📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহুদীদের চক্রান্ত হইতে রক্ষা

📄 ইয়াহুদীদের চক্রান্ত হইতে রক্ষা


আবদুর রহমান ইব্‌ন কা'ব ইব্‌ন মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জনৈক সাহাবী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায় এবং মূর্তিপূজকদিগকে এই মর্মে পত্র লিখিল, আপনারা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়াছেন। এই কারণে আমরা আল্লাহ্র কসম খাইয়া বলিতেছি, আপনারা হয় তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন অথবা তাহাকে মদীনা হইতে বাহির করিয়া দিন। যদি উহা না করেন তবে আমরা সর্বশক্তি দিয়া আপনাদের উপর ঝাপাইয়া পড়িব এবং আপনাদের যোদ্ধা পুরুষদেরকে হত্যা করিব ও আপনাদের মহিলাদের সম্মান বিনষ্ট করিব। এই চিঠি পাইবার পরই ইব্‌ন উবায় এবং তাহার মূর্তিপূজারী সাথীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিবার পর তিনি তাহাদের সহিত সাক্ষাত করেন এবং বলেন, মনে হইতেছে মক্কার কুরায়শদের হুমকিতে তোমরা যথেষ্ট প্রভাবিত হইয়াছ। কিন্তু উহা তোমাদের জন্য এতো মারাত্মক নয়, যতনা ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করিবে। কেননা তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সংকল্প করিয়াছ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কথা শুনিয়া তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল এবং যুদ্ধ করা হইতে বিরত থাকিল। বদর যুদ্ধের পর মক্কার কুরায়শরা আবার ইয়াহুদীদের নিকট পত্র লিখিল, তোমরা ঘরবাড়ি ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সঙ্গীর (মুহাম্মাদ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। অন্যথা আমরা তোমাদের সহিত যাহা করার করিব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে কোন পার্থক্য থকিবে না। এইরূপ চিঠি পাইবার পর বানু নাযীরের ইয়াহুদীরা সন্ধি ভঙ্গ করিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই মর্মে অবহিত করিল, আপনি আপনার সঙ্গীদের ত্রিশজন লইয়া আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করিবে। তাহারা আগনার কথা শুনিবে। যদি তাহারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের কথায় সম্মত হইলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের পরিকল্পনা ছিল, রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্জনে আনিয়া হত্যা করিবে। ইহার জন্য তাহারা তরবারি লইয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে বানু নাষীরের এক মহিলা অবহিত হইয়া সে তাহার ভাই আনসারী মুসলমানের নিকট সংবাদ দিল। ঐ মহিলার ভাই রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই সম্পর্কে অবগত করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌছিবার পূর্বেই যেন ফিরিয়া আসেন। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে হিফাযত করেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪২১, হাদীছ ৪০২৮, ৪০৩২; আবূ দাউদ, ৩খ, পৃ. ১৫৫, হাদীছ নং ৩০০৪)।

রাসূলুল্লাহ (স) একদা তাঁহার কয়েকজন সাহাবাকে লইয়া বানু আমেরের দুই ব্যক্তির রক্তপণ পরিশোধে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে বানু নাযীরের নিকট গমন করেন, যাহাদিগকে হযরত আমর ইবন উমায়‍্যা আদ-দামরী (রা) ভুলক্রমে হত্যা করিয়াছিলেন। তখন তাহারা বলিল, আপনি আপনার সংগীদেরকে লইয়া এই স্থানে অপেক্ষা করুন, আমরা ব্যবস্থা করিতেছি। এই কথার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের একটি দেয়ালের সহিত হেলান দিয়া বসিয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। এমন সময় তাহারা গোপনে বলাবলি করিল, এই মুহূর্তের মত মুহাম্মাদকে এত নিকটে তোমরা আর কখনও পাইবে না। সুতরাং এমন কে আছে যে ঐ ঘরের ছাদে উঠিয়া বিরাট পাথর খণ্ড তাঁহার উপর নিক্ষেপ করিয়া তাঁহার উপদ্রব হইতে আমাদেরকে রক্ষা করিবে? তখন আমর ইবন জাহ্হাশ ইব্‌ন কা'ব বলিল, আমি পারিব। সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স)-র নিকট জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত সেই স্থান হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। সাহাবীগণ তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এতো দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহাবীদেরকে অবহিত করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪২০, হাদীছ ৪০২৮, ৪০৩২; ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৩৪)।

