📄 বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনার অলৌকিকত্ব
কুরআন কারীমের ভাষা ও সাহিত্যগত মু'জিযা ও অলৌকিকত্ব যে সমস্ত বিষয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পাইয়াছে, উহার মধ্যে আল-কুরআনের অপূর্ব বর্ণনাভঙ্গি ও বিস্ময়কর উপস্থাপনার শৈল্পিক রীতি অন্যতম। আল-কুরআনের এই বর্ণনা পদ্ধতি নজীরবিহীন। বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়:
(এক) আল-কুরআন সম্পূর্ণ গদ্যও নয়, পদ্যও নয়—এমন এক অতুলনীয় রীতিতে নাযিল হইয়াছে। এই কারণে উহার মধ্যে পদ্য ও পদ্যের নিয়ম-রীতির অবতারণা হয় নাই, কিন্তু ইহা সত্ত্বেও কুরআনের বর্ণনাধারায় এমন বিমুগ্ধকর মধুময় সুর ও ছন্দের ঝংকার পাওয়া যায়, যাহা কবিতার ছন্দ ও সুরের গতিময়তা ও প্রাণময়তার তুলনায় অনেক অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও স্বাদ-সমৃদ্ধ। আমরা দেখিতে পাই যে, পদ্য সাহিত্য ও কবিতার ছন্দে ওযন বা মাত্রার সাম্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রত্যেকটি ছন্দের মিত্রাক্ষরের মিল লক্ষ্য করা হয়। এই ক্ষেত্রে যে ছন্দ যত উৎকর্ষতা লাভ করে, উহার রুচিও চমৎকারিত্ব তত বৃদ্ধি পায়। তৎপর কবিতার ছান্দিক. মাধুর্য ও উৎকর্ষতা আরও বৃদ্ধি পায়, যদি মিত্রাক্ষরের সমিলের সাথে সাথে প্রান্তাক্ষরগুলিও এক ধরনের ব্যবহৃত হয়। কারণ ইহার প্রভাবে কবিতা ও ছন্দের প্রত্যেকটি চরণে অনুভূত হয় এক তুলনাহীন ধ্বনিরস এবং চিত্তাকর্ষক স্বাদ।
পদ্য-সাহিত্য ও কাব্য-ছন্দে এই রুচি সৃষ্টির জন্য প্রত্যেক ভাষায় স্বতন্ত্র নিয়ম-রীতি রহিয়াছে। পরিবেশ ও অঞ্চলের বিভিন্নতার কারণে এই সমস্ত নিয়ম-রীতিতেও পার্থক্য হইয়া থাকে। উহার কোন রীতিই সার্বজনীন নহে। কিন্তু কুরআনের মু'জিযা ও অলৌকিকত্ব এই যে, কুরআন পৃথিবীর কোন একটি ভাষার বা অঞ্চলের স্বতন্ত্র নিয়ম-রীতিকে অনুসরণ না করিয়া বরং সর্বঅঞ্চলের সর্ব ভাষার সর্ব রীতিতে সমানভাবে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যসমূহকে সমন্বিত করিয়া এমন একটি মনোমুগ্ধকর পদ্ধতিতে উপস্থাপন রীতি সৃষ্টি করিয়াছে, যাহার রুচি ও প্রাঞ্জলতা, ধ্বনিরস ও সাবলীলতা এমন সুমধুর ও হৃদয়গ্রাহী যে, উহা কেবল আরবী ভাষাভাষীদের জন্যই চিত্তাকর্ষক নহে, বরং আরব-আযম তথা গোটা পৃথিবীর সকল অঞ্চলের এবং সকল ভাষার মানুষের জন্যই, যেমন রুচিশীল তেমনি বিস্ময়কর। আরব ও অনারব সকলেই উহাতে মুগ্ধ হয়, বিমোহিত হয়। এই কারণেই আমরা দেখি যে, কুরআন নাযিলকালীন যুগের আরব কবি ও সাহিত্যিকগণ কুরআনের বর্ণনাধারার এই অলৌকিক উপস্থাপনা রীতি দেখিয়া বলিতে শুরু করিয়াছিল যে, ইহা কবিতা, কিন্তু পরক্ষণেই আবার তাহারা বলিতে লাগিল, না, ইহা কবিতা নহে। বস্তুত কুরআনের এই তুলনাহীন বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনা রীতি মানবীয় শক্তি ও সামর্থ্যের ঊর্ধের বিষয়। ইহা কুরআনের অন্যতম মু'জিযা (আল-ফাওযুল কাবীর, পৃ. ৩৪)।
