📄 হযরত আয়্যব (আ)-এর মু'জিযা
হযরত আয়্যব (আ) ছিলেন বনী ইসরাঈলের নবী এবং হযরত লূত (আ)-এর দৌহিত্র। তিনি "আদূম” জাতির নিকট প্রেরিত হন (দ্র. রূহুল-মা'আনী, ১২খ., পৃ. ২০৫)।
তাঁহার জীবনে সংঘটিত মু'জিযাসমূহের মধ্যে ছিল অলৌকিকভাবে তাঁহার রোগ মুক্তি এবং সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ পুন ফিরিয়া পাওয়া। তিনি এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। অপরদিকে তাঁহার সকল ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততিও হাতছাড়া হইয়া যায়। তিনি লোকালয়ের বাহিরে এক বিরাণ ভূমিতে দীর্ঘ কয়েক বৎসর পড়িয়া থাকেন। ইহা ছিল তাঁহার প্রতি আল্লাহর পক্ষ হইতে ধৈর্যের পরীক্ষা। অবশেষে তিনি এই সবরের পরীক্ষায় সাফল্যের সহিত উত্তীর্ণ হন (দ্র. ৩৮ : ৪১, ২১৪ ৪৪)। তাঁহার দু'আ আল্লাহ কবুল করিলেন, তাঁহাকে সুস্থতা দান করিলেন এবং তাঁহার সকল ধন-সম্পদ ফিরাইয়া দিলেন (২১:৮৪)। আল্লাহ তা'আলা তাহাকে বলিলেন, হে আয়্যুব! তুমি তোমার পা দ্বারা যমীনে আঘাত কর। এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়' (৩৮ : ৪১-৪২)। তিনি পা দ্বারা আঘাত করিলেন। তৎক্ষণাৎ একটি সুমিষ্ট পানির ফোয়ারা জারি হইল। তিনি এ ফোয়ারার পানি দ্বারা গোসল করার সাথে সাথে পূর্ণ সুস্থ হইয়া উঠিলেন। এমনকি সুঠাম সুন্দর যুবকে পরিণত হইয়া গেলেন (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৪২০; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, ২খ., পৃ. ১৯০)।
হযরত আয়্যুব (আ)-এর নিকট দৈনন্দিন আহারের জন্য সামান্য পরিমাণ গম ও যব থাকিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করিয়া দেওয়ার জন্য গমগুলিকে স্বর্ণ এবং যবগুলিকে রৌপ্যে রূপান্তরিত করিয়া দিলেন (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ৪২১; আল-বিদায়া, ১খ., পৃ. ২৫৬)।
হযরত আয়্যুব (আ)-এর সাত কন্যা ও সাত পুত্র সন্তান ছিল। পরীক্ষার দিনগুলিতে তাহারা সকলেই ইন্তিকাল করিয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা তাহাদের সকলকেই পুনরায় জীবিত করিয়া দিলেন। অতঃপর নবীর স্ত্রীর গর্ভে নূতন সন্তানও উক্ত পরিমাণ দান করিলেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে : وَأَتَيْنُهُ أَهْلَهُ وَمَثْلَهُ مَعَهُمُ “এবং আমি তাহাকে তাঁহার পরিবার-পরিজন ফিরাইয়া দিলাম এবং তাহাদের সঙ্গে তাহাদের মত আরও দান করিলাম” (২১: ৮৪; রূহুল মায়ানী, ২৩খ., পৃ. ২০৯)।
তাঁহারা আরও একটি মু'জিযা ছিল এই যে, তিনি যখন গোসল করিয়া সুস্থ হইয়া উঠিলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে জান্নাতী পোশাক পরিধান করাইলেন এবং তাঁহার শারীরিক গঠনও সৌন্দর্য বহু গুণে বৃদ্ধি করিয়া দিলেন। ফলে তাঁহার স্ত্রী রহীমা তাঁহাকে চিনিতে পারিতেছিলেন না (রূহুল মা'আনী, ২৩ খ., পৃ. ২০৭)।
