📄 আবূ যার (রা) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
উম্মু যার (রা) হইতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ যার (রা)-এর ওফাত সন্নিকটবর্তী হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ হইতে শুনিয়াছি, তিনি একদল লোক সম্পর্কে বলিলেন, (যাহাদের মধ্যে আমিও ছিলাম) তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তি জনমানবশূন্য প্রান্তরে মারা যাইবে। তাহার মৃত্যুর সময় একদল মুমিন উপস্থিত হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) যাহাদের সম্পর্কে এই কথা বলিয়াছিলেন, তাহারা সকলে বসতি এলাকায় ইন্তিকাল করিয়াছেন। এখন জনমানবশূন্য প্রান্তরে একমাত্র আমিই রহিয়া গিয়াছি। তুমি পথের দিকে দৃষ্টি রাখিও। আমি বলিলাম, এখন রাস্তায় কেহই নাই। কিছুক্ষণ পর আমি কিছু লোককে দেখিলাম। আমি কাপড় নাড়িয়া তাহাদেরকে ডাকিলাম। তাহারা আসিয়া আবু যারের নিকট দাঁড়াইল। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাহার দাফনকার্য সমাধা করিয়া তাহারা চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৩০)।
📄 উন্মু ওয়ারাকার শাহাদাতের খবর
হযরত উম্মু ওয়ারাকা বিনতে নাওফাল (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন বদর যুদ্ধে রওয়ানা হন তখন আমি আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকেও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি দিন, যাহাতে আল্লাহ পাক আমাকে শাহাদাত নসীব করেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি এখানেই থাক। এখানেই তোমার শাহাদাত নসীব হইবে। এজন্য উম্মু ওয়ারাকাকে শহীদ বলা হইত। তিনি কুরআন পাঠ করিতেছিলেন। তিনি একটি গোলাম ও একটি বাঁদীকে শর্তাধীনে মুক্ত করিয়াছিলেন। সেই গোলাম ও বাঁদী উভয়ে এক রাতে তাহাকে গলা টিপিয়া হত্যা করে। হযরত 'উমার (রা)-এর খিলাফত কালে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। খলীফার নির্দেশে তাহাদিগকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৩৪)।
হযরত হুযায়ফা (রা) বর্ণনা করেন, আমরা খলীফা উমার (রা)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই উক্তি স্মরণ রাখিয়াছ যাহা তিনি ফিতনা সম্পর্কে বলিয়াছিলেন? হুযায়ফা বলিলেন, আমি। অতঃপর তিনি বসিলেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন, মানুষ নিজের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও পাড়া-প্রতিবেশি সংক্রান্ত ব্যাপারে যে ফিতনায় নিপতিত হয়—সালাম, সাদাকা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ তাহার সেই পাপকে মোচন করিয়া দেয়। তিনি বলিলেন, আমি তোমাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি নাই। সেই ফিতনার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছি যাহা সাগরের তরঙ্গের ন্যায় প্রবাহিত হইবে। হুযায়ফা (রা) বলিলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন। সেই ফিতনা আপনার কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। কেননা সেই ফিতনা ও আপনার মাঝে একটি বন্ধ দরজা রহিয়াছে। 'উমার (রা) বলিলেন, দরজাটি কি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইবে, না খুলিয়া দেওয়া হইবে? তিনি বলিলেন, ভাঙ্গিয়া ফেলা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, তাহা হইলে উহা আর বন্ধ করা যাইবে না। আমি বলিলাম, হাঁ। (শাকীক বলিলেন) আমরা হুযায়ফা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, উমার (রা) কি দরজাটি সম্পর্কে জানিতেন? তিনি বলিলেন, হাঁ (বুখারী, কিতাবুল ফিতনা, বাব, সমুদ্রের উর্মি মালার ন্যায় ফিতনা প্রকাশ পাইবে, ২খ., পৃ. ১০৫১)।
হযরত আয়উব ইব্ন বাশীর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) সফরে যাওয়ার পথে হারারায় পৌঁছিয়া ইন্নালিল্লাহ...... পাঠ করিলেন। সাহাবা কিরাম ইহার কারণ জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, তোমাদের পরে আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ লোকগণ এই হাররায় নিহত হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪১)। বায়হাকী হাসান হইতে বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধে মদীনার লোকজনকে সমূলে হত্যা করা হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪১)।
হযরত মালেক ইব্ন আনাস (রা) বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধে সাত শত হাফিজে কুরআন শাহাদাত বরণ করেন। তাহাদের তিন শত ছিলেন সাহাবী। এই ঘটনা ইয়াযীদের শাসনামলে সংঘটিত হয়। বায়হাকী মুগীরা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, মুসলিম ইবন 'উকবা তিনদিন পর্যন্ত মদীনায় লুণ্ঠন কার্য চালায় এবং এক হাজার কুমারীর ইষযত হরণ করে। লায়ছ ইবন সা'দ বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধ ৬৩ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের তিন দিন বাকী থাকিতে বুধবার দিন সংঘটিত হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪২)।
