📄 ইহসান ও আত্মাশুদ্ধির তাৎপর্য ও গুরুত্ব
ইহসান (احسان) শব্দটি আরবী। ইহার আভিধানিক অর্থ নেক কাজ করা, সদাচার করা, কোন কাজ যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়া ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় ইহসান হইল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উত্তমরূপে ইবাদত করা এবং তাঁহার সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, মহান রাব্বুল 'আলামীনের প্রতি এবং তাঁহার সৃষ্টির প্রতি যাবতীয় কর্তব্য সুন্দর ও উত্তমরূপে সম্পাদন করাই হইল ইহসান। কুরআন মজীদের, একাধিক আয়াতে ইহসানের বিষয়টি বিবৃত হইয়াছে। মহান রাব্বুল 'আলামীন ইরশাদ করেন: وَأَحْسَنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ. "তোমরা সৎকাজ কর, আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণ লোককে ভালবাসেন” (২: ১৯৫)।
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِنْدَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ. “হাঁ, যে কেহ আল্লাহ্র নিকট সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে এবং সৎকর্মপরায়ণ হয় তাহার প্রতিদান তাহার প্রতিপালকের নিকট রহিয়াছে এবং তাহাদের কোন ভয় নাই ও তাহারা দুঃখিত হইবে না" (২: ১১২)।
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتْمَى وَالْمَسْكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًاً .
"তোমরা আল্লাহর ইবাদত করিবে, কোন কিছুকে তাঁহার শরীক করিবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সংগী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ পসন্দ করেন না দাম্ভিক অহংকারীকে" (৪ঃ ৩৬)।
ইহসান সম্পর্কে হাদীছেও পরিষ্কার বর্ণনা রহিয়াছে। عن ابي هريرة قال كان النبي ﷺ بارز يوما للناس فاتاه رجل فقال ما الايمان قال الايمان ان تؤمن بالله وملائكته وبلقائه ورسله وتؤمن بالبعث قال ما الاسلام قال الاسلام ان تعبد الله ولا تشرك به وتقيم الصلوة وتؤدى الزكوة المفروضة وتصوم رمضان قال ما الاحسان قال ان تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك. "হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) জনসমক্ষে বাহির হইয়া আসিলেন। এমন সময় তাঁহার কাছে একজন লোক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ঈমান কি? তিনি বলিলেন, ঈমান হইল-তুমি বিশ্বাস রাখিবে আল্লাহর উপর, তাঁহার ফেরেশতাগণের উপর, (কিয়ামতের দিন) তাঁহার সাক্ষাতের উপর এবং তাঁহার রাসূলগণের উপর। তুমি আরও বিশ্বাস রাখিবে পুনরুত্থানের উপর। লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, ইসলাম কি? তিনি বলিলেন, ইসলাম হইল, তুমি আল্লাহ্ ইবাদত করিবে এবং তাঁহার সংগে শরীক করিবে না, সালাত কায়েম করিবে, ফরয যাকাত আদায় করিবে এবং রমযানের রোযা রাখিবে। অতঃপর লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, ইহসান কি? তিনি বলিলেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করিবে যেন তুমি তাঁহাকে দেখিতেছ, যদি দেখিতে না পাও তবে তিনি তোমাকে দেখিতেছেন” (বুখারী, ১খ., পৃ. ১২)।
'আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী এবং মোল্লা আলী কারী (র) বলেন, উপরিউক্ত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (স) ইহসান তথা তাসাওউফের দুইটি স্তরের প্রতি বিশেষভাবে ইংগিত করিয়াছেন। একটি হইল মুকাশাফা ও মুশাহাদা এবং অপরটি হইল মুরাকাবা। আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উছমানী (র) فان لم تكن تراه فانه يراك এর ব্যাখ্যায় বলেন: فان لم تتصور انك تراه الذي هو مقام المشاهدة فتصور انه يراك الذي هو مقام المراقبة) "তুমি যদি ধারণা করিতে না পার যে, তুমি তাঁহাকে (আল্লাহকে) দেখিতেছ (যাহাকে মুশাহাদা বলা হয়) তবে এই ধারণা করিবে যে, তিনি (আল্লাহ) তোমাকে দেখিতেছেন (যাহাকে মুরাকাবা বলা হয়) (ফায়দুল বারী, ১খ., পৃ. ৫৩১-৫৩৪)।
কুরআন ও হাদীছের উপরিউক্ত উদ্ধৃতিসমূহ হইতে এই কথা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে ইহসানের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত ইহসান এবং আত্মশুদ্ধি হইল বিদ্যুতের পাওয়ার হাউজের মত। পাওয়ার হাউজের সহিত সংযোগ না থাকিলে যেমন বাতি জ্বলে না তেমনিভাবে আত্মশুদ্ধি ছাড়া বান্দার কোন প্রচেষ্টাই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না এবং তাহা কবুলিয়াতের মর্যাদায় উন্নীত হয় না। হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ (র) বলেন, ইহসান ও ইখলাস এমন মহাসম্পদ যে, উহা ব্যতীত ইলম ও আমল সবই গুরুত্বহীন (আকাবির কা সুলুক ও ইহসান, পৃ. ২৩)।
মোল্লা আলী (র)-এর মতে, "উপরিউক্ত হাদীছে ইহসান বলিয়া ইখলাসের কথাই বুঝানো হইয়াছে। আর এই ইখলাস হইল ঈমান ও ইসলামের বিশুদ্ধতার জন্য পূর্বশর্ত” (মিরকাত, ১খ., পৃ. ১২৪)। শায়খুল হাদীছ মাওলানা যাকারিয়া (র) বলেন, উপরিউক্ত বক্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, ইহ্সান হইল ইখলাসের সমার্থবোধক শব্দ। ইহা ছাড়া ঈমান ও ইসলাম কিছুই সহীহ হয় না। এমনকি আমলের গ্রহণযোগ্যতাও ইহারই উপর নির্ভরশীল। এই কারণেই হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র) বলিয়াছেন, ইখলাসবিহীন আমল রূহবিহীন শরীর এবং অর্থ ছাড়া শব্দের অনুরূপ (আকাবির কা ইহসান ও সুলুক, পৃ. ২৩)।
বস্তুত ইহসান ও ইখলাসের স্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যই অধ্যাত্মিকতার যাবতীয় সাধনা এবং এই ইহসানই হইল তাসাওউফের মূল হাকীকত। শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দিহলাবী (র) আশ'আতুল লুম'আত গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, হাদীছে ইহসানের কথা বলিয়া তাসাওউফের দিকেই ইংগিত করা হইয়াছে (আকাবির কা ইহসান ও সুলুক, পৃ. ২৩)।
