📄 হযরত হূদ (আ)-এর মু'জিযা
হযরত হূদ (আ) সাম ইবন নূহ-এর বংশধর। তিনি 'আদ জাতির প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন (কাসাসুল কুরআন, গোলাম নবী, ১খ., পৃ. ৭৫)। তাঁহার জাতি মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। তিনি তাহাদেরকে উহা হইতে বিরত হইয়া তাওহীদের দিকে ফিরিয়া আসিতে আহবান জানাইলেন। তাহারা তাঁহার আহবান প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, তুমি আমাদের নিকট কোন প্রমাণ লইয়া আস নাই। আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি না। তাহারা চ্যালেঞ্জ করিয়া বলিল, তোমার কথা অস্বীকার করিলে তুমি আমাদেরকে আল্লাহ্ যেই আযাবের ভয় দেখাইতেছ, পারিলে তাহা আনয়ন করিয়া দেখাও। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পয়গাম্বর হযরত হূদ (আ)-এর দাবির সত্যতার প্রমাণ প্রতিষ্ঠাকল্পে দীর্ঘ তিন বৎসর ব্যাপী তাহাদের উপর চরম দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির আযাব নাযিল করিলেন। এই আযাব অপসারিত হইতে না হইতেই তাহাদের উপর আরেক আযাব নামিয়া আসিল। অন্ধকারপূর্ণ প্রচণ্ড তুফান আরম্ভ হইল। এই তুফান দীর্ঘ সাত রাত্র ও আট-দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ফলে 'আদ জাতি সমূলে ধ্বংস হইয়া গেল (দ্র. ১১৪ ৫৩-৫৪; ৭৪ ৬৬-৭০; ২৬: ১৩৬; ৪৬: ২৪; ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., পৃ. ২২৬)।
এই সর্বগ্রাসী ধ্বংস হইতে হযরত হূদ (আ) এবং তাঁহার সঙ্গীগণ অলৌকিকভাবে রক্ষা পান। তাহারা নিজ নিজ গৃহে পূর্ণ নিরাপদে অবস্থান করেন (ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., পৃ. ২২৬)।
📄 হযরত সালিহ (আ)-এর মু'জিযা
ছামূদ জাতির প্রতি প্রেরিত নবী হযরত সালিহ (আ)। তিনি ছিলেন সাম ইবন নূহ-এর বংশোদ্ভূত। তাঁহার নবুওয়াতের সময়কাল হযরত হূদ (আ)-এর পর (দ্র. ৭: ৭৩-৭৯, ১১ : ৬১-৬৮; ১৫:৮০-৮৪; ১৭:৫৯; ২৬: ১৪১-১৫৯; ২৭:৪৫-৫৩; ৪১: ১৭-১৮; ৫৪: ২৩-৩২; আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৮খ., পৃ. ১৬২; রাযী, তাফসীরুল কাবীর, ১৪খ., পৃ. ১৬২)।
তাঁহার জাতিও ছিল মূর্তিপূজারী। তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তাঁহার জাতি তাঁহাকে অস্বীকার করিল এবং অলৌকিক কিছু ঘটাইয়া দেখাইবার দাবি করিল। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত সালিহ (আ)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মু'জিযা প্রদান করিলেন। একটি পাথর হইতে লাল বর্ণের একটি উস্ত্রী বাহির হইয়া আসিল। আল্লাহ তা'আলা তাহার জাতিকে এই মর্মে সতর্ক করিয়া দিলেন যে, ইহা আল্লাহর উস্ত্রী। ইহার কোনরূপ ক্ষতি করা যাইবে না। অন্যথায় তাহাদের উপর আল্লাহর আযাব নামিয়া আসিবে (দ্র. ৭: ৭৩)। কিন্তু তাহারা উহাকে হত্যা করিল। ফলে তাহাদের উপর নামিয়া আসিল মর্মন্তুদ শাস্তি (দ্র. ৯১: ১১, তাফসীর কাবীর, ১৪খ., পৃ. ১৬২)।
📄 হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর বরকতময় জীবনে বেশ কিছু মু'জিযা লক্ষ্য করা যায়। যথা, (এক) ইব্রাহীম (আ)-এর স্ত্রী সারা ছিলেন পরমা সুন্দরী। একবার তিনি এবং তাঁহার স্ত্রী মিসরের স্বৈরাচারী বাদশাহর রাজ্যে উপস্থিত হইলেন। বাদশাহ ইহা জানিতে পারিয়া তাঁহাদেরকে ডাকিয়া পাঠাইল এবং কুমতলবে হযরত সারার দিকে স্বীয় হস্ত প্রসারিত করিল। আল্লাহর কুদরতে তৎক্ষণাৎ তাহার হস্ত অবশ হইয়া গেল। বাদশাহ স্বীয় অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হইয়া তাঁহার নিকট দু'আ চাহিল। তিনি দু'আ করিলেন, বাদশাহর হস্ত পূর্ববৎ সুস্থ হইয়া গেল। এইভাবে তিনবার তাঁহার এই মু'জিযার প্রকাশ ঘটিল (বুখারী, সহীহ, হাদীছ নং ৩১৪৩)।
(দুই) হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর তাওহীদের প্রচার ও প্রসারের দরুন তৎকালীন স্বৈরাচারী বাদশাহ নমরূদ তাঁহার প্রতি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। শেষ পযর্ন্ত সে তাঁহাকে অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধীভূত করার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করিল। যথারীতি অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হইলে বাদশাহ হযরত ইবরাহীম (আ)-কে সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল। কিন্তু তীব্র দাহের অগ্নি তাঁহার একটি কেশাগ্রও স্পর্শ করিল না। আল্লাহর কুদরতে অলৌকিকভাবে তিনি অগ্নিগর্ভে নিরাপদে অবস্থান করিলেন। আল্লাহ তা'আলা অগ্নিকে নির্দেশ দিলেন, يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ. “হে অগ্নি! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হইয়া যাও” (২১:৬৯)।
(তিন) হযরত ইব্রাহীম (আ) মিসর হইতে সিরিয়া প্রত্যাবর্তনকালে ফিলিস্তীনের আস-সাব' নামক স্থানে অবতরণ করেন। সেখানে তিনি একটি কূপ খনন করেন। কূপটির পানি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট। অতঃপর সেখানকার অধিবাসিগণ হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে পীড়া ও কষ্ট দিতে আরম্ভ করিল। তিনি সেখান হইতে চলিয়া যাইতেই কূপটির পানি অদৃশ্য হইয়া গেল। সাব'বাসী নিজেদের অপকর্মের জন্য অনুতপ্ত হইল এবং ইব্রাহীম (আ)-এর সন্ধান করিয়া তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিল। ইব্রাহীম (আ) তাহাদের প্রতি সদয় হইলেন এবং নিজ ছাগপাল হইতে সাতটি ছাগল তাহাদিগকে দান করিয়া বলিলেন, এই ছাগলগুলি লইয়া যাও। এই ছাগলগুলিকে পানি পান করিতে দিলেই কূপ হইতে স্বচ্ছ পানির ধারা উৎসারিত হইবে। তবে কোন ঋতুবতী নারী যেন অঞ্জলী ভরিয়া উহা হইতে পানি না উঠায়। তাহারা নবীর কথামত কাজ করিল, ফলে কূপ হইতে পুনরায় পানির ধারা জারি হইয়া গেল। বেশ কিছু দিন পর জনৈকা ঋতুবর্তী নারী নবীর কথা অমান্য করিয়া উক্ত কূপ হইতে অঞ্জলী ভরিয়া পানি তুলিল। ফলে কূপটি আবার শুকাইয়া গেল (তারীখ, আত্-তাবারী, ১খ., পৃ. ১২৭; আল-কামিল, ১খ., পৃ.৭৯)।
(চার) হযরত ইব্রাহীম (আ) বার্ধক্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছার পর সন্তান লাভ করা তাঁহার জীবনে সংঘটিত অলৌকিক নিদর্শনাবলীর অন্যতম। তাঁহার বয়স যখন ১২০ এবং তাঁহার স্ত্রীর বয়স ৯০ বৎসর, তখন তিনি মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে ফেরেস্তা মারফত ইসহাক নামক সন্তান লাভের সুসংবাদ প্রাপ্ত হন (দ্র. ১১ঃ ৭১; ছা'লাবী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃ. ৮৬)।
(পাঁচ) হযরত ইব্রাহীম (আ) আল্লাহর নির্দেশে তাঁহার স্ত্রী হাজেরা (রা) এবং দুগ্ধপোষ্য সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ)-কে মক্কার জন-মানবহীন মরুভূমিতে নির্বাসনে রাখিয়া আসেন (দ্র. ১৪ঃ ৩৭)। তাঁহাদের মশকের পানি এবং সামান্য পাথেয় শেষ হইয়া গেলে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসমাঈল (আ)-এর পায়ের গোড়ালীর ঘর্ষণে উহার তলাস্থ ভূমি হইতে একটি সুমিষ্ট পানির ধারা জারি করিয়া দেন, যাহা আজও যমযম কূপ নামে প্রবহমান রহিয়াছে (বুখারী, কিতাবুল- আম্বিয়া, ১খ., পৃ. ৪৭৪)।
(ছয়) হযরত ইসমাঈল (আ) যখন ১৩ বৎসর বয়সে পৌঁছেন তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে স্বপ্নে নির্দেশ দেন, তোমার আদরের পুত্র ইসমাঈলকে আল্লাহ্ সন্তুষ্টির জন্য যবেহ কর (দ্র. আল-বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৫৯)। তিনি যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করিয়া একটি ধারালো ছুরি লইয়া হযরত ইসমাঈল (আ)-এর গলায় চালাইতে লাগিলেন। কিন্তু ছুরিটি অকেজো হইয়া গেল। তিনি গায়েব হইতে আল্লাহর প্রত্যাদেশ পাইলেন, তোমার স্বপ্ন পূরণ হইয়াছে। তুমি ইসমাঈলের পরিবর্তে এই দুম্বাটি কুরবানী কর। তিনি উহাকে যবেহ করিলেন (দ্র. ৩৭: ১০৪-১০৭; আল-বিদায়া, ১খ., পৃ. ১৫৮)।
