📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুদের দৃষ্টি হইতে উধাও হওয়া

📄 শত্রুদের দৃষ্টি হইতে উধাও হওয়া


আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অনেক সময় বিদ্রুপকারী শত্রুদের দৃষ্টি হইতে উধাও করিয়া রাখিতেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ "আমি উহাদের সম্মুখে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করিয়াছি এবং উহাদেরকে আবৃত করিয়াছি, ফলে উহারা দেখিতে পায় না" (৩৬:৯)।

একবার অভিশপ্ত আবূ জাহল বলিল, আমি মুহাম্মাদ (স)-কে দেখিতে পাইলে এই করিব, সেই করিব। তখন নাযিল হয় এই আয়াত। লোকেরা তাহাকে বলিল, ঐ তো মুহাম্মাদ। কিন্তু সে তাঁহাকে দেখিতে পাইল না। সে জিজ্ঞাসা করিল, কোথায়? আমি তো তাঁহাকে দেখিতে পাইতেছি না (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৩ খ., পৃ. ১৫৬)।

ইমাম বাগাবী বলেন, আলোচ্য আয়াত নাযিল হইয়াছে আবূ জাহল-ও তাহার সুহৃদ মাখযুমীকে লক্ষ্য করিয়া। আবূ জাহল শপথ করিয়া বলিয়াছিল, আমি মুহাম্মাদকে সালাতরত অবস্থায় দেখিতে পাইলে পাথরের আঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ করিয়া দিব। ইহার পর একদিন সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে পাইল সালাতরত অবস্থায়। সে একটি প্রস্তর খণ্ড হাতে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে আগাইয়া গেল কিন্তু তাহার হাত জড়াইয়া গেল তাহার গ্রীবার সহিত। পাথরটি পড়িল তাহার অন্য হাতের উপর। সে তাহার সাথীদের নিকট ফিরিয়া বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করিল। পরক্ষণেই সে ধপাস করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। বানু মাখযূম গোত্রের এক ব্যক্তি বলিল, ঠিক আছে, এবার আমিই এই পাথর দ্বারা তাহাকে হত্যা করিব। কিন্তু কিছু দূর অগ্রসর হইতেই আল্লাহ তা'আলা তাহার দৃষ্টি ছিনাইয়া লইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তখন সালাতে কুরআন পাঠ করিতেছিলেন। সে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনিতে পাইল কিন্তু তাঁহাকে দেখিতে পাইল না। বাধ্য হইয়া সে ফিরিয়া আসিল তাহার সাথীদের নিকট, কিন্তু তাহাদিগকেও দেখিতে পাইল না। সাথীরা বলিল, কি হইল তোমার? সে বলিল, আমি তাঁহাকে দেখিতে পাইতেছিলাম না; অবশ্য তাঁহার কুরআন পাঠের আওয়াজ শুনিতে ছিলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! আমি মুহাম্মাদের দিকে আগাইয়া যাইতে যাইতে দেখিলাম, এক ভয়ংকর আকৃতির প্রাণী তাঁহার ও আমার মধ্যে আড়াল হইয়া মুখ বাঁকা অবস্থায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। মনে হইতেছিল আর একটু অগ্রসর হইলে প্রাণীটি আমাকে খাইয়া ফেলিত (তাফসীরে মাযহারী, ৮ খ., পৃ. ৭২)।

وَأَخْرَجَ الْبَيْهَقِيُّ فِي الدَّلَائِلِ مِنْ طَرِيقِ السُّدِّي الصَّغِيرِ عَنِ الْكَلْبِيُّ عَنْ أَبِي صَالِحٍ عَنْ ابْنِ عَبَّاسَ أَنَّ نَاسًا مِنْ بَنِي مَخْزُومٍ تَوَاصَوْا بِالنَّبِيِّ ﷺ لِيَقْتُلُوهُ مِنْهُمْ أَبُو جَهْل وَالْوَلِيدُ بْنُ الْمُغِيرَةِ فَبَيْنَا النَّبِيُّ ﷺ قَائِمٌ يُصَلَّى يَسْمَعُونَ قِرَاءَتَهُ أَرْسَلُوا إِلَيْهِ الْوَلِيدُ لِيَقْتُلَهُ فَانْطَلَقَ حَتَّى أَتَى الْمَكَانَ الَّذِي يُصَلَّى فِيْهِ فَجَعَلَ يَسْمَعُ قِرَاءَتَهُ وَلَا يَرَهُ فَانْصَرَفَ إِلَيْهِمْ فَأَعْلَمَهُمْ فَاتَوهُ فَلَمَّا انْتَهُوا إِلَى الْمَكَانِ الَّذِي هُوَ يُصَلَّى فِيْهِ سَمِعُوا قِرَاءَتَهُ فَيَذْهَبُونَ إِلَى الصَّوْتِ فَإِذَا الصُّوْتُ مِنْ خَلْفِهِمْ فَيَذْهَبُونَ إِلَيْهِ فَيَسْمَعُونَهُ أَيْضًا مِّنْ خَلْفِهِمْ فَانْصَرَفُوا وَلَمْ يَجِدُ وَا إِلَيْهِ سَبِيلًا.

"বায়হাকী তাঁহার "দালাইল" গ্রন্থের সুদ্দী সগীরের সনদে কালবী হইতে, তিনি আবূ সালেহ হইতে, তিনি ইবন্ 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, মাখযূম গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক ঠিক করিল, তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবে। তাহাদের সহিত যোগ দিয়াছিল আবু জাহল ও ওয়ালীদ ইব্‌ন মুগীরা। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সালাতরত অবস্থায় ছিলেন। তাঁহার কুরআন পাঠের আওয়াজ শুনিতেছিল দুর্বৃত্তরা। প্রথমে আগাইয়া আসিল ওয়ালীদ। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে পাইল না। শ্রুত হইতেছিল তাঁহার কুরআন পাঠের আওয়াজ। সে ফিরিয়া আসিয়া সাথীদেরকে সব খুলিয়া বলিল। আর একজন উঠিয়া দাঁড়াইল। একটু অগ্রসর হইতেই তাহার অবস্থাও হইল তথৈবচ। সে কেবল কুরআন পাঠের আওয়াজ শুনিল কিন্তু কিছুই দেখিতে পাইল না। সামনে অগ্রসর হইলে মনে হইল আওয়াজ আসিতেছে পিছনের দিক হইতে। সেই দিকে যাওয়া শুরু করিলে শুনিতে পাইল আওয়াজ আসিতেছে বিপরীত দিক হইতে। তাই বিফল হইয়া ফিরিয়া আসা ছাড়া আর কোন উপায় রহিল না"।

সেই কথাই বলা হইয়াছে সূরা ইয়াসীনের ৯ নং আয়াতে : "আমি উহাদের সম্মুখে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করিয়াছি এবং উহাদিগকে আবৃত করিয়াছি, ফলে উহারা দেখিতে পায় না" (৩৬ : ৯, প্রাগুক্ত, পৃ.৭২)।

আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র ঘোষণা করেন, وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا "এবং তিনি তাহাকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যাহা তোমরা দেখ নাই" (৯:৪০)।

'আইশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে সঙ্গে লইয়া উপস্থিত হইলেন পর্বতের গুহায়। 'উমার (রা) হইতে বায়হাকী বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা করিয়াছিলেন রাত্রিবেলায়। ইবন ইসহাক ও ওয়াকিদী বলিয়াছেন, তিনি আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর বসতবাড়ীর পিছনের দরজা দিয়া বাহির হইয়াছিলেন। 'আইশা বিনতে কুদামা (রা) হইতে আবূ নু'আয়ম লিখিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমরা পিছনের দরজা দিয়া বাহির হইয়াছিলাম, সামনে পড়িয়াছিল আবু জাহল। আল্লাহ তাআলা তাহার দৃষ্টিশক্তি রহিত করিয়া দিয়াছিলেন, তাই সে আমাদিগকে দেখিতে পায় নাই (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ২০৯)।

আবু নু'আয়মের বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত আসমা (রা) বর্ণনা করেন, আবূ বকর সিদ্দীক (রা) দেখিলেন, এক লোক গুহার মুখামুখি হইয়াছে। আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! লোকটি তো আমাদিগকে দেখিয়া ফেলিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কখনও না। তাহার সামনে রহিয়াছে ফেরেশতাদের পাখার আড়াল।- একটু পরেই লোকটি তাহাদের দিকে মুখ করিয়া পেশাব করিতে বসিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আবূ বকর! লোকটি আমাদিগকে দেখিলে এমন কাজ করিত না (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ২১৩)।

হযরত আবূ বক্র সিদ্দীক (রা) বর্ণনা করেন, আমি (ভয়ার্ত স্বরে) বলিলাম, হে আল্লাহ্ত্র রাসূল! আমরা গুহার মধ্যে আর উপরে শত্রুরা দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। পায়ের দিকে তাকাইলেই তাহারা আমাদিগকে দেখিয়া ফেলিবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আবূ বকর! ঐ দুইজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি, যাহদের সংগে তৃতীয় জন স্বয়ং আল্লাহ? আবূ নু'আয়ম তাঁহার হিল্লা পুস্তকে 'আতা ইব্‌ন মায়সারা সূত্রে বর্ণনা করেন, মাকড়সা জালের মাধ্যমে আড়াল করিয়াছিল দুইবার। একবার জালূতের আক্রমণ হইতে দাউদ (আ.)-কে আর একবার ছওর গিরি গুহায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে (প্রাগুক্ত, পৃ. ২১২; বুখারী, ১ খ., কিতাবুল মানাকিব, পৃ. ৫১৬)।

একবার আবু জাহল একটি পরামর্শ সভা ডাকিল। সমাবেশে অভিশপ্ত ব্যক্তিটি বলিল, দেখ মুহাম্মাদ বলে, যদি তোমরা তাঁহার আনুগত্য কর তবে তোমা বাদশাহ হইবে আর মৃত্যুর পর তোমরা চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করিবে। আর যদি তাঁহার বিরুদ্ধাচরণ কর তাহা হইলে অসম্মানে মৃত্যুবরণ করিবে এবং পরকালে আল্লাহর আযাবে পতিত হইবে। আবু জাহল বলিল, আমি একটি প্রস্তাব করিতে চাই- প্রস্তাবটি আপনাদের মনঃপুত হইবে। সকলে বলিল, ঠিক আছে, এইবার আপনার কথাই শুনি। আবু জাহল বলিল, প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন করিয়া তেজোদ্দীপ্ত যুবক নির্বাচন করা হউক। এইভাবে সকল যুবক একত্র হইয়া একযোগে আক্রমণ করিয়া তলোয়ারের আঘাতে মুহাম্মাদকে হত্যা করিবে। এইভাবে সকল গোত্র হত্যাকাণ্ডে শরীক হইতে পারিবে। আর মুহাম্মাদের নিকটজনেরা সকল গোত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার সাহস পাইবে না। খুব বেশী হইলে রক্তপণ দাবি করিতে পারিবে। সম্মিলিতভাবে সেই রক্তপণের দাবি পরিশোধ করাও আমাদের জন্য সহজ হইবে। নজদী শায়খ শয়তান বলিল, হাঁ, ইহা একটা প্রস্তাবের মত প্রস্তাব। আবূ জাহলের প্রস্তাবটিকে নজদী শায়খের মত অন্যান্যরাও সর্বান্তকরণে মানিয়া লইল। ঐ সমাবেশেই প্রস্তাবটি কার্যকর করার দিনক্ষণ নির্ধারণ করিয়া ফেলিল। হযরত জিব্রাঈল (আ) এই সংবাদ পৌছাইয়া দিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট। আরও বলিলেন, আবু জাহলের দল ঠিক করিয়াছে, আজ রাত্রে তাহারা আপনাকে হত্যা করিতে আসিবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে হিজরতের নির্দেশ দিয়াছেন। আজ রাতেই আপনাকে গৃহত্যাগ করিতে হইবে।

আবু জাহলের দল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহের চতুর্দিকে ঘিরিয়া ফেলিল। তাহাদের পরিকল্পনা ছিল ভোরবেলা মুহাম্মাদ যখন বাড়ীর বাহিরে আসিবে, তখন সকলে মিলিয়া একযোগে তাঁহার উপর তলোয়ারের আঘাত হানিবে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের উপস্থিতি টের পাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এক মুষ্টি মাটি লইয়া ঘর হইতে বাহির হইলেন। ঐ মাটি আবূ জাহলের লোকদের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করিয়া যাইতে যাইতে বলিলেন, হাঁ, আমি এই রকম বলিয়াছি, যাহারা আমার লোকদের মাধ্যমে নিহত হইবে, তুমিও তাহাদের একজন। রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক নিক্ষিপ্ত মাটি গিয়া পড়িল তাহাদের সকলের মস্তকে। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের চোখের সামনে সৃষ্টি করিয়া দিলেন অন্তরায়। রাসূলুল্লাহ (স) পাঠ করিলেন:

يس. والقُرْآنِ الْحَكِيمِ ، إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ . عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ، تَنْزِيلَ الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ ، لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَّا أَنْذِرَ آبَاؤُهُمْ فَهُمْ غَفِلُونَ . لَقَدْ حَقِّ الْقَوْلُ عَلَى أَكْثَرِهِمْ فَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ . إِنَّا جَعَلْنَا فِي أَعْنَاقِهِمْ أَغْلَلاً فَهِيَ إِلَى الْأَذْقَانِ فَهُمْ مُقْمَحُونَ ، وَجَعَلْنَا مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ.