উল্লেখ্য যে, ইহসান, আত্মশুদ্ধি এবং তাসাওউফের মূল কথা হইল, ব্যক্তিকে আখলাকে সায়্যি'আ তথা গাফলাত, খিয়ানত, জিহালাত (মূর্খতা), গীবত, নিফাক, চোগলখোরী, বদগুমানী, ধোঁকা, প্রতারণা, হিংসা, বিদ্বেষ, রাগ, ক্রোধ, অহংকার, আত্মম্ভরিতা, মিথ্যা, অকৃতজ্ঞতা, পদ ও সম্পদের মোহ, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা ইত্যাদি হইতে পরিশুদ্ধ করত আখলাকে হাসানা অর্থাৎ ইখলাস, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, সবর, শোকর, যিকির, সিদক, আদল, ইনসাফ আফউ, ক্ষমা, আমানতদারী, বিনয়, নম্রতা ও ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি দ্বারা সুশোভিত করা। বস্তুত খুলুকে 'আযীম অর্থাৎ পরিশুদ্ধ জীবনের মূর্ত প্রতীক ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। তাঁহার চারিত্রিক গুণাবলীর কথা উল্লেখ পূর্বক কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে: وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ "আর আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত” (৬৮:৪)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) নিজেও তাঁহার উত্তম চরিত্রের কথা উল্লেখ পূর্বক বলিয়াছেন: بعثت لاتمم حسن الاخلاق. "আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হইয়াছি" (মিশকাত, পৃ. ৪৩২)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) নিজে মহান চরিত্রের অধিকারী হওয়ার পাশাপাশি সাহাবায়ে কিরামকেও উক্ত চরিত্রে চরিত্রবান বানানোর লক্ষ্যে জীবনব্যাপী সাধনা করিয়াছেন। ইহা তাঁহার নবুওয়াতী মিশনের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। কুরআন মজীদে ইরশাদ হইয়াছে: لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى المُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَلٍ مُّبِيْنٍ: "আল্লাহ্ মুমিনদের প্রতি অবশ্যই অনুগ্রহ করিয়াছেন যে, তিনি তাহাদের নিজেদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন। সে তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট তিলাওয়াত করে, তাহাদেরকে পরিশোধন করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও তাহারা পূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল" (৩: ১৬৪)।
আয়াতে বর্ণিত তাযকিয়ায়ে নফস তথা চরিত্র সংশোধনের এই গুরুদায়িত্ব রাসূলুল্লাহ্ (স) অত্যন্ত দক্ষতার সহিত আঞ্জাম দেন। ফলে মারামারি, কাটাকাটি, ছিনতাই, রাহাযানী এক কালে যাহাদের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় ছিল তাঁহারাই পরবর্তী কালে এমন সোনার মানুষে পরিণত হইলেন যে, স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাদের সত্যবাদিতা, আমানতদারী, ইখলাস, লিল্লাহিয়াত ও আন্তরিকতার প্রশংসা করেন। এমনকি আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহাদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবৃওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষী হিসাবে পৃথিবীর সামনে তুলিয়া ধরিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে: مُحَمَّدٌ رَّسُولُ الله وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيْمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ. "মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল, তাহার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাহাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখিবে। তাহাদের লক্ষণ তাহাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন পরিস্ফুট থাকিবে" (৪৮:২৯)।
ইমাম কুরতুবীসহ মুফাসসিরীনে কিরাম বলেন, وَالَّذِيْنَ مَعَهُ শব্দ দুইটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, সকল সাহাবীই এই আয়াতের মর্মার্থের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ্ (স) সাহাবায়ে কিরামকে পরিশোধিত করিয়া গড়িয়া তোলার লক্ষ্যে একদিকে যেমনিভাবে তাহাদেরকে বাস্তব প্রশক্ষিণ প্রদান করিয়াছেন, তেমনিভাবে তিনি তাহাদেরকে এই ব্যাপারে বহু নীতিবাক্যও শুনাইয়াছেন, উৎসাহিত করিয়াছেন তাহাদেরকে আলখাকে হাসান! অবলম্বনের জন্য এবং জোর নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন আখলাকে সায়্যিআ বর্জনের জন্য।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে ইহসানের প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন ইহসান এবং আত্মশুদ্ধির মূর্তপ্রতীক। তিনি ছিলেন পরিশুদ্ধ জীবনের বাস্তব নমুনা। কুরআন মজীদে তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধি বলিয়া যাহা কিছুকে বুঝানো হইয়াছে ইহার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়াছিল মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বাস্তব জীবনে। কেননা কুরআনই হইল তাঁহার আখলাক। আত্মশুদ্ধির মূল কথা হইল, আখলাকে সায়্যিআ তথা মন্দ স্বভাব হইতে পরিশুদ্ধ হওয়া এবং আখলাকে হাসানা তথা সুন্দর গুণাবলীর দ্বারা ভূষিত হওয়া। এই দুইটি বিষয়কে সামনে রাখিয়া আমরা যদি কুরআন, হাদীছ এবং ইতিহাস গ্রন্থের প্রতি গভীরভাবে নযর দেই তাহা হইলে দেখিতে পাইব, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর জীবনে ইহসান ও আত্মশুদ্ধির পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটিয়াছিল। যেই গুণাবলীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি হাসিল হয় তাহা মহানবী (স)-এর মধ্যে যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল সেই সম্পর্কে কিছু আলোচনা নিম্নে পেশ করা হইল :
(এক) ইখলাস ও নিয়াতের বিশুদ্ধতা : ইখলাসের অর্থ হইল, যাবতীয় আমল একমাত্র আল্লাহর জন্যই সম্পাদন করা। তাঁহার সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে কোন কাজ না করা। রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন উসওয়াতুন হাসানা। তিনি জীবনে যত কাজ করিয়াছেন সব মহান প্রভু আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তই করিয়াছেন। নিজে ইখলাসের উপর চলার সাথে সাথে অপরকেও তিনি ইখলাসের দাওয়াত দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন : اخلص دينك يكفيك العمل القليل. "তুমি ইখলাসের সহিত আমল করিলে অল্প আমলই তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে" (মুসতাদরাক হাকেম, ৪খ., পৃ. ৩০৫)।
قال رسول الله ﷺ ان الله لا ينظر الى صوركم واموالكم ولكن ينظر الى قلوبكم واعمالكم.
"রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন : আল্লাহ্ তোমাদের রূপ-সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদের প্রতি তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের হৃদয় ও অন্তরের দিকে" (মিশকাত, পৃ. ৪৫৪)। উপরিউক্ত হাদীছ হইতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর পক্ষ হইতে ছওয়াব ও প্রতিদান দেওয়ার যে বিধান রহিয়াছে তাহা ব্যক্তির আন্তরিকতা ও নিয়াতের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল।
(দুই) আল্লাহ্র ভয়, তাঁহার আনুগত্য ও ইবাদত : রাসূলুল্লাহ্ (স) সকল মানুষ অপেক্ষা আল্লাহকে অধিক ভয় করিতেন। তিনি নামায ও ইবাদতে মশগুল থাকিতেন। সাওম পালন করিতেন। কুরআন তিলাওয়াত করিতেন এবং সদা স্বীয় প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেন। এই প্রসঙ্গে অনেক হাদীছ বর্ণিত আছে। হযরত আনাস (রা) ইহতে বর্ণিত এক হাদীছে আছে, একবার তিনজন সাহাবী নবী কারীম (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে জানার জন্য উম্মুল মু'মিনীনগণের নিকট আসিলেন। তাহাদেরকে নবী কারীম (স)-এর ইবাদত-বন্দেগী সম্পর্কে অবগত করার পর তাহারা ইহাকে সামান্য বলিয়া মনে করিলেন। তৎপর তাহারা বলিলেন, কোথায় আমরা, আর কোথায় নবী কারীম (স)! আল্লাহ্ তা'আলা তো তাঁহার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করিয়া দিয়াছেন। অতঃপর তাহাদের একজন বলিলেন, আমি সর্বদা রাতভর নামায পড়িব। দ্বিতীয়জন বলিলেন, আমি সব সময় রোযা রাখিব, কখনও রোযা ভাঙ্গিব না। তৃতীয় ব্যক্তি বলিলেন, আমি মহিলাদের হইতে বিচ্ছিন্ন থাকিব, মোটেই বিবাহ করিব না। ইহার পর নবী কারীম (স) তাহাদের নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি এমন কথা বলিয়াছ? আল্লাহ্র কসম! আমি কি তোমাদের তুলনায় সর্বাপেক্ষা আল্লাহভীরু নহি এবং আমি কি তোমাদের তুলনায় অধিক মুত্তাকী নহি? কিন্তু (এই সব কিছুর পরও) আমি রোযা রাখি এবং রোযা ভঙ্গও করি। আমি নামায পড়ি এবং (কখনও) ঘুমাইয়াও থাকি। আমি বিবাহও করি (মহিলাদের সহিত আমি সম্পর্ক ছিন্ন করিনা। ইহাই আমার নীতি ও আদর্শ)। সুতরাং যেই ব্যক্তি আমার নীতি ও আদর্শ হইতে বিমুখ হইয়া থাকিবে সে আমার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে না (মিশকাত শরীফ, ১খ., পৃ. ২৭)।
হযরত মুগীরা ইন্ন শু'বা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) এত দীর্ঘ নামায পড়িতেন যে, ইহাতে তাঁহার উভয় পা ফুলিয়া যাইত। তাঁহাকে প্রশ্ন করা হইল, আপনি এত কষ্ট করিতেছেন? অথচ আপনার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই প্রশ্ন শুনিয়া তিনি বলিলেন, আমি কি আল্লাহ্ কৃতজ্ঞ বান্দা হইব না (জামে তিরমিযী, ১খ., পৃ. ৯৪)! রাসূলুল্লাহ্ (স) ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ্র ভয় পোষণ করা এবং আল্লাহ্র ইবাদত ও আনুগত্য করার পাশাপাশি অন্যদেরকে তাকওয়া এবং ইবাদতের দাওয়াত দিয়াছেন। হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন- سمعت رسول الله ﷺ يخطب فى حجة الوداع فقال اتقوا الله وصلوا خمسكم وصوموا شهركم وادوا زكاة أموالكم واطيعوا أمراءكم تدخلوا جنة ربكم. "বিদায় হজ্জের সময় আমি রাসূলুল্লাহ্ (র)-কে এই মর্মে বক্তৃতা দিতে শুনিয়াছি, তিনি বলিয়াছেন: তোমরা আল্লাহকে ভয় করিবে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করিবে, রমযান মাসে রোযা রাখিবে, নিজেদের মালের যাকাত প্রদান করিবে এবং তোমাদের নেতৃবৃন্দের আনুগত্য করিবে। তাহা হইলে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে দাখিল হইতে পারিবে" (তিরমিযী, সূত্র রিয়াদুস সালিহীন, ১খ., পৃ. ৪৮)।
তাকওয়া ও হিদায়াতের মূর্ত প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বদা আল্লাহর নিকট তাকওয়া ও হিদায়াতের জন্য দু'আ করিতেন। হাদীছে আছে- ان النبى ﷺ كان يقول اللهم انى اسئلك الهدى والتقى والعفاف والغنى. "নবী কারীম (স) বলিতেন: "হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট হিদায়াত, তাকওয়া, সংযম, পবিত্রতা এবং মুখাপেক্ষীহীনতা কামনা করি" (সহীহ মুসলিম, সূত্র: রিয়াদুস সালিহীন, ১খ., পৃ. ৪৭)।
(তিন) তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীলতা : তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) অনুপম গুণের অধিকারী ছিলেন। এই ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন উসওয়াতুন হাসানা। রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সম্বোধন করিয়া কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ. "এবং কাজকর্মে তুমি তাহাদের সহিত পরামর্শ কর, অতঃপর তুমি কোন সংকল্প করিলে আল্লাহ্র উপর নির্ভর করিবে; যাহারা নির্ভর করে আল্লাহ্ তাহাদেরকে ভালবাসেন" (৩: ১৫৯)।