'আইশা (রা) বলেন, খায়বার যুদ্ধের পর সাল্লাম ইবন মিশকামের স্ত্রী যয়নব বিনত হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বকরির ভূনা গোশত উপঢৌকন হিসাবে পাঠায়। সেই নারী আগেই খবর লইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ বকরীর কোন অংশ বেশী পছন্দ করেন। তদনুযায়ী সে পছন্দনীয় অংশে বেশী করিয়া বিষ মিশ্রিত করে, অন্যান্য অংশেও বিষ মিশ্রিত করে। রাসূলুল্লাহ (স) পছন্দনীয় অংশের এক টুকরা মুখে দেন, কিন্তু চিবিয়াই ফেলিয়া দিলেন। অতঃপর বলিলেন, এই যে হাড় দেখিতেছ, ইহা আমাকে বলিতেছে, উহার মধ্যে বিষ মিশ্রিত রহিয়াছে। যয়নবকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবার পর সে স্বীকার করিল। তিনি বলিলেন, তুমি কেন এই কাজ করিয়াছ? সে বলিল, আমি ভাবিয়াছিলাম, যদি আপনি বাদশাহ হন তবে আমরা তাঁহার শাসন হইতে মুক্তি পাইব। আর যদি এই ব্যক্তি নবী হন তবে আমার বিষ মিশানোর খবর তাঁহাকে জানাইয়া দেওয়া হইবে। এই বিষ মিশ্রিত গোশত ভক্ষণ করা হইতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূলকে এইভাবে হিফাযত করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৬৩৩, হাদীছ ৪২৪৯)।

বদর যুদ্ধের কয়েক দিন পরের কথা। 'উমায়র ইবন ওয়াত্ব নামক এক কুরায়শ রাসূলুল্লাহ (স)-কে নানাভাবে কষ্ট দিত। এই 'উমায়র একদিন কা'বার হাতীমে বসিয়া সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সহিত বদরের যুদ্ধে নিহতদের লাশ বদরের একটি নোংরা কূপে নিক্ষেপ করিবার দুঃখজনক ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করিতেছিল। এক পর্যায়ে সাফওয়ান বলিল, আল্লাহ্ কসম। তাহাদের অনুপস্থিতিতে বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কোন স্বাদ নাই। উত্তরে 'উমায়র বলিল, আল্লাহ্র কসম! তুমি সত্য কথাই বলিয়াছ। দেখো, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হইতাম, আমার পরিবার-পরিজনের যদি চিন্তা না থাকিত তাহা হইলে আমি মদীনায় গিয়া মুহাম্মাদকে হত্যা করিতাম। সাফওয়ান সব কথা শুনিয়া 'উমায়রকে বলিল, তোমার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আমি তোমার পক্ষ হইতে ঋণ পরিশোধ করিয়া দিব। তোমার পরিবারকে আজীবন আমার নিজের পরিবারের ন্যায় দেখাশুনা করিব। 'উমায়র বলিল, তবে আমাদের এই কথা যেন গোপন থাকে। সাফওয়ান বলিল, হাঁ।

অতঃপর 'উমায়র তাহার তরবারি ধারাল করিল এবং উহাতে বিষ মিশ্রিত করিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইল। মদীনায় পৌঁছিয়া সে মসজিদে নববীর সামনে উট বসাইতেছিল, এমতাবস্থায় 'উমার (রা)-এর দৃষ্টি তাহার উপর পড়িল। উমায়রকে দেখামাত্র 'উমার (রা) বলিলেন, এই নরাধম! আল্লাহর দুশমন! নিশ্চয় তুমি কোন খারাপ উদ্দেশ্যে আসিয়াছ? হযরত 'উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে সংবাদ দিলেন যে, 'উমায়র তরবারি ঝুলাইয়া আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে আমার কাছে লইয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসার পর তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'উমায়র! তুমি কেন আসিয়াছ? সে বলিল, আপনাদের কাছে আমাদের যে বন্দী রহিয়াছে তাহাদের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য আসিয়াছি। তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে তোমার গলায় তরবারি কেন? সে বলিল, আল্লাহ এই তরবারি নিপাত করুন, ইহা কি আর আমাদের কোন কাজে আসিবে? তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, সত্যি করিয়া বল, কেন আসিয়াছ? সে পুনরায় বলিল, যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে আসিয়াছি। তিনি বলিলেন, তুমি মিথ্যা বলিতেছ। বরং তুমি এবং সাফওয়ান কা'বার হাতীমে বসিয়া কুরায়শদের লাশ কূপে ফেলিবার প্রসঙ্গ লইয়া আফসোস করিতেছিলে। তুমি এক পর্যায়ে বলিয়াছিলে, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হইতাম এবং আমার যদি পরিবার-পরিজন না থাকিত, তবে এই স্থান হইতে গিয়া মুহাম্মাদকে শেষ করিয়া দিতাম। এই কথা শুনিবার পর সাফওয়ান তোমার ঋণ এবং পরিবারের দায়িত্ব নিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আমাকে হত্যার ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক আমার এবং তোমার মধ্যে অন্তরায় হইয়া রহিয়াছেন।

