📄 মহানবী (স)-এর অদৃশ্য বিষয়ক জ্ঞান ও ভবিষ্যদ্বাণী
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অদৃশ্য বিষয়ে অবহিত হওয়া অন্য প্রকৃতির এক বিশেষ মু'জিযা। অদৃশ্য বিষয় ও ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি অনেক তথ্য প্রদান করিয়াছেন। যেমন মুনাফিকদের গোপন ষড়যন্ত্রের সংবাদ, জান্নাত, জাহান্নাম, উম্মতের পরবর্তী কালের অবস্থা, কিয়ামতের আলামত, দাজ্জাল, ইয়াজুজ-মাজুজ এবং সেই সময় সংঘটিতব্য অনেক বিষয়ের সংবাদ প্রদান করিয়াছেন। মূলত অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান ('ইলমূল গায়ব) একমাত্র মহান আল্লাহ্ জন্যই নির্দিষ্ট। পবিত্র কুরআনের ভাষায়: إِنَّمَا الغيب لله "অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহ্রই আছে "(১০ঃ ২০)।
لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ . "আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে, অদৃশ্য সম্বন্ধেও আমি অবগত নই" (৬:৫০)।
এই সম্পর্কে নবী করীম (স) বলিয়াছেন: و الله اني لا أَعْلَمُ إِلَّا مَا عَلَّمَنِي رَبِّي . "আল্লাহর কসম! আমি নিজ হইতে কিছু জানি না, যাহা আমার প্রভু আমাকে জানাইয়াছেন তাহা ব্যতীত"।
এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, নবী করীম (স)-এর অদৃশ্য জ্ঞান আল্লাহ তা'আলার দান। তাঁহার অদৃশ্য জ্ঞানের বিষয়টি সর্বজন বিদিত। নবী করীম (স)-এর অদৃশ্য জ্ঞান ছিল দুই ধরনের। এক প্রকার হইতেছে ওহী মাতলু অর্থাৎ কুরআনুল কারীম। এই কুরআনুল কারীমের মাধ্যমেই রাসূলুল্লাহ (স) অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছেন। এই বিষয়ে কুরআনুল কারীমে বেশ কিছু আয়াত রহিয়াছে। দ্বিতীয় প্রকার হইতেছে 'ওহী গায়র মাতলু' অর্থাৎ হাদীছ শরীফ। অনেক হাদীছে অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ রহিয়াছে।
'ইলমে গায়ব বা অদৃশ্য জ্ঞান এমন বিষয় যাহা মানুষ চোখ, কান, নাক ইত্যাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উপলব্ধি করিতে পারে না, সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিধিতেও আসে না। যেমন ফেরেশতা, জিন্ন, জান্নাত, জাহান্নাম, শয়তান ইত্যাদি আমাদের নিকট অদৃশ্য। কেননা এইগুলি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভব করা যায় না। অদৃশ্য জ্ঞানকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়। (এক) যাহা কুরআন ও হাদীছের দলীল দ্বারা প্রমাণ করা যায়। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম, জিন, ফেরেশতা। (দুই) যাহা যুক্তি বা দলীল দ্বারা প্রমাণ করা যায় না। যেমন মানুষ কখন মৃত্যুবরণ করিবে, সে হতভাগ্য না ভাগ্যবান হইবে, কিয়ামত কখন সংঘটিত হইবে ইত্যাদি।
(ক) আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবেই জ্ঞানী। তিনি অবগত না করাইলে একটি অক্ষরও কেহ জানিতে পারে না; (খ) আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (স) ও অন্যান্য আম্বিয়া কিরামকে অদৃশ্য বিষয়ের বেশ কিছু জ্ঞান দান করিয়াছেন; (গ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জ্ঞান সমস্ত সৃষ্টিকূল হইতে বেশি। এই তিনটি বিষয় ধর্মের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা পঞ্চ অদৃশ্যের অনেক ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-কে সুবিস্তৃত জ্ঞান দান করিয়াছেন। এই পঞ্চ অদৃশ্য সম্পর্কে আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছেঃ إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَ يُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ . "কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে; তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন যাহা জরায়ুতে আছে। কেহ জানে না আগামী কাল সে কি অর্জন করিবে এবং কেহ জানে না কোন স্থানে তাহার মৃত্যু ঘটিবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত” (৩১:৩৪)।
আলোচ্য আয়াতের বিষয়বস্তু হইতেছে পাঁচটি যাহা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেহ জানে না। ঐ পাঁচটি বিষয় হইতেছে- (১) কখন সংঘটিত হইবে কিয়ামত; (২) কোথায় কখন বৃষ্টিপাত হইবে, কী পরিমাণে হইবে; (৩) নারীর গর্ভাশয়ে কোন আকৃতি বা প্রকৃতির সন্তান রহিয়াছে; (৪) আগামী দিবসে সে কী উপার্জন করিবে, (৫) কাহার মৃত্যু কোন স্থানে ও কখন হইবে। এইগুলি জানেন কেবল আল্লাহ তা'আলা। কারণ তিনি সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত। হাদীছেও অনুরূপ বর্ণনা আছে (তাফসীরে মাযহারী, ৭খ., পৃ. ২৬৪; বুখারী, কিতাবুত-তাফসীর, সূরা লুকমান, ২খ., পৃ. ৭০৪)।
অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنَ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ . "অদৃশ্য সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহ অবহিত করিবার নহেন, তবে আল্লাহ তাঁহার রাসূলগণের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন” (৩৪:১৭৯)।
অদৃশ্য জ্ঞান জানানোর ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কোন বাধ্যবাধকতা নাই। তবে তিনি তাঁহার নবীদের মধ্য হইতে কাহাকেও অদৃশ্য বিষয়ে অবগত করেন। যেমন রাসূলুল্লাহ (স)-কে মুনাফিকদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও আরও অনেক বিষয়ে অবগত করাইয়াছিলেন। এই বিষয়ে সূরা জিন-এর আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য। عَلِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا . إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ . "তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত” (৭২: ২৬-২৭)।
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ . “অদৃশ্যের কুঞ্জি তাঁহারই নিকট রহিয়াছে, তিনি ব্যতীত অন্য কেহ তাহা জানে না” (৬:৫৯)।
يَوْمَ يَجْمَعُ اللَّهُ الرُّسُلَ فَيَقُولُ مَاذَا أُجِبْتُمْ قَالُوا لَا عِلْمَ لَنَا إِنَّكَ انْتَ عَلامُ الْغُيُوبِ . "স্মরণ কর, যেদিন আল্লাহ রসূলগণকে একত্র করিবেন এবং জিজ্ঞাসা করিবেন, 'তোমরা কি সাড়া পাইয়াছিলে?' তাহারা বলিবে, 'আমাদিগের তো কোন জ্ঞান নাই; তুমিই তো অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাতা” (৫:১০৯)।
قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ. “বল, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেহই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না" (২৭ঃ৬৫)।
এইখানে 'মান ফীস সামাওয়াতি' আকাশমণ্ডলীর কেহ এবং 'মান ফীল আরদ' পৃথিবীর কেহ বলিয়া বুঝানো হইয়াছে যথাক্রমে ফেরেশতামণ্ডলীকে এবং জিন ও মানুষকে। এইভাবে বক্তব্যটি দাঁড়াইয়াছে—হে আমার প্রিয় রাসূল! আপনি মানুষকে জানাইয়া দিন, ফেরেশতা, জিন, মানুষ কেহই জানে না অদৃশ্যের সংবাদ। এই বিষয়ের পরিপূর্ণ জ্ঞান সংরক্ষণকারী কেবল আল্লাহ। কারণ তিনিই একমাত্র 'আলিমুল গায়ব' = অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। উল্লেখ্য, আল্লাহ পাক দয়া করিয়া তাঁহার প্রিয়ভাজন নবী-রাসূলগণকে কোন কোন অদৃশ্যের সংবাদ জানান। তাই আল্লাহ্ পক্ষ হইতে প্রাপ্ত হিসাবে তাহারা অদৃশ্যের সংবাদ জানেন, এই কথা বলিতে কোন দোষ নাই। কিন্তু সাথে সাথে এই বিশ্বাসটিও রাখিতে হইবে যে, তাহাদের কেহই সত্তাগতভাবে 'আলিমুল গায়ব' = অদৃশ্যের সংবাদদাতা নন (তাফসীরে মাযহারী, ৭খ., পৃ. ১২৮)।
ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ . “ইহা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ-যাহা আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি” (৩ঃ৪৪)।
জ্ঞান অর্জিত হয় দেখিয়া, শুনিয়া বা পুস্তক পাঠের মাধ্যমে। কিন্তু এইসব মাধ্যম ব্যতিরেকে রাসূলুল্লাহ (স) জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁহার সেই বিশেষ জ্ঞানের সাহায্যে তিনি অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ দিয়াছেন। যেমন তাঁহার সময় ও মরিয়ম (আ)-এর সময়ের ব্যবধান প্রায় পাঁচ শত বৎসর। পাঁচ শত বৎসর পূর্বের মরিয়মের অভিভাবকত্ব নিয়া বাদানুবাদের সংবাদ, লটারীর মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সংবাদ, নদীর পানিতে কলম নিক্ষেপের সংবাদের বর্ণনা তিনি দিয়াছিলেন। অতীতের এই সকল ঘটনা আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জানাইয়াছিলেন ওহীর মাধ্যমে (তাফসীর মাযহারী, ২খ., পৃ. ৪৮, ৪৯)।
وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْن . "সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে” (৮১: ২৪)।
আল্লাহ বলেন, আমার সর্বশেষ রাসূল এমন নহেন যে, তিনি আমার পক্ষ হইতে নাযিলকৃত ওহীর কোন অংশ প্রকাশ করিবেন এবং কোন অংশ গোপন করিবেন। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ্র নিকট হইতে সকল বাণী যথাযথভাবে পৌছাইয়াছেন (তাফসীর মাযহারী, ১০খ., পৃ. ২১১)।
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنْتَ تَعْلَمُهَا أَنْتَ وَلَا قَوْمُكَ مِنْ قَبْلِ هذا "এই সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি, যাহা ইহার পূর্বে তুমি জানিতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানিত না" (১১:৪৯)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী বলেন, হে আমার প্রিয় রাসূল! এতক্ষণ ধরিয়া অদৃশ্যলোক হইতে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে সুদূর অতীতের নূহ নবী ও তাঁহার সম্প্রদায়ের বৃত্তান্ত আপনাকে জানাইলাম। এই সকল ঘটনা আপনি ও আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা আগে কখনও শুনে নাই। তাই বিগত যুগের আসমানী কিতাবসমূহ অধ্যয়ন ব্যতিরেকেই আপনাকে এই সকল তথ্য জানানো হইল। আর আপনার মাধ্যমে জানানো হইল আপনার সমসাময়িক ও ভবিষ্যতের সকল পাঠক ও শ্রোতাকে (তাফসীরে মাযহারী, ৫ খ., পৃ. ৯৩)।
ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنْتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرُهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ . "ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ-যাহা তোমাকে আমি ওহী দ্বারা অবহিত করিতেছি। ষড়যন্ত্র করাকালে যখন উহারা মতৈক্যে পৌঁছিয়াছিল তখন তুমি উহাদের নিকট ছিলে না" (১২: ১০২)।
আলোচ্য আয়াতের মমার্থ হইতেছে, হে রাসূল! এতক্ষণ ধরিয়া প্রত্যাদেশের মাধ্যমে আমি আপনাকে জানাইলাম নবী ইউসুফের জীবন-বৃত্তান্ত। সুদূর অতীতে ইউসুফের বিরুদ্ধে তাঁহার ভাইয়েরা যে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল সেই সময় এবং এই কাহিনীতে বিবৃত অন্যান্য ঘটনার সময় আপনি সেখানে ছিলেন না। কাহারও নিকট হইতে এই ইতিবৃত্তের আনুপূর্বিক বিবরণ জানিবার কোন সুযোগও আপনার ছিল না। তাই এই কাহিনী আপনাকে জানানো হইল ওহীর মাধ্যমে।
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ .
"কে সে, যে তাঁহার অনুমতি ব্যতীত তাঁহার নিকট সুপারিশ করিবে? তাহাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যাহা কিছু আছে তাহা তিনি অবগত। যাহা তিনি ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত তাঁহার জ্ঞানের কিছুই তাহারা আয়ত্ত করিতে পারে না" (২: ২৫৫)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাহাদেরকে তাঁহার জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত করান, তাহারা হইলেন নবী ও রাসূলগণ যাহাতে তাহাদের অদৃশ্য জ্ঞান নবুওয়াতের দলীলরূপে পরিগণিত হয়। যেমন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: علِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً . إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَّسُولٍ . "তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না, তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত" (৭২: ২৬-২৭)।
ولسوف يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
"অচিরেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে অনুগ্রহ দান করিবেন আর তুমি সন্তুষ্ট হইবে" (৯৩:৫)।
হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, ভবিষ্যতে কি কি সাফল্যের অধিকারী করা হইবে, তাহা তাহাকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল (তাফসীরে মাযহারী, ১খ., পৃ. ২৮৩)।
অনুরূপভাবে কিয়ামতে যাহা ঘটিবে তাহাও কুরআন শরীফে বর্ণিত হইয়াছে। মহানবী (স) ভবিষ্যতের এই সকল বিষয়ে অবহিত হন ও বাস্তব সত্য হিসাবে তাঁহার নিকট সেইগুলি প্রতিভাত হয়। সেইগুলির কয়েকটি নিম্নে বর্ণিত হইল। আল-কুরআনুল করীমে ইরশাদ হইয়াছে:
يَأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ، يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكْرَى وَمَا هُمْ بِسُكْرَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ .
