📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ


আবু নাঈম কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, হযরত আবূ উসায়দ (রা) বলেন, একদা মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্য হযরত আব্বাস (রা)-কে বলেন, হে আবুল ফাদল! আগামী কল্য আমি না আসা পর্যন্ত আপনি সন্তান-সন্ততিসহ কোথাও যাইবেন না। আপনার সহিত আমার প্রয়োজন আছে। পরের দিন ভোরে সকলে তাহার প্রতীক্ষায় রহিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আগমন করিলেন। তিনি সকলকে সালাম দিলে সকলেই তাঁহার সালামের উত্তর দিলেন।

তিনি প্রত্যূষের শুভ সমাচার জিজ্ঞাসা করিলে হযরত আব্বাস (রা) প্রত্যূষের শুভ সমাচার জ্ঞাপন করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসুন। সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসিলে তিনি তাঁহার চাদর মুবারক দ্বারা সকলকে ঢাকিয়া লইলেন, অতঃপর দু'আ করিতে লাগিলেন, “হে আমার পালনকর্তা! আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব আমার চাচা; পিতৃ সদৃশ। আর তাঁহার সন্তান-সন্ততি আমার পরিবারভুক্ত। অদ্য আমি স্বীয় চাদরের আবরণ দ্বারা তাহাদেরকে যেমন অন্তরাল করিয়াছি, তদ্রূপ তুমি তাহাদেরকে দোযখের আগুন হইতে দূরে রাখিও।” সঙ্গে সঙ্গে গৃহের দরজার চৌকাঠ, দেওয়াল, প্রাচীর সম্মিলিতভাবে আমীন আমীন বলিতে লাগিল। হযরত ইবন আব্বাস (রা) হইতে বায়হাকীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ, ৫০৫; কাযী 'ইয়ায, আশ- শিফা, ২খ., ৫৯০; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ, পৃ., ৩৫১; আবূ নাঈম, দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৭০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাঘের বাক্যালাপ এবং মহানবী (সা)-এর রিসালাত সম্পর্কে সাক্ষ্যদান

📄 বাঘের বাক্যালাপ এবং মহানবী (সা)-এর রিসালাত সম্পর্কে সাক্ষ্যদান


হযরত রাসূলে কারীম (স)-এর মু'জিযাসমূহের মধ্যে তাঁহার সহিত বাঘের কথা বলা এবং বাঘ কর্তৃক তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের সংবাদ অন্যের নিকট পৌছানো অন্যতম। এই ঘটনা বিভিন্ন সাহাবী হইতে কিছু কিছু শব্দের তারতম্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপটের ভিন্নতাসহ হাদীছ গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু রিওয়ায়াতগুলির মূল প্রতিপাদ্য একই। তবে কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটিয়াছিল। উহার কিছু কিছু রিওয়ায়াত সনদের দিক দিয়া দুর্বল হইলেও মু'জিযার ক্ষেত্রে তাহা গ্রহণযোগ্য। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর এই সম্পর্কে বেশকিছু রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন।

ইমাম আহমাদ (র) আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন, একদা একটি বাঘ একটি বকরীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং তাহা লইয়া গেল। অতঃপর রাখাল উহার অনুসরণ করিয়া বাঘের নিকট হইতে বকরীটি ছিনাইয়া লইয়া আসিল। বাঘটি তখন লেজের উপর বসিয়া বলিল, তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? আল্লাহ যে রিযিক আমার নিকট আনিয়া দিয়াছেন তাহা তুমি আমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া যাইতেছ? রাখালটি বলিল, কী আশ্চর্য! বাঘ আমার সহিত মানুষের ন্যায় কথা বলিতেছে। বাঘটি বলিল, আমি কি তোমাকে ইহা হইতেও আশ্চর্যজনক খবর দিব? মুহাম্মাদ (স) ইয়াছরিবে অতীতের খবর দিতেছেন!