(দুই) কুরআনের অলৌকিক বর্ণনাভঙ্গির ও উপস্থাপন রীতির আরও একটি দিক এই যে, ভাষালংকারবিদগণের দৃষ্টিতে মনোভাব ব্যক্ত করার তিনটি ধারা প্রচলিত রহিয়াছে। যথা. ১. খিতাবী, ২. আদাবী (সাহিত্যিক) ও ৩. 'ইলমী (জ্ঞানগত)। এই তিনটি বর্ণনাধারার প্রত্যেকটিরই পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগক্ষেত্র রহিয়াছে। অনুরূপ উহার প্রত্যেকটি ধারারই রহিয়াছে স্বতন্ত্র পরিমণ্ডল। তাই একই ক্ষেত্রে সবকয়টি রীতিকে একত্র করা সম্ভব নহে। যেমন একজন বক্তা যখন বক্তৃতা করেন তখন তাহার বর্ণনার ধরন থাকে এক রকম। আর যখন তিনি কোন প্রবন্ধ পাঠ করেন বা লিখেন, তখন তাহার বর্ণনার রীতি হইয়া থাকে ভিন্ন রকম। এমনিভাবে তিনি যখন কোন গ্রন্থ রচনা করিতে বসেন, তখন উহার বর্ণনাভঙ্গি হয় আরেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সুসজ্জিত। এখানেই কুরআন কারীমের অলৌকিকত্বও বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য! তাহা এই যে, কুরআন কারীম একই সাথে বর্ণনারীতির উক্ত তিনটি ধারাকে সমন্বিত করিয়াছে, যাহা মানবীয় ক্ষমতার ঊর্ধ্বের বিষয়। ইহারই ফলে আপনি কুরআন লইয়া চিন্তা-গবেষণা করিলে দেখিবেন যে, কুরআনে কারীমের প্রত্যেকটি আয়াতে, প্রত্যেকটি বাক্যে একদিকে যেমন সম্বোধনসূচক হৃদয় ছোঁয়া প্রাণবন্ত বক্তব্য রহিয়াছে, অপরদিকে উহাতে রহিয়াছে ভাষা ও সাহিত্যের প্রাঞ্জলতা এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সজীবতা। এইভাবে কুরআন কারীম সমৃদ্ধ হইয়াছে অসংখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্যে আর সৌন্দর্যের সমারোহে।
(তিন) আল-কুরআনের অলৌকিক বর্ণনাভঙ্গির আরও একটি দিক এই যে, মূর্খ, সাধারণ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, অতিশিক্ষিত, আলিম, পণ্ডিত, সকলের উদ্দেশ্যেই কুরআন নাযিল হইয়াছে। সমভাবে সকলকে সম্বোধন করা হইয়াছে। আল-কুরআনের একই বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপন ধারা উক্ত সকল প্রকারের পাঠককে একই সাথে প্রভাবান্বিত করিয়া থাকে। মূর্খ বা অতি স্বল্প ও সাধারণ শিক্ষিতগণ যেমন আল-কুরআন হইতে নিজেদের প্রয়োজনীয় নসীহত হাসিল করিতেছে এবং অতি সহজ ও সরলভাবে কুরআনের আহ্বান বুঝিয়া লইতেছে, তেমনিভাবে অতি শিক্ষিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণও গভীর দৃষ্টিতে কুরআন পাঠ করিয়া উহার মধ্য হইতে জ্ঞানগর্ভ ও বিস্ময়কর তত্ত্ব ও তথ্যাবলীর সন্ধান পাইতেছে। আল-কুরআনের বর্ণিত বিষয়বস্তুসমূহের সূক্ষ্মতা ও গভীরতার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে মনে হইবে যে, মামুলী জ্ঞান-বুদ্ধির মানুষের জন্য বুঝি কুরআনের ভাব অনুধাবন করা কোনক্রমেই সম্ভব নহে। উদাহরণস্বরূপ তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, সৃষ্টি, আল্লাহর অস্তিত্ব, পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়গুলি নিঃসন্দেহে অতিশয় জটিল ও সূক্ষ্মতর। অথচ কুরআন শরীফ এই সমস্ত জটিল ও কঠিন বিষয়গুলিকে এমন সরল, সহজ ও সাবলীল আন্দাযে উপস্থাপন করিয়াছে যে, একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিও অতি সহজে উহা বুঝিতে পারে।
অপরদিকে দর্শনপ্রিয়, চিন্তাশীল জ্ঞানী ব্যক্তিও উহা অধ্যয়ন করিয়া উহাতে এমন বলিষ্ঠ প্রমাণাদির সন্ধান পায় যাহা তাহাকে সত্য প্রমাণে চরম সফলতা দান করে। সে দেখিবে, আল- কুরআন অতি সহজ ভাষায় কথার বাঁকে বাঁকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের এমন এমন সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়াবলীর তথ্য ও সমাধান প্রদান করিয়াছে, যে পর্যন্ত পৌঁছিতে বিজ্ঞান গবেষণার শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল লাগিয়া যাইবে ('উলূমুল কুরআন, পৃ. ২৬৩-২৬৫)