উহুদ যুদ্ধের সময় এই আয়াতের বাস্তব নমুনা আমরা দেখিতে পাই মহানবী (স)-এর মাঝে। ঐতিহাসিকগণ বলেন, যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে ডাকিলেন এবং তাহাদের নিকট পরামর্শ চাহিলেন, আমরা মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিব, নাকি বাহিরে গিয়া তাহাদের মুকাবিলা করিব? আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণের মধ্যে যাহারা প্রধান ছিলেন তাহারা মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু যেইসব নওজোয়ান সাহাবী বদরযুদ্ধে শরীক হইতে পারেন নাই তাহারা জিহাদের জযবায় উদ্বেলিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে মদীনার বাহিরে গিয়া যুদ্ধ করার জন্য পরামর্শ দিলেন। কিন্তু নবী কারীম (স)-এর ইচ্ছা ছিল মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা। পরিশেষে হযরত হামযা, হযরত সা'দ ইবন উবাদা এবং হযরত নু'মান ইবন মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা যদি মদীনার অভ্যন্তরে তাহাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলি তাহা হইলে ইসলামের দুশমনেরা আমাদেরকে কাপুরুষ বলিবে। তাহাদের বক্তব্য শোনার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) মদীনার বাহিরে যাইয়া প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার উপর ফয়সালা প্রদান করিলেন। অতঃপর আসরের নামায আদায় করত নবী কারীম (স) হুজরা মুবারকে প্রবেশ করিলেন। সাথে ছিলেন হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রা)। তিনি এখনও পর্যন্ত হুজরা মুবারক হইতে বাহির হননি। ইত্যবসরে হযরত সা'দ ইব্ন মু'আয এবং হযরত উসায়দ ইব্ন হুদায়র (রা) উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, মদীনার বাহিরে যাইয়া কাফিরদের মুকাবিলা করার ব্যাপারে তোমরা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বাধ্য করিয়াছ। অথচ তাঁহার উপর মহান আল্লাহ্ ওহী নাযিল করেন। কাজেই সমীচীন হইল বিষয়টিকে তাঁহার রায়ের উপর ছাড়িয়া দেওয়া। ইতোমধ্যে তিনি দুইটি লৌহবর্ম পরিধান করত অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হইয়া হুজরা হইতে বাহিরে চলিয়া আসিলেন। সাহাবায়ে কিরাম বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ভুলবশত আপনার মর্জির খেলাপ কাজের ব্যাপারে আমরা আপনাকে চাপ দিয়াছি, যাহা আমাদের জন্য কোনভাবেই শোভনীয় নহে। কাজেই আপনি আপনার ইচ্ছামত কাজ করুন। এই কথা শোনার পর তিনি বলিলেন, কোন নবীর জন্য জায়েয নাই হাতিয়ার পরিধান করার পর যুদ্ধ না করিয়া তাহা খুলিয়া ফেলা। তোমরা আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া চল। আমি যাহা বলি তাহা মান্য কর। আর মনে রাখিবে, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও অবিচল থাক তবে তোমরা আল্লাহর পক্ষ হইতে বিজয় ও সাহায্যপ্রাপ্ত হইবে (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ১৮৭-১৯০)।
নিজে তাওয়াক্কুল অবলম্বনের পাশাপাশি মহানবী (স) সাহাবায়ে কিরামকেও তাওয়াক্কুল অবলম্বনের দাওয়াত দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন- لو انكم تتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير تغدوا خماصا وتروح بطانا . "যদি তোমরা আল্লাহ্র উপর যথাযথভাবে নির্ভর করিতে তাহা হইলে তিনি তোমাদেরকে অনুরূপ রিযিক দান করিতেন যেইরূপ পক্ষীকুলকে রিযিক দিয়া থাকেন। তাহারা ভোরে খালি পেটে বাহির হয় এবং দিনের শেষে ভরা পেটে ফিরিয়া আসে” (তিরমিযী, ইবন মাজা, সূত্র মিশকাত শরীফ, পৃ. ৪৫২)।
লজ্জা ও সম্ভ্রম মানুষের এমন একটি স্বভাবজাত গুণ যদ্দারা বহুবিধ নৈতিক গুণাবলীর বিস্তৃতি ঘটে। লজ্জাশীলতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করত রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা (সহীহ বুখারী ও মুসলিম, সূত্র মিশকাত, পৃ. ১২)। অপর এক বর্ণনায় আছে, الحياء خير كله "লজ্জার সর্বাংশই উত্তম" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম, সূত্র মিশকাত, পৃ. ৪৩১)। লজ্জা মানুষকে সকল প্রকার অনিষ্ট হইতে রক্ষা করে। লজ্জাহীন মানুষ ভাল-মন্দ সকল কাজ নির্বিঘ্নে করিতে পারে। কোন কিছুই তাহাকে মন্দ কাজ হইতে নিবৃত্ত রাখিতে পারে না। রাসূলুল্লাহ্ (স) ইরশাদ করেন: ان مما ادرك الناس من كلام النبوة الأولى اذا لم تستحى فاصنع ماشئت. “পূর্ববর্তী নবীগণের বাণী হইতে পরবর্তী লোকেরা যাহা পাইয়াছে তাহা হইল, তোমার লজ্জা না থাকিলে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পার" (সহীহ বুখারী, সূত্র মিশকাত শরীফ, পৃ. ৪৩১)।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) বলেন, একদা নবী কারীম (স)-এক আনসারী ব্যক্তির নিকট দিয়া যাইতেছিলেন, তখন সে তাহার ভাইকে অধিক লজ্জাশীল না হওয়ার জন্য উপদেশ দিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, তাহাকে এইভাবে থাকিতে দাও। কেননা লজ্জা ঈমানের অঙ্গ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম, সূত্র মিশকাত, পৃ. ৪৩১)। তবে ইল্ম হাসিলের ক্ষেত্রে লজ্জাশীলতা প্রশংসনীয় নহে। মুজাহিদ (র) বলিয়াছেন, লাজুক এবং অহংকারী ব্যক্তি ইল্ম হাসিল করিতে পারে না। হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, আনসারদের মহিলারা উত্তম। লজ্জা তাহাদেরকে দীনের ইল্ম শিক্ষা হইতে ফিরাইয়া রাখিতে পারে না। এই প্রসঙ্গে হযরত উম্মু সালামা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উম্মু সুলায়ম (রা) হাযির হইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আল্লাহ্ হক কথা প্রকাশ করিতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হইলে কি তাহাতে তাহাদের গোসল করিতে হইবে? নবী কারীম (স) বলিলেন, হাঁ, যখন সে বীর্য দেখিতে পাইবে। তখন উম্মু সালামা (রা) (লজ্জায়) তাঁহার মুখ ঢাকিয়া লইলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! স্ত্রীলোকদের কি স্বপ্নদোষ হয়? তিনি বলিলেন, হাঁ, হয়। তোমার ডান হাত ধুলায় ধুসরিত হউক। (তাহা না হইলে) তাহার সন্তান তাহার আকৃতি পায় কিরূপে (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ২৪)?
