📄 (এক) লাঠি সর্পে পরিণত হওয়া
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার নবৃওয়াতের প্রমাণস্বরূপ এই নিদর্শন প্রদান করেন। তিনি যখন ফিরআওনের নিকট দাওয়াত লইয়া গেলেন এবং নিজেকে আল্লাহ্ প্রেরিত নবী ও রাসূল বলিয়া দাবি করিলেন, তখন ফিরআওন তাঁহাকে অস্বীকার করিল। নবী বলিলেন, যদি ইহার প্রমাণ পেশ করিতে পারি, তবুও কি তুমি আমাকে অস্বীকার করিবে? ফিরআওন বলিল, তুমি সত্যবাদী হইলে প্রমাণ পেশ কর। মূসা (আ) তাঁহার হাতের লাঠি নিক্ষেপ করিলেন, অমনি তাহা সর্পে রূপান্তরিত হইয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিল (দ্র. ২৬: ২৯-৩২)।
📄 (দুই) তাঁহার দক্ষিণ হস্ত শুভ্র উজ্জ্বল হইয়া যাওয়া
ইহাও একটি মু'জিযা যাহা ফিরআওনের দরবারে সংঘটিত হইয়াছিল। মূসা (আ) তাঁহার দক্ষিণ হস্ত বগলে চাপিয়া রাখিয়া বাহির করিলেন। তৎক্ষণাৎ উহা শুভ্র উজ্জ্বল হইয়া গেল। আবার যখন তিনি তাঁহার হাত বগলে স্থাপন করিলেন, তৎক্ষণাৎ তাহা পূর্বের ন্যায় হইয়া গেল (দ্র. ২৬: ৩৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২৫১)।
(তিন) ফিরআওনের দরবারে মূসা (আ)-এর লাঠি সর্পে পরিণত হইলে ফিরআওন উহাকে যাদু বলিয়া আখ্যায়িত করে এবং যাদুকরদিগকে ডাকিয়া আনিয়া উহার মুকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ প্রদান করে। মূসা (আ) যাদুকরদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিলেন। যথাসময়ে যাদুকরদের যাদু প্রদর্শন শুরু হইল। যাদুকরগণ তাহাদের হাতের অসংখ্য রশিকে সর্পে পরিণত করিয়া প্রদর্শন করিল। সর্বশেষে মূসা (আ) তাঁহার লাঠি মাটিতে ছাড়িয়া দিলেন। উহা অজগর সর্পে পরিণত হইয়া যাদুকরদের সকল যাদু গিলিয়া ফেলিল। যাদুকরগণ মূসা (আ)-এর এই অলৌকিক মু'জিযা দেখিয়া ঈমান আনয়ন করিল (দ্র. ২৬:৪৬-৪৮; ৭: ১১৬; ২০: ৬৮-৬৯; ১০: ৮১; তারীখুল-কামিল, ১খ., পৃ. ১৪০)। কিন্তু ফিরআওন ও তাহার সম্প্রদায় ঈমান আনয়ন করিল না বরং তাহারা পূর্বের তুলনায় আরও বেশি বিরোধিতায় লিপ্ত হইল। এই জাতীয় মু'জিযা ও নিদর্শনাবলীর মধ্যে ছিল দুর্ভিক্ষ, ফল ও ফসলের ক্ষতি এবং উৎপাদন হ্রাস, তুফান, কীট পোকার মহামারী, পঙ্গপাল ও অস্বাভাবিক ব্যাঙের উপদ্রব ইত্যাদি। রক্তবৃষ্টি বর্ষণও ছিল ইহার মধ্যে একটি (দ্র. ৭: ১৩০-১৩৪)।
প্রথমে তাহাদের উপর চরম দুর্ভিক্ষ এবং ফল ও ফসলের উৎপাদন হ্রাসের আযাব আসিল। তাহাদের অনুরোধে মূসা (আ)-এর দু'আয় এই আযাব অপসারিত হইল। কিন্তু পূর্ববৎ তাহারা কুফরীতে লিপ্ত হইলে এইবার তাহাদের উপর নামিয়া আসিল প্রবল তুফান। তাহাদের উপর এত পরিমাণে বৃষ্টিপাত হইল যে, তাহাদের দেশ সম্পূর্ণ ভাসিয়া গেল। এমনকি তাহারা ঘর হইতে বাহির হইতে পারিতেছিল না (কামিল, ১খ., পৃ. ১৪২)।