তখন রাখাল তাহার বকরীর পাল তাড়াইয়া লইয়া মদীনায় প্রবেশ করিল। অতঃপর মদীনার এক প্রান্তে বকরীগুলি রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গেল এবং তাঁহাকে উক্ত ঘটনা অবহিত করিল। তখন সালাতের ঘোষণা (আযান) দেওয়া হইল। অতঃপর (সালাতশেষে) রাসূলুল্লাহ (স) বাহিরে আসিয়া রাখালকে বলিলেন, লোকজনকে উহা অবহিত কর। সে লোকজনকে তাহা অবহিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে সত্য বলিয়াছে। সেই সত্তার কসম! যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন। কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হইবে না যতক্ষণ না হিংস্র জন্তু মানুষের সহিত কথা বলে, আর মানুষের সহিত তাহার চাবুকের প্রান্ত, জুতার ফিতা কথা বলিবে এবং তাহার উরুদেশ তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কি কাজ করিয়াছে সেই সংবাদ প্রদান করিবে।

হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়া বলেন, ইহার সনদ সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। বায়হাকী ইহাকে সহীহ বলিয়া প্রত্যয়ন করিয়াছেন। ইমাম তিরমিযী (র) ইহার অংশ বিশেষ বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহাকে হাসান-গারীব-সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬১)

ইমাম আহমাদ (র) আর এক সূত্রে আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, এক বেদুঈন মদীনার এক প্রান্তে তাহার বকরীর কাছে ছিল। একটি বাঘ আসিয়া পাল হইতে একটি বকরী লইয়া গেল। বেদুঈন দৌড়াইয়া গিয়া বাঘের কবল হইতে উহা উদ্ধার করিয়া লইয়া আসিল। বাঘ তাহাকে অনুসরণ করিয়া পিছনে পিছনে আসিল। তারপর চারপায়ের উপর বসিয়া লেজ নাড়াইতে নাড়াইতে লোকটিকে সম্বোধন করিয়া বলিল, তুমি আমার রিযিক লইয়া আসিয়াছ, যে রিযিক আল্লাহ আমাকে দান করিয়াছেন। লোকটি বলিল, 'আহা! কী আশ্চর্য! বাঘ লেজ নাড়াইয়া আমাকে সম্বোধন করিতেছে! তখন বাঘ বলিল, আল্লাহর কসম! তুমি ইহা হইতে অধিক আশ্চর্যের বিষয় রাখিয়া আসিয়াছ। লোকটি বলিল, ইহা হইতে অধিক আশ্চর্যজনক বিষয় আর কি? বাঘ বলিল, রাসূলুল্লাহ (স) দুই মরুভূমির মধ্যখানে দুইটি খেজুর গাছের আড়ালে মানুষের সহিত অতীতে কি ঘটিয়াছে এবং ভবিষ্যতে কি ঘটিবে তাহা লইয়া আলাপ করিতেছেন।

অতঃপর বেদুঈন বকরীগুলিকে চীৎকার দিয়া হাঁকাইয়া লইয়া আসিল এবং মদীনার এক স্থানে রাখিয়া নবী কারীম (স)-এর নিকট চলিয়া আসিল। সে সোজা গিয়া তাঁহার দরজায় করাঘাত করিল। নবী কারীম (স) সালাতশেষে বলিলেন, বকরীর মালিক বেদুঈন কোথায়? তখন লোকটি দাঁড়াইল। নবী কারীম (স) তাহাকে বলিলেন, তুমি যাহা শুনিয়াছ এবং যাহা দেখিয়াছ তাহা লোকজনকে অবহিত কর। অতঃএব সে বাঘটিকে যে অবস্থায় দেখিয়াছিল এবং তাহার নিকট হইতে যাহা শুনিয়াছিল তাহা বর্ণনা করিল। তখন নবী কারীম (স) বলিলেন, সে সত্য বলিয়াছে। কিয়ামতের পূর্বে কিছু নিদর্শন দেখা যাইবে। সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার জীবন! ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হইবে না যতক্ষণ না হিংস্র জন্তু মানুষের সহিত কথা বলে, আর মানুষের সহিত তাহার চাবুকের প্রান্ত, জুতার ফিতা কথা বলিবে এবং তাহার উরুদেশ তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার যাহা করিয়াছে সেই সংবাদ প্রদান করিবে। এই রিওয়ায়াতটি সুনান গ্রন্থের শর্তে উত্তীর্ণ হইলেও ইহার সংকলকগণ ইহা রিওয়ায়াত করেন নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৪)।