(চার) আমানতদারী: আমানতদারী একটি মহৎ গুণ। এই গুণের ক্ষেত্রে নবী কারীম (স) ছিলেন অদ্বিতীয় ও অনন্য। জীবনে কখনও তিনি আমানতের খিয়ানত করিয়াছেন বলিয়া প্রমাণ নাই। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই তাঁহার নিকট আমানত রাখিতেন। তিনি তাহা প্রাপককে যথাযথভাবে ফেরত দিতেন। ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর আমানতদারী যেহেতু কাফিরদের নিকটও স্বীকৃত ছিল, তাই তাঁহার নিকট সাধারণ লোকেরা আমানত রাখিত। তাঁহার নিকট রক্ষিত আমানত প্রাপকদের নিকট ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি হিজরতের সময় হযরত 'আলী (রা)-কে মক্কায় রাখিয়া আসিয়াছিলেন। তিনি সেই আমানতসমূহ যথাযথভাবে প্রদান করিয়া মদীনায় আগমন, করেন (সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, পৃ. ৫৫)। উপরিউক্ত গুণে গুণান্বিত করিয়া গড়িয়া তোলার উদ্দেশ্যে তিনি এই ব্যাপারে লোকদেরকে উৎসাহিত করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: لا ايمان لمن لا امانة له ولا دين لمن لا عهد له "যাহার মধ্যে আমানতদারী নাই তাহার ঈমান নাই এবং যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তাহার ধর্ম নাই" (সুনান বায়হাকী, সূত্র মিশকাত শরীফ, পৃ. ১৫)।
اية المنافق ثلث زاد مسلم وان صام وصلى وزعم انه مسلم ثم اتفقا اذا حدث كذب واذا وعد اخلف واذا اؤتمن خان. "মুনাফিকের আলামত তিনটি। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে, যদিও সে সাওম পালান করে, সালাত আদায় করে এবং সে মনে করে যে, সে মুসলমান। অতঃপর তাহারা (ইমাম বুখারী ও মসলিম) উভয়ে বর্ণনা করিয়াছেন: (১) যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে; (২) অঙ্গীকার করিলে বরখেলাফ করে এবং (৩) আমানত রাখা হইলে আত্মসাত করে" (মিশকাত শরীফ, পৃ. ১৭)।
(পাঁচ) অঙ্গীকার রক্ষা করা: অঙ্গীকার রক্ষা করা সত্যপরায়ণতারই একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অঙ্গীকার রক্ষা করার ব্যাপারে ইহার চাইতে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কী হইতে পারে যে, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস হযরত আবূ সুফ্যান (রা)-কে যেই সকল প্রশ্ন করিয়াছিলেন তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন ইহাও ছিল যে, মুহাম্মাদ কি কখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়াছেন? উত্তরে আবূ সুফ্যান (রা) স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন যে, তিনি তখনও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন নাই (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৩)। এই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রাণের শত্রু (মুসলমান হওয়ার পূর্বে) আবূ সুফ্যান (রা)-এর ভাষ্য। হযরত সাফওয়ান ইবন উমায়্যা (রা) ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে কাফির ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইয়ামান গমনের উদ্দেশ্যে জিদ্দা গমন করেন। 'উমায়র ইব্ন ওয়াত্ব রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হইয়া তাহার পলায়নের ঘটনা খুলিয়া বলিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার মাথার পাগড়ী তাহাকে দান করিয়া বলিলেন, ইহা হইল সাফওয়ানের নিরাপত্তার প্রতীক। 'উমায়র পাগড়ী লইয়া সাফওয়ানের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, তোমার পলায়নের প্রয়োজন নাই, তুমি নিরাপদ। অতঃপর তিনি তাঁহার খিদমতে উপস্থিত হইয়া প্রার্থনা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী (স), ২খ., পৃ. ২১১-১২)। উল্লিখিত ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি যে অঙ্গীকার করিয়াছেন কখনও ইহার ব্যত্যয় ঘটে নাই। রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বয়ং অঙ্গীকার রক্ষা করার পাশাপাশি লোকজনকেও অঙ্গীকার রক্ষা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন। যেমন তিনি বলেন: ولا دين لمن لا عهد له. "যে ব্যক্তি অঙ্গীকার রক্ষা করে না তাহার ধর্ম নাই" (বায়হাকী, সূত্র মিশকাত, পৃ. ১৫)।
(ছয়) বীরত্ব ও সাহসিকতা: এই গুণের ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অবস্থান ছিল অনন্য। তিনি জীবনে বহু বিপদের সম্মুখীন হইয়াছিলেন কিন্তু কখনও সাহস হারান নাই ও বিচলিত হন নাই। হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) লোকদের মধ্যে সকলের চাইতে সুন্দরতম, সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল এবং সর্বাপেক্ষা অধিক সাহসী ছিলেন। এক রাত্রে মদীনাবাসিগণ কোন একটি শব্দ শুনিয়া ভীষণ ভয় পাইয়াছিল। ইহাতে লোকজন সেই বিকট শব্দের দিকে ছুটিয়া চলিল এবং নবী কারীম (স)-কে তাহাদের সম্মুখে দেখিতে পাইল। তিনি সর্বাগ্রে সেই আওয়াজের দিকে পৌঁছিয়া গিয়াছিলেন। এই সময় নবী কারীম (স) বলিতে লাগিলেন, ভীত হইও না, ভীত হইও না। তখন তিনি আবূ তালহা (রা)-এর একটি ঘোড়ার পিঠে জিনপোষ ছাড়াই আরোহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার গলায় ঝুলিতেছিল একটি তরবারি। অতঃপর নবী কারীম (স) বলিলেন, আমি এই ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত পাইয়াছি (বুখারী, মুসলিম, সুত্র মিশকাত, পৃ. ৫১৮)।
