📄 হযরত দাউদ (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ইয়াকূব (আ)-এর অধস্তন নবম পুরুষের বংশে তাঁহার জন্ম। তিনি বানু ইসরাঈলী নবীদের অন্যতম। তাঁহার জাতির বসবাস ছিল লোহিত সাগরের তীরে।
📄 বায়তুল মাকদিস নির্মাণ এবং তাঁহার মৃত্যুর বিস্ময়কর মু'জিযা
হযরত সুলায়মান (আ) আল্লাহ্ হুকুমে জিন্ন জাতিকে বশীভূত করিয়া বায়তুল মাকদিস মসজিদের নির্মাণকার্য আরম্ভ করেন। জিন্নরা দিনরাত অনবরত কাজ করিতে লাগিল। মসজিদের নির্মাণ কাজ কিছু বাকী থাকিতে তিনি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে অবগত হইলেন যে, তাঁহার জীবনকাল শেষ। কিন্তু তাঁহার মৃত্যু হইয়া গেলে জিন্নেরা অবশিষ্ট কাজ ছাড়িয়া দিবে। সুলায়মান (আ) আল্লাহ্র নির্দেশে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করত তাঁহার মেহরাবে প্রবেশ করিলেন। মেহবারটি ছিল স্বচ্ছ কাঁচ নির্মিত। বাহির হইতে উহার অভ্যন্তর ভাগ দেখা যাইত। তিনি উহার ভিতরে ইবাদতের উদ্দেশ্যে লাঠিতে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন। যথাসময়ে তাঁহার রূহ কবয হইয়া গেল। আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহার দেহ মৃত্যুর পরও লাঠির উপর ঐভাবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। অবাধ্য জিন্নেরা "তিনি তাকাইয়া আছেন" ভাবিয়া তাঁহার ভয়ে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করিতে লাগিল। দীর্ঘ সময় পর তাহাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত হইল। অপরদিকে উইপোকা লাঠির অভ্যন্তর ভাগ খাইয়া ফেলিল। ফলে লাঠি ভাঙ্গিয়া পড়িল এবং নবীর লাশ মাটিতে পড়িয়া গেল। তখন জিন্নেরা বুঝিতে পারিল যে, তাঁহাঁর মৃত্যু হইয়াছে (দ্র. ৩৪:১৪)।
📄 হযরত যাকারিয়্যা (আ)-এর মু'জিযা
হযরত যাকারিয়া (আ) বানু ইসরাঈলী নবীদের একজন। তিনি বায়তুল মাকদিস এলাকায় নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বায়তুল মাকদিসের ইমাম এবং তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। হযরত মারয়াম (আ) তাঁহার তত্ত্বাবধানে বায়তুল মাকদিসের একটি প্রকোষ্ঠে লালিত-পালিত হন। তিনি তাঁহার দেখাশুনা করিতেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান এবং তাঁহার স্ত্রীও ছিল বন্ধ্যা। তাঁহারা উভয়ে তখন চরম বার্ধক্যে পৌছিয়া গিয়াছিলেন। একদা যাকারিয়্যা (আ) মারয়ামের প্রকোষ্ঠে যাইয়া দেখিলেন, তাঁহার সামানে অ-মৌসুমী ফল-মূল বিদ্যমান। যাকারিয়্যা (আ) উহা কোথা হইতে আসিয়াছে জানিতে চাহিলেন। মারয়াম বলিলেন, ইহা আল্লাহ্ পক্ষ হইতে আসিয়াছে। হযরত যাকারিয়্যা (আ) মনে মনে চিন্তা করিলেন, যেই আল্লাহ্র অ-মৌসুমে ফল দিতে সক্ষম তিনি তো আমাদের এই চরম বার্ধক্যে এবং আমার স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব দূর করিয়া সন্তান দিতে পারেন। তিনি দু'আ করিলেন এবং দু'আ কবুল হইল। তিনি ইয়াহইয়া নামক পুত্র সন্তান লাভে ধন্য হইলেন (দ্র. ৩ঃ ৩৭-৪১; ১৯:১-১১)।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ঈসা (আ) মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শনস্বরূপ মারয়ামের গর্ভে পিতাবিহীন জন্মলাভ করেন। এইভাবে তাঁহার জন্মলাভ একটি অলৌকিক বিষয় এবং মু'জিযা। ইহা ছাড়াও আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে একাধিক মু'জিযা দান করিয়াছিলেন। সূরা বাকারায় আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: وَأَتَيْنَا عِيسَى بْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَت "আমি ঈসা ইবন মারয়ামকে কয়েকটি মু'জিযা দান করিয়াছি" (২ঃ ৮৭)। সংক্ষেপে তাহার মু'জিযাগুলির বিবরণ নিম্নে তুলিয়া ধরা হইল:
(এক) দুধ পানকালীন কথা বলা: হযরত মারয়াম যখন শিশু ঈসাকে লইয়া তাঁহার বাড়িতে ফিরিয়া আসিলেন তখন সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিতে শুরু করিল। শিশু ঈসা তখন মারয়ামের কোলে দুধ পান করিতেছিলেন। তিনি মানুষের ভর্ৎসনা শুনিয়া দুধপান ছাড়িয়া দিলেন এবং মানুষের দিকে মুখ ফিরাইয়া শাহাদাত অঙ্গুলী খাড়া করিয়া বলিলেন:
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللهِ اثْنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا. وَجَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَ أَوْصُنِي بِالصَّلوة والزَّكوة مَا دُمْتُ حَيًّا. وَبَرًا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا. وَالسَّلَامُ عَلَى يَوْمَ ولدتُ وَيَوْمَ أَمُوْتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيًّا.