“হে মানুষ! ভয় কর তোমাদের প্রতিপালককে, কিয়ামতের কম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার! যে দিন তোমরা উহা প্রত্যক্ষ করিবে সেই দিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্তৃত হইবে তাহার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তাহার গর্ভপাত করিয়া ফেলিবে; মানুষকে দেখিবে নেশাগ্রস্ত সদৃশ, যদিও উহারা নেশাগ্রস্ত নহে। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন" (২২:১-২)।
حَتَّى إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَاجُوجُ وَهُمْ مِّنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُوْنَ . "এমনকি যখন ইয়া'জুজ ও মা'জুজকে মুক্তি দেওয়া হইবে। এবং উহারা প্রতি উচ্চভূমি হইতে ছুটিয়া আসিবে” (২১ঃ ৯৬)।
يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ وَبَرَزُوا لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ . وَتَرَ الْمُجْرِمِينَ يَوْمَئِذٍ مُّقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ . سَرَابِيلُهُمْ مِّنْ قَطِرَانٍ وَتَغْشَى وُجُوهَهُمُ النَّارُ . "যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হইয়া অন্য পৃথিবী হইবে এবং আকাশমণ্ডলীও; এবং মানুষ উপস্থিত হইবে আল্লাহ্র সম্মুখে-যিনি এক পরাক্রমশালী। সেই দিন তুমি অপরাধীদেরকে দেখিবে শৃঙ্খলিত অবস্থায়, উহাদের জামা হইবে আলকাতরার এবং অগ্নি আচ্ছন্ন করিবে উহাদের মুখমণ্ডল" (১৪:৪৮-৫০)।
'ইকরিমা বলিয়াছেন, এই পৃথিবী নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া হইবে, সৃষ্টি করা হইবে নূতন পৃথিবী। এই পৃথিবীর সকল মানুষকে স্থানান্তরিত করা হইবে ওই পৃথিবীতে। বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত সাহল (রা) বলিয়াছেন, মহাবিচার দিবসে ধূসর বর্ণের এক নূতন পৃথিবীতে সকল মানুষকে একত্র করা হইবে। পিষ্ট আটার মত বর্ণবিশিষ্ট ওই পৃথিবী হইবে সমতল। সেখানে বাড়ি-ঘরের কোন চিহ্ন থাকিবে না। বায়হাকী ও সুদ্দীর বর্ণনায় আসিয়াছে, হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, এই পৃথিবীকে পরিবর্তন করা হইবে, মুছিয়া ফেলা হইবে পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, উপত্যকা ও তরুলতাসমূহ। টানিয়া প্রস্তুত করা হইবে পৃথিবীকে। তারপর ওই পৃথিবী হইবে শুভ্র অস্ত্রের মত উজ্জ্বল, যাহার উপরে কোন রক্তপাত অথবা অপরাধ সংঘটিত হয় নাই। আর তখন বিলীন করিয়া দেওয়া হইবে আকাশের চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রসমূহ (তাফসীরে মাযহারী, ৫খ., পৃ. ২৮৩, ২৮৪)।
فَإِذَا نُقِرَ فِي النَّاقُورِ. فَذَلِكَ يَوْمَئِذٍ يَوْمٌ عَسِيرٌ. “যেদিন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, সেই দিন হইবে এক সংকটের দিন" (৭৪:৮-৯)।
إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ كَانَ مِيقَانًا ، يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَتَأْتُونَ أَفْوَاجًا . وَفُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَابًا ، وَسُيِّرَتِ الْجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَابًا "নিশ্চয় নির্ধারিত আছে বিচার দিবস; সেই দিন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে এবং তোমরা দলে দলে সমাগত হইবে। আকাশ উন্মুক্ত করা হইবে, ফলে উহা হইবে বহু দ্বারবিশিষ্ট। আর চলমান করা হইবে পর্বতসমূহকে, ফলে সেইগুলি হইয়া যাইবে মরীচিকা" (৭৮: ১৭, ১৮, ১৯, ২০)।
এই সকল বিষয় অদৃশ্য, আল্লাহ তা'আলা না জানাইয়া দিলে অজ্ঞাত থাকিয়া যাইত। মহান আল্লাহ মহানবী (স)-এর মাধ্যমে এই সকল অদৃশ্য বিষয় মানুষকে জানাইয়া দিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই জ্ঞান আল্লাহ তা'আলা হইতে প্রাপ্ত।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর দ্বিতীয় প্রকার অদৃশ্য বিষয়ক জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায় হাদীছ শরীফে। অদৃশ্যের সংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণী সংক্রান্ত হাদীছসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হইল।
হযরত 'আলী (রা) বলেন, নবী করীম (স) মিকদাদ, যুবায়র ও আমাকে 'রাওদায়ে খাখ' নামক স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দিয়া বলিলেন, সেখানে পৌঁছিয়া তোমরা উষ্ট্রারোহী এক নারীর সাক্ষাত পাইবে। তাহার নিকট একটি পত্র রহিয়াছে। পত্রটি তাহার নিকট হইতে উদ্ধার করিয়া আনিবে। তাহাকে যথাস্থানে পাইয়া বলিলাম, পত্রটি বাহির করিয়া দাও। সে বলিল, আমার নিকট কোন পত্র নাই। আমরা বলিলাম, শীঘ্র পত্রটি বাহির করিয়া দাও। নচেত তোমাকে উলঙ্গ করিয়া তল্লাশী করা হইবে। সে ভয় পাইয়া তাহার খোপার ভিতর হইতে পত্রটি বাহির করিয়া দিল, মতান্তরে কোমর বন্ধনী হইতে।
হাতিব ইবন আবী বালতা'আ (রা) পত্রটি মক্কাবাসী কতিপয় মুশরিকের নামে লিখিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হাতিবের নিকট কৈফিয়ত চাহিলেন। হাতিব বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! দয়া করিয়া আমার ব্যাপারে তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন না। আমি কুরায়শদের কেহ নহি। অন্যান্য মুহাজিরদের কোন না কোন পর্যায়ে কুরায়শদের সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক রহিয়াছে। কেবল আমারই কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক নাই (আমার পরিবার মক্কা শরীফে রহিয়াছে)। আমি শুধু এই বিশ্বাসে পত্র লিখিয়াছিলাম যে, ইহাতে মুসলমানদের কোন ক্ষতি হইবে না। আর আমি কুরায়শদের প্রতি সহানভূতি দেখাইয়া নিজের পরিবার-পরিজনদের নিরাপত্তা বিধান করিতে পারিব। ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুফরের প্রতি সন্তুষ্টির ভিত্তিতে আমি ইহা করি নাই। আমি এখনও ইসলামের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।
মহানবী (স) তাহার কথা শুনিয়া বলিলেন, হাতিব সত্য কথা বলিয়াছে। হযরত 'উমার (রা) আবেদন করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান কাটিয়া দেই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাতিব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ। আল্লাহ তা'আলা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বলিয়াছেন, 'তোমরা যাহা ইচ্ছা কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছি' (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব ফাতহ মাক্কা, ২খ., পৃ. ৬১২)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, লোকেরা নবী করীম (স)-এর নিকট প্রশ্ন করিত, এমনকি প্রশ্ন করিতে করিতে তাঁহাকে বিরক্ত করিয়া তুলিত। একদিন রাসূলুল্লাহ (স) মিম্বারে আরোহণ করিয়া বলিলেন, তোমরা আজ আমাকে যাহা ইচ্ছা প্রশ্ন করিতে পার, আমি উত্তর প্রদান করিব। হযরত আনাস (রা) বলিলেন, আমি ডাইনে বামে তাকাইতেছিলাম। দেখিতে পাইলাম, সকলেই আপন আপন বস্ত্র দ্বারা মাথা ঢাকিয়া কাঁদিতেছে। সেই সময় এমন এক ব্যক্তি যাহাকে বাক-বিতণ্ডার সময় অন্য ব্যক্তির সন্তান বলিয়া সম্বোধন করা হইত, সে উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিল, হে আল্লাহর নবী! আমার পিতা কে? তিনি বলিলেন, হুযায়ফা। ইহার পর 'উমার (রা) বলিলেন, আমরা আল্লাহকে রব, ইসলামকে দীন এবং মুহাম্মাদ (স)-কে রাসূল হিসাবে পাইয়া পরিতুষ্ট। ফিতনার অনিষ্টতা হইতে আমরা আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি। ইহার পর নবী করীম (স) বলিলেন, আজিকার মত এত উত্তম বস্তু এবং এত ভয়ংকর বস্তু আমি ইতোপূর্বে কখনও প্রত্যেক্ষ করি নাই। আমার সম্মুখে জান্নাত ও জাহান্নাম পেশ করা হইয়াছিল, এমনকি সেই দুইটি আমি দেওয়ালের পাশেই, দেখিতে পাইতেছিলাম (বুখারী, কিতাবুল ফিতান, বাব ফিতনা হইতে আশ্রয় প্রার্থনা, ২খ., পৃ. ১০৫০)।
ইমাম মুসলিম (র) আবূ যায়দ হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে ফজরের সালাত পড়াইলেন। অতঃপর তিনি মিম্বারে আরোহণ করিয়া যুহর পর্যন্ত খুতবা দিলেন। মিম্বার হইতে নামিয়া তিনি যুহরের সালাত আদায় করিলেন। ইহার পর আবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত খুতবা দিলেন। এই সুদীর্ঘ খুতবায় তিনি অতীত ঘটনাবলী এবং কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিতব্য বিষয়াবলীর বর্ণনা দিলেন। যে অধিক মনে রাখিতে পারিয়াছে সে অধিক জ্ঞানী (আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১০৮)।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াকে উন্মুক্ত করিয়া আমার সামনে উপস্থিত করিলেন। তখন হইতে কিয়ামত পর্যন্ত যাহা কিছু ঘটিবে উহার সব কিছুই এমনভাবে জ্ঞাত হইলাম যেমনভাবে আমি আমার হাতের তালুকে স্পষ্ট দেখিতে পাই। পূর্বেকার নবীগণের অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ (স)-এর সামনে ভবিষ্যতে কি ঘটিবে তাহা উদ্ঘাটিত করিয়া দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ২খ.., পৃ. ১০৯)।
সামুরা ইবন জুনদুব (রা) বর্ণনা করেন, সূর্যগ্রহণ হইল। নবী করীম (স) সূর্যগ্রহণের সালাত আদায় করিলেন। অতঃপর তিনি বলিলেন, আল্লাহর কসম, আমি সালাতে তোমাদের সেই সকল বিষয় প্রত্যেক্ষ করিয়াছি, ভবিষ্যতে তোমরা যেইগুলির সম্মুখীন হইবে (প্রাগুক্ত, ২ খ., পৃ. ১০৯)।
হযরত হুযায়ফা ইবন ইয়ামান (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদিন খুতবা প্রদান করিলেন। উহাতে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত সংঘটিতব্য সকল কিছুই জানাইয়া দিলেন। ঐ সকল বিষয় কাহারও কাহারও স্মরণে আছে, আবার কেহ কেহ ভুলিয়া গিয়াছেন। ভুলিয়া যাওয়া বিষয়গুলি এইরকম যে, বাহ্যিকভাবে আমরা কোন কোন ব্যাপার ভুলিয়া যাই, আবার সেই বিষয়ের সামনা-সামনি হইলে তাহা স্মরণ হয়। যেমন কেহ কিছুকাল অনুপস্থিত থাকিলে তাহার কথা আমরা ভুলিয়া যাই, আবার সামনে আসিলে তাহাকে চিনিতে পারি। হযরত হুযায়ফা (রা) বলিলেন, আমি এইরূপ মনে করি না যে, আমার সাথীগণ ইচ্ছা করিয়া ইহা ভুলিয়া গিয়াছেন; বরং আল্লাহর কসম! তাহাদিগকে ভুলাইয়া দেওয়া হইয়াছে। নিশ্চয় কিয়ামত পর্যন্ত দীনের মধ্যে যে সকল ফিতনা দেখা দিবে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহার বিবরণ দিয়া গিয়াছেন, এমনকি ফিতনাকারীর নাম, পিতার নাম এবং বাসস্থানের নাম পর্যন্ত বলিয়া গিয়াছেন।
তিনি বলিয়াছেন, প্রাথমিক অবস্থায় ফিতনাবাজদের সংখ্যা তিন শত পর্যন্ত হইবে। কিন্তু পরবর্তীতে তাহাদের অনুসারীদের সংখ্যা হইবে অনেক। হযরত আবু যর (রা) বলেন, নবী (স) এই রকম সকল বিষয়েরই আলোচনা করিয়াছেন। এমনকি আকাশে যেই পাখিটি পাখা মেলিয়া উড়িয়া যায়, তাহার সম্পর্কেও আমাদিগকে জানাইয়া দিয়াছেন (মাদারিজুন নুযূওয়াত, উর্দু, ১খ., পৃ. ৩৭৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, "মুসলমানদের মধ্যে দশ অশ্বারোহী নবুওয়াতের দাবিদার হইবে। তাহাদের নাম, তাহাদের পিতা ও পিতামহের নাম পর্যন্ত আমার জানা আছে। তাহাদের ঘোড়ার রং কি হইবে, তাহাও আমি বলিয়া দিতে পারি। পৃথিবীতে তাহারা উত্তম অশ্বারোহী হইবে” (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৪)।
নবী করীম (স) তাহার উম্মতগণকে জানাইয়া দিয়াছেন, তাহারা একদিন দুশমনদের উপর বিজয়ী হইবে। মক্কা মুকাররামা, বায়তুল মাকদিস, ইয়ামান, শাম ও ইরাকে মুসলমানদের বিজয় সূচিত হইবে এবং সেখানে এমন শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করিবে যে, একজন মহিলা একাকী হীরা হইতে মক্কা পর্যন্ত ভ্রমণ করিলে আল্লাহ্ ভয় ছাড়া তাহার আর কোন কিছুর সামান্যতম ভয় ও আশংকার উদ্রেক হইবে না (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৫)।
হাদীছ শরীফে বর্ণিত হইয়াছে, নবী করীম (স) এক সময় মদীনায় অবস্থান করিবেন। আল্লাহ তা'আলা তাহার উম্মতকে বিজয় দান করিবেন। কায়সার ও কিসরার ধনভাণ্ডার মুসলমানদের মধ্যে বণ্টিত হইবে। তাহারা চলিয়া যাওয়ার পর পুনরায় কোন কিসরা ও কায়সার হইবে না। কিসরার রাজ্য টুকরা টুকরা হইয়া গিয়াছিল, যেইভাবে নবী করীম (স)-এর মুবারক পত্র সে ছিড়িয়া টুকরা টুকরা করিয়াছিল। কায়সার সিরিয়া হইতে পলায়ন করিয়াছিল এবং তাহার অধীনস্থ রাজ্যসমূহ ইসলামী রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল। মুসলমানগণ তাহার অধীনস্থ অন্যান্য রাজ্যগুলিও দখল করিয়াছিল। এইসব হইয়াছিল হযরত উমার (রা)-এর খিলাফত কালে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন যে, মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন বিবাদ-বিশৃংখলার উদ্ভব হইবে। মুসলমানগণ প্রবৃত্তির অনুসারী হইবে এবং অতীত কালের ইয়াহুদী-নাসারাদের পদাংক অনুসরণ করিয়া চলিবে। উম্মতের মধ্যে ৭৩ ফিরকা হইবে। তন্মধ্যে একটি মাত্র ফিরকা নাজাত প্রাপ্ত হইবে। মুসলমানগণ আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসের পিছনে ছুটিবে। সকাল-সন্ধ্যায় ভিন্ন ভিন্ন পোশাক পরিধান করিবে। জমকালো পোশাক পরিবে। ঘরের ভিতর ভাল ভাল ফরাস ব্যবহার করিবে। ঘরের পাকা ছাদ বানাইবে। দেওয়ালে ঝুলাইবে রং বেরঙের পর্দা। অহংকার ও দম্ভভরে চলাফিরা করিবে। নানা রকম আহার্যের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িবে। পারস্য ও রোমদেশের নারীদের ন্যায় মুসলিম মহিলাদের নিকট হইতে সেবা গ্রহণ করিবে।
তিনি আরও বলিয়াছেন, মুসলমানদের মধ্যে যখন এইগুলি বিস্তার লাভ করিবে, তখন আল্লাহ তা'আলা তাহাদের উপর শাস্তি নাযিল করিবেন এবং তাহাদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হইয়া যাইবে। পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা পুণ্যবানদের স্থান দখল করিয়া লইবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'আলা পুণ্যবান লোকদেরকে তাহাদের মধ্য হইতে উঠাইয়া নিবেন। সময় অতি দ্রুত অতিবাহিত হইবে। তিনি আরও বলিয়াছেন, কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে বিদ্যা উঠিয়া যাইবে এবং বিদ্বান ব্যক্তিগণ দুনিয়া হইতে চলিয়া যাইবেন। ফিতনা প্রকাশিত হইবে। গান-বাজনা ও হাসি-তামাশার উপকরণের ব্যাপক বিস্তার ঘটিবে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৫)।
মুসায়লামা কায্যাব (মিথ্যাবাদী)-এর ফিতনার খবর দেওয়া হইয়াছে এবং তাহার অনিষ্ট হইতে সাবধান করা হইয়াছে। এই মর্মে নবী করীম (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আরবদের জন্য আক্ষেপ, ফিতনার আলামত নিকটবর্তী। তিনি আরো বলিয়াছেন, পৃথিবীর পরিমণ্ডলকে একাকার করিয়া আমাকে দেখানো হইয়াছে। যেই পর্যন্ত আমাকে দেখানো হইয়াছে সেই পর্যন্ত আমার উম্মতের অধিকারেই দেখিয়াছি। দেখিয়াছি মাশরিক, মাগরিব ও তৎমধ্যবর্তী স্থান ও ভারতের হুকুমতও ইসলামের ছায়াতলে সুদীর্ঘ হইবে। তাহার দৈর্ঘ্য পূর্বাঞ্চল হইতে এজিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হইবে যাহার শেষে সংযুক্ত আর কোনো জনবসতি নাই (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৬)।