হুনায়নের যুদ্ধের দিন স্বল্প সংখ্যক 'সাহাবী ব্যতীত সকলেই যখন বিক্ষিপ্ত হইয়া পাড়িয়াছিল তখন নবী কারীম (স) উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছিলেন, انا النبي لا كذب انا ابن عبد المطلب "আমি নবী, মিথ্যাবাদী নহি, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর" (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৭)।
(সাত) ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা: বিপদে ধৈর্য ধারণ করা, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থির থাকা এবং অবিচল থাকার ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) পূর্ণতার অধিকারী ছিলেন। বিপদে তিনি কখনও অধৈর্য হইতেন না এবং কঠিন হইতে কঠিনতর অবস্থায়ও তিনি মনোবল হারাইতেন না। জীবনে তিনি এমন বহু পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছেন- যাহা তাঁহার চুলকে পাকাইয়া দিয়াছে, প্রতিরোধের দেওয়াল ভাংগিয়া চুরমার করিয়া দিয়াছে, ইহার পরও তিনি ছিলেন শান্ত ও অবিচল। দুর্বলতম অবস্থায়ও তিনি বিজয়ীর মতা ধৈর্য ধারণ করিয়াছেন। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও রাসূলুল্লাহ্ (স) দীন প্রচারে সামান্যতম পিছপা হন নাই। ইহা চরম ধৈর্যের একটি উদাহরণ। অন্যরাও যেন ধৈর্য অবলম্বন করে সেইজন্য রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, الصبر ثوابه الجنة "ধৈর্যের বিনিময় হইল জান্নাত" (সুনান বায়হাকী, সূত্র মিশকাত, পৃ. ১৭৩)।
: অন্য এক হাদীছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, "ঈমানদার ব্যক্তির বিষয়টি খুবই অদ্ভূত। বস্তুত ঈমানদারের প্রতিটি কাজই তাঁহার জন্য মঙ্গলময়। আর ইহা একমাত্র মুমিনদেরই বৈশিষ্ট্য। তাহার সচ্ছলতা অর্জিত হইলে সে শোকর করে। ইহা তাহার জন্য কল্যাণকর। তাঁহার উপর কোন বিপদ আসিলে সে সবর করে। ইহাও তাহার জন্য কল্যাণকর" (সহীহ মুসলিম, সূত্র মিশকাত, পৃ. ৪৫২)।
(আট) যুদ (অল্পে তুষ্টি) ও শোকর: এতদুভয় ক্ষেত্রেও রাসূলুল্লাহ (স) পরিপূর্ণতার অধিকারী ছিলেন। যুহদ মানে হইল আখিরাতের শান্তি লাভের আশায় দুনিয়ার সুখ-শান্তি পরিহার করা, অল্পে তুষ্ট থাকা। আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে দুনিয়ার ভোগবিলাস ও সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হইতে নিষেধ করিয়াছেন। তাঁহাকে শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে, এখানকার আনন্দ ও সৌন্দর্যোপকরণ পরীক্ষার জন্য দেওয়া হইয়াছে। আসল শান্তি আখিরাতে পাওয়া যাইবে। ইরশাদ হইয়াছে: وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى . "তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনও প্রসারিত করিও না উহার প্রতি যাহা আমি তাহাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যরূগে উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়াছি, তদ্দ্বারা তাহাদের পরীক্ষা করিবার জন্য। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী” (২০: ১৩১)।
আল্লাহ তা'আলার এই আদেশ ও উপদেশ রাসূলুল্লাহ্ (স) স্বীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানিয়া চলিয়াছেন। তাই নবী কারীম (স)-এর সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করিলে ইহা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের প্রতি মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। ভোগ-বিলাসের সকল উপকরণ করায়ত্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় তাহা পরিহার করিয়াছেন। মদীনায় হিজরতের পর তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। গণীমতরূপে তাহার হস্তগত হয় বেশুমার সম্পদ। এইগুলির কিছুই তিনি নিজের আরাম-আয়েশের জন্য ব্যয় করেন নাই। পরিবারের ব্যয়ভার বহনের জন্য তিনি ঋণও করিয়াছেন। তাঁহার ইনতিকালের পর দেখা গেল যে, তাঁহার লৌহ বর্মটি আবু শাহমা নামক এক ইয়াহুদীর নিকট বন্ধক রহিয়াছে। উহার বিনিময়ে তিনি পরিবারের জন্য সামান্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ করিয়াছিলেন (কাযী ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১৪০)। সাহাবায়ে কিরামও যেন যুহৃদ অবলম্বন করিয়া চলেন সেজন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন: ازهد في الدنيا يحبك الله وازهد فيما فى ايدى الناس يحبوك "দুনিয়াতে কৃষ্ণতা অবলম্বন কর তাহা হইলে আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসিবেন এবং মানুষের হাতে যে ধন-সম্পদ রহিয়াছে তাহা হইতেও কৃষ্ণতা অবলম্বন কর, তাহা হইল লোকেরাও তোমাকে মহব্বত করিবে” (সুনান ইবন মাজা, কিতাবুষ-যুহদ, বাব ১, হাদীছ নং ১০২)।
