📄 হযরত যুল-কিফ্ল (আ)-এর মু'জিযা
হযরত যুল-কিফল (আ) সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তিনি নবী অথবা নবীর খলীফা ছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৯খ., পৃ. ৮২)। তাঁহার মু'জিযার বর্ণনায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রহিয়াছে। উহা এই যে, তিনি তাঁহার সমসাময়িক কাফির বাদশাহকে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করিলে সে বলিল, ইহা গ্রহণ করিলে আমার কী লাভ হইবে? নবী বলিলেন, ইহাতে আপনি জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাইবেন। বাদশাহ বলিল, আমার জন্য এই জান্নাতের যামিন কে হইবে ? নবী বলিলেন, আমি হইব। বাদশাহ ঈমান আনয়ন করিলেন। কিছু দিন পরেই বাদশাহর মৃত্যু হইল। পরদিন লোকেরা ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিল, বাদশাহর একটি হাত কবরের বাহিরে বাহির হইয়া আছে এবং উহার মধ্যে একটি সবুজ বর্ণের কাগজে লিখিত রহিয়াছে: “আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইয়াছেন এবং অমুক ব্যক্তি তাহার যামানত পূর্ণ করিয়া দিয়াছেন”। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া হযরত যুল-কিফল (আ)-এর জাতির সকলেই তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করিল (কুরতুবী, তাফসীর, ১১খ., পৃ. ৩২৭)।
📄 হযরত ইলয়াস (আ)-এর মু'জিযা
বনূ ইসরাঈলের অন্যতম নবী হযরত ইলয়াস (আ)। বা'লাবাক্ক (بعلبك) শহরে প্রেরিত হন। তাঁহার সময়কালে বানু ইসরাঈলী সমাজে রাজা ‘উজব'-এর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজা ও তাহার প্রজাবৃন্দ বা'ল নামক এক মূর্তির পূজা করিত। নবী তাহাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। ইহাতে রাজা ভীষণ ক্ষুব্ধ হইল এবং নবীকে হত্যা করিবার জন্য সংকল্প করিল। নবী ইলয়াস (আ) একটি পর্বত গুহায় আশ্রয় লইলেন। সত্য অস্বীকারের পরিণতিতে জাতির উপর নামিয়া আসিল চরম দুর্ভিক্ষ। হযরত ইলয়াস (আ) রাজা উজবের সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিলেন, “তোমরা মহান আল্লাহর নাফরমানী হইতে বিরত হইলেই তোমাদের দুর্ভিক্ষ দূর হইতে পারে”। তিনি আরও বলিলেন, “আমার আনীত ধর্মই যে সত্য ধর্ম উহা প্রমাণ করিবার জন্য আস আমরা কুরবানী পেশ করি। আমি আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করিব। তোমরা তোমাদের দেবতার নামে কুরবানী পেশ করিবে। যাহার কুরবানী আসমানী অগ্নি আসিয়া ভস্মীভূত করিবে তাহার ধর্ম সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইবে"।
রাজা এই প্রস্তাব মানিয়া লইয়া দেবতার নামে কুরবানী পেশ করিল। হযরত ইলয়াস (আ) মহান আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করিলেন। নবীর কুরবানী কবুল হইল। ইহা দেখিয়া বা'ল দেবতার অনুসারীরা সিজদায় পড়িল এবং নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন করিল (নূরুল কুরআন, ২৩খ., পৃ. ১৪৬)।