'উমায়র বলিল, ইহা তো এমন ব্যাপার যাহা আমি ও সাফওয়ান ব্যতীত সেই স্থানে অন্য কেহ উপস্থিত ছিল না। কাজেই আমি আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি, ইহা আল্লাহ ব্যতীত আপনাকে অন্য কেহ জানান নাই। এই বলিয়া 'উমায়র ইসলাম গ্রহণ করিলেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২২৭-২২৮)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, যেই রাত্রে এক দল জিনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আকৃষ্ট করা হইয়াছিল আমি সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত ছিলাম। ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, একজন জিন অগ্নিশিখা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে আসিল। তখন জিবরাঈল (আ) বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আপনাকে একটি দু'আ শিক্ষা দিব, পাঠ করিলে তাহার অগ্নি নির্বাপিত হইয়া যাইবে। অতঃপর জিবরাঈল বলিলেন, আপনি বলুন: اعوذ بكلمات الله التامة التي لا يجاوزهن بر ولا فاجر من شر ما ينزل من السماء وما يعرج فيها ومن شر ما ذرأ في الارض وما يخرج منها ومن شر فتن الليل ومن شر طوارق الليل والنهار الا طارقاً يطرق بخير يا رحمن "আমি আল্লাহ্ আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি, যিনি বড়ই অনুগ্রহকারী এবং তাঁহার ঐসমস্ত পরিপূর্ণ কলেমার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি যাহা নেককার অথবা বদকার অতিক্রম করিতে পারে না, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন এবং ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা আসমান হইতে অবতরণ করে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা আসমানে আরোহণ করে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা যমীনে বিস্তার করিয়াছে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা যমীন হইতে বাহির হয় এবং রাত্রি ও দিনের ফিৎনার অনিষ্ট হইতে এবং প্রত্যেক রাত্রিতে আগমনকারী দুর্ঘটনার অনিষ্ট হইতে, ঐ আগমনকারী ঘটনা ব্যতীত যাহা কল্যাণ বহিয়া আনে। হে দয়ালু" (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৪৯)।

হযরত জাবির (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নাজদের দিকে সংঘটিত একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। উক্ত সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অতিশয় কণ্টকযুক্ত বৃক্ষবেষ্টিত এক উপত্যকায় দেখিতে পাই যে, তিনি একটি গাছের নিচে অবতরণ করিয়া একটি ডালে তরবারি ঝুলাইয়া রাখিলেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, লোকেরা তখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া উপত্যকায় গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করিতেছিল। জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম, সেই সুযোগে গাওরাস ইবনুল হারিছ নামক এক লোক আমার নিকট আসিয়া তরবারি ধারণ করিয়া আমাকে বলিল, আমা হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি উত্তর দিলাম "আল্লাহ”! আল্লাহর নাম শুনিবামাত্র তাহার দেহে কম্পন শুরু হইয়া তরবারিটি তাহার হাত হইতে পড়িয়া গেল এবং সে সেইখানে বসিয়া পড়িল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) গাত্রোত্থান করিয়া তরবারিটি হাতে লইয়া বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? কোন উপায়ন্তর না দেখিয়া সে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখিয়া সে ইসলাম গ্রহণ করিল এবং স্বগোত্রের লোকদের নিকট যাইয়া বলিল, আমি মুহাম্মাদের চাইতে উত্তম মানুষ আর কখনও দেখি নাই (বুখারী, পৃ. ৫৭০, হাদিছ ২৯১৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩)।

ফাদাল। ইবন 'উমার (রা) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) যখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করিতেছিলেন, তখন আমি মনে মনে ভাবিতেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (স)-কে শেষ করিয়া দিব। কিন্তু আমি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম তখন তিনি বলিলেন, ফাদালা মনে মনে কি ভাবিতেছ? আল্লাহ্র রাসূলকে শহীদ করিয়া দিতে চাহিতেছ? আমি বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অতঃপর তিনি হাসিলেন এবং আমার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মুবারক হাত আমার বুকে রাখিলেন। তখন আমার অবস্থা এমন হইল যে, পৃথিবীর সকল বস্তু হইতে তিনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হইয়া গেলেন (মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৮৯; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৯২)।

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে আরবের বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন গোত্র হইতে আনুগত্য প্রকাশ ও সন্ধি স্থাপনের জন্য প্রতিনিধি দলসমূহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিতে থাকে। তেমনি এক প্রতিনিধি দল আসে বানু আমের হইতে। এই প্রতিনিধি দলে আমের ইবন তুফায়ল, আব্বাদ ইবন কায়স এবং জাব্বার ইবন সালামা এই তিন নেতা ছিল উল্লেখযোগ্য। মূলত আমের ইবন তুফায়ল আসিয়াছিল কোন এক বাহানায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে। তাহার সঙ্গী আব্বাদকে সে বলিল, মুহাম্মাদের কাছে গিয়া একটা কিছু বাহানা করিয়া আমি তাহাকে অন্যমনষ্ক করিব। তুমি এই সুযোগ তাঁহার উপর তরবারি চালাইবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া আমের বলিল, মুহাম্মাদ! একটু এই দিকে আসুন তো। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি আল্লাহ্র উপর ঈমান না আনা পযর্ন্ত আমি আসিব না। সে পুনরায় একই অনুরোধ জানাইল। রাসূলুল্লাহ (স) এইবারও প্রত্যাখান করিলেন। তখন সে ক্ষিপ্ত হইয়া বলিল, ঈশ্বরের নামে বলিতেছি, আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ঘোড়া এবং যোদ্ধা দিয়া দেশ ভরিয়া দির। তাহারা চলিয়া যাইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইয়া আল্লাহ! আমেরের দুরভিসন্ধি হইতে হিফাযত কর। পথে আমের আব্বাদকে জিজ্ঞাসা করিল, ব্যাপার কি আব্বাদ? কথামত কাজ করিলে না কেন? পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র লোক, যাহাকে আমি সমীহ করিতাম। আজ হইতে আর তাহা থাকিল না।

