📄 জাবির (রা) ও তাঁহার স্ত্রীর ঘটনা
عن جابر بن عبد الله قال لما حفر الخندق رأيت برسول الله ﷺ خمصا شديدا فانكفيت الى امرأتي فقلت هل عندك شئ فانى رأيت برسول الله ﷺ خمصا شديدا فاخرجت الى جرابا فيه صاع من شعير ولنا بهيمة داجن فذهبتها وطحنت الشعير ففرغت الى فراغي وقطعتها في برمتها ثم وليت الى رسول الله ﷺ فقالت لا تفضحني برسول الله ﷺ وبمن معه فجئته فساررته فقلت يا رسول الله ذبحنا بهيمة لنا وطحنا صاعا من شعير كان عندنا فتعال انت ونفر معك فصاح النبي ﷺ فقال يا اهل الخندق ان جابرا قد صنع سُوْرًا فَحَيَّهَلاً بكم . فقال رسول الله ﷺ و لا تنزلن برمتكم ولا تخبزن عجينكم حتى اجئ فجئت وجاء رسول الله ﷺ يقدم الناس حتى جئت امرتى فقالت بك وباك فقلت قد فعلت الذي قلت فاخرجت له عجينا فبصق فيه وبارك ثم عمد الى برمتنا فبصك وبرك ثم قال ادع خابزة فلتخبز معك واقدحى من برمتكم ولا تنزلوها وهم الف فاقسم بالله لقد اكلوا حتى تركوه وانحرفوا وان برمتنا لتغط كما هي وان عَجِيْنَنَا لَيُخْبَرُ كما هو .
"হযরত জাবির (রা) বলেন, পরিখা খননের সময় আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখিয়াছি। আমি আমার স্ত্রীর নিকট আসিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমার নিকট কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখিয়াছি। তখন তিনি চামড়ার থলিয়া বাহির করিলেন যাহাতে প্রায় দুই কেজি পরিমাণ যব ছিল। আর আমাদের ছিল একটি গৃহপালিত দুগ্ধবতি ছাগল। আমি উহা যবেহ করিলাম এবং যবগুলি পিষিলাম। আমি অবসর থাকায় সে আমাকেও কিছু দায়িত্ব দিল। আমি যবেহ করা পশুটিকে টুকরা টুকরা করিয়া ডেকচিতে রাখিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট রওয়ানা হইলাম। স্ত্রী আমাকে বলিল, দেখিও, রাসূলুল্লাহ (স) এবং তাঁহার সঙ্গীদের দ্বারা আমাকে লজ্জিত করিও না। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া গোপনে তাঁহাকে বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের একটি দুম্বা আমরা যবেহ করিয়াছি। আর প্রায় দুই কেজি যব যা আমাদের ছিল সেইগুলি পিষিয়া আটা বানাইয়াছি। সুতরাং আপনি এবং আপনার সাথে কয়েকজনকে লইয়া আসুন। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) সজোরে বলিলেন, হে পরিখাবাসী! জাবির খাবার তৈরী করিয়াছে। তোমরা আস এবং তাড়াতাড়ি আস। রাসূলুল্লাহ (স) জাবিরকে বলিলেন, আমি না আসা পর্যন্ত ডেকচি চুলা হইতে নামাইবে না এবং রুটিও তৈরী করিবে না। জাবির (রা) বলেন, আমি ফিরিয়া আসিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) আসিলেন এবং লোকজনও আসিতে লাগিল। জাবির (রা) বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকট আসিলাম। সব শুনিয়া সে রাগ করিয়া বলিল, তুমি উৎসন্নে যাও, তোমার ধ্বংস হউক! আমি বলিলাম, আমি-তো তোমার কথা মতই কাজ করিয়াছি। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে খামীরগুলি পেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) উহাতে স্বীয় মুখের লালা মিশাইলেন এবং বরকতের জন্য দু'আ করিলেন। অতঃপর ডেকচির দিকে অগ্রসর হইলেন এবং উহাতেও মুখের লালা মিশাইলেন এবং বরকতের জন্য দু'আ করিলেন। তারপর বলিলেন, একজন রুটি প্রস্তুতকারিনীকে ডাক যে তোমার সহিত রুটি তৈরী করিবে এবং ডেকচি না নামাইয়া তরকারী পরিবেশন করিবে। লোকসংখ্যা ছিল এক হাজার। অতপর তিনি আল্লাহর নামে তাঁহাদের মাঝে খাদ্য বণ্টন করিয়া দিলেন। তাঁহারা খাইলেন, তারপরও খাদ্য অবশিষ্ট রহিয়া গেল। আর আমাদের ডেকচি আগের মতই টগবগ করতেছিল এবং আটা হইতে আগের মতই রুটি তৈরী হইতেছিল” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীছ নং ৪১০১, ৪১০২, পৃ. ৮৪৫; সুনান আদ-দারিমী, ১খ, পৃ. ২০; সহীহ মুসলিম, ৬খ., পৃ. ১১৭-১১৮, হাদীছ নং ৫৮৭৭, ৩খ., পৃ. ১৬৪৫)।
অপর একটি বর্ণনায় আসিয়াছে: عن جابر ان رجلا اتى النبي ﷺ يستطعمه فاطعمه شطر وسق شعير فمازال الرجل ياكل منه وإمرأته وضيفها حتى كاله فاتي النبي ﷺ فقال لولم تكله لا كلتم منه ولقام لكم .
"হযরত জাবির (রা) হইতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া কিছু খাবার প্রার্থনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে প্রায় ৬০ কেজি (অর্ধ ওয়াসাক) যব দিলেন। সে প্রতিদিন উহা হইতে নিজের জন্য, নিজের স্ত্রী এবং মেহমানের জন্য ব্যয় করিত। তারপরও উহাতে কোন কমতি হয় নাই। অবশেষে একদিন লোকটি অবশিষ্ট যবগুলি মাপিয়া দেখিল, ফলে বরকত কমিয়া গেল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হাজির হইয়া ঘটনা বর্ণনা করিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যদি তুমি উহা না মাপিতে তবে উহা হইতে তুমি চিরকাল খাইতে পারিতে এবং উহা তোমাদের জন্য স্থায়ী হইত" (সহীহ মুসলিম, ফাদাইল, ৭খ., পৃ. ৬০, নং ৯)।
খাদ্য বৃদ্ধির বর্ণনা অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে: عن ابي هريرة قال كنا مع رسول الله ﷺ في غزوة غزاها وهي غزوة تبوك فارمل فيها المسلمون واحتاجوا الى الطعام فاستاذنوا رسول الله ﷺ في نحر الابل فاذن لهم فبلغ ذلك عمر فجاء الى رسول الله ﷺ فقال يا رسول الله ﷺ ابلهم حملهم وتبلغهم علوهم ينهرونها ادع يا رسول الله عز وجل فيها بالبركة . قال اجل فدعا بنطع فبسط ثم دعا بفضل ازوادهم فجاء الناس بما بقى معهم فجمعت ثم دعا الله عز وجل فيها بالبركة ودعاهم باوعيتهم فملاءها وفضل كثير. فقال رسول الله ﷺ عند ذلك اشهد ان لا اله الا الله واشهد ان عبد الله ورسوله. ومن لقى الله عز وجل بها غير شاك دخل الجنة.
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এক যুদ্ধে ছিলাম। আর উহা ছিল তাবুকের যুদ্ধ। মুসলমানগণ সেই যুদ্ধে দারুণ অভাবে পড়িয়াছিল। ফলে তাহারা রাসূলুল্লাহ-এর নিকট সওয়ারীর পশু যবেহ করিবার অনুমতি চাহিল, আর রাসূলুল্লাহ (স) অনুমতিও দিলেন। এই সংবাদ হযরত উমার (রা)-এর নিকট পৌছিলে তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তাহাদের উট তাহাদিগকে বহন করিয়া থাকে এবং তাহাদিগকে উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করিয়া থাকে। অথচ আপনি তাহাদিগকে সেই উট যবেহ করিবার অনুমতি দিয়াছেন! ইয়া রাসূলাল্লাহ! বরং তাহাদিগের অবশিষ্ট পাথেয় চাহিয়া পাঠান এবং তাহাতে বরকতের জন্য দু'আ করুন। তিনি বলিলেন, হাঁ, তাহাই করা হইবে। অতঃপর সকলের অবশিষ্ট পাথেয় জমা করিতে আহবান করিলেন। তারপর লোকজন তাহাদের নিকট যাহা কিছু ছিল লইয়া আসিতে লাগিল। ফলে কিছু পাথেয় জমা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) উহাতে বরকতের জন্য দু'আ করিলেন এবং তাহাদিগকে তাহাদের পাত্রসমূহ লইয়া আসিতে আহবান করিলেন। তাহারা নিজেদের পাত্রসমূহ লইয়া আসিলেন এবং উহা হইতে পাত্র ভর্তি করিয়া লইলেন। তারপরও প্রচুর খাবার অবশিষ্ট রহিয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে, আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রাসূল। যে ব্যক্তি সন্দেহমুক্ত হইয়া আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎ করিবে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে” (অনুরূপ বর্ণনার জন্য দ্র. মুসলিম, ঈমান, বাব ১০, নং ১৩৯/৪৫; মিশকাত, হাদীছ নং ৫৯১২, ৩খ., পৃ. ৮৬৬, কিতাবুল ফাদাইল, বাবুন ফিল- মু'জিযাত; আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ৫৫৬-৭)।
অপর একটি বর্ণনায় অনুরূপ খাদ্য বৃদ্ধি কথা বর্ণিত হইয়াছে এইভাবে: عن ابي عبيد انه طبخ للنبي ﷺ قدرا فقال له ناولني الذراع . وكان يعجبه الذراع . فناوله الذراع ثم قال ناولني الذراع فناوله ذراعا ثم قال ناولني الذراع فقلت يا نبي الله وكم للشاة من ذراع فقال والذي نفسي بيده ان لو سكت لا عطيت اذرعا ما دعوت به .
