📄 দৃষ্টান্ত-২: খৃস্টানদের প্রতি মুবাহালার চ্যালেঞ্জ
নাজরানের খৃস্টান পাদ্রীদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় আগমন করিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিল, মুহাম্মাদ। ঈসা (আ) সম্বন্ধে আপনার মত কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা আমার এখানে কিছু সময় অপেক্ষা কর। এই সম্বন্ধে মহান আল্লাহ আমাকে যাহা জানাইবেন আমি তোমাদেরকে তাহা জানাইয়া দিব। কিছুক্ষণ পর নাযিল হইল:
إِنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُنْ مِّنَ الْمُمْتَرِيْنَ .
"আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলাম। অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলাম, হও, ফলে সে হইয়া গেল। এই সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে। সুতরাং তুমি সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হইও না" (৩:৫৯-৬০)।
হযরত ঈসা (আ) সম্বন্ধে কুরআনের এই ব্যাখ্যা নাজরানের খৃস্টান পাদ্রীগণ মানিয়া লইতে অস্বীকার করিল। তখন কুরআন তাহাদেরকে মুবাহালার চ্যালেঞ্জ দিয়া বলিল:
فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَذِبِينَ . إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْقَصَصُ الْحَقُّ وَمَا مِنْ إِلَّهُ إِلَّا اللهُ وَإِنَّ اللَّهَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ .
"তোমার নিকট জ্ঞান আসিবার পর যে কেহ এই বিষয়ে তোমার সহিত তর্কে লিপ্ত হয় তাহাকে বল, আইস! আমরা আহবান করি আমাদের পুত্রগণকে ও তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারিগণকে ও তোমাদের নারিগণকে, আমাদের নিজদেরকে ও তোমাদের নিজদেরকে। অতঃপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর দেই আল্লাহ্ লা'নত। নিশ্চয় ইহা সত্য বৃত্তান্ত। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য ইলাহ নাই। নিশ্চয় আল্লাহ্ পরম প্রতাপশালী ও প্রজ্ঞাময়” (৩ঃ ৬১-৬২)।
এই মুবাহালার চ্যালেঞ্জের পর খৃস্টানগণ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িল। তাহারা কুরআনের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করিল এবং জিয়া প্রদানের শর্তে নিরাপত্তা চুক্তি করিতে বাধ্য হইল (ইব্ন কাছীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১০৬)।
فَإِن تَوَلُّوا فَإِنَّ اللهَ عَلِيمٌ بِالْمُفْسِدِينَ . "যদি তাঁহারা মুখ ফিরাইয়া লয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ফাঁসাদকারীদের সম্বন্ধে সম্যক অবগত" (৩ঃ ৬৩)।
এইভাবে "কুরআনের ঘোষণাই সত্য হইল যে, ইহারাই ফাসাদ সৃষ্টিকারী। ইহারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আগাইয়া আসিবে না।
📄 দৃষ্টান্ত-৩: আবু লাহাব ও তাহার স্ত্রীর ধ্বংসযজ্ঞ
আবু লাহাব ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের সন্তানদের মধ্যে অন্যতম। সে ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরম শত্রু। সে নানাভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-কে কষ্ট দিত। নবৃওয়াতের তৃতীয় বৎসরে যখন এই আয়াত নাযিল হয় :
وَأَنذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبَيْنَ "আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন" (২৬ : ২১৪) তখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পর্বতে আরোহণ করিয়া কুরায়শ গোত্রকে আহবান করেন এবং তাহাদেরকে শির্ক ও কৃষ্ণের কারণে কঠিন আযাবের মুখামুখি হওয়া সম্পর্কে সতর্ক করেন। পিতৃব্য আবু লাহাব এই কথা শুনিয়া বলিয়া উঠিল : تبا لك الهذا جمعتنا 'ধ্বংস হউক তোমার! এইজন্যই কি তুমি আমাদেরকে একত্র করিয়াছ"? অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে পাথর মারিতে উদ্যত হইল। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াত নাযিল করেন :
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وتَبَ. مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ. سَيَصْلَى تَارَاً ذات لهب . “ধ্বংস হউক আবু লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হউক সে নিজেও। তাহার ধন-সম্পদ ও তাহার উপার্জন তাহার কোন কাজে আসে নাই। অচিরেই সে দগ্ধ হইবে লেলিহান অগ্নিতে" (১১১:১-৩)।
আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীলও রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করিত। সেও তাহার স্বামীর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরোধিতায় সমভাবে জড়িত ছিল। সূরার শেষাংশে তাহার পরিণতির কথাও ব্যক্ত হইয়াছে।
وَأَمْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ فِي جَيْدِهَا حَبْلٌ مِّنْ مُسَدٍ . "এবং তাহার স্ত্রীও যে ইন্ধন বহন করে, তাহার গলদেশে পাকানো রশি" (১১১:৪-৫)।
আল-কুরআনে বর্ণিত আবু লাহাব ও তাহার স্ত্রীর এই করুণ পরিণতি এক শতভাগ সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। তাহাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাহাদের কোন উপকারে আসে নাই। আবু লাহাব প্লেগে আক্রান্ত হয়। সংক্রমণের ভয়ে তাহার পরিবারের লোকজন তাহাকে বিজন ভূমিতে রাখিয়া আসে। শেষ পর্যন্ত এই করুণ অসহায়ত্বের মধ্যে সে মারা যায়। অনুরূপ তাহার স্ত্রী পাহাড় হইতে লাকড়ীর বোঝা বহনকালে বোঝা ফসকাইয়া গলায় ফাঁস খায় এবং এই অবস্থায় তাহার মৃত্যু হয় (ফাওয়াইদে উছমানী, পৃ. ৭৯০-৭৯১)।