📄 মু'জিযার আভিধানিক অর্থ
মুজিয়া শব্দটি মূল হলো ‘ইজায, অর্থ অক্ষম বা অকর্মণ্য করিয়া দেওয়া। ইহার বিপরীত শব্দ কুদরত, অর্থ সক্ষম বা সমর্থ হওয়া। আল-ই’জায হইতে গঠিত মু’জিয়া শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ কর্তৃবাচক। আল-মুজিয়া অর্থ অক্ষমকারী। পারিভাষিক অর্থে
مَا أُعْجِزَ بِهِ الْخَصْمُ عِنْدَ التَّحَدِّى. “চ্যালেঞ্জের সময় যাহা প্রতিপক্ষকে অক্ষম করিয়া দেয়। প্রতিপক্ষ সম্পূর্ণরূপে অক্ষম ও অকর্মণ্য হইয়া পড়ে” (আয্-যুবায়দী, তাজুল ‘আর্স, ১৫৮খ., পৃ. ২২১)। আশ-শামী বলেন :
قَالَ الْمُحَقِّقُوْنَ اَلْمُعْجِزَةُ هِيَ الْاَمْرُ الْخَارِقُ لِلْعَادَةِ الْمَقْرُوْنُ بِالتَّحَدِّى الدَّالُّ عَلَى صِدْقِ الْاَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ الْوَاقِعُ عَلَى وَفْقِ دَعْوَى الْمُتَحَدِّى بِهَا مَعَ اَمْنِ الْمُعَارَضَةِ وَسُمِّيَتِ الْمُعْجِزَةُ لِعَجْزِ الْبَشَرِ عَنِ الْاِتْيَانِ بِمِثْلِهَا. “মুহাক্কিক আলেমগণ বলিয়াছেন, নবীগণের সত্যতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় যে অস্বাভাবিক বিস্ময়কর ঘটনা তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হয় উহাই মু'জিয়া। চ্যালেঞ্জকারীর দাবির প্রেক্ষিতে যাহা প্রতিদ্বন্দিতাকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়। মানুষের পক্ষে অনুরূপ কিছু করা অসম্ভব বিধায় উহার নামকরণ করা হয় মু’জিয়া” (সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৪০৫)। আল্লামা জুরজানী বলেন :
اَلْمُعْجِزَةُ اَمْرُ خَارِقُ لِلْعَادَةِ دَاعِيَةٌ اِلَى الْخَيْرِ وَالسَّعَادَةِ مَقْرُوْنَةٌ بِدَعْوَى النُّبُوَّةِ قُصِدَ بِهِ اِظْهَارُ صِدْقِ مَنِ ادَّعَى اَنَّهُ رَسُوْلٌ مِنَ اللهِ. “মু’জিযা হইল অস্বাভাবিক একটি ঘটনা, যাহা কল্যাণ ও সৌভাগ্যের প্রতি আমন্ত্রণ জানায়, যাহা নবুওয়্যাত কর্মের সহিত জড়িত। ইহার উদ্দেশ্য হইল, যিনি নবুওয়্যাতের দাবি করিয়াছেন উহার সত্যতা প্রমাণ করা” (আল-জুরজানী, কিতাবুত্ তা’রীফাত, পৃ. ২১৮)।
আল-মু'জামুল ওয়াসীত গ্রন্থে উল্লেখ হইয়াছে:
المعجزة امر خارق للعادة يظهر الله على يد بنى تائيداً النبوته وما يعجزه البشران يأتوا بمثله .