"হযরত আবূ 'উবায়দ (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি নবী (স)-এর জন্য ডেকচিতে গোস্ত রান্না করিলেন। খাদ্য পরিবেশন করা হইল রাসূসুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, আমাকে সামনের পা দাও। রাসূলুল্লাহ (স) ছাগলের সামনের পা অত্যন্ত পছন্দ করিতেন। অতএব তাঁহাকে সামনের পা পরিবেশন করা হইল। অতঃপর তিনি তাহাকে বলিলেন, আমাকে সামনের পা দাও। তারপর তাঁহাকে আরেকটি সামনের পা পরিবেশন করা হইল। তিনি আবার বলিলেন, আমাকে সামনের পা দাও। তখন রাবী বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ছাগলের কয়টি সামনের পা থাকে? তিনি তাহাকে বলিলেন, সেই সত্তার শপথ যাঁহার হাতে আমার জীবন! তুমি যদি চুপ থাকিতে তাহা হইলে আমি যতবার সামনের পা চাহিতাম, তুমি ততবার সামনের পা দিতে সক্ষম হইতে” (সুনান আদ-দারিমী, ১খ., পৃ. ২২, হা. নং ৪৪)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে: عن أبي بعلاء سمرة بن جندب قال كنا مع النبى ﷺ ننتنا ول من قصعة من غدوة حتى الليل يقوم عشرة ويقعد عشرة قلنا فمما كانت تمد قال من اى شئ تعجب ما كانت تمد الا من ههنا واشار بيده الى السماء
"হযরত সামুরা ইব্ন জুনদুব (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট রক্ষিত একটি পাত্র হইতে সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্য গ্রহণ করিতেছিলাম। দশজন দাঁড়াইয়া আর দশজন বসিয়া অর্থাৎ যখন দশজন বসিয়া খাইতেন তখন অপর দশজন অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া থাকিতেন। আমরা বলিলাম, এক পাত্র খাবার এত বেশী হইতে পারে কি করিয়া? তিনি বলিলেন, তুমি কিসে আশ্চর্যবোধ করিয়াছ। বৃদ্ধি-তো হয় একমাত্র সেই মহান আল্লাহ হইতে। এই বলিয়া তিনি স্বীয় হাত দ্বারা আকাশের দিকে ইশারা করিলেন” (সুনান আদ-দারিমী, ১খ., পৃ. ৩০; মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ নং ৫৯২৮, ৩খ., পৃ. ১৬৬৭)।
অন্য একটি হাদীছে আসিয়াছে: عن انس قال كان رسول الله ﷺ عروسا بزينب فعمدت امى ام سلیم الى تمر وسمن واقط فصنعت حيسا فجعلته في تور فقالت یا انس اذهب بهذا الى رسول الله ﷺ فقل بعثت بهذا اليك امى وهى تقرئك السلام فقال رسول الله ﷺ ضعه ثم قال اذهب فادع لى فلانا فلانا وفلانا رجالا سماهم وادع لى من لقيت فدعوت من سمى ومن لقيت فرجعت فاذا البيت غاص باهله قيل لانس عددكم كم كانوا قال زهاء ثلاث مائة فرايت النبى ﷺ وضع يده على تلك الحيسة وتكلم بما شاء الله ثم جعل بدعو عشرة عشرة يأكلون منه ويقول لهم اذكروا اسم الله وليأكل كل رجل مما يليه قال فاكلوا حتى شبعوا فخرجت طائفة ودخلت طائفة حتى اكلوا كلهم قال لى يا انس ارفع فرفعت فما ادرى حين وضعت كان اكثر ام حين رفعت.
"হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যয়নবকে বিবাহ করেন। বিবাহ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমার মাতা উম্মু সুলায়ম (রা) খেজুর, ঘি ও পনিরযোগে হায়স (এক প্রকার মিষ্টি জাতীয় খাবার) তৈরি করিলেন এবং একটি থালায় রাখিলেন। তারপর আমাকে বলিলেন, হে আনাস! ইহা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যাও এবং বল, আমার মাতা ইহা আপনাকে দেওয়ার জন্য আমাকে পাঠাইয়াছেন এবং তিনি আপনাকে সালামও জানাইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, রাখো। তারপর বলিলেন, যাও, অমুক অমুককে আমার নিকট ডাকিয়া পাঠাও এবং তিনি তাহাদের নামও বলিয়া দিলেন। তিনি আরো বলিলেন, তাহা ছাড়া তোমার সহিত যাহাদের দেখা হইবে তাহাদিগকেও ডাকিয়া আনিবে। তারপর যাহাদের নাম বলা হইল এবং আমার সহিত সাক্ষাত হইল আমি তাহাদের দাওয়াত দিলাম। ইহার পর আমি ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম, বাড়ী ভর্তি লোকজন। আনাস (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল, তোমাদের সংখ্যা কত? তিনি উত্তর দিলেন, তিন শত প্রায়। আমি দেখিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় হস্ত উক্ত হায়সে রাখিলেন এবং কি যেন বলিলেন, ইহার পর দশজন দশজন করিয়া খাইতে আহবান করিলেন। সকলে উহা হইতে খাইল। তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, আল্লাহর নাম নিয়া প্রত্যেকেই নিজের সামনে রক্ষিত খাবার হইতে খাইবে। আনাস বলেন, সকলে খাইল এবং পরিতৃপ্ত হইল। এইভাবে সকলেই একের পর এক খাইয়া বাহির হইয়া গেল এবং কেহ অবশিষ্ট রহিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, হে আনাস! তুলিয়া রাখ। আনাস বলেন, আমি তুলিয়া রাখিলাম। আমি বুঝিতে পারিলাম না, খাবার যখন রাখা হইয়াছিল তখন অধিক ছিল না, তুলিয়া রাখা হইয়াছিল তখন অধিক ছিল” (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ নং ৫৯১৩, ৩খ., পৃ. ১৬৬১)।
অপর একটি বর্ণনায় আসিয়াছে: عن عبد الرحمن بن أبي بكر قال كنا مع رسول الله ﷺ ثلاثين ومائة . فقال النبى ﷺ هل مع احد منكم طعام فاذا مع رجل صاع من طعام أو نحوه فعجن . ثم جاء رجل مشرك مشعان طويل بغنم يسوقها فقال النبي ﷺ ابيع أم عطية او قال ام هبة قال لا بل بيع قال فاشترى منه شاة . فصنعت وامر رسول الله ﷺ بسواد البطن ان يشوى . قال ايم الله ما من الثلاثين ومائة الأحز له رسول الله ﷺ حزة حزة من سواد بطنها ان كان شاهدا اعطاه وان كان غائبا خبأها له وجعل فيها قصعتين . فاكلنا منها اجمعون وشبعنا وفضل في القصعتين . فحملته على البعير او كما قال
"হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবু বকর (রা) বলেন, আমরা এক শত ত্রিশজন লোক রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমাদের কাহারো নিকট খাবার আছে কি? দেখা গেল, এক ব্যক্তির নিকট এক সা (প্রায় ২ কেজি) পরিমাণ যব আছে অথবা এই জাতীয় অন্য কোন খাবার। তারপর উহা গুলিয়া খামীর তৈরী করা হইল। তারপর দীর্ঘদেহী, দীর্ঘকেশী এক মুশরিক একপাল ছাগল হাঁকাইয়া লইয়া আসিল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এইগুলি বিক্রয়ের, না কি উপঢৌকন অথবা দানের জন্য? সে বলিল না, বরং আমি উহা বিক্রয় করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট হইতে একটা ছাগল কিনিলেন। পরে উহা যবেহ করা হইল এবং টুকরা টুকরা করা হইল। রাসূলুল্লাহ (স) কলিজা ইত্যাদি ভুনা করিতে নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর কসম! তিনি এক শত ত্রিশজনের প্রত্যেককেই এক টুকরা করিয়া কলিজা ভুনা দিলেন। যাহারা উপস্থিত ছিল তাহাদিগকে তো দিলেনই আর যাহারা অনুপস্থিত ছিল তাহাদের জন্যও তুলিয়া রাখিলেন। তারপর দুই প্রকারের খাবার দুইটি পেয়ালায় রাখিলেন। আমরা প্রত্যেকেই তৃপ্তি সহকারে আহার করিলাম। তারপরও যথারীতি উভয় বেলায়ই পর্যাপ্ত খাবার অবশিষ্ট রহিয়া গেল। রাবী বলেন, আমি উহা উটের পিঠে তুলিয়া রাখিলাম অথবা রাবী যেমন বর্ণনা করিয়াছেন" (বুখারী, হাদীছ নং ৫৩৮২, পৃ. ১১৬৭; মুসলিম, ৬খ., পৃ. ১২৯-১৩০)।
অন্য একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে: عن انس ان ام سلیم امه عمدت الى مد من شعير جشته وجعلت منه خطيفة وعصرت عكة عندها ثم بعثتنى الى النبي الله فاتيته وهو في اصحابه فدعوته قال ومن معى فجئت فقلت انه يقول ومن معى فخرج اليه ابو طلحة قال يا رسول الله انما هو شيئ صنعته ام سليم فدخل فجئ به وقال ادخل على عشرة فدخلوا فاكلوا حتى شبعوا ثم قال ادخل على عشرة فد خلوا فا كلوا حتى شبعوا ثم قال ادخل على عشرة حتى عد اربعين ثم اكل النبى الله ثم قام فجعلت انظر هل نقص منها شيئ .
“হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত, তাহার মা উম্মে সুলায়ম এক মুদ্দ (প্রায় ১৮ লিটার) যব পিষিলেন এবং উহা দ্বারা খতীফা (দুধ ও আটা মিশ্রিত খাবার) তৈরী করিলেন। তারপর ঘি-এর পাত্র নিংড়াইয়া দিলেন। অতঃপর আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট পাঠাইলেন। আমি তাঁহার নিকট আসিলাম। তিনি সাহাবীদের মাঝে বসিয়াছিলেন। আমি তাঁহাকে দাওয়াত দিলাম। তিনি বলিলেন: আর যাঁহারা আমার সঙ্গে আছে? আমি বাড়ি আসিয়া বলিলাম, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার সঙ্গে যাহারা আছে? তারপর আবূ তালহা তাঁহার নিকট গিয়া বলিলেন, এতো সামান্য খাবার, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যাহা উম্মে সুলায়ম তৈরী করিয়াছে। তারপর তিনি আসিলেন, তাঁহার সামনে সেইগুলিই পেশ করা হইল। তিনি বলিলেন, দশজন করিয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দাও। তাহারা আসিয়া তৃপ্তি সহকারে খাইল। তারপর তিনি পুনরায় বলিলেন, দশজন আমার নিকট পাঠাও। তারপর তাহারাও আসিয়া তৃপ্তি সহকারে খাইল। পুনরায় তিনি বলিলেন, আরো দশজনকে আমার নিকট পাঠাইয়া দাও। এইভাবে তিনি চল্লিশজন পর্যন্ত গণনা করিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) নিজে খাইলেন। আমি দেখিতে লাগিলাম, তাহা হইতে কিছু কমিয়াছে কিনা” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীছ নং ৫৪৫০, পৃ. ১১৭৯, কিতাবুল আতইমা)।
অপর একটি হাদীছে আসিয়াছে: عن عبد الرحمن بن ابي بكر ان اصحاب الصفة كانوا ناسا فقراء وان رسول الله ﷺ قال مرة من كان عنده طعام اثنين فليذهب بثالث ومن كان عنده طعام اربعة فليذهب بخامس بسادس او كما قال وان ابا بكر جاء بثلاثة وانطلق نبي الله ﷺ بعشرة وابو بكر وثلاثة قال فهو انا وابى وامى ولا ادرى هل قال امراتی و خادمی بین بيتنا وبين وبيت ابي بكر وان ابا بكر تعشى عند النبى ﷺ ثم لبث حتى صلى العشاء ثم رجع فلبث حتى تعشى رسول الله ﷺ فجاء بعد ما مضى من الليل ما شاء الله قالت له امراته ما حبسك عن أضيافك قال اوما عشبتهم قالت ابوا حتى تجئ قد عرضوا عليهم فغلبوهم قال فذهبت انا فاختبأت وقال ياغنثر فجدع وسب وقال كلوا وقال لا اطعمه ابدا قال وايم الله ما كنا نأخذ من لقمة الا ربا من اسفلها اكثر مما قبل ذلك بثلاثة مرار قال فاكل منها ابو بكر وقال انما كان ذلك من الشيطان يعنى يمينه ثم اكل منها لقمة ثم حملها الى رسول الله ﷺ فاصبحت عنده قال كان بيننا وبين قوم عهد فمضى الاجل فتفرقنا اثنا عشر رجالا مع كل رجل منهم اناس الله اعلم كم مع كل رجل . قال الا انه بعث معهم فاكلوا منها اجمعون او كما قال
"হযরত আবদুর রহমান ইব্ন আবূ বকর (রা) হইতে বর্ণিত। আসহাবে সুফ্ফার লোকজন ছিলেন দরিদ্র। তাই রাসূলুল্লাহ (স) একদা বলিলেন, যাহার নিকট দুইজনের খাবার আছে সে যেন তৃতীয় জনকে সঙ্গে লইয়া যায়। আর যাহার নিকট চারজনের খাবার আছে সে যেন পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ ব্যক্তিকে সঙ্গে লইয়া যায় অথবা বর্ণনাকারী যেইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। রাবী বলেন, আবু বকর (রা) তিনজনকে সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। আর আল্লাহ্র রাসূল (স) দশজনকে লইয়া রওয়ানা হইলেন। আবূ বকর (রা) বলিলেন, আমাদের পরিবারে আমরা ছিলাম তিনজন: আমি, আমার পিতা ও আমার মাতা। বর্ণনাকারী বলেন, আমার স্ত্রী এবং আমাদের ও আবূ বকরের বাড়ীতে শরীক খাদিম এই কথা বলিয়াছিলেন কিনা জানিনা। রাবী বলেন, আবূ বকর (রা) নবী কারীম (স)-এর গৃহে রাতের খাবার খাইলেন, তারপর অপেক্ষা করিলেন। অবশেষে এশার নামায আদায় করা হইল। সালাতশেষে তিনি প্রত্যাবর্তন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিলেন। তারপর রাতের কিয়দংশ অতিবাহিত হইলে তিনি গৃহে ফিরিলেন। তাঁহার স্ত্রী তাঁহাকে বলিলেন, মেহমান রাখিয়া দেরী করিলেন কেন? তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কেন, তুমি কি তাহাদিগকে রাতের খাবার খাওয়াও নাই? তিনি উত্তর দিলেন, আপনি না আসা পর্যন্ত তাহারা আহার করিতে কিছুতেই রাজি হয় নাই। কয়েকবারই খাবার পেশ করা হইয়াছে কিন্তু তাহারা তাহাদের কথায়ই অনঢ়। আবদুর রহমান বলিলেন, আমি গিয়া লুকাইয়া রহিলাম। তিনি বলিলেন, হে নির্বোধ। তারপর তিনি আমাকে বকাবকিও করিলেন। আর মেহমানদের বলিলেন, কাজটি ভাল হইল না। এইবার আপনারা আহার করুন। তিনি আরো বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমরা যেই লোকমাই গ্রহণ করিতেছিলাম তাহার নীচে তাহারও অধিক পরিমাণে বাড়িয়া যাইতেছিল। এমনকি আমরা পরিতৃপ্ত হইলেও আমাদের খাদ্য পূর্বের ন্যায়ই রহিল, বরং তাহা হইতে অনেক বেশী রহিয়া গেল। আবূ বকর (রা) খাবারের প্রতি লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন যে, খাবার যেমন ছিল তেমনি আছে বা তাহা হইতেও অধিক হইয়াছে। তিনি তাঁহার স্ত্রীকে বলিলেন, হে উম্বতে বনী ফিরাস! ব্যপার কি? তিনি বলিলেন, না কিছু না, আমার চোখের প্রশান্তি। এইগুলি পূর্বে যাহা ছিল, উহা হইতে তিন গুণ বাড়িয়া গিয়াছে। আবদুর রহমান বলেন, ইহার পর আবূ বকর (রা) কিছু খাইলেন এবং বলিলেন, ওটা অর্থাৎ (শপথ) শয়তানের পক্ষ হইতে। তারপর আরও এক লোকমা খাইলেন। তারপর সেইগুলি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট লইয়া গেলেন। আমিও তাঁহার নিকট সকাল পর্যন্ত ছিলাম। তিনি বলিলেন, আমাদের এবং কোন এক গোত্রের মাঝে চুক্তি ছিল। মেয়াদ শেষ হইয়া গেলে আমরা বারজন লোক নিযুক্ত করিলাম। তাহাদের প্রত্যেকের সাথে আরো অনেক লোক ছিল। তবে আল্লাহই ভাল জানেন, প্রত্যেকের সাথে কতজন ছিল। তাহাদের প্রত্যেকের নিকট সেই খাবার পাঠানো হইল আর তাহারা সকলেই সেই খাবার খাইলেন অথবা বর্ণনাকারী যেইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন" (মুসলিম ৬খ., পৃ. ১৩০; সহীহ আল-বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, বাবু 'আলামাতিন নুবুওয়াত, হাদীছ নং ৩৫৮১, পৃ. ৭৩৪)।
অপর একটি হাদীছে আসিয়াছে: عن ابي هريرة قال لما كان يوم غزوة تبوك اصاب الناس مجاعة فقال عمر يا رسول الله ! ادعهم بفضل ازوادهم ثم ادع الله لهم عليها بالبركة فقال نعم فدعا بنطع فبسط ثم دعا بفضل ازوادهم فجعل الرجل يجئ بكف ذرة ويجئ الآخر بكف تمر حتى اجتمع على النطع شئ يسير فدعا رسول الله ﷺ بالبركة ثم قال خذوا في اوعيتكم فاخدوا في أوعيتهم حتى ماتركوا في العسكر وعاء الا ملؤوه قال فاكلوا حتى شبعوا و فضلت فضلة
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, তাবুক যুদ্ধে সাহাবীগণের খাদ্যাভাব হইল। তখন হযরত 'উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তাহাদিগকে তাহাদের অবশিষ্ট পাথেয় নিয়া আসিতে আদেশ করুন। তারপর তাহাতে আল্লাহর নিকট বরকতের জন্য দু'আ করুন। তখন তিনি বলিলেন, হাঁ, তাহাই করা হইবে। তারপর একটি চাদর আনিতে আদেশ করিলেন। চাদর আনা হইলে তিনি তাহা বিছাইয়া দিলেন। তারপর তাহাদের অবশিষ্ট পাথেয় নিয়া আসিতে বলিলেন। তারপর লোকজন নিয়া আসিতে লাগিল। কেহ নিয়া আসিল সামান্য ভুট্টা, কেহ নিয়া আসিল সামান্য খেজুর, আবার কেহ নিযা আসিল সামান্য খাবার। অবশেষে দেখা গেল যে, চাদরের উপর অতি সামান্য খাবার জমিয়াছে। তারপর রাসূলুল্লাহ (স) বরকতের জন্য দু'আ করিলেন। শেষে বলিলেন, তোমাদের পাত্রসমূহ তাহা হইতে ভরিয়া লও। অতএব তাহারা তাহাদের পাত্রসমূহ ভরিয়া লইলেন। দেখা গেল সৈনিকদের এমন কোন পাত্র ছিল না যাহা তাহারা ভরে নাই। তারপর তাহারা লইল এবং পরিতৃপ্ত হইল। তৎপরও খাবার অবশিষ্ট রহিয়া গেল" (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীছ নং ৫৯১২, ৩খ., পৃ. ১৬৬০, বাবুন ফিল-মু'জিযাত)।
