📄 হযরত ইদরীস (আ)-এর মু'জিযা
হযরত ইদরীস (আ) হযরত শীছ-এর পর নবী হইলেন। আল-কুরআনের একাধিক স্থানে তাঁহার আলোচনা হইয়াছে (দ্র.. ১৯: ৫৬, ২১ঃ ৮৫)। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সর্বপ্রথম মু'জিযা হিসাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অংক শাস্ত্রের জ্ঞান দান করেন (ইবন কাছীর, মুখতাসার তাফসীর, ২খ., পৃ. ৪৫৬)।
তাঁহার আরও একটি মু'জিযা ছিল এই যে, তাঁহার সময়কালে পৃথিবীতে বাহাত্তরটি ভাষা প্রচলিত ছিল। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত মু'জিযাবলে সকল ভাষা বুঝিতেন এবং সকল ভাষায় অনর্গল কথা বলিতে পারিতেন। তিনি প্রত্যেক জাতিকে তাহাদের নিজস্ব ভাষায় দাওয়াত ও তালীম দিতেন (মুফতী মাসউদুল করীম, কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৯৪)।
📄 হযরত নূহ (আ)-এর মু'জিযা
হযরত নূহ (আ) একজন বিশিষ্ট নবী ও রাসূল ছিলেন। হযরত আদম (আ)-এর দশ পুরুষ পর হযরত শীছ-এর বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার নবৃওয়াতী জীবনের ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রদ ঘটনাবলী পবিত্র কুরআনে বারবার বিবৃত হইয়াছে (দ্র. ১১: ২৫-৪৮, ১৭: ৩, ২৩, ৩১; ২৫: ৩৮; ৭১: ১-২৮০ কাসাসূল কুরআন, ১খ., পৃ. ৬৪)।
হযরত নূহ (আ)-এর যুগের ঐতিহাসিক বিশ্বব্যাপী প্রলয়ংকরী তুফান তাঁহার অন্যতম মু'জিযা ও নবৃওয়াতের সত্যতার মহানিদর্শন (দ্র. ১১: ২৫-৪৮; ৫৪: ৯-১৬)। হযরত নূহ (আ)-এর এই তুফান মু'জিযার মধ্যে আরও অনেকগুলি মু'জিযার সমাবেশ ঘটিয়াছে। যথাঃ
(এক) আল্লাহ্র নির্দেশে বিশাল এক নৌকা তৈরী করা। তাঁহার পূর্বে পৃথিবীতে নৌযান ব্যবহারের সূচনা হয় নাই। যখন তিনি আল্লাহর পক্ষ হইতে একটি নৌযান তৈরী করিবার জন্য আদিষ্ট হইলেন তখন আল্লাহর নিকট আরয করিলেন: হে আল্লাহ্। নৌযান কি? আল্লাহ বলিলেন, একটি কাঠ নির্মিত ঘর যাহা পানিতে ভাসিয়া চলে। নূহ বলিলেন, আল্লাহ্! কাঠ কোথায় পাইব? আল্লাহ বলিলেন, হে নূহ! আমি যাহা চাহি তাহা করিতে সক্ষম। তুমি আমার তত্ত্বাবধানে এবং আমার প্রত্যাদেশ মুতাবিক নৌযান নির্মাণ আরম্ভ কর (দ্র. ১১: ২৫-৪৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ১১০)।
(দুই) আল্লাহ তা'আলা হযরত নূহ (আ)-কে প্রাণীজগতের প্রত্যেক জাতের এক জোড়া করিয়া নৌযানে তুলিবার নির্দেশ দেন। যখন তুফানের সময় নিকটবর্তী হইল তখন জল-স্থল, পর্বত ও সমভূমির সকল জীব-জন্তু আল্লাহর কুদরতে নূহ (আ)-এর নিকটে আসিয়া জড়ো হইল। তিনি তাঁহার পছন্দমত প্রত্যেক জাত হইতে এক জোড়া করিয়া প্রাণী নৌযানে তুলিয়া লইলেন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ. ৪১)।
(তিন) বিভিন্ন প্রজাতির জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ একত্রে দীর্ঘ দিন নৌযানে বসবাস করিল। কেহ কাহারও উপর কোন রকম আক্রমণ করে নাই এবং শান্তি ভঙ্গ করে নাই। এমনকি সিংহ ও গাভীর মধ্যেও শান্তি ও সম্প্রীতির সম্পর্ক বিরাজমান ছিল (আল্লামা আলুসী, রূহুল মা'আনী, ২খ., পৃ. ৫৪)।