একবার রাজা উজব কতিপয় ঘাতককে এই বলিয়া প্রেরণ করিল, যেইভাবেই হউক প্রতারণা করিয়া ইলয়াসকে হত্যা করিতে হইবে। হযরত ইলয়াস (আ) একটি পর্বত গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন। ঘাতকরা আসিয়া নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করিল এবং নবীকে বাহির হইয়া আসিতে আহ্বান জানাইল। নবী বলিলেন, "হে আল্লাহ! তাহারা মিথ্যাবাদী হইলে তাহাদেরকে আসমানী অগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত কর"। তৎক্ষণাত আসমানী অগ্নি আসিয়া তাহাদেরকে ভস্মীভূত করিয়া দিল। এইভাবে রাজা উজব দুই দুইবার ঘাতক দল প্রেরণ করিল এবং প্রত্যেক বারই তাহারা মহান আল্লাহর গযবে অলৌকিকভাবে ধ্বংস হইল (তাফসীরে মাযহারী, ৮খ., পৃ. ১৪৯)।
একবার হযরত ইলয়াস (আ) হযরত ইউনুস (আ)-এর বাড়িতে অবস্থান করিতেছিলেন। ইউনুস (আ) ছিলেন তখন ছোট শিশু। কিছু দিন পর ইলয়াস (আ) চলিয়া গেলে শিশু ইউনুস ইন্তিকাল করেন। তাহার মাতা ইলয়াস (আ)-এর খিদমতে আসিয়া আরয করিলেন, "হে আল্লাহর নবী! আপনি চলিয়া আসিবার পর আমার সন্তান ইউনুস ইন্তিকাল করিয়াছে। দয়া করিয়া আপনি তাহার পুনর্জীবিত হওয়ার জন্য দু'আ করুন"। নবী দু'আ করিলেন। আল্লাহ তা'আলা ইউনুস (আ)-কে চৌদ্দ দিন পর পুনর্জীবিত করিয়া দিলেন।
একবার তিনি এক বৃদ্ধার বাড়িতে মেহমান হইলেন। বৃদ্ধার নিকট একটি পাত্রে সামান্য আটা এবং অপর পাত্রে সামান্য যয়তূনের তৈল ছিল। তিনি দু'আ করিলেন, ফলে পাত্র দুইটি আটা ও যয়তুন দ্বারা ভরিয়া গেল।
এক সময় সত্য অস্বীকারের অপরাধে তাঁহার জাতির উপর অনাবৃষ্টির আযাব আসিল। তিনি জাতিকে বলিলেন, তোমরা শিরক বর্জন কর, তোমাদের আযাব বিদূরিত হইবে। জাতি উহাই মানিয়া লইল। তৎক্ষণাৎ আকাশে মেঘ দেখা দিল এবং উহা হইতে প্রবল বর্ষণ হইল (সীরাত বিশ্বকোষ, ইফাবা, ২খ., পৃ. ২৫৮)।
📄 হযরত আল-ইয়াসা' (আ)-এর মু'জিযা
আল-ইয়াসা' (আ) হযরত ইলয়াস (আ)-এর চাচাতো ভাই এবং বনী ইসরাঈলের নবী। হযরত ইলয়াস (আ)-এর পর তিনি তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি সর্বদা হযরত ইলয়াস (আ)-এর সহিত চলাফেরা করিতেন। একবার বনী ইসরাঈলের মধ্যে চরম দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি দেখা দিলে হযরত ইলয়াস (আ) আল-য়াসাকে সঙ্গে লইয়া মহান আল্লাহর দরবারে দু'আ করেন। ফলে সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত হয়। জাতি চাষাবাদের জন্য বীজ না থাকায় অভিযোগ করিল। মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইলয়াস বলিলেন, তোমরা জমিতে লবণ ছিটাইয়া দাও। তাহারা লবণ ছিটাইয়া দিল। ফলে জমিতে ছোলা উৎপন্ন হইল। তিনি আরও বলিলেন, তোমরা জমিতে বালু ছিটাইয়া দাও। তাহারা বালু ছিটাইয়া দিল। ফলে জমিতে চারাগাছ উদ্গত হইল (ছা'লাবী, কাসাসুল-আম্বিয়া, পৃ. ২৭৮)।
হযরত আল-ইয়াসা' (আ)-এর মু'জিযা ছিল হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযার অনুরূপ। তিনি পানির উপর দিয়া হাঁটিয়া যাইতেন, মৃতকে জীবিত করিতেন, জন্মান্ধকে চক্ষুষ্মান করিতেন, কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য করিতেন (সায়্যিদ হুসায়ন, আল-মীযান ফী তাফসীরিল কুরআন, পৃ. ২৭৫)।
