📄 গুইসাপের আশ্চর্যজনক বাকশক্তি লাভ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাসমূহের মধ্যে গুইসাপের তাঁহার সহিত কথা বলা এবং তাঁহার রিসালাত ও আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্ক সাক্ষ্য দেওয়া অন্যতম। ঘটনাটি বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার তাঁহার সাহাবীদের এক মাহফিলে ছিলেন। তখন বানু সুলায়ম গোত্রের এক বেদুঈন তাঁহার নিকট আসিল। সে একটি গুইসাপ শিকার করিয়া তাহার আস্তিনের মধ্যে করিয়া লইয়া আসিয়াছিল। তাহার উদ্দেশ্য ছিল স্বীয় আস্তানায় গিয়া উহা ভূনা করিয়া খাইবে। অতঃপর সে দলবদ্ধ লোকজন তথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে সাহাবীদের সঙ্গে দেখিয়া বলিল, ইহা কি? লোকজন বলিল, এই ব্যক্তি বলে যে, সে নবী। তখন বেদুঈনটি ভীড় ঠেলিয়া সম্মুখে অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, লাত ও উয্যার কসম! মহিলারা যাহাদিগকে দুধ পান করাইয়াছে তাহাদের মধ্যে আমার নিকট তোমা হইতে বেশী ঘৃণিত ও বেশী ক্রোধের পাত্র আর কেহ নাই। আমার কওম যদি আমাকে আজুল (তাড়াহুড়াকারী) নাম না রাখিত তবে অবশ্যই আমি দ্রুত তোমাকে হত্যা করিতাম এবং ইহাতে আনন্দিত হইতাম।
তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তাহাকে হত্যা করি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তুমি কি জান না যে, ধৈর্যশীল ব্যক্তি নবী হওয়ার কাছাকাছি? অতঃপর তিনি বেদুঈনের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, তুমি যাহা বলিয়াছ তাহা বলিতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে? তুমি নাহক কথা বলিয়াছ। তুমি আমার মজলিসে আমাকে সম্মান কর নাই কেন? বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাচ্ছিল্যভরে বলিল, তুমি আমার সহিত কথাও বলিতেছ! এই গুইসাপটি তোমার উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত আমি তোমার উপর ঈমান আনিব না। এই বলিয়া সে নিজ জামার হাতার ভিতর হইতে গুইসাপটি বাহির করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে ছুড়িয়া ফেলিল। রাসূলুল্লাহ (স) গুইসাপটিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে গুইসাপ! গুইসাপটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় তাঁহার ডাকের উত্তর দিল যাহা কওমের সকলেই শুনিতে পাইল। সে বলিল, লাব্বায়কা ওয়া সা'দায়ক। لبيك وسعديك يا زين من وافي القيامة "আমি হাজির। আপনার কল্যাণ হউক, হে কিয়ামত পর্যন্ত আগতদের মধ্যে সুন্দরতম ব্যক্তি"! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কাহার ইবাদাত কর হে গুইসাপ? গুইসাপ বলিল: الذي في السماء عرشه وفي الارض سلطانه وفي البحر سبيله وفي الجنة رحمته وفي النار عقابه "আকাশে যাঁহার আরশ রহিয়াছে; পৃথিবীতে যাঁহার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে; সমুদ্রের মধ্যে যাঁহার পথ রহিয়াছে; জান্নাতে যাঁহার রহমত এবং জাহান্নামে যাঁহার শাস্তি রহিয়াছে"। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি কে হে গুইসাপ? গুইসাপ বলিল : انت رسول رب العالمين وخاتم النبيين قد افلح من صدقك وقد خاب من كذبك "আপনি জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল, সর্বশেষ নবী। যে আপনাকে সত্যবাদী বলিয়া বিশ্বাস করিবে সে সফলকাম হইবে। আর যে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলিবে সে ধ্বংস হইয়া যাইবে"। কোন কোন রিওয়ায়াতে গুইসাপের একটি দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তির কথাও উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ইব্ন জাওযী, আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ৩৩৮)।
এই কথা শুনিয়া বেদুঈন বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি চাক্ষুষ দেখার পর আর কাহারও কথার অনুসরণ করিব না। আল্লাহ্র কসম। আমি এমতাবস্থায় আসিয়াছিলাম যে, পৃথিবীর বুকে আপনার তুলনায় অধিক ঘৃণিত ব্যক্তি আমার নিকট আর কেহ ছিল না। আর আজ আপনি আমার নিকট আমার পিতা, আমার চক্ষু ও খোদ আমার নিজ হইতে অধিক প্রিয়। আমি আপনাকে ভিতরে-বাহিরে গোপনে-প্রকাশ্যে ভালবাসি। আর আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নাই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার দ্বারা হিদায়াত দান করিয়াছেন। এই দীন নিশ্চয়ই বিজয়ী হইবে; বিজিত হইবে না। অতঃপর বেদুঈন তাহার কওমের নিকট গিয়া এই সংবাদ জানাইলে কওমের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৭০; কাযী 'ইয়ায; আশ-শিফা, ২খ., পৃ. ৩০৯-৩১০; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ৩৩৬-৩৮; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৯২-৯৩)।
এই রিওয়ায়াত সম্পর্কে অনেকে অনেক সমালোচনা করিয়াছেন। যেমন ইমাম বায়হাকী বলেন, এই সম্পর্কে হযরত 'আইশা (রা) ও আবূ হুরায়রা (রা) হইতেও হাদীছ বর্ণিত আছে। তবে এইসব বর্ণনা যঈফ। আয-যাহাবী (র) বলেন, আল্লাহ্র কসম! বায়হাকী সত্য বলিয়াছেন। কারণ ইহা বাতিল খবর। আল-মুযানী ও ইব্ন তায়মিয়া ইহার কঠোর সমালোচনা করিয়াছেন এবং ইহাকে কাহিনীকারের বানানো গল্প বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। তবে আল-হায়ছামী ইহাকে খুবই যুক্তিসংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য মত বলিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি বলেন, ইহার সনদে এমন কোনও রাবী নাই, যাহাকে মনগড়া হাদীছ বানাইবার অপবাদ দেওয়া হইয়াছে। তবে ইহা ঠিক যে, তাহাদের মধ্যে দুর্বলতা রহিয়াছে। এই ধরনের দুর্বলতার কারণে ইহাকে 'মনগড়া' বা 'বানানো' বলিয়া মন্তব্য করা যায় না। নবী করীম (স)-এর মু'জিযা অতি বিশাল ব্যাপার। উহাতে এমনও বিষয় রহিয়াছে যাহা ইহা হইতেও আশ্চর্যজনক। তাই তাহার মধ্যে শারী'আতের দৃষ্টিকোণ হইতে অস্বীকার করিবার মত কিছুই নাই। উপরন্তু এই সম্পর্কে ইমামগণের রিওয়ায়াত রহিয়াছে। ইহা যঈফ ঠিকই তবে তাই বলিয়া মনগড়া বা বানানো কাহিনীর পর্যায়ভুক্ত নহে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫২১)।
📄 উসতুওয়ানা-ই হান্নানা রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা
মসজিদে নববী নির্মাণের পর হইতে তথায় খুতবা দেওয়ার জন্য কোন মিম্বার ছিল না। তখন সমতল মেঝের উপর দাঁড়াইয়া রাসূলুল্লাহ (স) খুতবা দিতেন। খুতবা প্রদান করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িলে কোন কোন সময় তিনি তাঁহার নিকটস্থ খুঁটির (উসতুওয়ানা) পার্শ্বে গিয়া দাঁড়াইতেন। অষ্টম হিজরীর প্রারম্ভ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) এইভাবেই খুতবা প্রদান করেন। মদীনার এক আনসারী মহিলার মায়মূন নামক একজন গোলাম ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুনিপুণ কাঠমিস্ত্রী। তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অনুমতি পাইলে আমি আপনার জন্য একখানা সুন্দর কাঠের মিম্বার তৈরি করিয়া দিতে পারি। উহার উপর দাঁড়াইয়া খুতবা প্রদান করিতে আপনার সুবিধা হইবে। প্রয়োজন হইলে ইহার উপর বসিতেও পারিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার আবেদন মঞ্জুর করিয়া তাহাকে এই কাজের অনুমতি দেওয়ার জন্য তাহার মনিবকে বলিয়া পাঠাইলেন। তাহার মনিব আনন্দের সহিত তাহাকে অনুমতি দিলেন। তিনি মদীনার নিকটবর্তী জংগল হইতে অতি উৎকৃষ্ট কাঠ কাটিয়া তাহা দিয়া একখানা সুন্দর মিম্বার নির্মাণ করিয়া দিলেন (হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮৩৩)।