'উবাদা ইবন সামিত বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন; ভবিষ্যতে এমন শাসকবর্গ আসিবে, যাহারা দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকিয়া বিলম্বে নামায আদায় করিবে। তোমরা তাহাদের সহিত নফলস্বরূপ নামায আদায় করিবে। জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র) বলেন, ইহারা হইল বানূ উমায়্যার শাসকবর্গ। যাহারা বিলম্বে নামায পড়ার ব্যাপারে পরিচিত। অবশ্য খলীফা হযরত উমার ইব্ন আবদুল আযীযের আগমনের পর অবস্থায় পরিবর্তন হয়। তিনি যথা সময়ে নামায পড়ার রীতি প্রবর্তন করেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪২)।
'আবদুল মালিক ইবন উমায়র বর্ণনা করেন, বাশীর ইবন সা'দ আপন পুত্র নু'মান ইব্ন বাশীরকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এই পুত্রের জন্য দু'আ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে তোমার সমমর্যাদায় পৌঁছিবে। তাহার পর সে সিরিয়া যাইবে। সেখানকার মুনাফিকরা তাহাকে হত্যা করিবে। ইবন সা'দ মাসলামা ইবন মুহারিব হইতে বর্ণনা করেন, মারওয়ানের খিলাফাতকালে দাহ্হাক ইব্ন কায়স মারজ রাহিতে নিহত হন। সেই সময় নু'মান ইব্ন বাশীর হিম্স হইতে পলায়ন করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি তখন হিমসের গভর্নর ছিলেন। তিনি মারওয়ানের বিরোধিতা করিয়াছিলেন। হিমসবাসীরা তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করে এবং হত্যা করে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমার উম্মতের শেষ যুগে এমন লোক আসিবে যাহারা মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করিবে। এমন হাদীছ বর্ণনা করিবে, যাহা তোমরা এবং তোমাদের প্রবীণগণ কেহই শুনে নাই। তোমাদের উচিত এমন লোক হইতে বাঁচিয়া থাকা (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
ওয়াসিলা ইনুল 'আসকা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কিয়ামত সংঘটিত হইবে না যে পর্যন্ত ইবলীস বাজারে ঘুরাফিরা করিয়া এই কথা প্রচার না করিবে যে, অমুকের পুত্র অমুক আমার নিকট এই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছে। হযরত ইবন মাস'উদ (রা) বর্ণনা করেন, শয়তান এক ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করিয়া মানুষের নিকট মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করিবে। ফলে মানুষ বিভক্ত হইয়া পড়িবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃঃ ১৪৩)।
ওয়ালীদ ইবন 'উকবা বর্ণনা করেন, মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসীরা তাহাদের শিশুদেরকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করে। তিনি শিশুদের মাথায় স্নেহের হাত বুলান এবং দু'আ করেন। আমার জননীও আমাকে লইয়া তাঁহার নিকট আসেন। আমার শরীরে সুগন্ধি মাখা ছিল। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইলেন না এবং স্পর্শও করিলেন না। বায়হাকী বলেন, ওয়ালীদের ব্যাপারে এই আচরণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষ্যত জ্ঞানের ভিত্তিতেই হইয়াছিল। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল যে, ওয়ালীদ এই বরকত হইতে বঞ্চিত থাকুক। 'উছমান (রা)-এর সময় তিনি গভর্নর ছিলেন। তিনি শরাব পান করিতেন এবং নামাযে বিলম্ব করিতেন। তাহার এইসব বদভ্যাসের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার সঙ্গে এইরূপ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৪)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রত্যেকের একাত্তর ফিরকা কিংবা বাহাত্তর ফিরকা ছিল, আর আমার উম্মত তেহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হইবে। তাহারা প্রবৃত্তির পূজা করিবে। একটি ফিরকা ছাড়া সকলেই জাহান্নামে যাইবে। আমার অনুসারী জামা'আত জাহান্নামী হইবে না। আমার উম্মতের মধ্যে এমন সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করিবে, যাহারা খেয়াল-খুশীর অনুসরণে অতীত সম্প্রদায়সমূহের অনুগামী হইবে, যেমন কুকুর তাহার মনিবের অনুগামী হয়। এই উম্মতের শিরা-উপশিরায় কু-প্রবৃত্তি প্রবিষ্ট হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামত কায়েম হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানগণ ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই না করিবে। মুসলমানগণ তাহাদিগকে হত্যা করিবে। তাহারা প্রস্তর অথবা বৃক্ষের আড়ালে আত্মগোপন করিলে প্রস্তর বা বৃক্ষ বলিবে, হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা! এই তো আমার পশ্চাতে ইয়াহুদী। তাহাকে হত্যা কর। গারকাদ নামক বৃক্ষ এই কথা বলিবে না, কারণ উহা হইতেছে ইহুদীদের বৃক্ষ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতুস-সা'আত, বাব লা তাকুমুস-সা'আতু হাত্তা তাআ'বুদু দাউসু জুলখালাসাত, ২খ., পৃ. ৩৯৬)।
হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামতের পূর্বে আবার লাত- 'উযযার পূজা আরম্ভ হইবে। এই কথা শুনিয়া আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে, তিনিই তাঁহার রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন হিদায়াত ও সত্য দীনসহ সকল দীনের উপর উহাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্য, যদিও মুশরিকরা উহা অপছন্দ করে। এই আয়াত নাযিলের পর আমি মনে করিয়াছিলাম, এই ওয়াদা পূর্ণ করা হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা অবশ্যই হইবে। তবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করিবেন ততদিন তাহা বলবৎ থাকিবে।