এই আযাবের পর আসিল উকুনের (نمل) আযাব (৭: ১৩০)। তাহাদের ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার, আসবাবপত্র, এমনকি খাবার-দাবারের মধ্যে পর্যন্ত ইহারা ছড়াইয়া গেল। ফলে তাহাদের জীবন দুর্বিসহ হইয়া উঠিল। অতঃপর মূসা (আ)-এর দু'আয় ইহাও অপসারিত হইল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২৬১)।
ইহার পর তাহাদের উপর আসিল পঙ্গপালের আযাব। পঙ্গপালে তাহাদের শস্যাদি ও ফল-ফলাদি ছাইয়া গেল। ক্ষেত-খামার ধ্বংস করিয়া অবশেষে ইহারা তাহাদের ঘর-বাড়ির পেরেক পর্যন্ত খাইয়া ফেলিল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২৬৬)। নবীর দু'আয় এই আযাব বিদূরিত হওয়ার পর তাহাদের উপর ব্যাঙের আযাব আপতিত হইল। তাহাদের ঘর-বাড়ি, আসবাবপত্র সবকিছুই ব্যাঙে ভরিয়া গেল। ডেক-ডেকচী, হাঁড়ি-পাতিল সবকিছুতেই শুধু ব্যাঙ আর ব্যাঙ, এমনকি পানি পান করিবার জন্য পানপাত্র হাতে লইয়া মুখের নিকটবর্তী করিলে দেখা গেল উহাতে ব্যাঙ রহিয়াছে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২৬৫)।
সবশেষে তাহাদের নিকট আসিল রক্তের মহামারী। তাহাদের নদী ও কূপের সমস্ত পানি রক্তে পরিণত হইয়া গেল। আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল এই যে, এক সময় ফিরআওনের এক লোক (কিবতী) এবং বনি ইসরাঈলের এক লোক একই স্থানে পানি পান করিতে গেল। ইসরাঈলী নির্মল পানি পাইল, কিন্তু কিবতী পাইল রক্তপূর্ণ পানি। নবীর দু'আয় ইহাও অপসারিত হইল (আল-বিদায়া, ১খ., পৃ. ২৬৬)।
ফিরআওন ও তাহার জাতির সম্মুখে উল্লিখিত নিদর্শনাবলীর সবগুলি বাস্তবায়িত হওয়ার পরও তাহারা ঈমানের পথে ফিরিয়া আসিল না, বরং পূর্বের মতই সত্যের বিরোধিতায় লিপ্ত থাকিল। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা (আ)-কে তাঁহার জাতি বানু ইসরাঈলকে লইয়া হিজরত করিবার নির্দেশ প্রদান করিলেন। নবী মূসা (আ)-এর এই হিজরতের পথে এবং হিজরত পরবর্তী সময়ে বানু ইসরাঈলের সম্মুখে আরও বেশ কিছু মু'জিযা প্রকাশিত হয়। উহার উদ্দেশ্য ছিল বানু ইসরাঈলের প্রতি মহান আল্লাহর রহমতে তাহাদের মনোবল ও ঈমানকে আরও সুদৃঢ় এবং মজবুত করা। এই জাতীয় মু'জিযার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করা হইল।
যখন মূসা (আ) বানু ইসরাঈলকে লইয়া মিসর হইতে রওয়ানা হইলেন তখন ফিরআওন ও তাহার দলবল তাহাদের পশ্চাদধাবন করিল। মূসা (আ) সম্মুখে অগ্রসর হইয়া লোহিত সাগরের তীর পর্যন্ত পৌছিয়া গেলেন। সংগে বানু ইসরাঈলের বিশাল কাফেলা। তিনি তাঁহার হাতের লাঠি দ্বারা পানিতে আঘাত করিলেই সমুদ্র বক্ষে প্রশস্ত রাস্তা হইয়া গেল। তাঁহারা নির্বিঘ্নে সমুদ্র পার হইয়া গেলেন। তাঁহাদের দেখাদেখি ফিরআওন ও তাহার দলের লোকেরাও তাঁহাদের অনুসরণ করিল। যখন তাহারা সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছিল আল্লাহর কুদরতে রাস্তা তখন পানিতে একাকার হইয়া গেল। ফলে ফিরআওন তাহার বিশাল দলবলসহ সমুদ্রের মধ্যে ডুবিয়া মরিল (দ্র. ৪৪: ২৩-২৪)।