একই ঘটনা ইমাম আহমাদ (র) আবূ হুরায়রা (রা) হইতে এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন যে, একটি বাঘ বকরীর রাখালের নিকট আসিয়া পাল হইতে একটি বকরী লইয়া গেল। রাখাল উহার অনুসন্ধানে গিয়া বাঘের নিকট হইতে উহা ছিনাইয়া লইয়া আসিল। অতঃপর বাঘটি একটি টীলায় আরোহণ করিয়া চার পায়ের উপর বসিল এবং লেজ নাড়াইতে নাড়াইতে বলিল, তুমি এমন এক রিযিকের পিছু ধাওয়া করিয়া উহা ছিনাইয়া লইয়াছ যাহা আল্লাহ আমাকে দান করিয়াছেন। লোকটি বলিল, আল্লাহ্র কসম! আজিকার মত আমি আর কখনও দেখিনাই যে, বাঘ কথা বলিতে পারে। বাঘ বলিল, ইহা হইতে বেশী আশ্চর্যের বিষয় সেই লোক, যিনি দুই মরুভূমির মধ্যখানে খেজুরগাছ পরিবেষ্টিত অবস্থায় তোমাদেরকে যাহা অতীত হইয়াছে এবং যাহা তোমাদের পরে ভবিষ্যতে হইবে তাহার খবর দিতেছেন। রাখাল ছিল ইয়াহুদী সম্প্রদায়ভুক্ত। সে নবী কারীম (স)-এর নিকট চলিয়া আসিল, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করিল এবং তাঁহাকে এই সংবাদ অবহিত করিল। নবী কারীম (স) ইহার সত্যায়ন করিলেন এবং বলিলেন, ইহা কিয়ামতের আলামাতসমূহের একটি। অতি সত্বর এমন এক সময় আসিবে যে, লোক ঘর হইতে বাহির হইবে আর তাহার জুতা ও চাবুক তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কি করিয়াছে সেই খবর না দেওয়া পর্যন্ত সে ফিরিবে না (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৫)।

আবূ হুরায়রা (রা)-এর হাদীছ অন্যত্র আরও বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে। সেখানে উল্লিখিত হইয়াছে যে, অতঃপর বাঘটি (রাখালকে) বলিল, তুমিই বরং বেশী আশ্চর্যের। তুমি তোমার বকরীর কাছে দাঁড়াইয়া আছ আর এমন নবীকে ত্যাগ করিয়াছ যাঁহার তুলনায় অধিক সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন নবী আল্লাহ আর কখনও প্রেরণ করেন নাই। জান্নাতের দরজাসমূহ তাঁহার জন্য উন্মুক্ত করা হইয়াছে এবং উহার অধিবাসিগণ তাঁহার সাহাবীদের প্রতি তাঁকাইয়া তাহাদের যুদ্ধ দেখে। তোমার ও তাঁহার মধ্যে কেবল এই ঘাটিরই ব্যবধান। ইহা অতিক্রম করিলেই তুমি আল্লাহ্ সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া যাইবে। রাখাল বলিল, আমার বকরী কে দেখিবে? বাঘ বলিল, তুমি ফিরিয়া আসা পর্যন্ত আমি উহা চরাইব।

অতঃপর লোকটি তাহার বকরীগুলি বাঘের যিম্মায় রাখিয়া চলিয়া গেল। এইভাবে তাহার ইসলাম গ্রহণ এবং নবী কারীম (স)-এর সহিত জিহাদে অংশগ্রহণের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। লোকটি ফিরিয়া আসিয়া তাহার বকরীর পাল আক্ষত অবস্থায়ই পাইল এবং বাঘের জন্য উহার মধ্য হইতে একটি বকরী যবেহ করিল (কাযী 'ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৩১০-৩১১)।

আবূ নু'আয়ম তাঁহার দালাইলুন নুবৃওয়াত গ্রন্থে আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি ইহা তাঁহার নিজের এবং তাবুক যুদ্ধের সময়কার ঘটনা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৫)।

বায়হাকী ইবন উমার (রা) সূত্রে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। সেখানে মন্তব্য করা হইয়াছে যে, হাফিজ ইবন 'আদী বলেন, আবূ বকর ইব্‌ন দাউদ বলিয়াছেন, এই রাখালের বংশধরকে বলা হইত বানু মুকাল্লিমুয-যি'ব (বাঘের সহিত কথোপকথনকারীর বংশধর)। তাহাদের বেশ সম্পদ ও উট ছিল। তাহারা ছিল খুযা'আ বংশের। বাঘের সহিত যে রাখাল কথা বলিয়াছিল তাহার নাম ছিল উতবান। খ্যাতনামা মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ ইব্‌ন আশ'আছ আল-খুযা'ঈ (র) তাঁহারই বংশধর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৬)।