আর একটি হাদীছে আসিয়াছে: "হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আমি কিছু খেজুর লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিলাম। তারপর তিনি বলিলেন, ইহাতে বরকতের জন্য দু'আ করুন। তিনি বলিলেন, অতঃপর খেজুরগুলি তিনি তাঁহার সামনে সাজাইয়া রাখিলেন, তারপর দু'আ করিলেন। তারপর বলিলেন, এইগুলি পাত্রে রাখিয়া দাও। যখন তাহা হইতে বাহির করিবার প্রয়োজন হয় তখন তোমার হাত ঢুকাইবে, কিন্তু তাহা খুলিবে না। রাবী বলেন, আমি তাহা হইতে এইরূপ এইরূপ গ্রহণ করিয়াছি এবং আল্লাহর রাস্তায় দানও করিয়াছি। আমরা তাহা হইতে খাইয়াছি এবং খাওয়াইয়াছিও, অথচ রসদ ব্যাগ আমা হইতে পৃথক হয় নাই। আর যখন হযরত 'উছমান (রা)-কে হত্যা করা হইয়াছিল তখন তাহা শেষ হইয়া যায়। অপর একটি বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি বলেন, আমি তাহা হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় খাইয়াছি এবং হযরত আবূ বকর (রা)-এর যুগেও খাইয়াছি। আর হযরত 'উছমান (রা)-এর যুগ পুরোটাতেই খাইয়াছি। তারপর যখন 'উছমান (রা)-কে হত্যা করা হইল আমার হাতে যাহা ছিল তাহা কাড়িয়া লওয়া হইল এবং রসদ পাত্রটিও কাড়িয়া লওয়া হইল। রাবী বলেন, আমি কি তোমাদিগকে সংবাদ দিব যে, কতদিন তাহা হইতে খাইয়াছি? আমি তাহা হইতে দুই শত ওয়াসাক-এর চেয়েও বেশী খাইয়াছি (ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ, হাদীছ নং ৮৪১৪, ৩খ., পৃ. ৩১; আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃঃ ১০১-১০২)।
অপর একটি হাদীছে বর্ণিত হইয়াছেঃ "হযরত দুকায়ন ইবন সা'ঈদ আল-খাছ'আমী (রা) বলেন, আমরা চার শত চল্লিশজন লোক রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট আসিলাম এবং খাদ্য প্রার্থনা করিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) হযরত 'উমার (রা)-কে বলিলেন, যাও তাহাদিগকে খাইতে দাও। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (স)! আমার নিকট যেই খাবার আছে তাহা শুধু আমার পরিবার-পরিজনের জন্য যথেষ্ট হইতে পারে। তিনি বলিলেন, যাও, তাহাদিগকে খাইতে দাও। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (স)! আপনি যেই কথা বলিলেন তাহাই করিব। রাবী বলেন, তারপর হযরত 'উমার দাঁড়াইলেন, আমরাও তাঁহার সহিত দাঁড়াইলাম। তারপর আমাদিগকে তাঁহার একটি কামরাতে লইয়া গেলেন। তারপর তাঁহার ঘর হইতে চাবী বাহির করিলেন এবং দরজা খুলিলেন। দুকায়ন (রা) বলেন, ঘরে দেখিলাম অতি সামান্যই খেজুর আছে। তিনি বলিলেন, তোমরা কি চাও? রাবী বলেন, আমাদের প্রত্যেকেই তাহার প্রয়োজনানুসারে গ্রহণ করিলাম। তারপর আমরা লক্ষ্য করিয়া দেখিলাম যে, তাহার একটি খেজুরও কমে নাই" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬খ., পৃ. ১০৭)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর খাদ্য বৃদ্ধিসংক্রান্ত মু'জিযা সম্বলিত আরও অনেক বর্ণনা রহিয়াছে। এই জাতীয় কিছু বর্ণনা কাযী 'ইয়ায স্বীয় গ্রন্থ আশ-শিফা-য় সূত্রবিহীনভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। তাহা হইতে কিছু বর্ণনা নিম্নে প্রদত্ত হইল।
একদা হযরত আবূ আয়্যব (রা) রাসূলুল্লাহ্ (স) এবং হযরত আবু বকর (রা) এই দুইজনের উপযোগী খাদ্য তৈরী করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, আনসারদের মধ্য হইতে ৪০ জন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে খাবারের জন্য আহ্বান কর। তাহাদেরকে ডাকা হইল। দুইজনের জন্য তৈরী খাদ্য দ্বারাই তাঁহাদেরকে আপ্যায়ন করা হইল। তাঁহারা খাওয়ার পরও খাদ্য যথারীতি অবশিষ্ট রহিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, এইবার ৬০ জনকে ডাক। ডাকা হইলে তাঁহারাও পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করিলেন। তারপরও খাদ্য অবশিষ্ট রহিল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেন, এইবার ৭০ জনকে ডাক। তারপর তাঁহারাও আসিয়া খাইয়া গেলেন। এতলোক খাওয়ার পরও খাদ্য শেষ হয় নাই। এই বিস্ময়কর অবস্থা দেখিয়া আপ্যায়িত ব্যক্তিবর্গ ইসলামের বায়আত গ্রহণ করিলেন। দুইজনের জন্য তৈরী খাদ্যে এত বরকত হইয়াছিল যে, তাহা দ্বারা এক শত আশিজন পর্যন্ত খাইয়া ছিলেন (কাযী 'ইয়ায, আশ-শিফা,
📄 খেজুরে বরকত হওয়ার ঘটনা
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত। তাবুকের যুদ্ধের সময় সাহাবায়ে কিরাম খাদ্যাভাবে কষ্ট পাইতে থাকিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি অনুমতি দিলে আমরা আমাদের সওয়ারী উট যবেহ করিয়া ক্ষুধা নিবারণ করিতে পারি। ইহাতে রাসূলে কারীম (স) সম্মতি জ্ঞাপন করিলে হযরত 'উমার ফারুক (রা) আসিয়া আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি তাহাই করা হয় তবে সওয়ারীর উট কমিয়া যাইবে। বরং কাফেলার লোকদের নিকট অবশিষ্ট যেই খাদ্য রহিয়াছে উহা একত্র করিয়া আপনি আল্লাহ্ পাকের দরবারে বরকতের জন্য দু'আ করুন। হয়ত আল্লাহ্ পাক ইহাতেই বরকত দিবেন।
রাসূলে কারীম (স) একটি দস্তরখান বিছাইয়া উহাতে অবশিষ্ট খাদ্যসামগ্রী একত্র করার নির্দেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই ঘোষণার পর কেহ এক মুষ্টি যব, কেহ এক মুষ্টি খেজুর, আবার কেহ সামান্য কয়েকটি রুটির টুকরা লইয়া দস্তরখানে রাখিতে লাগিলেন। অতঃপর নবী কারীম (স) সেই খাদ্যে বরকতের দু'আ করিয়া সকলকে স্ব স্ব পাত্র ভরিয়া লইতে আদেশ দিলে প্রত্যেকেই পাত্র পূর্ণ করিয়া পরিতৃপ্ত হইয়া আহার করিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ কি মহিমা। ইহার পরও খাদ্য অবশিষ্ট রহিয়া গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলেন: আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং নিশ্চয় আমি তাঁহার রাসূল। যেই ব্যক্তি অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করত এই কলেমা মুখে উচ্চারণ করিবে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৪২-৪৩; ২খ., পৃ. ৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১১৭-১১৮; আশ্-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৬৪-৫৬৫; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৭৫-২৭৬; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৩৫৫)।
আল-ওয়াকিদীর বর্ণনায় আছে, "বনী সা'দ ইব্ন হুসায়মের এক ব্যক্তি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) তাবুকের এক স্থানে অবস্থানকালে আমি তাঁহার খেদমতে হাযির হইলাম। সেই সময় তাঁহার সহিত আরও ছয় ব্যক্তি অবস্থান করিতেছিলেন। আমি সেইখানে পৌঁছিয়া তাঁহাকে সালাম করিলে তিনি আমাকে বসিতে বলিলেন। আমি বসিয়া আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই এবং আপনি আল্লাহ্ সত্য রাসূল। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, তুমি মুক্তি পাইয়াছ। অতঃপর বিলাল (রা)-কে ডাকিয়া বলিলেন, "আমাদেরকে খাবার দাও।" বিলাল (রা) একটি দস্তরখান বিছাইয়া একটি থলিয়া হইতে খেজুর, ঘি ও পনীরের তৈরী পাঞ্জেরী বাহির করিলেন। অতঃপর নবী কারীম (স) আমাদেরকে খাওয়ার নির্দেশ দিলে আমরা পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পর আমি আরয করিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! খাবারের পরিমাণ দেখিয়া প্রথমে আমি মনে করিয়াছিলাম, সম্পূর্ণ খাবার একাই খাইয়া ফেলিব। এই কথা শুনিয়া মহানবী (স) বলিলেন, কাফের সাত অন্ত্রে ভক্ষণ করিয়া থাকে, আর মু'মিন ভক্ষণ করে এক অস্ত্রে। পরের দিন মধ্যাহ্ন ভোজে আহার গ্রহণ ও ইসলামের প্রতি আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করণার্থে আমি মহানবী (স)-এর খেদমতে হাযির হইয়া দেখিতে পাইলাম, তাঁহার নিকট আরও দশজন মানুষ উপস্থিত। রাসূলুল্লাহ্ (স) বিলাল (রা)-কে খাবার দিতে বলিলে তিনি একটি দস্তরখান বিছাইয়া একটি পলিয়া হইতে মুষ্টি ভরিয়া খেজুর বাহির করিতে থাকিলেন। নবী কারীম (স) বলিলেন, "বিলাল! আরশের অধিপতির উপর ভরসা রাখিয়া উদারমনে খেজুর এখানে রাখ এবং এই ভীতি অন্তরে স্থান দিও না যে, সেইখানে বখিলী করা হইবে।"