(নয়) বিনয় ও নম্রতা: কথাবার্তা, আচার-আচরণ ইত্যাদি সব কিছুর ক্ষেত্রে নবী কারীম (স) বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করিয়া চলিতেন। এই ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য 'কামালাতের অধিকারী ছিলেন। তিনি সর্বদা আল্লাহ্ পাকের দরবারে মিনতি জানাইতেন, হে আল্লাহ্! তুমি আমার চোখে আমাকে তুচ্ছ করিয়া দেখাও আর শ্রেষ্ঠ করিয়া দেখাও মানুষের চোখে (মাদারিজুন নুবৃওয়াত, ১খ., পৃ. ৭৯)।
হযরত উমার (রা) বলেন, আল্লাহ্ পাক রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে এই স্বাধীনতা দান করিয়াছিলেন যে, তিনি নবী বাদশাহ হইবেন, না নবী বান্দা হইবেন। মহানবী (স) নিজের জন্য নবী বান্দা হওয়াই শ্রেয় মনে করিয়াছিলেন (কাযী ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ১৩০)। তিনি তাঁহার সাহাবীদেরকে বলিতেন, তোমরা আমার প্রশংসায় অতিরঞ্জিত করিবে না, যেমন খৃস্টান সমাজ মারয়াম-তনয় ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে। পূর্ণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সত্ত্বেও আমি আল্লাহ্ই বান্দা। তাই তোমরাও আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল বলিও (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., প. ২০৪)।
একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে দেখামাত্র ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল। এতদ্দর্শনে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাকে বলিলেন, আমি মহাপরাক্রমশালী কোন রাজা-বাদশাহ নই। আমি এক মহিলার সন্তান, যিনি শুকনা গোশত রান্না করিয়া ভক্ষণ করিতেন। হযরত আইশা (রা) বলেন, যে কোন ধরনের লোক তাঁহাকে আহবান করিলে তিনি তাঁহার আহবানে সাড়া দিতেন (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ২০৪; হাকেম আল-মুসতাদরাক, ৩খ., পৃ. ৪৮)।
হযরত আবূ উমামা (র) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ্ (স) লাঠিতে ভর দিয়া আমাদের নিকট আসিলেন। তাঁহার সম্মানার্থে আমরা দাঁড়াইয়া গেলাম। তিনি আমাদেরকে বলিলেন, অনারব লোকেরা কাহাকেও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে যেভাবে দাঁড়াইয়া যায় তোমরা সেইভাবে দাঁড়াইবে না (কাযী ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ২৬৩)। তিনি আরও বলেন, আমি আল্লাহ্র বান্দা, তাঁহার অন্যান্য বান্দাদের মতই আমি পানাহার করি, আমিও সেইভাবে উপবেশন করি, যেইভাবে তাহারা উপবেশন করে (প্রাগুক্ত)। সাহাবায়ে কিরামও যাহাতে নম্রতা অবলম্বন করেন সেইজন্য তিনি বলিয়াছেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি এই মর্মে ওহী নাযিল করিয়াছেন যে, তোমরা বিনয় অবলম্বন করিবে। কেহ কাহারও সামনে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করিবে না এবং কেহ কাহারও উপর সীমালংঘন করিবে না (সহীহ মুসলিম, সূত্র-রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ২৬৭)।
অন্য এক হাদীছে আছে: وما تواضع أحد لله الا رفعه الله. "কেহ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিনয় অবলম্বন করিলে আল্লাহ্ তাহার মর্যাদা বাড়াইয়া দেন" (সহীহ মুসলিম, সূত্র-রিয়াদুস সালিহীন, পৃ. ২৬৭)।
(দশ) দানশীলতা ও বদান্যতা: সমাজে বিভিন্ন স্তরের মানুষ বসবাস করে। কেহ ধনী, কেহ গরীব। ধনীদের জন্য উচিত গরীবদের প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করা। বস্তুত সমাজের গরীব শ্রেণীর লোকদের প্রতি দানশীলতা ও বদান্যতা প্রদর্শন করা একটি মহৎ গুণ। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে এই বিষয়ে বহু তাকীদ রহিয়াছে। আল্লাহ্ তা'আলা হইলেন সবচেয়ে বড় দাতা। তাঁহার পর মানুষের মধ্যে বড় দাতা হইলেন রাসূলুল্লাহ (স)। হযরত আনাস (রা) বলেন: قال رسول الله ﷺ هل تدرون من اجود الناس قالوا الله ورسوله اعلم قال الله تعالى اجود جودا ثم انا اجود بنى آدم واجودهم من بعدى رجل علم علما فنشره باتی يوم القيامة اميرا وحده او قال امة واحدة. "রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, তোমরা কি বলিতে পার, সর্বাপেক্ষা বড় দাতা কে? সাহাবীগণ বলিলেন, আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলই অধিক অবগত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহই হইলেন সর্বাপেক্ষা বড় দাতা। তৎপর বনী আদমের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা বড় দাতা। আর আমার পর বড় দাতা হইবে সেই ব্যক্তি যে ইলম শিক্ষা করিয়া তাহা বিস্তার করিতে থাকিবে। কিয়ামতের দিন সে একাই একজন আমীর অথবা একটি উম্মত হইয়া উঠিবে" (বায়হাকী, সূত্র মিশকাত, পৃ. ৩৭)।
كان رسول الله ﷺ اجود الناس وكان أجود ما يكون في رمضان حين يلقاه جبرئيل وكان يلقاه في كل ليلة من رمضان فيدارسه القرآن والرسول الله ﷺ اجود بالخير من الريح المرسلة "রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা! আর রমযান মাসে তিনি আরও বেশী দানশীল হইতেন, যখন জিব্রাঈল (আ) তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন। আর রমযানের প্রতি রাতেই জিব্রাঈল (আ) তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কুরআন মজীদ পরস্পর পাঠ করিয়া শুনাইতেন। আল্লাহ্র কসম! প্রবল বেগে প্রবাহিত বায়ু অপেক্ষাও রাসূলুল্লাহ্ (স) অধিক দানশীল ছিলেন" (সহীহ বুখারী, ১খ, পৃ. ৩)।