“সে (ঈসা) বলিল, আমি তো আল্লাহ্ বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন। আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে। আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করিয়াছেন এবং তিনি আমাকে করেন নাই উদ্ধত ও হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হইব” (১৯:৩০-৩৩)।
এতদ্ব্যতীত মৃতকে জীবিত করা, জন্মান্ধকে সুস্থ করা, শ্বেত-কুষ্ঠ রোগীকে আরোগ্য করা এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলিয়া দেওয়া- এই চারটি মু'জিযার কথা পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে একসংগে বিবৃত হইয়াছে। আয়াতটি এই:
أَنِّي قَدْ جِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُمْ مِّنَ الطَّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللهِ وَأَبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ وَأُحْيِ الْمَوْتَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَأْكُلُوْنَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.
"নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ হইতে নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখীর আকৃতি তৈরী করি। অতঃপর উহাতে যখন ফুৎকার করি আর উহা উড়ন্ত পাখীতে পরিণত হইয়া যায়। আল্লাহর হুকুমে আমি সুস্থ করিয়া থাকি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত-কুষ্ঠ রোগীকে, আর আমি জীবিত করি মৃতকে আল্লাহ্র হুকুমে। আর আমি তোমাদেরকে বলিয়া দেই যাহা তোমরা খাইয়া আস এবং যাহা তোমারা ঘরে রাখিয়া আস। ইহাতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রহিয়াছে যদি তোমরা মুমিন হও” (৩: ৪৯; ৫:১১০)।
(দুই) ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ)-কে হত্যা করিতে এবং শূলীতে চড়াইতে চাহিয়াছিল এবং ইহা বাস্তবায়নের জন্য যাবতীয় কার্যক্রমও সম্পন্ন করিয়াছিল। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতে তাঁহাকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলিয়া নেন এবং কিয়ামতের পূর্বে তিনি পুনরায় দুনিয়াতে আগমন করিবেন এবং তাঁহার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটিবে। তাঁহার এই জীবিতাবস্থায় আসমানে উত্থান নিঃসন্দেহে একটি অনন্য মু'জিযা (দ্র. ৩:৫৫)।
(তিন) আসমান হইতে খাদ্য নাযিল হওয়া: হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারী ও তাঁহার সহচর হাওয়ারীগণ একবার এই মর্মে আবেদন করিলেন যে, হযরত! আল্লাহ তা'আলা তো সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। সেই হিসাবে তিনি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাবার পাঠাইতেও নিঃসন্দেহে সক্ষম। সুতরাং তিনি যদি আমাদের জন্য আসমান হইতে খাবারের ব্যবস্থা করিতেন, তাহা হইলে তো আমরা সব সময় তাঁহার যিকিরে মশগুল থাকিতে পারিতাম। আমাদেরকে খাবার সংগ্রহের জন্য সময় ব্যয় করিতে হইত না। মেহেরবানী করিয়া দু'আ করুন। হযরত ঈসা (আ) দু'আ করিলেন। আল্লাহ তা'আলা দু'আ কবুল করিলেন। তাহাদের নিকট আসমান হইতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা নাযিল হইল (৫: ১১২-১১৫; কাসাসুল-কুরআন, ৪খ., পৃ. ৮৪-৮৫)।