📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-১

📄 দৃষ্টান্ত-১


প্রত্যেক ভাষায় এমন কিছু শব্দ পাওয়া যায় যাহার ধ্বনি ও উচ্চারণ শ্রুতিমধুর হয় না। অথচ ভাব প্রকাশের জন্য উহার বিকল্প কোন শব্দও নাই। ফলে কবি-সাহিত্যিকগণ বাধ্য হইয়া ঐ সমস্ত শব্দই ব্যবহার করিয়া থাকেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কুরআন কারীমে এমন একটি হৃদয়গ্রাহী, মনপ্রীতিকর পদ্ধতি অনুসৃত হইয়াছে যে, সাহিত্য রুচিসম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই উহাতে চমৎকৃত না হইয়া পারে না। যেমন 'পাকা ইট' অর্থ ব্যক্ত করার জন্য আরবী ভাষায় যতগুলি শব্দ রহিয়াছে, উহার সবগুলিই অতি নিচু পর্যায়ের। যথা اجر ، رطوب، قرمه ; কিন্তু আল- কুরআনে যখন এই ভাবটি প্রকাশের প্রয়োজন দেখা দিল তখন উহাকে এমন সুন্দর ও সাবলীল আন্দাযে আশ্চর্যকর ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হইল যে, প্রয়োজনীয় ভাব প্রকাশের সাথে সাথে অপছন্দনীয় শব্দ পরিহার করাও সম্ভব হইল। উপরন্তু উহার মধ্যে সৃষ্টি হইল এক অপরূপ বাগ্মিতা। ইরশাদ হইল:
وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ الهِ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يُهَا مِنُ عَلَى الطَّيْنِ فَاجْعَلْ لَي صَرْحًا لَعَلَّى أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَذِبِينَ .
"ফির'আওন বলিল, হে পারিষদবর্গ! আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলিয়া জানি না! হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈয়ার কর; হয়ত আমি ইহাতে উঠিয়া মূসার ইলাহকে দেখিয়া লইতে পারি। তবে আমি অবশ্য মনে করি সে মিথ্যাবাদী" (২৮: ৩৮)।
অর্থাৎ কাঁচা ইট বুঝাইবার জন্য কুরআন কারীম الطين على قد। শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-২

📄 দৃষ্টান্ত-২


জাহিলী যুগে আরবী সাহিত্যে 'মৃত্যু' অর্থ প্রকাশের জন্য অনেকগুলি শব্দ ব্যবহার করিত। যেমন : هلاك، حلاق ، حتف، فناء، سام ، قتیم ، خالج ইত্যাদি।
এই শব্দগুলির প্রত্যেকটির পশ্চাতে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস ও ধারণা কার্যকর ছিল যে, মৃত্যুর কারণে মানুষের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধ্বংস হইয়া যায়। কাজেই মানুষের পুনরায় জীবিত হওয়া এবং হাশরের ময়দানে পুনরুত্থিত হওয়া সম্ভব নহে। তৎকালীন আরববাসীরা যেহেতু পরকালে বিশ্বাসী ছিল না, তাই মৃত্যুর অর্থ প্রকাশের জন্য তাহারা এইরূপ শব্দই নির্বাচন করিয়াছিল। এই মৃত্যুর অর্থ প্রকাশের জন্য ঐ সমস্ত জাহিলী চেতনাসমৃদ্ধ শব্দের কোন একটি শব্দও আল-কুরআন গ্রহণ করে নাই বরং কুরআন ইহার জন্য توفی শব্দটি সৃষ্টি করিল। এই توفی শব্দটি একদিকে যেমন মৃত্যুর ভাব প্রকাশ করে যে, মৃত্যু অর্থ চিরতরে ধ্বংস নহে বরং মৃত্যুর মর্ম হইল, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মানুষের রূহকে কবজা করিয়া লওয়া, তৎপর আল্লাহ যখন চাহিবেন, 'রূহকে মানবদেহে পুনপ্রতিষ্ঠিত করিয়া দিবেন। এইভাবে মানবজাতির পুনরুত্থান ঘটিবে। মৃত্যুর অর্থ প্রকাশের জন্য এই শব্দটির ব্যবহার কুরআনের পূর্বে আর কোথাও দেখা যায় নাই (শায়খ বিনুরী, য়াতীমাতুল-বায়ান লিমুশকিলাতিল-কুরআন, পৃ. ৫৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দৃষ্টান্ত-৩

📄 দৃষ্টান্ত-৩


'আরবী ভাষায় বেশ কিছু শব্দ এমন রহিয়াছে যাহার একবচন স্পষ্ট প্রাঞ্জল ও সুখপাঠ্য হওয়া সত্ত্বেও উহার বহুবচন দুষ্পাঠ্য। যেমন 'পৃথিবী'-এর অর্থ প্রকাশের জন্য ارض শব্দটির দুইরূপ বহুবচন ব্যবহার প্রচলিত রহিয়াছে। একটি ارضون অপরটি اراضی উভয় রূপ ব্যবহারই দুষ্পাঠ্য হিসাবে বিবেচিত। ফলে শব্দ দুইটির ব্যবহার ফাসাহাত ও বালাগাতপূর্ণ ভাষার প্রাঞ্জল্য ও সাবলীলতা ব্যাহত করে। কিন্তু ইহা সত্ত্বেও আরব কবি-সাহিত্যিকগণ প্রয়োজনের খাতিরে শব্দ দুইটির ব্যবহার পরিহার করিতে সক্ষম হন নাই। কারণ উহার বিকল্প শব্দ তাহাদের জ্ঞানভাণ্ডারে অনুপস্থিত। কিন্তু কুরআন কারীম যখন এই শব্দটি ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করিল তখন اَرَاضِىْ বা الْاَرَاضُوْن শব্দদ্বয় প্রয়োগ না করিয়া এমন একটি সুন্দর ও রুচিশীল পদ্ধতি অবলম্বন করিয়াছে, যাহার দ্বারা একদিকে যেমন প্রকৃত ভাব প্রকাশ পাইয়াছে, অপরদিকে বাক্যের দুষ্পাঠ্যতাও বিদূরিত হইয়া সৃষ্টি হইয়াছে ভাষার এক অভিনব লালিত্য ও সৌন্দর্য। কুরআনের ভাষা শুনুন:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ . "আল্লাহই সপ্তাকাশ সৃষ্টি করিয়াছেন এবং অনুরূপভাবে পৃথিবীকেও সৃষ্টি করিয়াছেন" (৬৫: ১২)।
এই আয়াতে سَمُوت শব্দটি বহুবচন ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু الْاَرْض শব্দটির বহুবচন প্রয়োগ করা হয় নাই, বরং বহুবচনের ভাব প্রকাশের জন্য وَمِنَ الْاَرْضِ مِثْلَهُنَّ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00