আব্বাদ বলিল, আমার ব্যাপারে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিও না। তোমার কথামত যতবার আমি মুহাম্মাদকে মারিবার উদ্দ্যোগ লইয়াছি, ততবারই তুমি আমার সামনে আসিয়া আড়াল হইয়াছ। তবে কি তরবারি দিয়া তোমাকেই মারিব? এইভাবে আল্লাহ তাঁহার হাবীবকে বাঁচাইয়া লইলেন (দালাইলুন নুবুওয়াত, পৃ. ১৬২-১৬৩)।

হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত হুনায়নের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এক পর্যায়ে তাঁহার সাহাবীগণ পিছু হটিয়া আসেন। পরিশেষে কাফিররা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলে, তখন রাসূলুল্লাহ (স) খচ্চর হইতে নিচে নামিয়া যমীন হইতে এক মুষ্ঠি মাটি লইলেন এবং তিনি তাহাসহ কাফিরদের দিকে অগ্রসর হইয়া বলেন : شاهت الوجوه "মুখমণ্ডল কদর্য হউক"। অতঃপর আল্লাহ তাহাদের প্রতিটি ব্যক্তির চক্ষুদ্বয় উক্ত মাটিদ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন। ফলে তাহারা সকলে পিছু হটিয়া যায় এবং মহান আল্লাহ কাফিরদের পরাজিত করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের হইতে প্রাপ্ত গনীমতের মাল সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন (ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৩৯, হাদীছ ৪৩১৭)।

শায়বা ইবন 'উছমান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন হুনায়নের যুদ্ধে যান তখন আমার পিতা ও চাচার কথা স্মরণ হইল। তাহাদেরকে হযরত 'আলী ও হামযা (রা) হত্যা করিয়াছিলেন। আমি মনে মনে ভাবিলাম, আজ মুহাম্মাদের উপর প্রতিশোধ লইব। যখন আমি তাঁহার কাছে আগাইয়া গেলাম, দেখিলাম আব্বাস (রা) তাঁহার ডান পার্শ্বে। বামদিকে গেলাম দেখিলাম তাঁহার চাচাত ভাই আবু সুফ্যান ইবনুল হারিছ তাঁহার বাম পার্শ্বে। অতঃপর আমি পিছন দিক দিয়া আসিলাম এবং একেবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া গেলাম। যখন তরবারি দিয়া আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে উদ্যত হইলাম হঠাৎ বিদ্যুতের ন্যায় অগ্নি স্ফুলিঙ্গ আসিয়া পড়িল। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পিছনে সরিয়া গেলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, শায়বা! আমার কাছে আস। তিনি আমার বুকে হাত রাখিলেন। ইহাতেই আল্লাহ তা'আলা আমার ভিতর হইতে শয়তানী দূর করিয়া দিলেন। আমি তাঁহার পবিত্র চেহারার দিকে তাকাইবা মাত্রই তিনি আমার কাছে প্রাণের চাইতে প্রিয় হইয়া গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, শায়বা। যাও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৯১-৯২; দালাইলুন নুবুওয়াত, পৃ. ১৫১)।

হযরত 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাদু করার ফলে তাঁহার অবস্থা এমন হইল যে, তিনি যেই কাজ করেন নাই, তাহা সম্পর্কেও ধারণা হইত যে, তিনি কাজটি করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই ব্যাপারে আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন। অতঃপর তিনি একদিন 'আইশা (রা)-কে বলিলেন, আমার রোগটা কি, মহান আল্লাহ তাহা আমাকে বলিয়া দিয়াছেন। (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি আসিল, একজন শিয়রে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসিয়া গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্যজনকে বলিল, তাঁহার অসুখটা কি? অন্যজন বলিল, ইনি যাদুগ্রস্ত। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, কে যাদু করিয়াছে? উত্তর দিল, ইয়াহুদীদের মিত্র মুনাফিক লাবীদ ইবন আসাম্ম। আবার প্রশ্ন করা হইল, কি বস্তুতে যাদু করিয়াছে? উত্তর হইল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হইল, চিরুণীটি কোথায়? উত্তর হইল, খেজুর ফলের আবরণীতে বির যারওয়ান কূপে একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়া রাখা হইয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেই কূপের নিকট গিয়া বলিলেন, স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) 'আইশা (রা)-কে ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, কূপের পানি মেহেন্দি ভিজা পানির মত হইয়া আছে। পরবর্তীতে জিনিসগুলি বাহির করিয়া আনিলেন। তাহাতে একটা চিত্র ছিল। চিত্রে একটা ধনুকের ছিলায় এগারটা গিরা ছিল। এই সময় সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হয়। এই সূরাদ্বয় পাঠ করিলে গিরাগুলি খুলিয়া যায়। সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া যান (ফাতহুল-বারী, ১০খ., পৃ. ২৭২-২৯০, হাদীছ ৫৭৬৩-৫৭৬৬; ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৬১২; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৯৯)।