"ইয়াসীন, শপথ জ্ঞানগর্ভ কুরআনের, তুমি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্ভূক্ত; তুমি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। কুরআন নাযিলকৃত পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহ্র নিকট হইতে, যাহাতে তুমি সতর্ক করিতে পার এমন জাতিকে যাহাদের পিতৃপুরুষদিগকে সতর্ক করা হয় নাই, যাহার ফলে উহারা গফিল। উহাদের অধিকাংশের জন্য সেই বাণী অবধারিত হইয়াছে; সুতরাং উহারা ঈমান আনিবে না। আমি উহাদের গলদেশে চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরাইয়াছি, ফলে উহারা ঊর্ধ্বমুখী হইয়া গিয়াছে। আমি উহাদের সম্মুখে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করিয়াছি এবং উহাদিগকে আবৃত করিয়াছি; ফলে উহারা দেখিতে পায় না" (৩৬:১-৯)।

এই পর্যন্ত পাঠ করিয়া তিনি তাহাদের সম্মুখ দিয়ে বাহির হইয়া গেলেন। তাহাদের কেহই তাঁহাকে দেখিতে পাইল না (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৫২-৫৩; তাফসীরে ইবন কাছীর, উক্ত আয়াতের তাফসীর (দ্র.), প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৫৫-৫৮)।

আবু লাহাবের স্ত্রীর নাম ছিল উম্মু জামীল। তাহার পিতার নাম ছিল হারব। সে ছিল আবু সুফ্যান-এর বোন "হাম্মালাতাল হাতাব" বা কাষ্ঠ বহনকারিনী। নানা কটূক্তির মাধ্যমে সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মনে কষ্ট দিত। একদা হযরত আবূ বক্স সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির ছিলেন। তিনি দেখিতে পাইলেন, উম্মু জামীল আসিতেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মহিলাটি বড়ই বেআদব ও কটুভাষিণী। এইখান হইতে চলিয়া গেলে ভাল হইত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে আমাকে দেখিতে পাইবে না। উম্মু জামীল সেইখানে আসিয়া বলিল, হে আবূ বকর। তোমাদের নেতা আমার বদনাম করিয়াছে। হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, আমাদের নেতা কবিতাও বলেন না, কাহারও দোষও বলেন না। অভিশপ্ত মহিলাটি ব্যর্থ হইয়া চলিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) সেইখানেই ছিলেন, কিন্তু সে দেখিতে পায় নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ্ তা'আলা একজন ফেরেশতা পাঠাইয়াছিলেন। সে আমাকে তাহার পাখা দ্বারা আড়াল করিয়া রাখিয়াছিল। ইমাম বুখারী (র) বলেন, সেই সময় ঐ দুষ্ট মহিলার হাতে একটি পাথর ছিল। সে বলিয়াছিল, মুহাম্মাদকে দেখিতে পাইলে এই পাথরের আঘাতে তাহার মুখ ভাঙ্গিয়া ফেলিব (নাউযুবিল্লাহ্) (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১২৮; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১ খ., পৃ. ৩৮৬-৮৭)।

আবূ ইয়া'লা, ইব্‌ন আবী হাতিম, বায়হাকী ও আবূ নু'আয়ম হযরত আসমা' বিন্তে আবূ বকর (রা) হইতে বর্ণনা করেন, সূরা লাহাব নাযিল হওয়ার পর 'আওরা' বিন্তে হারব উত্তেজিত অবস্থায় রওয়ানা হইল। তাঁহার হাতে ছিল একটি পাথর। রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে বসিয়াছিলেন। হযরত আবূ বকর (রা)-ও তাঁহার সহিত ছিলেন। 'আওরাকে আসিতে দেখিয়া হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স)! 'আওরা আসিতেছে। আমার আশংকা হয় যে, সে আপনাকে দেখিয়া ফেলিবে। রাসূলুল্লাহ। বলিলেন, সে আমাকে দেখিতে পাইবে না। 'আওরা আসিয়া হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট দাঁড়াইয়া গেল, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিতে পাইল না। সে হযরত আবূ বকর (রা)-কে বলিল, আমি জানিতে পারিয়াছি, তোমার সাথী আমার নিন্দাবাদ করিয়াছে। হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, কা'বা গৃহের প্রভুর কসম! তিনি তোমার নিন্দা করেন নাই।

বায়হাকী এই বর্ণনাটি আসমা (রা) হইতে হুবহু বর্ণনা করিয়াছেন। ইহাতে কথাগুলি এইরূপ- হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, আমার সঙ্গী কবি নন্। তিনি কবিতা জানেন না। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ বকর (রা)-কে ইশারায় বলিলেন, আওরা-কে প্রশ্ন কর, আমার সঙ্গে আর কাহাকেও দৃষ্টিগোচর হয় কি? সে আমাকে দেখে না। কারণ আমার ও তাহার মধ্যে একটি অন্তরাল স্থাপন করা হইয়াছে। আবু বকর (রা) আওরা-কে এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে বলিল, তুমি আমার সাথে উপহাস করিতেছ। আমি তো তোমাদের নিকট কাহাকেও দেখিতে পাইতেছি না (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১২৭)।

ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَب নাযিল হওয়ার পর আবু লাহাব জানিতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা তাহার নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছেন। তখন সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) তখন আবূ বকর (রা)-এর সহিত কা'বা গৃহের পার্শ্বে অবস্থান করিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করার জন্য আবু লাহাব সঙ্গে পাথর লইয়া আসিয়াছিল। কিন্তু যখন সে তাহাদের নিকটবর্তী হইল তখন সে আবূ বকর (রা)-কে ব্যতীত আর কাহাকেও দেখিতে পাইল না। আল্লাহ তা'আলা তাহার দৃষ্টি হইতে তাঁহাকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছিলেন। সে আবূ বকর (রা)-কে বলিল, হে আবূ বকর। তোমার বন্ধু কোথায়? আমি তাঁহাকে খুঁজিয়া পাইতেছি না। আমি জানিতে পারিয়াছি যে, সে আমার নিন্দাবাদ করিয়াছে। আল্লাহর কসম। আমি যদি এই সময় তোমার সাথীকে পাইতাম তাহা হইলে এই পাথর তাঁহার মুখে নিক্ষেপ করিতাম (আশ্-শিফা, ১ খ., পৃ. ৬৮৪)।

أَخْرَجَ مُسْلِمٌ عَنْ أَبِي هَرَيْرَةَ قَالَ قَالَ أَبُو جَهْلٍ هَلْ يُعَفِّرُ مُحَمَّدٌ وَجْهَهُ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ قَالَ فَقِيلَ نَعَمْ فَقَالَ وَالآتِ وَالْعُزَّى لَئِنْ رَأَيْتُهُ يَفْعَلُ ذَلِكَ لَأَطَانَّ عَلَى رَقَبَتِهِ أَوْ لَأَعَفِّرَنَّ وَجْهَهُ فِي التُّرَابِ قَالَ فَأَتَى رَسُولَ اللهِ ﷺ وَهُوَ يُصَلَّى زَعَمَ لِيَطًا عَلَى رَقَبَتِهِ قَالَ فَمَا منه الا وَهُوَ يَنْكُصُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَيَتَّقِى بِيَدَيْهِ قَالَ فَقِيلَ لَهُ مَالَكَ فَقَالَ إِنَّ بَيْنِي وَبَيْنَهُ لَخَنْدَقًا مِنْ نَارٍ وَهَوْلاً وَأَجْنِحَةً فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَوْ دَنَا مِنِّي لَأَخْتَطَفَتهُ الْمَلَائِكَةُ عُضُوا عُضُوا قَالَ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى أَنْ رَآهُ اسْتَغْنى ..... كلاً لا تُطِعْهُ

"আবূ হুরায়ারা (রা) হইতে বর্ণিত। আবূ জাহল লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিল, মুহাম্মাদ নিজ মুখমণ্ডল তোমাদের সামনে মাটিতে রাখে কি? তাহারা বলিল, হাঁ। আবু জাহল বলিল, লাত ও উয্যার কসম! আমি তাহাকে এইরূপ দেখিলে তাহার গর্দান পদদলিত করিব অথবা মুখমণ্ডল ধুলায় ধূসরিত করিয়া দিব। অতঃপর একদিন রাসূলুল্লাহ (স) যখন সালাতরত ছিলেন, তখন আবূ জাহ্ আগাইয়া আসিল। সেখানে উপস্থিত লোকেরা দেখিল, আবূ জাহ্ল হঠাৎ পিছনের দিকে ফিরিয়া যাইতেছে এবং উভয় হাত দিয়া নিজেকে রক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেছে। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইলে সে বলিল, আমার ও মুহাম্মাদের মধ্যে আগুনের একটি খাদ রহিয়াছে এবং কতকগুলি অদৃশ্য হাত কার্যকর দেখিতে পাইতেছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে আমার নিকট আসিলে ফেরেস্তাগণ তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিত। সেই সময় নাযিল হয় : كَلَّا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَيَطْغَى (আল-খাসাইসুল কুবরা, ১ খ., পৃ. ১২৬)।

ইবন ইসহাক, বায়হাকী ও আবূ নু'আয়ম ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, আবূ জাহ্ন বলিল, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা দেখিতেছ যে, মুহাম্মাদ আমাদের ধর্মের দোষ বাহির করে, আমাদের পূর্বপুরুষদের মন্দ বলে, আমাদিগকে নির্বোধ সাব্যস্ত করে এবং আমাদের উপাস্যদিগকে গালি দেয়। আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আগামী দিন পাথর লইয়া বসিব। যখন সে নামাযে দাঁড়াইবে এই পাথর দিয়া তাহার মাথা পিষ্ট করিয়া দিব। ইহার পর দেখিব তাহার গোত্র বনৃ'আবদে মানাফ কি করিতে পারে। আবূ জাহল সকালে উঠিয়া একটি পাথর লইয়া বসিয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) সালাতে দাঁড়াইলেন। কুরায়শগণ আপন আপন মজলিসে বসিয়া গেল। তাহারা আবূ জাহলের কাণ্ড দেখিতেছিল। যখন রাসূলুল্লাহ্ (স) সিজদায় গেলেন, তখন আবু জাহল পাথর লইয়া তাঁহার দিকে আগাইয়া গেল। নিকটে পৌছিলে হঠাৎ সে বিবর্ণ হইয়া গেল এবং ভীত-বিহবল হইয়া পড়িল। সে পশ্চাতে হঁটিতে লাগিল এবং পাথরটি হাত হইতে ফেলিয়া দিল। কুরায়শরা দৌড়িয়া আবূ জাহলের নিকট গেল এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমার কি হইল? সে বলিল, আমি যখন তাঁহার দিকে অগ্রসর হইলাম, তখন একটি হৃষ্টপুষ্ট উট দেখিলাম। আল্লাহ্র কসম! এই উটের মাথা, ঘাড় ও দাঁত যেমন দেখিলাম, কোন উটের তেমন দেখি নাই। মনে হইল, এই উট আমাকে খাইয়া ফেলিবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আ)। আবূ জাহল আমার নিকট আসিলে সে তাহাকে ধরিয়া ফেলিত (আল-খাসাইসুল-কুবরা, ১খ., পৃ. ১২৬)।

وَأَخْرَجَ الْبُخَارِيُّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ أَبُو جَهْلِ لَئِنْ رَأَيْتُ مُحَمَّدًا يُصَلَّى عِنْدَ الْكَعْبَةِ لَأَطَأَنَّ عَلَى عُنُقِهِ فَبَلَغَ النَّبِيِّ ﷺ ذَالِكَ فَقَالَ لَوْ فَعَلَ لَأَخَذَتْهُ الْمَلَائِكَةُ .

"হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, আবূ জাহল বলিল, আমি মুহাম্মাদকে বায়তুল্লাহে সালাতরত অবস্থায় দেখিলে তাঁহার গর্দান পদদলিত করিব। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার এই সংকল্পের কথা জানিতে পারিয়া বলিলেন, আবূ জাহল এইরূপ করিতে আসিলে ফেরেশতারা সর্বসমক্ষে তাহাকে ধরিয়া ফেলিবে” (বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৪০)।

বাযযার, তাবারানী, হাকেম, বায়হাকী ও আবু নু'আয়ম ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, একদিন মসজিদে আমার উপস্থিতিতে আবূ জাহল বলিল, মুহাম্মাদকে সিজদায় দেখিলে তাঁহার গর্দান পদদলিত করার জন্য আমি সংকল্প করিয়াছি। ইবন 'আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট গমনপূর্বক আবূ জাহলের কুমতলবের খবর তাঁহাকে অবহিত করিলাম। তিনি কিছুটা রাগান্বিত অবস্থায় গৃহ হইতে বাহির হইয়া মসজিদে যাইয়া সালাত শুরু করিলেন। তিনি সালাতে সূরা ইকরা পাঠ করিতেছিলেন। যখন إِنَّ الْأَنْسَانَ لِيَطْغَى পর্যন্ত পৌছিলেন তখন এক ব্যক্তি আবু জাহলকে বলিল, এই তো মুহাম্মদ! সে বলিল, আমি যাহা দেখিতেছি, তোমরা তাহা দেখিতেছ না। আল্লাহ্র কসম! আকাশের প্রান্ত আমাকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭)।

আবূ নু'আয়ম 'ইকরিমা হইতে এবং তিনি ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) মসজিদুল হারামে সশব্দে কুরআন তিলাওয়াত করিলে কুরায়শরা তাঁহার উপর নির্যাতন চালায় এবং তাঁহাকে ধরিতে উদ্যত হয়। হঠাৎ তাহাদের হাত তাহাদের গর্দানের সহিত বেড়ি হইয়া যায় এবং তাহাদের দৃষ্টিশক্তি রহিত হইয়া যায়। তাহারা কোন কিছুই দেখিতে পাইতেছিল না। এই অবস্থায় তাহারা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সকাশে হাযির হইয়া আরয করে, আমরা আপনাকে আল্লাহ্র কসম দিতেছি। অতঃপর তিনি তাহাদের জন্য দু'আ করেন। ফলে তাহাদের অন্ধত্ব দূর হয় (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৮)।

আবূ নু'আয়ম মু'তামির ইব্‌ন সুলায়মান হইতে, তিনি তঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন, জনৈক মাখযূমী মন্দ উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দিকে অগ্রসর হইল। তাহার হাতে একটি পাথর ছিল। সে যখন নিকটে আসিল তখন তিনি সিজদায় ছিলেন। সে হাত তুলিল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার হাত অবশ হইয়া গেল, হাত হইতে পাথর আলাদা করার শক্তি রহিল না। সে তাহার সঙ্গী-সাথীদের নিকট ফিরিয়া আসিলে তাহারা বলিল, তুমি কাপুরুষ। সে বলিল, আমি কাপুরুষতা দেখাই নাই। এই দেখ, পাথর আমার হাতেই রহিয়াছে। আমি ইহা আলাদা করিতে পারি না। তাহারা অবাক হইল। তাহারা পাথরে তাহার আঙ্গুলগুলি অবশ দেখিতে পাইল। অনেক চিকিৎসা করার পর পাথরটি আঙ্গুল হইতে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হইল (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৮)।

আল-ওয়াকিদী ও আবূ নু'আয়ম 'উরওয়া ইনুষ যুবায়র (রা) হইতে বর্ণনা করেন, নাদর ইব্‌নুল হারিছ রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে কষ্ট দিত। একদিন গ্রীষ্মকালে তীব্র গরমের সময় দ্বিপ্রহর রাসূলুল্লাহ (স) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য যাইতেছিলেন। তিনি ছানিয়াতুল হুযনের নিম্নভাগ পর্যন্ত পৌঁছিয়া গেলেন। এই কাজে দূরে চলিয়া যাওয়াই তাঁহার অভ্যাস ছিল। নাদর বলিল, মুহূর্তে তিনি যেমন নির্জনে রহিয়াছেন, তাঁহাকে হত্যা করার জন্য এমন সুযোগ আর পাওয়া যাইবে না। সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দিকে অগ্রসর হইল; কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া আপন গৃহে ফিরিয়া আসিল। পথিমধ্যে আবূ জাহলের সহিত তাহার সাক্ষাত হইলে সে বলিল, কোথা হইতে আসিতেছ? নাদর বলিল, আমি মুহাম্মাদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল তাহাকে হত্যা করা। কারণ সে একাকী ছিল। কিন্তু অকস্মাৎ আমি অনেকগুলি সিংহ দেখিলাম। সেইগুলি মুখ হা করিয়া আমার দিকে আগাইয়া আসিতেছিল। আমি ভীত হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। আবু জাহল বলিল, ইহাও তাঁহার যাদু (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০)।

বানু মুগীরার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে আসিবার পর তাহার চক্ষু অন্ধ হইয়া যায়। ফলে সে তাঁহাকে আর দেখিতে পায় নাই। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যাওয়ার পরও দৃষ্টি শক্তি আর ফিরিয়া পায় নাই (মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৮৭)।

মু'তামির ইবন সুলায়মান তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় বানু মাখযূমের এক ব্যক্তি তাঁহার মাথায় আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে পাথর লইয়া আসে। সে তাঁহার উপর পাথর নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইলে তাহার হাত পাথরের সহিত আটকাইয়া যায়। ফলে সে আর পাথরটি নিক্ষেপ করিতে পারে নাই। অতঃপর লোকটি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট যাওয়ার পর লোকেরা তাহার হাত পাথরের সহিত লাগানো দেখিয়া অবাক হইয়া গেল এবং ঐ ব্যক্তিকে চিকিৎসার মাধ্যমে পাথর হইতে মুক্ত করিল (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫৫)।

তাবারানী, ইব্‌ন মান্দা ও আবূ নু'আয়মের রিওয়ায়াতে হাকামের কন্যা বর্ণনা করেন। আমার দাদা হাকাম আমাকে বলিয়াছেন, আমি তোমার নিকট একটি চাক্ষুষ ঘটনা বর্ণনা করিতেছি শুন। একদিন আমরা এই মর্মে অঙ্গীকার করিলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পাকড়াও করিব। তখন আমরা একটি ভয়ংকর শব্দ শুনিতে পাইলাম। মনে হইল যেন তিহামার পাহাড় চুরমার হইয়া গিয়াছে। আমরা জ্ঞন হারাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) নামায সমাপ্ত করিয়া গৃহে ফিরিয়া যাওয়া পর্যন্ত আমাদের কোন বোধশক্তিই ছিল না। পরবর্তী রাতে আমরা আবার পূর্ববৎ অঙ্গীকার করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) মসজিদে আসিলে আমরা তাঁহার দিকে অগ্রসর হইলাম। দেখিলাম, সাফা ও মারওয়া পহাড়দ্বয় আসিয়া পরস্পর মিলিত হইয়া আমাদের ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে অন্তরাল হইয়া গেল। আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ্র কসম! আমাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয় নাই। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আমাদিগকে ইসলামে প্রবেশের তৌফিক দান করিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৯)।

ইবন ইসহাক বলেন, শায়বা ইবন 'উছমান ইব্‌ন আবূ তালহা আমার নিকট বর্ণনা করেন, আর তিনি ছিলেন 'আবদুদ-দার গোত্রের একজন। আমি মনে মনে বলিলাম, আজই আমাদের মুহাম্মাদের নিকট হইতে রক্তের প্রতিশোধ লওয়ার সুযোগ। উল্লেখ্য, তাহার পিতা উহুদের যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল। সে বলিল, আজ আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করিব। আমি মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার চারিপার্শ্বে ঘুরিতে লগিলাম। তাহার পর কি যেন আসিয়া আমার ও তাঁহার মধ্যখানে অন্তরায় হইল, এমনকি হৃদয় পর্যন্ত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। শেষ পর্যন্ত আর মুহাম্মাদকে হত্যা করা সম্ভব হইল না। আমি উপলব্ধি করিলাম, আমাকে এই কাজ হইতে নিবৃত্ত করা হইয়াছে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৬৫)।

মহান আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিদ্রূপকারী কাফির মুশরিকদের দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য রাখিতেন, আবার কখনও অন্য কৌশল অবলম্বন করিতেন। এই মর্মে মহান আল্লাহর ঘোষণা: إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزئين “আমিই যথেষ্ট তোমার জন্য বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে" (১৫: ৯৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মানুষ ও জিনদের অনিষ্ট হইতে রাসূলুল্লাহ (স) নিরাপদ

📄 মানুষ ও জিনদের অনিষ্ট হইতে রাসূলুল্লাহ (স) নিরাপদ


রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত ও রিসালাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হইয়া যেই দিন সাফা পর্বতে দাঁড়াইয়া মক্কার কুরায়শদের উদ্দেশ্যে ইসলামী দাওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, সেই দিন হইতেই তিনি সংকটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। ধীরে ধীরে নানা বাধা-বিঘ্নের প্রকাশ ঘটে। এক সময় জুলুম নির্যাতন সীমা অতিক্রম করে। ক্রমশ এমন অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, কোন মানুষের পক্ষে আল্লাহ তা'আলার মদদ ও সাহায্য ব্যতীত এই অবস্থায় টিকিয়া থাকাই অসম্ভব, সফলতা লাভ করার তো প্রশ্নই উঠে না। যদি তাঁহার উপর আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমতে রাসূলুল্লাহ (স) সাফল্যের এই সমস্ত দুর্গম বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেন ও সফলতা অর্জন করেন। ইহা সন্দেহাতীত যে, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাঁহার হিফাযত করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে: يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥ ۚ وَٱللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِ ۗ “হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের নিকট হইতে আপনার প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে, আপনি তাহা প্রচার করুন। যদি আপনি তাহা না করেন, তবে তো আপনি তাঁহার বার্তা প্রচার করিলেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ হইতে রক্ষা করিবেন" (৫ঃ ৬৭)।