অতীতের কোন উম্মতের রাজ্য উত্তরে ও দক্ষিণে এত বড় রাজ্য হয় নাই। হযরত আবূ উমামা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সব সময়ই একটি দল হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকিবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুশমনদের মুকাবিলায় শক্তিশালী থাকিবে। সাহাবা কিরাম (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ধরনের লোক কোথায় থাকিবে? তিনি বলিলেন, বায়তুল মুকাদ্দাসে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৬)।
নবী করীম (স) একদা হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর মাকে বলিয়াছিলেন, তোমার গর্ভে পুত্র সন্তান রহিয়াছে। সে জন্মগ্রহণ করিলে তাহাকে আমার নিকট লইয়া আসিবে। বাচ্চা জন্মগ্রহণ করিবার পর নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হইল। রাসুলুল্লাহ (স) তাহার ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত দিলেন এবং নিজ মুখের লালা শিশুর মুখে দিলেন। অতঃপর তাহার নাম রাখিলেন আবদুল্লাহ। সে অনেক খলীফার পিতা হইবে। তুর্কীরা আরবদের উপর বিজয়ী হইবে, এই সংবাদও তিনি দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৬)।
হযরত 'উছমান (রা)-এর খিলাফত সম্পর্কে নবী করীম (স) সংবাদ দিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত উছমানকে একটি জামা পরিধান করাইবেন। অথচ কতিপয় লোক তাহা খুলিয়া ফেলিতে চাহিবে। জামা পরিধান করানোর অর্থ খিলাফত প্রদান করা। তিনি তাহাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়াছিলেন এবং তিনি যে পরীক্ষার সম্মুখীন হইবেন সেই সম্পর্কে তাঁহাকে আগেই জানাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি আরও বলিয়াছিলেন, যতক্ষণ 'উমার জীবিত থাকিবে ততক্ষণ পর্যন্ত ফিতনার উদ্ভব হইবে না। হযরত 'উমার (রা) শহীদ হইবেন বলিয়াও তিনি পূর্বেই সংবাদ দিয়াছিলেন। হযরত 'আলী (রা)-এর সঙ্গে হযরত যুবায়র (রা)-এর যুদ্ধ হইবে এবং সে যুদ্ধের পর হযরত যুবায়র (রা) অনুতপ্ত হইবেন- এই সম্পর্কেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন। তাঁহার পবিত্র স্ত্রীগণের একজন সম্পর্কে বলিয়াছিলেন যে, তিনি যখন মক্কা ও বসরার মধ্যবর্তী হাওয়াব নামক স্থানে পৌঁছিবেন, তখন কুকুরের আওয়াজ শুনিবেন এবং সেখানে নিহতদের স্তূপ পাওয়া যাইবে। জঙ্গে জামালের সময় হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) যখন মক্কা হইতে বসরার দিকে যাইতেছিলেন, তখন উক্ত স্থানে ঐ ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৭)।
হযরত 'আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-কে খবর দিয়াছিলেন, তাহাকে বিদ্রোহীরা হত্যা করিবে। হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর সৈন্যরা তাহাকে হত্যা করিয়াছিল (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)-কে বলিয়াছিলেন, তোমার ব্যাপারে লোকেরা আক্ষেপ করিবে, আর তুমিও লোকদের তৎপরতায় আক্ষেপ করিবে। হাজ্জাজের নির্দেশে তাঁহার সহিত সেই রকম আচরণই করা হইয়াছিল। হযরত ইব্ন 'আব্বাস (রা)-কে তিনি বলিয়াছিলেন, তুমি তোমার দৃষ্টিশক্তি হারাইয়া ফেলিবে। তিনি হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা), হযরত জা'ফর ইবন আবূ তালিব (রা) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাতের ব্যাপারেও সংবাদ প্রদান করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ২৭৮)।
কুরনান নামের এক ব্যক্তি সম্পর্কে নবী করীম (স) মন্তব্য করিলেন, সে জাহান্নামী। লোকটি এক যুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করিল। পরিশেষে দেখা গেল, সে যখমের যন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া তলোয়ার দিয়া আত্মহত্যা করিল। লোকেরা এই সংবাদ নবী করীম (স)-এর কাছে পৌঁছাইলে তিনি বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, আর আমি আল্লাহ্র রাসূল।
নবী করীম (স) একদল লোক সম্পর্কে মন্তব্য করিয়াছিলেন, সেই দলে ছিলেন হযরত আবূ হুরায়রা (রা), হযরত হুযায়ফা (রা), হযরত সামুরা ইব্ন জুনদুব (রা) প্রমুখ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, শেষোক্ত ব্যক্তি আগুনে পুড়িয়া মারা যাইবে। তিনজনের মধ্যে সর্বশেষে মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন হযরত সামুরা ইবন জুনদুব (রা)। তিনি অতি বৃদ্ধ হওয়ার কারণে এই রকম দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, তাঁহার শরীরের উত্তাপ একেবারে কমিয়া গিয়াছিল। শরীরকে গরম রাখার জন্য সব সময় তাঁহাকে আগুনের তাপ গ্রহণ করিতে হইত। অবশেষে আগুনে পুড়িয়া তিনি ইন্তিকাল করেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৮)।
উহুদের যুদ্ধে হানযালা (রা) শাহাদাত বরণ করিলেন। নবী করীম (স) বলিলেন, হানযালাকে ফেরেশতারা এখন গোসল দিতেছে, যাহা সাহাবীগণ জানিতেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা কর, কারণ কি? তাহার স্ত্রী বলিলেন, তিনি অপবিত্র ছিলেন, তাহার গোসলের প্রয়োজন ছিল। হযরত হানযালা (রা) যখন শুনিলেন, নবী করীম (স) ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন, তখনই তিনি যুদ্ধের ময়দানে ছুটিয়া গেলেন এবং গোসল করার ফুরসত পান নাই। এই অবস্থায় তিনি শহীদ হন। হযরত আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা) বলেন, আমি হযরত হানযালার মাথা হইতে পানির ফোঁটা টপটপ করিয়া পড়িতে দেখিয়াছি (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৮)।
নবী করীম (স) আরও সংবাদ জানাইয়াছেন, বনূ ছাকীফ গোত্রে এক মিথ্যাবাদী এবং এক হত্যাকারী জন্ম নিবে। তাহাই হইয়াছিল। সেই গোত্রে জন্ম নিয়াছিল মিথ্যাবাদী মুখতার ইন্ন উবায়দ এবং নরঘাতক হাজ্জাজ ইন ইউসুফ (প্রাগুক্ত; ১খ., পৃ. ৩৭৮)।
নবী করীম (স) সায়্যিদা ফাতিমা (রা) সম্পর্কে বলিয়াছিলেন, আহলে বায়তের মধ্যে সকলের আগে আমার সহিত মিলিত হইবে ফাতিমা। নবী করীম (স)-এর দুনিয়া হইতে প্রস্থানের ছয় মাস পর হযরত ফাতিমা (রা) ইন্তিকাল করিলেন। তিনি আরও বলিয়াছেন, আমার স্ত্রীগণের মধ্যে সেই আমার সহিত সর্বাগ্রে মিলিত হইবে যাহার হাত লম্বা। এই কথার দ্বারা তিনি উম্মুল মু'মিনীর হযরত যয়নব (রা)-কে বুঝাইয়াছিলেন। কারণ তিনি খুব বেশী দান করিতেন। পরবর্তীতে তাহাই হইয়াছিল (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৮-৭৯)।
তিনি আরো বলিয়াছেন, আখেরী যামানায় আমার উম্মতের মধ্যে তিরিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটিবে। তাহাদের মধ্যে চারজন হইবে নারী। তাহাদের প্রত্যেকেই আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূল সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করিবে। এক বর্ণনায় আসিয়াছে, তাহারা নবৃওয়াতের দাবিদার হইবে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৭৯)।
তিনি আরও বলিয়াছেন কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (স) এর সহিত এখন হইতে অর্থাৎ খন্দকের যুদ্ধের পর আর যুদ্ধ করিবে না। ইহার পর কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারাইয়া ফেলিয়াছিল (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮০)।
তিনি মিলহান-কন্যা উম্মু হারাম (রা)-কে সুসংবাদ দিয়াছিলেন যে, বাদশাদের মতো তিনি সমুদ্রপথে যুদ্ধ যাত্রা করিবেন। তাহাই হইয়াছিল। আমিরুল মু'মিনীন হযরত উছমান (রা)-এর সময়ে হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮১)।
নবী করীম (স) বলিয়াছেন, আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল সর্বদাই হকের উপর কায়েম থাকিবে। কিয়ামত পর্যন্ত এই রকম চলিবে।
নবী করীম (স) আপন চাচা 'আব্বাস (রা)-এর ঐ সম্পদের কথা বলিয়া দিয়াছিলেন যাহা তিনি বদর যুদ্ধে আসিবার সময় তাহার স্ত্রী উম্মুল ফাদলের নিকট রাখিয়া আসিয়াছিলেন। এই বিষয় তাহার স্ত্রী ছাড়া আর কেহই জানিত না। নবী করীম (স) ইহা তাহাকে জানাইবার পর হযরত আব্বাস (রা) ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮২)।
হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) এক সময় অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। মনে হইতেছিল, তিনি আর বাঁচিবেন না। কিন্তু নবী করীম (স) তাহাকে দেখিয়া বলিয়াছিলেন, সম্ভবত তুমি রোগ হইতে নিষ্কৃতি পাইবে। তোমার দ্বারা একটি কওম উপকার লাভ করিবে এবং একটি কওম ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। অর্থাৎ তোমার দ্বারা মুসলমানদের লাভ হইবে আর কাফিরদের ক্ষতি হইবে। এই কথায় তাহার দীর্ঘ জীবন লাভের শুভ সংবাদ ছিল। জীবিতাবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর মধ্যে তিনিই সকলের শেষে ইন্তিকাল করেন (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮২)।
তিনি উমায়্যা ইবন খালাফ সম্পর্কে বলিয়াছিলেন, সে আমার হাতে মারা যাইবে। উতবা ইবন আবু লাহাব সম্পর্কে বলিয়াছিলেন, আল্লাহর সৃষ্ট প্রাণী তাহাকে ভক্ষণ করিবে। তাহাকে বাঘে খাইয়াছিল (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮২)।
বদর যুদ্ধের দিন নবী করীম (স) স্থান চিহ্নিত করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন, অমুক অমুক কাফের অমুক অমুক স্থানে নিহত হইবে। যুদ্ধশেষে দেখা গেলো, নবী করীম (স)-এর চিহ্নিত স্থানে তাহারা মৃত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮২)।
বাদশাহ নাজাশী ইন্তিকাল করিলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, নাজ্জাশী দুনিয়া হইতে বিদায় নিয়াছে। সাহাবীগণকে বলিয়া তিনি তাহার জানাযার সালাত আদায় করিয়াছিলেন। ফিরোজ দায়লামী পারশ্যের বাদশাহর দূত হইয়া আসিলে নবী করীম (স) তাহাকে বলিয়াছিলেন, বাদশাহর মৃত্যু হইয়াছে। ফীরোজ দায়লামী পরে এই কথার সত্যতা জানার পর মুসলমান হইয়াছিলেন। হযরত আবুযর গিফারী (রা)-কে বলিয়াছিলেন, হে আবুযর সেই দিন তোমার কী অবস্থা হইবে যেইদিন মদীনার লোকেরা তোমাকে মদীনা হইতে বাহির করিয়া দিবে? তিনি বলিলেন, তাহা হইলে আমি মসজিদে হারামে অবস্থান লইবো। তিনি বলিলেন, সেখান হইতেও যদি বাহির করিয়া দেওয়া হয়? হাদীছের শেষের দিকে বলা হইয়াছে- এমতাবস্থায় তোমাকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করিতে হইবে এবং ঐ অবস্থায় তুমি ইন্তিকাল করিবে (প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
নবী করীম (স) একদিন হযরত সুরাকা (রা)-কে বলিয়াছিলেন, ঐদিন তোমার অবস্থা কেমন হইবে যেইদিন পারসের বাদশাহর হাতের স্বর্ণের চুড়ি তুমি পরিধান করিবে? হযরত উমার (রা)-এর খিলাফতের সময় পারস্য বিজয় হইল। গনীমতের মালের মধ্যে বাদশাহর স্বর্ণের চুড়ি দুইটিও ছিল। হযরত উমার ফারূক (রা) হযরত সুরাকা (রা)-এর হাতে স্বর্ণের চুড়ি দুইটি পরাইয়া দিয়া বলিয়াছিলেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি পারস্যের বাদশাহর স্বর্ণের চুড়ি সুরাকার হাতে পরাইয়াছেন (প্রাগুক্ত, ১খ. পৃ. ৩৮৩)।
সুহায়ল ইবন 'আমর কুরায়শদের একজন সরদার ছিলেন, তিনি ছিলেন সুবক্তা। তিনি নবী করীম (স) ও সাহাবায়ে কিরামের নিন্দাবাদ করিতেন, তাহাদিগকে গালি-গালাজ করিতেন। বদর যুদ্ধে তাহাকে বন্দী করা হইলে হযরত উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি ইহার দাঁতগুলি ভাঙ্গিয়া দেই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হে উমার! অচিরেই সে এমন অবস্থায় পৌঁছিবে যাহা দেখিয়া তুমিও খুশি হইবে। সেই রকমই হইয়াছিল। তিনি ইসলাম গ্রহণ করিয়া মক্কা মুকাররমাতেই বসবাস করিতেছিলেন। অতঃপর নবী করীম (স)-এর ওফাত ও হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর খিলাফত লাভের সংবাদ যখন মক্কাতে পৌঁছিল, তখন তিনি বিশেষ ভাষণ দিয়া মুসলমানদের মনে শান্তি ও দৃঢ়তা আনয়ন করিয়াছিলেন। সেই ভাষণের মাধ্যমে তিনি তাহাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া দিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ১খ. পৃ. ৩৮৪)।
হযরত ছাবিত ইবন কায়স ইবন শাম্মাস (রা)-কে নবী করীম (স) বলিয়াছিলেন, এতদিন তো নিরুপদ্রব জীবন অতিবাহিত করিলে! এখন শাহাদাতের জন্য প্রস্তুতি নাও। তিনি ভণ্ড নবী মুসায়লামা কায্যাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়া ইয়ামামাতে শহীদ হইয়াছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন ফদালা ইবন 'উমার আল-লায়ছী মনে মনে ইচ্ছা করিল যে, তাওয়াফরত অবস্থাতেই সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবে। ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)- এর কাছাকাছি পৌছিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) ইহা জানিতে পরিয়া ডাকিলেন, ফদালা। তোমার মনে কি দূরভিসন্ধি আছে? সে বলিল তেমন কিছুই না, আমি তো আল্লাহ্ নাম স্মরণ করিতেছি। তাহার কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মৃদু হাসিলেন এবং বলিলেন, আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি দালাকে আরও কাছে ডাকিয়া আনিয়া তাঁহার পবিত্র হস্ত তাহার বক্ষে স্থাপন করিলেন। পরে হযরত ফদালা নিজেই বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পবিত্র হস্ত আমার বক্ষ হইতে উঠাইয়া লওয়ার আগেই আমি গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে অনুভব করিলাম, এখন তিনিই আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম (প্রাগুক্ত, ১০খ., পৃ. ৩৬২)।
