📄 হযরত হিযকীল (আ)-এর মু'জিযা
হযরত হিযকীল (আ) বানু ইসরাঈলী নবীদের একজন। তিনি 'জুদাহ' নামক এলাকায় প্রেরিত হন। তাঁহার নবুওয়াতকাল হযরত যূশা' ইবন নূন-এর পরবর্তী সময় (কাসাসুল- কুরআন, ২খ., পৃ. ২০)। পবিত্র কুরআনে তাহার নাম আলোচিত হয় নাই। তবে সূরা বাকারা ২৪৩ নং আয়াতে তাঁহার ও তাঁহার জাতির কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। বস্তুত এই ঘটনাটিই তাঁহার জীবনের অন্যতম অলৌকিক ঘটনা ও মু'জিযা।
ঘটনার বিবরণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জাতিকে জিহাদের নির্দেশ দেন। জাতি মৃত্যুর ভয়ে জিহাদে যাইতে অস্বীকার করে এবং পলায়ন করে। আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে মৃত্যুদান করেন, যাহাতে সকলেই এই কথা বুঝিতে পারে যে, কোন কৌশলই মৃত্যু হইতে রক্ষা করিতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নবী হিযকীলের দু'আয় সকলকে পুনরায় জীবিত করে (মা'আলিমুত-তানযীল, ১খ., পৃ. ২২৩)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, হে হিযকীল! আমি তাহাদেরকে কীভাবে জীবিত করিব তাহা কি তুমি দেখিতে চাও? তিনি বলিলেন, হাঁ। আল্লাহ পাক বলিলেন, তুমি এই বলিয়া উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ দাও, "হে পুরাতন হাড়সমূহ! মহান আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ নিজ স্থানে একত্রিত হইতে আদেশ করিতেছেন।" যোষণার পরপর বিক্ষিপ্ত হাড়গুলি উড়িয়া নিজ নিজ স্থানে আসিয়া সংযুক্ত হইল এবং পরিণত হইল পূর্ণ মানব কংকালে। আল্লাহর নির্দেশে নবী বলিলেন, হে মানব কংকাল! তোমারা গোশতে সজ্জিত হও। সবগুলি দেহ গোশতে সজ্জিত হইল। অতঃপর দেহগুলি চামড়ায় সজ্জিত হইল, এমনকি আল্লাহ্র কুদরতে মানবদেহগুলি পরিধেয় বস্ত্রেও সজ্জিত হইয়া গেল। ইহার পর নবী হিযকীল বলিলেন, হে দেহসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে দাঁড়াইবার আদেশ করিতেছেন। ইহা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে সকলে দাঁড়াইয়া গেল (২: ২৪৩, তাবারী, তাফসীর, ১খ., পৃ. ৩২৩)।
তাহারা জীবিত হওয়ার পর তাহাদের পোশাক ও চেহারা হরিদ্রা বর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এমনকি তাহারা নূতন কোন পোশাক পরিধান করিলে তাহাও হরিদ্রা বর্ণ হইয়া যাইত। এই ধারা তাহাদের পরবর্তী বংশের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল (হাশিয়াতুস-সাবী, ১খ., পৃ. ১০৭)।
📄 হযরত 'উযায়র (আ)-এর মু'জিযা
হযরত উযায়র (আ) হারূন ইবন ইমরান (আ)-এর বংশধর এবং ইসরাঈলী বংশের নবীদের অন্যতম। ইয়াহুদীরা তাঁহাকে আল্লাহ্র পুত্র বলিয়া মনে করিত (আল-কুরআন ৯ : ৩০; আল-বিদায়া, ২খ., পৃ. ৪০)।
তাঁহার জীবনে অলৌকিক ঘটনা ছিল এই যে, একদা তিনি গাধায় চড়িয়া একটি বিধ্বস্ত জনপদ অতিক্রম করিতেছিলেন। সেখানে কেহই জীবিত ছিল না। তিনি বিস্ময়ের সহিত বলিলেন, এমন বিধ্বস্ত উজাড় জনপদ আবার কিভাবে আবাদ হইবে? আল্লাহ তা'আলা তৎক্ষণাৎ তাঁহার মৃত্যু দিলেন এবং পূর্ণ এক শত বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁহাকে পুনর্জীবিত করিলেন। তিনি জীবিত হইয়া দেখিলেন, তাঁহার খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় অবিকৃত রহিয়াছে। অপরদিকে গাধাটি মরিয়া গিয়াছে এবং প্রায় নিশ্চিহ্ন হইয়া পড়িয়াছে। তিনি দেখিলেন, মৃত গাধাটি তাঁহার সামনে পুনরায় জীবিত হইয়া উঠিল। তিনি আরও দেখিলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত উজাড় জনপদটি পূর্বাপেক্ষা সুন্দর ও সুশোভিতরূপে আবাদ হইয়া রহিয়াছে। এই সবই ছিল অসাধারণ, অলৌকিক ও মু'জিযাস্বরূপ (দ্র. ২: ২৫৯)।