এই আয়াত নাযিল হইলে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন। "হে লোকসকল! আমার জন্য পাহারা দান অপসারিত কর, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করিয়া দিয়াছেন" (তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৩৬৩, হাদীছ নং ৩০৪৬, বাংলা অনু. ইফাবা)।

আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-কে রক্ষা করিবার তাৎপর্য হইল, মহান আল্লাহ্র অসীম কুদরতে সকল ব্যবস্থায় তাহার পূর্ণ হিফাযত করা। মহান আল্লাহ তাঁহার দাওয়াতের প্রথমদিকে তাঁহার চাচা আবূ তালিব দ্বারা তাঁহার হিফাযত করিয়াছেন। আবু তালিবের মৃত্যুর পর মুত'ইম ইবন 'আদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন (আসাহহুস- সিয়ার, পৃ. ৫৭)। রাসূলুল্লাহ (স) তাইফ হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় জিন্নদের একটি দল তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করে ও ইসলাম গ্রহণ করে (সূরা জিন্ন, আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৭)। পরিশেষে মদীনায় হিজরত করিবার পর মদীনাবাসী আওস ও খাযরাজ গোত্র তাহারা তাঁহার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। এইভাবে যখনই কোন মুশরিক আহলে কিতাব ও মুনাফিক, তাঁহার অনিষ্টের চেষ্টা করিয়াছে তখনই মহান আল্লাহ তাঁহাকে হিফাযত করিয়াছেন ও তাহাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করিয়া দিয়াছেন (ইবন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৮-৮৯)।

আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা বিধান ও তাঁহার শত্রুগণকে তাঁহার ক্ষতি করা হইতে বিরত রাখিবার অনেক ঘটনা ও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। তদ্রূপ কিছু ঘটনা নিয়ে বর্ণিত হইল : উম্মু জামীল আবু লাহাবের স্ত্রী, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি শত্রুতায় সে তাহার স্বামী আবু লাহাব অপেক্ষা কোন অংশেই কম ছিল না। উম্মু জামীল যখন জানিতে পারিল, তাহার এবং তাহার স্বামীর নিন্দা করিয়া কুরআনের আয়াত নাযিল হইয়াছে, তখন সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে খুঁজিতে খুঁজিতে কা'বা শরীফের নিকটে আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) সেই সময় কা'বা ঘরের পাশে অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহার সহিত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)- ছিলেন। উম্মু জামীলের হাতে ছিল এক মুষ্ঠি পাথর। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছাকাছি পৌঁছামা আল্লাহ তাহার দৃষ্টি কাড়িয়া লইলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে আর দেখিতে পায় নাই, হযর আবূ বকরকে দেখিতে পাইতেছিল। আবু বকর (রা)-এর সামনে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোমা সাথী কোথায়? আমি শুনিয়াছি তিনি আমার নিন্দা করেন। আল্লাহ্র শপথ! আমি যদি তাঁহাবে পাইয়া যাই, তা হইলে তাঁহার মুখে এই পাথর ছুড়িয়া মারিব। দেখো আমিও একজন কবি অতঃপর সে এই কবিতা শুনাইল: مذمما عصينا - وامره ابينا - ودينه قلينا "মুযাম্মামের অবাধ্যতা করিয়াছি, তাহার কাজকে সমর্থন করি নাই এবং তাহার দীনকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার সহিত প্রত্যাখ্যান করিয়াছি।" এই বলিয়া সে চলিয়া গেল। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে কি আপনাকে দেখিতে পায় নাই? তিনি বলিলেন, না, দেখিতে পায় নাই। মহান আল্লাহ আমার ব্যাপারে তাহার দৃষ্টি কাড়িয়া লইয়াছিলেন (ইব্‌ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৪২-৩৪৩; দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫০)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, একদা আবু জাহল কুরায়শ সরদারদেরকে জিজ্ঞাসা করিল, মুহাম্মাদ কি আপনাদের সামনে মাটিতে সিজদা করে? তাহারা বলিল, হা। আবূ জাহল বলিল, লাত এবং উয্যার শপথ! আমি যদি তাঁহাকে এইরূপ করিতে দেখি, তবে তাঁহার ঘাড় ভাঙ্গিয়া দিব, তাঁহার চেহারা মাটিতে হেঁচড়াইব। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাত আদায় করিতে দেখিয়া আবু জাহল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘাড়ে আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইল। কিন্তু সকলে দেখিল যে, হঠাৎ আবূ জাহ্ল চিৎ হইয়া মাটিতে গড়াগড়ি খাইতেছে এবং চিৎকার করিয়া বলিতেছে, বাঁচাও! বাঁচাও!! পরিচিত লোকেরা জিজ্ঞাসা করিল, আবুল হাকাম! তোমার কি হইয়াছে? আবু জাহল বলিল, আমি দেখিলাম, আমার এবং মুহাম্মাদের মাঝখানে আগুনের বিরাট একটি পরিখা। ভয়াবহ সেই আগুনের পরিখায় দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) এই কথা শুনিয়া বলিলেন, যদি সে আমার কাছে আসিত তবে ফেরেশতাগণ তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করিয়া ছোঁ মারিয়া লইয়া যাইত (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৯৩৮-৯৩৯; হাদীছ নাং ৪৯৫৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৮)।

অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, আবূ জাহ্ল বলিয়াছিল, হে কুরায়শ ভাইয়েরা! আপনারা লক্ষ্য করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ আমাদের ধর্মের সমালোচনা এবং আমাদের উপাস্য হইতে বিরত হইতেছে। আমাদের পিতা ও পিতামহকে গালমন্দ করিয়া যাইতেছে। এই কারণে আমি আল্লাহর সহিত অঙ্গীকার করিয়াছি যে, আমি একটি ভারি পাথর লইয়া বসিয়া থাকিব। মুহাম্মাদ যখন সিজদায় যাইবে, তখন সেই পাথর দিয়া তাঁহার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিব। অতঃপর যে কোন পরিস্থিতির জন্য আমি প্রস্তুত আছি। ইচ্ছা হইলে আপনারা আমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখিয়া দিবেন অথবা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিবেন। কুরায়শরা এই প্রস্তাব শুনিয়া বলিল, কোন অবস্থাতেই আমরা তোমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখিয়া দিব না। তুমি যাহা করিতে চাও করিতে পার।

পরদিন সকালে আবূ জাহ্ল একটি ভারি পাথর লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপেক্ষায় বসিয়া থাকিল। কুরায়শরা একে একে সমবেত হইয়া আবূ জাহলের তৎপরতা দেখিবার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) যথারীতি হাজির হইয়া সালাত আদায় করা শুরু করিলেন। তিনি যখন সিজদায় গেলেন তখন আবু জাহ্ল তাহার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিবার জন্য পাথর লইয়া অগ্রসর হইল। কিন্তু পরক্ষণে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া এমন অবস্থায় ফিরিয়া আসিল যেন তাহার হাত পাথরের সহিত আটকাইয়া রহিয়াছে। কুরায়শের কয়েকজন তাহার নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আবুল হাকাম! তোমার কী হইয়াছে? সে বলিল, আমি রাত্রিবেলা যেই কথা বলিয়াছিলাম তাহা পূর্ণ করিতে যাইতেছিলাম। কিন্তু কাছাকাছি পৌছিয়া দেখিতে পাইলাম, মুহাম্মদ এবং আমার মধ্যখানে একটা উট আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। আল্লাহ্র কসম! এত বড়, এত লম্বা ঘাড় ও দাঁতবিশিষ্ট উট আমি কখনও দেখি নাই। উটটি আমার উপর আক্রমণ করিতে চাহিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিলেন, উটের ছদ্মবেশে তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ)। আবু জাহল যদি আমার নিকট আসিত তবে তাহাকে পাকড়াও করা হইত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৭; সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৯৬-৯৭)।

ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, ফাতিমা (রা) বলেন, একদিন কুরায়শ মুশরিকরা কা'বার হাতীমে লাত-'উয্যার কসম খাইয়া সমস্বরে বলাবলি করিতে লাগিল, আমরা যদি মুহাম্মাদকে পাই তাহা হইলে তাহাকে হত্যা না করিয়া এই স্থান ত্যাগ করিব না। ফাতিমা (রা) বলেন, এই কথা শুনিয়া আমি ক্রন্দন করিতে করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে গিয়া বলিলাম, তাহারা আপনাকে দেখিলে হত্যা করিবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, মা, চুপ কর। আমার জন্য উযূর পানি লইয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স) উযূ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া তাহাদের পাশ দিয়াই মসজিদে গমন করিলেন। মুশরিকরা তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, এইতো মুহাম্মাদ! এই কথা বলিয়াই তাহারা তাহাদের মাথা অবনত করিল। এমনকি তাহাদের চিবুক বুকে গিয়া লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের পাশে গিয়া এক মুষ্ঠি মাটি লইলেন এবং شاهت الوجوه বলিয়া তাহাদের দিকে নিক্ষেপ করিলেন। এই মাটি যাহাদের শরীরে লাগিয়াছিল, তাহারা সকলেই বদরের যুদ্ধে নিহত হইয়াছে (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫০)।

হাকাম ইবন আবিল 'আস বলেন, আমরা কতিপয় কাফির রাসূলুল্লাহ (স.) কে হত্যা করিবার অঙ্গিকার করিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, রাত্রিবেলয় যখন রাসূলুল্লাহ (স) ঘর হইতে বাহির হইবেন, তখন তাঁহার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালানো হইবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট সময়ে তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম। কিন্তু তিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া আমাদের সম্মুখ দিয়া চলিয়া গেলেন। তখন আমরা এক বিকট আওয়াজ শুনিতে পাইলাম যাহাতে আমাদের এই আশঙ্কা হইল যে, হয়ত মক্কার সকল প্রাণী মৃত্যবরণ করিয়াছে। ঐ শব্দ শুনিবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলে অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (স) হারাম শরীফ হইতে সালাত আদায় করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলে আমরা জ্ঞান ফিরিয়া পাইলাম।

পরবর্তী রাত্রেও আমরা একই উদ্দেশ্যে যথাস্থানে ওঁত পাতিয়া রহিলাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ঘর হইতে বাহির হইয়া আমাদের নিকট পৌছামাত্র সাফা-মারওয়া পাহাড় আমাদের ও রাসূলের মাঝে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়াইল। ফলে আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূলকে কাফিরদের অনিষ্ট হইতে হিফাজত করিলেন। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ আমাদিগকে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করিয়াছেন (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৮৪-৬৮৫; দালা'ইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ৫২৮-৫২৯)।

ইবন 'আৱাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) উচ্চস্বরে মসজিদুল হারামে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করিতেছিলেন। নির্যাতন চালাইবার জন্য কুরায়শরা তাঁহাকে ধরিতে উদ্যত হয়। হঠাৎ তাহাদের হাত তাহাদের নিজ নিজ ঘাড়ের সহিত আটকাইয়া বেড়ীর মত হইয়া যায়। তাহারা দৃষ্টি শক্তিও হারাইয়া ফেলে। ফলে তাহারা আর কিছুই দেখিতে পাইল না (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫৫)।

