📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযার তাৎপর্য

📄 মু'জিযার তাৎপর্য


নবৃওয়াতের দাবিদার স্বীয় গোত্রীয় সন্তানদিগকে যে আমন্ত্রণ জানান এবং এই জগতের বুকে যে পয়গাম ছড়াইয়া দেন, উহার সত্যতার সমুজ্জ্বল প্রমাণ বা নিদর্শন যদিও স্বয়ং পয়গাম বা পয়গামবাহকের অস্তিত্ব, তথাপি সংশয়ী চিত্তের স্বস্তির প্রয়োজনে প্রমাণে পূর্ণতা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সত্যের আহ্বায়কের দ্বারা এমন কিছু কার্যাবলী প্রকাশ পায় যাহা সাধারণ মানুষের ক্ষমতা বা ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে।
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর বেলায় অগ্নি শীতল হয়। হযরত মূসা (আ)-এর হাতের লাঠি পরিণত হইল অজগর সাপে। পিতাবিহীন সন্তানের অস্তিত্ব হইলেন হযরত ঈসা (আ)। মহানবী (স) মসজিদে হারাম হইতে মসজিদে আক্সা, তথা হইতে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পরিভ্রমণ করিয়া আসেন স্বল্প সময়ে। মানববুদ্ধি যেহেতু এইগুলির ব্যাখ্যা প্রদান করিতে অক্ষম, সেহেতু ইহাতে এক অদৃশ্য শক্তির ক্রিয়া ধরা পড়ে। যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে ইহা প্রকাশ পায়, অদৃশ্যের জ্ঞানসহ অন্যান্য নিদর্শনাদি যাহার সহায়ক হয়, তাহাকে অদৃশ্য সাহায্যপ্রাপ্ত বলিয়া ধরা হয়। কুরআন মজীদ এই সমস্ত ঘটনার নাম দিয়াছে 'বায়্যিনাত', 'বারাহীন' এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে 'আয়াত'। মুহাদ্দিছগণ ঐগুলিকে 'দালাইলুন নুবৃওয়াত' আখ্যা দিয়াছেন। দার্শনিকগণের পরিভাষায় উহা নাম হইল মু'জিযা' বা অস্বাভাবিক কার্যাবলী (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৭৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযার স্বরূপ

📄 মু'জিযার স্বরূপ


আল্লাহ তা'আলা কোন নিয়ম, উপকরণ, কার্যকারণ নীতি ব্যতীতই যে কোন বস্তুকে অস্তিত্বে আনয়ন করিতে সক্ষম। মু'জিযা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও তেমনই কোন নিয়ম-নীতির প্রয়োজন নাই। যখনই তিনি ইচ্ছা করেন তখনই তিনি মু'জিযা প্রদর্শন করেন। তবে ইহা মানবিক শক্তির ঊর্ধ্বে। ইহা শিক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোন শিক্ষাগার, পাঠাগার, পরীক্ষাগার বা পাঠ্যসূচি তৈয়ার করাও সম্ভব নহে। হযরত মূসার লাঠি দ্বারা লক্ষবার মাটিতে আঘাত করিলেও আর ঝরনা প্রবাহিত হইবে না। লক্ষবার মাটিতে নিক্ষেপ করিলেও তাহা সাপে পরিণত হইবে না। শুধু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা হইলেই তাহা সম্ভব হইবে। আবার যে নবীর মাধ্যমে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে, তিনি নিজেও অনবহিত যে, কখন ও কিভাবে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে। কারণ মু'জিযা প্রদর্শনের জন্য কোন সুনির্ধারিত নিয়ম-কানুন বা সময়ও নাই। দেখা গিয়াছে, ফিরআওন ও তাহার স্বজাতির সম্মুখে হযরত মূসা (আ) তাঁহার হাতের লাঠিটি মাটিতে ফেলিয়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে লাঠিটি বিরাট একটি অজগর সাপে পরিণত হইল এবং ফোঁস ফাঁস, লম্ফঝম্ফ করিতে লাগিল। হযরত মূসা (আ) নিজেও ভীত-সন্ত্রস্ত হইলেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন :
خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سِيْرَتَهَا الْأُولَى
"তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না, আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:২১)।
হযরত মূসা (আ) যদি পূর্ব হইতেই জানিতেন, লাঠি ছাড়িয়া দিলে সাপে পরিণত হইবে, তাহা হইলে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইতেন না।
মু'জিযার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। এই জগতে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার খেলা চলিতেছে। দেখা যায়, কেহ যদি কোন কিছু আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে, তখন অপর একজন উহার প্রতিযোগিতায় উহা অপেক্ষা উন্নততর আবিষ্কারে মাতিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু মু'জিযার ক্ষেত্রে তেমনটি চিন্তা-ভাবনারও ঊর্ধ্বে। মহা প্রলয়কাল পর্যন্ত সংগ্রাম করিয়াও কেহ মু'জিযার অনুরূপ কিছু প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবে না। উড়োজাহাজ আকাশে উড়িয়া চলে মেশিনের সাহায্যে। আরও উন্নততর মেশিনের সাহায্যে রকেট চলে। পক্ষান্তরে হযরত সুলায়মান-এর (আ) তখত-সিংহাসন আকাশে উড্ডীয়মান হয় মেশিন ছাড়াই, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার দ্বারা। অনুরূপ মেশিন ছাড়া উড়া কি আর কাহারও পক্ষে সম্ভব হইয়াছে? মানবিক শক্তি ও জগতের যাবতীয় শক্তি মু'জিযার ক্ষেত্রে অচল, অকার্যকর। বস্তুত মু'জিযা উপাত্ত-উপকরণ বহির্ভূত আল্লাহ অ'আলার গোপন ইচ্ছার বহিপ্রকাশ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মু'জিযার প্রকারভেদ