"অস্বাভাবিক বিষয়কে মু'জিযা বলে। একজন নবীর নবুওয়াতের সমর্থনে আল্লাহ পাক তাহা প্রকাশ করিয়া থাকেন। অনুরূপ কিছু প্রকাশ করিতে সাধারণ মানুষ অক্ষম" (মু'জামুল ওয়াসীত, পৃ. ৫৮৫)।
ইমাম ইবন তায়মিয়্যা বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবন, কর্ম, চরিত্র ও বাণী তথা তাঁহার জীবনের প্রতিটি আচরণ, উচ্চারণ এক একটি জীবন্ত মু'জিযা। তাঁহার উপর নাযিলকৃত শরী'আত একটি স্বতন্ত্র মু'জিযা। তদুপরি উম্মতের পূণ্যবান লোকদের কারামাতসমূহও তাঁহার নবুওয়াতের মু'জিযা বলিয়া গণ্য করা হয় (ইমাম ইব্ তায়মিয়্যা, আল-জাওয়াবুস সাহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ, ৪খ., পৃ.৭৮-৯৪)।
নবী-রাসূলগণ (আ) আল্লাহ পাকের নির্দেশে মানুষকে হিদায়াতের বাণী শুনাইয়া সৎপথ প্রদর্শন করেন। সৌভাগ্যবান ব্যক্তিগণ তাঁহাদের হিদায়াতের বাণী শ্রবণ করিয়া অবিলম্বে তাঁহাদের প্রতি ঈমান আনেন। পক্ষান্তরে হতভাগ্যগণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শিকার হইয়া তাঁহাদেরকে অবিশ্বাস করিয়া থাকে। এই হতভাগ্যদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিরসনকল্পে নবী-রাসূলগণের নবুওয়াতের সমর্থনে আল্লাহ পাক অভূতপূর্ব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটাইয়া থাকেন। উহাই মু'জিযা বলিয়া অভিহিত (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৭খ., পৃ. ৭২৪)।
ইবন ইউসুফ সালিহী বলেন, মু'জিযাকে মু'জিযা বলিয়া স্বীকার করিবার ক্ষেত্রে চারিটি শর্তের আওতায় উহাকে বিশ্লেষণ করিতে হইবে।
(এক) যাহা স্বাভাবিক নিয়ম নীতি ভঙ্গ করিয়া সংঘটিত হইবে, যেমন চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া, অঙ্গুলী সমূহ হইতে পানির ঝরণা প্রবাহিত হওয়া, লাঠি সাপে পরিণত হওয়া, প্রস্তরের মধ্য হইতে উস্ত্রী বাহির হওয়া ইত্যাদি।
(দুই) যাহা চ্যালেঞ্জের সহিত জড়িত। আবার অনেকে বলিয়াছেন, যাহা চ্যালেঞ্জের সহিত জড়িত নহে। কারণ মহানবী (স) হইতে স্বাভাবিক' নীতিবিরুদ্ধ যে সকল ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে উহার অধিকাংশই চ্যালেঞ্জবিহীন। অতএব যাহারা চ্যালেঞ্জের শর্ত আরোপ করিয়াছেন, তাঁহাদের অভিমত সঠিক নহে। সমস্যাটির সমাধান এইভাবে করা যাইতে পারে যে, যখনই নবী করীম (স) নবৃওয়াতের দাবি করিয়াছেন, তখনই স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গ করিয়াই তাহা সংঘটিত হইয়াছে। যখনই তিনি দাবি করিতেছেন أَنَا رَسُولُ الله إلى الخلق "আমি সৃষ্টি জগতের প্রতি আল্লাহ তা'আলার একজন রাসূল", তখনই বুঝিতে হইবে স্বাভাবিক নিয়ম ভঙ্গ করিয়াই এই দাবিটি করা হইতেছে। মুখ্যত চ্যালেঞ্জ এইখানে পরোক্ষভাবেই জড়িত (শায়খ কামালুদ্দীন ইবনুল হুমাম, মাসীরাত)।
(তিন) যাহা নবৃওয়াত ও রিসালাত প্রাপ্তির পূর্বে সংঘটিত হইয়াছে। উহাতে চ্যালেঞ্জ বা মুকাবিলার কোন উৎস থকে না। ইহা মু'জিযা বলিয়া অভিহিত নহে বরং কারামাত বলা যাইতে পারে। যেমন মহানবী (স)-এর শৈশব অবস্থায় তাঁহার বক্ষ বিদারণ, কৈশোরাবস্থায় তাঁহাকে মেঘের ছায়াদান। শিশুকালে হযরত ঈসার দোলনা হইতে কথা বলা। ইহা নবী-রাসূলগণের নবৃওয়াত ও রিসালতের ভিত্তি।
(চার) যাহা দাবিদারের দাবির স্বপক্ষে সংঘটিত হইবে তাহাই মু'জিযা, বিপক্ষে হইলে মু'জিযা নহে। যেমন নবৃওয়াতের দাবিদার দাবি করিবেন, আমার নবুওয়াতের নিদর্শন হইল, আমার দাবির স্বপক্ষে আমার হাত অথবা এই প্রাণী যাহার কথা বলিবে। তাহার হাত অথবা প্রাণীটি যদি তাহার বিপক্ষে বলে এই লোকটি মিথ্যুক, সে নবী নহে। তাহা হইলে তাহার হাত ও প্রাণীটি কথা বলা সত্ত্বেও তাহার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়াছে বলিয়া উহা মু'জিযা নহে। যেমন মুসায়লামা কায্যাব একটি কূপে পানি বৃদ্ধির জন্য থুথু নিক্ষেপ করিয়াছিল। ফলে কূপটি ধ্বসিয়া গিয়া উহার পানি উধাও হইয়া গিয়াছিল।