ওয়ার্কিদী উম্মুল মু'মিনীল 'আইশা (রা)-এর এক মুক্তদাসের মাধ্যমে বর্ণনা করিয়াছেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) এক বন্দীকে 'আইশা (রা)-এর নিকট উপস্থিত করিয়া বলিলেন, ইহাকে কড়া পাহারায় রাখিতে হইবে। এই বলিয়া তিনি সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। 'আইশা (রা) বন্দীর প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিয়াছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এক আগন্তুক মহিলার সহিত কথা বলিতে গিয়া তিনি অন্যমনস্ক হইয়া পড়িলেন। সুযোগ পাইয়া লোকটি পলায়ন করিল। কিছুক্ষণ পর সেখানে রাসূলুল্লাহ (স) উপস্থিত হইলেন এবং বলিলেন, বন্দী লোকটিকে তো দেখিতেছি না। 'আইশা বলিলেন, কোথায় যে গেল। রাসূলুল্লাহ (স) কিছুটা উৎকণ্ঠিত হইয়া বলিলেন, আল্লাহ তোমার হস্ত কর্তন করুন। এই কথা বলিয়া তিনি বাহিরে গিয়া অপেক্ষমান সাহাবীগণকে বলিলেন, মালযামের পশ্চাৎভূমি হইতে এখনই লোকটিকে খুঁজিয়া লইয়া আস। সাহাবীগণ নির্দেশ শুনিয়া তৎক্ষণাৎ রওয়ানা হইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর নির্দেশিত স্থান হইতে পুনরায় তাহাকে বন্দী করিয়া আনা হইল। সঠিক সনদ দ্বারা রিওয়ায়াতটি সমর্থিত নয় (প্রাগুক্ত, ৫খ. পৃ. ৪১৯)।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আব্বাস ও উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) হইতে ইমাম বাগাবী বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, লায়লাতুল মি'রাজ-এর পরবর্তী সকালে আমি বসিয়া চিন্তা করিতেছিলাম, মি'রাজের কথা বলিলে লোকেরা আমাকে অসত্যভাষী বলিবে। কা'বা প্রাঙ্গণের এক প্রান্তে বসিয়াছিলাম দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে। এমন সময় আবূ জাহ্ল সেখান দিয়া যাওয়ার সময় বিদ্রূপের স্বরে বলিল, মুহাম্মাদ। নূতন কিছু পাইলে নাকি? আমি বলিলাম, হাঁ, গত রাত্রে আমাকে এক স্থানে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। সে বলিল, কোথায়? আমি বলিলাম, বায়তুল মুকাদ্দাসে। সে বলিল, সকালের মধ্যেই মক্কায় ফিরিয়া আসিলে? আমি বলিলাম, হাঁ। সে কোন মন্তব্য না করিয়া বলিল, তুমি যাহা বলিলে আমি কি তাহা লোকজনকে বলিয়া দিব? আমি বলিলাম, হাঁ। সে লোকদেরকে ডাকিয়া আনিলে আমি প্রথমে কথা বলিলাম। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কার কিছু সংখ্যক লোক বায়তুল মাকদিস সফর করিয়াছিল। তাহারা বলিল, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি বায়তুল মুকাদ্দাসের বিবরণ দিতে পারিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আমি একে একে বায়তুল মাকদিসের বিভিন্ন অংশের বিবরণ দিতে শুরু করিলাম। বায়তুল মাকদিসকে আমার সম্মুখে উপস্থিত করা হইল, যেন তাহা আকীলের বাড়ীর নিকট দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। আমি দেখিয়া দেখিয়া বলিতে লাগিলাম। লোকেরা শুনিয়া বলিল, তোমার বর্ণনা সঠিক। এইবার আমাদের কাফেলা সম্পর্কে কিছু বল? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি তোমাদের কাফেলাকে দেখিয়াছি আর-রাওহা নামক স্থানে। তাহাদের একটি উট হারাইয়া গিয়াছিল। উহা খুঁজিতেছিল তাহারা। সেইখানে ছিল তাহাদের একটি পানির মশক। আমার তৃষ্ণা পাইয়াছিল। তাই মশক হইতে পানি পান করিয়াছি। কাফেলা ফিরিয়া আসিলে তাহাদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিও, আমি যেই স্থানের কথা বলিলায় সেই স্থানে তাহাদের পানির পাত্রটি ছিল কি না? লোকেরা বলিল, ইহা একটি নিদর্শন বটে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি অমুক গোত্রের কাফেলারও সাক্ষাত পাইয়াছিলাম। তাহাদের দুইজন লোক আরোহণ করিয়াছিল একটি উটে। যুমুর নামক স্থানে ঐ উট আমাকে দেখিয়া আওয়াজ করিয়া উঠিল। তাহাদের কাফেলা আসিলে জিজ্ঞাসা করিয়া দেখিও আমি ঠিক বলিয়াছি কিনা? লোকেরা বলিল, ইহাও একটি বিবেচ্য নিদর্শন। লোকেরা পুনরায় বলিল, আমাদের কাফেলা সম্পর্কে বল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তানঈম নামক স্থানে আমি তোমাদের কাফেলার উটগুলি দেখিয়াছি। লোকেরা বলিল, কয়টি উট ছিল সেখানে এবং সেইগুলির আকৃতি কেমন ছিল? আর সেইগুলির পিঠে কোন কোন পণ্যের বোঝা ছিল? রাসূলুল্লাহ্ (স)-বলিলেন, আমি এতো কিছু লক্ষ্য করি নাই। তবুও বলিতেছি, শুন! হারূরা নামক স্থানে সম্পূর্ণ কাফেলা আমার সামনাসামনি হইয়াছিল। তখন আমি অমুক অমুক ব্যক্তিকে দেখিয়াছি। কাফেলার সম্মুখভাগে ছিল একটি মেটে বর্ণের উট। উহার পিঠে ছিল খেজুর পাতা দ্বারা তৈরী মাদুরের বোঝা। অমুক দিন সূর্যোদয়ের সময় তোমাদের কাফেলা মক্কায় পৌঁছিবে। মুশরিকরা বলিল, এই নিদর্শনও যাচাইযোগ্য। নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যোদয়ের সময় তাহারা বিস্ময়ে দেখিল যে, সম্মুখভাগেই মেটে বর্ণের উটটিসহ কাফেলা ফিরিয়া আসিয়াছে। কাফেলার লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) যাহা বলিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ সত্য (তাফসীরে মাযহারী, ৫খ., পৃ ৪০১, ৪০২)।
বুখারী ও মুসলিম ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আমলে সূর্যগ্রহণ হয়। তিনি এই সময় নামায পড়িলেন। নামায হইতে ফিরিয়া আসিলে সাহাবীগণ আরয করিলেন, আমরা আপনাকে কোন বস্তু গ্রহণ করিতে এবং পরক্ষণেই তাহা হইতে বিরত থাকিতে দেখিয়াছি। তিনি বলিলেন, আমি জান্নাত দেখিয়া তাহা হইতে এক গুচ্ছ আঙ্গুর ফল লইতে চাহিয়াছিলাম, কিন্তু নিলাম না। যদি নিতাম তাহা হইলে দুনিয়া বাকী থাকা পর্যন্ত তোমরা উহা খাইতে পারিতে। আমি দোযখ দেখিয়াছি, এমন ভয়াবহ দৃশ্য কখনও দেখি নাই। দোযখীদের অধিকাংশই ছিল নারী (সহী মুসলিম, সালাতুল কুসূফ অধ্যায়, ১খ., পৃ. ২৯৬; বুখারী, বাব সূর্য গ্রহণের নামায, ১খ., পৃ. ১৪৪; প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৮৯)।
ইমরান ইবন হুসায়ন (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমি জান্নাত দেখিয়াছি এবং জান্নাতীদের অধিকাংশই দরিদ্র। আমি জাহান্নামও দেখিয়াছি, জাহান্নামীদের অধিকাংশই নারী (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৮৯)।
হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করিলাম। সেখানে একটি প্রাসাদ দেখিতে পাইলাম। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ইহা কাহার জন্য? ফেরেশতারা বলিলেন, ইহা উমার ইবন খাত্তাবের জন্য। হে 'উমার! তোমার আত্মসম্মানবোধের কথা চিন্তা করিয়া আমি প্রাসাদে প্রবেশ করি নাই। রাবী আবু বকর ইবন 'আয়্যাশ বর্ণনা করেন, আমি হুমায়দকে জিজ্ঞাসা করিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) এই প্রাসাদ জাগ্রত অবস্থায় দেখিয়াছেন, না স্বপ্নে? হুমায়, বলিলেন, জাগ্রত অবস্থায় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৮৯)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, জিবরাঈল আমার হাত ধরিয়া জান্নাতের সেই দরজা দেখাইলেন যাহা দিয়া আমার উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করিবে। হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, যদি আমিও আপনার সহিত থাকিতাম তাহা হইলে আমিও সেই দরজাটা দেখিতাম! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বপ্রথম তুমিই জান্নাতে দাখিল হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৯০)।
উমায়্যা ইবন মাখশী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে এক ব্যক্তি খাবার খাইতেছিল, কিন্তু শুরুতে বিসমিল্লাহ বলে নাই। খাওয়ার শেষ প্রান্তে পৌঁছিয়া সে বলিল, বিসমিল্লাহ আও- ওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, লোকটির সাথে শয়তানও খাইতেছিল। কিন্তু সে যখন বিসমিল্লাহ বলিল তখন শয়তান বমি করিয়া তাহার পেটের খাবার বাহির করিয়া দিল (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৯১)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, যাকাতলব্ধ খাদ্যশস্যের হিফাজত রাসূলুল্লাহ্ (স) আমার দায়িত্বে অর্পণ করেন। এক ব্যক্তি আমার নিকট আসিল এবং নিজ হস্তে খাদ্যশস্য তুলিয়া লইতে লাগিল। আমি তাহাকে ধরিয়া ফেলিলাম। আমি বলিলাম, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া যাইব। সে বলিল, আমি গরীব মানুষ, আমার পরিবার-পরিজন ক্ষুধায় কষ্ট পাইতেছে। আমি খুবই অভাবী। এই কথা শুনিয়া আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিলাম। সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গমন করিলাম। তিনি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, আবূ হুরায়রা! গত রাতের কয়েদী কোথায় গিয়াছে? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে বিনয়ের সহিত পরিবারের ক্ষুধার কষ্টের কথা বলিলে আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিয়াছি। তিনি বলিলেন, সে তোমার সাথে মিথ্যা বলিয়াছে। সে আবার আসিবে। আমি অপেক্ষায় রহিলাম। সে পুনরায় আসিল এবং খাদ্যশস্য তুলিয়া লইল। আমি তাহাকে ধরিয়া ফেলিলাম। সে বলিল, আমাকে ছাড়িয়া দিন। আমি গরীব মানুষ। আর কখনও আসিব না। আমি ছাড়িয়া দিলাম। সকালে রাসূলুল্লাহ (স)-বলিলেন, রাতের কয়েদী কোথায়? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তাহার অভাব-অনটনের কথা বলিলে আমি তাহাকে ছাড়িয়া দিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে মিথ্যা বলিয়াছে। সে আবার আসিবে। আমি অপেক্ষায় রহিলাম। রাতে আসিয়া সে খাদ্যশস্য লইতে লাগিল। আমি তাহাকে পাকড়াও করিলাম, বলিলাম, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া যাইব। সে বলিল, আমাকে ছাড়িয়া দিন, আমি আপনাকে উপকারী 'ইল্ম শিখাইয়া দিব। তাহা এই, আপনি যখন নিদ্রা যাইবেন তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করিবেন। ইহা আল্লাহর পক্ষ হইতে আপনার দেহরক্ষী হইবে। সকাল পর্যন্ত আপনার নিকট শয়তান আসিবে না। আমি সকালে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে ঘটনা শুনাইলাম। তিনি বলিলেন, তোমার নিকট যে আসিয়াছিল সে ছিল শয়তান। আয়াতুল কুরসী সম্পর্কে সে যাহা বলিয়াছে তাহা ঠিক কিন্তু সে নিজে মিথ্যাবাদী (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৯৫)।
'আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সাহচর্য লাভ করিয়া আমি মানুষ ও জিনদের সহিত যুদ্ধ করিয়াছি। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা প্রশ্ন করিলাম, আপনি জিনদের সহিত কিভাবে লড়াই করিলেন? তিনি বলিলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এক স্থানে অবতরণ করিলাম। আমি পানি আনার জন্য বালতি ও মশক হাতে লইলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার নিকট কেহ আসিবে এবং তোমাকে পানি আনিতে বাঁধা দিবে। কূপের নিকট পৌছিয়া আমি কৃষ্ণকায় এক ব্যক্তিকে দেখিতে পাইলাম। তাহাকে যুদ্ধবাজ মনে হইতেছিল। সে বলিল, তুমি এক কূপ হইতে এই বালতি পানিও উঠাইতে পারিবে না। আমি তখনই তাহাকে ধরিয়া ধরাশায়ী করিলাম। অতঃপর একটি পাথর নিক্ষেপ করিয়া তাহার নাক ও মুখ ভাঙ্গিয়া দিলাম, অতঃপর মশক ভর্তি পানি নিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট আসিলাম। তিনি বলিলেন, কেহ আসিয়াছিল কি? আমি ঘটনার বর্ণনা দিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে ছিল শয়তান (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ., ৯৫)।
সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত ছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কে? তিনি বলিলেন, আমি নবী। সে প্রশ্ন করিল, কিয়ামত কখন হইবে? তিনি বলিলেন, ইহা অদৃশ্য বিষয় এবং এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন। সে বলিল, নবীর পরিচয় কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, নবী হইলেন আল্লাহ্ প্রেরিত। সে বলিল, আপনার তলোয়ারটি আমাকে দেখান। তিনি তাহাকে তলোয়ারখানা দিলেন। সে উহা নাড়াচাড়া করিয়া ফিরাইয়া দিল। তিনি বলিলেন, তুমি যাহা ইচ্ছা করিয়াছিলে তাহা করিবার ক্ষমতা তোমার নাই। সে বলিল, আমার উহাই ইচ্ছা ছিল। অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, লোকটি আমার তলোয়ার দিয়া আমাকে হত্যা করিবার ইচ্ছা করিয়াছিল, কিন্তু সে তাহা পারিল না (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০০)।
হযরত ওয়াবিসা (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সৎকর্ম ও পাপকর্ম সম্পর্কে জানার জন্য হাযির হইলাম। তিনি বলিলেন, ওয়াবিসা! তুমি যেই বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য আসিয়াছ আমি তাহা বলিয়া দিতেছি। আমি বলিলাম, বলুন। তিনি বলিলেন, তুমি সৎকর্ম ও অসৎকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছ। আমি বলিলাম, আল্লাহ্র কসম, যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন! আমি এইজন্যই আসিয়াছিলাম। অতঃপর তিনি বলিলেন, সৎকাজ উহাই যেই কাজে তোমার বক্ষ উন্মুক্ত থাকে, কোনরূপ সন্দেহের কাঁটা অনুভূত হয় না। আর মন্দ সেই কাজ, যে কাজে তোমার মনে খটকা থাকে, যদিও মানুষ তোমাকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়া থাকে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০১)।
হযরত 'আবদুল্লাহ্ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন, আমি নবী করীম (স)-এর নিকট ছিলাম। তাঁহার খেদমতে দুই ব্যক্তি উপস্থিত হইল। তাহাদের একজন আনসারী, অপরজন ছাকাফী। তাহারা কিছু জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) ছাকাফীকে বলিলেন, প্রশ্ন কর। আর যদি চাও তাহা হইলে আমিই বলিয়া দেই, তুমি কি প্রশ্ন করিতে আসিয়াছ। ছাকাফী বলিলেন, বলুন। তিনি বলিলেন, তুমি নামায, রুকু, সিজদা, রোযা এবং ফরয গোসল সম্পর্কে জানিতে আসিয়াছ। সে বলিল, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ রাসূল হিসাবে পাঠাইয়াছেন! আমি এইসব বিষয়েই জ্ঞান অর্জন করিতে আসিয়াছি।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আনসারীকে বলিলেন, তুমিও প্রশ্ন কর, তুমি চাহিলে আমি তোমার প্রশ্নও বলিয়া দিতে পারি। সে বলিল, বলুন। তিনি বলিলেন, তুমি আসিয়াছ এই কথা জানিতে যে, গৃহ হইতে বায়তুল্লাহ্ নিয়াতে বাহির হইলে তাহার কি ছওয়াব? তুমি আরও জানিতে চাও যে, তুমি আরাফাতে অবস্থান, মাথা মুণ্ডন, তাওয়াফ ও কংকর নিক্ষেপ করিবে কিনা। আনসারী বলিল, আমি এইসকল কথাই জানিতে আসিয়াছি (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০১)।
উকবা ইব্ন আমের আল-জুহানী (রা) বর্ণনা করেন, কয়েকজন ইয়াহূদী আগমন করিল। তাহাদের সহিত তাহাদের ধর্মগ্রন্থও ছিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাতের অনুমতি চাহিল। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গেলাম এবং তাঁহাকে জ্ঞাত করিলাম। তিনি বলিলেন, তাহাদের সহিত আমার সাক্ষাতে লাভ কি? তাহারা আমাকে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করিতে চাহে যাহা আমার জানা নাই। আমি আল্লাহ্র বান্দা। আমি কেবল তাহাই জানি যাহা আমার প্রভু আমাকে জানাইয়া দেন। তারপর তিনি উযূ করিয়া মসজিদে গেলেন, দুই রাক'আত নামায পড়িয়া প্রফুল্ল মনে বাহির হইলেন। তখন তাঁহার মুখমণ্ডলে আনন্দের চিহ্ন প্রস্ফুটিত ছিল। তিনি বলিলেন, তাহাদিগকে আমার নিকট পাঠাইয়া দাও। তাহারা আসিলে তিনি বলিলেন, তোমরা ইচ্ছা করিলে যাহা জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছ তাহা আমি বলিয়া দেই। তাহারা বলিল, বলুন। আমাদের ইচ্ছাও তাহাই। তিনি বলিলেন, তোমরা আমার নিকট যুল-কারনায়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতে আসিয়াছ (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০১)।
