানুষ ও জিন জাতির প্রতি। প্রত্যেক নবী তাঁহার উম্মতের নিকট ধর্ম প্রচারের ছওয়াব পাইবেন। আর আমাদের নবী কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানুষের নিকট ধর্ম প্রচারের ছওয়াব পাইবেন। উহা প্রচারের কারণেও ছওয়াব পাইবেন এবং নিজের সত্তার মর্যাদার ভিত্তিতেও ছওয়াব পাইবেন। এই কারনেই আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শনস্বরূপ বলেন : وَلَوْ شِئْنَا لَبَعَثْنَا فِي كُلِّ قَرْيَةٍ نَذِيرًا "আমি ইচ্ছা করিলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী প্রেরণ করিতে পারিতাম" (২৫:৫১)। এখানে অনুগ্রহের বিষয় এই যে, যদি আল্লাহ্ তা'আলা প্রতিটি জনপদে একজন করিয়া সতর্ককারী প্রেরণ করিতেন তাহা হইলে রাসূলুল্লাহ্ (স) যে জনপদবাসীকে সতর্ক করিয়াছেন কেবল তাহাদেরকে সতর্ক করার ছওয়াব পাইতেন (বিদায়াতুস সুউল ফী তাফদীলির রাসূল, পৃ. ৪৬-৪৭)। উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের কথা কুরআন ও হাদীছে বিশদভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ... "আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করিয়াছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না" (৩৪ঃ ২৮)। وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَلَمِينَ. "আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করিয়াছি" (২১:১০৭)। قُلْ يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا . "বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহ্র রাসূল, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি ও তাঁহার বার্তাবাহক উম্মী নবীর প্রতি— যে আল্লাহ্ ও তাঁহার বাণীতে ঈমান আনে এবং তোমরা তাহার অনুসরণ কর, যাহাতে তোমরা সঠিক পথ পাও” (৭: ১৫৮)।
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعُلَمِينَ نَذِيرًا . "কত মহান তিনি যিনি তাঁহার বান্দার প্রতি ফুরকান (আল-কুরআন) নাযিল করিয়াছেন যাহাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হইতে পারে" (২৫: ১)।
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنْصِتُوا فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَى قَوْمِهِمْ مُنْذِرِينَ. "স্মরণ কর, আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলাম একদল জিন্নকে, যাহারা কুরআন পাঠ শুনিতেছিল। যখন উহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইল, তখন বলিল, তোমরা চুপ করিয়া শ্রবণ কর। যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হইল তখন উহারা উহাদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া গেল সতর্ককারীরূপে” (৪৬: ২৯)।
হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। নবী কারীম (স) বলেন: আমাকে এমন পাঁচটি জিনিস দেওয়া হইয়াছে যাহা আমার পূর্ববর্তী কাহাকেও দেওয়া হয় নাই: (১) এক মাসের পথ পর্যন্ত আমার প্রভাব দ্বারা আমাকে সাহায্য করা হইয়াছে। (২) যমীনকে আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্র করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং আমার উম্মতের যেখানেই নামাযের সময় হইবে সেখানেই যেন নামায আদায় করিয়া নেয়। (৩) আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হইয়াছে, আমার পূর্বে কাহারও জন্য তাহা হালাল ছিল না। (৪) আমাকে শাফা'আতের অধিকার প্রদান করা হইয়াছে। (৫) পূর্ববর্তী নবীগণকে বিশেষ সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করা হইত। আর আমি জগৎসমূহের জন্য প্রেরিত হইয়াছি (বুখারী, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ৫৫৩; মুসলিম, মাসাজিদ, বাব ১, নং ১১৬৩/৩/৫২১)। অপর এক বর্ণনায় রহিয়াছে, পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হইতেন। আর আমি লাল-কালো সকল মানুষের প্রতি প্রেরিত হইয়াছি (মুসলিম, নং ৫২১)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, যেই সত্তার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তাঁহার কসম! এই উম্মত উম্মতে দাওয়াত বা উম্মতে ইজাবাত। যে কোন ব্যক্তি ইয়াহুদী হউক কিংবা খৃস্টান; আমার আগমনের কথা শুনার পর যদি আমি যে দীন নিয়া প্রেরিত হইয়াছি ইহার উপর ঈমান না আনিয়া মারা যায় তবে সে জাহান্নামী হইবে (মুসলিম, ঈমান, বাব ৭০, মং ৩৮৬/২৪০/১৫৩)।
