📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-১: লূত সাগর বা মৃত সাগর

📄 দৃষ্টান্ত-১: লূত সাগর বা মৃত সাগর


জর্দান ও বায়তুল মুকাদ্দাসের মধ্য দিয়া প্রবাহিত এবং উত্তর ও দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত এই সাগরটি 'ধৃত সাগর' বা 'মৃত সাগর' নামে বিখ্যাত। সাগরটির একমাত্র সংযোগ হইল জর্দান নদীর সহিত। হযরত লূত (আ)-এর জাতির বসবাস ছিল এই অঞ্চলে। সাগরটির দৈর্ঘ্য ৭৭ কিলোমিটার, প্রস্থে ৫ হইতে ১৮ কিলোমিটার। সমুদ্র সমতল হইতে ইহার অবস্থান প্রায় ৪০০ মিটার নীচে। ইহার পানি অত্যধিক লবণাক্ত। সাধারণত সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা প্রতি হাজার গ্রামে ৩.৫ ভাগ। কিন্তু মৃত সাগরের পানির লবণাক্ততার পরিমাণ প্রতি হাজার গ্রামে ২৩৮ ভাগ। এই অস্বাভাবিক লবণাক্ততার কারণে উহার পানির ঘনত্বও অনেক অনেক বেশী। ফলে উহাতে কোন প্রাণী ডুবে না। উহার পানি এতই বিষাক্ত যে, উহাতে কোন প্রাণী বাঁচেও না। সাম্প্রতিক কালে রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গিয়াছে যে, উহার পানিতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম ক্লোরাইড, ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং সোডিয়াম সালফেট রহিয়াছে। এই সমস্ত রাসায়নিক উপাদানের সামান্য পরিমাণই কোন কিছু বিষাক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। পৃথিবীতে এইরূপ বৈশিষ্ট্যের সমুদ্র দ্বিতীয়টি নাই। ইহার কারণ ও রহস্য কি?
কুরআন কারীম ইহার ব্যাখ্যা দিয়াছে। বস্তুত এখানে কোন সমুদ্র ছিল না, এখানে ছিল হযরত লূত (আ)-এর জাতির বাসস্থান। তাহারা যখন আল্লাহ্র নির্দেশ অমান্য করিয়া চরম পাপাচারে লিপ্ত হইল, এমনকি সমকামিতার ন্যায় ঘৃণ্য অপরাধে নিজদেরকে অভ্যস্ত করিয়া তুলিল, তখন মহান রাব্বুল 'আলামীন তাহাদেরকে কঠিন শাস্তি দিলেন। তাহাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষিত হইল। তাহাদের বসতীসহ তাহাদের ভূখণ্ডকে উল্টাইয়া দেওয়া হইল। ইরশাদ হইয়াছে:
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِّنَ الْعُلَمِينَ ، إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِّنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِّنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أَنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ . فَأَنْجَيْنَهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغُبِرِينَ ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَراً فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ.
"এবং দূতকেও পাঠাইলাম। সে তাঁহার সম্প্রদায়কে বলিয়াছিল, তোমরা এমন কুকর্ম করিতেছ যাহা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেহ করে নাই। তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্য নারী ছাড়িয়া পুরুষের নিকট গমন করিতেছ! তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। উত্তরে তাহার সম্প্রদায় শুধু বলিল, ইহাদেরকে তোমাদের জনপদ হইতে বহিষ্কৃত কর। ইহারা তো এমন লোক, যাহারা অতি পবিত্র হইতে চাহে। অতঃপর আমি তাহাকে ও তাহার স্ত্রী ব্যতীত তাহার পরিবার-পরিজনকে উদ্ধার করিয়াছিলাম। তাহার স্ত্রী ছিল পশ্চাতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত, তাহাদের উপর বিশেষ বৃষ্টি বর্ষণ করিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কী হইয়াছিল তাহা লক্ষ্য কর" (৭:৮০-৮৪)।
সুরায়ে হৃদে আরও স্পষ্ট ভাষায় তাহাদের জনপদ উল্টাইয়া ধ্বংস করিবার কথা বিবৃত হইয়াছে:
فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّنْ سِجِّيلٍ مَنْضُورٍ . مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدِ .
"অতঃপর যখন আমার আদেশ আসিল তখন আমি জনপদকে উল্টাইয়া দিলাম এবং উহাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করিলাম প্রস্তর কংকর যাহা তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত ছিল। ইহা জালিমদের হইতে দূরে নহে” (১১:৮২-৮৩)।
অভিশপ্ত লূত জাতির ধ্বংসের পর আল্লাহ তা'আলা ইহাকে ভবিষ্যত মানুষের নিকট দৃষ্টান্ত স্থল হিসাবে চিরস্থায়ী করিয়াছেন। ইহাই আজকের মৃত সাগর বা লূত সাগর (দ্র. তাফসীর গ্রন্থসমূহে সূরা হুদ ও সূরা আ'রাফ-এর সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের তাফসীর)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-২: মাআরিব বাঁধ