ইসলামী বাহিনী তাবুক অভিযান হইতে বিজয়ের বেশে ফিরিবার পথে এক জায়গায় একটি ঘাটিতে ১২জন মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার চেষ্টা করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত ছিলেন হযরত আম্মার (রা) ও হযরত হুযায়ফা (রা)। অন্য সাহাবীগণ তখন দূরে ছিলেন। মুনাফিক কুচক্রীরা এই সময়কে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিবার জন্য অগ্রসর হইল। ১২জন মুনাফিক নিজেদের চেহারা ঢাকিয়া অগ্রসর হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ব্যাপারটা বুঝিতে পারিলেন। তিনি হযরত হুযায়ফা (রা)-কে পাঠাইলেন। হুযায়ফা (রা) পিছনের দিকে গিয়া মুনাফিকদের বাহন উটগুলিকে এলোপাথাড়ি আঘাত করিতে লাগিলেন। এই আঘাতের প্রভাবে আল্লাহ তাহাদেরকে দ্রুত পিছনের দিকে সরাইয়া দিলেন। মহান আল্লাহ এইভাবে তাঁহাকে তাহাদের অনিষ্ট হইতে রক্ষা করেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৩৪; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩৩১-৩২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ


আবু নাঈম কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, হযরত আবূ উসায়দ (রা) বলেন, একদা মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্য হযরত আব্বাস (রা)-কে বলেন, হে আবুল ফাদল! আগামী কল্য আমি না আসা পর্যন্ত আপনি সন্তান-সন্ততিসহ কোথাও যাইবেন না। আপনার সহিত আমার প্রয়োজন আছে। পরের দিন ভোরে সকলে তাহার প্রতীক্ষায় রহিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আগমন করিলেন। তিনি সকলকে সালাম দিলে সকলেই তাঁহার সালামের উত্তর দিলেন।

তিনি প্রত্যূষের শুভ সমাচার জিজ্ঞাসা করিলে হযরত আব্বাস (রা) প্রত্যূষের শুভ সমাচার জ্ঞাপন করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসুন। সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসিলে তিনি তাঁহার চাদর মুবারক দ্বারা সকলকে ঢাকিয়া লইলেন, অতঃপর দু'আ করিতে লাগিলেন, “হে আমার পালনকর্তা! আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব আমার চাচা; পিতৃ সদৃশ। আর তাঁহার সন্তান-সন্ততি আমার পরিবারভুক্ত। অদ্য আমি স্বীয় চাদরের আবরণ দ্বারা তাহাদেরকে যেমন অন্তরাল করিয়াছি, তদ্রূপ তুমি তাহাদেরকে দোযখের আগুন হইতে দূরে রাখিও।” সঙ্গে সঙ্গে গৃহের দরজার চৌকাঠ, দেওয়াল, প্রাচীর সম্মিলিতভাবে আমীন আমীন বলিতে লাগিল। হযরত ইবন আব্বাস (রা) হইতে বায়হাকীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ, ৫০৫; কাযী 'ইয়ায, আশ- শিফা, ২খ., ৫৯০; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ, পৃ., ৩৫১; আবূ নাঈম, দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৭০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাঘের বাক্যালাপ এবং মহানবী (সা)-এর রিসালাত সম্পর্কে সাক্ষ্যদান

📄 বাঘের বাক্যালাপ এবং মহানবী (সা)-এর রিসালাত সম্পর্কে সাক্ষ্যদান


হযরত রাসূলে কারীম (স)-এর মু'জিযাসমূহের মধ্যে তাঁহার সহিত বাঘের কথা বলা এবং বাঘ কর্তৃক তাঁহার নবৃওয়াত ও রিসালাতের সংবাদ অন্যের নিকট পৌছানো অন্যতম। এই ঘটনা বিভিন্ন সাহাবী হইতে কিছু কিছু শব্দের তারতম্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপটের ভিন্নতাসহ হাদীছ গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু রিওয়ায়াতগুলির মূল প্রতিপাদ্য একই। তবে কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটিয়াছিল। উহার কিছু কিছু রিওয়ায়াত সনদের দিক দিয়া দুর্বল হইলেও মু'জিযার ক্ষেত্রে তাহা গ্রহণযোগ্য। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর এই সম্পর্কে বেশকিছু রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন।

ইমাম আহমাদ (র) আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন, একদা একটি বাঘ একটি বকরীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং তাহা লইয়া গেল। অতঃপর রাখাল উহার অনুসরণ করিয়া বাঘের নিকট হইতে বকরীটি ছিনাইয়া লইয়া আসিল। বাঘটি তখন লেজের উপর বসিয়া বলিল, তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না? আল্লাহ যে রিযিক আমার নিকট আনিয়া দিয়াছেন তাহা তুমি আমার নিকট হইতে ছিনাইয়া লইয়া যাইতেছ? রাখালটি বলিল, কী আশ্চর্য! বাঘ আমার সহিত মানুষের ন্যায় কথা বলিতেছে। বাঘটি বলিল, আমি কি তোমাকে ইহা হইতেও আশ্চর্যজনক খবর দিব? মুহাম্মাদ (স) ইয়াছরিবে অতীতের খবর দিতেছেন!