'উরওয়া ইবনুয যুবায়র বর্ণনা করেন, নাদর ইবনুল হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-কে ভীষণ কষ্ট দিত। গ্রীষ্মকালে একদিন দুপুরে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সানিয়‍্যাতুল হুযনের নিম্নাঞ্চলে গেলেন। নাদর তাঁহাকে যাইতে দেখিয়া ভাবিল, তাঁহাকে হত্যা করিবার এমন উত্তম সুযোগ আর কখনও পাওয়া যাইবেনা। নযর তাহার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে অগ্রসর হইল; কিন্তু হঠাৎ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিল। পথে আবূ জাহলের সহিত দেখা হইলে সে জিজ্ঞাসা করিল, নাদর কোথায় হইতে আসিয়াছ? নাদর বলিল, মুহাম্মাদ নির্জনে ছিল, আমি তাঁহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার পশ্চাৎ গমন করিয়াছিলাম। কিন্তু অকস্মাৎ আমি অনেকগুলি সিংহ দেখিলাম। সেইগুলি মুখ হা করিয়া আমার দিকে আগাইয়া আসিতেছিল। আমি ভীত হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। আবু জাহল বলিল, ইহাও তাঁহার যাদু (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০)।

বানু মুগীরার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে আসিবার পর তাহার চক্ষু অন্ধ হইয়া যায়। ফলে সে তাঁহাকে আর দেখিতে পায় নাই। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যাওয়ার পরও দৃষ্টি শক্তি আর ফিরিয়া পায় নাই (মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৮৭)।

মু'তামির ইবন সুলায়মান তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় বানু মাখযূমের এক ব্যক্তি তাঁহার মাথায় আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে পাথর লইয়া আসে। সে তাঁহার উপর পাথর নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইলে তাহার হাত পাথরের সহিত আটকাইয়া যায়। ফলে সে আর পাথরটি নিক্ষেপ করিতে পারে নাই। অতঃপর লোকটি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট যাওয়ার পর লোকেরা তাহার হাত পাথরের সহিত লাগানো দেখিয়া অবাক হইয়া গেল এবং ঐ ব্যক্তিকে চিকিৎসার মাধ্যমে পাথর হইতে মুক্ত করিল (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫৫)।

তাবারানী, ইব্‌ন মান্দা ও আবূ নু'আয়মের রিওয়ায়াতে হাকামের কন্যা বর্ণনা করেন। আমার দাদা হাকাম আমাকে বলিয়াছেন, আমি তোমার নিকট একটি চাক্ষুষ ঘটনা বর্ণনা করিতেছি শুন। একদিন আমরা এই মর্মে অঙ্গীকার করিলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পাকড়াও করিব। তখন আমরা একটি ভয়ংকর শব্দ শুনিতে পাইলাম। মনে হইল যেন তিহামার পাহাড় চুরমার হইয়া গিয়াছে। আমরা জ্ঞন হারাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) নামায সমাপ্ত করিয়া গৃহে ফিরিয়া যাওয়া পর্যন্ত আমাদের কোন বোধশক্তিই ছিল না। পরবর্তী রাতে আমরা আবার পূর্ববৎ অঙ্গীকার করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) মসজিদে আসিলে আমরা তাঁহার দিকে অগ্রসর হইলাম। দেখিলাম, সাফা ও মারওয়া পহাড়দ্বয় আসিয়া পরস্পর মিলিত হইয়া আমাদের ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে অন্তরাল হইয়া গেল। আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ্র কসম! আমাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয় নাই। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আমাদিগকে ইসলামে প্রবেশের তৌফিক দান করিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৯)।

ইবন ইসহাক বলেন, শায়বা ইবন 'উছমান ইব্‌ন আবূ তালহা আমার নিকট বর্ণনা করেন, আর তিনি ছিলেন 'আবদুদ-দার গোত্রের একজন। আমি মনে মনে বলিলাম, আজই আমাদের মুহাম্মাদের নিকট হইতে রক্তের প্রতিশোধ লওয়ার সুযোগ। উল্লেখ্য, তাহার পিতা উহুদের যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল। সে বলিল, আজ আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করিব। আমি মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার চারিপার্শ্বে ঘুরিতে লগিলাম। তাহার পর কি যেন আসিয়া আমার ও তাঁহার মধ্যখানে অন্তরায় হইল, এমনকি হৃদয় পর্যন্ত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। শেষ পর্যন্ত আর মুহাম্মাদকে হত্যা করা সম্ভব হইল না। আমি উপলব্ধি করিলাম, আমাকে এই কাজ হইতে নিবৃত্ত করা হইয়াছে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৬৫)।

মহান আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিদ্রূপকারী কাফির মুশরিকদের দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য রাখিতেন, আবার কখনও অন্য কৌশল অবলম্বন করিতেন। এই মর্মে মহান আল্লাহর ঘোষণা: إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزئين “আমিই যথেষ্ট তোমার জন্য বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে" (১৫: ৯৫)।

রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত ও রিসালাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হইয়া যেই দিন সাফা পর্বতে দাঁড়াইয়া মক্কার কুরায়শদের উদ্দেশ্যে ইসলামী দাওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, সেই দিন হইতেই তিনি সংকটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। ধীরে ধীরে নানা বাধা-বিঘ্নের প্রকাশ ঘটে। এক সময় জুলুম নির্যাতন সীমা অতিক্রম করে। ক্রমশ এমন অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, কোন মানুষের পক্ষে আল্লাহ তা'আলার মদদ ও সাহায্য ব্যতীত এই অবস্থায় টিকিয়া থাকাই অসম্ভব, সফলতা লাভ করার তো প্রশ্নই উঠে না। যদি তাঁহার উপর আল্লাহ তা'আলার বিশেষ রহমতে রাসূলুল্লাহ (স) সাফল্যের এই সমস্ত দুর্গম বাধাবিপত্তি অতিক্রম করেন ও সফলতা অর্জন করেন। ইহা সন্দেহাতীত যে, সর্বাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তাঁহার হিফাযত করিয়াছেন। ইরশাদ হইয়াছে:

يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥ ۚ وَٱللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِ ۗ

“হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের নিকট হইতে আপনার প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছে, আপনি তাহা প্রচার করুন। যদি আপনি তাহা না করেন, তবে তো আপনি তাঁহার বার্তা প্রচার করিলেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ হইতে রক্ষা করিবেন" (৫ঃ ৬৭)।

এই আয়াত নাযিল হইলে রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন। "হে লোকসকল! আমার জন্য পাহারা দান অপসারিত কর, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করিয়া দিয়াছেন" (তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৩৬৩, হাদীছ নং ৩০৪৬, বাংলা অনু. ইফাবা)।

আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-কে রক্ষা করিবার তাৎপর্য হইল, মহান আল্লাহ্র অসীম কুদরতে সকল ব্যবস্থায় তাহার পূর্ণ হিফাযত করা। মহান আল্লাহ তাঁহার দাওয়াতের প্রথমদিকে তাঁহার চাচা আবূ তালিব দ্বারা তাঁহার হিফাযত করিয়াছেন। আবু তালিবের মৃত্যুর পর মুত'ইম ইবন 'আদী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন (আসাহহুস- সিয়ার, পৃ. ৫৭)। রাসূলুল্লাহ (স) তাইফ হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় জিন্নদের একটি দল তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করে ও ইসলাম গ্রহণ করে (সূরা জিন্ন, আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৭)। পরিশেষে মদীনায় হিজরত করিবার পর মদীনাবাসী আওস ও খাযরাজ গোত্র তাহারা তাঁহার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। এইভাবে যখনই কোন মুশরিক আহলে কিতাব ও মুনাফিক, তাঁহার অনিষ্টের চেষ্টা করিয়াছে তখনই মহান আল্লাহ তাঁহাকে হিফাযত করিয়াছেন ও তাহাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করিয়া দিয়াছেন (ইবন কাছীর, ২খ., পৃ. ৮৮-৮৯)।

আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা বিধান ও তাঁহার শত্রুগণকে তাঁহার ক্ষতি করা হইতে বিরত রাখিবার অনেক ঘটনা ও দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। তদ্রূপ কিছু ঘটনা নিয়ে বর্ণিত হইল : উম্মু জামীল আবু লাহাবের স্ত্রী, রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচী। রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি শত্রুতায় সে তাহার স্বামী আবু লাহাব অপেক্ষা কোন অংশেই কম ছিল না। উম্মু জামীল যখন জানিতে পারিল, তাহার এবং তাহার স্বামীর নিন্দা করিয়া কুরআনের আয়াত নাযিল হইয়াছে, তখন সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে খুঁজিতে খুঁজিতে কা'বা শরীফের নিকটে আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) সেই সময় কা'বা ঘরের পাশে অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহার সহিত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)- ছিলেন। উম্মু জামীলের হাতে ছিল এক মুষ্ঠি পাথর। রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছাকাছি পৌঁছামা আল্লাহ তাহার দৃষ্টি কাড়িয়া লইলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে আর দেখিতে পায় নাই, হযর আবূ বকরকে দেখিতে পাইতেছিল। আবু বকর (রা)-এর সামনে গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, তোমা সাথী কোথায়? আমি শুনিয়াছি তিনি আমার নিন্দা করেন। আল্লাহ্র শপথ! আমি যদি তাঁহাবে পাইয়া যাই, তা হইলে তাঁহার মুখে এই পাথর ছুড়িয়া মারিব। দেখো আমিও একজন কবি অতঃপর সে এই কবিতা শুনাইল:

مذمما عصينا - وامره ابينا - ودينه قلينا

"মুযাম্মামের অবাধ্যতা করিয়াছি, তাহার কাজকে সমর্থন করি নাই এবং তাহার দীনকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার সহিত প্রত্যাখ্যান করিয়াছি।" এই বলিয়া সে চলিয়া গেল। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে কি আপনাকে দেখিতে পায় নাই? তিনি বলিলেন, না, দেখিতে পায় নাই। মহান আল্লাহ আমার ব্যাপারে তাহার দৃষ্টি কাড়িয়া লইয়াছিলেন (ইব্‌ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৪২-৩৪৩; দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫০)।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, একদা আবু জাহল কুরায়শ সরদারদেরকে জিজ্ঞাসা করিল, মুহাম্মাদ কি আপনাদের সামনে মাটিতে সিজদা করে? তাহারা বলিল, হা। আবূ জাহল বলিল, লাত এবং উয্যার শপথ! আমি যদি তাঁহাকে এইরূপ করিতে দেখি, তবে তাঁহার ঘাড় ভাঙ্গিয়া দিব, তাঁহার চেহারা মাটিতে হেঁচড়াইব। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাত আদায় করিতে দেখিয়া আবু জাহল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘাড়ে আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হইল। কিন্তু সকলে দেখিল যে, হঠাৎ আবূ জাহ্ল চিৎ হইয়া মাটিতে গড়াগড়ি খাইতেছে এবং চিৎকার করিয়া বলিতেছে, বাঁচাও! বাঁচাও!! পরিচিত লোকেরা জিজ্ঞাসা করিল, আবুল হাকাম! তোমার কি হইয়াছে? আবু জাহল বলিল, আমি দেখিলাম, আমার এবং মুহাম্মাদের মাঝখানে আগুনের বিরাট একটি পরিখা। ভয়াবহ সেই আগুনের পরিখায় দাউ দাউ করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) এই কথা শুনিয়া বলিলেন, যদি সে আমার কাছে আসিত তবে ফেরেশতাগণ তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করিয়া ছোঁ মারিয়া লইয়া যাইত (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৯৩৮-৯৩৯; হাদীছ নাং ৪৯৫৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৮)।

অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, আবূ জাহ্ল বলিয়াছিল, হে কুরায়শ ভাইয়েরা! আপনারা লক্ষ্য করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ আমাদের ধর্মের সমালোচনা এবং আমাদের উপাস্য হইতে বিরত হইতেছে। আমাদের পিতা ও পিতামহকে গালমন্দ করিয়া যাইতেছে। এই কারণে আমি আল্লাহর সহিত অঙ্গীকার করিয়াছি যে, আমি একটি ভারি পাথর লইয়া বসিয়া থাকিব। মুহাম্মাদ যখন সিজদায় যাইবে, তখন সেই পাথর দিয়া তাঁহার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিব। অতঃপর যে কোন পরিস্থিতির জন্য আমি প্রস্তুত আছি। ইচ্ছা হইলে আপনারা আমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখিয়া দিবেন অথবা আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করিবেন। কুরায়শরা এই প্রস্তাব শুনিয়া বলিল, কোন অবস্থাতেই আমরা তোমাকে বান্ধবহীন অবস্থায় রাখিয়া দিব না। তুমি যাহা করিতে চাও করিতে পার।