📄 হযরত ইউনুস (আ)-এর মু'জিযা
তিনি হযরত ইয়া'কূব ইবন ইসহাক (আ)-এর বংশের অন্যতম নবী। তাঁহার নবৃওয়াতের এলাকা ছিল ইরাকের মাওসিল-এর প্রসিদ্ধ নগরী 'নিনাওয়া'। তাঁহার জাতি শির্ক-এ নিমজ্জিত ছিল। তিনি তাঁহার জাতিকে ৩৩ বৎসর যাবৎ অবিরাম আল্লাহর দিকে ডাকিলেন। কিন্তু তাহারা ঈমান তো আনয়ন করিলই না, উপরন্তু তাঁহাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করিল। অবশেষে যখন জাতির ধ্বংস অনিবার্য হইয়া গেল, তিনি জাতির প্রতি ক্ষোভে, অভিমানে হিজরত করার সংকল্প করিলেন। এমনকি আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করিয়া তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে বাহির হইয়া পড়িলেন। পথিমধ্যে তিনি একটি নৌযানে আরোহণ করিলেন। যাত্রীসংখ্যা অধিক হওয়ায় নৌযানটি ডুবিয়া যাওয়ার উপক্রম হইলে নৌযান কর্তৃপক্ষ সেখানে কোন পলাতক দাস থাকার আশংকা করে এবং লটারীর মাধ্যমে তাহাকে বাহির করিবার সিদ্ধান্ত নেয়। লটারীতে বারংবার হযরত ইউনুস (আ)-এর নামই আসিতেছিল। অবশেষে তিনি সমুদ্র বক্ষে নিক্ষিপ্ত হইলেন। এবং তৎক্ষণাৎ বৃহদাকার এক মৎস তাঁহাকে গিলিয়া ফেলিল। আল্লাহ তা'আলা মাছকে আদেশ করিলেন, সে যেন ইউনুস (আ)-কে না খায়, বরং তাঁহার হিফাজত করে। মাছটি তাঁহাকে লইয়া সমুদ্র বক্ষে বিচরণ করিতে লাগিল। অবশেষে হযরত ইউনুস (আ) তাঁহার অপরাধ বুঝিতে পারিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করত তওবা করিলেন :
لَا إِلَهَ إِلا أَنْتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ . "তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নাই; তুমি পবিত্র মহান! আমি তো সীমা লংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত” (২১:৮৭)।
আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রার্থনা কবুল করিলেন এবং তাঁহাকে মাছের উদর হইতে নাজাত দিলেন। তিনি চল্লিশ দিন মৎস উদরে ছিলেন। ইহা ছিল মহান আল্লাহ্ কুদরতের অসাধারণ নিদর্শন। মাছটি যখন তাঁহাকে সমুদ্র তীরে উদগীরণ করিল তখন তাঁহার অসুস্থ তুলতুলে দেহকে ছায়াদানের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তৎক্ষণাত সেখানে একটি লাউ গাছ জন্মাইলেন এবং তাঁহার জীবিকার জন্য একটি দুগ্ধদায়িনী দুম্বা, অপর বর্ণনাতে হরিণী নিয়োজিত করিয়া দিলেন (দ্র. আল-কুরআনের সূরা আস-সাফফাত এর এবং সূরা আল-আম্বিয়ার সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের তাফসীর)।