এই চারটি শর্ত বহির্ভূত বিষয়গুলি মু'জিযা নহে। তবে দাজ্জাল তাহার দুই হাতে স্বাভাবিক নীতি বিরুদ্ধ নিদর্শনসহ আগমন করিবে। উহাকে মু'জিযা বলা যাইবে না। কারণ সে নবুওয়াতের দাবিদার হইবে না, বরং সে দাবিদার হইবে প্রভুত্বের (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৯খ., পৃ. ৪০৬)।
শব্দ বিভ্রাট-নবী-রাসূলগণ দ্বারা প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনাকে সাধারণত মু'জিযা বলা হয়। শব্দটি বহুল প্রচলিত। তবে কয়েকটি কারণেই শব্দটির ব্যবহার যুক্তিযুক্ত নয়।
(এক) পবিত্র কুরআন ও হাদীছে শব্দটি আদৌ-ব্যবহৃত হয় নাই। তদস্থলে কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে আয়াত বায়্যিনাত ও বুরহান। এই পরিভাষাদ্বয় মূল বক্তব্যকে যথাযথ সুন্দরভাবে ব্যক্ত করে। অনুরূপ হাদীছ গ্রন্থসমূহে ব্যবহৃত হইয়াছে 'দলীল' ও 'আলামত' শব্দদ্বয়। মু'জিযা শব্দটির ব্যবহারে অস্বাভাবিক, অলৌকিক ইত্যাদি বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা হইয়া থাকে। আল-কুরআন ও হাদীছে ব্যবহৃত শব্দগুলি 'আয়াত,' 'বায়্যিনাত', 'বুরহান', 'দলীল', 'আলামত' অর্থাৎ নিদর্শন, দলীল, ব্যবহার করা হইলে বিষয়টি বিতর্কিত হইত না।
(দুই) মু'জিযা পরিভাষাটির ব্যবহারগত কারণে ইহার সহিত কিছু মানসিক বিশেষ কারণ জড়িত হইয়া পড়িয়াছে। অথচ উহা অসমীচীন। যেমন নবী-রাসূলগণ কর্তৃক উহা প্রকাশ পায় বলিয়া সাধারণ মানুষ উহাকে নবী-রাসূলগণের অলৌকিক কাজ ইত্যাদি বলিয়া ধারণা করিয়া থাকে।
(তিন) মু'জিযা শব্দটি হইতে বুঝা যায়, উহা একটি অসম্ভব অস্বাভাবিক কাজ। বাস্তবে তাহা নহে। তাই বলা যায়, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শনের দিক হইতে মু'জিযার উপর যতগুলি প্রশ্ন আরোপিত হইয়াছে, তাহা এই ভুল পরিভাষা ব্যবহার করার কারণেই।
(চার) সর্বাপেক্ষা বড় কথা হইল, আমাদের এমন একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দের প্রয়োজন। যাহাতে নবৃওয়াতের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট থাকিবে। মু'জিযা শব্দটি তেমন ব্যাপক অর্থবোধক নহে বরং কুরআন পাকে ব্যবহৃত শব্দাবলী ব্যাপক অর্থবহ। সুতরাং কুরআন পাকে ব্যবহৃত আয়াত, 'বায়্যিনাত', 'বুরহান' হাদীছ শরীফে ব্যবহৃত 'দলীল', 'আলামতই মু'জিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য যথাযথ শব্দ (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন- নবী, খ., পৃ. ১৭)।
আল-কুরআনে মু'জিযাকে 'আয়াত' বলা হইয়াছে। কুরআন পাকের পরিভাষায় নবী- রাসূলগণের মু'জিযাকে আয়াত ও বায়্যিনাত বলিয়া এইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে: فَلَمَّا جَاءَهُمْ مُوسَى بِأَيْتِنَا بَيِّنت قَالُوا مَا هَذَا إِلا سِحْرٌ مُفْتَرَى .
"মূসা যখন উহাদের নিকট আমার সুস্পষ্ট নিদর্শন লইয়া আসিল, উহারা বলিল, ইহা-তো অলীক ইন্দ্রজাল মাত্র" (২৮: ৩৬)! فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمُ الطُّوفَانَ وَالجَرَادَ وَالقُمَّلَ وَالصَّفَادِعَ وَالدَّمَ أَيْت مفصلات .
"অতঃপর আমি তাহাদিগকে প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, রক্ত ও ভেক দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এইগুলি স্পষ্ট নিদর্শন" (৭: ১৩৩)। قَالَ إِنْ كُنْتَ جِئْتَ بِآيَةٍ فَأْتِ بِهَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ .
"ফিরআওন বলিল, যদি তুমি কোন নিদর্শন আনিয়া থাক তবে তুমি সত্যবাদী হইলে তাহা পেশ কর" (৭: ১০৬)।
মক্কার মুশরিকরা যখন মু'জিযা দাবি করিল তখন উহার প্রত্যুত্তরে ঘোষণা করা হইল: قُلْ إِنَّمَا الْأَيَاتُ عِنْدَ اللهِ . "বল, নিদর্শন তো আল্লাহ্র এখতিয়ারভুক্ত" (৬:১০৯)।
অবিশ্বাসীরা বলিতঃ فَلْيَأْتِنَا بِآيَاتِ كَمَا أُرْسِلَ الْأَوَّلُونَ . "অতএব সে আনয়ন করুক আমাদের নিকট এক নিদর্শন যেইরূপ নিদর্শনসহ প্রেরিত হইয়াছিল পূর্ববর্তিগণ” (২১:৫)।
হযরত সালেহ (আ) তাঁহার মু'জিযা সম্পর্কে ঘোষণা করেন: وَيُقَوْمِ هَذِهِ نَاقَةُ اللهِ لَكُمْ أَيَةً . “হে আমার সম্প্রদায়! ইহা আল্লাহ্র উষ্ট্রী তোমাদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ” (১১ঃ ৬৪)।
📄 মু'জিযার তাৎপর্য
নবৃওয়াতের দাবিদার স্বীয় গোত্রীয় সন্তানদিগকে যে আমন্ত্রণ জানান এবং এই জগতের বুকে যে পয়গাম ছড়াইয়া দেন, উহার সত্যতার সমুজ্জ্বল প্রমাণ বা নিদর্শন যদিও স্বয়ং পয়গাম বা পয়গামবাহকের অস্তিত্ব, তথাপি সংশয়ী চিত্তের স্বস্তির প্রয়োজনে প্রমাণে পূর্ণতা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সত্যের আহ্বায়কের দ্বারা এমন কিছু কার্যাবলী প্রকাশ পায় যাহা সাধারণ মানুষের ক্ষমতা বা ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে।
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর বেলায় অগ্নি শীতল হয়। হযরত মূসা (আ)-এর হাতের লাঠি পরিণত হইল অজগর সাপে। পিতাবিহীন সন্তানের অস্তিত্ব হইলেন হযরত ঈসা (আ)। মহানবী (স) মসজিদে হারাম হইতে মসজিদে আক্সা, তথা হইতে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পরিভ্রমণ করিয়া আসেন স্বল্প সময়ে। মানববুদ্ধি যেহেতু এইগুলির ব্যাখ্যা প্রদান করিতে অক্ষম, সেহেতু ইহাতে এক অদৃশ্য শক্তির ক্রিয়া ধরা পড়ে। যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে ইহা প্রকাশ পায়, অদৃশ্যের জ্ঞানসহ অন্যান্য নিদর্শনাদি যাহার সহায়ক হয়, তাহাকে অদৃশ্য সাহায্যপ্রাপ্ত বলিয়া ধরা হয়। কুরআন মজীদ এই সমস্ত ঘটনার নাম দিয়াছে 'বায়্যিনাত', 'বারাহীন' এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে 'আয়াত'। মুহাদ্দিছগণ ঐগুলিকে 'দালাইলুন নুবৃওয়াত' আখ্যা দিয়াছেন। দার্শনিকগণের পরিভাষায় উহা নাম হইল মু'জিযা' বা অস্বাভাবিক কার্যাবলী (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন-নবী, ৩খ., পৃ. ৭৬)।
📄 মু'জিযার স্বরূপ
আল্লাহ তা'আলা কোন নিয়ম, উপকরণ, কার্যকারণ নীতি ব্যতীতই যে কোন বস্তুকে অস্তিত্বে আনয়ন করিতে সক্ষম। মু'জিযা প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও তেমনই কোন নিয়ম-নীতির প্রয়োজন নাই। যখনই তিনি ইচ্ছা করেন তখনই তিনি মু'জিযা প্রদর্শন করেন। তবে ইহা মানবিক শক্তির ঊর্ধ্বে। ইহা শিক্ষা করার উদ্দেশ্যে কোন শিক্ষাগার, পাঠাগার, পরীক্ষাগার বা পাঠ্যসূচি তৈয়ার করাও সম্ভব নহে। হযরত মূসার লাঠি দ্বারা লক্ষবার মাটিতে আঘাত করিলেও আর ঝরনা প্রবাহিত হইবে না। লক্ষবার মাটিতে নিক্ষেপ করিলেও তাহা সাপে পরিণত হইবে না। শুধু আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা হইলেই তাহা সম্ভব হইবে। আবার যে নবীর মাধ্যমে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে, তিনি নিজেও অনবহিত যে, কখন ও কিভাবে মু'জিযা প্রদর্শিত হইবে। কারণ মু'জিযা প্রদর্শনের জন্য কোন সুনির্ধারিত নিয়ম-কানুন বা সময়ও নাই। দেখা গিয়াছে, ফিরআওন ও তাহার স্বজাতির সম্মুখে হযরত মূসা (আ) তাঁহার হাতের লাঠিটি মাটিতে ফেলিয়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে লাঠিটি বিরাট একটি অজগর সাপে পরিণত হইল এবং ফোঁস ফাঁস, লম্ফঝম্ফ করিতে লাগিল। হযরত মূসা (আ) নিজেও ভীত-সন্ত্রস্ত হইলেন। আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিলেন :
