📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উসতুওয়ানা-ই হান্নানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা

📄 উসতুওয়ানা-ই হান্নানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা


মসজিদে নববী নির্মাণের পর হইতে তথায় খুতবা দেওয়ার জন্য কোন মিম্বার ছিল না। তখন সমতল মেঝের উপর দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স) খুতবা দিতেন। খুতবা প্রদান করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িলে কোন কোন সময় তিনি তাঁহার নিকটস্থ খুঁটির (উসতুওয়ানা) পার্শ্বে গিয়া দাঁড়াইতেন। অষ্টম হিজরীর প্রারম্ভ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবেই খুতবা প্রদান করেন। মদীনার এক আনসারী মহিলার মায়মূন নামক একজন গোলাম ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুনিপুণ কাঠমিস্ত্রী। তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অনুমতি পাইলে আমি আপনার জন্য একখানা সুন্দর কাঠের মিম্বার তৈরি করিয়া দিতে পারি। উহার উপর দাঁড়াইয়া খুতবা প্রদান করিতে আপনার সুবিধা হইবে। প্রয়োজন হইলে ইহার উপর বসিতেও পারিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আবেদন মঞ্জুর করিয়া তাহাকে এই কাজের অনুমতি দেওয়ার জন্য তাহার মনিবকে বলিয়া পাঠাইলেন। তাহার মনিব আনন্দের সহিত তাহাকে অনুমতি দিলেন। তিনি মদীনার নিকটবর্তী জংগল হইতে অতি উৎকৃষ্ট কাঠ কাটিয়া তাহা দিয়া একখানা সুন্দর মিম্বার নির্মাণ করিয়া দিলেন (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৩৩)।

হযরত মায়মূনের নির্মিত মিম্বারখানা তিন সিঁড়িবিশিষ্ট ছিল। প্রত্যেকটি সিঁড়ির প্রন্থ এক বিঘত এবং মিম্বারখানার দৈর্ঘ্য দুই হাত ও প্রস্থ একহাত ছিল। এই মিম্বার তৈরি হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) স্বাভাবিকভাবেই পূর্বের স্থান ত্যাগ করিয়া নবনির্মিত মিম্বারে দাঁড়াইয়া খুতবা দিতে আরম্ভ করিলেন। তখন যে খুঁটিতে তিনি ইতোপূর্বে হেলান দিতেন সেই খুঁটিটি তাঁহার বিচ্ছেদ বেদনায় ব্যথিত হইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল। খুঁটির উচ্ছ্বাসপূর্ণ ক্রন্দনে দুঃখিত হইয়া উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামও কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মিম্বার হইতে নামিয়া খুঁটিকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, "হে খুঁটি! তুমি যে অবস্থায় আছ এই অবস্থায়ই আমি তোমাকে রাখিতে পারি, আর যদি ইচ্ছা কর তবে আমি তোমাকে জান্নাতে লইয়া যাইতে পারি"। এই কথা বলিবার সংগে সংগে খুঁটির ক্রন্দন বন্ধ হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে জান্নাতে যাওয়াকেই গ্রহণ করিয়াছে (আবূ নু'আয়ম আল-ইসফাহানী, দালাইলুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ১৪২; আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., পৃ. ৫০৬-৫০৭; আন-নাসাঈ, সুনান, ১খ, পৃ. ১৪১)।

রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংস্পর্শে আসিয়া উক্ত কাঠে প্রাণের সঞ্চার হওয়া, তাঁহার বিচ্ছেদে দুঃখিত হইয়া ক্রন্দন করা এবং তাঁহার সান্ত্বনা প্রদানে নীরব হওয়া-রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা। উক্ত খেজুর কাণ্ডটি সম্পর্কে হাদীছ গ্রন্থসমূহে অনেক তথ্য আছে। যথা: (১) উহাকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, তুমি ইচ্ছা করিলে আমি তোমাকে পুনরায় তোমার পূর্বস্থানে রোপণ করিয়া দেই, তুমি তাজা গাছ হইয়া যাইবে। আর ইচ্ছা করিলে আমি তোমাকে জান্নাতে রোপণ করিতে পারি। তুমি জান্নাতের মাটি ও পানিতে বর্ধিত হইয়া আল্লাহর পেয়ারা বান্দাগণকে ফল খাওয়াইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সেই খেজুর কাণ্ডটি দ্বিতীয় ব্যবস্থাকে পছন্দ করিয়াছে (আল-বুখারী, ৫খ., অনুবাদ হামিদিয়া লাইব্রেরী, ১৯৯৪ খৃ., ৫ম সংস্করণ, ঢাকা পৃ. ৪৯৫)।

সাময়িকভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ঐ খেজুর কাণ্ডটিকে দাফন করাইয়া দিয়াছিলেন (আল-বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪৯৫)। পরবর্তী খেজুর কাণ্ডটি সাহাবী উবায়্যি ইবন কা'ব (রা)-এর হস্তগত হইয়া তাহারই হিফাজতে ছিল। কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে ইহার বিলুপ্তি সাধিত হয়। আলিমগণ লিখিয়াছেন, দাফনকৃত খেজুর কাণ্ডটি বোধহয় মসজিদে নববী পুনঃ নির্মাণ কালে উক্ত সাহাবীর হস্তগত হইয়াছিল (আল-বুখারী, অনু. হামিদিয়া লাইব্রেরী, ৫ম সংস্করণ, ৫খ, পৃ. ৪৯৫)। এই ঘটনা ১১জন সাহাবী কতৃক বর্ণিত হইয়াছে (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৬১৫, টিকা নং ২)।

মাওলানা কাসিম নানুতবী (র)-এর মতানুসারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা হযরত মূসা (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর মৃতকে জীবিতকরণ মু'জিযাসমূহ হইতে অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ। কারণ হযরত মূসা (আ)-এর লাঠি অজগরের আকৃতি ধারণ করিয়া জীবিত হইয়াছিল এবং উহা অজগরের ন্যায়ই ছুটাছুটি করিয়াছিল। এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর প্রস্তুতকৃত বস্তুগুলি পাখির আকার ধারণপূর্বক জীবিত হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর বরকতে উসতুওয়ানা কাষ্ঠ থাকা অবস্থায়ই উহা হইতে জীবিতদের ন্যায় আচরণ প্রকাশ পাইয়াছিল। সুতারাং তাঁহার এই মু'জিযা পূর্ববর্তী রাসূলগণের মু'জিযার তুলনায় অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ (দুনিয়া মে ইসলাম কেউ কর ফয়লা, দেওবন্দ ১৩৬৫ হি., পৃ. ১০৩; ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০ খ., পৃ. ৭৬৬; হযরত রাসূলে কারীম (সা) জীবন ও শিক্ষা, ই.ফা.বা., ঢাকা ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ৫৬১-৬২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00