📄 যে সকল পর্বতমালার মধ্য দিয়া দ্বিখণ্ডিত চাঁদ প্রদর্শিত হইয়াছিল
রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক দ্বিখণ্ডিত চাঁদ বিভিন্ন পর্বতমালার মধ্যে প্রদর্শিত হইয়াছিল বলিয়া প্রামাণ্য ও নির্ভযোগ্য হাদীছ গ্রন্থাবলী এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সীরাত গবেষকদের মতামত হইতে জানা যায়। এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী ও মুসলিম (র) কর্তৃক উদ্ধৃত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর রিওয়ায়াতাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মক্কাবাসীদের কোন একটি নিদর্শন দেখানোর দাবি জানানোর প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে এমনভাবে দ্বিখণ্ডিত চাঁদ প্রদর্শন করেন যে, উভয় খণ্ডের মাঝে 'হেরা' (حراء) পর্বত দেখিতে পাইতেছিলেন (নাদরাতুন না'ঈম, বঙ্গানু. ১খ., পৃ. ৬৫৯)। তবে বেশ কিছু বর্ণনায় আবূ কুবায়স (ابو قبیس) ও কু'আয়কি'আন (قعيقعان) পাহাড়ের নাম উল্লিখিত হইয়াছে (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৭; আল-ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ২৭২)। তবে ইবনুল জাওযী স্বীয় গ্রন্থে কু'আয়কি'আন-এর পরিবর্তে কী'আন (قيعان) শব্দ উল্লেখ করিয়াছেন (আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৭৩)। ইহা ছাড়া তিনি স্বীয় কিতাবে মুজাহিদ-এর একটি রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন যাহাতে নির্দিষ্ট কোন পাহাড়ের নাম উল্লেখ করা হয় নাই; বরং তাহাতে বলা হইয়াছে, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পর একখণ্ড কোন এক পাহাড়ের উপর দেখা গেল এবং অন্য খণ্ডটি পাহাড়ের পশ্চাতে দেখা গেল (আল-ওয়াফা, ১খ., পৃ. ২৭২)। ইবন কাছীরও স্বীয় তাফসীরে কয়েকটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন যাহাতে নির্দিষ্ট কোন পাহাড়ের নাম উল্লেখ করা হয় নাই (ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৩; অনুরূপ বর্ণনার জন্য আরো বিস্তারিত দ্রষ্টব্য আন-নাসাঈ, ৬খ., পৃ. ২৬৩)। ইবন আব্বাস (রা)-এর সনদ-পরম্পরায় ইব্ন কাছীর স্বীয় সীরাত-এ সাফা (صفا) এবং মারওয়া (مروة) পাহাড়ের নাম উল্লেখ করিয়াছেন (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৮; আবূ নু'আয়ম, দালাইলুন নুবৃওয়াহ, পৃ. ২৩৫)।
📄 প্রদর্শিত চাঁদের টুকরার সংখ্যা
প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য হাদীছ গ্রন্থাবলীর প্রাপ্ত তথ্যে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক প্রদর্শিত চাঁদের টুকরার সংখ্যা ছিল দুইটি। এই প্রসঙ্গে সহীহ মুসলিমে 'আবদুল্লাহ (রা) -এর রিওয়ায়াত এভাবে উল্লিখিত হইয়াছে: রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যুগেই চন্দ্র দ্বিখণ্ডে খণ্ডিত হইয়াছিল। অতঃপর তিনি উপস্থিত সকলকে বলেন, তোমরা সাক্ষ্য দাও (সাহীহ মুসলিম, বাব ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; রাসূলুল্লাহ্ (স) কর্তৃক বিদীর্ণকৃত চাঁদের টুকরার সংখ্যা যে দুইটি ছিল সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য আরও দ্রষ্টব্য সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং ২৮০২, ৪খ., পৃ. ২১৫৯; সুনান আত-তিরমিযী, হাদীছ নং ৩২৮৫, ৩২৮৯, ৫খ., পৃ. ৩৯৭; কুরতুবী, তাফসীর, ১৭খ., পৃ. ১২৭; তাবারী, তাফসীর, ২৭খ., পৃ. ৮৫; ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬২-২৬৩; আন-নাসাঈ, হাদীছ নং ১১৫৫২, ১১৫৫৩, ৬খ., পৃ. ৪৭৬; তাফসীরুল জালালায়ন, ১খ., পৃ. ৭০৪)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক মু'জিযা প্রদর্শন ও উহার সাক্ষ্য
মক্কাবাসী কাফির-মুশরিকদের দাবির প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (স) যখন চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে প্রদর্শন করেন তখন তাহারা এই সুস্পষ্ট মু'জিযা দর্শন করিয়াও প্রতিহিংসা ও অহংকারের বশবর্তী হইয়া অস্বীকার করিতে না পারে সম্ভবত এজন্য তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলকেই তিনি সাক্ষী রাখেন বা সাক্ষ্য দিতে বলেন। উক্ত মু'জিযাকে সাক্ষী রাখা বা সাক্ষ্য প্রদান প্রসঙ্গে আল-কুরআনুল কারীমের কোথাও এ বিষয়ে তেমন কোন উল্লেখ বা সমান্যতম ইঙ্গিতও করা হয় নাই বলিয়া বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কুরআন গবেষকগণ মনে করেন। তবে নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থাবলীতে প্রসঙ্গটি চমৎকারভাবে উল্লিখিত হইয়াছে।
