📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অষ্টম দৃষ্টান্ত

📄 অষ্টম দৃষ্টান্ত


একদিন জনৈক বেদুঈন একজন তিলাওয়াতকারীর মুখে নিম্নোক্ত আয়াত শুনিতে পাইল:
فَلَمَّا اسْتَيْئَسُوْا مِنْهُ خَلَصُوْا نَجِيًّا قَالَ كَبِيْرُهُمْ أَلَمْ تَعْلَمُوْا أَنَّ أَبَاكُمْ قَدْ أَخَذَ عَلَيْكُمْ مُوْثِقًا مِنَ اللَّهِ وَمِنْ قَبْلُ مَا فَرَّطْتُمْ فِيْ يُوْسُفَ فَلَنْ أَبْرَحَ الْأَرْضَ حَتَّى يَأْذَنَ لِيْ أَبِيْ أَوْ يَحْكُمَ اللَّهُ لِيْ وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِيْنَ
“যখন উহারা তাহার নিকট হইতে সম্পূর্ণ নিরাশ হইল, তখন উহারা নির্জনে গিয়া পরামর্শ করিল। উহাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ জন বলিল, তোমরা কি জান না, তোমাদের পিতা তোমাদের নিকট হইতে আল্লাহ্‌র নামে অঙ্গীকার লইয়াছেন এবং পূর্বেও তোমরা ইউসুফ-এর ব্যাপারে ত্রুটি করিয়াছিলে। সুতরাং আমি কিছুতেই এই দেশ ত্যাগ করিব না যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন অথবা আল্লাহ্‌ আমার জন্য কোন ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই বিচারকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ”।
তিলাওয়াত সমাপ্ত হইলে বেদুইন বলিয়া উঠিল, আমি সাক্ষ্য প্রদান করিতেছি যে, কোন মাখলুকের পক্ষে এমন কালাম বলা সম্ভব নহে (কুরআন সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ২৭৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নবম দৃষ্টান্ত

📄 নবম দৃষ্টান্ত


মক্কাবাসীরা বাৎসরিক কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করিত। প্রতিযোগিতায় যাহার কবিতা প্রথম স্থান অধিকার করিত, প্রতিযোগিতার মূল্যায়নে কা'বা গৃহের দরজায় তাহার কবিতা শোভা পাইত। ইহা ছিল বিজয় ও গৌরবের স্বীকৃতি। একদিন জনৈক মুসলমান কুরআনের নিম্নোক্ত ক্ষুদ্রতর সূরাটি কা'বা গৃহের দরজায় লটকাইয়া দিলেন :
إِنَّا أَعْطَيْنٰكَ الْكَوْثَرَ - فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ - إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
“আমি অবশ্যই তোমাকে কাওছার দান করিয়াছি। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর। নিশ্চয় তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ” (১০৮ : ১-৩)।
ইহা ছিল একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। আরবের যশস্বী কবি-সাহিত্যিকগণ উহার মুকাবিলায় দুই-এক পংক্তি রচনার চেষ্টা করিল। কিন্তু সকলেই ব্যর্থ হইয়া সমস্বরে বলিল, لَيْسَ هٰذَا كَلَامُ الْبَشَر - “ইহা মানুষের রচিত কালাম নহে” (কুরআন সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ২৭৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দশম দৃষ্টান্ত