পরদিন সকালে আবূ জাহ্ল একটি ভারি পাথর লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর অপেক্ষায় বসিয়া থাকিল। কুরায়শরা একে একে সমবেত হইয়া আবূ জাহলের তৎপরতা দেখিবার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া রহিল। রাসূলুল্লাহ (স) যথারীতি হাজির হইয়া সালাত আদায় করা শুরু করিলেন। তিনি যখন সিজদায় গেলেন তখন আবু জাহ্ল তাহার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিবার জন্য পাথর লইয়া অগ্রসর হইল। কিন্তু পরক্ষণে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া এমন অবস্থায় ফিরিয়া আসিল যেন তাহার হাত পাথরের সহিত আটকাইয়া রহিয়াছে। কুরায়শের কয়েকজন তাহার নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আবুল হাকাম! তোমার কী হইয়াছে? সে বলিল, আমি রাত্রিবেলা যেই কথা বলিয়াছিলাম তাহা পূর্ণ করিতে যাইতেছিলাম। কিন্তু কাছাকাছি পৌছিয়া দেখিতে পাইলাম, মুহাম্মদ এবং আমার মধ্যখানে একটা উট আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। আল্লাহ্র কসম! এত বড়, এত লম্বা ঘাড় ও দাঁতবিশিষ্ট উট আমি কখনও দেখি নাই। উটটি আমার উপর আক্রমণ করিতে চাহিতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিলেন, উটের ছদ্মবেশে তিনি ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ)। আবু জাহল যদি আমার নিকট আসিত তবে তাহাকে পাকড়াও করা হইত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৭; সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৯৬-৯৭)।

ইবন 'আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, ফাতিমা (রা) বলেন, একদিন কুরায়শ মুশরিকরা কা'বার হাতীমে লাত-'উয্যার কসম খাইয়া সমস্বরে বলাবলি করিতে লাগিল, আমরা যদি মুহাম্মাদকে পাই তাহা হইলে তাহাকে হত্যা না করিয়া এই স্থান ত্যাগ করিব না। ফাতিমা (রা) বলেন, এই কথা শুনিয়া আমি ক্রন্দন করিতে করিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে গিয়া বলিলাম, তাহারা আপনাকে দেখিলে হত্যা করিবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, মা, চুপ কর। আমার জন্য উযূর পানি লইয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স) উযূ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া তাহাদের পাশ দিয়াই মসজিদে গমন করিলেন। মুশরিকরা তাঁহাকে দেখিয়া বলিল, এইতো মুহাম্মাদ! এই কথা বলিয়াই তাহারা তাহাদের মাথা অবনত করিল। এমনকি তাহাদের চিবুক বুকে গিয়া লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের পাশে গিয়া এক মুষ্ঠি মাটি লইলেন এবং شاهت الوجوه বলিয়া তাহাদের দিকে নিক্ষেপ করিলেন। এই মাটি যাহাদের শরীরে লাগিয়াছিল, তাহারা সকলেই বদরের যুদ্ধে নিহত হইয়াছে (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫০)।

হাকাম ইবন আবিল 'আস বলেন, আমরা কতিপয় কাফির রাসূলুল্লাহ (স.) কে হত্যা করিবার অঙ্গিকার করিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, রাত্রিবেলয় যখন রাসূলুল্লাহ (স) ঘর হইতে বাহির হইবেন, তখন তাঁহার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালানো হইবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট সময়ে তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলাম। কিন্তু তিনি ঘর হইতে বাহির হইয়া আমাদের সম্মুখ দিয়া চলিয়া গেলেন। তখন আমরা এক বিকট আওয়াজ শুনিতে পাইলাম যাহাতে আমাদের এই আশঙ্কা হইল যে, হয়ত মক্কার সকল প্রাণী মৃত্যবরণ করিয়াছে। ঐ শব্দ শুনিবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সকলে অজ্ঞান হইয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (স) হারাম শরীফ হইতে সালাত আদায় করিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলে আমরা জ্ঞান ফিরিয়া পাইলাম।

পরবর্তী রাত্রেও আমরা একই উদ্দেশ্যে যথাস্থানে ওঁত পাতিয়া রহিলাম। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ঘর হইতে বাহির হইয়া আমাদের নিকট পৌছামাত্র সাফা-মারওয়া পাহাড় আমাদের ও রাসূলের মাঝে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়াইল। ফলে আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূলকে কাফিরদের অনিষ্ট হইতে হিফাজত করিলেন। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ আমাদিগকে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করিয়াছেন (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৮৪-৬৮৫; দালা'ইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ৫২৮-৫২৯)।

ইবন 'আৱাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) উচ্চস্বরে মসজিদুল হারামে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করিতেছিলেন। নির্যাতন চালাইবার জন্য কুরায়শরা তাঁহাকে ধরিতে উদ্যত হয়। হঠাৎ তাহাদের হাত তাহাদের নিজ নিজ ঘাড়ের সহিত আটকাইয়া বেড়ীর মত হইয়া যায়। তাহারা দৃষ্টি শক্তিও হারাইয়া ফেলে। ফলে তাহারা আর কিছুই দেখিতে পাইল না (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫৫)।

'উরওয়া ইবনুয যুবায়র বর্ণনা করেন, নাদর ইবনুল হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-কে ভীষণ কষ্ট দিত। গ্রীষ্মকালে একদিন দুপুরে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সানিয়‍্যাতুল হুযনের নিম্নাঞ্চলে গেলেন। নাদর তাঁহাকে যাইতে দেখিয়া ভাবিল, তাঁহাকে হত্যা করিবার এমন উত্তম সুযোগ আর কখনও পাওয়া যাইবেনা। নযর তাহার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে অগ্রসর হইল; কিন্তু হঠাৎ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া ফিরিয়া আসিল। পথে আবূ জাহলের সহিত দেখা হইলে সে জিজ্ঞাসা করিল, নাদর কোথায় হইতে আসিয়াছ? নাদর বলিল, মুহাম্মাদ নির্জনে ছিল, আমি তাঁহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার পশ্চাৎ গমন করিয়াছিলাম। কিন্তু অকস্মাৎ আমি অনেকগুলি সিংহ দেখিলাম। সেইগুলি মুখ হা করিয়া আমার দিকে আগাইয়া আসিতেছিল। আমি ভীত হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। আবু জাহল বলিল, ইহাও তাঁহার যাদু (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬০)।

বানু মুগীরার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে আসিয়াছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে আসিবার পর তাহার চক্ষু অন্ধ হইয়া যায়। ফলে সে তাঁহাকে আর দেখিতে পায় নাই। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যাওয়ার পরও দৃষ্টি শক্তি আর ফিরিয়া পায় নাই (মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৮৭)।

মু'তামির ইবন সুলায়মান তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় বানু মাখযূমের এক ব্যক্তি তাঁহার মাথায় আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে পাথর লইয়া আসে। সে তাঁহার উপর পাথর নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হইলে তাহার হাত পাথরের সহিত আটকাইয়া যায়। ফলে সে আর পাথরটি নিক্ষেপ করিতে পারে নাই। অতঃপর লোকটি তাহার সম্প্রদায়ের নিকট যাওয়ার পর লোকেরা তাহার হাত পাথরের সহিত লাগানো দেখিয়া অবাক হইয়া গেল এবং ঐ ব্যক্তিকে চিকিৎসার মাধ্যমে পাথর হইতে মুক্ত করিল (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৫৫)।

তাবারানী, ইব্‌ন মান্দা ও আবূ নু'আয়মের রিওয়ায়াতে হাকামের কন্যা বর্ণনা করেন। আমার দাদা হাকাম আমাকে বলিয়াছেন, আমি তোমার নিকট একটি চাক্ষুষ ঘটনা বর্ণনা করিতেছি শুন। একদিন আমরা এই মর্মে অঙ্গীকার করিলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পাকড়াও করিব। তখন আমরা একটি ভয়ংকর শব্দ শুনিতে পাইলাম। মনে হইল যেন তিহামার পাহাড় চুরমার হইয়া গিয়াছে। আমরা জ্ঞন হারাইলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) নামায সমাপ্ত করিয়া গৃহে ফিরিয়া যাওয়া পর্যন্ত আমাদের কোন বোধশক্তিই ছিল না। পরবর্তী রাতে আমরা আবার পূর্ববৎ অঙ্গীকার করিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (স) মসজিদে আসিলে আমরা তাঁহার দিকে অগ্রসর হইলাম। দেখিলাম, সাফা ও মারওয়া পহাড়দ্বয় আসিয়া পরস্পর মিলিত হইয়া আমাদের ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে অন্তরাল হইয়া গেল। আমরা তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ্র কসম! আমাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয় নাই। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আমাদিগকে ইসলামে প্রবেশের তৌফিক দান করিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৯)।

ইবন ইসহাক বলেন, শায়বা ইবন 'উছমান ইব্‌ন আবূ তালহা আমার নিকট বর্ণনা করেন, আর তিনি ছিলেন 'আবদুদ-দার গোত্রের একজন। আমি মনে মনে বলিলাম, আজই আমাদের মুহাম্মাদের নিকট হইতে রক্তের প্রতিশোধ লওয়ার সুযোগ। উল্লেখ্য, তাহার পিতা উহুদের যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল। সে বলিল, আজ আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করিব। আমি মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁহার চারিপার্শ্বে ঘুরিতে লগিলাম। তাহার পর কি যেন আসিয়া আমার ও তাঁহার মধ্যখানে অন্তরায় হইল, এমনকি হৃদয় পর্যন্ত আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। শেষ পর্যন্ত আর মুহাম্মাদকে হত্যা করা সম্ভব হইল না। আমি উপলব্ধি করিলাম, আমাকে এই কাজ হইতে নিবৃত্ত করা হইয়াছে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৬৫)।

মহান আল্লাহ্ তা'আলা তাঁহার প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিদ্রূপকারী কাফির মুশরিকদের দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য রাখিতেন, আবার কখনও অন্য কৌশল অবলম্বন করিতেন। এই মর্মে মহান আল্লাহর ঘোষণা: إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزئين “আমিই যথেষ্ট তোমার জন্য বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে" (১৫: ৯৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়াহুদীদের চক্রান্ত হইতে রক্ষা