ইব্ন আব্বাস (রা) বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে নবী-রাসূল এবং আকাশবাসী সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। এই কথা শুনিয়া উপস্থিত সকলে বলিলেন, হে ইব্ন আব্বাস! কেমন করিয়া এবং কোন দলীলের ভিত্তিতে তাঁহাকে আকাশবাসীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হইয়াছে? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আকাশবাসীদের উদ্দেশ্যে বলিয়াছেন: وَمَنْ يَقُلْ مِّنْهُمْ إِنِّي إِلهُ مِّنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيْهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّلِمِينَ. "তাহাদের মধ্যে যে বলিবে, 'আমিই ইলাহ্ তিনি ব্যতীত, তাহাকে আমি প্রতিফল দিব জাহান্নাম; এইভাবেই আমি যালিমদেরকে শাস্তি দিয়া থাকি" (২১ : ২৯)।
তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সম্বোধন করিয়া বলেন: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِّنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ. "নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে দিয়াছি সুস্পষ্ট বিজয়, যেন আল্লাহ্ তোমার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁহার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন" (৪৮ : ১-২)।
তাহার পর উপস্থিত লোকজন পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, নবী-রাসূলগণের উপর তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব কেমন করিয়া? জবাবে তিনি বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন মজীদে বলিয়াছেন: وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ. "আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাহার স্বজাতির ভাষাভাষী করিয়া পাঠাইয়াছি তাহাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করিবার জন্য" (১৪ : ৪)।
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ الأَ كَافَّةً لِّلنَّاسِ. "আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করিয়াছি” (৩৪ : ২৮)।
অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সমস্ত জিন ও ইনসানের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছেন (মুসনাদে দারিমী, ১খ., পৃ. ২৯-৩০; হাদীছ নং ৪৭; ইব্ন আবূ হাতিম, তাফসীর ইবন কাছীর, ৩খ., পৃঃ ৫৪৭; হাফিয হায়ছামী (র) বলেন, হাদীছটি ইমাম তাবারানী বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহার রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। তবে হাকাম ইব্ন আবান ইহার ব্যতিক্রম। অবশ্য তিনিও নির্ভরযোগ্য। আবূ ইয়ালাও হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন; মাজামাউয যাওয়াঈদ, ৮খ., পৃ. ২৫৫)।
📄 (তিন) খতমে নবৃওয়াত
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার বান্দাদের প্রতি যেসব অনুগ্রহ করিয়াছেন ইহার অন্যতম হইল হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাহাদের প্রতি রাসূল হিসাবে প্রেরণ করিয়াছেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বিশেষ সম্মান হইল, তিনি তাঁহার মাধ্যমে নবুওয়াত ও রিসালাতের ধারা সমাপ্ত করিয়াছেন এবং তাঁহার মাধ্যমেই তিনি দীন ইসলামের পূর্ণতা বিধান করিয়াছেন। আল্লাহ্ তা'আলা কুরআন মজীদে এবং রাসূলুল্লাহ্ (স) হাদীছ শরীফে পরিষ্কারভাবে এই কথা জানাইয়া দিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পর নূতনভাবে আর কোন নবী বা রাসূল এই পৃথিবীতে আসিবেন না যাহাতে মানুষ একথা বুঝিতে পারে যে, তাঁহার পর যদি কেহ নবুওয়াতের দাবি করে তবে সে মিথ্যাবাদী, প্রতারক এবং দাজ্জাল। খতমে নবুওয়াত তথা নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّنْ رِّجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا . "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নহে; বরং সে আল্লাহ্র রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ” (৩৩:৪০)।