যুলকারনায়ন একজন রোমক সম্রাট! তিনি দ্বিগ্বিজয়ে বাহির হইয়া অবশেষে মিসরের উপকূলে উপস্থিত হইলেন। তিনি একটি শহর নির্মাণ করিলেন, যাহার নাম আলেকজান্দ্রিয়া। শহরের নির্মাণ সমাপ্ত হইলে আল্লাহ তা'আলা তাহার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠাইলেন। ফেরেশতা তাঁহাকে লইয়া আকাশে আরোহণ করিলেন। আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল পর্যন্ত উঁচুতে উঠিয়া ফেরেশতা বলিলেন, নীচে দেখেন কি আছে? যুল-কারনায়ন বলিলেন, দুইটি শহর দেখিতেছি। ফেরেশতা তাহাকে আরও উপরে লইয়া গেলেন এবং বলিলেন, নীচে কি আছে? তিনি বলিলেন, কিছুই দেখা যাইতেছে না। ফেরেশতা বলিলেন, যে দুইটি শহর দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল, সেই দুইটি শহর নয়, মহাসাগর। আল্লাহ তা'আলা তোমার পথ নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। তুমি সেই পথে চলিবে। মূর্খকে জ্ঞান শিখাইবে এবং জ্ঞানীকে জ্ঞানের উপর দৃঢ় রাখিবে। ইহার পর ফেরেশতা যুল-কারনায়নকে পৃথিবীতে নামাইয়া দিলেন। তিনি দুই পাহাড়ের মধ্যস্থলে প্রাচীর নির্মাণ করিয়াছিলেন, ইহার পর ভূমণ্ডলে পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি এক সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হইয়াছিলেন, যাহাদের চেহারা ছিল কুকুরের মত। তাহারপর অন্য এক সম্প্রদায়ের নিকট গমন করিয়াছিলেন। ইয়াহ্দীরা এই বিবরণ শুনিয়া বলিল, আমাদের কিতাবে এইরূপই বলা হইয়াছে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০১)।
ছাবিত আল-বানানী বর্ণনা করেন, মুনাফিকরা এক স্থানে সমবেত হইয়া পরস্পর আলোচনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাদের মধ্যে অনেক ব্যক্তি সমবেত হইয়া এমন এমন কথাবার্তা বলিয়াছে। যাহারা এমন কথা বলিয়াছ তাহারা উঠিয়া আল্লাহর কাছে তওবা ইস্তিগফার করুক। আমিও তোমাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করিব। কিন্তু মুনাফিকরা উঠিল না। তিনি এই কথা তাহাদেরকে তিনবার বলিলেন, অতঃপর বলিলেন, তোমরা না দাঁড়াইলে আমি তোমাদের নাম প্রকাশ করিয়া দিব। তিনি তাহাদের নাম ধরিয়া ডাকিলেন। তখন মুনাফিকরা লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় মুখ ঢাকিয়া দাঁড়াইল (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ., ১০২)।
ইমাম বায়হাকী জনৈক আনসারী হইতে বর্ণনা করেন, জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াত করিলেন। খাবার পেশ করা হইলে তিনি এক লোকমা মুখে দিয়া চর্বণ করিতে লাগিলেন, অতঃপর বলিলেন, ইহা সেই ছাগলের গোশত যাহা অন্যায়ভাবে লওয়া হইয়াছে। মহিলাকে জিজ্ঞাসা করা হইলে সে বলিল, তাহার প্রতিবেশিনী স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকেই ছাগলটি প্রেরণ করিয়াছিল।
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (সা) ও তাঁহার সাহাবীগণ এক মহিলার নিকট দিয়া গমন করিলেন। মহিলা একটি ছাগল যবেহ করিয়া খাবার প্রস্তুত করিল। তিনি এক লোকমা মুখে দিলেন কিন্তু গলাধকরণ করিতে পারিলেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলিলেন, এই ছাগলটি অনুমতি ছাড়াই গ্রহণ করা হইয়াছে। মহিলা বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মু'আয পরিবারের লোকদের সহিত আমাদের কোন লৌকিকতা নাই। আমরা তাহাদের বস্তু নিয়া নেই এবং তাহারাও আমাদের বস্তু নিয়া নেয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০৩)।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক পৌঁছিয়া বলিলেন, আজ রাত্রে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় প্রবাহিত হইবে। তোমাদের মধ্যকার কোন ব্যক্তি যেন রাতে না দাঁড়ায়। যাহার নিকট উট রহিয়াছে সে যেন তাহার উটের উরুদেশের রশি বাঁধিয়া রাখে। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হইল (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ৩৩৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক হইতে হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) কে দূমাতুল জান্দালের শাসক উচ্চায়দির-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন। উকায়দির ইবন আবদুল মালিক বানু কিন্দার খৃস্টধর্মাবলম্বী রাজা ছিল। হযরত খালিদের (রা) যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিয়াছিলেন, তুমি তাহাকে গরু শিকাররত অবস্থায় পাইবে। খালিদ (রা) যখন সেখানে পৌঁছিলেন তখন ছিল ফুটফুটে চাঁদনী রাত। রাজা তাহার রাণীকে নিয়া ছাদে বসিয়া গল্পগুজব করিতেছিল। এমন সময় একটি বন্যগরু আসিয়া তাহার প্রাসাদের দরজায় শিং দ্বারা আঘাত করিল। রাণী বলিল, এইরূপ কখনও দেখিয়াছেন কি? উকায়দির বলিল, না, এমন তো কখনও দেখি নাই। রাণী বলিল, হাতের নিকট এমন শিকার কি হাতছাড়া করা যায়? উকায়দির: তাহা কি করিয়া হয়? উকায়দির সাথে সাথে ঘোড়া ডাকিয়া তাহার ভাই হাসসানসহ পরিবারের কয়েকজন লোক লইয়া শিকারের উদ্দেশ্যে বাহির হইলেন। ইতোমধ্যে খালিদ (রা) তাঁহার বাহিনী নিয়া সেখানে পৌঁছিলেন। উভয় দল মুখামুখি হইল এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর অদৃশ্য সংবাদটি বাস্তবায়িত হইল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩৪৩-৪৪)।
ইবনুল কাইয়িম লিখিয়াছেন, আবুল আসওয়াদ তাঁহার 'মাগাযী' গ্রন্থে হযরত উরওয়া (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনকালে কতিপয় মুনাফিক শলা-পরামর্শ করিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন আকাবা গিরি-সংকট অতিক্রম করিবেন তখন তাহাকে সেই সংকীর্ণ গিরি-সংকটের উঁচু স্থান হইতে নিচে গর্তে ফেলিয়া দিয়া হত্যা করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে তাহারা তাঁহার পিছু পিছু আসিতে থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাহা তাঁহার প্রিয় হাবীবকে অবগত করেন। রাসূলুল্লাহ (স) আকাবার নিকটে আসিয়াই ঘোষণা করিলেন, যাহাদের ইচ্ছা তাহারা বা ওয়াদীর প্রশস্ত নিচু পথ দিয়া রাস্তা অতিক্রম করিতে পারে। তিনি আকাবার পথ ধরিয়াই চলিলেন। লোকজন ঘোষণা শুনিয়া বা ওয়াদীর পথে চলিল, কিন্তু মুনাফিকরা এই পথেই অগ্রসর হইল। তাহারা মুখে মুখোশ পরিয়া নিল এবং-তাহাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিল।
রাসূলুল্লাহ (স) হুযায়ফাও আম্মার (রা)-কে সঙ্গে লইলেন। তিনি বলিলেন, হে আম্মার! তুমি উটনীর লাগাম ধর। হে হুযায়ফা! তুমি উটনির পিছনে থাক। রাসূলুল্লাহ (স) যখন আকাবার সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করিতেছিলেন তখন সেই হতভাগাদের পদধ্বনি (পিছন দিক হইতে) শোনা যাইতেছিল। তাহাদের মুখে ছিল মুখোশ, আর রাতটাও ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ক্রোধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চেহারা রক্তিম বর্ণ হইয়া উঠিল তিনি ক্রুদ্ধকণ্ঠে নির্দেশ দিলেন, তাহাদেরকে পিছনের দিকে হটাইয়া দাও। হুযায়ফা (রা) তাহার তীরের ফলা দিয়া তাহাদের উটের মুখে সজোরে আঘাত হানিলেন। প্রথমে তাহারা তাঁহাকে একজন সাধারণ পথিক বলিয়া ধারণা করিয়াছিল। অতঃপর তাহারা হুযায়ফা (রা)-কে চিনিতে পারিয়া বুঝিতে পারিল, ষড়যন্ত্র ফাঁস হইয়া গিয়াছে। তখন তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া মুখোশ ফেলিয়া জনতার ভিড়ে মিশিয়া গেল।
হুযায়ফা (রা) ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত উট হাকাইবার নির্দেশ দিলেন। 'আম্মার (রা)-কেও দ্রুত চলিবার নিদের্শ দিলেন। এইভাবে দ্রুত আকাবা অতিক্রম করিয়া তিনি সৈন্যদের অপেক্ষায় থামিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) হুযায়ফা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি লোকগুলিকে চিনিতে পারিয়াছ? তিনি বলিলেন, সওয়ারীগুলি তো অমুক অমুকের ছিল, কিন্তু লোক কাহারা ছিল উহা সনাক্ত করিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি তাহাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা করিতে পারিয়াছ? হুযায়ফা (রা) বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহারা আমাদেরকে আকাবার গিরি-পথ হইতে নিচে ফেলিয়া দিয়া হত্যা করিতে চাহিয়াছিল। তিনি আরও বলিলেন, ব্যাপারটি ফাঁস করিও না, আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অভিসন্ধি ও তাহাদের নাম সম্পর্কে আমাকে অবহিত করিয়াছেন। ইনশাআল্লাহ প্রত্যুষে উহা বলিব।
ইবন ইসহাকের বর্ণনায় রহিয়াছে, প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবায়, সা'দ ইবন আবী সারহ, আবা খাতির আল-আরাবী, আমের আবু আমের, রাহিব ও জালাস ইবন সাওয়াদকে ডাকিয়া আন। জালাস ইবন সওয়াদ বলিয়াছিল, আজ রাত্রে আমরা মুহাম্মাদকে আকাবা হইতে নিচে ফেলিয়া দিব, যদিও মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীগণ আমাদের চাইতে উত্তম হইয়া থাকে। আমরা তো ছাগল আর তাহারা হইতেছে আমাদের রাখাল। আমরা নির্বোধ, তাহারা বুদ্ধিমান। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ডাকিয়া আন মুজাম্মে' ইবন জারিয়াকে এবং মালীহ তামীমীকে। এই ব্যক্তিদ্বয় মুরতাদ হইয়া নিখোঁজ হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ডাকিয়া আন হিস্স্স ইবন নুমায়রকে। এই ব্যক্তি যাকাতের খেজুর লুট করিয়াছিল।...রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, তুমি কেন এমনটি করিলে? সে জবাক দিল, আমার জানা ছিল না যে, আপনি উহা জানিতে পারিবেন। এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, আপনি সত্যিই আল্লাহ্র রাসূল। ইতোপূর্বে আমি মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করি নাই। এখন আমি মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন।
তাহার পর তিনি বলিলেন, ডাকিয়া আনো তুআয়ম ইবন আবীরাককে, ডাকিয়া আনো 'আবদুল্লাহ ইবন 'উওয়ায়নাকে। এই ব্যক্তি তাহার সঙ্গীদেরকে বলিয়াছিল, আজ রাতে জাগ্রত থাক, তাহা হইলে চিরদিন শান্তিতে বসবাস করিতে পারিবে। আজ মুহাম্মাদকে খতম করা ছাড়া তোমাদের আর কোন কাজ নেই। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি নিহত হইলে তোমার কি লাভ হইত শুনি? সে ক্ষমা প্রার্থনা করিলে তিনি তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন।
তাহার পর তিনি বলিলেন, ডাকিয়া আনো মুররা ইবন রবীকে। সে বলিয়াছিল, একটি লোককে হত্যা করিলে সকলেই শান্তি পাইবে। সর্বমোট এই বার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার পরামর্শ করিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের প্রত্যেকের নাম ও উক্তি হুবহু বলিয়া দিলেন। তিনি তাহাদের প্রত্যেককে বলিলেন, তুমি এইরূপ উক্তি করিয়াছিলে এবং তোমার অভিসন্ধি ছিল এই, ইত্যাদি। ইহাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন: يَحْلِفُوْنَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُوا وَمَا نَقَمُوا إِلَّا أَنْ أَعْنُهُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ مِنْ فَضْلِهِ فَإِنْ يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَهُمْ وَإِنْ يَتَوَلُّوا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِنْ ولى ولا نَصِيرٍ . "উহারা আল্লাহ্ শপথ করে যে, উহারা কিছু বলে নাই। কিন্তু উহারা তো কুফরীর কথা বলিয়াছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর উহারা কাফির হইয়াছে। উহারা যাহা সংকল্প করিয়াছিল তাহা পায় নাই। আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল নিজ কৃপায় উহাদেরকে অভাবমুক্ত করিয়াছিলেন বলিয়াই উহারা বিরোধিতা করিতেছে। উহারা তওবা করিলে উহাদের জন্য ভাল হইবে, কিন্তু উহারা মুখ ফিরাইয়া লইলে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে উহাদিগকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিবেন। পৃথিবীতে উহাদের কোন অভিভাবক নাই এবং কোন সাহায্যকারীও নাই” (৯: ৭৪)।
আল-ওয়াকিদী বলেন, দশম হিজরীতে দশ সদস্যবিশিষ্ট গামিদ প্রতিনিধি দল মদীনায় 'বাকী 'উল-গারকাদে' উপস্থিত হন। সেখান হইতে সকলে একত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। তাহাদের মাল-পত্রের নিকট তাহারা একজন বালককে রাখিয়া যান। ঘটনাক্রমে বালকটি ঘুমাইয়া পড়িলে এক চোর আসিয়া একজনের একটি ব্যাগ নিয়া পালাইয়া যায়। সেই ব্যাগে তাহারা কাপড়-চোপড় ছিল।
তাহারা সকলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া সালাম দিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদেরকে শরীয়াতের বিধানাবলী সম্বলিত একটি লিখিত ফরমান দিলেন। তাহার পর জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা তোমাদের মাল-পত্রের নিকট কাহাকে রাখিয়া আসিয়াছ? তাহারা জবাবে বলিলেন, এক বালককে রাখিয়া আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ছেলেটি তো ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। একটি চোর আসিয়া একজনের একটি ব্যাগ চুরি করিয়াছে। তাহাদের একজন বলিয়া উঠিল, আমার ছাড়া দলের আর কাহারও ব্যাগ নাই। একটু পরেই তিনি বলিলেন, ব্যাগটি চোর লইয়া গিয়াছিল, পরে তাহা আবার পাওয়া গিয়াছে।
তাহারা বিলম্ব না করিয়াই তাহাদের মালপত্রের নিকট চলিয়া গেলেন এবং ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করিলেন। সে বলিল, আমি ঘুম হইতে জাগিয়া দেখিলাম, ব্যাগ নাই। খোঁজ করিতে বাহির হইয়া পড়িলাম, সামান্য দূরেই একটি লোককে বসা অবস্থায় দেখিতে পাইলাম। আমি সেই দিকে অগ্রসর হইতেই লোকটি চলিয়া গেল। সে যেখানে বসিয়াছিল সেখানে গিয়া কিছু মাটি খোড়া অবস্থায় দেখিতে পাইলাম। একটু খোঁজার পরেই সেখানে ব্যাগটি পাইলাম এবং তাহা নিয়া চলিয়া আসিলাম। আনুপূর্বিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর অদৃশ্য সংবাদের বাস্তবায়ন দেখিয়া সকলেই সমস্বরে বলিয়া উঠিল, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর সত্য রাসূল। অবশেষে বালকটিও রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিল এবং ইসলাম গ্রহণ করিল। মহানবী (স) অন্যান্য দলের মত তাহাদেরকেও পথখরচা দিয়া বিদায় করিলেন। (প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৮-৬৫)।