বিলাল (রা) সমস্ত খেজুর থলিয়া হইতে বাহির করিয়া রাখিলে আমি অনুমান করিলাম, সেই খেজুর দুই মুদ্দ (প্রায় দেড় সের) হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) আপন হস্ত মুবারক সেই খেজুরের উপর রাখিয়া আমাদেরকে বিসমিল্লাহ বলিয়া খাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমরা সকলেই তাহা হইতে পেট ভরিয়া খাইলাম। আমি নিজে খেজুর উৎপাদন করিতাম বিধায় বেশী খাওয়ার অভ্যাস সত্ত্বেও আর খাওয়ার মত অবস্থা ছিল না। সকলের খাওয়া শেষ হইলে আমি দেখিতে পাইলাম, দস্তরখানে কম-বেশী তত খেজুরই পড়িয়া রহিয়াছে যতগুলি বিলাল (রা) রাখিয়াছিলেন যেন তাহা হইতে একটি খেজুরও আমরা খাই নাই।
পরের দিন আসিয়াও আমি দশ বা তাহার চাইতে এক/দুইজন বেশী মানুষ দেখিতে পাইলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-কে খাবার দিতে বলিলে তিনি পূর্বের সেই থলিটিই নিয়া আসিলেন। উহা আমি দেখিয়াই চিনিতে পারিলাম। দস্তরখানে খেজুর রাখা হইলে মহানবী (স) তাহার উপরে হাত রাখিবার পর আমাদেরকে বিসমিল্লাহ বলিয়া খাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমরা পরিতৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পরও পূর্বের সমপরিমাণই রহিয়া গেল। পরপর তিন দিন একই অবস্থা হইল (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০১৭-১০১৮)।
ইয়াস ইব্ন সালামা (র) তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, খায়বার অভিযানে আমরা মহানবী (স)-এর সঙ্গে ছিলাম। একদিন তিনি আমাদের নিকট থাকা অবশিষ্ট পাথেয় তথা খেজুরসমূহ একত্র করার নির্দেশ দিয়া একটি দস্তরখান বিছাইলেন। আমরা সকলে আমাদের পাথেয়সমূহ উহাতে রাখিয়া দিলাম। খাদ্যের স্তূপ দেখিয়া আমি অনুমান করিলাম যে, উহা বকরীর পিঠ পরিমাণ উঁচু হইবে। আমরা সংখ্যায় ছিলাম চার শত জন। আমাদের প্রত্যেকেই তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পর আমি আবারও দেখিয়া ধারণা করিলাম, খাদ্যের স্তূপ বকরীর পিঠের সমানই. রহিয়া গিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১২০)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নবী কারীম (স) এক যুদ্ধে গমন করিলেন। পথিমধ্যে খাদ্যসংকট দেখা দিলে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: আবূ হুরায়রা! তোমার নিকট খাবার আছে কি? আমি বলিলাম, কয়েকটি খেজুর ব্যতীত আমার নিকট আর কিছু নাই। তাঁহার নির্দেশে আমি খেজুরগুলি হাজির করিলে তিনি একটি দস্তরখান আনিতে বলিলেন। তাহা আনিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সবগুলি খেজুর মুঠির ভিতর লইলেন। খেজুর ছিল একুশটি। অতঃপর তিনি বিসমিল্লাহ পড়িয়া প্রতিটি খেজুর দস্তরখানে রাখিবার পর পুনর্বার সবগুলি খেজুর হাতের মুঠিতে চাপ দিয়া বলিলেন: যাও, অমুককে তাহার সঙ্গীসহ ডাকিয়া আন। সেইমতে তাহারা আসিয়া খেজুর ভক্ষণ করিয়া চলিয়া গেল। মহানবী (স) পুনরায় বলিলেন: যাও, অমুককে তাহার সঙ্গীসহ ডাকিয়া আন। তাহারা আসিয়া তৃপ্তির সহিত আহার করিয়া চলিয়া যাইবার পরও কিছু খেজুর অবশিষ্ট রহিয়া গেল। অতঃপর নবী কারীম (স)-এর নির্দেশে তাঁহার সহিত বসিয়া আমি খেজুর খাইলাম। উহার পরও কিছু খেজুর বাঁচিয়া গেল। তিনি সেইগুলি আমার থলিতে ভরিয়া দিয়া বলিলেন, আবূ হুরায়রা! তুমি কিছু নিতে চাহিলে এই থলিতে হাত ঢুকাইয়া বাহির করিয়া লইবে। কিন্তু কখনও থলি উপুড় করিয়া ঢালিয়া দিও না। তাহা হইলে বরকত শেষ হইয়া যাইবে।
ঐ ঘটনার পর হইতে যখনই প্রয়োজন হইত আমি থলির ভিতর হাত ঢুকাইয়া খেজুর বাহির করিয়া লইতাম। ত্রিশ বছর পর্যন্ত আমি ঐ থলি হইতে আহার করিয়াছি এবং পঞ্চাশ ওয়াসাক খেজুর আল্লাহ্র রাস্তায় দান করিয়াছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আর বরকতে কোনদিন ঐ থলিটি খেজুরশূন্য হয় নাই। থলিটি আমার কোমরের পিছনে ঝুলান থাকিত। হযরত 'উছমান (রা)-এর শাহাদাতের দিন থলিটি আমার বাহনের পশ্চাতে লটকাইয়া রাখিয়াছিলাম তখন উহা হারাইয়া যায় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১২১-১২২; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৬৯; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৮২; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৩৬৬; আল-খাসাইসুল কুবরা, উর্দু অনুবাদ, ২খ., পৃ. ১২৯)।
সা'ঈদ ইব্ন মীনার উদ্ধৃতিতে ইন্ন ইসহাক বর্ণনা করিয়াছেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় নু'মান ইব্ন বশীরের ভগ্নি এবং বশীর ইবন সা'দের কন্যা এই প্রসঙ্গে বলেন, আমার মা 'উরওয়া বিনত রাওয়াহা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, এই খেজুরগুলি তোমার পিতা ও মামা 'আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-কে দিয়া আস। এক মুষ্ঠির মত খেজুর একটি কাপড়ে জড়াইয়া আমি খন্দকের দিকে চলিলাম যাহা আমার আব্বা ও মামার দ্বিপ্রহরের খাবার ছিল।
আমি আমার পিতা ও মামাকে খুঁজিতেছিলাম। এক পর্যায়ে হযরত রাসূল কারীম (স) আমাকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, বেটি! তোমার কাছে কি? আমি আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এইগুলি খেজুর যাহা আমার আম্মা, আমার পিতা ও মামার দুপুরের খাবারের জন্য পাঠাইয়াছেন। অতঃপর তিনি চাহিলে আমি খেজুরগুলি তাঁহার হাতে দিলাম, কিন্তু তাঁহার হাত সেই খেজুরে পূর্ণ হইল না। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে দস্তরখান বিছানোর পর সেই খেজুরগুলি তিনি তাহার উপর ছড়াইয়া দিয়া সকলকে খাওয়ার জন্য ডাকিয়া আনিতে বলিলেন।
বশীরের কন্যা বলেন, খন্দকবাসী দস্তরখানে একত্র হইতে লাগিলেন। একদল খাওয়া শেষ করিয়া উঠিয়া যাইবার পর দ্বিতীয় দল আসিয়া খাইতে আরম্ভ করিতেন। এইভাবে সকল খন্দকবাসী পেট ভরিয়া আহার করিবার পরও খেজুর শেষ হইল না। আল্লাহ্র কসম! দস্তরখানে তখনও খেজুর মওজুদ ছিল যাহা কিনার দিয়া গড়াইয়া পড়িতেছিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১২০; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৮৪)।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত সালমান ফারসী (রা) বলেন, আমাকে রাসূলে আকরাম (স) বলিয়াছেন: "সালমান! নিজ মালিকের সঙ্গে আযাদীর জন্য শর্তাবলী ঠিক করিয়া চুক্তি করিয়া নাও”। আমি তাঁহার সঙ্গে কথা বলিবার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হইল যে তাহাকে চল্লিশ উকিয়া স্বর্ণ প্রদান ও তিন শত খেজুর গাছ লাগাইয়া তাহাতে ফল আসিবার পর আমি মুক্তি লাভ করিব। মহানবী (স) সাহাবীগণকে (রা) উৎসাহ দিয়া বলিলেন: তোমরা সালমানকে খেজুরের চারা দিয়া সাহায্য কর। ফলে আমাকে কেহ ৩০টি, কেহ ২০টি, কেহ ১৫টি, আবার কেহ ১০টি খেজুরের চারা দ্বারা সাহায্য করিলেন। এইভাবে তিন শত চারা পূর্ণ হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে গর্ত খুঁড়িবার নির্দেশ দিলেন। আমি সঙ্গীদেরকে সঙ্গে লইয়া গর্ত খুঁড়িবার পর মহানবী (স) আপন হস্তে চারাগুলি রোপণ করিয়া দিয়া বরকতের দু'আ করিলেন। সেই সত্তার কসম যাঁহার হাতে সালমানের জীবন! একটি বৎসর অতিবাহিত হইতে না হইতে সকল গাছেই ফল আসিয়া গেল। একটি চারাও শুকায় নাই কিংবা মরিয়াও যায় নাই। সবগুলিই খুব তরতাজা হইয়া প্রচুর ফল দিয়াছিল (ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, আল- মুসনাদ, ১৭খ., পৃ. ৯৯-১০০; ইবন হিশাম, সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ২৪৪; সীরাতুল মুস্তাফা, '১খ., পৃ. ৪২৪)।