তখন রাখাল তাহার বকরীর পাল তাড়াইয়া লইয়া মদীনায় প্রবেশ করিল। অতঃপর মদীনার এক প্রান্তে বকরীগুলি রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গেল এবং তাঁহাকে উক্ত ঘটনা অবহিত করিল। তখন সালাতের ঘোষণা (আযান) দেওয়া হইল। অতঃপর (সালাতশেষে) রাসূলুল্লাহ (স) বাহিরে আসিয়া রাখালকে বলিলেন, লোকজনকে উহা অবহিত কর। সে লোকজনকে তাহা অবহিত করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে সত্য বলিয়াছে। সেই সত্তার কসম! যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের জীবন। কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হইবে না যতক্ষণ না হিংস্র জন্তু মানুষের সহিত কথা বলে, আর মানুষের সহিত তাহার চাবুকের প্রান্ত, জুতার ফিতা কথা বলিবে এবং তাহার উরুদেশ তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কি কাজ করিয়াছে সেই সংবাদ প্রদান করিবে।

হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করিয়া বলেন, ইহার সনদ সহীহ-এর শর্তে উত্তীর্ণ। বায়হাকী ইহাকে সহীহ বলিয়া প্রত্যয়ন করিয়াছেন। ইমাম তিরমিযী (র) ইহার অংশ বিশেষ বর্ণনা করিয়াছেন এবং ইহাকে হাসান-গারীব-সহীহ বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬১)

ইমাম আহমাদ (র) আর এক সূত্রে আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, এক বেদুঈন মদীনার এক প্রান্তে তাহার বকরীর কাছে ছিল। একটি বাঘ আসিয়া পাল হইতে একটি বকরী লইয়া গেল। বেদুঈন দৌড়াইয়া গিয়া বাঘের কবল হইতে উহা উদ্ধার করিয়া লইয়া আসিল। বাঘ তাহাকে অনুসরণ করিয়া পিছনে পিছনে আসিল। তারপর চারপায়ের উপর বসিয়া লেজ নাড়াইতে নাড়াইতে লোকটিকে সম্বোধন করিয়া বলিল, তুমি আমার রিযিক লইয়া আসিয়াছ, যে রিযিক আল্লাহ আমাকে দান করিয়াছেন। লোকটি বলিল, 'আহা! কী আশ্চর্য! বাঘ লেজ নাড়াইয়া আমাকে সম্বোধন করিতেছে! তখন বাঘ বলিল, আল্লাহর কসম! তুমি ইহা হইতে অধিক আশ্চর্যের বিষয় রাখিয়া আসিয়াছ। লোকটি বলিল, ইহা হইতে অধিক আশ্চর্যজনক বিষয় আর কি? বাঘ বলিল, রাসূলুল্লাহ (স) দুই মরুভূমির মধ্যখানে দুইটি খেজুর গাছের আড়ালে মানুষের সহিত অতীতে কি ঘটিয়াছে এবং ভবিষ্যতে কি ঘটিবে তাহা লইয়া আলাপ করিতেছেন।

অতঃপর বেদুঈন বকরীগুলিকে চীৎকার দিয়া হাঁকাইয়া লইয়া আসিল এবং মদীনার এক স্থানে রাখিয়া নবী কারীম (স)-এর নিকট চলিয়া আসিল। সে সোজা গিয়া তাঁহার দরজায় করাঘাত করিল। নবী কারীম (স) সালাতশেষে বলিলেন, বকরীর মালিক বেদুঈন কোথায়? তখন লোকটি দাঁড়াইল। নবী কারীম (স) তাহাকে বলিলেন, তুমি যাহা শুনিয়াছ এবং যাহা দেখিয়াছ তাহা লোকজনকে অবহিত কর। অতঃএব সে বাঘটিকে যে অবস্থায় দেখিয়াছিল এবং তাহার নিকট হইতে যাহা শুনিয়াছিল তাহা বর্ণনা করিল। তখন নবী কারীম (স) বলিলেন, সে সত্য বলিয়াছে। কিয়ামতের পূর্বে কিছু নিদর্শন দেখা যাইবে। সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে আমার জীবন! ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হইবে না যতক্ষণ না হিংস্র জন্তু মানুষের সহিত কথা বলে, আর মানুষের সহিত তাহার চাবুকের প্রান্ত, জুতার ফিতা কথা বলিবে এবং তাহার উরুদেশ তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার যাহা করিয়াছে সেই সংবাদ প্রদান করিবে। এই রিওয়ায়াতটি সুনান গ্রন্থের শর্তে উত্তীর্ণ হইলেও ইহার সংকলকগণ ইহা রিওয়ায়াত করেন নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৪)।

