📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দার্শনিকগণের অভিমত

📄 দার্শনিকগণের অভিমত


দার্শনিক ইব্‌ন সীনার দৃষ্টান্ত হইতে কারামাতের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তাঁহার সৃষ্টিতত্ত্ব "অপরিহার্য এবং আত্মসচেতন ইচ্ছাসম্পন্ন' উদ্ভবের অস্তিত্বমূলক অদৃষ্টবাদের মধ্যে মু'জিযাত ও কারামাতকে তিনি স্থান দিয়াছেন। নবীগণ তাহাদের মানবীয় প্রকৃতির পরিপূর্ণতা ও বাহ্যিক বস্তুনিচয়ের উপর প্রকৃতিগত আত্মিক প্রভাবেই মু'জিযা দ্বারা তাহাদের আগমনকে সুনিশ্চিত করিয়া থাকেন। উল্লেখ্য যে, ইব্‌ন রুশদ 'তাহাফুতুত তাহাফুত' গ্রন্থে (সম্পা, Bouyes, 515) একটি পার্থক্য উল্লেখ করিয়াছেন। তাহা হইল, যাহার মধ্যে গুণগত পার্থক্য নিহিত শুধু সেইগুলিই অলৌকিক ঘটনা। কারণ, সাধারণ মানুষের পক্ষে তাহা অসম্ভব হইলেও প্রকৃতপক্ষে তাহা সম্ভব। তাঁহার রিসালা ফী আক'সামিল উলূম গ্রন্থে (তিস'উর রাসাইলের অন্তর্ভুক্ত, কায়রো সংস্করণ, ১৩২৬/১৯০৪, পৃ. ১৪)। ইবন সীনা বলেন, কারামাত প্রকৃতিগতভাবে মু'জিযার সমার্থক। তাঁহার ইশারাত গ্রন্থে (সম্পা., Foget Lieden, ১৮২০ খৃ., ১২০) তিনি এই কথা সমর্থন করেন যে, আধ্যাত্মিক গভীরতার কল্যাণে যাহার আত্মা জাগতিক বস্তুর উপর প্রভাবশীল এবং যিনি এই প্রভাব কল্যাণকর ও নীতিসিদ্ধ পন্থায় ব্যবহার করেন, যদি তিনি নবী হন তাহা হইলে আল্লাহর দান হিসাবে তিনি উহা লাভ করেন তাহাই মু'জিযা। আর যদি তিনি ওলী হন, তাহা হইলে তিনি কারামাতের সৌভাগ্য অর্জন করেন। নবীগণ নবৃওয়াতপ্রাপ্ত হন আল্লাহর প্রতি তাঁহাদের প্রকৃতিগত সহজাত প্রবৃত্তি, প্রজ্ঞার ত্রিবিধ পরিপূর্ণতা, চিন্তাশক্তি ও কঠোর সত্যনিষ্ঠার মাধ্যমে, যদিও সেই সাধনা বা মু'জিযা নিম্ন মানের হয় (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৭খ., পৃ. ৩২৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ক) বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাব্যতা

📄 (ক) বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাব্যতা


কোন নবীর নৈতিক পরিপূর্ণতার নিদর্শন কোন অলৌকিক ঘটনা বা মু'জিযা অহেতুক নহে, বরং উহা আল্লাহ পাকের সদিচ্ছা বা কার্যকর ইচ্ছা। তিনি তাঁহার সেই ইচ্ছাকে একজন নবীর মাধ্যমে সম্পাদন করিয়া থাকেন। সেই অলৌকিক কার্যটি সম্পাদিত হয় কোন ঘোষণা বা চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায়। সুতরাং আল্লাহ পাকের পক্ষে কোন বিজ্ঞপ্তি বা চ্যালেঞ্জ ছাড়াই কোন সাধকের মাধ্যমে অতি প্রাকৃত কোন ঘটনা ঘটান বৈধ বা জাইয।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (খ) আল-কুরআনের সমর্থন