বাঘের ঘটনাটি অন্যভাবেও বর্ণিত হইয়াছে। তাহাতে বাঘ কর্তৃক বকরী শিকারেরর কথা নাই, তবে তাহার জন্য খাবার বরাদ্দ করার প্রস্তাবের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। যেমন আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একটি বাঘ আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে চারি পায়ের উপর ভর করিয়া বসিয়া পড়িল এবং লেজ নাড়াইতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে সমস্ত বাঘের পক্ষ হইতে প্রতিনিধি হইয়া তোমাদের নিকট তোমাদের সম্পদ হইতে কিছু চাহিতে আসিয়াছে। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমরা এইরূপ করিব না। তাহাদের মধ্যকার এক লোক পাথর উঠাইয়া বাঘের দিকে ছুড়িয়া মারিল। ইহাতে বাঘটি পিছনে ফিরিয়া চীৎকার করিতে করিতে চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৬; আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল কুববা, বায়হাকী হামযা ইব্‌ন আবী উসায়দ হইতে এবং আল-ওয়াকিদী আল-মুত্তালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ ইব্‌ন হানতাব হইতে এই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহাদের বর্ণনায় আরও রহিয়াছে যে, সাহাবায়ে কিরাম বাঘটির জন্য কোন অংশ দিতে অস্বীকার করিলে রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে ইশারায় ছিনাইয়া লইতে পরামর্শ দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৭; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৩)। কোন কোন রিওয়ায়াতে এক শত বাঘ আগমনের কথা উল্লিখিত হইয়াছে (প্রাগুক্ত)।

অন্য এক রিওয়ায়াতে দেখা যায়, মক্কায় কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যানের সম্মুখে এই ধরনের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। ইবন ওয়াহব রিওয়ায়াত করিয়াছেন, এই ধরনের একটি ঘটনা আবূ সুফয়ান ইবন হারব ও সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সহিত ঘটিয়াছিল। তাহারা দেখিল, একটি বাঘ একটি শিশুকে (কাযী 'ইয়ায-এর বর্ণনামতে হরিণ) ধাওয়া করিয়া লইয়া যাইতেছে। শিশুটি হারাম শরীফে ঢুকিয়া পড়িল। অতঃপর বাঘটি ফিরিয়া গেল। ইহা দেখিয়া তাহারা অবাক হইয়া গেল। তখন বাঘটি বলিল, ইহা হইতে আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদিল্লাহ মদীনায় তোমাদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকিতেছেন, আর তোমরা তাঁহাকে ডাকিতেছ জাহান্নামের দিকে। আবূ সুফ্যান বলিল, লাত ও 'উযযার কসম! তুমি এই কথা যদি মক্কায় বলিতে তাহা হইলে উহার অধিবাসিগণ মক্কা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইত (কাযী 'ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৩১১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৭; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫১৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (স)-এর সহিত হরিণীর বাক্যালাপ

📄 মহানবী (স)-এর সহিত হরিণীর বাক্যালাপ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাসমূহের একটি হইল জঙ্গলের হরিণের তাঁহার সহিত কথা বলা এবং তাঁহার সহিত কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করা। এই সম্পর্কে তিনটি রিওয়ায়াত পাওয়া যায়, যাহাদের মর্ম প্রায় একই। একটি রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:

আবূ নু'আয়ম আল-ইসফাহানী তাঁহার দালাইলুন-নুবৃওয়াত গ্রন্থে আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে উল্লেখ করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) একটি কওমের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তাহারা একটি হরিণ শিকার করত উহাকে তাঁবুর খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিয়াছিল। হরিণী বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে পাকড়াও করা হইয়াছে, অথচ আমার দুইটি দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা রহিয়াছে। তাই আপনি তাহাদের নিকট হইতে আমাকে একটু অনুমতি লইয়া দিন যাহাতে আমি বাচ্চাদের দুধ পান করাইয়া আবার তাহাদের নিকট ফিরিয়া আসিতে পারি।