(সাত) আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহীম (আ)-কে কা'বাগৃহ পুনরায় নির্মাণের নির্দেশ দিলেন। ইতোপূর্বে কা'বাগৃহ, হযরত নূহ (আ)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের দরুন বালুতে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছিল। তিনি পুত্র হযরত ইসমাঈলকে সঙ্গে লইয়া কা'বা গৃহ নির্মাণ আরম্ভ করিলেন। দেয়ালের গাঁথনি উঁচু হইয়া গেল তখন তিনি একটি পাথরের উপর দাঁড়াইয়া নির্মাণকার্য করিতে লাগিলেন। আল্লাহর কুদরতে পাথরটি তাঁহার নির্মাণ কার্যের সুবিধার্থে উঠা-নামা করিত। তাঁহার পদচিহ্ন পাথরবক্ষে অংকিত হইয়া রহিল যাহা আজও কা'বা চত্বরে মাকামে ইবরাহীম নামক স্থানে সংরক্ষিত রহিয়াছে (দ্র. ২: ১২৫; ৩ঃ ৯৬-৯৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ১৬৩)।
(আট) আল্লাহ তা'আলা মৃতকে কিভাবে আবার জীবিত করিবেন তাহা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করান। আল্লাহ তাঁহাকে বলিলেন, তুমি চারটি পাখি লও এবং উহাদিগকে তোমার বশীভূত করিয়া লও। অতঃপর পাখিগুলিকে যবেহ করিয়া উহাদের রক্ত-গোশত ও হাড় সবকিছু একত্রে মিশাইয়া ফেল। অতঃপর উহাকে ভাগ করিয়া চারটি পর্বত চূড়ায় রাখিয়া আস। তারপর উহাদিগকে এইভাবে ডাকিয়া লও, হে টুকরা টুকরা হইয়া যাওয়া হাড্ডিসমূহ, বিচ্ছিন্ন হইয়া যাওয়া গোশতসমূহ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রক্ত-শিরাসমূহ! তোমরা একত্র হইয়া যাও। তোমাদের মাধ্যে আল্লাহ তা'আলা রূহ ফিরাইয়া দিবেন। ঘোষণা মাত্রই এক হাড্ডি অপর হাড্ডির উপর ঝাঁপাইয়া পড়িতে লাগিল। এক রক্ত অপর রক্তের সহিত মিলিত হইয়া প্রবাহিত হইতে শুরু করিল। গোশতের একাংশ অপর অংশের সহিত সংযুক্ত হইয়া পুন দেহাবয়বে রূপান্তরিত হইয়া গেল। এইভাবে প্রত্যেকটি পাখির রক্ত, গোশত, হাড্ডি ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ স্বতন্ত্রভাবে মিলিত হইল এবং পূর্ণাঙ্গ পাখি হইয়া গেল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সেইগুলির রূহ ফিরাইয়া দিলেন। ফলে সবগুলি পাখি পুনরায় জীবিত হইয়া তাঁহার নিকট ফিরিয়া আসিল (দ্র. ২: ২৬০; আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৩খ., পৃ. ২৮-২৯)।
📄 হযরত লূত (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর সহোদর হারানের পুত্র লূত (আ)। তিনি সাদৃম (জর্দান)-এ নবী হিসাবে প্রেরিত হন। তিনি হযরত ইব্রাহীম-এর সমসাময়িক। তাঁহার জাতি মূর্তিপূজা ও সমকামিতার ঘৃণ্য পাপাচারে লিপ্ত ছিল (দ্র. ৬: ৮৩; ৭: ৮০; ১১: ৬৯; ১৫: ৫১; ২১: ৭১)। হযরত লূত (আ) তাঁহার জাতির নিকট সত্যের দাওয়াত লইয়া আগমন করিলে জাতি তাঁহাকে অস্বীকার করিল। জাতি চ্যালেঞ্জ করিয়া বলিল, তুমি সত্যবাদী হইলে আল্লাহর শাস্তি আনয়ন কর। আমরা তোমাকে সত্যবাদী বলিয়া মনে করি না (দ্র. ২৯: ২৯)।
আল্লাহ তা'আলা তাহাদের এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়া তাহাদের উপর চরম আযাব নাযিল করিলেন। তাহাদের জনপদকে শূন্যে উঠাইয়া অতঃপর তাহাদেরসহ উল্টাইয়া দিলেন। ইহাতে তাহারা নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। লূত জাতির ধ্বংসাবশেষ আজও মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শনরূপে লুত সাগরের আশেপাশে বিদ্যমান রহিয়াছে (দ্র. ১১: ৮৩, তাফসীরে উসমানী, পৃ. ৬০১)।