মহানবী (স) মদীনায় আপমনের পর হযরত আনাস (রা)-এর আম্মা তাহাকে চাদরে জড়াইয়া খাদেম হিসাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত করিবার পর তাঁহার জন্য দু'আর দরখাস্ত করিলেন। মহানবী (স) তাহার সম্পদ ও সন্তানের উন্নতির জন্য দু'আ করিলেন। হযরত আনাস (রা)-এর উক্তি এই যে, সেই দু'আর বরকতে আজ তিনি প্রচুর সম্পদের মালিক এবং তাহার ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনীর সংখ্যা এক শতের কাছাকাছি পৌছিয়া গিয়াছে। মহানবী (সা)-এর দু'আয় হযরত আনাস (রা) এমন বরকত লাভ করিলেন যে, তাঁহার বাগানে বৎসরে দুইবার ফল হইত (শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৩৪৮)।
দুকায়ন ইবন সা'ঈদ খাছ'আমী ও নু'মান ইব্ন মুকাররিন বলেন, আমরা চারি শত চল্লিশজন লোক একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে আসিয়া খাদ্যসামগ্রীর আবেদন করিলাম। তিনি হযরত 'উমার (রা)-কে নির্দেশ দিলেন, যাও, ইহাদেরকে খাদ্যসামগ্রী দিয়া দাও। হযরত উমার (রা) আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বর্তমানে কয়েক সা' খেজুর ছাড়া আর কিছুই নাই, গ্রীষ্মকালে যাহা আমার সন্তানদের জন্যও যথেষ্ট হইবে না। রাসূলুল্লাহ (স) আবারও বলিলেন, যাও, ইহাদেরকে খাদ্যসামগ্রী দিয়া দাও। এইবার হযরত 'উমার (রা) যখন দরজা খুলিলেন তখন সেইখানে খেজুরের এত বড় স্তূপ দেখিতে পাইলেন যেন দুগ্ধপোষ্য উটের বাচ্চা বসিয়া আছে। তিনি আমাদেরকে নেওয়ার নির্দেশ দিলে আমরা সকলে ইচ্ছামত খেজুর লইবার পর খেজুরের স্তূপের দিকে তাকাইয়া আমার মনে হইল যেন আমরা কেহই তথা হইতে একটি খেজুরও গ্রহণ করি নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১২৭; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৬৭; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৩৫৮)।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, মহানবী (স) হযরত যয়নব (রা)-কে বিবাহ করার পর আমাকে কিছু নির্দিষ্ট লোক ও উপস্থিত অন্যান্য লোককে ডাকিয়া আনিবার নির্দেশ দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘর লোকে লোকারণ্য হইয়া গেল। তাহাদের সম্মুখে এক মুদ্দ পরিমাণ খেজুরের তৈরি এক পেয়ালা হায়েস পেশ করা হইলে মহানবী (স) তাহাতে হাত রাখিয়া তিনটি আঙ্গুল ডুবাইয়া দিলেন। সকলে তৃপ্তি সহকারে লই পান করিবার পরও পেয়ালাটি পূর্বের ন্যায়ই ভরপূর রহিয়া গেল। অথচ লোকসংখ্যা ছিল একাত্তর থেকে বাহাত্তর জন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১১৪; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৬৬-৫৬৭)।
হযরত ইবন সা'দ সালিম ইবনুল জা'দ হইতে বর্ণনা করেন, একবার নবী কারীম (স) সাহাবায়ে কিরামকে সফরের পাথেয় হিসাবে মুখ বন্ধ করিয়া এক মশক পানি দিলেন এবং সাথে সাথে দু'আও করিয়া দিলেন। নামাযের সময় সাহাবীগণ মশক খুলিয়া দেখিতে পাইলেন, উহা দুধে পরিপূর্ণ এবং উপরে সর জমিয়া আছে (বিশ্বনবীর তিনশত মো'জেযা, পৃ. ১৮৬, মো'জেযা নং ১৯৬, মোহাম্মদী লাইব্রেরী, ঢাকা)।
📄 দুধে বরকত হওয়ার ঘটনা
ইমাম বুখারী (র) হযরত আবূ হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন, সেই আল্লাহর কসম যিনি ব্যতীত আর কোন প্রতিপালক নাই! ক্ষুধার তাড়নায় কয়েকবার আমি অস্থির হইয়া মাটিতে পড়িয়া গিয়াছিলাম এবং প্রচণ্ড ক্ষুধায় পেটে পাথর বাঁধিয়া রাখিয়াছিলাম। এমন অসহায় অবস্থায় একদিন আমি হযরত রাসূল কারীম (স) ও সাহাবায়ে কিরাম-এর যাতায়াতের পথে বসিয়া পড়িলাম। সেই পথে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) যাইতে থাকিলে আমি তাঁহাকে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত সম্পর্কে শুধু এই উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করিলাম যেন তিনি আমার আহারের ব্যবস্থা করিয়া দেন। কিন্তু তিনি আমার ব্যাপারে কিছু না করিয়াই চলিয়া গেলেন। অতঃপর হযরত 'উমার (রা) আমার পাশ দিয়া যাইতে থাকিলে আমি তাঁহাকেও একই উদ্দেশ্যে কুরআন মাজীদের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনিও আমাকে এড়াইয়া গেলেন।
ইতোমধ্যে হযরত রাসূল কারীম (স) ঐ পথ দিয়া যাইবার সময় আমাকে দেখিয়া মুচকি হাসিলেন এবং বুঝিতে পারিলেন, ক্ষুধার তাড়নায় আমার মনের চাহিদা কি ও কিসের আভাস ফুটিয়া উঠিয়াছে আমার চেহারায়। তাই তিনি বলিলেন, "আবূ হুরায়রা"! তাঁহার ডাকে সাড়া দিয়া আমি বলিলাম, লাব্বায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ” (হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত)। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার সঙ্গে যাইতে বলিলেন। আমি তাঁহাকে অনুসরণ করিলাম। ঘরে প্রবেশ করিয়া নবীজী (স) আমাকে অনুমতি দিলে আমিও প্রবেশ করিলাম। তিনি এক পেয়ালা দুধ দেখিতে পাইয়া তাহা কোথা হইতে আসিয়াছে জিজ্ঞাসা করিলে ঘরের লোকজন বলিলেন, অমুক পুরুষ বা মহিলা হাদিয়া পাঠাইয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে আবারও আবূ হুরায়রা বলিয়া ডাক দিলে উত্তরে আমি বলিলাম, “লাব্বায়কা ইয়া রাসূলুল্লাহ!” তিনি বলিলেন, আসহাবে সুফ্ফার সকলকে ডাকিয়া আন।
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আসহাবে সুফ্ফা ছিলেন ইসলামের সিপাহী এবং আল্লাহর মেহমান। তাঁহাদের কোন বাড়ি-ঘর ছিল না, পরিবার-পরিজনও ছিল না। তাঁহারা দুনিয়া অর্জনের চেষ্টা করিতেন না। সম্পদের প্রতি কোন মোহ তাঁহাদের ছিল না। মহানবী (স)-এর নিকট কখনও সাদাকার মাল আসিলে নিজের জন্য তাহা হইতে কিছুই গ্রহণ না করিয়া উহার সম্পূর্ণটাই ব্যয় করিতেন আহলে সুফ্ফার জন্য। আর যদি কোথাও হইতে হাদিয়া আসিত তাহা হইতে আহলে সুফ্ফার জন্য যেমন ব্যয় করিতেন তেমন নিজেও তাহা হইতে কিছু গ্রহণ করিতেন।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নির্দেশমত আমি আহলে সুফ্ফাকে ডাকিতে গেলেও আমি হতাশ হইলাম এই জন্য যে, এতটুকু দুধে আহলে সুফ্ফার কী হইবে? এতটুকু দুধ আমার জন্যই যথেষ্ট ছিল যাহা পান করিয়া আমি শরীরের শক্তি ফিরিয়া পাইতাম। রাসূলুল্লাহ (স)-এরা আদেশে আমি তাঁহাদেরে মধ্যে এই দুধ বিতরণ করিয়া দিলে আমার জন্য তখন আর কিছুই থাকিবে না। কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর কথা মান্য করা ছাড়া কোন উপায় নাই বিধায় আমি তাঁহাদেরকে ডাকিয়া আনিলাম। অনুমতি লইয়া তাঁহাদের প্রত্যেকে ঘরে প্রবেশ করিবার পর নিজ নিজ আসন গ্রহণ করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) "আবূ হির” বলিয়া আমাকে ডাক দিলে আমি “লাব্বায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ!” বলিয়া সাড়া দিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে ঐ দুধ সকলের মধ্যে বণ্টন করিবার নির্দেশ দিলেন। পেয়ালা হাতে লইয়া আমি বণ্টনের শুরুতে তাহা এক ব্যক্তির হাতে দিলে সে তৃপ্তির সাথে পান করিয়া আমার হাতে উহা ফেরৎ দিল। দ্বিতীয়জনকে দিলে সেও পরিতৃপ্ত হইয়া ফেরৎ দিল।