📄 দশম দৃষ্টান্ত


কুরআন কারীমের সমস্ত আয়াতই মু'জিযা, ইহার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মু'জিযা পূর্ণ আয়াত হইল সূরা হুদের এই আয়াত :
وَقِيْلَ يٰأَرْضُ ابْلَعِيْ مَآءَكِ وَيٰسَمَآءُ أَقْلِعِيْ وَغِيْضَ الْمَآءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُوْدِيِّ وَقِيْلَ بُعْدًا لِّلْقَوْمِ الظّٰلِمِيْنَ
“ইহার পর বলা হইল, হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গ্রাস করিয়া লও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। ইহার পর বন্যা প্রশমিত হইল এবং কার্য সমাপ্ত হইল, নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হইল এবং বলা হইল, জালিম সম্প্রদায় ধ্বংস হউক” (১১ : ৪৪)।
আয়াতটিকে কুরআনের শ্রেষ্ঠতম মু'জিযাপূর্ণ আয়াত বলার কারণ এই যে, এই আয়াতের মধ্যে সর্বমোট উনিশটি কলেমা রহিয়াছে। ইহার প্রত্যেকটি কলেমার মধ্যে ফাসাহাত ও বালাগাত তথা আরবী ভাষা-সাহিত্যশৈলী ও অলংকার শাস্ত্রের একটি করিয়া নিয়ম-নীতি প্রয়োগ হইয়াছে। এই হিসাবে এই আয়াতের উনিশটি শব্দের মধ্যে উনিশটি নিয়ম-নীতি বিদ্যমান রহিয়াছে।
কুরআন কারীমের চ্যালেঞ্জিং ইতিহাসে এই আয়াত সম্পর্কে দুইটি চমকপ্রদ ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণিত আছে। জাহিলী যুগে আরব কবিদের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, তাহারা নির্বাচিত ও শ্রেষ্ঠ বিবেচিত কবিতা ও সাহিত্য রচনা কাবাগৃহের দেওয়ালে ঝুলাইয়া দিত। যতক্ষণ পর্যন্ত উহার তুলনায় শ্রেষ্ঠ রচনা উপস্থাপিত না হইত, ততক্ষণ পর্যন্ত উহাই কা'বাগৃহের দেওয়ালে শোভা পাইত। এইভাবে সেরা কবি-সাহিত্যিকগণ সাহিত্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হইত। জাহিলী যুগের বিখ্যাত কবি ইমরুউল কায়স-এর ভগ্নি তখনও জীবিত ছিল। সে ছিল তৎকালীন আরবের সেরা কবি-সাহিত্যিকদের অন্যতম। একদিন ইমরুউল কায়সের ভগ্নি তাহার স্বরচিত একটি কবিতা পংক্তি কা'বাগৃহের দেওয়ালে ঝুলাইয়া দিয়া ঘোষণা করিল, 'আমার এই কবিতা পংক্তির মুকাবিলায় শ্রেষ্ঠ কোন রচনা কেহ উপস্থিত করিতে সক্ষম হইবে না। আমার এই রচনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অতুলনীয়।' জনৈক মুসলিম তাহার এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে কুরআনের উপরে উল্লিখিত আয়াতটি কাবাগৃহে দেওয়ালে লটকাইয়া দিলেন। প্রত্যূষে ইমরুলে কায়সের ভগ্নি দেখিল, তাহার কবিতা পংক্তির যাবতীয় সৌন্দর্য আল-কুরআনের আয়াতের শিল্পের তুলনায় কোন বিবেচনাই রাখে না। সে দ্রুত তাহার পংক্তিটি দেওয়াল হইতে নামাইয়া ফেলিল এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকার করিল ليس كلام ابلغ من هذا "ইহার তুলনায় শ্রেষ্ঠ কোন রচনা নাই" (আল-ইতকান)।
অপর ঘটনাটি আব্বাসী খিলাফাত আমলের। তদানীন্তন আরব কবিদের মধ্যে সেরা কবি ছিল 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুকাফা', অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি। একদিন সে ঘোষণা করিল, কেহ যদি আমার এক বৎসরের ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার গ্রহণ করে, তবে আমি দিবারাত্র সর্ব সময় আল-কুরআনের অনুরূপ কালাম রচনায় আত্মনিয়োগ করিব এবং আমি এই মর্মে ঘোষণা দিতেছি যে, আমি কুরআনের অনুরূপ কালাম রচনা করিতে সক্ষম হইব। এক ব্যক্তি তাহার এক বৎসরের যাবতীয় ব্যয় বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করিল। ইবনুল মুকাফ্ফ্ফফা' একটি বদ্ধ গৃহে প্রবেশ করিয়া গভীর অধ্যবসায়ে মগ্ন হইল। সুদীর্ঘ এক বৎসরকাল নিরবচ্ছিন্ন চিন্তা ও গবেষণার পর সে কিছু কালাম রচনা করিল। অতঃপর চরম আত্মতৃপ্তি ও গর্বস্ফিত স্বরে ঘোষণা করিল, 'আমি কুরআনের সমতুল্য বাগ্মিতাপূর্ণ কালাম রচনা করিতে সক্ষম হইয়াছি। অমুক দিন তাহা জনসম্মুখে প্রকাশ করিব'। পূর্ব ঘোষণানুসারে সে 'যখন তাহার স্বরচিত সাহিত্য লইয়া গৃহ হইতে বাহির হইল তখন দেখিতে পাইল, একটি ছোট্ট মেয়ে কুরআনের পূর্বোক্ত (১১:৪৪) আয়াতটি তিলাওয়াত করিতেছে।
একটি ছোট্ট মেয়ের মুখে কুরআনের এই অভূতপূর্ব বিস্ময়কর সাহিত্যপূর্ণ আয়াত শুনিয়া ইবনুল মুকাফা' উল্টা পদে হাঁটিয়া গৃহে প্রস্থান করিল এবং দীর্ঘ এক বৎসরের মেহনতের ফলে রচিত কালামের পাণ্ডুলিপিগুলি ছিঁড়িয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিয়া দিল। চরম হতাশা আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়া সে বলিতে লাগিল:
ياليتنى قد خاب سعى وصنعى عند سماع تلاوة هذه الصبية والله ان هذا القرآن لا يمكن ان يتحدى به احد والله ان هذا من كلام الله ليس هذا من كلام البشر .
"হায় আফসোস! এই ছোট্ট মেয়ের তিলাওয়াতের সামনেই আমার দীর্ঘ এক বৎসরের একনিষ্ঠ মেহনত ও জীবনপণ চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল। আল্লাহ্র শপথ! এই কুরআনের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে ইহা মহান আল্লাহ্র কালাম, কোন মানুষের কালাম নহে” (বাকিল্লানী, ই'জাযুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৫০)।
কুরআন কারীমের এই অতুলনীয় বাগ্মিতা ও উচ্চ সাহিত্য মানের অলৌকিকত্বকে আরবী ভাষা-পণ্ডিতগণ চারটি শিরোনামে বিভক্ত করিয়াছেন।
১. শব্দসমূহের অলৌকিকত্ব;
২. বাক্য বিন্যাসের অলৌকিকত্ব;
৩. বর্ণনা রীতি, ভঙ্গি ও উপস্থাপনার অলৌকিকত্ব;
৪. আয়াতসমূহের পারস্পরিক সুসামঞ্জস্যশীলতার অলৌকিক যোগসূত্র ('উলূমুল কুরআন, ২৫৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00