خُذْهَا وَلَا تَخَفْ سَنُعِيدُهَا سِيْرَتَهَا الْأُولَى
"তুমি ইহাকে ধর, ভয় করিও না, আমি ইহাকে ইহার পূর্বরূপে ফিরাইয়া দিব" (২০:২১)।
হযরত মূসা (আ) যদি পূর্ব হইতেই জানিতেন, লাঠি ছাড়িয়া দিলে সাপে পরিণত হইবে, তাহা হইলে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হইতেন না।
মু'জিযার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নাই। এই জগতে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার খেলা চলিতেছে। দেখা যায়, কেহ যদি কোন কিছু আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে, তখন অপর একজন উহার প্রতিযোগিতায় উহা অপেক্ষা উন্নততর আবিষ্কারে মাতিয়া উঠিয়াছে। কিন্তু মু'জিযার ক্ষেত্রে তেমনটি চিন্তা-ভাবনারও ঊর্ধ্বে। মহা প্রলয়কাল পর্যন্ত সংগ্রাম করিয়াও কেহ মু'জিযার অনুরূপ কিছু প্রদর্শন করিতে সক্ষম হইবে না। উড়োজাহাজ আকাশে উড়িয়া চলে মেশিনের সাহায্যে। আরও উন্নততর মেশিনের সাহায্যে রকেট চলে। পক্ষান্তরে হযরত সুলায়মান-এর (আ) তখত-সিংহাসন আকাশে উড্ডীয়মান হয় মেশিন ছাড়াই, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার দ্বারা। অনুরূপ মেশিন ছাড়া উড়া কি আর কাহারও পক্ষে সম্ভব হইয়াছে? মানবিক শক্তি ও জগতের যাবতীয় শক্তি মু'জিযার ক্ষেত্রে অচল, অকার্যকর। বস্তুত মু'জিযা উপাত্ত-উপকরণ বহির্ভূত আল্লাহ অ'আলার গোপন ইচ্ছার বহিপ্রকাশ।
📄 মু'জিযার প্রকারভেদ
হাফিজ ইব্ন কাছীর বলেন, মু'জিযা দুই প্রকার: (১) অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক; (২) পার্থিব বা জড়। পবিত্র কুরআন মজীদ একটি অপার্থিব বা আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠতম মু'জিযা। ইহা সমুজ্জল প্রমাণাদির উৎকৃষ্ট বর্ণনাকারী ও নবৃওয়াতের বিস্ময়কর নিদর্শন। স্বয়ংসম্পূর্ণ, অজেয়, রচনাশৈলীর অনন্যতায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইহা আল্লাহ্র কালাম। জিন-ইনসানকে এই কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করিয়া দেখাইতে আহবান করা হইয়াছে। ইহাতে আরবী ভাষার পণ্ডিতবর্গ অক্ষমতা প্রকাশ করিয়াছে। যেমন কুরআন পাকে উল্লেখ হইয়াছে:
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأَنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
"বল, যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তাহারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তাহারা ইহার অনুরূপ আনয়ন করিতে পারিবেন না” (১৭:৮৮)।
উল্লিখিত আয়াত দ্বারা প্রথমত অবিশ্বাসীদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হইয়াছে, তোমরা যদি সক্ষম হও তবে এই কুরআনের অনুরূপ একটি কুরআন রচনা করিয়া লইয়া আইস। তাহাদের অক্ষমতা সম্পর্কে বলা হইয়াছে, তোমরা পরস্পর সহায়তা করিয়াও অনুরূপ রচনা করিতে সক্ষম হইবে না।