📄 প্রথম কারণ
প্রথম কারণ হইল, একজন উম্মী নবীর মুখে এইরূপ তাৎপর্য ও হিকমতপূর্ণ, আরবী ভাষার সর্বোচ্চ সাহিত্যমানসম্পন্ন 'কালাম' নিঃসৃত হওয়া। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবীর নিরক্ষরতার পরিচয় প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন:
وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كتب ولا تَخُطُهُ بِيَمِينِكَ إِذَا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
"তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯: ৪৮)।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স) যদি উম্মী না হইতেন তবে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীরা সন্দেহ করিতে পারিত, হয়ত তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহ দেখিয়া বা উহা নকল করিয়া সুযোগ-সুবিধামত কুরআন রচনা করিয়া লইয়াছেন, তৎপর উহা মুখস্ত করিয়া লোকদেরকে শুনাইতেছেন। অবিশ্বাসীদের এইরূপ সন্দেহ-সংশয় এবং উহার উৎসের মূলোৎপাটন করিয়া আল-কুরআন ঘোষণা করিয়াছে:
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ ابْتُنَا بَيِّنت قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا انْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلَهُ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَائِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ . قُلْ لَوْ شَاءَ اللهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلَا أَدْرِكُمْ بِهِ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِّنْ قَبْلِهِ أَفَلا تَعْقِلُونَ . فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِايَتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْمُجْرِمُونَ
"যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াত তাহাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন যাহারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তাহারা বলে, ইহা ছাড়া অন্য এক কুরআন আন অথবা ইহাকে বদলাও। আপনি বলুন, নিজ হইতে ইহা বদলান আমার কাজ নহে। আমার প্রতি যাহা ওহী হয়, আমি কেবল তাহাই অনুসরণ করি। আমি আমার প্রভুর অবাধ্যতা করিলে অবশ্যই মহা দিবসের শাস্তির আশংকা করি। আপনি বলুন, আল্লাহর সেইরূপ ইচ্ছা হইলে আমিও তোমাদিগের নিকট ইহা তেলাওয়াত করিতাম না এবং তিনিও তোমাদিগকে এই বিষয়ে অবহিত করিতেন এবং আমি তো ইহার পূর্বে তোমাদিগের মধ্যে জীবনের দীর্ঘকাল অবস্থান করিয়াছি। তবুও কি তোমরা বুঝিতে পার না? যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে অথবা আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করে, তাহার অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে? নিশ্চয় অপরাধীরা সফলকাম হয় না" (১০:১৫-১৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন একজন উম্মী, তাঁহার এই বিষয়টি তাঁহার জাতির নিকট অজ্ঞাত ছিল না। তিনি তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ চল্লিশটি বৎসর তাঁহার জাতির সহিতই অতিবাহিত করিয়াছিলেন। অতএব এমন একজন উম্মী ব্যক্তি হইতে উচ্চতর পর্যায়ের বাগ্মিতা ও সাহিত্যমানসম্পন্ন, সমধিক তথ্য