নাখ'আ ইয়ামানের একটি কবীলা। একাদশ হিজরীর মুহাররামের মাঝামাঝি এই কবীলার একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় আসিলেন। ইহাই ছিল সর্বশেষ আগমনকারী প্রতিনিধি দল। এই দলের লোকসংখ্যা ছিল দুই শত। ইহারা আসিয়া আয-যিয়াফা নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন এবং সেইখান হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হন। ইহারা ইসলামের স্বীকারোক্তি করেন। ইহারা ইতোপূবেই হযরত মু'আয ইবন জাবাল (রা)-এর হাতে ইসলামের বায়'আত করিয়াছিলেন।
এই প্রতিনিধি দলের মধ্যে একজনের নাম ছিল যুরারা ইবন 'আমর। তিনি বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! এই সফরে আমি অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, সেই সকল স্বপ্ন কি? তিনি বলিলেন, একটি স্বপ্ন এই যে, একটি মাদী গাধা বাচ্চা প্রসব করিয়াছে- যাহার রং লাল-কালো মিশ্রিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি একজন গর্ভবতী দাসীকে ঘরে রাখিয়া আসিয়াছ? তিনি বলিলেন, হ্যাঁ! রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে একটি শিশু সন্তান প্রসব করিয়াছে। নবজাতকটি পুত্র সন্তান। আর সে তোমারই ঔরসজাত সন্তান। যুরারা জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহার রঙের তাৎপর্য কি? রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে নিকটে ডাকিয়া কানে কানে বলিলেন, তোমার কি শ্বেতকুষ্ট আছে, যাহা তুমি লোকাদের নিকট গোপন করিয়া থাক? যুরারা বিস্ময়মাখা কণ্ঠে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আজ পর্যন্ত কেহই এই সংবাদ অবগত ছিল না এবং আপনি ব্যতীত কেহই এই কথাটি জানে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই রঙের তাৎপর্য ইহাই।
তিনি বলিলেন, আমি অতঃপর স্বপ্নে দেখিলাম, নু'মান ইবনুল মুনযির দুল ও অলংকারাদি পরিয়া রহিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা হইতেছে আরবদেশ যাহা তাহার সুন্দরতম বেশে এখন সজ্জিত রহিয়াছে আর এই সৌন্দর্যে তাহাকে বেশ মানাইতেছে।
যুরারা ইবন 'আমর বলেন, আমি আরও দেখিলাম, একটি দীর্ঘকেশী বৃদ্ধা ভূগর্ভ হইতে উত্থিত হইল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা হইতেছে আরব ছাড়া অন্যান্য দেশের অবস্থা। তিনি বলিলেন, আমি আরও দেখিলাম, ভূগর্ভ হইতে একটি অগ্নিশলাকা বাহির হইয়া তাহা আমার এবং আমার পুত্র 'আমরের মধ্যে অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা হইতেছে পরবর্তীকালে প্রকাশমান ফিতনা বা বিপর্যয়। যুরারা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি সেই ফিতনা, হে আল্লাহর রাসূল? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, লোকেরা তাহাদের ইমামকে হত্যা করিবে। মুসলমানরা পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হইবে। একজন মুসলমানকে হত্যা করা অপর মুসলমান পানি পান করার মত স্বাভাবিক মনে করিবে। যদি তোমার পুত্র প্রথমে মারা যায় তাহা হইলে তুমি তাহা প্রত্যক্ষ করিবে। আর যদি তুমি ইন্তিকাল কর তাহা হইলে তোমার পুত্র সেই ফিতনা প্রত্যক্ষ করিবে।
যুরারা সেই ফিতনা না দেখার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট দু'আ চাহিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জন্য দু'আ করিলেন এবং তিনি কিছু দিন পর ইন্তিকাল করিলেন। কিন্তু তাহার পুত্র হযরত 'উছমান ইব্ন আফ্ফান (রা)-এর বিরোধী দলে যোগদান করিয়াছিল (প্রাগুক্ত, সিয়ার, পৃ. ৪৬৯-৭০)।
'উমায়র ইব্ন ওয়াহ্ত্ব যখন বদর যুদ্ধে অনেক মুশরিকের নিহত হওয়ার পর মক্কায় ফিরিয়া গেল, তখন সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সাথে হিজরে আসিয়া বসিল। সে বলিল, সাফওয়ান! যুদ্ধে নিহতদের পরে আমাদের বাঁচিয়া থাকার প্রতি ধিক্কার। সাফওয়ান বলিল, বাস্তবিকই এমন পরাজয়ের পর বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কোন আনন্দ নাই। 'উমায়র আরও বলিল, যদি আমার ঘাড়ে ঋণের বোঝা না থাকিত, যাহা আদায় করার কোন উপায় আমার নাই এবং সন্তানাদি না থাকিত যাহাদের জন্য আমার পরে কোন সম্পদ নাই, তবে আমি যাইয়া মুহাম্মাদকে হত্যা করিতাম। যদি তুমি আমাকে আমার সন্তানাদি ও ঋণের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করিতে পার, তবে আমার জন্য মুহাম্মাদের নিকট একটি বাহানা করার সুযোগও আছে। আমি তাঁহাকে বলিব, আমি আমার বন্দীকে মুক্ত করার জন্য আসিয়াছি। 'উমায়রের এইসব কথা শুনিয়া সফওয়ান খুবই প্রীত হইল। সে বলিল, আচ্ছা তোমার ঋণ আমার যিম্মায় এবং তোমার সন্তানদের ভরণ-পোষণ আমার দায়িত্বে রহিল।
অতঃপর সফওয়ান তাহাকে সওয়ারীর উট দিল, সকল প্রকার সাজ-সরঞ্জাম দ্বারা সজ্জিত করিল এবং আদেশ করিল যে, 'উমায়রের তরবারি শান দিয়া তাহাতে বিষ মিশ্রিত করিয়া দেওয়া হউক। অতঃপর 'উমায়র রওয়ানা হইয়া মদীনায় পৌঁছিল। সে মসজিদের দরজায় আসিয়া উট হইতে নামিল। উট বাঁধিয়া তরবারি নিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে চলিল। হযরত 'উমর (রা) তাহাকে দেখিয়া ফেলিলেন। তিনি তখন আনসারদের সহিত কথাবার্তা বলিতেছিলেন। 'উমায়রকে তিনি বলিলেন, এই সেই কুকুর, আল্লাহ্র দুশমন তোমাদের সম্মুখে আসিয়াছে। সে বদরে আমাদের সহিত যুদ্ধের চক্রান্ত করিয়াছিল এবং আমাদের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপাইয়া তুলিয়াছিল।
অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) 'উমায়রকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কী উদ্দেশ্যে আগমন করিয়াছ? সে বলিল, আপনার নিকট আমার এক লোক বন্দী আছে। আপনি আমার নিকট হইতে ইহার মুক্তিপণ গ্রহণ করুন। আপনি আমাদের গোত্রের ও পরিবারেরই লোক। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে তোমার ঘাড়ে এই তরবারি ঝুলিতেছে কেন? 'উমায়র বলিল, এই তরবারির সর্বনাশ হউক- বদর যুদ্ধে ইহা আমাদের কি উপকার করিতে পারিয়াছে? সওয়ারী হইতে নামার সময় আমি ভুলক্রমে ইহা ঝুলন্ত অবস্থায় লইয়া আসিয়াছি।
রাসূলুল্লাহ (স) আবার বলিলেন, সঠিক করিয়া বল, তুমি কেন আসিয়াছ? সে বলিল, আমি তো কেবল আমার বন্দীর মুক্তিপণ দেওয়ার জন্যই আগমন করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, তুমি হিজর নামক স্থানে বসিয়া সাফওয়ানের সহিত কী পরামর্শ করিয়াছিলে? এই কথা শুনিয়া সে হতভম্ব হইয়া বলিল, আমি কোন ব্যাপারে পরামর্শ করি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি এই ব্যাপারে পরামর্শ করিয়াছিলে যে, তুমি আমাকে হত্যা করিবে এবং সাফওয়ান তোমার সন্তানদের ব্যয়ভার বহন করিবে এবং তোমার ঋণ পরিশোধ করিবে। আল্লাহ তা'আলা আমার ও তোমার এই সংকল্পের মাঝখানে অন্তরায়। অতএব তুমি আমাকে হত্যা করিতে পারিবে না। এই কথা শুনিয়া 'উমায়র তৎক্ষণাৎ কলেমা শাহাদাত পাঠ করিল এবং বলিল, নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। আমরা ওহী ও আকাশ হইতে আগত সকল বিষয়কে মিথ্যা বলিতাম। কিন্তু হিজর নামক স্থানে বসিয়া আমার ও সাফওয়ানের মধ্যে যে কথাবার্তা হইয়াছিল, তাহা আমরা দুইজন ব্যতীত আর কেহই জানিত না। সুতরাং ইহা নিশ্চিত যে, আল্লাহ তা'আলাই আপনাকে এই সংবাদ অবগত করাইয়াছেন (তরজমানুস সুন্নাহ্, ৪খ., পৃ. ২২৫-২৬)।
ইবন সা'দ হযরত ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, পারস্য-রাজের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-এর পত্র পৌঁছিলে সে ইয়ামানের গভর্ণর বাযানকে নির্দেশ প্রেরণ করিল যে, দুইজন শক্তিশালী ব্যক্তিকে এই লোকের নিকট পাঠাইয়া তাহাকে গ্রেফতার করিয়া আমার নিকট নিয়া আসিবে। সেই মুতাবিক বাযান একটি পত্রসহ দুই ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট প্রেরণ করিল। পত্র পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিলেন এবং তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাহাদের স্কন্ধদেশ কাঁপিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আগামী কাল তোমরা উভয়ে আমার নিকট আসিবে। আমি আমার সিদ্ধান্ত তোমাদেরকে জানাইয়া দিব। পরের দিন সকালবেলা তাহারা উপস্থিত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা তোমাদের প্রভু বাযানকে এই সংবাদ পৌছাইয়া দাও যে, আমার রব আল্লাহ্ বাযানের রব পারস্য-রাজকে গত রাতের সপ্তপ্রহর অতিক্রান্ত হওয়ার পর হত্যা করিয়াছেন এবং তাহার পুত্র শেরওয়াঁকে তাহার উপর চাপাইয়া দিয়াছেন। সে পিতাকে হত্যা করিয়াছে। তাহারা উভয়ে বাযানের নিকট এই সংবাদ পৌঁছাইয়া দিল। বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়া বাযান ও ইয়ামানের লোকজন ইসলামে দীক্ষিত হইলেন (আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১০)।
বায়হাকী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) একজন সাহাবীকে জনৈক মুশরিক সরদারের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। মুশরিক সরদার বলিল, যেই আল্লাহ্ দিকে আপনি আমাকে দাওয়াত দিতেছেন, তিনি সোনার তৈরী, না রূপার তৈরী, না পিতলের তৈরী? এই কথা শুনিয়া সাহাবী ফিরিয়া আসিলেন। আল্লাহ তা'আলা আকাশ হইতে বজ্রপাতের মাধ্যমে সেই মুশরিককে জ্বালাইয়া ভস্মীভূত করিয়া দেন। দূত সাহাবী তখনও পথিমধ্যে ছিলেন এবং তিনি এই সম্পর্কে কিছুই জানিতেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়া দিলেন যে, সেই মুশরিক ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪)।
বায়হাকী ও আবূ নু'আয়ম বর্ণনা করেন যে, 'উরওয়া ইব্ন মাস'উদ ছাকাফী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। অতঃপর তিনি আপন সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সেখানে গেলে তাহারা তোমাকে হত্যা করিবে। অন্য এক হাদীছে রহিয়াছে, তাহারা তোমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিবে। 'উরওয়া বলিলেন, এইরূপ আশংকা নাই। কারণ তাহারা আমাকে অত্যন্ত সমীহ করে। তাহারা আমাকে নিদ্রিত পাইলেও জাগ্রত করিবে না। তাহার পর 'উরওয়া আপন সম্প্রদায়ের নিকট চলিয়া গেলেন। তাহাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তাহারা মানিল না। তিনি তাহাদেরকে শাস্তির কথা শুনাইলেন। ইহাতেও কাজ হইল না।
একদিন তিনি গাত্রোত্থান করিলেন, সুবহে-সাদেক উদিত হইল, তিনি আপন কক্ষে নামাযের জন্য আযান দিলেন এবং কলেমা শাহাদাত পাঠ করিলেন। জনৈক ছাকাফী তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া তীর নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে হত্যা করিলেন। 'উরওয়ার শাহাদাতের সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলে তিনি বলিলেন, উরওয়ার দৃষ্টান্ত ইয়ামীন (আ)-এর সঙ্গীর অনুরূপ। তিনিও তাঁহার কওমকে আল্লাহর দিকে আহবান করার ফলে নিহত হইয়া ছিলেন। এক রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, তীর লাগার পর 'উরওয়া বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তিনি আমাকে পূর্বেই বলিয়াছিলেন, তোমার সম্প্রদায় তোমাকে হত্যা করিবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪)।
আবূ ইয়া'লা ও বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কেরামের সহিত কথাবার্তার মাঝে ইরশাদ করিলেন, এই দিক হইতে একটি প্রতিনিধি দল আগমন করিবে, তাহারা পূর্ব দিকের সকল লোকজনের মধ্যে উত্তম। হযরত 'উমর (রা) মজলিস হইতে উঠিয়া সেই দিকে রওয়ানা হইলেন। তিনি তেরজন উষ্ট্রারোহীর দেখা পাইলেন। তিনি তাহাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিল, আমরা বানু আবদুল কায়সের লোক (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৬)।
ইবন সা'দ উরওয়া হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদিন সকালে দিগন্তের পানে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন, উষ্ট্রারোহীদের একটি দল পূর্ব দিক হইতে আগমন করিয়াছে। তাহারা ইসলামের প্রতি অনিহা প্রকাশ করিবে না। এই দীর্ঘ দুর্গম পথ অতিক্রম করিতে যাইয়া তাহারা তাহাদের উটগুলিকে শীর্ণকায় করিয়া ফেলিয়াছে। অনেক পাথেয় নিঃশেষ করিয়া ফেলিয়াছে। তাহাদের সরদারের একটি আলামত রহিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের জন্য বলিলেন, হে আল্লাহ! আবদুল কায়সকে ক্ষমা কর। তাহারা আমার নিকট দুনিয়া অন্বেষণ করিতে আসে নাই। তাহারা পূর্ব দিককার সর্বোত্তম মানুষ। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ ব্যক্তি আগমন করিলেন। তাহাদের সরদার ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আওফ আল-আশাজ্জ। রাসূলুল্লাহ (স) তখন মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। তাহারা আসিয়া তাঁহাকে সালাম করিলে তিনি জওয়াব দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইব্ন 'আওফ আল-আশাজ্জ কে? তিনি আরয করিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৬)।
হাকেম হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, হিজরের অধিবাসী বানু 'আবদুল কায়স রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলে কথা বলিতে বলিতে রাসূলুল্লাহ (স)-ইরশাদ করেন, তোমাদের দেশে অমুক ধরনের খেজুর রহিয়াছে, যাহার নাম তোমাদের নিকট এই, আর অমুক প্রকারের খেজুর আছে যাহার নাম এই। এইভাবে তিনি হিজরের সকল প্রকার খেজুরের প্রচলিত নামসহ উল্লেখ করিলেন। প্রতিনিধি দলের এক ব্যক্তি বলিলেন, আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উৎসর্গ ইউক। যদি আপনি হিজরে জন্মগ্রহণ করিতেন তাহা হইলেও সেখানকার খেজুর সম্পর্কে আপনার জ্ঞান ইহার চেয়ে বেশি হইত না যাহা এখন রহিয়াছে। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই স্থানে তোমাদের উপস্থিতির সময় তোমাদের ভূখণ্ড আমাকে দেখানো হইয়াছে এবং আমি সব কিছুই দেখিয়া লইয়াছি। তোমাদের এক প্রকার খেজুর আছে বরনী যাহা অসুখ-বিসুখে ফলপ্রদ (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৬)।
বায়হাকীর বর্ণনায় ওয়াইল ইবন হুজর (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সংবাদ অবগত হই। অতঃপর আমি তাঁহার খেদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য যাত্রা করিলাম। আমি সেখানে উপস্থিত হইলে সাহাবীগণ বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তোমাদের আগমনের সংবাদ তিন দিন পূর্বেই আমাদিগকে জানাইয়াছেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২২)।