তিনি বলিলেন, ইহার মালিক কোথায়? কওমের লোকেরা বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা। তিনি বলিলেন, ইহাকে ছাড়িয়া দাও। সে তাহার বাচ্চার নিকট গিয়া উহাদের দুধ পান করাইয়া তোমাদের নিকট আবার ফিরিয়া আসিবে। তাহারা বলিল, আমাদের জন্য ইহার জামিন হইবে কে? তিনি বলিলেন, আমি। অতঃপর তাহারা হরিণীকে ছাড়িয়া দিল। হরিণী গিয়া তাহার বাচ্চাদের দুধ পান করাইয়া তাহাদের নিকট ফিরিয়া আসিল। অতঃপর তাহারা হরিণীকে বাঁধিয়া ফেলিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি উহাকে আমার নিকট বিক্রয় করিবে? তাহারা বলিল, উহা আপনার জন্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বলিলেন, তোমরা উহাকে ছাড়িয়া দাও। অতঃপর তাহারা হরিণীকে ছাড়িয়া দিল এবং উহা চলিয়া গেল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৮; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬১)।

বাকী দুইটি রিওয়াতে হরিণীটি এই কালিমা উচ্চারণের উল্লেখ আছে: اشهد ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল” (আল - বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৯-৭০; আল - খাসাইসুল কুবরা, ২খ.,

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গুইসাপের আশ্চর্যজনক বাকশক্তি লাভ

📄 গুইসাপের আশ্চর্যজনক বাকশক্তি লাভ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাসমূহের মধ্যে গুইসাপের তাঁহার সহিত কথা বলা এবং তাঁহার রিসালাত ও আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্ক সাক্ষ্য দেওয়া অন্যতম। ঘটনাটি বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে উল্লিখিত হইয়াছে। ইমাম বায়হাকী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) একবার তাঁহার সাহাবীদের এক মাহফিলে ছিলেন। তখন বানু সুলায়ম গোত্রের এক বেদুঈন তাঁহার নিকট আসিল। সে একটি গুইসাপ শিকার করিয়া তাহার আস্তিনের মধ্যে করিয়া লইয়া আসিয়াছিল। তাহার উদ্দেশ্য ছিল স্বীয় আস্তানায় গিয়া উহা ভূনা করিয়া খাইবে। অতঃপর সে দলবদ্ধ লোকজন তথা রাসূলুল্লাহ (স)-কে সাহাবীদের সঙ্গে দেখিয়া বলিল, ইহা কি? লোকজন বলিল, এই ব্যক্তি বলে যে, সে নবী। তখন বেদুঈনটি ভীড় ঠেলিয়া সম্মুখে অগ্রসর হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, লাত ও উয্যার কসম! মহিলারা যাহাদিগকে দুধ পান করাইয়াছে তাহাদের মধ্যে আমার নিকট তোমা হইতে বেশী ঘৃণিত ও বেশী ক্রোধের পাত্র আর কেহ নাই। আমার কওম যদি আমাকে আজুল (তাড়াহুড়াকারী) নাম না রাখিত তবে অবশ্যই আমি দ্রুত তোমাকে হত্যা করিতাম এবং ইহাতে আনন্দিত হইতাম।

তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি তাহাকে হত্যা করি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! তুমি কি জান না যে, ধৈর্যশীল ব্যক্তি নবী হওয়ার কাছাকাছি? অতঃপর তিনি বেদুঈনের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, তুমি যাহা বলিয়াছ তাহা বলিতে কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছে? তুমি নাহক কথা বলিয়াছ। তুমি আমার মজলিসে আমাকে সম্মান কর নাই কেন? বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাচ্ছিল্যভরে বলিল, তুমি আমার সহিত কথাও বলিতেছ! এই গুইসাপটি তোমার উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত আমি তোমার উপর ঈমান আনিব না। এই বলিয়া সে নিজ জামার হাতার ভিতর হইতে গুইসাপটি বাহির করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে ছুড়িয়া ফেলিল। রাসূলুল্লাহ (স) গুইসাপটিকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, হে গুইসাপ! গুইসাপটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট আরবী ভাষায় তাঁহার ডাকের উত্তর দিল যাহা কওমের সকলেই শুনিতে পাইল। সে বলিল, লাব্বায়কা ওয়া সা'দায়ক। لبيك وسعديك يا زين من وافي القيامة "আমি হাজির। আপনার কল্যাণ হউক, হে কিয়ামত পর্যন্ত আগতদের মধ্যে সুন্দরতম ব্যক্তি"! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কাহার ইবাদাত কর হে গুইসাপ? গুইসাপ বলিল: الذي في السماء عرشه وفي الارض سلطانه وفي البحر سبيله وفي الجنة رحمته وفي النار عقابه "আকাশে যাঁহার আরশ রহিয়াছে; পৃথিবীতে যাঁহার ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে; সমুদ্রের মধ্যে যাঁহার পথ রহিয়াছে; জান্নাতে যাঁহার রহমত এবং জাহান্নামে যাঁহার শাস্তি রহিয়াছে"। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি কে হে গুইসাপ? গুইসাপ বলিল : انت رسول رب العالمين وخاتم النبيين قد افلح من صدقك وقد خاب من كذبك "আপনি জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল, সর্বশেষ নবী। যে আপনাকে সত্যবাদী বলিয়া বিশ্বাস করিবে সে সফলকাম হইবে। আর যে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলিবে সে ধ্বংস হইয়া যাইবে"। কোন কোন রিওয়ায়াতে গুইসাপের একটি দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তির কথাও উল্লেখ করা হইয়াছে (দ্র. ইব্‌ন জাওযী, আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ৩৩৮)।