একদা হযরত ইলয়াস (আ) হযরত আল-ইয়াসা' (আ)-কে তাঁহার চাদর দান করিয়াছিলেন। আল-ইয়াসা' (আ) উক্ত চাদর দ্বারা জর্ডান নদীতে আঘাত করিলেন। ফলে পানি দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া রাস্তা হইয়া গেল। তিনি নদী পার হইয়া গেলেন (দা'ইরাতুল মা'আরিফ, ৪খ., পৃ. ৩৩৫)।
আরীহা নগরীর পানি ছিল ব্যবহারের অনুপযোগী। তিনি উহাতে লবণ নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উহার পানি সুমিষ্ট, নির্মল ও সুপেয় পানিতে পরিণত হইল (প্রগুক্ত)। একদা কতিপয় দুষ্ট যুবক তাঁহাকে বিদ্রূপ করিলে দুইটি বন্য ভাল্লুক আসিয়া যুবকদিগকে হত্যা করিল (প্রাগুক্ত)।
📄 হযরত হিযকীল (আ)-এর মু'জিযা
হযরত হিযকীল (আ) বানু ইসরাঈলী নবীদের একজন। তিনি 'জুদাহ' নামক এলাকায় প্রেরিত হন। তাঁহার নবুওয়াতকাল হযরত যূশা' ইবন নূন-এর পরবর্তী সময় (কাসাসুল- কুরআন, ২খ., পৃ. ২০)। পবিত্র কুরআনে তাহার নাম আলোচিত হয় নাই। তবে সূরা বাকারা ২৪৩ নং আয়াতে তাঁহার ও তাঁহার জাতির কাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। বস্তুত এই ঘটনাটিই তাঁহার জীবনের অন্যতম অলৌকিক ঘটনা ও মু'জিযা।
ঘটনার বিবরণ এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁহার জাতিকে জিহাদের নির্দেশ দেন। জাতি মৃত্যুর ভয়ে জিহাদে যাইতে অস্বীকার করে এবং পলায়ন করে। আল্লাহ তা'আলা তাহাদেরকে মৃত্যুদান করেন, যাহাতে সকলেই এই কথা বুঝিতে পারে যে, কোন কৌশলই মৃত্যু হইতে রক্ষা করিতে পারে না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা নবী হিযকীলের দু'আয় সকলকে পুনরায় জীবিত করে (মা'আলিমুত-তানযীল, ১খ., পৃ. ২২৩)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, হে হিযকীল! আমি তাহাদেরকে কীভাবে জীবিত করিব তাহা কি তুমি দেখিতে চাও? তিনি বলিলেন, হাঁ। আল্লাহ পাক বলিলেন, তুমি এই বলিয়া উচ্চ কণ্ঠে আওয়াজ দাও, "হে পুরাতন হাড়সমূহ! মহান আল্লাহ তোমাদেরকে নিজ নিজ স্থানে একত্রিত হইতে আদেশ করিতেছেন।" যোষণার পরপর বিক্ষিপ্ত হাড়গুলি উড়িয়া নিজ নিজ স্থানে আসিয়া সংযুক্ত হইল এবং পরিণত হইল পূর্ণ মানব কংকালে। আল্লাহর নির্দেশে নবী বলিলেন, হে মানব কংকাল! তোমারা গোশতে সজ্জিত হও। সবগুলি দেহ গোশতে সজ্জিত হইল। অতঃপর দেহগুলি চামড়ায় সজ্জিত হইল, এমনকি আল্লাহ্র কুদরতে মানবদেহগুলি পরিধেয় বস্ত্রেও সজ্জিত হইয়া গেল। ইহার পর নবী হিযকীল বলিলেন, হে দেহসমূহ! আল্লাহ তোমাদেরকে দাঁড়াইবার আদেশ করিতেছেন। ইহা উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে সকলে দাঁড়াইয়া গেল (২: ২৪৩, তাবারী, তাফসীর, ১খ., পৃ. ৩২৩)।
তাহারা জীবিত হওয়ার পর তাহাদের পোশাক ও চেহারা হরিদ্রা বর্ণ হইয়া গিয়াছিল। এমনকি তাহারা নূতন কোন পোশাক পরিধান করিলে তাহাও হরিদ্রা বর্ণ হইয়া যাইত। এই ধারা তাহাদের পরবর্তী বংশের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল (হাশিয়াতুস-সাবী, ১খ., পৃ. ১০৭)।