📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযা ও ইসতিদরাজের মধ্যে পার্থক্য

📄 মু'জিযা ও ইসতিদরাজের মধ্যে পার্থক্য


পূর্ববর্তী আলোচনায় মু'জিযার সংজ্ঞা, স্বরূপ ও তাৎপর্য এবং ইসতিদরাজের যে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে, তাহাতেই মু'জিযাও ইসতিদরাজ এবং নবী ও যাদুকরের মধ্যে তারতম্য সুস্পষ্ট রূপে বিশ্লেষিত হইয়াছে। যাদু, সম্মোহন বা ভেল্কিবাজি শুধু হাসি-কৌতুকের সাময়িক প্রহসন মাত্র। পক্ষান্তরে মু'জিযা বা নিদর্শন হইল বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সংস্কার ও ধ্বংস, নির্মাণ ও বিনষ্ট, উন্নতি ও অবনতির উপায় উপাদান। যাদুকরের উদ্দেশ্য থাকে, যাদুর প্রহসন দ্বারা কোন অসাধারণ ঘটনাকে শুধু বিস্ময়কর পদ্ধতিতে প্রতিহত করা, যাহাতে সে কিছুক্ষণের জন্য দর্শকমণ্ডলীকে বিস্ময়াভিভূত করিয়া দিতে পারে। পক্ষান্তরে একজন নবীর উদ্দেশ্য থাকে সেই বিস্ময়কর নিদর্শনাবলীর মাধ্যমে বিশ্বজোড়া সংস্কার সাধন, জাতিকে চিরসত্যের পথে আহ্বান, গোত্রসমূহকে কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ঐশ্বর্যশালী হওয়ার শিক্ষাদান ও আল্লাহ্ দীনকে সুদৃঢ় করা। নবী-রাসূলগণ হইলেন সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী, পূত-পবিত্রকারী, উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা ও বিশ্ববাসীর সাক্ষ্যদাতা। আর যাদুকর এই সকল গুণের দিক হইতে সম্পূর্ণ রূপে বঞ্চিত।
পবিত্র কুরআনে যাদুমন্ত্র সম্পর্কে যাহা আলোচিত হইয়াছে তাহাতে স্পষ্ট বুঝা যায় আল-কুরআন যাদু-মন্ত্রের অস্তিত্ব বা প্রতিক্রিয়াকে স্বীকার করে, কিন্তু তাহা অনুমোদন বা সমর্থন করে না। একটি ধাঁধা বা সম্মোহন ব্যতীত উহার কোন গুরুত্বই দেয় না। লক্ষ্য করা যায়, হারূত-মারূত ঘটনায় যাদুর শক্তি ও ক্ষমতার সীমা সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
ফিরেতা ফাতেমা এবং ওড়না পরা মেয়েরা হাতা (স) এড়ানোর জন্য তাদের পিঠে থাকে (২: ৯৫) যারা তাদের স্বামী থেকে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তারা শিখবে, কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না, তারা যা শিখবে তা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না (২: ২৩০) যারা তাদের স্বামী থেকে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তারা শিখবে, কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না, তারা যা শিখবে তা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না (২: ২৩০)।
"উহাদের যাদুর প্রভাবে অকস্মাৎ মূসা (আ)-এর মনে হইল তাহাদের দড়ি ও লাঠিগুলি ছোটাছুটি করিতেছে” (২০: ৬৬)।
হযরত মূসা (আ)-এর সম্মুখে তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী যাদুকররা প্রথমে তাহাদের যাদু প্রদর্শন করিলে এই রকম ঘটনা ঘটিয়াছিল। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ হইতে হযরত মূসা (আ)-এর প্রতি প্রত্যাদেশ হইল:
قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعْلَى وَالْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَحْرٍ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى
"আমি বলিলাম, ভয় করিও না, তুমিই প্রবল, তোমার দক্ষিণ হস্তে যাহা আছে তাহা নিক্ষেপ কর। উহারা হা করিয়া তাহা গ্রাস করিয়া ফেলিবে। উহা যাহা করিয়াছে তাহা-তো কেবল যাদুকরের কৌশল। যাদুকর যেখানেই আসুক সফল হইবে না" (২০: ৬৮-৬৯)।