(চার) কুরআনের বিস্ময়কর বর্ণনারীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এই যে, আবৃত্তিকারী যতই উচ্চ মানের কবি-সাহিত্যিক হউন না কেন, একটি বিষয়ের বারংবার আবৃত্তি ও পুনরাবৃত্তি অতিশয় বিব্রতকর এবং অস্বস্তিকর। কিন্তু কুরআন কারীমের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। ইহাতে একটি বিষয়ের বারংবার পুনরাবৃত্তি হইয়াছে, কিন্তু এতদসত্ত্বেও উহাতে কোন বিস্বাদ ও বিরক্তির উদ্রেক। তো হয়ইগনাইয়া বরং উহাতে অনুভূত হয় মৃতনা নূ্যূতক রুচি ও মাধুর্যতা অনিষ্ট কুরআনের পাঠিক মাত্রই ইহা অনুভব করিয়া থাকের সাত সদকে ভেরী চ্যাতাচার্টার ঠুকার নীড় দীপের অপাঁচ্যাধ্যাপক অর্থবাহক সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা কুরআনের বিস্ময়কর বর্ণনায়ীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যজন আজ কুরআন অর্টি সেংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে এত ব্যাপক বক্তী বিস্তৃত বিষয়সমূহকে অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিয়াছে যে? প্রত্যেক যুগও কালেই ইহা হইতে পথনির্দেশনা হাসিল (করা) যাইবে। তাহস্রতাব্দীর পর শিতাব্দী এমনকি সহস্রাব্দ অতিক্রান্ত হইবার পরও কুরআনের সকল বিষয়বস্তু দীপ্তিমান শ্রীহয়াছে? কুরআনের প্রত্যেকটি আইকান চির-মৃতন রহিয়াছে। পাঠকের নিকট গ্রীনে হইবে। ফেস এইমাত্র বিষয়টি মাযিল হইয়াছোদাশাদের বিলাকি.ميه ياافغا
চ্যাভীধা সংক্ষিপ্ত অথচ (মর্ম বিস্তৃত, এই রীতিতে কুরআন কারীম অনেক অনেক বিষয়কে। ইহার মধ্যে প্রসন্নিবেশিতী করিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ স্পকলেরই জানা যেড়া আলকুরজীন ফোন ইতিহাসের গ্রন্থ নহে। কিন্তু উহাতে সংক্ষিপ্তাকারে এমনার ঐতিহাসিকনিগ্রন্থ ওষ্ঠ্যউপস্থাপিত হইয়াছে, যাহা ইতিহাসের সর্বোচ্চ নির্ভরশীল উৎস। অনুরূপ কুরআন রাজনীতি ও আইনের গ্রন্থ নহে। কিন্তু মাত্র কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে আল-কুরআন রাজনীতি ও আদর্শ মহাবিষ্ণু গাড়িধার ঐমকী কিছু মূলনীতি ও পদ্ধতি ভূপেশ করিয়াছে যাহার ফুল-যুগান্তরে মহাপ্রলয় পর্যন্ত বিশ্ব মানবতাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করিয়ে।চুচী চ্যাভরী বীীয়াগচী দ্যাাতচুকু-গোত এরয়। 'চ
অনুরূপ আল-কুরআন দর্শন ও বিজ্ঞানের কোন গ্রন্থ নহে। কিন্তু দর্শন ও বিজ্ঞানের এমন কিছু জটিল তথ্য কুরআন খুলিয়া দিয়াছে যাহার সমাধানে মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে (উলূমুল কুরআন, পৃ. ২৬৫)।
📄 আয়াতসমূহের পারস্পরিক যোগসূত্রের অলৌকিকত্ব
আয়ার নারাচকু চোরাত কী চ্যুত" কুরআন কারীমের আয়াতসমূহের পারস্পরিক সুসামঞ্জস্যপূর্ণ যোগসূত্র, উহার অতি সূক্ষ্মতর একটি অলৌকিক ও বিশ্বয়কর বৈশিষ্ট্য। একজন পাঠক স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আল-কুরআন তিলাওয়াত করিলে তাহারা মেনে হইবে, উহার আয়াতসমূহের মধ্যে পারস্পরিক কোন অংযোগ নাইসা কিন্তু পাঠক যদি একটু পর্তীর দৃষ্টিতে আল-কুরআন তিলাওয়াত করেন তাহা হইলে দেখা যাইবে, আল কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াত অপর আয়াতের সাইপ্ত সূক্ষ্মভাকে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত আল-কুরআনের একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করুনদ আল্লাহ তাআলা ইরশীদ করেসাত ভাই সাক্ষ চারাত। চার্জ আদা, মারজাত করার চাচ কাভ্যাং عبادي انى لنا الغفور الرحيم وأن عذابي هو العاب الال PES as "আপুঞ্জি আমার বান্দাদেরকে জারাইয়া, বিল, আমি সত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াল এরং-ইয়ার যে, আমার শাড়ি, যন্ত্রণাদায়ক শস্মৃতিটা ১৫০৪৪৯০ PEREউট ক্যাচত্রীচ চ্যজাচ এই উস্তোয়ারিঘয়ের পরবর্তী সায়াত রইলও হক) চাতে ভাত্যিক জান্নাত মোজার। স্যাঢ়শ্রীচ ونَبَلَهُمْ عَن ضيف ابراهيم : انا فَعَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا مثلنا قَالَ انَّا عَنكُم كو جاران .
"আপনি তাহাদেরকে ইব্রাহীমের মেহমানদের অবস্থাও ধনাইয়া দিকট যথন তাহারা তাহার গৃহে আগমন করিল এবং জ্বলিল, সাঙ্গার্সন তিনি বলিলেন, আমরা তোমাদের ব্যাপারে ভীতায় (১৯৪৫১-৫২( מנות פופולן בףত শিশুত কার চার রাকচু ত্যারীচ তিচিলেকা"
উপরে উল্লিখিত আয়াতসমূহের মধ্যে বাহ্যত কোন সম্বন্ধ আছে বলিয়া মনে হয় না। কিন্তু আপনি যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করেন তাহা হইলে দেখিবেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঘটনা মূলত পূর্ববর্তী আয়াতেরই সমর্থক। কেননা যে সকল ফেরেশতা হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর নিকট আগমন করিয়াছিলেন, তাহারা দুইটি কাজ আঞ্জাম দিয়াছেন। (এক) তাহারা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে একজন নেককার সুসতান লাভের সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন। (দুই) তাহারা হযরত লূত (আ)-এর বিদ্রোহী জাতিকে আসমানী আযাব দ্বারা ধ্বংস করিয়া দেওয়ার দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। প্রথম কাজটি ছিল আল্লাহ্ ঘোষণা (انا الغفور الرحيم )আমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু)-এর প্রকাশ এবং দ্বিতীয় কাজটি ছিল وان عذابی هو العذاب الاليم )নিশ্চয় আমার শাস্তিই মর্মন্তুদ শাস্তি)-এর প্রকাশ। এইভাবে আয়াতগুলির মধ্যে গভীর ও সূক্ষ্ম সম্বন্ধ এবং সুসামঞ্জশ্যশীল যোগসূত্র বিদ্যমান রহিয়াছে (ই'জাযুল কুরআন, শিব্বীর আহমাদ উছমানী)।
📄 নবম কারণ
কুরআনুল কারীমের একটি অন্যতম মু'জিযা এই যে, কুরআনুল কারীম তিলাওয়াত করিলে কিংবা উহার তিলাওয়াত শ্রবণ করিলে মুসলিম-কাফির, সাধারণ-অসাধারণ, মানব-দানব নির্বিশেষে সকলের উপরই একটি বিশেষ ধরনের প্রভাব সৃষ্টি হয়। কুরআন কারীম ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থের তিলাওয়াতে বা শ্রবণে ইহা পরিলক্ষিত হয় না। এই প্রসঙ্গে আল-কুরআনের ভাষ্য নিম্নরূপ:
اِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِیْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَاِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ أَيْتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
"মু'মিন তো তাহারাই যাহাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তাঁহার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন উহা তাহাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তাহারা তাহাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে" (৮:২)।
اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَديثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِي تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ .
"আল্লাহ নাযিল করিয়াছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব, যাহা সুসামঞ্জস্য এবং যাহা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়। ইহাতে, যাহারা স্বীয় প্রতিপালককে ভয় করে, তাহাদের গাত্র রোমাঞ্চিত হয়, অতঃপর তাহাদের দেহ-মন প্রশান্ত হইয়া আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকিয়া পড়ে। ইহাই আল্লাহর পথনির্দেশ, তিনি যাহাকে ইচ্ছা উহা দ্বারা পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ যাহাকে বিভ্রান্ত করেন তাহার কোন পথপ্রদর্শক নাই" (৩৯: ২৩)।
জিন জাতির উপর কুরআন শ্রবণের প্রভাব সম্বন্ধে স্বয়ং জিনদের ভাষ্য আল-কুরআনে বিবৃত হইয়াছে:
قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا ، يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَأَمَنَّا بِهِ وَلَنْ نُشْرِكَ بِرَبِّنَا أَجَدا
"বল, আমার প্রতি ওহী প্রেরিত হইয়াছে যে, জিনদিগের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করিয়াছে এবং বলিয়াছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করিয়াছি যাহা সঠিক পথ নির্দেশ করে, ফলে আমরা ইহাতে ঈমান আনিয়াছি। আমরা কখনও আমাদের প্রতিপালকের শরীক স্থির করিব না" (৭২: ১-২)।
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَراً مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ القُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا انْصِتُوا فَلَمَّا قُضِيَ وَلُّوا إِلى قَوْمِهِمْ مُنْذِرِينَ . قَالُوا يُقَوْمَنَا إِنَّا سَمِعْنَا كتباً أُنْزِلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ يَهْدِي إِلَى الْحَقِّ وَالى طريق مستقيم .
"স্মরণ কর, আমি তোমার প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছিলাম একদল জিনকে, যাহারা কুরআন পাঠ শুনিতেছিল। যখন তাহারা তাহার নিকট উপস্থিত হইল তখন একে অপরকে বলিতে লাগিল, তোমরা চুপ করিয়া শ্রবণ কর। যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হইল তখন তাহারা উহাদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরিয়া গেল সতর্ককারীরূপে। তাহারা বলিল, হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শ্রবণ করিয়াছি যাহা নাযিল করা হইয়াছে মূসার পরে। ইহা উহার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহকে সমর্থন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দাও এবং তাহার প্রতি ঈমান আন। আল্লাহ তোমাদের পাপ ক্ষমা করিবেন এবং তোমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি হইতে রক্ষা করিবেন" (৪৬: ২৯-৩০)।
মুশরিক ও কাফির শ্রবণকারীর উপর আল-কুরআন তিলাওয়াতের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার অসংখ্য ঘটনা হাদীছ গ্রন্থসমূহে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে কয়েকটি ঘটনা পেশ করা হইল।
(এক) হযরত যুবায়র ইবন মুত'ইম (রা) তাহার ইসলাম গ্রহণের পূর্বের একটি ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (স) মাগরিবের নামাযে সূরা তৃর পাঠ করিতেছিলেন। আমি শুনিতেছিলাম। মনে হইল যেন আমার হৃদয় উড়িয়া যাইতেছে। তিনি বলেন, সেই দিনের কুরআন তিলাওয়াতই আমার উপর প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। আয়াতগুলি ছিল এই:
أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَلِقُونَ . أَمْ خَلَقُوا السَّمُوتِ وَالْأَرْضِ بَلْ لَا يُوقِنُونَ . أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ . أَمْ لَهُمْ سُلَّمَ يُسْتَمِعُونَ فِيهِ فَلْيَأْتِ مُسْتَمِعُهُمْ بِسُلْطَانٍ مُّبِين .