ও তত্ত্ব সমৃদ্ধ, অসাধারণ জ্ঞানের আধার মহাগ্রন্থ আল-কুরআন প্রকাশ পাওয়া 'মুজিযা' নহে তো আর কি? তাই তো রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘোর বিরোধী নাদ্র ইবন হারিছের মুখে ইহার প্রতিধ্বনি শুনিতে পাওয়া যায়। নাদ্র ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরম বিরোধী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুরায়শদের মধ্যে সর্বাধিক অভিজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্যক্তি। একদিন নাদর কুরায়শদিগকে খেতাব করিয়া বলিল, হে কুরায়শগণ! মুহাম্মদ তোমাদেরকে এমন কি সমস্যায় ফেলিয়াছে, যাহার কোন সমাধান খুঁজিয়া পাইতেছ না? সে তো তোমাদের চোখের সামনেই বড় হইল। তোমরা ভাল-ভাবেই জান, মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সত্যবাদী, সবচেয়ে বেশি আমানতদার এবং সর্বাপেক্ষা প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁহার চুল সাদা হইতে চলিয়াছে এবং সে ঐ দাবি উত্থাপন করিয়াছে যাহা তোমরা শুনিয়াছ, তখন তোমরা বলিতে লাগিলে, এই ব্যক্তি যাদুকর, ইনি কবি, ইনি উম্মাদ। হে জাতি! আল্লাহকে সাক্ষী রাখিয়া বলিতেছি, আমি মুহাম্মাদের কথা শুনিয়াছি, মুহাম্মাদ যাদুকর নহেন, সে কবিও নহেন, সে উম্মাদও নহেন। আমার অশংকা হইতেছে, নূতন কোন বিপদ তোমাদেরকে গ্রাস করিয়া না বসে (ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৯৭)।
📄 দ্বিতীয় কারণ
কুরআন কারীম সর্বশ্রেষ্ঠ মু'জিযা হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হইল, কুরআনের উচ্চ সাহিত্যমান এবং উহার মুকাবিলায় গোটা মানবজাতির অক্ষমতা। কুরআনের প্রথম সম্বোধন ছিল প্রত্যক্ষভাবে আরব জাতির প্রতি। আরবদের অন্য কোন একাডেমিক জ্ঞান না থাকিলেও ভাষা শৈলীর উপর তাহাদের ছিল অসাধারণ ব্যুৎপত্তি। এই হিসাবে আরবজাতি গোটা মানব বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম স্থান অধিকার করিয়া লইয়াছিল। কুরআন তাহাদেরকে আহ্বান করিয়া বলিল, কুরআন মহান আল্লাহর কালাম, মুহাম্মাদ (স)-এর রচিত নহে। এই বিষয়ে যদি তোমরা সন্দেহের মধ্যে থাক, তবে উহার অনুরূপ অন্তত একটি সূরা তোমরা রচনা করিয়া দেখাও। যদি তোমাদের পক্ষে এককভাবে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা সম্ভব না হয়, তবে তোমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা কর। এমনকি দানব জনগোষ্ঠীকেও এই কাজে সহযোগিতার জন্য ডাকিয়া লও এবং যেভাবেই হউক এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়া কুরআনের ক্ষুদ্রতর একটি আয়াত সমতুল্য কালাম রচনা করিয়া পেশ কর।
আরব জনগোষ্ঠী ছিল ইসলাম ও কুরআনকে উৎখাত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে উজ্জীবিত। ইহার জন্য তাহারা যাহা কিছু সম্ভাব্য তাহাই করিয়াছে। যুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, দেশান্তরিতকরণ, এমনকি অসংখ্য যুদ্ধ ও লড়াই-এ পর্যন্ত তাহারা প্রবৃত্ত হইয়াছে। এমতাবস্থায় কুরআনের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই ছিল তাহাদের জন্য অতি সহজতর উপায়। কিন্তু তাহাদের কেহই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের দুঃসাহস দেখাইতে সক্ষম হয় নাই। ইহার কারণ কি? কারণ ইহাই যে, কুরআনের উচ্চতর ভাষাশৈলী, বাগ্মিতা, প্রাঞ্জলতা, ভাবের প্রাণময়তা এবং সহজ ও সাবলীল উপস্থাপনা নিরপেক্ষ স্বচ্ছ অন্তর লইয়া যে কোন পাঠকারী ব্যক্তি বিমোহিত না হইয়া পারে না। রুচিশীল পাঠক মাত্রই কুরআনের এই অনুপম সাহিত্যরসের অলৌকিকত্বে প্রীত ও বিমুগ্ধ হইতে বাধ্য। কুরআনের ভাষা সম্পদ, শব্দ-সম্ভার, শিক্ষা ও বুদ্ধিগ্রাহ্যতা, এক কথায় যেই দিক দিয়াই বিচার করা হউক না কেন—কুরআন অতুলনীয়, নজীরবিহীন, চির অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কুরআনের অনুরূপ সাহিত্য বৈশিষ্ট্য না অতীতে কেহ দেখাইতে পারিয়াছে, আর না কস্মিনকালেও কেহ দেখাইতে সক্ষম হইবে।
কুরআন নাযিলকালীন সুনাম খ্যাত, বিশ্বনন্দিত কবি- সাহিত্যিক ও বাগ্মীগণের অভিব্যক্তিসমূহ একটু মনযোগ সহকারে পাঠ করুন। দেখিবেন, কুরআনের প্রতি তাহাদের কিরূপ অকৃত্রিম স্বীকারোক্তি।
ওয়ালীদ ইবন মুগীরা ছিল আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও ভাষাজ্ঞানীদের অন্যতম। ইসলামের ঘোরতর দুশমন আবু জাহলের ভ্রাতুষ্পুত্র। একদিন সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, মুহাম্মাদ! আমাকে কিছু আয়াত পড়িয়া শুনাও। রাসূলুল্লাহ (স) কয়েকটি আয়াত পাঠ করিলেন। ওয়ালীদ তৃপ্ত হইল না। বিস্মিত ও বিমুগ্ধ হইয়া সে বলিল, মুহাম্মাদ! আবার পড়। রাসূলুল্লাহ (স) আরও কিছু আয়াত পাঠ করিলেন। এইভাবে কয়েকবার পুনঃ পুনঃ পাঠ শুনিবার পর ওয়ালীদ আত্মহারা হইয়া বলিয়া উঠিল, 'আমি আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিতেছি, ইহার স্বাদ ও প্রাঞ্জলতাই ভিন্ন রকমের। যেই বৃক্ষের এইগুলি ফল, উহার কাণ্ড খুবই মজবুত। নিশ্চয় ইহা কোন মানুষের রচনা নহে।'
"ওয়ালীদ মুহাম্মাদের কালাম শুনিয়া প্রভাবান্বিত হইতেছে"-এই সংবাদ শুনিয়া আবু জাহল দৌড়িয়া আসিল এবং ওয়ালীদকে সতর্ক করিতে লাগিল। আবু জাহলের হুমকি-ধমকি ও তিরস্কারের প্রতি উত্তরে ওয়ালীদ সেদিন যাহা বলিয়াছিল তাহা খুবই হৃদয়গ্রাহী এবং কুরআনের সত্যতার সাক্ষ্যস্বরূপ। ওয়ালীদ বলিল, আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, কবিতার ছন্দ, পদবিন্যাস, সুর, ভাষার গতি-প্রকৃতি ও উজান-ভাটি ইত্যাদি আমি তোমাদের চাইতে বেশি জানি। পুনরায় আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি, মুহাম্মাদের পঠিত কালামের মধ্যে এই সমস্তের কোনই বালাই নাই। কবিতার সহিত তাঁহার পঠিত কালামের কোনই সামঞ্জস্যতা নাই ('উলূমুল কুরআন, পৃ. ২৫১)।
এই ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরার আরও একটি ঘটনা ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করিয়াছেন। রাসূল কারীম (স)-এর মক্কায় অবস্থানকালীন দাওয়াতের প্রক্রিয়াসমূহের মধ্যে একটি প্রক্রিয়া এই ছিল যে, তিনি হজ্জ মৌসুমে আগত আরবের বিভিন্ন তীর্থযাত্রী কাফেলার নিকট যাইয়া তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। বিষয়টি কুরায়শ কাফিরদেরকে মহা ভাবনায় ফেলিয়া দিল। তাহারা চিন্তা করিল, এইভাবে যদি মুহাম্মাদ তাঁহার ইসলামের প্রচার ও প্রসার করে, তবে অল্প দিনের মধ্যেই গোটা আরবময় ইসলামের আকর্ষণ বাড়িয়া যাইবে এবং মানুষ ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হইয়া যাইবে।