📄 (খ) আল-কুরআনের সমর্থন


এমন কতকগুলি ঘটনার অস্তিত্ব দিবালোকের মত দেদীপ্যমান ও যথার্থ বলিয়া প্রমাণিত, কুরআন মজীদে যাহা উল্লেখিত হইয়াছে, যাহার ধারকগণ কোন নবৃওয়াতের দাবিদার ছিলেন না। যেমন:
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يُمَرِيمُ أَنِّي لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ .
"যখনই যাকারিয়া কক্ষে তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইত তখনই তাহার নিকট খাদ্য-সামগ্রী দেখিতে পাইত। সে বলিত, এইসব তুমি কোথায় পাইলে? সে বলিত, উহা আল্লাহ্ নিকট হইতে। নিশ্চয় আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন" (৩: ৩৭)।
সন্দেহাতীতরূপে ঘটনাটি ছিল বিস্ময়কর, অলৌকিক। হযরত ঈসা ('আ)-এর জননী মারয়াম ('আ) নিজে কোন নবী ছিলেন না, নবুওয়াতের দাবিদারও ছিলেন না, অথচ তাঁহার নিকট পাওয়া যাইত অসম মৌসুমে মৌসুমী ফল। আরও উল্লেখ হইয়াছে:
أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ أَيْتِنَا عَجَبًا
"তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর" (১৮:৯)?
যাহারা একটি পার্বত্য গুহাতে একাধারে তিন শত বৎসর ঘুমন্ত ছিলেন তাহারা নবী-রাসূল নহেন, অথচ এই সকল ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘটনা আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে অলৌকিক নিদর্শন। আরও উল্লেখ পাওয়া যায়:
قَالَ الَّذِي عِنْدَهُ عِلْمٌ مِّنَ الكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ يُرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ فَلَمَّا رَأَهُ مُسْتَقِرًّا عِنْدَهُ قَالَ هَذَا مِنْ فَضْلِ رَبِّي .
"কিতাবের জ্ঞান যাহার ছিল সে বলিল, আপনি চক্ষুর পলক ফেলিবার পূর্বেই আমি উহা আপনাকে আনিয়া দিব। সুলায়মান যখন উহা সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখিল তখন বলিল, ইহা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ" (২৭:৪০)।
ঘটনাটি ঘটিয়াছিল হযরত সুলায়মান (আ)-এর আদেশে হয় একজন জিন্ন অথবা কোন বিজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে, যাহারা কোন নবী ছিলেন না যিনি চক্ষের পলকে রানী বিলকীসের বিরাট সিংহাসন আনিয়াছিলেন অনেক দূর হইতে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সূফী মনস্তত্ত্ব কর্তৃক স্বীকৃত

📄 সূফী মনস্তত্ত্ব কর্তৃক স্বীকৃত


ওলীগণের কারামাত সূফী দার্শনিকগণ কর্তৃক স্বীকৃত হইয়াছে। সুন্নী সূফী বিদ্যায় পারদর্শিগণ কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা সাধারণভাবে আশ'আরী মতবাদের খুবই নিকটবর্তী। এই মতবাদে কারামাত ও মু'জিযার পার্থক্যের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে। কোন ওলী-দরবেশ বিস্ময়কর কার্যাবলী সম্পাদন করিলে তিনি সেই কারণে নবী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করিতে পারেন না। তিনি তদানীন্তন রাসূল (আ) কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্মীয় আইনের অনুশাসন মানিতে বাধ্য থাকেন।
কারামাত কখনও মু'জিযার প্রতিদ্বন্দী হইতে পারে না, বরং মু'জিযার পৃষ্ঠপোষকতা করে। স্মরণ রাখিতে হইবে যে, ওলীগণের কারামাত সেই নবীর মু'জিযার প্রমাণ যে নবীর তিনি উম্মত। সেইহেতু মু'জিযা নবীর সত্যতার প্রতীক। আমরা দেখিতে পাই, হযরত খুবায়ব (রা)-কে অবিশ্বাসীরা যখন মক্কাতে শূলীতে দেয়, তখন মহানবী (স) অনেক দূরে মদীনার মসজিদে তাঁহার সহচরবৃন্দ পরিবেষ্টিত অবস্থায় উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি অন্তরদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করিলেন, হযরত খুবায়বের উপর জুলুম-অত্যাচারের করুণ অবস্থা। সহচরবৃন্দকে তাহ। সবিস্তারে অবহিত করেন। অপরদিকে আল্লাহ পাক হযরত খুবায়বের 'অন্তরায় দূরীভূত করেন। তিনি মহানবী (স)-এর পবিত্র দর্শন লাভ করেন, সালাম পেশ করেন তাঁহাকে। তিনিও সালামের জবাব দেন। হযরত খুবায়বও সালামের জবাব শুনিতে পান। মহানবী (স) তাহার জন্য দো'আ করেন। মক্কা-মদীনার মধ্যে দূরত্ব ছিল বিস্তর। তবুও তাঁহাদের মধ্যে সাক্ষাত, সালাম আদান-প্রদান সুনিশ্চিতরূপে অস্বাভাবিক ব্যাপার। ইহা হযরত খুবায়বের জন্য ছিল কারামাত আর মহানবী (স)-এর জন্য ছিল মু'জিযা (দাতা গনজে বখশ, কাশফুল মাহজুব, পৃ. ২৭২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00