📄 ইয়াহুদীদের চক্রান্ত হইতে রক্ষা


আবদুর রহমান ইব্‌ন কা'ব ইব্‌ন মালিক (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জনৈক সাহাবী হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, কুরায়শ কাফিররা আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবায় এবং মূর্তিপূজকদিগকে এই মর্মে পত্র লিখিল, আপনারা আমাদের লোককে আশ্রয় দিয়াছেন। এই কারণে আমরা আল্লাহ্র কসম খাইয়া বলিতেছি, আপনারা হয় তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন অথবা তাহাকে মদীনা হইতে বাহির করিয়া দিন। যদি উহা না করেন তবে আমরা সর্বশক্তি দিয়া আপনাদের উপর ঝাপাইয়া পড়িব এবং আপনাদের যোদ্ধা পুরুষদেরকে হত্যা করিব ও আপনাদের মহিলাদের সম্মান বিনষ্ট করিব। এই চিঠি পাইবার পরই ইব্‌ন উবায় এবং তাহার মূর্তিপূজারী সাথীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিবার পর তিনি তাহাদের সহিত সাক্ষাত করেন এবং বলেন, মনে হইতেছে মক্কার কুরায়শদের হুমকিতে তোমরা যথেষ্ট প্রভাবিত হইয়াছ। কিন্তু উহা তোমাদের জন্য এতো মারাত্মক নয়, যতনা ক্ষতি তোমরা নিজেরা নিজেদের করিবে। কেননা তোমরা তো তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সংকল্প করিয়াছ। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই কথা শুনিয়া তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল এবং যুদ্ধ করা হইতে বিরত থাকিল। বদর যুদ্ধের পর মক্কার কুরায়শরা আবার ইয়াহুদীদের নিকট পত্র লিখিল, তোমরা ঘরবাড়ি ও দুর্গের অধিকারী। কাজেই তোমাদের উচিত আমাদের সঙ্গীর (মুহাম্মাদ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। অন্যথা আমরা তোমাদের সহিত যাহা করার করিব। আর আমাদের ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে কোন পার্থক্য থকিবে না। এইরূপ চিঠি পাইবার পর বানু নাযীরের ইয়াহুদীরা সন্ধি ভঙ্গ করিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করিল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই মর্মে অবহিত করিল, আপনি আপনার সঙ্গীদের ত্রিশজন লইয়া আমাদের কাছে আসুন এবং আমাদের ত্রিশজন আলিম আপনার সংগে এক আলাদা স্থানে দেখা করিবে। তাহারা আগনার কথা শুনিবে। যদি তাহারা আপনার উপর ঈমান আনে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে আমরা আপনার উপর ঈমান আনিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের কথায় সম্মত হইলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের পরিকল্পনা ছিল, রাসূলুল্লাহ (স)-কে নির্জনে আনিয়া হত্যা করিবে। ইহার জন্য তাহারা তরবারি লইয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে বানু নাষীরের এক মহিলা অবহিত হইয়া সে তাহার ভাই আনসারী মুসলমানের নিকট সংবাদ দিল। ঐ মহিলার ভাই রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই সম্পর্কে অবগত করিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌছিবার পূর্বেই যেন ফিরিয়া আসেন। এইভাবে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে হিফাযত করেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪২১, হাদীছ ৪০২৮, ৪০৩২; আবূ দাউদ, ৩খ, পৃ. ১৫৫, হাদীছ নং ৩০০৪)।

রাসূলুল্লাহ (স) একদা তাঁহার কয়েকজন সাহাবাকে লইয়া বানু আমেরের দুই ব্যক্তির রক্তপণ পরিশোধে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে বানু নাযীরের নিকট গমন করেন, যাহাদিগকে হযরত আমর ইবন উমায়‍্যা আদ-দামরী (রা) ভুলক্রমে হত্যা করিয়াছিলেন। তখন তাহারা বলিল, আপনি আপনার সংগীদেরকে লইয়া এই স্থানে অপেক্ষা করুন, আমরা ব্যবস্থা করিতেছি। এই কথার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের একটি দেয়ালের সহিত হেলান দিয়া বসিয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। এমন সময় তাহারা গোপনে বলাবলি করিল, এই মুহূর্তের মত মুহাম্মাদকে এত নিকটে তোমরা আর কখনও পাইবে না। সুতরাং এমন কে আছে যে ঐ ঘরের ছাদে উঠিয়া বিরাট পাথর খণ্ড তাঁহার উপর নিক্ষেপ করিয়া তাঁহার উপদ্রব হইতে আমাদেরকে রক্ষা করিবে? তখন আমর ইবন জাহ্হাশ ইব্‌ন কা'ব বলিল, আমি পারিব। সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (স)-র নিকট জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত সেই স্থান হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। সাহাবীগণ তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এতো দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহাবীদেরকে অবহিত করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪২০, হাদীছ ৪০২৮, ৪০৩২; ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৩৪)।

'আইশা (রা) বলেন, খায়বার যুদ্ধের পর সাল্লাম ইবন মিশকামের স্ত্রী যয়নব বিনত হারিছ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বকরির ভূনা গোশত উপঢৌকন হিসাবে পাঠায়। সেই নারী আগেই খবর লইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ বকরীর কোন অংশ বেশী পছন্দ করেন। তদনুযায়ী সে পছন্দনীয় অংশে বেশী করিয়া বিষ মিশ্রিত করে, অন্যান্য অংশেও বিষ মিশ্রিত করে। রাসূলুল্লাহ (স) পছন্দনীয় অংশের এক টুকরা মুখে দেন, কিন্তু চিবিয়াই ফেলিয়া দিলেন। অতঃপর বলিলেন, এই যে হাড় দেখিতেছ, ইহা আমাকে বলিতেছে, উহার মধ্যে বিষ মিশ্রিত রহিয়াছে। যয়নবকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিবার পর সে স্বীকার করিল। তিনি বলিলেন, তুমি কেন এই কাজ করিয়াছ? সে বলিল, আমি ভাবিয়াছিলাম, যদি আপনি বাদশাহ হন তবে আমরা তাঁহার শাসন হইতে মুক্তি পাইব। আর যদি এই ব্যক্তি নবী হন তবে আমার বিষ মিশানোর খবর তাঁহাকে জানাইয়া দেওয়া হইবে। এই বিষ মিশ্রিত গোশত ভক্ষণ করা হইতে আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূলকে এইভাবে হিফাযত করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৬৩৩, হাদীছ ৪২৪৯)।

বদর যুদ্ধের কয়েক দিন পরের কথা। 'উমায়র ইবন ওয়াত্ব নামক এক কুরায়শ রাসূলুল্লাহ (স)-কে নানাভাবে কষ্ট দিত। এই 'উমায়র একদিন কা'বার হাতীমে বসিয়া সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সহিত বদরের যুদ্ধে নিহতদের লাশ বদরের একটি নোংরা কূপে নিক্ষেপ করিবার দুঃখজনক ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করিতেছিল। এক পর্যায়ে সাফওয়ান বলিল, আল্লাহ্ কসম। তাহাদের অনুপস্থিতিতে বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কোন স্বাদ নাই। উত্তরে 'উমায়র বলিল, আল্লাহ্র কসম! তুমি সত্য কথাই বলিয়াছ। দেখো, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হইতাম, আমার পরিবার-পরিজনের যদি চিন্তা না থাকিত তাহা হইলে আমি মদীনায় গিয়া মুহাম্মাদকে হত্যা করিতাম। সাফওয়ান সব কথা শুনিয়া 'উমায়রকে বলিল, তোমার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আমি তোমার পক্ষ হইতে ঋণ পরিশোধ করিয়া দিব। তোমার পরিবারকে আজীবন আমার নিজের পরিবারের ন্যায় দেখাশুনা করিব। 'উমায়র বলিল, তবে আমাদের এই কথা যেন গোপন থাকে। সাফওয়ান বলিল, হাঁ।

অতঃপর 'উমায়র তাহার তরবারি ধারাল করিল এবং উহাতে বিষ মিশ্রিত করিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইল। মদীনায় পৌঁছিয়া সে মসজিদে নববীর সামনে উট বসাইতেছিল, এমতাবস্থায় 'উমার (রা)-এর দৃষ্টি তাহার উপর পড়িল। উমায়রকে দেখামাত্র 'উমার (রা) বলিলেন, এই নরাধম! আল্লাহর দুশমন! নিশ্চয় তুমি কোন খারাপ উদ্দেশ্যে আসিয়াছ? হযরত 'উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে সংবাদ দিলেন যে, 'উমায়র তরবারি ঝুলাইয়া আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাকে আমার কাছে লইয়া আস। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসার পর তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, 'উমায়র! তুমি কেন আসিয়াছ? সে বলিল, আপনাদের কাছে আমাদের যে বন্দী রহিয়াছে তাহাদের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য আসিয়াছি। তাহাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে তোমার গলায় তরবারি কেন? সে বলিল, আল্লাহ এই তরবারি নিপাত করুন, ইহা কি আর আমাদের কোন কাজে আসিবে? তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, সত্যি করিয়া বল, কেন আসিয়াছ? সে পুনরায় বলিল, যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে আসিয়াছি। তিনি বলিলেন, তুমি মিথ্যা বলিতেছ। বরং তুমি এবং সাফওয়ান কা'বার হাতীমে বসিয়া কুরায়শদের লাশ কূপে ফেলিবার প্রসঙ্গ লইয়া আফসোস করিতেছিলে। তুমি এক পর্যায়ে বলিয়াছিলে, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হইতাম এবং আমার যদি পরিবার-পরিজন না থাকিত, তবে এই স্থান হইতে গিয়া মুহাম্মাদকে শেষ করিয়া দিতাম। এই কথা শুনিবার পর সাফওয়ান তোমার ঋণ এবং পরিবারের দায়িত্ব নিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আমাকে হত্যার ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক আমার এবং তোমার মধ্যে অন্তরায় হইয়া রহিয়াছেন।

'উমায়র বলিল, ইহা তো এমন ব্যাপার যাহা আমি ও সাফওয়ান ব্যতীত সেই স্থানে অন্য কেহ উপস্থিত ছিল না। কাজেই আমি আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি, ইহা আল্লাহ ব্যতীত আপনাকে অন্য কেহ জানান নাই। এই বলিয়া 'উমায়র ইসলাম গ্রহণ করিলেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২২৭-২২৮)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, যেই রাত্রে এক দল জিনকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি আকৃষ্ট করা হইয়াছিল আমি সেই রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত ছিলাম। ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, একজন জিন অগ্নিশিখা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে আসিল। তখন জিবরাঈল (আ) বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আপনাকে একটি দু'আ শিক্ষা দিব, পাঠ করিলে তাহার অগ্নি নির্বাপিত হইয়া যাইবে। অতঃপর জিবরাঈল বলিলেন, আপনি বলুন: اعوذ بكلمات الله التامة التي لا يجاوزهن بر ولا فاجر من شر ما ينزل من السماء وما يعرج فيها ومن شر ما ذرأ في الارض وما يخرج منها ومن شر فتن الليل ومن شر طوارق الليل والنهار الا طارقاً يطرق بخير يا رحمن "আমি আল্লাহ্ আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি, যিনি বড়ই অনুগ্রহকারী এবং তাঁহার ঐসমস্ত পরিপূর্ণ কলেমার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করিতেছি যাহা নেককার অথবা বদকার অতিক্রম করিতে পারে না, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন এবং ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা আসমান হইতে অবতরণ করে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা আসমানে আরোহণ করে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা যমীনে বিস্তার করিয়াছে, ঐসব বস্তুর অনিষ্ট হইতে যাহা যমীন হইতে বাহির হয় এবং রাত্রি ও দিনের ফিৎনার অনিষ্ট হইতে এবং প্রত্যেক রাত্রিতে আগমনকারী দুর্ঘটনার অনিষ্ট হইতে, ঐ আগমনকারী ঘটনা ব্যতীত যাহা কল্যাণ বহিয়া আনে। হে দয়ালু" (দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ১৪৯)।