"উহারা কি স্রষ্টা ব্যতীত সৃষ্টি হইয়াছে, না উহারা নিজেরাই স্রষ্টা? না কি উহারা আকাশ-মণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছে? বরং উহারা তো অবিশ্বাসী। তোমার প্রতিপালকের ভাণ্ডার কি উহাদের নিকট রহিয়াছে, না উহারা এই সমুদয়ের নিয়ন্তা? নাকি উহাদের কোন সিঁড়ি আছে যাহাতে আরোহণ করিয়া উহারা শ্রবণ করে? থাকিলে উহাদের সেই শ্রোতা স্পষ্ট প্রমাণ পেশ করুক" (৫২: ৩৫-৩৮)।
অপর একদিনের ঘটনা। রাসূলে কারীম (স) সূরা তুর তিলাওয়াত করিতেছিলেন। যুবায়র শুনিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যখন اَنْ عَذَابٌ رَبِّكَ لَوَاقِع “তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী” (৫২: ৭) আয়াতটি তিলাওয়াত করিলেন তখন যুবায়রের মনে হইতেছিল, সেই শাস্তি যেন তাহার উপরই আপতিত হইতেছে। তিনি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করিলেন (যারকাশী, আল-বুরহান, ২খ., পৃ. ১১৪)।
(দুই) হিজরতের পূর্বে মক্কার কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইসলাম প্রচার কার্য বন্ধ করিবার জন্য সাধ্যমত সকল চেষ্টাই করিয়াছে। কিন্তু তাহাদের কোন চেষ্টাই সফল হয় নাই। শেষ পর্যন্ত তাহারা ভাবিল, সম্ভবত মুহাম্মাদ (স)-এর কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকিত পারে। অন্যথা সে এই ইসলামের জন্য এত কষ্ট-ক্লেশ কেন সহ্য করিতেছে। স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন, জড়বাদী, দুনিয়া প্রেমিক মুশরিকদের পক্ষে রাসূলুল্লাহ (স)-এর শানে এইরূপ চিন্তার চাইতে ভাল কিছু চিন্তা করিবার অবকাশ ছিল কোথায়? তাহারা পরামর্শ করিয়া ‘উৎবা ইবন রবী'আকে রাসূলুল্লাহ (স) সমীপে প্রেরণ করিল। উদ্দেশ্য, রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াতী মিশন হইতে নিবৃত করিবার জন্য কতিপয় লোভনীয় প্রস্তাব পেশ করা। ‘উৎবা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে হাযির হইয়া বলিল, মুহাম্মাদ! আমি কিছু প্রস্তাব লইয়া আসিয়াছি। আপনি যাহা পছন্দ করিবেন, আমরা তাহাই পূরণ করিব। তবুও আপনাকে আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মের বিরোধিতা ছাড়িতে হইবে এবং নূতন ধর্মাদর্শের প্রচার বন্ধ করিতে হইবে। আমাদের প্রস্তাবগুলি এই :
১. আপনি গোটা আরবের নেতৃত্ব করিতে চাহিলে আমরা আপনাকে নেতা মানিয়া লইতে রাজি আছি।
২. অথবা আপনি বিশাল ধনৈশ্বর্যের মালিক হইতে চাহিলে আমরা আপনার জন্য উহার ব্যবস্থা করিয়া দিতে প্রস্তুত আছি।
৩. অথবা আপনি কোন পরমা সুন্দরী মহিলার পাণি গ্রহণ করিতে চাহিলে আমরা আপনার জন্য উহার বন্দোবস্ত করিতেও রাজি আছি।
‘উৎবার বক্তব্য সমাপ্ত হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার কোন উত্তর না দিয়া বরং কুরআন কারীম হইতে দুইটি আয়াত পাঠ করিয়া শুনাইলেন :
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الْهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
"বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি তাহার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং তাহার প্রতিপালকের ইবাদতে কাহাকেও শরীক না করে" (১৮ : ১১০)।
