📄 দৃষ্টান্ত : ২
নবৃওয়াতের চতুর্দশ বৎসরের মুহাররমে কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাওয়াতী তৎপরতা প্রতিরোধ করিবার জন্য একটা কার্যকর উপায় উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এক গোপন বৈঠকে সমবেত হয়। কুরায়শদের প্রসিদ্ধ নেতৃবৃন্দ এই বৈঠকে যোগদান করিয়াছিল। বৈঠকে নিম্নবর্ণিত প্রস্তাবসমূহ আলোচিত হয়।
১. মুহাম্মাদের হাতে-পায়ে বেড়ী লাগাইয়া কারাবাসে নিক্ষেপ করা হউক।
২. তাহাকে একটি পাগলা উটের পিঠে বসাইয়া দেশান্তর করা হউক।
৩. তাহাকে হত্যা করা হউক। দীর্ঘ আলোচনার পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হইল। কুরায়শগণ এই বৈঠকটি অতি গোপনে করিয়াছিল এবং বৈঠকের বিষয়বস্তুও যথাসাধ্য গোপন রাখিয়াছিল। কিন্তু আল-কুরআন তাহাদের এই অতি গোপনীয় বৈঠকের যাবতীয় কার্যক্রম ফাঁস করিয়া দিল। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
"স্মরণ কর, কাফিরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করিবার জন্য, হত্যা করিবার জন্য অথবা নির্বাসিত করিবার জন্য এবং তাহারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহ্ও কৌশল করেন। আর আল্লাহ কৌশলীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ" (৮: ৩০; ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৪৮০)।
📄 দৃষ্টান্ত : ৩
মদীনার মুনাফিকরা সর্বদা এই চিন্তায় ব্যাপৃত ছিল যে, কি উপায়ে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করা যায়। এই কুমতলবে তাহারা কুবা মসজিদের নিকটবর্তী মহল্লায় একটি মসজিদ তৈয়ার করিল। রাসূলে কারীম (স) তাবুক অভিযানে রওয়ানার প্রাক্কালে তাহারা তাঁহার খিদমতে হাজির হইয়া বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! পীড়িত, দুর্বল ও বৃদ্ধ লোকেরা মসজিদে নববীতে কিংবা কুবা মসজিদে যাইতে পারে না। তাহাদের জামা'আতে নামায আদায়ের সুবিধার জন্য আমরা একটি মসজিদ তৈয়ার করিয়াছি। মেহেরবানী করিয়া আপনি উক্ত মসজিদে একবার নামায পড়িয়া উদ্বোধন করিয়া দিন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এখন তো আমি তাবুকে রওয়ানা হইয়াছি। ফিরিবার পর দেখা যাইবে। রাসূলে করীম (স) তাবুক হইতে ফিরিবার পথে তাহাদের মসজিদে গমনের ইচ্ছা করিলেন। তখন আল-কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে তাহাদের গোপন উদ্দেশ্য ফাঁস করিয়া দেওয়া হয় এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে সেখানে যাইতে নিষেধ করা হয়।
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضراراً وكُفْرًا وتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَارْصَادًا لَمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلا الْحُسْنَى وَاللهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَذِبُونَ . لَا تَقُمْ فِيْهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أَسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ . أَفَمَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى تَقْوَى مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ خَيْرٌ أَمْ مِّنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى شَفَا جُرُفَ هَارٍ فَأَنْهَارَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ لا يَزَالُ بُنْيَانُهُمُ الَّذِي بَنَوا رِيبَةً فِي قُلُوبِهِمْ إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ .
"যাহারা মসজিদ নির্মাণ করিয়াছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মু'মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতোপূর্বে আল্লাহ ও তাহার রাসূলের বিরুদ্ধে যে ব্যক্তি সংগ্রাম করিয়াছে তাহার গোপন ঘাটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তাহারা অবশ্যই শপথ করিয়া বলিবে, আমরা সদুদ্দেশ্যেই ইহা করিয়াছি। আল্লাহ সাক্ষী, তাহারা তো মিথ্যাবাদী। তুমি ইহাতে কখনও দাঁড়াইও না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হইতেই স্থাপিত হইয়াছে তাকওয়ার উপর, উহাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। তথায় এমন লোক আছে যাহারা পবিত্রতা অর্জন ভালবাসে এবং আল্লাহ্ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন। যে ব্যক্তি তাহার গৃহের ভিত্তি আল্লাহভীতি ও আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উপর স্থাপন করে সে উত্তম না ঐ ব্যক্তি উত্তম যে তাহার গৃহের ভিত্তি স্থাপন করে এক খাতের ধ্বংসোম্মুখ কিনারায়, ফলে যাহা উহাকেসহ জাহান্নামের অগ্নিতে পতিত হয়? অাল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না। উহাদের গৃহ যাহা উহারা নির্মাণ করিয়াছে তাহা উহাদের অন্তরে সন্দেহের কারণ হইয়া থাকিবে যে পর্যন্ত না উহাদের অন্তর ছিন্নভিন্ন হইয়া যায়। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়" (৯: ১০৭-১১০)।
উক্ত আয়াতগুলি নাযিল হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তথাকথিত মসজিদ নামক কাফিরদের আড্ডাখানা ধ্বংস করিবার জন্য একদল সাহাবীকে প্রেরণ করেন। তাহারা আগুন লাগাইয়া উহাকে ভস্মীভূত করিয়া দেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ৫২৯)।
এইভাবে আল-কুরআন মানুষের অন্তরে নিহিত বিষয়কে প্রকাশ করিয়া শ্রেষ্ঠতম মু'জিযার আসন অলংকৃত করিয়াছে।