লোহিত সাগর পার হইয়া মূসা (আ) উম্মতের বিশাল বাহিনীসহ তীহ উপত্যকায় আসিয়া পৌছিলেন। এখানে পানির তীব্র সংকট দেখা দিল। আল্লাহ্র নির্দেশে মূসা (আ) তাঁহার হাতের লাঠি দ্বারা একটি পাথরে আঘাত করিলেন। তৎক্ষণাৎ পাথর হইতে বারটি পানির ধারা জারি হইয়া গেল (দ্র. ২ঃ ৬০; ৭: ১৬০)।
তীহ্ উপত্যকায় তাহাদের খাবারের চাহিদা মিটানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা আসমান হইতে মান্না ও সালওয়া নামক খাবার প্রেরণ করেন। 'মান্না' ছিল এক জাতীয় সুস্বাদু খাবার এবং সালওয়া ছিল চড়ুই পাখি সদৃশ্য এক জাতীয় গোশতের খাবার। ইহা প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তাহাদের নিকট প্রেরিত হইত (দ্র. ২ঃ ৫৭; ৭: ১৬০; ২০ঃ ৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২৮২)।
তাই প্রান্তরে বান্ ইসরাঈলকে উত্তপ্ত রৌদ্র হইতে ছায়া প্রদানের জন্য মূসা (আ)-এর দু'আয় আল্লাহ তা'আলা মেঘমালা প্রেরণ করেন। উহা তাহাদের মাথার উপর ভাসমান থাকিয়া তাহাদেরকে ছায়া দান করিত (দ্র. ২: ৫৭)।
মূসা (আ)-এর উপর পবিত্র আসমানী কিতাব "তাওরাত” নাযিল হইলে তিনি তাহা লইয়া জাতির নিকট আসিলেন। জাতি বলিল, আমরা চাক্ষুষ আল্লাহকে না দেখিয়া এবং 'এই তাওরাত আমার কিতাব, তোমরা ইহার উপর আমল কর' এই কথা না শুনিয়া তোমাকে বিশ্বাস করিব না। শেষ পর্যন্ত মূসা (আ) আল্লাহ্র নির্দেশ মত তাহাদের নেতৃস্থানীয় সত্তরজনকে সঙ্গে লইয়া তূর পর্বতে গমন করিলেন। সেখানে তাহারা আল্লাহ্ তাজাল্লী দেখিতে পাইল এবং সকলেই আল্লাহ্র বাণী শুনিতে পাইল, এমনকি তাহারা সকলে সেজদায় পড়িয়া গেল। কিন্তু পরক্ষণেই তাহারা বলিল, ইহা যে আল্লাহরই তাজাল্লী এবং তাঁহারই বাণী 'ইহার প্রমাণ কি'? তাহাদের উক্তিতে আল্লাহ তা'আলা ভীষণ নারায হইলেন এবং বিদ্যুৎ চমক, বজ্র-আওয়াজ ও ভূমিকম্প দ্বারা তাহাদের সকলকে ধ্বংস করিয়া দিলেন (দ্র. ২ঃ ৫৫)। এই দৃশ্য দেখিয়া হযরত মূসা (আ) কাঁদিয়া ফেলিলেন, তিনি তাহাদের পুনর্জীবনের জন্য দু'আ করিলেন। ফলে তাহারা সকলেই পুনর্জীবিত হইয়া উঠিল এবং বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকাইয়া রহিল (দ্র. ৭: ১৫৫-১৫৬; তাবারী, তারীখ, ১খ., পৃ. ৪২৯)।
বানু ইসরাঈলীগণ তাওরাতের বিধান মানিয়া চলা কষ্টসাধ্য মনে করিল এবং উহার উপর আমল করিতে অস্বীকার করিয়া বসিল। তখন আল্লাহ তা'আলা একটি পর্বত তাহাদের মাথার উপর তুলিয়া ধরিলেন, যেন পর্বতটি এখনই তাহাদের উপর ভাঙ্গিয়া পড়িবে! ইহা দেখিয়া তাহার তাওরাত মানিয়া চলিভে স্বীকার করিল (দ্র. ২:৬৩, ৭: ১৭১; আল-কামিল, ১খ.,