📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মু'জিযা প্রদর্শন ও উহার সাক্ষ্য
মক্কাবাসী কাফির-মুশরিকদের দাবির প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (স) যখন চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে প্রদর্শন করেন তখন তাহারা এই সুস্পষ্ট মু'জিযা দর্শন করিয়াও প্রতিহিংসা ও অহংকারের বশবর্তী হইয়া অস্বীকার করিতে না পারে সম্ভবত এজন্য তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলকেই তিনি সাক্ষী রাখেন বা সাক্ষ্য দিতে বলেন। উক্ত মু'জিযাকে সাক্ষী রাখা বা সাক্ষ্য প্রদান প্রসঙ্গে আল-কুরআনুল কারীমের কোথাও এ বিষয়ে তেমন কোন উল্লেখ বা সমান্যতম ইঙ্গিতও করা হয় নাই বলিয়া বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কুরআন গবেষকগণ মনে করেন। তবে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থাবলীতে প্রসঙ্গটি চমৎকারভাবে উল্লিখিত হইয়াছে।
বিভিন্ন হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থাবলীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ্ (স) মহান আল্লাহ্ সীমাহীন কুদরতে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া প্রদর্শিত করিবার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলকেই সাক্ষ্য দিতে বা সাক্ষী থাকিতে আদেশ করেন। তিনি সাক্ষী থাকা বা সাক্ষ্য দেয়া প্রসঙ্গে আদেশ ও দু'আসূচক বিভিন্ন পদবাচ্য শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। কখনও তিনি উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করিয়া বলেন : اشهدوا "তোমরা সকলেই সাক্ষ্য দাও বা তোমরা উক্ত মু'জিযা সম্পর্কে সাক্ষী থাক" (সহীহুল বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, হাদীছ নং ৪৮৬৪, পৃ. ১০৪৩; সহীহ মুসলিম, বাব ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; সুনান আত-তিরমিযী, হাদীছ নং ৩২৮৫, ৩২৮৭, ৫খ., পৃ. ৩৯৬-৩৯৭; তাবারী, তাফসীর, প্রাগুক্ত, ২৭খ., পৃ. ৮৫-৮৭.; আন-নাসাঈ, হাদীছ নং ১১৫৫৩, ৬খ., পৃ. ৪৭৬; তাফসীর জালালায়ন, ১খ., পৃ. ৭০৪.)।
ইমাম কুরতুবী স্বীয় তাফসীরে 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন যাহাতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সকলকে সম্বোধন করিয়া বলেন, يا فلان يا فلان “ওহে অমুক! ওহে অমুক! তোমরা সকলেই সাক্ষী থাক" (কুরতুবী, তাফসীর, ১৭খ., পৃ. ১২৭)।
ইবন কাছীর স্বীয় তারীখে আবূ নু'আয়ম-এর উদ্ধৃতিতে ইবন 'আব্বাস (রা)-এর আরও একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ সালামা ইবন 'আবদুল আসাদ এবং আল-আরকাম ইবনুল আরকামকে সম্বোধন করিয়া বলেন : উক্ত মু'জিযা প্রসঙ্গে তোমরা সাক্ষ্য দাও (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৭)।
হাদীছ ও সীরাতের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ হইতে আরো জানা যায়, মহান আল্লাহর সীমাহীন কুদরতে উক্ত মু'জিযা প্রদর্শনের পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সকলের সামনে আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন এবং বলেন, اللهم إشهد "আয় আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক” (সহীহ মুসলিম, বাবু ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৩; তাবারী, তাফসীর, ২৭খ., পৃ. ৮৫; আন-নাসায়ী, হাদীছ নং ১১৫৫২, ৬খ., পৃ. ৪৭৬)। তাবারী স্বীয় তাফসীরে মুজাহিদ-এর উদ্ধৃতিতে একটি রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন যাহাতে আবূ বকর (রা)-কে সাক্ষী থাকার বিষয়টি উল্লিখিত হইয়াছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ বকর (রা)-কে বলেন : إشهد يا أبابكر "হে আবুবকর! তুমি সাক্ষী থাক" (তাবারী, তাফসীর, ২৭খ., পৃ. ৮৭; আরও দ্র. ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৪)।
📄 দ্বিখণ্ডিত চাঁদ দর্শনে মুশরিকদের প্রতিক্রিয়া
মুশরিকদের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইলে তাহাদের মধ্যে যে সকল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল তাহা আল-কুরআনুল কারীম প্রকাশ করিয়াছে: وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَا لَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ وَإِنْ يَرَوْا أَيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌّ .
"তাহারা যদি কোন মু'জিযা দেখে তবে মুখ ফিরাইয়া নেয় এবং বলে, এটা তো চিরায়ত যাদু। তাহারা সত্যকে অস্বীকার করিয়াছে এবং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করিয়াছে, প্রত্যেক বিষয়ে যথা সময়েই স্থিরীকৃত হয়" (৫৪: ২-৩)।
কুরআন গবেষকগণ মনে করেন, কুরআন মজীদের সূরা আল-কামারে বর্ণিত উল্লিখিত আয়াতে একদিকে যেমন মুশরিকদের স্বভাব- চরিত্রের পরিচয় তুলিয়া ধরা হইয়াছে, অন্যদিকে উক্ত মু'জিযা দর্শনে তাহাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল বা সত্যকে প্রত্যাখ্যানের যে স্বরূপ ফুটিয়া উঠিয়াছিল তাহার চিত্র ও তুলিয়া ধরা হইয়াছে। এই মু'জিযাটি চাক্ষুষভাবে দেখিয়াও তাহারা হিংসাপরায়ণতার বশবর্তী হইয়া মুখ ফিরাইয়া নিয়াছিল, এমনকি তাহারা বলিয়াছিল, মুহাম্মাদ আমাদেরকে যাদু করিয়াছে। এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ স্বীয় কিতাবে জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা)-এর রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যুগেই চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল। খণ্ডিত চাঁদের এক অংশ এই পাহাড়ে এবং অন্য অংশ এই পহাড়ে (ভিন্ন পাহাড়ে)-এর উপর দেখা গিয়াছিল। ইহারপর মক্কাবাসী কাফিররা বলিল যে, মুহাম্মাদ আমাদের সকলের উপর যাদু করিয়াছে। তাহাদের কেহ কেহ আবার বলিতে লাগিল, যদিও মুহাম্মদ আমাদের উপর যাদু করিয়াছে কখনও সে সকল মানুষের উপর যাদু করিতে সক্ষম হইবে না (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৭)।
📄 চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সময় সাহাবায়ে কিরামের উপস্থিতি
চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামের সংখ্যা কত ছিল সে সম্পর্কে তেমন কোন সংখ্যার কথা জানা যায় না। তবে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক উক্ত মু'জিযা প্রদর্শনের সময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহাবায়ে কিরাম উপস্থিত ছিলেন। এই সম্পর্কীয় বর্ণনার জন্য দ্র. সাহীহুল বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবু তাফসীরিল কুরআন, হাদীছ নং ৪৯৬৫, পৃ. ১০৪৩; সহীহ মুসলিম, বাবু ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; সুনান আত-তিরমিযী, হাদীছ নং ৩২৮৫, ৩২৮৭, ৫খ., পৃ. ৩৯৭-৩৯৮; তাবারী, তাফসীর, ২৭ খ., পৃ. ৮৫; ইব্ন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৩)।
📄 চাঁদ কতবার দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল?
রাসূলুল্লাহ (স) একবারই চন্দ্রকে দ্বিখণ্ডিত করিয়াছিলেন বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ অভিন্ন মত ব্যক্ত করিয়াছেন। শুধু আনাস ইবন মালিক (র)-এর রিওয়ায়াত হইতে জানা যায়, চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা মক্কাভূমিতে দুইবার সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি বলেন, মক্কাবাসীরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একটি মু'জিযা প্রদর্শনের দাবি করে। তিনি মক্কাভূমিতেই দুইবার চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করেন। অতঃপর এতদসংশ্লিষ্ট আয়াত নাযিল হয় (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩২৮৬, ৫খ., পৃ. ৭৩৯; কুরতুবী, তাফসীর, ১৭ খ., পৃ. ১২৬; তাবারী, তাফসীর, ২৭ খৃ., পৃ. ৮৪, ৮৫ ও ৮৭; আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৬-১১৭)। এই হাদীছে দুইবার (مرتين) চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল কথাটি চন্দ্রের দুই খণ্ডকে দুইবার (قطعتين) বলিয়া রাবী বর্ণনা করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ১খ, পৃ. ৫১৩, পাদটীকা নং ১০)।
উপসংহারঃ 'ইনশিকাকুল কামার' বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি অনন্য মু'জিযা। মূলত আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাধ্যমে এই মু'জিযা সংঘটিত হইয়াছিল। আল-কুরআনুল কারীমে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া সম্পর্কে যেসব তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করা হইয়াছে তাহা এবং প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীছ ও সীরাতের যে সকল বর্ণনা আমাদের নিকট পৌছিয়াছে তাহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত মু'জিযা সন্দেহাতীতভাবে সত্য এবং অকাট্যরূপে স্বীকৃত।