তাঁহার আরেকটি মু'জিযা ছিল এই যে, মৎস উদর হইতে নিষ্কৃতির পর আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে পুনরায় নিজ জাতির নিকট ফিরিয়া যাইতে আদেশ করিলেন। তিনি যথাসময়ে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে তাঁহার দেশের এক রাখালের সহিত তাঁহার সাক্ষাত হইল। তিনি রাখালকে বলিলেন, সে যেন তাঁহার জাতিকে তাঁহার আগমন বার্তা পৌঁছাইয়া দেয়। রাখাল বলিল, আমি কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া জাতিকে এই বার্তা পৌঁছাইতে পারিব না। “আমি ভয় পাইতেছি, আপনিই ইউনুস নবী কিনা”, “আপনিই আমাদের প্রতীক্ষিত নবী কিনা”। তখন রাখালের ছাগল পালের একটি ছাগল, তাঁহার চারণভূমির একটি বৃক্ষ এবং স্বয়ং চারণভূমি এই মর্মে সাক্ষ্য প্রদান করিল যে, তিনিই তোমাদের প্রতীক্ষিত নবী ইউনুস (আ)।
রাখাল জাতিকে নবীর আগমন বার্তা শুনাইলে জাতির লোকজন চারণভূমিতে নবীর সহিত সাক্ষাতের জন্য আসিল। কিন্তু পূর্ব স্থানে নবীকে না পাইয়া রাখাল উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িল। তখন সেই সাক্ষ্যদাতা ছাগলটি আগত লোকদিগকে ইউনুস (আ)-এর সন্ধান দিল (সীরাত বিশ্বকোষ, ইফাৰা, ২খ., পৃ. ২১৫-২১৬)।
📄 হযরত যুল-কিফ্ল (আ)-এর মু'জিযা
হযরত যুল-কিফল (আ) সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তিনি নবী অথবা নবীর খলীফা ছিলেন (রূহুল মা'আনী, ১৯খ., পৃ. ৮২)। তাঁহার মু'জিযার বর্ণনায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রহিয়াছে। উহা এই যে, তিনি তাঁহার সমসাময়িক কাফির বাদশাহকে তাওহীদের দাওয়াত পেশ করিলে সে বলিল, ইহা গ্রহণ করিলে আমার কী লাভ হইবে? নবী বলিলেন, ইহাতে আপনি জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাইবেন। বাদশাহ বলিল, আমার জন্য এই জান্নাতের যামিন কে হইবে ? নবী বলিলেন, আমি হইব। বাদশাহ ঈমান আনয়ন করিলেন। কিছু দিন পরেই বাদশাহর মৃত্যু হইল। পরদিন লোকেরা ঘুম হইতে উঠিয়া দেখিল, বাদশাহর একটি হাত কবরের বাহিরে বাহির হইয়া আছে এবং উহার মধ্যে একটি সবুজ বর্ণের কাগজে লিখিত রহিয়াছে: “আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করিয়া দিয়াছেন। আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইয়াছেন এবং অমুক ব্যক্তি তাহার যামানত পূর্ণ করিয়া দিয়াছেন”। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়া হযরত যুল-কিফল (আ)-এর জাতির সকলেই তাঁহার উপর ঈমান আনয়ন করিল (কুরতুবী, তাফসীর, ১১খ., পৃ. ৩২৭)।
📄 হযরত ইলয়াস (আ)-এর মু'জিযা
বনূ ইসরাঈলের অন্যতম নবী হযরত ইলয়াস (আ)। বা'লাবাক্ক (بعلبك) শহরে প্রেরিত হন। তাঁহার সময়কালে বানু ইসরাঈলী সমাজে রাজা ‘উজব'-এর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজা ও তাহার প্রজাবৃন্দ বা'ল নামক এক মূর্তির পূজা করিত। নবী তাহাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। ইহাতে রাজা ভীষণ ক্ষুব্ধ হইল এবং নবীকে হত্যা করিবার জন্য সংকল্প করিল। নবী ইলয়াস (আ) একটি পর্বত গুহায় আশ্রয় লইলেন। সত্য অস্বীকারের পরিণতিতে জাতির উপর নামিয়া আসিল চরম দুর্ভিক্ষ। হযরত ইলয়াস (আ) রাজা উজবের সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিলেন, “তোমরা মহান আল্লাহর নাফরমানী হইতে বিরত হইলেই তোমাদের দুর্ভিক্ষ দূর হইতে পারে”। তিনি আরও বলিলেন, “আমার আনীত ধর্মই যে সত্য ধর্ম উহা প্রমাণ করিবার জন্য আস আমরা কুরবানী পেশ করি। আমি আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করিব। তোমরা তোমাদের দেবতার নামে কুরবানী পেশ করিবে। যাহার কুরবানী আসমানী অগ্নি আসিয়া ভস্মীভূত করিবে তাহার ধর্ম সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইবে"।
রাজা এই প্রস্তাব মানিয়া লইয়া দেবতার নামে কুরবানী পেশ করিল। হযরত ইলয়াস (আ) মহান আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করিলেন। নবীর কুরবানী কবুল হইল। ইহা দেখিয়া বা'ল দেবতার অনুসারীরা সিজদায় পড়িল এবং নবীর প্রতি ঈমান আনয়ন করিল (নূরুল কুরআন, ২৩খ., পৃ. ১৪৬)।
একবার রাজা উজব কতিপয় ঘাতককে এই বলিয়া প্রেরণ করিল, যেইভাবেই হউক প্রতারণা করিয়া ইলয়াসকে হত্যা করিতে হইবে। হযরত ইলয়াস (আ) একটি পর্বত গুহায় অবস্থান করিতেছিলেন। ঘাতকরা আসিয়া নিজেদেরকে ঈমানদার দাবি করিল এবং নবীকে বাহির হইয়া আসিতে আহ্বান জানাইল। নবী বলিলেন, "হে আল্লাহ! তাহারা মিথ্যাবাদী হইলে তাহাদেরকে আসমানী অগ্নি দ্বারা ভস্মীভূত কর"। তৎক্ষণাত আসমানী অগ্নি আসিয়া তাহাদেরকে ভস্মীভূত করিয়া দিল। এইভাবে রাজা উজব দুই দুইবার ঘাতক দল প্রেরণ করিল এবং প্রত্যেক বারই তাহারা মহান আল্লাহর গযবে অলৌকিকভাবে ধ্বংস হইল (তাফসীরে মাযহারী, ৮খ., পৃ. ১৪৯)।
একবার হযরত ইলয়াস (আ) হযরত ইউনুস (আ)-এর বাড়িতে অবস্থান করিতেছিলেন। ইউনুস (আ) ছিলেন তখন ছোট শিশু। কিছু দিন পর ইলয়াস (আ) চলিয়া গেলে শিশু ইউনুস ইন্তিকাল করেন। তাহার মাতা ইলয়াস (আ)-এর খিদমতে আসিয়া আরয করিলেন, "হে আল্লাহর নবী! আপনি চলিয়া আসিবার পর আমার সন্তান ইউনুস ইন্তিকাল করিয়াছে। দয়া করিয়া আপনি তাহার পুনর্জীবিত হওয়ার জন্য দু'আ করুন"। নবী দু'আ করিলেন। আল্লাহ তা'আলা ইউনুস (আ)-কে চৌদ্দ দিন পর পুনর্জীবিত করিয়া দিলেন।
একবার তিনি এক বৃদ্ধার বাড়িতে মেহমান হইলেন। বৃদ্ধার নিকট একটি পাত্রে সামান্য আটা এবং অপর পাত্রে সামান্য যয়তূনের তৈল ছিল। তিনি দু'আ করিলেন, ফলে পাত্র দুইটি আটা ও যয়তুন দ্বারা ভরিয়া গেল।
এক সময় সত্য অস্বীকারের অপরাধে তাঁহার জাতির উপর অনাবৃষ্টির আযাব আসিল। তিনি জাতিকে বলিলেন, তোমরা শিরক বর্জন কর, তোমাদের আযাব বিদূরিত হইবে। জাতি উহাই মানিয়া লইল। তৎক্ষণাৎ আকাশে মেঘ দেখা দিল এবং উহা হইতে প্রবল বর্ষণ হইল (সীরাত বিশ্বকোষ, ইফাবা, ২খ., পৃ. ২৫৮)।