একই ঘটনা ইমাম আহমাদ (র) আবূ হুরায়রা (রা) হইতে এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন যে, একটি বাঘ বকরীর রাখালের নিকট আসিয়া পাল হইতে একটি বকরী লইয়া গেল। রাখাল উহার অনুসন্ধানে গিয়া বাঘের নিকট হইতে উহা ছিনাইয়া লইয়া আসিল। অতঃপর বাঘটি একটি টীলায় আরোহণ করিয়া চার পায়ের উপর বসিল এবং লেজ নাড়াইতে নাড়াইতে বলিল, তুমি এমন এক রিযিকের পিছু ধাওয়া করিয়া উহা ছিনাইয়া লইয়াছ যাহা আল্লাহ আমাকে দান করিয়াছেন। লোকটি বলিল, আল্লাহ্র কসম! আজিকার মত আমি আর কখনও দেখিনাই যে, বাঘ কথা বলিতে পারে। বাঘ বলিল, ইহা হইতে বেশী আশ্চর্যের বিষয় সেই লোক, যিনি দুই মরুভূমির মধ্যখানে খেজুরগাছ পরিবেষ্টিত অবস্থায় তোমাদেরকে যাহা অতীত হইয়াছে এবং যাহা তোমাদের পরে ভবিষ্যতে হইবে তাহার খবর দিতেছেন। রাখাল ছিল ইয়াহুদী সম্প্রদায়ভুক্ত। সে নবী কারীম (স)-এর নিকট চলিয়া আসিল, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ করিল এবং তাঁহাকে এই সংবাদ অবহিত করিল। নবী কারীম (স) ইহার সত্যায়ন করিলেন এবং বলিলেন, ইহা কিয়ামতের আলামাতসমূহের একটি। অতি সত্বর এমন এক সময় আসিবে যে, লোক ঘর হইতে বাহির হইবে আর তাহার জুতা ও চাবুক তাহার অনুপস্থিতিতে তাহার পরিবার কি করিয়াছে সেই খবর না দেওয়া পর্যন্ত সে ফিরিবে না (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৫)।

আবূ হুরায়রা (রা)-এর হাদীছ অন্যত্র আরও বিশদভাবে বর্ণিত হইয়াছে। সেখানে উল্লিখিত হইয়াছে যে, অতঃপর বাঘটি (রাখালকে) বলিল, তুমিই বরং বেশী আশ্চর্যের। তুমি তোমার বকরীর কাছে দাঁড়াইয়া আছ আর এমন নবীকে ত্যাগ করিয়াছ যাঁহার তুলনায় অধিক সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন নবী আল্লাহ আর কখনও প্রেরণ করেন নাই। জান্নাতের দরজাসমূহ তাঁহার জন্য উন্মুক্ত করা হইয়াছে এবং উহার অধিবাসিগণ তাঁহার সাহাবীদের প্রতি তাঁকাইয়া তাহাদের যুদ্ধ দেখে। তোমার ও তাঁহার মধ্যে কেবল এই ঘাটিরই ব্যবধান। ইহা অতিক্রম করিলেই তুমি আল্লাহ্ সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া যাইবে। রাখাল বলিল, আমার বকরী কে দেখিবে? বাঘ বলিল, তুমি ফিরিয়া আসা পর্যন্ত আমি উহা চরাইব।

অতঃপর লোকটি তাহার বকরীগুলি বাঘের যিম্মায় রাখিয়া চলিয়া গেল। এইভাবে তাহার ইসলাম গ্রহণ এবং নবী কারীম (স)-এর সহিত জিহাদে অংশগ্রহণের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। লোকটি ফিরিয়া আসিয়া তাহার বকরীর পাল আক্ষত অবস্থায়ই পাইল এবং বাঘের জন্য উহার মধ্য হইতে একটি বকরী যবেহ করিল (কাযী 'ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৩১০-৩১১)।

আবূ নু'আয়ম তাঁহার দালাইলুন নুবৃওয়াত গ্রন্থে আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি ইহা তাঁহার নিজের এবং তাবুক যুদ্ধের সময়কার ঘটনা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৫)।

বায়হাকী ইবন উমার (রা) সূত্রে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। সেখানে মন্তব্য করা হইয়াছে যে, হাফিজ ইবন 'আদী বলেন, আবূ বকর ইব্‌ন দাউদ বলিয়াছেন, এই রাখালের বংশধরকে বলা হইত বানু মুকাল্লিমুয-যি'ব (বাঘের সহিত কথোপকথনকারীর বংশধর)। তাহাদের বেশ সম্পদ ও উট ছিল। তাহারা ছিল খুযা'আ বংশের। বাঘের সহিত যে রাখাল কথা বলিয়াছিল তাহার নাম ছিল উতবান। খ্যাতনামা মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ ইব্‌ন আশ'আছ আল-খুযা'ঈ (র) তাঁহারই বংশধর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৬)।