আল্লাহ তা'আলা যাদুকর ও নবীর মধ্যে যে পার্থক্য নিরূপণ করিয়াছেন তাহা হইল, নবী কৃতকার্য হন আর যাদুকর হয় অকৃতকার্য। নবীর কার্যকলাপ চেষ্টা-সাধনা ও মু'জিযার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে সফলকাম ও কল্যাণধর্মী হওয়া। অপরপক্ষে যাদুকরের উদ্দেশ্য হইল- ধোঁকাবাজি, প্রবঞ্চনা ও অনিষ্ট সাধন করা। অপর একটি আয়াতে এই ব্যাখ্যারই পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে। মিসরীয় যাদুকরদিগকে লক্ষ্য করিয়া হযরত মূসা (আ) বলিলেন:
مَا جِئْتُمْ بِهِ السِّحْرُ إِنَّ اللَّهَ سَيُبْطِلُهُ إِنَّ اللَّهَ لَا يُصْلِحُ عَمَلَ الْمُفْسِدِينَ
"তোমরা যাহা আনিয়াছ তাহা যাদু, নিশ্চয় আল্লাহ তাহাকে অসার করিয়া দিবেন। আল্লাহ নিশ্চয় অশান্তি সৃষ্টিকারীদের কর্ম সার্থক করেন না". (১০:৮১)।
যাদু ও তন্ত্রমন্ত্র একটি সাময়িক ক্রীড়া-কৌতুক। আর মু'জিযার প্রভাব, ক্রিয়াশীলতা সার্বজনীন, সর্বকালীন। এই জগতে উহার ফলাফল অত্যন্ত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। হযরত মূসা (আ)-এর মু'জিযা অবলোকন করিয়া ফিরআওন যখন বলিল, ইহাতো সব যাদুমন্ত্রের লীলাখেলা। জবাবে হযরত মূসা (আ) বলিলেন:
أسخر هذا وَلا يُفْلِحُ السَّحِرُونَ
"ইহা কি যাদু? যাদুকরেরা তো সফলকাম হয় না” (১০: ৭৭)।
পৌত্তলিক অবিশ্বাসীরা মহানবী (স) সম্পর্কে বলাবলি করিত, এই লোকটি শয়তানী শক্তির সাহায্যে এইসব বাণী পেশ করিতেছে তাঁহার বাণীর উৎস হইল শয়তানী শিক্ষা। উহার জবাবে আল্লাহ পাক তাহাদেরকে জানাইয়া দিলেন, মহানবী (স)-এর বাণীর উৎসমূল ভাল না মন্দ, শয়তানী শক্তির বহিপ্রকাশ, না ফেরেশতা শক্তির ফল-এই তত্ত্ব ও তথ্যটি অনুধাবন করা খুবই সহজ। স্বয়ং আহ্বানকারীর জীবন, তাঁহার চরিত্র ও কার্যকলাপ উহার উজ্জ্বল সাক্ষ্য। হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষায় বৃক্ষের পরিচয় ফল দ্বারাই। সুতরাং শয়তানী ও আসমানী উভয় শক্তির মধ্যে তারতম্য নিরূপণ করা মোটেই কষ্টসাধ্য নহে। আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন শয়তান কাহার নিকট গমন করে:
تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكَ أَثِيمٍ . يُلْقُوْنَ السَّمْعَ وَ أَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ "উহারা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর নিকট। উহারা কান পাতিয়া থাকে এবং উহাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী" (২৬: ২২২-২২৩)।
আসল ও নকল নবীর মধ্যে তারতম্য নিরূপণের নিমিত্ত তাহার চারিত্রিক জীবনই যথেষ্ট। এতদ্ব্যতীত মিথ্যাবাদী ও অপবাদ রটনাকারী ও অসৎ চলাফেরা কম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, দীর্ঘস্থায়ী কিংবা চিরন্তন হয় না। যেমন আল-কুরআন ঘোষণা দেয়:
إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللهِ الكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ . مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. "নিশ্চয় যাহারা আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করিবে তাহারা সফলকাম হইবে না। উহাদের সুখ-সম্ভোগ সামান্যই এবং উহাদের জন্য রহিয়াছে মর্মন্তুদ শাস্তি” (১৬: ১১৬-১১৭); (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ১৭৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00