এই দুঃশ্চিন্তা লইয়া তাহারা পরামর্শ করিতে বসিল। ওয়ালীদের সভাপতিত্বে পরামর্শ সভা আরম্ভ হইল। আলোচ্য বিষয়পত্র একটিই : কিভাবে মুহাম্মাদের এই দাওয়াতের সুযোগকে বানচাল করা যায়? এক সর্দার প্রস্তাব করিল, মুহাম্মাদের পশ্চাতে আমরা এই কথা প্রচার করিব যে, 'সাবধান! এই লোক গণক। কাজেই তোমরা তাঁহার কথায় কর্ণপাত করিও না'। সভাপতি ওয়ালীদ এই প্রস্তাব নাকচ করিয়া বলিল, "আল্লাহ্র কসম! ইহা কিছুতেই সত্য নহে”। আমি নিজ কর্ণে মুহাম্মাদের কালাম শুনিয়াছি। তাহা কখনও গণকের কথা নহে। অপর এক কুরায়াশী প্রস্তাব করিল, তাহাকে উন্মাদ বলা হউক। ওয়ালীদ বলিল, লোকেরা বরং তোমাদেরকেই পাগল বলিবে। মুহাম্মাদের মধ্যে পাগলামির কিছুই নাই।
আরেকজন প্রস্তাব করিল, তবে কি আমরা তাহাকে কবি বলিয়া প্রচার করিব? সভাষদ প্রধান ওয়ালীদ বলিল, না, ইহাও সত্য হইবে না। আমি কবিতার ছন্দ ও পদ বিন্যাস, সুর ও ব্যঞ্জনা সব কিছুই জানি। কিন্তু মুহাম্মাদের প্রচারিত কালামে উহার কোনটাই পাই না। মুহাম্মাদের কালামের ছন্দ ও বিন্যাস চমৎকার, এক নূতন ও অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী।
একে একে সকল প্রস্তাব নাকচ হইয়া গেলে একজন শীর্ষ কুরায়শী সর্দার বলিল, মুহাম্মাদ আসলে একজন যাদুকর। ওয়ালীদ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে একথার প্রতিবাদ করিয়া বলিল, না, মুহাম্মাদ যাদুকর নহেন। কারণ যাদুর মন্ত্রতন্ত্র, ঝাড়ফুঁক ইহার কিছুই তাঁহার মধ্যে নাই। দীর্ঘ আলোচনার পর ওয়ালীদ সিদ্ধান্ত দিল, হাঁ, মুহাম্মাদকে আর কিইবা বলিবে? এক অর্থে তাহাকে যাদুকর বলিতে পার। কারণ, তাহার যাদুময়ী কালাম পাঠ ভাই-ভাই, পিতা-পুত্র, এমনকি স্বামী-স্ত্রীতে পর্যন্ত বিভেদ ও বিচ্ছেদ ঘটাইতে সক্ষম হইয়াছে। এইজন্য তাঁহার সাথে চলাফেরা এবং আলাপ-আলোচনা করা উচিত নহে (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ. পৃ. ২৭০-২৭১)।
আরেকটি দৃষ্টান্ত। একদিন রাত্রিকালে আবূ সুফ্যান, আবূ জাহ্ল ও আখনাস ইবন শারীক-কুরায়শদের এই তিন শীর্ষ নেতা নিজ নিজ গৃহ হইতে বাহির হইয়া অতি গোপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনিবার জন্য তাঁহার গৃহের নিকটে অবস্থান লইল। প্রত্যেকেই নিজেকে গোপন রাখিয়াছে, কেহই পরস্পরের খবর জানে না। রাত্রির গভীরে রাসূল কারীম (স) নিজ গৃহাভ্যন্তরে নামাযে দাঁড়াইয়া কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হইলেন। নেতৃত্রয় গভীর মনোযোগসহ কুরআন শুনিতে লগিল। কুরআনের অপূর্ব মাধুর্যে বিমোহিত হইয়া তাহারা সারা রাত্রি কাটাইয়া দিল। চারিদিকে যখন ভোরের আলো উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, তখন তাহারা এস্ত পদে নিজ নিজ বাড়ির দিকে পালাইতে লাগিল। কিন্তু কি আশ্চর্য! পথিমধ্যে তাহাদের পরস্পরের সহিত সাক্ষাৎ ঘটিয়া গেল। লজ্জা আর অপমানে তাহারা পরস্পরকে ভর্ৎসনা ও ধিক্কার দিতে লাগিল এবং এই মর্মে শপথ করিল যে, 'আজ যাহাই হইয়াছে, আগামীতে সাবধান! আর কেহই কোন দিন আসিবে না'।
দ্বিতীয় দিন প্রত্যেকেই ভাবিল, আজ তো আর কেহ আসিবে না, কাজেই এই সুযোগ আমি হাতাইয়া লই। দেখা গেল, পরবর্তী রজনীতে তিনজনই উপস্থিত। এবারও তাহারা পরস্পর কসম খাইয়া পুনরায় না আসিবার অঙ্গীকার করিল। কিন্তু কুরআন কারীমের অলৌকিক স্বাদ তাহারা আস্বাদন করিয়াছিল। তাই উহা ভুলিয়া থাকা ছিল অসম্ভব ব্যাপার।