এই কথা শুনিয়া বেদুঈন বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমি চাক্ষুষ দেখার পর আর কাহারও কথার অনুসরণ করিব না। আল্লাহ্র কসম। আমি এমতাবস্থায় আসিয়াছিলাম যে, পৃথিবীর বুকে আপনার তুলনায় অধিক ঘৃণিত ব্যক্তি আমার নিকট আর কেহ ছিল না। আর আজ আপনি আমার নিকট আমার পিতা, আমার চক্ষু ও খোদ আমার নিজ হইতে অধিক প্রিয়। আমি আপনাকে ভিতরে-বাহিরে গোপনে-প্রকাশ্যে ভালবাসি। আর আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নাই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাকে আমার দ্বারা হিদায়াত দান করিয়াছেন। এই দীন নিশ্চয়ই বিজয়ী হইবে; বিজিত হইবে না। অতঃপর বেদুঈন তাহার কওমের নিকট গিয়া এই সংবাদ জানাইলে কওমের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৭০; কাযী 'ইয়ায; আশ-শিফা, ২খ., পৃ. ৩০৯-৩১০; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ৩৩৬-৩৮; মাজমাউয যাওয়াইদ, ৮খ., পৃ. ২৯২-৯৩)।

এই রিওয়ায়াত সম্পর্কে অনেকে অনেক সমালোচনা করিয়াছেন। যেমন ইমাম বায়হাকী বলেন, এই সম্পর্কে হযরত 'আইশা (রা) ও আবূ হুরায়রা (রা) হইতেও হাদীছ বর্ণিত আছে। তবে এইসব বর্ণনা যঈফ। আয-যাহাবী (র) বলেন, আল্লাহ্র কসম! বায়হাকী সত্য বলিয়াছেন। কারণ ইহা বাতিল খবর। আল-মুযানী ও ইব্‌ন তায়মিয়া ইহার কঠোর সমালোচনা করিয়াছেন এবং ইহাকে কাহিনীকারের বানানো গল্প বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। তবে আল-হায়ছামী ইহাকে খুবই যুক্তিসংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য মত বলিয়া ব্যক্ত করিয়াছেন। তিনি বলেন, ইহার সনদে এমন কোনও রাবী নাই, যাহাকে মনগড়া হাদীছ বানাইবার অপবাদ দেওয়া হইয়াছে। তবে ইহা ঠিক যে, তাহাদের মধ্যে দুর্বলতা রহিয়াছে। এই ধরনের দুর্বলতার কারণে ইহাকে 'মনগড়া' বা 'বানানো' বলিয়া মন্তব্য করা যায় না। নবী করীম (স)-এর মু'জিযা অতি বিশাল ব্যাপার। উহাতে এমনও বিষয় রহিয়াছে যাহা ইহা হইতেও আশ্চর্যজনক। তাই তাহার মধ্যে শারী'আতের দৃষ্টিকোণ হইতে অস্বীকার করিবার মত কিছুই নাই। উপরন্তু এই সম্পর্কে ইমামগণের রিওয়ায়াত রহিয়াছে। ইহা যঈফ ঠিকই তবে তাই বলিয়া মনগড়া বা বানানো কাহিনীর পর্যায়ভুক্ত নহে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫২১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00