হযরত মায়মূনের নির্মিত মিম্বারখানা তিন সিঁড়িবিশিষ্ট ছিল। প্রত্যেকটি সিঁড়ির প্রন্থ এক বিঘত এবং মিম্বারখানার দৈর্ঘ্য দুই হাত ও প্রস্থ একহাত ছিল। এই মিম্বার তৈরি হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) স্বাভাবিকভাবেই পূর্বের স্থান ত্যাগ করিয়া নবনির্মিত মিম্বারে দাঁড়াইয়া খুতবা দিতে আরম্ভ করিলেন। তখন যে খুঁটিতে তিনি ইতোপূর্বে হেলান দিতেন সেই খুঁটিটি তাঁহার বিচ্ছেদ বেদনায় ব্যথিত হইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল। খুঁটির উচ্ছ্বাসপূর্ণ ক্রন্দনে দুঃখিত হইয়া উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামও কাঁদিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মিম্বার হইতে নামিয়া খুঁটিকে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, "হে খুঁটি! তুমি যে অবস্থায় আছ এই অবস্থায়ই আমি তোমাকে রাখিতে পারি, আর যদি ইচ্ছা কর তবে আমি তোমাকে জান্নাতে লইয়া যাইতে পারি"। এই কথা বলিবার সংগে সংগে খুঁটির ক্রন্দন বন্ধ হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে জান্নাতে যাওয়াকেই গ্রহণ করিয়াছে (আবূ নু'আয়ম আল-ইসফাহানী, দালাইলুন নুবুওয়াত, ২খ., পৃ. ১৪২; আল-বুখারী, আস-সাহীহ, ১খ., পৃ. ৫০৬-৫০৭; আন-নাসাঈ, সুনান, ১খ, পৃ. ১৪১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর সংস্পর্শে আসিয়া উক্ত কাঠে প্রাণের সঞ্চার হওয়া, তাঁহার বিচ্ছেদে দুঃখিত হইয়া ক্রন্দন করা এবং তাঁহার সান্ত্বনা প্রদানে নীরব হওয়া-রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা। উক্ত খেজুর কাণ্ডটি সম্পর্কে হাদীছ গ্রন্থসমূহে অনেক তথ্য আছে। যথা: (১) উহাকে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, তুমি ইচ্ছা করিলে আমি তোমাকে পুনরায় তোমার পূর্বস্থানে রোপণ করিয়া দেই, তুমি তাজা গাছ হইয়া যাইবে। আর ইচ্ছা করিলে আমি তোমাকে জান্নাতে রোপণ করিতে পারি। তুমি জান্নাতের মাটি ও পানিতে বর্ধিত হইয়া আল্লাহর পেয়ারা বান্দাগণকে ফল খাওয়াইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সেই খেজুর কাণ্ডটি দ্বিতীয় ব্যবস্থাকে পছন্দ করিয়াছে (আল-বুখারী, ৫খ., অনুবাদ হামিদিয়া লাইব্রেরী, ১৯৯৪ খৃ., ৫ম সংস্করণ, ঢাকা পৃ. ৪৯৫)।
সাময়িকভাবে রাসূলুল্লাহ (স) ঐ খেজুর কাণ্ডটিকে দাফন করাইয়া দিয়াছিলেন (আল-বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪৯৫)। পরবর্তী খেজুর কাণ্ডটি সাহাবী উবায়্যি ইবন কা'ব (রা)-এর হস্তগত হইয়া তাহারই হিফাজতে ছিল। কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে ইহার বিলুপ্তি সাধিত হয়। আলিমগণ লিখিয়াছেন, দাফনকৃত খেজুর কাণ্ডটি বোধহয় মসজিদে নববী পুনঃ নির্মাণ কালে উক্ত সাহাবীর হস্তগত হইয়াছিল (আল-বুখারী, অনু. হামিদিয়া লাইব্রেরী, ৫ম সংস্করণ, ৫খ, পৃ. ৪৯৫)। এই ঘটনা ১১জন সাহাবী কতৃক বর্ণিত হইয়াছে (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৬১৫, টিকা নং ২)।
মাওলানা কাসিম নানুতবী (র)-এর মতানুসারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা হযরত মূসা (আ) ও হযরত ঈসা (আ)-এর মৃতকে জীবিতকরণ মু'জিযাসমূহ হইতে অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ। কারণ হযরত মূসা (আ)-এর লাঠি অজগরের আকৃতি ধারণ করিয়া জীবিত হইয়াছিল এবং উহা অজগরের ন্যায়ই ছুটাছুটি করিয়াছিল। এমনিভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর প্রস্তুতকৃত বস্তুগুলি পাখির আকার ধারণপূর্বক জীবিত হইয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর বরকতে উসতুওয়ানা কাষ্ঠ থাকা অবস্থায়ই উহা হইতে জীবিতদের ন্যায় আচরণ প্রকাশ পাইয়াছিল। সুতারাং তাঁহার এই মু'জিযা পূর্ববর্তী রাসূলগণের মু'জিযার তুলনায় অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ (দুনিয়া মে ইসলাম কেউ কর ফয়লা, দেওবন্দ ১৩৬৫ হি., পৃ. ১০৩; ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০ খ., পৃ. ৭৬৬; হযরত রাসূলে কারীম (সা) জীবন ও শিক্ষা, ই.ফা.বা., ঢাকা ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ৫৬১-৬২)।