📄 মু'জিযার স্বরূপ
আল্লাহ তা'আলা কোন নিয়ম, উপকরণ, কার্যকারণ নীতি ব্যতীতই যে কোন বস্তুকে অস্তিত্বে আনয়ন করিতে সক্ষম। মু'জিযা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও তেমনই কোন নিয়ম-নীতির প্রয়োজন নাই। যখনই তিনি ইচ্ছা করেন তখনই তিনি মু'জিযা প্রদর্শন করেন। তবে ইহা মানবিক শক্তির ঊর্ধ্বে। ইহা শিক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোন শিক্ষাগার, পাঠাগার, পরীক্ষাগার বা পাঠ্যসূচি তৈয়ার করাও সম্ভব নহে। হযরত মূসার লাঠি দ্বারা লক্ষবার মাটিতে আঘাত করিলেও আর ঝরনা প্রবাহিত হইবে না। লক্ষবার মাটিতে নিক্ষেপ করিলেও তাহা সাপে পরিণত হইবে না। শুধু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা হইলেই তাহা সম্ভব হইবে। আবার যে নবীর মাধ্যমে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে, তিনি নিজেও অনবহিত যে, কখন ও কিভাবে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে। কারণ মু'জিযা প্রদর্শনের জন্য কোন সুনির্ধারিত নিয়ম-কানুন বা সময়ও নাই। দেখা গিয়াছে, ফিরআওন ও তাহার স্বজাতির সম্মুখে হযরত মূসা (আ) তাঁহার হাতের লাঠিটি মাটিতে ফেলিয়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে লাঠিটি বিরাট একটি অজগর সাপে পরিণত হইল এবং ফোঁস ফাঁস, লম্ফঝম্ফ করিতে লাগিল। হযরত মূসা (আ) নিজেও ভীত-সন্ত্রস্ত হইলেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন :
خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سِيْرَتَهَا الْأُولَى
"তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না, আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:২১)।
হযরত মূসা (আ) যদি পূর্ব হইতেই জানিতেন, লাঠি ছাড়িয়া দিলে সাপে পরিণত হইবে, তাহা হইলে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইতেন না।
মু'জিযার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। এই জগতে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার খেলা চলিতেছে। দেখা যায়, কেহ যদি কোন কিছু আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে, তখন অপর একজন উহার প্রতিযোগিতায় উহা অপেক্ষা উন্নততর আবিষ্কারে মাতিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু মু'জিযার ক্ষেত্রে তেমনটি চিন্তা-ভাবনারও ঊর্ধ্বে। মহা প্রলয়কাল পর্যন্ত সংগ্রাম করিয়াও কেহ মু'জিযার অনুরূপ কিছু প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবে না। উড়োজাহাজ আকাশে উড়িয়া চলে মেশিনের সাহায্যে। আরও উন্নততর মেশিনের সাহায্যে রকেট চলে। পক্ষান্তরে হযরত সুলায়মান-এর (আ) তখত-সিংহাসন আকাশে উড্ডীয়মান হয় মেশিন ছাড়াই, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার দ্বারা। অনুরূপ মেশিন ছাড়া উড়া কি আর কাহারও পক্ষে সম্ভব হইয়াছে? মানবিক শক্তি ও জগতের যাবতীয় শক্তি মু'জিযার ক্ষেত্রে অচল, অকার্যকর। বস্তুত মু'জিযা উপাত্ত-উপকরণ বহির্ভূত আল্লাহ অ'আলার গোপন ইচ্ছার বহিপ্রকাশ।
📄 মু'জিযার প্রকারভেদ
হাফিজ ইব্ন কাছীর বলেন, মু'জিযা দুই প্রকার: (১) অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক; (২) পার্থিব বা জড়। পবিত্র কুরআন মজীদ একটি অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠতম মু'জিযা। ইহা সমুজ্জল প্রমাণাদির উৎকৃষ্ট বর্ণনাকারী ও নবৃওয়াতের বিস্ময়কর নিদর্শন। স্বয়ংসম্পূর্ণ, অজেয়, রচনাশৈলীর অনন্যতায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইহা আল্লাহ্র কালাম। জিন-ইনসানকে এই কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করিয়া দেখাইতে আহবান করা হইয়াছে। ইহাতে আরবী ভাষার পণ্ডিতবর্গ অক্ষমতা প্রকাশ করিয়াছে। যেমন কুরআন পাকে উল্লেখ হইয়াছে:
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأَنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
"বল, যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তাহারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তাহারা ইহার অনুরূপ আনয়ন করিতে পারিবেন না” (১৭:৮৮)।