এইভাবে একের পর এক সকলেই পান করিয়া পরিতৃপ্ত হইলে পেয়ালা হাতে রাসূলুল্লাহ (স) আমার দিকে তাকাইয়া মুচকি হাসিয়া ডাক দিলেন, "আবূ হির"। জবাবে আমি "লাব্বায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ” বলিলাম। তিনি বলিলেন, এখন আমি আর তুমি অবশিষ্ট রহিয়াছি। আমি তাঁহার কথায় সত্যতার সাক্ষ্য দিলে তিনি আমাকে বসিয়া পান করিবার নির্দেশ দিলেন। আমি যথেষ্ট পরিমাণে পান করিবার পর তিনি আমাকে আরও পান করিতে নির্দেশ দিলেন। আমি আরও পান করিবার পর তিনি নির্দেশ দিতেই থাকিলেন। এক পর্যায়ে আমি বলিলাম, সেই আল্লাহ্র কসম যিনি আপনাকে সত্য নবী করিয়া পাঠাইয়াছেন! আমার পেটে আর একটুও জায়গা নাই। তাঁহার নির্দেশে আমি তাঁহাকে পেয়ালা ফেরৎ দিবার পর তিনি প্রশংসার সাথে আল্লাহর নাম লইয়া অবশিষ্ট দুধ পান করিলেন (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৯৫৫-৯৫৬; আল-মুসতাদ্রাক লিল-হাকেম, ৩খ., পৃ. ১৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১০৫; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৯৪; আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৭০; সীরাতুন-নবী, ৩খ.)।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ (রা) বলেন, শৈশবে আমি উকবা ইন্ন মু'ইতের বকরী চরাইতাম। একদিন হযরত রাসূল কারীম (স) ও হযরত আবূ বকর (রা) আমার নিকট দিয়া যাওয়ার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নিকট দুধ আছে কি? আমি আরয করিলাম, দুধ আছে বটে, উহা অন্য মানুষের। আমি তো রক্ষক মাত্র। অতঃপর রাসূল কারীম (স) আমার নিকট দুগ্ধবতী নয় এমন কোন বকরী আছে কিনা জিজ্ঞাসা করিলে আমি তাঁহাকে তেমন একটি বকরী আনিয়া দিলাম। তিনি উহার স্তনে হস্ত বুলাইয়া দিয়া আল্লাহ পাকের দরবারে দু'আ করিলে তাহা দুধে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। ইহার পর একটি বড় পেয়ালায় উহার দুধ দোহন করিয়া উভয়ে তৃপ্তি সহকারে পান করিবার পর স্তনকে উদ্দেশ্য করিয়া "আগের মত চুপসাইয়া যাও” বলিয়া নির্দেশ দিলে উহা পূর্বের ন্যায় হইয়া গেল। আমি আরয করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই কথাগুলি শিখাইয়া দিন। রাসূলে পাক (স) আমার মাথায় হাত বুলাইয়া দু'আ করিলেন, আল্লাহ পাক তোমার প্রতি দয়া করুন, তুমি একজন বুদ্ধিমান কিশোর (ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, আল-মুসনাদ, ৩খ., পৃ. ৫০৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায়, পৃ. ১০৫; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী (স), ৩খ., পৃ. ৩৩৬-৩৩৭; আত-তাবাকাত, ১খ., পৃ. ১২২)।
হযরত 'আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল মুত্তালিব বংশের লোকদেরকে দাওয়াত করিলেন (যাহাদের সংখ্যা ছিল চল্লিশের মত)। তাহাদের মধ্যে কয়েকজন এমন স্বাস্থ্যবান ছিলেন যাহারা একাই পূর্ণ একটি বকরী ও আট সের দুধ আহার করিতে পারিতেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের জন্য আধা সের পরিমাণ আটা রান্না করাইলেন। অতঃপর ঐ খাবারই তাহারা সকলে পেট ভরিয়া আহার করিবার পরও এই পরিমাণ খাবার উদ্বৃত্ত থাকিয়া গেল যেন তাহা স্পর্শই করা হয় নাই। আহারশেষে মহানবী (স) একটি ছোট পেয়ালায় দুধ আনাইলে সকলে পরিতৃপ্ত হইয়া পান করিবার পরও সেই পরিমাণ দুধ অবশিষ্ট রহিয়া গেল যেন তাহা স্পর্শ কিংবা পান করা হয় নাই (মুসনাদ আহমাদ, ২খ., পৃ. ১৬৪-১৬৫; আল-খাসায়েসুল কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২৩; সীরাতুল মুস্তাফা হইতে সংগৃহীত, আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৫৬৫-৫৬৬; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৭৯-২৮০; সীরাতুল-মুস্তাফা (স), ১খ., পৃ. ১৭৩)।
হযরত যায়দ ইব্ন্ন খালিদ উম্মে মা'বাদের ভাই হইতে বর্ণনা করেন, নবী কারীম (স) মক্কা হইতে মদীনায় হিজরত করিবার সময় তাঁহার সঙ্গী ছিলেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এবং তাঁহার আযাদকৃত গোলাম 'আমের ইব্ন ফুহায়রা। আর তৃতীয় ব্যক্তিটি ছিল 'আবদুল্লাহ আল-লায়ছী, যাহাকে পথ প্রদর্শনের জন্য অর্থের বিনিময়ে সঙ্গে লওয়া হইয়াছিল। সফরের এক পর্যায়ে ক্ষুদ্র কাফেলাটি উম্মে মা'বাদের আবাসের নিকট পৌছিলে নবী কারীম (স) তাহার নিকট হইতে কিছু গোশত ও খেজুর ক্রয় করিতে চাহিলেন। কিন্তু উম্মে মা'বাদের নিকট মহানবী (স)- এর কাঙ্ক্ষিত বস্তু দুইটি ছিল না। কারণ ঐ সময় এতদঞ্চলে দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করিতেছিল।
তাহার কুটিরে একটি বকরী দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) উহার অবস্থা জিজ্ঞাসা করিলে উম্মে মা'বাদ জানাইল বকরীটি এতই দুর্বল যে, পালের সহিত চারণভূমি পর্যন্ত হাঁটিয়া যাইতে পারে না বিধায় উহাকে এখানে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, উহা কি সামান্য দুধও দেয় না? উম্মে মা'বাদ জানাইল, দুর্বলতার কারণে সে এখন আর দুধ দিতে পারে না। রাসূল পাক (স) বলিলেন, তুমি সম্মত হইলে আমি উহা হইতে দুধ দোহন করিব। উম্মে মা'বাদ রাষী হইয়া বলিল, যদি উহাতে দুধ থাকে তবে দোহন করুন।
রাসূলুল্লাহ (স) উহার স্তনে হাত বুলাইয়া বিসমিল্লাহ পড়িয়া দু'আ করিলেন। সহসা বকরীটির শুষ্ক স্তন দুধে পরিপূর্ণ হইয়া গেল এবং বকরীর স্বভাব অনুযায়ী সে রোমন্থন করিতে লাগিল। অতঃপর সে স্বতস্ফূর্তভাবে দুই পা ফাঁক করিয়া দুধ দোহনের সুযোগ করিয়া দিল। মহানবী (স) একটি পাত্র চাহিলে আট-নয়জন পান করিবার মত একটি বৃহৎ পাত্র আনা হইল। তিনি স্বহস্তে বকরীটি দোহন করিয়া পাত্রটি ভরিলেন। দোহনশেষে সর্বপ্রথম তিনি উম্মে মা'বাদকে তৃপ্তির সহিত পান করাইলেন, অতঃপর সাথী-সঙ্গীগণকে এবং সবশেষে নিজে পান করিয়া পুনরায় দোহন করিয়া পাত্রটি ভরিয়া দিলেন। এই বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া উম্মে মা'বাদ তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৬০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যায় পৃ. ৩১; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৪২; সীরাতুল-মুস্তাফা (স), ১খ., পৃ. ৩৮৭-৩৮৮; আত-তাবাকাত, ১খ., পৃ. ১৫৫)।
হযরত মিকদাদ (রা) বর্ণনা করেন, আমি এবং আমার দুইজন সাথী এমন অনাহারের শিকার হইলাম যে, ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি লোপ পাইয়া গিয়াছিল। আমরা হযরত রাসূল কারীম (স)-এর সাহাবীগণের নিকট নিজেদের অবস্থা ব্যক্ত করিলেও কেহই আমাদেরকে গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন না। অবশেষে আমরা রাসূল কারীম (স)-এর শরণাপন্ন হইলে তিনি আমাদেরকে ঘরে লইয়া গেলেন। ঘরে ছিল তিনটি ছাগল। রাসূল পাক (স) সেইগুলির দুধ দোহন করিয়া নিজেদের মধ্যে বণ্টন করিবার নির্দেশ দিলে আমরা প্রতিদিন ঐ ছাগলের দুধ দোহন করিয়া সকলে পান করিতাম এবং রাসূলে পাক (স)-এর অংশের দুধ তাঁহার জন্য রাখিয়া দিতাম। রাত্রিবেলা তিনি গৃহে আসিয়া ঘুমন্ত ব্যক্তি যেন জাগ্রত না হয় এবং জাগ্রত ব্যক্তি যেন শুনিতে পায় এমন নিম্ন আওয়াজে সালাম করিয়া মসজিদে যাইয়া নামায আদায়ের পর ঘরে ফিরিয়া নিজের অংশের দুধ পান করিতেন।