আয়াতটির শ্রবণ 'উৎবাকে এমনভাবে প্রভাবান্বিত করিল যে, সে আর কিছু না বলিয়া সোজা কুরায়শদিগের নিকট ফিরিয়া গেল এবং বলিল, মুহাম্মাদ যাহা পাঠ করে তাহা কস্মিনকালেও কবিতা নহে। ইহা অন্য কিছু। আমার মতে তোমরা তাহার বিরুদ্ধাচরণ করা পরিত্যাগ কর। তাঁহাকে স্বাধীনভাবে তাঁহার ধর্মাদর্শ প্রচার করিতে দাও। তিনি যদি সফল হন, ইহাতে তোমাদেরই মর্যাদা বৃদ্ধি পাইবে। অন্যথা আরবদের হাতে তিনি নিহত ও ধ্বংস হইবেন (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৯৩)।
(তিন) হযরত উমার ফারূক (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘোরতর শত্রু ছিলেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন, একদিন রাত্রিকালে আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে ব্যঙ্গোক্তি ও বিদ্রূপ করিবার উদ্দেশ্যে বাহির হইলাম। তখন তিনি কা'বা গৃহে নামায পড়িতেছিলেন। আমি তাঁহার নিকটে পৌছিয়া শুনিলাম, তিনি সূরা আল-হাক্কাহ তিলাওয়াত করিতেছেন। আমি নিবিষ্ট চিত্তে তাঁহার তিলাওয়াত শুনিতে থাকিলাম। মুহূর্তে মুহূর্তে আমার হৃদয়ে নূতন নূতন ভাবের উদয় হইতে লাগিল। আমি মনে মনে বলিলাম, কুরায়শরা যাহা বলিয়াছে তাহাই ঠিক। 'ইনি একজন মস্তবড় কবি। তখন রাসূলুল্লাহ (স) পড়িতে লাগিলেন:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ، وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ قَلِيْلًا مَّا تُؤْمِنُونَ "নিশ্চয় এই কুরআন এক সম্মানিত রাসূলের বাহিত বার্তা। ইহা কোন কবির রচনা নহে। তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর" (৬৯: ৪০-৪১)।
আমি মনে মনে বলিলাম, ইনি একজন মন্ত্র অভিজ্ঞ ব্যক্তি। অন্যথা আমার মনের ভাব তিনি কিভাবে জানিলেন? তৎক্ষণাত তিনি পড়িতে লাগিলেন:
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنِ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُونَ . تَنْزِيلٌ مِّنْ رَبِّ الْعَلَمِينَ .
"ইহা কোন গণকের কথাও নহে। তোমরা অল্পই অনুধাবন কর। ইহা জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হইতে নাযিলকৃত" (৬৯: ৪২-৪৩)।
এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) সূরাটির তিলাওয়াত শেষ করিলেন। ইহাতে আমার অন্তরে ইসলাম যথেষ্ট স্থান করিয়া লইল" (আহমাদ, মুসনাদ, ১খ., পৃ. ১৭)।
এই ঘটনার কিছু দিন পর তিনি কাফিরদের প্ররোচনায় রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার জন্য রওয়ানা হন। পথে নু'আয়ম ইবন আবদুল্লাহ তাহাকে বলিল, উমার! প্রথমে নিজের ঘর সামলাও। দেখ, তোমার ভগ্নি ফাতিমা ও তোমার ভগ্নিপতি সা'ঈদ ইতোমধ্যে ইসলামে দীক্ষিত হইয়াছে। এই সংবাদে হযরত 'উমার অগ্নিসম হইয়া উঠিলেন। তিনি দ্রুত ফাতিমার গৃহে প্রবেশ করিলেন। তখন ফাতিমা ও তাঁহার স্বামী গৃহাভ্যন্তরে অতি গোপনে সূরা তাহা তিলাওয়াত করিতেছিলেন। উমারকে দেখিয়া ফাতিমা আয়াতগুলি লুকাইয়া ফেলিলেন। উমার তাঁহাদের উভয়কে আঘাত করিলেন। কিন্তু ফাতিমা ও তাঁহার স্বামী তাঁহাদের ঈমানের উপর অটল রহিলেন। তাঁহাদের নির্ভীকতা ও ইসলামের জন্য নিষ্ঠা উমারকে ভাবাইয়া তুলিল। উমার বলিলেন, এতক্ষণ তোমরা যাহা পড়িতেছিলে তাহা আমার সামনে পেশ কর। ফাতিমা লিখিত সূরা' 'তাহা'র আয়াতগুলি উমারের সামনে পেশ করিলে উমার একমনে আয়াতগুলি পাঠ করিলেন। তিনি যখন এই আয়াতে পৌঁছিলেন :
اَنَّنِي أَنَا اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلوةَ لِذِكْرِي .
"আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। অতএব তুমি আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত আদায় কর" (২০: ১৪) তখন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। আল-কুরআনের আলৌকিক প্রভাব তাঁহার দেহ-মনকে শিহরিত করিয়া তুলিল। তিনি এক নূতন আলোর সন্ধান পাইলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি উচ্চ কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন :
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ
"আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল" (ইবনুল জাওযিয়্যা, তারীখ উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১০-১১)।
📄 দশম কারণ
কুরআন কারীম শ্রেষ্ঠ 'মু'জিযা হওয়ার দশম কারণ এই যে, কুরআন শরীফ বারংবার পাঠ করিলেও উহার স্বাদ শেষ হয় না, বরং উহার প্রতি আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পাইতে থাকে। ইহাকে যতই পাঠ করা হয় বা শ্রবণ করা হয়, কখনও ইহার প্রতি বিতৃষ্ণাভাব সৃষ্টি হয় না, বরং প্রত্যেকবারই এক অনাবিল আনন্দ ও নূতন এক অভাবনীয় পুলক অনুভূত হয়। ইহা আল-কুরআনেরই বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীতে যত ভাল ও আকর্ষণীয় পুস্তকই ইউক এবং উহার সাবলীলতা ও অলংকারপূর্ণতা যতই সমৃদ্ধ হউক না কেন, মানুষ উহা একবার বাড়নের দুইবার পাঠ বা শ্রবণ করিবার পর পুনরায় উহাকে পাঠ করিতে বা শ্রবণ করিতে আগ্রহ অনুভব করে না। কিন্তু পৃথিবীতে একমাত্র গ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম যাহা যত বেশী পাঠ করা হয় ততই উহার প্রতি মনের আগ্রহ, আবেগ ও উচ্ছ্বাস বাড়িতে থাকে। আল-কুরআনের পাঠ বা শ্রবণ কত যে আনন্দদায়ক, কত যে মধুময়, কত যে আত্মার প্রশান্তিদায়ক! রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) কুরআন নাযিলের সূচনা কালে সারা রাত নামাযে কুরআন তিলাওয়াতে কাটাইয়া দিতেন। তাঁহারা এত দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াইয়া নামায আদায় করিতেন যে, তাঁহাদের পা ফুলিয়া যাইত (মা'আরিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ. ৮৪৪)।
যুগ যুগ ধরিয়া আল-কুরআন পঠিত হইতেছে। সূরা ফাতিহার কথাই ধরুন। প্রত্যেক মুসলিম প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের প্রতি রাক'আতে ইহা পাঠ করিয়া থাকেন। ফরয, সুন্নাত ও নফল নামাযে তিনি কতবার এই সূরাটি পাঠ করিতেছেন? কিন্তু কেহ কি কোন দিন শুনিয়াছে যে, কাহারও নিকট ইহার বারবার আবৃত্তি বিরক্তিকর মনে হইয়াছে।
অতএব কুরআন কারীম এক মহাগ্রন্থ, মহাবিস্ময়, একটি মু'জিযা। মু'জিযার যত দিক ও বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে উহার সকল দিক বিচারেই ইহা মু'জিযা; বরং ইহার প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্যই এক একটি পূর্ণ মু'জিযা। আল-কুরআন অসংখ্য মু'জিযার কেন্দ্রবিন্দু।