বাঘের ঘটনাটি অন্যভাবেও বর্ণিত হইয়াছে। তাহাতে বাঘ কর্তৃক বকরী শিকারেরর কথা নাই, তবে তাহার জন্য খাবার বরাদ্দ করার প্রস্তাবের কথা উল্লিখিত হইয়াছে। যেমন আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, একটি বাঘ আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে চারি পায়ের উপর ভর করিয়া বসিয়া পড়িল এবং লেজ নাড়াইতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে সমস্ত বাঘের পক্ষ হইতে প্রতিনিধি হইয়া তোমাদের নিকট তোমাদের সম্পদ হইতে কিছু চাহিতে আসিয়াছে। তাহারা বলিল, আল্লাহ্র কসম! আমরা এইরূপ করিব না। তাহাদের মধ্যকার এক লোক পাথর উঠাইয়া বাঘের দিকে ছুড়িয়া মারিল। ইহাতে বাঘটি পিছনে ফিরিয়া চীৎকার করিতে করিতে চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৬; আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল কুববা, বায়হাকী হামযা ইব্‌ন আবী উসায়দ হইতে এবং আল-ওয়াকিদী আল-মুত্তালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ ইব্‌ন হানতাব হইতে এই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। তাহাদের বর্ণনায় আরও রহিয়াছে যে, সাহাবায়ে কিরাম বাঘটির জন্য কোন অংশ দিতে অস্বীকার করিলে রাসূলুল্লাহ (স) উহাকে ইশারায় ছিনাইয়া লইতে পরামর্শ দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৬৭; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৩)। কোন কোন রিওয়ায়াতে এক শত বাঘ আগমনের কথা উল্লিখিত হইয়াছে (প্রাগুক্ত)।

অন্য এক রিওয়ায়াতে দেখা যায়, মক্কায় কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যানের সম্মুখে এই ধরনের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। ইবন ওয়াহব রিওয়ায়াত করিয়াছেন, এই ধরনের একটি ঘটনা আবূ সুফয়ান ইবন হারব ও সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সহিত ঘটিয়াছিল। তাহারা দেখিল, একটি বাঘ একটি শিশুকে (কাযী 'ইয়ায-এর বর্ণনামতে হরিণ) ধাওয়া করিয়া লইয়া যাইতেছে। শিশুটি হারাম শরীফে ঢুকিয়া পড়িল। অতঃপর বাঘটি ফিরিয়া গেল। ইহা দেখিয়া তাহারা অবাক হইয়া গেল। তখন বাঘটি বলিল, ইহা হইতে আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদিল্লাহ মদীনায় তোমাদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকিতেছেন, আর তোমরা তাঁহাকে ডাকিতেছ জাহান্নামের দিকে। আবূ সুফ্যান বলিল, লাত ও 'উযযার কসম! তুমি এই কথা যদি মক্কায় বলিতে তাহা হইলে উহার অধিবাসিগণ মক্কা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইত (কাযী 'ইয়ায, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৩১১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৭; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৫১৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মহানবী (স)-এর সহিত হরিণীর বাক্যালাপ

📄 মহানবী (স)-এর সহিত হরিণীর বাক্যালাপ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযাসমূহের একটি হইল জঙ্গলের হরিণের তাঁহার সহিত কথা বলা এবং তাঁহার সহিত কৃত অঙ্গীকার রক্ষা করা। এই সম্পর্কে তিনটি রিওয়ায়াত পাওয়া যায়, যাহাদের মর্ম প্রায় একই। একটি রিওয়ায়াত নিম্নরূপ:

আবূ নু'আয়ম আল-ইসফাহানী তাঁহার দালাইলুন-নুবৃওয়াত গ্রন্থে আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে উল্লেখ করেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) একটি কওমের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তাহারা একটি হরিণ শিকার করত উহাকে তাঁবুর খুঁটির সহিত বাঁধিয়া রাখিয়াছিল। হরিণী বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে পাকড়াও করা হইয়াছে, অথচ আমার দুইটি দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা রহিয়াছে। তাই আপনি তাহাদের নিকট হইতে আমাকে একটু অনুমতি লইয়া দিন যাহাতে আমি বাচ্চাদের দুধ পান করাইয়া আবার তাহাদের নিকট ফিরিয়া আসিতে পারি।

তিনি বলিলেন, ইহার মালিক কোথায়? কওমের লোকেরা বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা। তিনি বলিলেন, ইহাকে ছাড়িয়া দাও। সে তাহার বাচ্চার নিকট গিয়া উহাদের দুধ পান করাইয়া তোমাদের নিকট আবার ফিরিয়া আসিবে। তাহারা বলিল, আমাদের জন্য ইহার জামিন হইবে কে? তিনি বলিলেন, আমি। অতঃপর তাহারা হরিণীকে ছাড়িয়া দিল। হরিণী গিয়া তাহার বাচ্চাদের দুধ পান করাইয়া তাহাদের নিকট ফিরিয়া আসিল। অতঃপর তাহারা হরিণীকে বাঁধিয়া ফেলিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন এবং বলিলেন, তোমরা কি উহাকে আমার নিকট বিক্রয় করিবে? তাহারা বলিল, উহা আপনার জন্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বলিলেন, তোমরা উহাকে ছাড়িয়া দাও। অতঃপর তাহারা হরিণীকে ছাড়িয়া দিল এবং উহা চলিয়া গেল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৮; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬১)।

বাকী দুইটি রিওয়াতে হরিণীটি এই কালিমা উচ্চারণের উল্লেখ আছে: اشهد ان لا اله الا الله وان محمدا رسول الله "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল” (আল - বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১৬৯-৭০; আল - খাসাইসুল কুবরা, ২খ.,

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00