দানশীলতা ও বদান্যতা ব্যক্তিকে জান্নাত পর্যন্ত পৌছাইয়া দেয়। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, দানশীলতা জান্নাতের একটি বৃক্ষস্বরূপ। যে ব্যক্তি দানশীল সে যেন উহার একটি শাখা ধরিয়াছে এবং সেই শাখা তাহাকে ছাড়িতেছে না, যে পর্যন্ত না তাহাকে জান্নাতে পৌঁছাইয়া দেয়। পক্ষান্তরে কৃপণতা হইতেছে জাহান্নামের একটি বৃক্ষ। যে ব্যক্তি কৃপণ সে যেন উহার একটি শাখা ধরিয়াছে এবং ঐ শাখা তাহাকে ছাড়িতেছে না, যে পর্যন্ত না তাহাকে জাহান্নামে পৌছাইয়া দেয় (বায়হাকী, সূত্র মিশকাত, পৃ. ১৬৭)। হযরত আনাস (রা) বলেন: ما سئل رسول الله ﷺ على الاسلام شيئا الا اعطاه قال فجاء رجل فاعطاه غنما بين جبلين فرجع الى قومه فقال يا قوم اسلموا فان محمدا يعطى عطاء لا يخشى الفاقة. "রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট ইসলাম গ্রহণের পর কেহ কিছু চাহিলে তিনি তাহাকে উহা দান করিতেন। আনাস (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট আগমন করিল। তিনি তাঁহাকে এত বেশী ছাগল দান করিলেন যাহাতে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হইয়া যায়। অতঃপর সেই ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট যাইয়া বলিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। কেননা মুহাম্মাদ (স) এত বেশী দান করেন যাহার পর আর অভাবের ভয় থাকে না” (মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল, হাদীছ নং ৫৮১৩-৫৮১৪)।
নবৃওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও রাসূলুল্লাহ্ (স) এই দান ও সেবার কাজ করিতেন। প্রথম ওহী লাভের পর যখন তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া গৃহে ফিরিয়া আসেন তখন খাদীজা (রা) তাহার কিছু সৎগুণাবলীর উল্লেখ পূর্বক তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলেন- كلا والله ما يخزيك الله ابدا انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم وتقرى الضيف وتعين على نوائب الحق. "আল্লাহ্র কসম! কখনও নহে। মহান আল্লাহ্ আপনাকে কখনও অপমানিত করিবেন না। আপনি তো আত্মীয় তার সম্পর্ক অটুট রাখেন, অসহায়-দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, বেকারের কর্মসংস্থান করেন, মেহমানদের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন” (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ৩)।
মহানবী (স) বলেন: আমি মুমিনদের জন্য তাহাদের নিজ হইতেও অধিক আপন। তাই মুমিনদের যে ইনতিকাল করিবে সে ঋণ রাখিয়া গেলে তাহা পরিশোধ করা আমার যিম্মায় (বুখারী, কিতাবুল কাফালা, হাদীছ নং ২২৯৮)।
উল্লেখ্য যে, ইহসান ও আত্মশুদ্ধির তাৎপর্য, গুরুত্ব এবং নবী জীবনে ইহার বাস্তবায়ন সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে এই কথাও মনে রাখিতে হইবে যে, মানুষের মধ্যে এমন কিছু স্বভাব-চরিত্র আছে যাহা খুবই নিকৃষ্ট এবং অপসন্দনীয়। এই জাতীয় স্বভাবচরিত্রকে আখলাকে রখীলা (اخلاق رذيلة) বা আখলাক সায়্যিআ (اخلاق سيئة) বলা হয়। আখলাকে সায়্যিআ, যেমন- গাফলত, জিহালাত (মূর্খতা), মিথ্যা, অহংকার, গীবত, চোগলখোরী, বদগুমানী, আত্মম্ভরিতা, ধোঁকা, প্রতারণা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, রাগ, অকৃতজ্ঞতা, পদ ও সম্পদের মোহ ইত্যাদি। এইগুলি হইতে বাঁচিয়া থাকাও অত্যাবশ্যক। মহানবী (স) যেহেতু মানবতার আদর্শ ছিলেন, তাই তিনি এইসব মন্দ চরিত্র হইতেও মুক্ত ছিলেন। নিজে দুশ্চরিত্র হইতে নিষ্কলুষ থাকার পাশাপাশি অন্যদেরকে উহা হইতে মুক্ত থাকার জন্য তিনি উপদেশ দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন: لا يدخل الجنة الجواظ ولا الجعظري. "অহঙ্কারী ও দুশ্চরিত্রের মানুষ জান্নাতে দাখিল হইতে পারিবে না" (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাব ৭; মুসনাদ আহমাদ, ৪খ., পৃ. ২২৭, সূত্র মিশকাত, পৃ. ৪৩১)।
বস্তুত চরিত্র সংশোধন ব্যতীত আত্মার সংশোধন সম্ভব নহে, এমনকি প্রকৃত মানুষ হওয়াও সম্ভব নহে। মানুষ হইতে হইলে চারিত্রিক দুর্বলতার যতগুলি দিক রহিয়াছে সবগুলির সংশোধন আবশ্যক। সংশোধনের জন্য অনুশীলন আবশ্যক। আর অনুশীলন বারংবার করিতে হয়। অব্যাহতভাবে মুজাহাদা ও সাধনা করিলে এবং বারংবার নফসের বিরুদ্ধাচরণ করিলে একদিন এই খারাপ স্বভাব নির্মূল হইয়া যাইবে। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে: وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ. "যাহারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম সাধনা করে আমি তাহাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করিব। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সংগে থাকেন” (২৯:৬৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: প্রকৃত মুজাহিদ সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ আনুগত্যে নিজের নফসের সহিত জিহাদ করে (সুনান বায়হাকী, সূত্র মিশকাত, পৃ. ১৫)।