হযরত উযায়র (আ) দীর্ঘ এক শত বৎসর পর যখন নিজ এলাকায় ফিরিয়া আসিলেন তখন জনপদবাসীর কেহই তাঁহাকে চিনিতে পারিল না। সকলেই বলিল, সে তো এক শত বৎসর পূর্বে নিখোঁজ হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার বাড়ির সম্মুখে এক বৃদ্ধার সাক্ষাৎ পাইলেন। সে ছিল অন্ধ। নবী, তাঁহাকে নিজের পরিচয় দিলেন। বৃদ্ধা অস্বীকার করিল। অবশেষে বৃদ্ধা বলিল "তুমি সত্যই উযায়র হইয়া থাকিলে আমার জন্য দু'আ কর যেন আমার অন্ধত্ব দূর হইয়া যায়"। নবী দু'আ করিলেন। তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধা দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়া পাইল। বৃদ্ধা পঙ্গুও ছিল। উযায়র (আ)-এর দু'আয় তিনি সুস্থ হইয়া উঠিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৪০)।
তাঁহার আরও একটি মু'জিযা ছিল এই যে, তিনি এক শত বৎসর পর জনপদে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন যে, আসমানী কিতাব তাওরাত নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে এবং মানুষ তাহা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছে। তখন তিনি আল্লাহ্র কুদরতে সম্পূর্ণ তাওরাত আদ্যন্ত মানুষের সম্মুখে পড়িয়া শোনান এবং পুনরায় তাওরাত সংকলন করেন। তাঁহার এই অলৌকিক কর্ম দেখিয়া জাতির কতিপয় লোক বিভ্রান্ত হইল এবং তাঁহাকে আল্লাহ্ পুত্র বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া বসিল (দ্র. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৪৪)।
একটি ইসরাঈলী সূত্রে বর্ণিত আছে যে, হযরত উযায়র (আ)-এর সময়ে তৎকালীন জালিম বাদশাহ 'বুস্তনসর' এই মর্মে নির্দেশ জারি করিল যে, সকলকে তাঁহার দেবতার পূজা করিতে হইবে। অন্যথা অস্বীকারকারীকে অগ্নিকাণ্ডে নিক্ষেপ করা হইবে। নবী উযায়র এবং তাঁহার সঙ্গীগণ রাজার এই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করিলেন। ইহাতে রাজা ক্ষুব্ধ হইয়া নবীকে তাঁহার দুইজন সঙ্গীসহ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল। কিন্তু আল্লাহ্ কুদরতে অগ্নি তাঁহাদেরকে স্পর্শও করিল না। তাঁহারা সকলেই অক্ষত রহিলেন। বুস্তনসর এই দৃশ্য দেখিয়া নিজের ভুল বুঝিতে পারিল এবং ভবিষ্যতে নবীর ধর্মমতকে সংরক্ষণের ঘোষণা প্রদান করিল (দানিয়াল, ৩য় অধ্যায়, পৃ. ২৮)।
📄 হারূন (আ)-এর মরদেহের উপস্থিতি
একদা হযরত মূসা ও হারুন (আ) হাওর পর্বতে সফরে গেলেন। সেখানে অবস্থানকালে হযরত হারুন (আ) ইন্তিকাল করেন। হযরত মূসা (আ) সেইখানেই ভাই হারূনকে কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করেন। পরে যখন তিনি বানু ইসরাঈলের নিকট ফিরিয়া আসিলেন' তখন তাহারা তাঁহাকে এই মর্মে অপবাদ দিল যে, তিনি আপন ভ্রাতা হারুনকে হত্যা করিয়াছেন। এই জঘন্য অপবাদ শুনিয়া মূসা (আ) অত্যন্ত ব্যথিত হইলেন এবং আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় চাহিলেন। আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-এর নিষ্কলুষতা প্রমাণের জন্য জনসম্মুখে হযরত হারুন (আ)-এর মরদেহ উপস্থিত করিলেন। সকলেই তাঁহার লাশ দেখিয়া বুঝিতে পারিল যে, তাঁহার স্বাভাবিক মৃত্যু হইয়াছে। তাঁহার শরীরে হত্যার কোনই আলামত ছিল না (কাসাসুল-কুরআন, ১খ., পৃ. ৫৩৫)।
📄 হযরত খিযির (আ)-এর সহিত মূসা (আ)-এর ভ্রমণ
এই ভ্রমণটি ছিল অনেক অলৌকিক কর্মকাণ্ড দ্বারা সমৃদ্ধ। যেমন তাঁহার থলির মধ্যকার মাছ যেখানে হারাইয়া যাইবে, সেখানে তাঁহার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির অবস্থান নির্ণিত হওয়া, মৃত মাছের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হওয়া, মাছটি যেই স্থান দিয়া সমুদ্রে প্রবেশ করিল সেখানকার পানির প্রবাহ বন্ধ হইয়া সুড়ংয়ের ন্যায় পথ হইয়া যাওয়া ইত্যাদি (দ্র. ১৭ : ৬০-৮৩; বুখারী, কিতাবুত-তাফসীর)।