📄 দৃষ্টান্ত-২: মাআরিব বাঁধ


কুরআন কারীম ইয়ামানের 'সাবা' সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক 'মাআরিব বাঁধ' সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য প্রদান করিয়াছে। আল-কুরআন নাযিল হওয়ার কালে ইহা ছিল মানুষের অজানা। সাম্প্রতিক কালের প্রখ্যাত ইউরোপীয় পর্যটক আর্নাড মাআরিব বাঁধ প্রসঙ্গে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, কুরআন কারীমে বর্ণিত স্থানে যাবতীয় বৈশিষ্ট্যসহ মাআরিব বাঁধ আবিষ্কৃত হইয়াছে এবং কালের বিবর্তনে এখনও বাঁধটির এক-তৃতীয়াংশ দেওয়াল টিকিয়া রহিয়াছে (দ্র. তরজমায়ে শায়খুল হিন্দ, ফাওয়ায়িদে উছমানী, পৃ. ৫৫৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-৩: হযরত নূহ (আ)-এর জাতির পরিণতি

📄 দৃষ্টান্ত-৩: হযরত নূহ (আ)-এর জাতির পরিণতি


হযরত নূহ (আ)-এর জাতি তাঁহার দাওয়াত অস্বীকার করিলে আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদেরকে মহাপ্লাবনের আযাব দ্বারা ধ্বংস করিয়াছেন। ঈমানদারগণকে রক্ষার জন্য আল্লাহ পাক হযরত নূহ (আ)-কে বিশালাকৃতির একটি নৌযান তৈরীর নির্দেশ দেন। নির্ধারিত সময়ে প্লাবন আরম্ভ হয়। হযরত নূহ (আ) ঈমানদারগণকে লইয়া নৌযানে আরোহণ করেন। মহাপ্লাবনের অথৈ পানিতে নৌযান ভাসিয়া চলিল। অবশেষে প্লাবন অপসৃত হইলে তাঁহার নৌযানটি জুদী পর্বতের শীর্ষচূড়ায় গিয়া থামিল (সূরা হৃদঃ ৪৪)।
কুরআন কারীমে হযরত নূহ (আ)-এর জাতির ধ্বংস এবং তাঁহার ও তাঁহার ঈমানদার সহচরবৃন্দের নৌযানে নিরাপদ থাকার এই ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। আধুনিক কালে আল-কুরআনের এই ঐতিহাসিক তথ্য বাস্তবে প্রমাণিত হইয়াছে। ১৯৫০ সালে নাসার বিজ্ঞানীগণ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তুরস্কের একটি পর্বত শৃঙ্গের নিকটবর্তী ভূতলে মানব চক্ষু সদৃশ্য একটি চিত্রের সন্ধান পান। তৎপর বিজ্ঞানিগণ উহার রহস্য উদঘাটনে আত্মনিয়োগ করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের পর তাহারা আল-কুরআনে বর্ণিত জুদী পর্বতের নিকটবর্তী ভূতলে একটি বিশালাকৃতির নৌযানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করেন। এই দীর্ঘ গবেষণা ও অনুসন্ধান কর্মে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানী মি. জোন্স। মি. জোন্স তাহার মন্তব্যে বলিয়াছেন, 'তাহার শতভাগ বিশ্বাস, ইহা সেই নূহ (আ)-এর নৌযানেরই অংশবিশেষ। আল-কুরআনে বর্ণিত বিষয়াবলীর সহিত এই ধ্বংসাবশেষের অবিকল মিল রহিয়াছে (সূত্র: বিদেশী পত্রিকা অবলম্বনে সাপ্তাহিক মেঘনা, ২০ জুলাই, ১৯৯৪ খৃ. সংখ্যা)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00