(চার) তাননূর তথা রুটি তৈয়ারীর উনুন হইতে সর্বপ্রথম পানি উথলিয়া উঠে, যাহা ছিল সর্বগ্রাসী মহাপ্লাবন শুরু হওয়ার পূর্ব নিদর্শন (দ্র. ১১:৪০)।
📄 হযরত হূদ (আ)-এর মু'জিযা
হযরত হূদ (আ) সাম ইবন নূহ-এর বংশধর। তিনি 'আদ জাতির প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন (কাসাসুল কুরআন, গোলাম নবী, ১খ., পৃ. ৭৫)। তাঁহার জাতি মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। তিনি তাহাদেরকে উহা হইতে বিরত হইয়া তাওহীদের দিকে ফিরিয়া আসিতে আহবান জানাইলেন। তাহারা তাঁহার আহবান প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, তুমি আমাদের নিকট কোন প্রমাণ লইয়া আস নাই। আমরা তোমাকে বিশ্বাস করি না। তাহারা চ্যালেঞ্জ করিয়া বলিল, তোমার কথা অস্বীকার করিলে তুমি আমাদেরকে আল্লাহ্ যেই আযাবের ভয় দেখাইতেছ, পারিলে তাহা আনয়ন করিয়া দেখাও। তখন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পয়গাম্বর হযরত হূদ (আ)-এর দাবির সত্যতার প্রমাণ প্রতিষ্ঠাকল্পে দীর্ঘ তিন বৎসর ব্যাপী তাহাদের উপর চরম দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির আযাব নাযিল করিলেন। এই আযাব অপসারিত হইতে না হইতেই তাহাদের উপর আরেক আযাব নামিয়া আসিল। অন্ধকারপূর্ণ প্রচণ্ড তুফান আরম্ভ হইল। এই তুফান দীর্ঘ সাত রাত্র ও আট-দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ফলে 'আদ জাতি সমূলে ধ্বংস হইয়া গেল (দ্র. ১১৪ ৫৩-৫৪; ৭৪ ৬৬-৭০; ২৬: ১৩৬; ৪৬: ২৪; ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., পৃ. ২২৬)।
এই সর্বগ্রাসী ধ্বংস হইতে হযরত হূদ (আ) এবং তাঁহার সঙ্গীগণ অলৌকিকভাবে রক্ষা পান। তাহারা নিজ নিজ গৃহে পূর্ণ নিরাপদে অবস্থান করেন (ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ., পৃ. ২২৬)।
📄 হযরত সালিহ (আ)-এর মু'জিযা
ছামূদ জাতির প্রতি প্রেরিত নবী হযরত সালিহ (আ)। তিনি ছিলেন সাম ইবন নূহ-এর বংশোদ্ভূত। তাঁহার নবুওয়াতের সময়কাল হযরত হূদ (আ)-এর পর (দ্র. ৭: ৭৩-৭৯, ১১ : ৬১-৬৮; ১৫:৮০-৮৪; ১৭:৫৯; ২৬: ১৪১-১৫৯; ২৭:৪৫-৫৩; ৪১: ১৭-১৮; ৫৪: ২৩-৩২; আলুসী, রূহুল মা'আনী, ৮খ., পৃ. ১৬২; রাযী, তাফসীরুল কাবীর, ১৪খ., পৃ. ১৬২)।
তাঁহার জাতিও ছিল মূর্তিপূজারী। তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তাঁহার জাতি তাঁহাকে অস্বীকার করিল এবং অলৌকিক কিছু ঘটাইয়া দেখাইবার দাবি করিল। তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত সালিহ (আ)-এর নবুওয়াতের দাবির সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মু'জিযা প্রদান করিলেন। একটি পাথর হইতে লাল বর্ণের একটি উস্ত্রী বাহির হইয়া আসিল। আল্লাহ তা'আলা তাহার জাতিকে এই মর্মে সতর্ক করিয়া দিলেন যে, ইহা আল্লাহর উস্ত্রী। ইহার কোনরূপ ক্ষতি করা যাইবে না। অন্যথায় তাহাদের উপর আল্লাহর আযাব নামিয়া আসিবে (দ্র. ৭: ৭৩)। কিন্তু তাহারা উহাকে হত্যা করিল। ফলে তাহাদের উপর নামিয়া আসিল মর্মন্তুদ শাস্তি (দ্র. ৯১: ১১, তাফসীর কাবীর, ১৪খ., পৃ. ১৬২)।