এক রাত্রে আমি আমার নিজের অংশের দুধ পান করিবার পর শয়তান আমাকে কুমন্ত্রণা দিল যে, রাসূল পাক (স) তো আনসারদের নিকট গমন করেন। তাহারা নিশ্চয় তাঁহার খাবারের আয়োজন করেন এবং তিনি তথায় আহারও করেন। সুতরাং এই সামান্য দুধে তাঁহার কি প্রয়োজন? শয়তানের প্রলোভনে পড়িয়া আমি তাঁহার অংশের দুধও পান করিয়া ফেলিলাম। এইবার শয়তান আমাকে লজ্জা দিয়া বলিতে লাগিল, হতভাগ্য! এইটা তুমি কি করিলে! তুমি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর অংশের দুধ পান করিয়া ফেলিলে? রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিয়া আসিয়া যখন নিজের অংশের দুধ পাইবেন না তখন তোমার জন্য বদদোয়া করিলে তোমার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ হইয়া যাইবে।
আমি ছিলাম একটি ছোট চাদরে আবৃত, যাহা দ্বারা মাথা ঢাকিলে পা খোলা থাকিত, আর পা ঢাকিলে মাথা খোলা থাকিত। তাই আমার ভাল ঘুম হইত না। আমার সঙ্গীদ্বয় ছিলেন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন যাহারা আমার ন্যায় অপরাধ করেন নাই। এই সময় মহানবী (স) আসিয়া সালাম দিয়া নামায আদায় করিতে মসজিদে চলিয়া গেলেন। নামাযান্তে তিনি ঘরে ফিরিয়া নিজের অংশের দুধ পান করিবার উদ্দেশে পাত্র খুলিয়া দেখিতে পাইলেন, পাত্র শূন্য। তিনি মাথা তুলিয়া আকাশের দিকে তাকাইলে, আমি মনে মনে ভাবিলাম, এই বুঝি তিনি আমার জন্য বদদু'আ করিলেন, আর আমি ধ্বংস হইয়া গেলাম। কিন্তু তিনি দু'আ করিলেন: হে আল্লাহ! "যে আমাকে আহার করাইবে তুমি তাহাকে আহার করাও এবং যে আমাকে পান করাইবে তুমি তাহাকে পান করাও"।
এই দু'আ শুনিবামাত্র আমি চাদর গুটাইয়া গাত্রোত্থান করত ছুরি হাতে সর্বাধিক মোটা তাজা ছাগলটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য যবেহ করিতে অগ্রসর হইলাম। কিন্তু আমি সবগুলি ছাগলের স্তনই দুধে পরিপূর্ণ দেখিতে পাইলাম। আমি বড় একটি পাত্র লইলাম যাহাতে দোহন করিবার মত দুধ হইবে বলিয়া তাঁহার পরিবারের কেহ কল্পনাও করিতেন না। আমি দোহন করিলে পাত্রটি পরিপূর্ণ হইয়া উপরে ফেনা ভাসিতে লাগিল। পাত্রটি লইয়া আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে হাযির হইলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমরা তোমাদের অংশের দুধ পান করিয়াছ কি? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি পান করুন। তিনি কিছু পান করিয়া আমাকে দিয়া দিলে দ্বিতীয়বার আমার অনুরোধে তিনি আরও কিছু পান করিয়া আমাকে ফিরাইয়া দিলেন। আমি যখন দেখিলাম, তিনি পূর্ণ তৃপ্তির সাথে পান করিয়াছেন এবং আমার উপর তাঁহার দু'আ লাগিয়াছে, তখন আমি আনন্দে হাসিতে হাসিতে মাটিতে লুটাইয়া পড়িলাম।
আমার এই অবস্থা দেখিয়া মহানবী (স) বলিলেন: মিকদাদ কি অশোভন আচরণ করিতেছে? অতঃপর আমি আমার আনুপূর্বিক ঘটনার বিবরণ দিলে তিনি বলিলেন: এই বরকত আল্লাহ পাকের রহমত বৈ কিছুই নহে। ঘটনা সম্পর্কে তুমি আমাকে পূর্বেই অবহিত করিলে তোমার সঙ্গীদ্বয়কে জাগাইয়া দিতাম। ফলে তাহারাও এই বরকতে শরীক হইতে পারিত। উত্তরে আমি বলিলাম, সেই আল্লাহর কসম যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ প্রেরণ করিয়াছেন। যখন আপনি এই বরকত প্রাপ্ত হইয়াছেন এবং আপনাদের উসীলায় আমিও উহা লাভ করিয়াছি তখন অন্য কেহ তাহা পাইল কি পাইল না, তাহাতে আমার কিছুই যায় আসে না (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ১৮৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ঠ অধ্যয়, পৃ. ১০৬; শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৩৫৭)।
ইমাম বায়হাকী হযরত নাফে' (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে এক সফরে চার শতজন ছিলাম। আমাদের অবস্থানস্থল ও তাহার আশেপাশে কোন পানি না থাকায় সকলেই বিচলিত হইয়া পড়িলাম। রাসূলুল্লাহ (স) ও এই ব্যাপারে অবগত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর দুই শিংবিশিষ্ট একটি বকরী আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে দাঁড়াইয়া গেল। উহাকে দোহন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-সহ আমরা সকলে দুধ পান করিয়া তৃপ্ত হইলাম। অতঃপর আমাকে উদ্দেশ্য করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হে নাফে'। রাত্রে ইহার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তোমার। কিন্তু আমার মনে হইতেছে, তুমি তাহা পারিবে না।" আমি তাই উহাকে ধরিয়া একটি রশি দ্বারা মযবুত করিয়া বাঁধিয়া রাখিলাম। কিন্তু মধ্য রাত্রে আমি জাগ্রত হইয়া অবাক বিস্ময়ে তাকাইয়া দেখিলাম, সেখানে বকরীর কোন চিহ্ন নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিবার পূর্বেই আমি ব্যপারটা তাঁহাকে জানাইলে তিনি বলিলেন, "হে নাফে'। বকরীটি যেইভাবে আসিয়াছিল সেইভাবেই চলিয়া গিয়াছে" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., ৬ষ্ট অধ্যায়, পৃ. ১০৬; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৯৫)।
ইমাম বায়হাকী আবুল 'আলিয়ার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বেশ কিছু সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তিনি কিছু খাবারের উদ্দেশ্যে আপন নয় স্ত্রীর নিকট খাদেমকে পাঠাইলেও কোন খাবার পাওয়া যায় নাই। এরই মাঝে একটি ছোট বকরীর উপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি পড়িল যাহা এখনও পর্যন্ত বাচ্চা দেয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স) উহার ওলানে হাত দিতেই উহা দুধে পরিপূর্ণ হইয়া গেল। তিনি একটি পাত্র আনাইয়া প্রত্যেক স্ত্রীর ঘরে এক এক পেয়ালা করিয়া পাঠাইয়া দিলেন। অতঃপর ঐ বকরী হইতে পুনরায় দুধ বাহির করিয়া উপস্থিত সকলেই পান করিলেন (মাওলানা হাবীবুর রহমান, লামিয়াতুল মু'জিযাত-এর উর্দু শরাহ মাওলানা মুহাম্মদ ইয়া'কূব অনূদিত "আলিয়াতুল মুদিহাত”, পৃ. ২৫৯; মু'জিযা নং ৭৮)।
হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা) বর্ণনা করেন, সেই ভাগ্যবান শিশুটিকে হযরত মুহাম্মাদ (স)] কোলে নিতেই আমার শুষ্ক স্তন দুধে পরিপূর্ণ হইয়া গেল যাহা রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে এবং তাঁহার দুধ ভাই দুইজনেই পান করিয়া পরিতৃপ্ত হইয়া গেলেন। উটনীর দুধ দোহন করিতে যাইয়া অবাক বিস্ময়ে দেখিতে পাইলেন তাহার শুষ্ক ওলানও দুধে পরিপূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। তাঁহার স্বামী তৃপ্তি সহকারে পান করিয়া রাত্রে আরামে ঘুমাইলেন। সকালে জাগ্রত হইতেই তাহার স্বামী বলিতে লাগিলেন, "তুমি ভাল করিয়া জানিয়া রাখিও হে হালীমা! আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেছি, তুমি একটি অত্যন্ত বরকতময় শিশু আনিয়াছ” (সীরাতুল-মুস্তফা, ১খ., পৃ. ৭১; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ১০৮; ইবন হিশাম, সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ১৮৪; শরহে 'আল্লামা যুরকানী, 'আলাল মাওয়াহিবিল-লাদুন্নিয়্যা লিল-কাসতাল্লানী, ১খ., পৃ. ১৪৪)।
হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা) যখন নবী কারীম (স)-কে দুধ পান করাইবার জন্য নিজ গ্রামে লইয়া গেলেন তখন বানূ সা'দ গোত্রের চেয়ে বেশী দুর্ভিক্ষ আর কোন গোত্রে ছিল না। আর মাঠ গুলিও ছিল ঘাসশূন্য। কিন্তু নবী কারীম (স)-এর বরকতে হালিমা সা'দিয়া (রা)-এর বকরীগুলি সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরিয়া আসিত তখন সেইগুলির ওলান থাকিত দুধে পরিপূর্ণ। অথচ অন্যদের বকরীগুলি মাঠ হইতে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরিয়া আসিত, আর উহাদের ওলানে এক ফোঁটা দুধও থাকিত না (আশ-শিফা, ১খ., পৃ. ৭২৮; আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ১০৯; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ১৮৪-১৮৫; সীরাতুল মুস্তাফা (স), ১খ., পৃ: ৭২)।