বিভিন্ন হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থাবলীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ্ (স) মহান আল্লাহ্ সীমাহীন কুদরতে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া প্রদর্শিত করিবার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত সকলকেই সাক্ষ্য দিতে বা সাক্ষী থাকিতে আদেশ করেন। তিনি সাক্ষী থাকা বা সাক্ষ্য দেয়া প্রসঙ্গে আদেশ ও দু'আসূচক বিভিন্ন পদবাচ্য শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। কখনও তিনি উপস্থিত সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করিয়া বলেন : اشهدوا "তোমরা সকলেই সাক্ষ্য দাও বা তোমরা উক্ত মু'জিযা সম্পর্কে সাক্ষী থাক" (সহীহুল বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, হাদীছ নং ৪৮৬৪, পৃ. ১০৪৩; সহীহ মুসলিম, বাব ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; সুনান আত-তিরমিযী, হাদীছ নং ৩২৮৫, ৩২৮৭, ৫খ., পৃ. ৩৯৬-৩৯৭; তাবারী, তাফসীর, প্রাগুক্ত, ২৭খ., পৃ. ৮৫-৮৭.; আন-নাসাঈ, হাদীছ নং ১১৫৫৩, ৬খ., পৃ. ৪৭৬; তাফসীর জালালায়ন, ১খ., পৃ. ৭০৪.)।
ইমাম কুরতুবী স্বীয় তাফসীরে 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা)-এর একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন যাহাতে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সকলকে সম্বোধন করিয়া বলেন, يا فلان يا فلان “ওহে অমুক! ওহে অমুক! তোমরা সকলেই সাক্ষী থাক" (কুরতুবী, তাফসীর, ১৭খ., পৃ. ১২৭)।
ইবন কাছীর স্বীয় তারীখে আবূ নু'আয়ম-এর উদ্ধৃতিতে ইবন 'আব্বাস (রা)-এর আরও একটি রিওয়ায়াত উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ সালামা ইবন 'আবদুল আসাদ এবং আল-আরকাম ইবনুল আরকামকে সম্বোধন করিয়া বলেন : উক্ত মু'জিযা প্রসঙ্গে তোমরা সাক্ষ্য দাও (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৭)।
হাদীছ ও সীরাতের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ হইতে আরো জানা যায়, মহান আল্লাহর সীমাহীন কুদরতে উক্ত মু'জিযা প্রদর্শনের পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স) উপস্থিত সকলের সামনে আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন এবং বলেন, اللهم إشهد "আয় আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক” (সহীহ মুসলিম, বাবু ইনশিকাকিল কামার, হাদীছ নং ২৮০০, ৪খ., পৃ. ২১৫৮; ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৩; তাবারী, তাফসীর, ২৭খ., পৃ. ৮৫; আন-নাসায়ী, হাদীছ নং ১১৫৫২, ৬খ., পৃ. ৪৭৬)। তাবারী স্বীয় তাফসীরে মুজাহিদ-এর উদ্ধৃতিতে একটি রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন যাহাতে আবূ বকর (রা)-কে সাক্ষী থাকার বিষয়টি উল্লিখিত হইয়াছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (স) আবূ বকর (রা)-কে বলেন : إشهد يا أبابكر "হে আবুবকর! তুমি সাক্ষী থাক" (তাবারী, তাফসীর, ২৭খ., পৃ. ৮৭; আরও দ্র. ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ২৬৪)।
📄 দ্বিখণ্ডিত চাঁদ দর্শনে মুশরিকদের প্রতিক্রিয়া
মুশরিকদের মু'জিযা প্রদর্শনের দাবির চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইলে তাহাদের মধ্যে যে সকল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল তাহা আল-কুরআনুল কারীম প্রকাশ করিয়াছে: وَكَذَّبُوا وَاتَّبَعُوا أَهْوَا لَهُمْ وَكُلُّ أَمْرٍ مُسْتَقِرٌّ وَإِنْ يَرَوْا أَيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُسْتَمِرٌّ .
"তাহারা যদি কোন মু'জিযা দেখে তবে মুখ ফিরাইয়া নেয় এবং বলে, এটা তো চিরায়ত যাদু। তাহারা সত্যকে অস্বীকার করিয়াছে এবং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করিয়াছে, প্রত্যেক বিষয়ে যথা সময়েই স্থিরীকৃত হয়" (৫৪: ২-৩)।
কুরআন গবেষকগণ মনে করেন, কুরআন মজীদের সূরা আল-কামারে বর্ণিত উল্লিখিত আয়াতে একদিকে যেমন মুশরিকদের স্বভাব- চরিত্রের পরিচয় তুলিয়া ধরা হইয়াছে, অন্যদিকে উক্ত মু'জিযা দর্শনে তাহাদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়াছিল বা সত্যকে প্রত্যাখ্যানের যে স্বরূপ ফুটিয়া উঠিয়াছিল তাহার চিত্র ও তুলিয়া ধরা হইয়াছে। এই মু'জিযাটি চাক্ষুষভাবে দেখিয়াও তাহারা হিংসাপরায়ণতার বশবর্তী হইয়া মুখ ফিরাইয়া নিয়াছিল, এমনকি তাহারা বলিয়াছিল, মুহাম্মাদ আমাদেরকে যাদু করিয়াছে। এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ স্বীয় কিতাবে জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা)-এর রিওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যুগেই চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হইয়াছিল। খণ্ডিত চাঁদের এক অংশ এই পাহাড়ে এবং অন্য অংশ এই পহাড়ে (ভিন্ন পাহাড়ে)-এর উপর দেখা গিয়াছিল। ইহারপর মক্কাবাসী কাফিররা বলিল যে, মুহাম্মাদ আমাদের সকলের উপর যাদু করিয়াছে। তাহাদের কেহ কেহ আবার বলিতে লাগিল, যদিও মুহাম্মদ আমাদের উপর যাদু করিয়াছে কখনও সে সকল মানুষের উপর যাদু করিতে সক্ষম হইবে না (আল-বিদায়া, ৩খ., পৃ. ১১৭)।