📄 মু'জিযার প্রকারভেদ


হাফিজ ইব্‌ন কাছীর বলেন, মু'জিযা দুই প্রকার: (১) অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক; (২) পার্থিব বা জড়। পবিত্র কুরআন মজীদ একটি অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠতম মু'জিযা। ইহা সমুজ্জল প্রমাণাদির উৎকৃষ্ট বর্ণনাকারী ও নবৃওয়াতের বিস্ময়কর নিদর্শন। স্বয়ংসম্পূর্ণ, অজেয়, রচনাশৈলীর অনন্যতায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইহা আল্লাহ্র কালাম। জিন-ইনসানকে এই কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করিয়া দেখাইতে আহবান করা হইয়াছে। ইহাতে আরবী ভাষার পণ্ডিতবর্গ অক্ষমতা প্রকাশ করিয়াছে। যেমন কুরআন পাকে উল্লেখ হইয়াছে:
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأَنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
"বল, যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তাহারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তাহারা ইহার অনুরূপ আনয়ন করিতে পারিবেন না” (১৭:৮৮)।
উল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রথমত অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হইয়াছে, তোমরা যদি সক্ষম হও তবে এই কুরআনের অনুরূপ একটি কুরআন রচনা করিয়া লইয়া আইস। তাহাদের অক্ষমতা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তোমরা পরস্পর সহায়তা করিয়াও অনুরূপ রচনা করিতে সক্ষম হইবে না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কারামাত

📄 কারামাত


كرامة (কারামাত) শব্দটি کرم ধাতুমূল হইতে গঠিত হইয়াছে। ইহার অর্থ, উদার, দয়ালু, সম্মানিত হওয়া। আল্লাহ পাকের অসংখ্য গুণবাচক নামের মধ্যে 'কারীম' একটি গুণবাচক নাম। আল-কুরআনে ইহা একাধিকবার ব্যবহৃত হইয়াছে। আল্লাহ পাক সেইখানে আল-কারীম (الكريم) অর্থাৎ উদার বা দয়ালু নামে আখ্যায়িত হইয়াছেন। তবে কারামাত বলিতে যাহা বুঝায়, আল-কুরআনে উল্লিখিত আল-কারীম শব্দ তাহা বুঝায় না। কারামাত (كرامة) শব্দটির বহুবচন কারামাত (كرامات)। ধর্মীয় পরিভাষায় ইহার অর্থ, আল্লাহর দেওয়া দান, যাহা সম্পূর্ণ মুক্ত, অবারিত অনুগ্রহ (ইহসান বা ইন'আম)। তবে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া যাইতে পারে এইভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ পূর্বক তাঁহার প্রিয়জনদেরকে অলৌকিক ঘটনা সম্পাদন করিবার যোগ্যতা প্রদান করিয়া থাকেন। আর তাহারাও আল্লাহ পাকের অনুকম্পাসিক্ত হইয়া অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন। ইহাই কারামাত নামে অভিহিত। এই সমস্ত ঘটনা সাধারণত বস্তু জগতে সংঘটিত অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার সমন্বয়ে ঘটিত নতুবা ভবিষ্যতের কোন পূর্ব সংকেতস্বরূপ অথবা আধ্যাত্মিক বিষয়ের কোন ব্যাখ্যাস্বরূপ (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৭খ, পৃ. ৩২৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00