উল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রথমত অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হইয়াছে, তোমরা যদি সক্ষম হও তবে এই কুরআনের অনুরূপ একটি কুরআন রচনা করিয়া লইয়া আইস। তাহাদের অক্ষমতা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তোমরা পরস্পর সহায়তা করিয়াও অনুরূপ রচনা করিতে সক্ষম হইবে না।
📄 কারামাত
كرامة (কারামাত) শব্দটি کرم ধাতুমূল হইতে গঠিত হইয়াছে। ইহার অর্থ, উদার, দয়ালু, সম্মানিত হওয়া। আল্লাহ পাকের অসংখ্য গুণবাচক নামের মধ্যে 'কারীম' একটি গুণবাচক নাম। আল-কুরআনে ইহা একাধিকবার ব্যবহৃত হইয়াছে। আল্লাহ পাক সেইখানে আল-কারীম (الكريم) অর্থাৎ উদার বা দয়ালু নামে আখ্যায়িত হইয়াছেন। তবে কারামাত বলিতে যাহা বুঝায়, আল-কুরআনে উল্লিখিত আল-কারীম শব্দ তাহা বুঝায় না। কারামাত (كرامة) শব্দটির বহুবচন কারামাত (كرامات)। ধর্মীয় পরিভাষায় ইহার অর্থ, আল্লাহর দেওয়া দান, যাহা সম্পূর্ণ মুক্ত, অবারিত অনুগ্রহ (ইহসান বা ইন'আম)। তবে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া যাইতে পারে এইভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ পূর্বক তাঁহার প্রিয়জনদেরকে অলৌকিক ঘটনা সম্পাদন করিবার যোগ্যতা প্রদান করিয়া থাকেন। আর তাহারাও আল্লাহ পাকের অনুকম্পাসিক্ত হইয়া অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন। ইহাই কারামাত নামে অভিহিত। এই সমস্ত ঘটনা সাধারণত বস্তু জগতে সংঘটিত অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার সমন্বয়ে ঘটিত নতুবা ভবিষ্যতের কোন পূর্ব সংকেতস্বরূপ অথবা আধ্যাত্মিক বিষয়ের কোন ব্যাখ্যাস্বরূপ (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৭খ, পৃ. ৩২৪)।
📄 ইসতিদরাজ
ইসতিদরাজ শব্দটি সাধিত হইয়াছে 'দারজ' ধাতুমূল হইতে। ইসতিদরাজ অর্থ ধোঁকা দেওয়া, প্রতারণা করা। আবার ইসতিদরাজ অর্থ, শনৈঃ শনৈঃ নিকটবর্তী হওয়া। বলা হয়, ইসতাদরাজাল্লাহুল 'আবদা' অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ধীর গতিতে বান্দার নিকটবর্তী হইলেন। ইহার অর্থ, বান্দা যখন নিত্য-নূতন পাপ কর্মে লিপ্ত হয় আল্লাহ তা'আলাও তখন নূতন নূতন নি'আমত রাশি দ্বারা তাহাকে পরিতুষ্ট করেন, তাহাকে ভুলাইয়া দেন ক্ষমা প্রার্থনা করিতে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন: سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ
"আমি অচিরেই তাহাদেরকে আস্তে আস্তে এমনভাবে পাকড়াও করিব যে, তাহারা বুঝিতেই পারিবে না"।
এই কারণেই হযরত ওমর (রা)-এর সম্মুখে যখন বাদশাহ কিসরার ধনভাণ্ডার আনীত হইল তখন তিনি আল্লাহ-তা'আলার নিকট দু'আ করিয়াছিলেন, আয় আল্লাহ! ইসতিদরাজকারী হওয়া হইতে আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি। যেহেতু আমি, তোমার ঘোষণা শুনিয়াছি, তুমি বলিয়াছ, "আমি অচিরেই তাহাদেরকে আস্তে আস্তে পাকড়াও করিব যেন তাহারা উপলব্ধিই করিতে না পারে" (আল-যাবীদী, তাজুল 'আরূস, ৫খ., পৃ. ৫৬০)।
ধোঁকা ও প্রবঞ্চনার দ্বারা মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার প্রক্রিয়াকে আরবী পরিভাষায় ইসতিদরাজ বলে। সিহর, যাদু, ইন্দ্রজাল, সম্মোহন, ভেল্কীবাজি, নজরবন্দী ইত্যাদি পরিভাষাগত ইসতিদরাজ। যাদুকররা সম্মোহন বা ইন্দ্রজালের দ্বারা মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে। অস্তে আস্তে মানুষ তাহাদের খপ্পরে পড়ে।
অস্বাভাবিক কার্যকলাপ দ্বারা মানুষকে প্রতারণা করে। ফলে ইহাও অলৌকিক মু'জিযা বা কারামাতের পর্যায়ে বিবেচিত হয়। তবে ইহা শরী'আত সমর্থিত নহে।
মুফতী মুহাম্মাদ ইউসুফ বলেন, যে অস্বাভাবিক ক্রিয়া-কর্ম কোন ফাসিক পাপী বিধর্মী কাফির হইতে প্রকাশ পায়, উহাকে প্রতারণা বা ইসতিদরাজ বলে। একজন ফাসিক ফাজির হইতে এই রকম অলৌকিক কার্য প্রকাশ পাওয়া একটা ফিৎনা এবং মানুষের জন্য মহাপরীক্ষা (মুফতী মুহাম্মাদ ইউসুফ, যাওয়াহিরুল ফারাইদ, পৃ. ৬২৭)।