মা'মার বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দু'আ করিলেন, হে আল্লাহ্। নৌকারোহীদেরকে প্রাণে রক্ষা করুন। কিছুক্ষণ পর তিনি বলিলেন, নৌকা পার হইয়া গিয়াছে। ইহার পর বলিলেন, তাহারা আসিতেছে। তাহাদেরকে একজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নিয়া আসিতেছে। এই নৌকারোহীরা ছিল আশ'আরী গোত্র এবং তাহাদিগকে যিনি নিয়া আসিতেছিলেন, তিনি ছিলেন আমর ইবন হুমুক আল্-খুযাযী। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কোথা হইতে আসিয়াছ? আমর বলিলেন, আমরা যাবীদ হইতে আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের জন্য বরকতের দু'আ করিলেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২২)।
ইবন সা'দ বর্ণনা করেন, তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তনের পর দারী গোত্রের দশ ব্যক্তির একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিল। তাহাদের মধ্যে তামীম আদ-দারীও ছিলেন। তাহাদের সকলেই মুসলমান হইয়া গেলেন। তামীম আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল। আমাদের প্রতিবেশী রোমকদের দুইটি গ্রাম রহিয়াছে- একটি জরী ও অপরটি বায়াতে আয়নূল। যদি আল্লাহ তা'আলা আপনাকে শামে বিজয় দান করেন, তাহা হইলে এই দুইটি গ্রাম আমাকে প্রদান করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই দুইটি গ্রামই তোমার। অতঃপর তিনি তামীমের নামে গ্রাম দুইটি লিখিয়া দিলেন। হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফতকালে শাম বিজিত হইলে তিনি গ্রাম দুইটি তামীমকে দিয়া দেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২৭)।
খারাইতীর রিওয়ায়াতে সা'ঈদ ইব্ন্ন জুবায়র বর্ণনা করেন, বানু তামীমের রাফি' ইব্ 'উমায়র বলিয়াছেন, আমি এক রাতে বালুকাময় ভূমিতে সফরে ছিলাম। নিদ্রা আসিলে আমি বলিলাম:
أَعُوذُ بِعَظِيمِ هَذَا الْوَادِي مِنَ الْجِنِّ . "আমি এই উপত্যকা প্রধানের নিকট জিন হইতে আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি”। হঠাৎ এক বৃদ্ধ জিন আমার সামনে আসিয়া বলিল, তুমি যখন কোন ভয়ংকর মরু ভূমিতে যাইবে তখন বলিরে : أَعُوذُ بِاللهِ رَبِّ مُحَمَّدٍ مِّنْ هذا الوادي . ""আমি মুহাম্মাদের রব আল্লাহ্র নিকট এই উপত্যকার জিন হইতে আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি"। কেননা জিনদের শাসন বাতিল হইয়া গিয়াছে। আমি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এই মুহাম্মাদ কে? সে বলিল, তিনি আরবের নবী। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কোথায় থাকেন? সে বলিল, ইয়াছরিবে। এই কথা শুনিয়া আমি উটে আরোহণ করিয়া মদীনার পথে চলিলাম। সেইখানে পৌঁছিলে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে দেখিয়া ইতোপূর্বেই ঘটনা বলিয়া দিলেন। আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আমি ইসলাম গ্রহণ করিলাম (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৩৩)।
ইবন মান্দা ও ইব্ন 'আসাকির বর্ণনা করেন, আবূ সুফরা নবী করীম (স)-এর নিকট বায়'আতের উদেশ্যে আগমন করিলেন। তাহার পরনে ছিল হলদে রঙের মূল্যবান বস্ত্রজোড়া। সে আঁচল টানিয়া টানিয়া অহংকারভরে আসিতেছিল। সে ছিল সুন্দর, দীর্ঘদেহী, গম্ভীর ও স্পষ্টভাষী। নবী করীম (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কে? সে বলিল, আমি কাতি' (ছিন্নকারী) ইব্ন সারিক (চোর) ইবন জালিম (অত্যাচারী)। আমার পিতামহ ছিলেন জুলান্দী। তিনি নৌকা ছিনতাই করিতেন। আমি বাদশাহ এবং শাহযাদা। এমন অদ্ভুত পরিচয় শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কেবল আবূ সুফরা। সারেক, জালিম ইত্যাদি উপাধি পরিত্যাগ কর। সে বলিল, আমি সাক্ষ্য দিতেছি, আপনি আল্লাহর সত্য রাসূল। আমার আঠারো সন্তান। সর্বশেষ সন্তানটি কন্যা যাহার নাম আমি সুফরা রাখিয়াছি (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৩৩)।
হাযেম ইবন আওস ইবন হারিছা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাবুক হইতে প্রত্যাবর্তন করিলেন তখন আমি তাঁহার নিকট হিজরত করিলাম। তিনি বলিলেন, হীরা এলাকা আমার সামনে তুলিয়া ধরা হইয়াছিল। আমি শায়মা বিনতে নুফায়লাকে সাদা খচ্চরের উপর সওয়ার দেখিতে পাইতেছি। সে কাল ওড়না পরিহিতা। আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! হীরা যদি জয় করি আর শায়মাকে যদি ঐ অবস্থায় পাই, তবে শায়মা আমার হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, তাহাই হইবে।
ইহার পর হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিলাফতকালে আমরা মুসায়লামা কায্যাবের বিরুদ্ধে অভিযান সমাপ্ত করিয়া হীরায় আগমন করিলাম। হীরায় সর্বপ্রথম আমরা শায়মা বিনতে নুফায়লাকে পাইলাম। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী শায়মা কাল ওড়না পরিহিতা অবস্থায় খচ্চরের উপর সওয়ার ছিল। আমি তাহাকে জড়াইয়া ধরিলাম। আমি বলিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) এই মহিলা আমাকে দান করিয়াছেন। খালিদ ইবন ওয়ালীদ তাহার পক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করিতে বলিলেন। আমি মুহাম্মাদ ইবন সালামা ও মুহাম্মাদ ইবন বিশর আনসারীদ্বয়কে সাক্ষীস্বরূপ পেশ করিলাম। অতঃপর খালিদ শায়মাকে আমার হাতে সোপর্দ করিলেন। শায়মার ভাই আসিয়া বলিল, শায়মাকে আমার নিকট বিক্রয় করিয়া দাও। আমি বলিলাম, ইহার মূল্য এক হাজার দিরহাম। সে আমাকে এক হাজার দিরহামই দিল। লোকেরা বলিল, তুমি এক লাখ দিরহাম চাহিলে শায়মার ভাই তাহাই দিত। আমি বলিলাম, দশ শতকের বেশি গণনা আমি জানি না (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১০৯)।
'আওফ ইবন মালিক আশজাঈ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, তোমরা জানিয়া রাখ, কিয়ামতের পূর্বে ছয়টি বিষয় সংগঠিত হইবে। তন্মধ্যে আমার ওফাত, বায়তুল মাকদিস বিজয়, ইহার পর দুইটি মৃত্যু, যেমন ছাগলের কিয়াছ রোগ হয় আর মরিয়া যায়। ইহার পর দৌলতের এত প্রাচুর্য হইবে যে, এক ব্যক্তি একশত দীনার পাইয়াও সন্তুষ্ট হইবে না। ইহার পর একটি ফিতনা আসিবে এবং আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করিবে। ইহার পর তোমাদের ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সন্ধি হইবে এবং শেতাঙ্গরা তোমাদের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিবে, অবশেষে নারীর গর্ভ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতা করিবে। 'আমওয়াস দুর্ভিক্ষের বছরে 'আওফ ইবন মালিক মু'আযকে বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিয়াছেন, তুমি ছয়টি বিষয় গণনা কর। তন্মধ্যে তিনটি হইয়া গিয়াছে, আর বাকী আছে তিনটি। এ তিনটি বিষয়ের জন্য দীর্ঘ সময় বাকী আছে (প্রাগুক্ত, ২খ., ১১০)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) উম্মে হারামের বাড়িতে আসিলেন এবং ঘুমাইয়া পড়িলেন। অতঃপর যখন জাগ্রত হইলেন, তখন তাহার মুখে ছিল মুচকি হাসি। উন্মে হারাম আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি হাসিতেছেন কেন? তিনি বলিলেন, আমার উম্মতের অবস্থা আমার সামনে পেশ করা হইয়াছিল। যাহারা আল্লাহর পথে জিহাদ করিবে তাহারা সমুদ্রের মধ্যে থাকিবে এবং স্বীয় সম্প্রদায়ের শাসক হইবে। উম্মে হারাম বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য দু'আ করুন, আল্লাহ যেন আমাকে তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি উম্মে হারামের জন্য দু'আ করিলেন। উহা বাস্তবায়িত হইয়াছিল হয়ত 'উছমান (রা)-এর শাসনামলে। উম্মে হারাম ও তাহার স্বামী 'উবাদা ইবনুস সামিতের সুহিত গাযীরূপে সমুদ্রে গমন করেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১১)।
'আবদুল্লাহ ইবন হানযালা (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বসিয়া আমাদের অভাব-অনটনের কথা আলোচনা করিতেছিলাম। এমন সময় তিনি বলিলেন, শুভসংবাদ শুনিয়া রাখ। আল্লাহ্র কসম। আমি তোমাদের জন্য দ্রব্যাদির স্বল্পতার চেয়ে আধিক্যের ভয় বেশি করিতেছি। পারস্য, রোম, ও হিময়ার জয় করা পর্যন্ত তোমাদের বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকিবে। তোমাদের তিনটি বড় বাহিনী হইবে। একটি সিরিয়ায়, একটি ইরাকে ও একটি ইয়ামানে থাকিবে। তোমাদের স্বাচ্ছন্দ্য এমন হইবে যে, এক ব্যক্তিকে দুই শত দিরহাম কিংবা দীনার দেওয়া হইলে সে ইহাকে কম মনে করিয়া নারাজ হইবে। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সিরিয়া কিরূপে বিজিত হইবে। সিরিয়া তো রোমকদের করতলগত। সেখানে তাহাদের বড় বড় নেতা রহিয়াছে। তিনি বলিলেন, সিরিয়া অবশ্যই বিজিত হইবে। সেখানে তোমরাই খলীফা হইবে। তোমাদের পদাতিক বাহিনীর কৃষ্ণকায় ব্যক্তির আশেপাশে শ্বেতাঙ্গদের প্রচণ্ড ভিড় থাকিবে এবং তাহারা তোমাদের আদেশের প্রতীক্ষা করিবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১২)।
আবদুল্লাহ ইব্ন বুস্র বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সেই সত্তার কসম যাঁহার হস্তে আমার প্রাণ! পারস্য ও রোম অবশ্যই বিজিত হইবে। ফলে খাদ্যসামগ্রীর প্রাচুর্য হইবে, কিন্তু আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হইবে না। অর্থাৎ খাদ্য আল্লাহর নাম নিয়া খাইবে না (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১১)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, যখন আমার উম্মত গর্বভরে চলিবে এবং পারস্য ও রোমের অধিবাসীরা তাহাদের খাদেম হইবে, তখন তাহাদের দুষ্টরা সৎ ব্যক্তিদের উপর, মন্দ ব্যক্তিরা ভাল ব্যক্তিদের উপর প্রাধান্য লাভ করিবে (খাসাইসুল-কুবরা, ২খ., পৃ. ১১১)।
'উরওয়া ইবন মালেক (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) সাহাবায়ে কিরামের মাঝে দাঁড়াইয়া বলিলেন, তোমরা দারিদ্র্যের ভয় কর, অথচ আল্লাহ তা'আলা পারস্য ও রোম তোমাদের অধীন করিয়া দিবেন। তখন ধন-সম্পদের প্রাচুর্য হইবে। আমার পরে ধন-সম্পদ তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করিবে।
'আমর ইবন শুরাহবীল বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, আজ রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখিয়াছি যেন কালো ছাগলের পাল আমার পিছনে পিছনে আসিতেছে। ইহার পশ্চাতে সাদা ছাগলের পাল আসিল। ফলে কালো ছাগলের পাল আর দৃষ্টিগোচর হইল না। হযরত আবূ বকর (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কালো ছাগলের পাল হইতেছে আরবের বাসিন্দা, যাহারা আপনার অনুসারী হইবে। ইহার পর অনারবরা আপনার অনুসরণ করিবে, তাহাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে আরবরা 'ভাঁহাদের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া যাইবে। রাসূলুল্লাহ (স) এই কথার সমর্থনে বলিলেন, নিঃসন্দেহে এইরূপই হইবে। (খাসায়েসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১২)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, বনী ইসরাঈলের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশুনা পয়গাম্বরগণ করিতেন। এক পয়গাম্বরের ওফাত হইলে অন্য পয়গাম্বর আসিতেন। কিন্তু আমার পরে আর কোন নবী নাই। আমার 'পরে অনেক খলীফা হইবে। সাহাবীগণ আরয করিলেন: আপনি তাহাদের সম্পর্কে আমাদের কি আদেশ দেন? ক্রমানুসারে তাহাদের প্রতি বায়'আত পূর্ণকর এবং তাহাদের হক আদায় কর। তাহাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৩)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমার পরে এমন খলীফা হইবে তাহারা যাহা জানিবে, তাহা করিবে এবং সেই বিষয়ের প্রতি তাহাদিগকে আদেশ প্রদান করা হইয়াছে যাহা তাহারা নিজেরাও করিবে। তাহাদের পরে এমন খলীফা হইবে, তাহারা যাহা জানিবে না, তাহা করিবে এবং যে কাজ তাহাদেরকে করিতে বলা হয় নাই, তাহা তাহারা করিবে। হযরত আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অনেক অপ্রিয় ঘটনা ঘটিবে যাহা তোমরা পছন্দ করিবে না। সাহাবীগণ বলিলেন, আমাদের কেহ যদি এমন অবস্থায় সম্মুখীন হয় তাহা হইলে সে কী করিবে? তিনি বলিলেন, তোমরা তাহাদের প্রাপ আদায় করিবে এবং আল্লাহর নিকট তোমাদের প্রাপ্য অনুসন্ধান করিবে (উপরিউক্ত বর্ণনাগুলির জন্য আল-খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১১-১১৪)।
'ইরবাদ ইবন সারিয়া বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন, যাহা শুনিয়া আমাদের মন বিগলিত হইয়া গেল, চোখে অশ্রু প্রবাহিত হইল। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ। এই উপদেশ তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশের মত। আপনি আমাদের হইতে কি অঙ্গীকার লইতে চাহেন? তিনি বলিলেন, আমি তোমাদেরকে, ওসিয়াত করিতেছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করিবে। কোন হাবশী গোলাম তোমাদের আমীর হইলে তোমরা তাহার আনুগত্য করিবে। তোমাদের মধ্যে যে জীবিত থাকিবে সে অনেক মতবিরোধ দেখিবে তোমরা বিদ'আতী কাজকে ভয় করিবে। কেননা উহা পথভ্রষ্টতা। যেই ব্যক্তি এইসব বিষয় পাইবে, তাহার উপর আমার ও আমার খলীফাগণের সুন্নত পালন করা ওয়াজিব। এই সুন্নতের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকিবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৪)।
হযরত সফীনা (রা) বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) মসজিদে নববীর নির্মাণ শুরু করিলে হযরত আবু বকর (রা) একটি পাথর বহন করিয়া আনিলেন এবং সেইটি স্থাপন করিলেন। হযরত 'উমার (রা)-ও একটি পাথর আনিলেন এবং তাহা স্থাপন করিলেন। অতঃপর হযরত 'উছমান (রা) পাথর আনিয়া স্থাপন করিলেন। নবী করীম (স) বলিলেন, ইহারা আমার পরে শাসক হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ, পৃ. ১১৪)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমি স্বপ্নে দেখিয়াছি যে, আমি শক্তিশালী ছাগলকে পানি পান করাইতেছি। ইহার পর যুবক ছাগলও ইহাদের সহিত শামিল হইল। ইহার পর আবু বকর আসিল সে এক অথবা দুই বালতি পানি তুলিল। তাহার মধ্যে দুর্বলতা ছিল। ইহার পর 'উমার আসিয়া বালতি হাতে নিতেই বালতি বৃহদাকার ধারণ করিল। সে তৃপ্তি সহকারে সকল মানুষ ও ছাগলকে পানি পান করাইল। ছাগলগুলিও পানি পান করিয়া প্রস্থান করিল। রাসulullah (s) Irshad karein, Is sapne ka tabeer yahī hai ki taqatwar bakriya Arab ke log hain aur naujawan bakriya anarabi hain. Imam Shafii (r) farmate hain, nabiyon ka khwab wahī hota hai. Hazrat Abu Bakr (r) ki kamzori ka matlab hai unke hukumat ka mukhtasar hona aur jald hi unki wafat hona (pragukta, 2kh., p. 115).
হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ অবস্থায় আমাকে বলিলেন, তুমি তোমার পিতা ও ভ্রাতাকে ডাকিয়া আন। আমি আবু বকরকে একটি কাগজ লিখিয়া দিব। কারণ আমার আশংকা হয় যে, নানাজনে নানা কথা বলিবে এবং অনেকেই আশা করিবে। অথচ আল্লাহ তা'আলা কেবল আবূ বকরকে চাহেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৫)।
হয়ত আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমার পরে ১২জন খলীফা হইবে। আবূ বকর (রা) আমার পরে অল্প সময় থাকিবে। অতঃপর তিনি হযরত 'উমার (রা) সম্পর্কে বলেন, সে শহীদ হইবে। অতঃপর তিনি হযরত 'উছমান (রা)-কে বলেন, মানুষ তোমার সেই জামা খুলিয়া ফেলিতে চাহিবে যাহা আল্লাহ তোমাকে পরিধান করাইবেন। আল্লাহর কসম! তুমি সেই জামা খুলিয়া ফেলিলে জান্নাতে প্রবেশ করিতে পারিবে না, যে পর্যন্ত সুচের ছিদ্র দিয়া উট প্রবেশ না করিবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৫)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, বানু মুসতালিকের লোকেরা হযরত আনাসকে বলিলেন, আপনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করুন, আমরা আগামী বৎসর আসিয়া যদি তাঁহাকে না পাই তাহা হইলে যাকাতের অর্থ কাহাকে প্রদান করিব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহাদেরকে বলিয়া দাও, যাকাতের অর্থ আবু বকরকে প্রদান করিবে। আমি এই কথা তাহাদের নিকট পৌঁছাইয়া দিলাম। তাহারা বলিল, যদি আবু বকর (রা)-কে না পাই, তাহা হইলে কাহাকে দিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, 'উমার (রা)-কে দিবে। তাহারা আবার প্রশ্ন করিল, যদি 'উমার (রা)-কে না পাই তাহা হইলে কাহাকে দিব? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলিলেন, 'উছমানকে দিবে। যেই দিন 'উছমান শহীদ হইবে সেই দিন তোমাদের উপর বিপদ নামিয়া আসিবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৫)।
হযরত জাবির ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আলী (রা)-কে বলেন, তুমি আমীর ও খলীফা হইবে এবং শাহাদাত লাভ করিবে। তোমার দাড়ি তোমার মাথার রক্তে রঞ্জিত হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৫)।
ছাওর ইবন মাজযা (রা) বর্ণনা করেন, জামাল যুদ্ধে আমি যখন তালহার নিকট গেলাম, তখন তাহার মধ্যে সামান্য প্রাণ স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কোন দলের লোক? আমি বলিলাম, আমি হযরত 'আলী (রা)-এর সহচরগণের একজন। হযরত তালহা বলিলেন, হাত বাড়াও। আমি বায়'আত করিব। আমি হাত বাড়াইলে তিনি অঙ্গীকার করিলেন। সেই মুহূর্তেই তিনি শাহাদাত বরণ করিলেন। আমি ফিরিয়া আসিয়া এই ঘটনা হযরত 'আলী (রা)-কে বলিলাম। তিনি বলিলেন, আল্লাহু আকবার। রাসূলুল্লাহ (স) সত্যই বলিয়াছেন, "আমার বায়'আত গ্রহণ না করিয়া তালহা জান্নাতে যাইবে, ইহা আল্লাহ্র পছন্দ নয়" (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবু বকর, 'উমার, 'উছমান, 'আলী, তালহা ও যুবায়র (রা) সহ হিরা পাহাড়ে ছিলেন। এই সময় একটি বড় পাথর নড়িয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, হে পাথর! থামিয়া যাও, নড়াচড়া করিও না। তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও একজন শহীদ রহিয়াছে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১২৪)।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ, জা'ফর ও 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার শহীদ হওয়ার সংবাদ মদীনায় পৌছিবার আগেই মানুষকে জানাইয়া দেন যে, যায়দ পতাকা হাতে লইয়াছে এবং শাহাদাত বরণ করিয়াছে। তারপর জা'ফর পতাকা হাতে লইয়াছে এবং সেও শহীদ হইয়াছে। তারপর 'আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা হাতে নিয়াছে। সে শহীদ হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) যখন এই সংবাদ দিতেছিলেন, তখন তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রু প্রবাহিত হইতেছিল। অবশেষে খালিদ ইবন ওয়ালীদ এই পতাকা হাতে তুলিয়া নিল। সে আল্লাহ তা'আলার অন্যতম তরবারি। তাহার হাতেই আল্লাহ তা'আলা বিজয় দান করিয়াছেন (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব, গাযওয়া মৃতা মিন আরদিশ শাম, ২খ., পৃ. ৬১১)।
📄 উওয়ায়স আল-কারনী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
হযরত 'উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, ইয়ামানের জনৈক ব্যক্তি তোমাদের নিকট আসিবে। ইয়ামানে কেবল তাহার মাথা থাকিবে। তাহার শরীরে সাদা দাগ থাকিবে। ইহা দূর করার জন্য সে আল্লাহ তা'আলার নিকট দু'আ করিবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাহার সাদা দাগ দূর করিয়া দিবেন, কিন্তু এক দীনার পরিমাণ জায়গা সাদা থাকিবে। তাহার নাম হইবে উওয়ায়স। কেহ তাহার সহিত সাক্ষাৎ পাইলে তাহার উচিত হইবে তাহার দ্বারা নিজের মাগফিরাতের জন্য দু'আ করানো (খাসাইসুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১২৯)।
📄 আবূ যার (রা) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
উম্মু যার (রা) হইতে বর্ণিত আছে, হযরত আবূ যার (রা)-এর ওফাত সন্নিকটবর্তী হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুখ হইতে শুনিয়াছি, তিনি একদল লোক সম্পর্কে বলিলেন, (যাহাদের মধ্যে আমিও ছিলাম) তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তি জনমানবশূন্য প্রান্তরে মারা যাইবে। তাহার মৃত্যুর সময় একদল মুমিন উপস্থিত হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) যাহাদের সম্পর্কে এই কথা বলিয়াছিলেন, তাহারা সকলে বসতি এলাকায় ইন্তিকাল করিয়াছেন। এখন জনমানবশূন্য প্রান্তরে একমাত্র আমিই রহিয়া গিয়াছি। তুমি পথের দিকে দৃষ্টি রাখিও। আমি বলিলাম, এখন রাস্তায় কেহই নাই। কিছুক্ষণ পর আমি কিছু লোককে দেখিলাম। আমি কাপড় নাড়িয়া তাহাদেরকে ডাকিলাম। তাহারা আসিয়া আবু যারের নিকট দাঁড়াইল। তাঁহার ইন্তিকালের পর তাহার দাফনকার্য সমাধা করিয়া তাহারা চলিয়া গেল (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৩০)।
📄 উন্মু ওয়ারাকার শাহাদাতের খবর
হযরত উম্মু ওয়ারাকা বিনতে নাওফাল (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন বদর যুদ্ধে রওয়ানা হন তখন আমি আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকেও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি দিন, যাহাতে আল্লাহ পাক আমাকে শাহাদাত নসীব করেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি এখানেই থাক। এখানেই তোমার শাহাদাত নসীব হইবে। এজন্য উম্মু ওয়ারাকাকে শহীদ বলা হইত। তিনি কুরআন পাঠ করিতেছিলেন। তিনি একটি গোলাম ও একটি বাঁদীকে শর্তাধীনে মুক্ত করিয়াছিলেন। সেই গোলাম ও বাঁদী উভয়ে এক রাতে তাহাকে গলা টিপিয়া হত্যা করে। হযরত 'উমার (রা)-এর খিলাফত কালে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। খলীফার নির্দেশে তাহাদিগকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৩৪)।
হযরত হুযায়ফা (রা) বর্ণনা করেন, আমরা খলীফা উমার (রা)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি বলিলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই উক্তি স্মরণ রাখিয়াছ যাহা তিনি ফিতনা সম্পর্কে বলিয়াছিলেন? হুযায়ফা বলিলেন, আমি। অতঃপর তিনি বসিলেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন, মানুষ নিজের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও পাড়া-প্রতিবেশি সংক্রান্ত ব্যাপারে যে ফিতনায় নিপতিত হয়—সালাম, সাদাকা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ তাহার সেই পাপকে মোচন করিয়া দেয়। তিনি বলিলেন, আমি তোমাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি নাই। সেই ফিতনার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছি যাহা সাগরের তরঙ্গের ন্যায় প্রবাহিত হইবে। হুযায়ফা (রা) বলিলেন, হে আমীরুল মু'মিনীন। সেই ফিতনা আপনার কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না। কেননা সেই ফিতনা ও আপনার মাঝে একটি বন্ধ দরজা রহিয়াছে। 'উমার (রা) বলিলেন, দরজাটি কি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইবে, না খুলিয়া দেওয়া হইবে? তিনি বলিলেন, ভাঙ্গিয়া ফেলা হইবে। উমার (রা) বলিলেন, তাহা হইলে উহা আর বন্ধ করা যাইবে না। আমি বলিলাম, হাঁ। (শাকীক বলিলেন) আমরা হুযায়ফা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, উমার (রা) কি দরজাটি সম্পর্কে জানিতেন? তিনি বলিলেন, হাঁ (বুখারী, কিতাবুল ফিতনা, বাব, সমুদ্রের উর্মি মালার ন্যায় ফিতনা প্রকাশ পাইবে, ২খ., পৃ. ১০৫১)।
হযরত আয়উব ইব্ন বাশীর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) সফরে যাওয়ার পথে হারারায় পৌঁছিয়া ইন্নালিল্লাহ...... পাঠ করিলেন। সাহাবা কিরাম ইহার কারণ জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, তোমাদের পরে আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠ লোকগণ এই হাররায় নিহত হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪১)। বায়হাকী হাসান হইতে বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধে মদীনার লোকজনকে সমূলে হত্যা করা হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪১)।
হযরত মালেক ইব্ন আনাস (রা) বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধে সাত শত হাফিজে কুরআন শাহাদাত বরণ করেন। তাহাদের তিন শত ছিলেন সাহাবী। এই ঘটনা ইয়াযীদের শাসনামলে সংঘটিত হয়। বায়হাকী মুগীরা (রা) হইতে বর্ণনা করেন, মুসলিম ইবন 'উকবা তিনদিন পর্যন্ত মদীনায় লুণ্ঠন কার্য চালায় এবং এক হাজার কুমারীর ইষযত হরণ করে। লায়ছ ইবন সা'দ বর্ণনা করেন, হাররার যুদ্ধ ৬৩ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের তিন দিন বাকী থাকিতে বুধবার দিন সংঘটিত হয় (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪২)।
'উবাদা ইবন সামিত বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন; ভবিষ্যতে এমন শাসকবর্গ আসিবে, যাহারা দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকিয়া বিলম্বে নামায আদায় করিবে। তোমরা তাহাদের সহিত নফলস্বরূপ নামায আদায় করিবে। জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র) বলেন, ইহারা হইল বানূ উমায়্যার শাসকবর্গ। যাহারা বিলম্বে নামায পড়ার ব্যাপারে পরিচিত। অবশ্য খলীফা হযরত উমার ইব্ন আবদুল আযীযের আগমনের পর অবস্থায় পরিবর্তন হয়। তিনি যথা সময়ে নামায পড়ার রীতি প্রবর্তন করেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪২)।
'আবদুল মালিক ইবন উমায়র বর্ণনা করেন, বাশীর ইবন সা'দ আপন পুত্র নু'মান ইব্ন বাশীরকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এই পুত্রের জন্য দু'আ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে তোমার সমমর্যাদায় পৌঁছিবে। তাহার পর সে সিরিয়া যাইবে। সেখানকার মুনাফিকরা তাহাকে হত্যা করিবে। ইবন সা'দ মাসলামা ইবন মুহারিব হইতে বর্ণনা করেন, মারওয়ানের খিলাফাতকালে দাহ্হাক ইব্ন কায়স মারজ রাহিতে নিহত হন। সেই সময় নু'মান ইব্ন বাশীর হিম্স হইতে পলায়ন করিতে চাহিয়াছিলেন। তিনি তখন হিমসের গভর্নর ছিলেন। তিনি মারওয়ানের বিরোধিতা করিয়াছিলেন। হিমসবাসীরা তাঁহাকে খুঁজিয়া বাহির করে এবং হত্যা করে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আমার উম্মতের শেষ যুগে এমন লোক আসিবে যাহারা মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করিবে। এমন হাদীছ বর্ণনা করিবে, যাহা তোমরা এবং তোমাদের প্রবীণগণ কেহই শুনে নাই। তোমাদের উচিত এমন লোক হইতে বাঁচিয়া থাকা (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
ওয়াসিলা ইনুল 'আসকা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, কিয়ামত সংঘটিত হইবে না যে পর্যন্ত ইবলীস বাজারে ঘুরাফিরা করিয়া এই কথা প্রচার না করিবে যে, অমুকের পুত্র অমুক আমার নিকট এই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছে। হযরত ইবন মাস'উদ (রা) বর্ণনা করেন, শয়তান এক ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করিয়া মানুষের নিকট মিথ্যা হাদীছ বর্ণনা করিবে। ফলে মানুষ বিভক্ত হইয়া পড়িবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃঃ ১৪৩)।
ওয়ালীদ ইবন 'উকবা বর্ণনা করেন, মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসীরা তাহাদের শিশুদেরকে লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করে। তিনি শিশুদের মাথায় স্নেহের হাত বুলান এবং দু'আ করেন। আমার জননীও আমাকে লইয়া তাঁহার নিকট আসেন। আমার শরীরে সুগন্ধি মাখা ছিল। তিনি আমার মাথায় হাত বুলাইলেন না এবং স্পর্শও করিলেন না। বায়হাকী বলেন, ওয়ালীদের ব্যাপারে এই আচরণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভবিষ্যত জ্ঞানের ভিত্তিতেই হইয়াছিল। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ছিল যে, ওয়ালীদ এই বরকত হইতে বঞ্চিত থাকুক। 'উছমান (রা)-এর সময় তিনি গভর্নর ছিলেন। তিনি শরাব পান করিতেন এবং নামাযে বিলম্ব করিতেন। তাহার এইসব বদভ্যাসের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার সঙ্গে এইরূপ করিয়াছিলেন (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৪)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রত্যেকের একাত্তর ফিরকা কিংবা বাহাত্তর ফিরকা ছিল, আর আমার উম্মত তেহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হইবে। তাহারা প্রবৃত্তির পূজা করিবে। একটি ফিরকা ছাড়া সকলেই জাহান্নামে যাইবে। আমার অনুসারী জামা'আত জাহান্নামী হইবে না। আমার উম্মতের মধ্যে এমন সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করিবে, যাহারা খেয়াল-খুশীর অনুসরণে অতীত সম্প্রদায়সমূহের অনুগামী হইবে, যেমন কুকুর তাহার মনিবের অনুগামী হয়। এই উম্মতের শিরা-উপশিরায় কু-প্রবৃত্তি প্রবিষ্ট হইবে (প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৫)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামত কায়েম হইবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানগণ ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই না করিবে। মুসলমানগণ তাহাদিগকে হত্যা করিবে। তাহারা প্রস্তর অথবা বৃক্ষের আড়ালে আত্মগোপন করিলে প্রস্তর বা বৃক্ষ বলিবে, হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা! এই তো আমার পশ্চাতে ইয়াহুদী। তাহাকে হত্যা কর। গারকাদ নামক বৃক্ষ এই কথা বলিবে না, কারণ উহা হইতেছে ইহুদীদের বৃক্ষ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতুস-সা'আত, বাব লা তাকুমুস-সা'আতু হাত্তা তাআ'বুদু দাউসু জুলখালাসাত, ২খ., পৃ. ৩৯৬)।
হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, কিয়ামতের পূর্বে আবার লাত- 'উযযার পূজা আরম্ভ হইবে। এই কথা শুনিয়া আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে, তিনিই তাঁহার রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন হিদায়াত ও সত্য দীনসহ সকল দীনের উপর উহাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্য, যদিও মুশরিকরা উহা অপছন্দ করে। এই আয়াত নাযিলের পর আমি মনে করিয়াছিলাম, এই ওয়াদা পূর্ণ করা হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা অবশ্যই হইবে। তবে যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করিবেন ততদিন তাহা বলবৎ থাকিবে।