হযরত জাবির (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত নাজদের দিকে সংঘটিত একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। উক্ত সফরে আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অতিশয় কণ্টকযুক্ত বৃক্ষবেষ্টিত এক উপত্যকায় দেখিতে পাই যে, তিনি একটি গাছের নিচে অবতরণ করিয়া একটি ডালে তরবারি ঝুলাইয়া রাখিলেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, লোকেরা তখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া উপত্যকায় গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করিতেছিল। জাবির (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম, সেই সুযোগে গাওরাস ইবনুল হারিছ নামক এক লোক আমার নিকট আসিয়া তরবারি ধারণ করিয়া আমাকে বলিল, আমা হইতে তোমাকে কে রক্ষা করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি উত্তর দিলাম "আল্লাহ”! আল্লাহর নাম শুনিবামাত্র তাহার দেহে কম্পন শুরু হইয়া তরবারিটি তাহার হাত হইতে পড়িয়া গেল এবং সে সেইখানে বসিয়া পড়িল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) গাত্রোত্থান করিয়া তরবারিটি হাতে লইয়া বলিলেন, এখন তোমাকে আমার হাত হইতে কে রক্ষা করিবে? কোন উপায়ন্তর না দেখিয়া সে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখিয়া সে ইসলাম গ্রহণ করিল এবং স্বগোত্রের লোকদের নিকট যাইয়া বলিল, আমি মুহাম্মাদের চাইতে উত্তম মানুষ আর কখনও দেখি নাই (বুখারী, পৃ. ৫৭০, হাদিছ ২৯১৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩)।

ফাদাল। ইবন 'উমার (রা) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) যখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করিতেছিলেন, তখন আমি মনে মনে ভাবিতেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (স)-কে শেষ করিয়া দিব। কিন্তু আমি যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম তখন তিনি বলিলেন, ফাদালা মনে মনে কি ভাবিতেছ? আল্লাহ্র রাসূলকে শহীদ করিয়া দিতে চাহিতেছ? আমি বলিলাম, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অতঃপর তিনি হাসিলেন এবং আমার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মুবারক হাত আমার বুকে রাখিলেন। তখন আমার অবস্থা এমন হইল যে, পৃথিবীর সকল বস্তু হইতে তিনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হইয়া গেলেন (মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ., পৃ. ৩৮৯; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৯২)।

মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরীতে আরবের বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন গোত্র হইতে আনুগত্য প্রকাশ ও সন্ধি স্থাপনের জন্য প্রতিনিধি দলসমূহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিতে থাকে। তেমনি এক প্রতিনিধি দল আসে বানু আমের হইতে। এই প্রতিনিধি দলে আমের ইবন তুফায়ল, আব্বাদ ইবন কায়স এবং জাব্বার ইবন সালামা এই তিন নেতা ছিল উল্লেখযোগ্য। মূলত আমের ইবন তুফায়ল আসিয়াছিল কোন এক বাহানায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার উদ্দেশ্যে। তাহার সঙ্গী আব্বাদকে সে বলিল, মুহাম্মাদের কাছে গিয়া একটা কিছু বাহানা করিয়া আমি তাহাকে অন্যমনষ্ক করিব। তুমি এই সুযোগ তাঁহার উপর তরবারি চালাইবে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া আমের বলিল, মুহাম্মাদ! একটু এই দিকে আসুন তো। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি আল্লাহ্র উপর ঈমান না আনা পযর্ন্ত আমি আসিব না। সে পুনরায় একই অনুরোধ জানাইল। রাসূলুল্লাহ (স) এইবারও প্রত্যাখান করিলেন। তখন সে ক্ষিপ্ত হইয়া বলিল, ঈশ্বরের নামে বলিতেছি, আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ঘোড়া এবং যোদ্ধা দিয়া দেশ ভরিয়া দির। তাহারা চলিয়া যাইবার পর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইয়া আল্লাহ! আমেরের দুরভিসন্ধি হইতে হিফাযত কর। পথে আমের আব্বাদকে জিজ্ঞাসা করিল, ব্যাপার কি আব্বাদ? কথামত কাজ করিলে না কেন? পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র লোক, যাহাকে আমি সমীহ করিতাম। আজ হইতে আর তাহা থাকিল না।

আব্বাদ বলিল, আমার ব্যাপারে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিও না। তোমার কথামত যতবার আমি মুহাম্মাদকে মারিবার উদ্দ্যোগ লইয়াছি, ততবারই তুমি আমার সামনে আসিয়া আড়াল হইয়াছ। তবে কি তরবারি দিয়া তোমাকেই মারিব? এইভাবে আল্লাহ তাঁহার হাবীবকে বাঁচাইয়া লইলেন (দালাইলুন নুবুওয়াত, পৃ. ১৬২-১৬৩)।

হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত হুনায়নের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। এক পর্যায়ে তাঁহার সাহাবীগণ পিছু হটিয়া আসেন। পরিশেষে কাফিররা যখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলে, তখন রাসূলুল্লাহ (স) খচ্চর হইতে নিচে নামিয়া যমীন হইতে এক মুষ্ঠি মাটি লইলেন এবং তিনি তাহাসহ কাফিরদের দিকে অগ্রসর হইয়া বলেন : شاهت الوجوه "মুখমণ্ডল কদর্য হউক"। অতঃপর আল্লাহ তাহাদের প্রতিটি ব্যক্তির চক্ষুদ্বয় উক্ত মাটিদ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দেন। ফলে তাহারা সকলে পিছু হটিয়া যায় এবং মহান আল্লাহ কাফিরদের পরাজিত করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের হইতে প্রাপ্ত গনীমতের মাল সাহাবীদের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন (ফাতহুল-বারী, ৮খ., পৃ. ৩৯, হাদীছ ৪৩১৭)।

শায়বা ইবন 'উছমান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন হুনায়নের যুদ্ধে যান তখন আমার পিতা ও চাচার কথা স্মরণ হইল। তাহাদেরকে হযরত 'আলী ও হামযা (রা) হত্যা করিয়াছিলেন। আমি মনে মনে ভাবিলাম, আজ মুহাম্মাদের উপর প্রতিশোধ লইব। যখন আমি তাঁহার কাছে আগাইয়া গেলাম, দেখিলাম আব্বাস (রা) তাঁহার ডান পার্শ্বে। বামদিকে গেলাম দেখিলাম তাঁহার চাচাত ভাই আবু সুফ্যান ইবনুল হারিছ তাঁহার বাম পার্শ্বে। অতঃপর আমি পিছন দিক দিয়া আসিলাম এবং একেবারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া গেলাম। যখন তরবারি দিয়া আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে উদ্যত হইলাম হঠাৎ বিদ্যুতের ন্যায় অগ্নি স্ফুলিঙ্গ আসিয়া পড়িল। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পিছনে সরিয়া গেলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, শায়বা! আমার কাছে আস। তিনি আমার বুকে হাত রাখিলেন। ইহাতেই আল্লাহ তা'আলা আমার ভিতর হইতে শয়তানী দূর করিয়া দিলেন। আমি তাঁহার পবিত্র চেহারার দিকে তাকাইবা মাত্রই তিনি আমার কাছে প্রাণের চাইতে প্রিয় হইয়া গেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, শায়বা। যাও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৬৯১-৯২; দালাইলুন নুবুওয়াত, পৃ. ১৫১)।

হযরত 'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর যাদু করার ফলে তাঁহার অবস্থা এমন হইল যে, তিনি যেই কাজ করেন নাই, তাহা সম্পর্কেও ধারণা হইত যে, তিনি কাজটি করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই ব্যাপারে আল্লাহ্র নিকট দু'আ করিলেন। অতঃপর তিনি একদিন 'আইশা (রা)-কে বলিলেন, আমার রোগটা কি, মহান আল্লাহ তাহা আমাকে বলিয়া দিয়াছেন। (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি আসিল, একজন শিয়রে এবং অন্যজন পায়ের কাছে বসিয়া গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্যজনকে বলিল, তাঁহার অসুখটা কি? অন্যজন বলিল, ইনি যাদুগ্রস্ত। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিল, কে যাদু করিয়াছে? উত্তর দিল, ইয়াহুদীদের মিত্র মুনাফিক লাবীদ ইবন আসাম্ম। আবার প্রশ্ন করা হইল, কি বস্তুতে যাদু করিয়াছে? উত্তর হইল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হইল, চিরুণীটি কোথায়? উত্তর হইল, খেজুর ফলের আবরণীতে বির যারওয়ান কূপে একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়া রাখা হইয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেই কূপের নিকট গিয়া বলিলেন, স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) 'আইশা (রা)-কে ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, কূপের পানি মেহেন্দি ভিজা পানির মত হইয়া আছে। পরবর্তীতে জিনিসগুলি বাহির করিয়া আনিলেন। তাহাতে একটা চিত্র ছিল। চিত্রে একটা ধনুকের ছিলায় এগারটা গিরা ছিল। এই সময় সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হয়। এই সূরাদ্বয় পাঠ করিলে গিরাগুলি খুলিয়া যায়। সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া যান (ফাতহুল-বারী, ১০খ., পৃ. ২৭২-২৯০, হাদীছ ৫৭৬৩-৫৭৬৬; ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৬১২; আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৯৯)।

ইসলামী বাহিনী তাবুক অভিযান হইতে বিজয়ের বেশে ফিরিবার পথে এক জায়গায় একটি ঘাটিতে ১২জন মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার চেষ্টা করে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত ছিলেন হযরত আম্মার (রা) ও হযরত হুযায়ফা (রা)। অন্য সাহাবীগণ তখন দূরে ছিলেন। মুনাফিক কুচক্রীরা এই সময়কে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিবার জন্য অগ্রসর হইল। ১২জন মুনাফিক নিজেদের চেহারা ঢাকিয়া অগ্রসর হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ব্যাপারটা বুঝিতে পারিলেন। তিনি হযরত হুযায়ফা (রা)-কে পাঠাইলেন। হুযায়ফা (রা) পিছনের দিকে গিয়া মুনাফিকদের বাহন উটগুলিকে এলোপাথাড়ি আঘাত করিতে লাগিলেন। এই আঘাতের প্রভাবে আল্লাহ তাহাদেরকে দ্রুত পিছনের দিকে সরাইয়া দিলেন। মহান আল্লাহ এইভাবে তাঁহাকে তাহাদের অনিষ্ট হইতে রক্ষা করেন (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৩৪; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩৩১-৩২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপস্থিতিতে প্রাচীরের বাক্যালাপ


আবু নাঈম কর্তৃক বর্ণিত হইয়াছে, হযরত আবূ উসায়দ (রা) বলেন, একদা মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্য হযরত আব্বাস (রা)-কে বলেন, হে আবুল ফাদল! আগামী কল্য আমি না আসা পর্যন্ত আপনি সন্তান-সন্ততিসহ কোথাও যাইবেন না। আপনার সহিত আমার প্রয়োজন আছে। পরের দিন ভোরে সকলে তাহার প্রতীক্ষায় রহিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আগমন করিলেন। তিনি সকলকে সালাম দিলে সকলেই তাঁহার সালামের উত্তর দিলেন।

তিনি প্রত্যূষের শুভ সমাচার জিজ্ঞাসা করিলে হযরত আব্বাস (রা) প্রত্যূষের শুভ সমাচার জ্ঞাপন করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসুন। সকলে পরস্পর মিলিত হইয়া বসিলে তিনি তাঁহার চাদর মুবারক দ্বারা সকলকে ঢাকিয়া লইলেন, অতঃপর দু'আ করিতে লাগিলেন, “হে আমার পালনকর্তা! আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব আমার চাচা; পিতৃ সদৃশ। আর তাঁহার সন্তান-সন্ততি আমার পরিবারভুক্ত। অদ্য আমি স্বীয় চাদরের আবরণ দ্বারা তাহাদেরকে যেমন অন্তরাল করিয়াছি, তদ্রূপ তুমি তাহাদেরকে দোযখের আগুন হইতে দূরে রাখিও।” সঙ্গে সঙ্গে গৃহের দরজার চৌকাঠ, দেওয়াল, প্রাচীর সম্মিলিতভাবে আমীন আমীন বলিতে লাগিল। হযরত ইবন আব্বাস (রা) হইতে বায়হাকীও অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ, ৫০৫; কাযী 'ইয়ায, আশ- শিফা, ২খ., ৫৯০; মাদারিজুন নুবুওয়াত, ১খ, পৃ., ৩৫১; আবূ নাঈম, দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ৩৭০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00