তৃতীয় রজনীতেও সকলেই অঙ্গীকারের কথা বেমালুম ভুলিয়া যাইয়া সংগোপনে কুরআন তিলাওয়াত শুনিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর গৃহপার্শ্বে উপস্থিত হইল। অবশেষে তাহারা একে অপরকে কুরআন সম্পর্কে মন্তব্য জিজ্ঞাসা করিল। আবূ সুফ্যান বলিল, 'সত্যি বলিতে কি, এমন বহু কিছু শুনিলাম, যাহা আমি বুঝিয়াছি এবং আমিও উহা সত্য বলিয়া জানি। আর বহু কিছু বিষয় এমন যাহার নিগূঢ় মর্ম আমি বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। আখনাস ইবন শরীক বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আমার মন্তব্যও তাহাই। আবু জাহল বলিল, স্পষ্ট কথা। যুগ যুগ ধরিয়া বনী 'আব্দ মানাফের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলিয়া আসিতেছে। তাহারাও দান-খয়রাত করে, আমরাও দান- খয়রাত করি। তাহারা মেহমানদারী করে, আমরাও মেহমানদারী করি। এইভাবে তাহারা যাহা কিছু করে, আমরাও সমানভাবে তাহাই করি। কাজেই মানে-সম্মানে ও ঐতিহ্যে আমরা কোন অংশেই তাহাদের চেয়ে কম নহি। আজ তাহারা দাবি করিয়াছে যে, তাহাদের বংশে নবী আসিয়াছে, তাহাদের নিকট ওহী আসে। আমরা ইহা কোথায় পাইব? সুতরাং এই কারণে তাহারা আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইয়া যাইবে, তাহা হইতে পারে না। অতএব ভাল, কি মন্দ, তাহা বুঝি না। আমরা মুহাম্মাদের উপর ঈমান আনিব না (মা'আরিফুল কুরআন, ১খ., পৃ. ১৫২)।
📄 আরও একটি দৃষ্টান্ত
বনী সুলায়ম গোত্রের জনৈক কায়স ইবন নাছীরা নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (স) কুরআন তিলওয়াত করিয়া শুনাইলেন। পাঠ শ্রবণান্তে কায়স স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার কওমকে আহ্বান করিয়া বলিল, হে আমার জাতি! রোম ও পারস্যের সেরা কবি ও সাহিত্যিকদের রচিত কবিতা ও রচনাবলী শুনিবার সুযোগ আমার হইয়াছে। বহু জ্যোতিষীর কথাও আমি শুনিয়াছি। হিময়ারের খ্যাতনামা জনপ্রিয় সাহিত্য রচনাও আমি পড়িয়াছি, কিন্তু মুহাম্মাদ (স)-এর মুখ নিঃসৃত বাণীর সমতুল্য কোন কালাম আজ পর্যন্ত আমি কোথাও পাই নাই ও শুনিয়া নাই। তোমরা আমার কথা শুনিয়া লও এবং তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লও (কুরআন সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ২৭৭)।
📄 চতুর্থ দৃষ্টান্ত
বনী সুলায়ম গোত্রের জনৈক কায়স ইবন নাছীরা নামক এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ (স) কুরআন তিলওয়াত করিয়া শুনাইলেন। পাঠ শ্রবণান্তে কায়স স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া তাহার কওমকে আহ্বান করিয়া বলিল, হে আমার জাতি! রোম ও পারস্যের সেরা কবি ও সাহিত্যিকদের রচিত কবিতা ও রচনাবলী শুনিবার সুযোগ আমার হইয়াছে। বহু জ্যোতিষীর কথাও আমি শুনিয়াছি। হিময়ারের খ্যাতনামা জনপ্রিয় সাহিত্য রচনাও আমি পড়িয়াছি, কিন্তু মুহাম্মাদ (স)-এর মুখ নিঃসৃত বাণীর সমতুল্য কোন কালাম আজ পর্যন্ত আমি কোথাও পাই নাই ও শুনি নাই। তোমরা আমার কথা শুনিয়া লও এবং তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়া লও (কুরআন সংকলনের ইতিহাস, পৃ. ২৭৭)।