📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 সিদ্ধান্তে অবিচলতা

📄 সিদ্ধান্তে অবিচলতা


কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থির করিবার পর উহাতে অটল ও অবিচল থাকা অত্যন্ত মহৎ গুণ। পরিস্থিতি ও পরিবেশ যতই প্রতিকূল হউক, সমালোচনা, আপত্তি, অভিযোগ যতই তীব্র হউক, সর্বাবস্থায় নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ও অবিচল থাকিতেন রাসূলে কারীম (স)। ইহা ছিল পবিত্র কুরআনের নির্দেশের প্রতি তাঁহার পরিপূর্ণ আনুগত্য। ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ المتوكلين..
“আপনি কাজ-কর্মে তাহাদের সহিত পরামর্শ করুন। অতঃপর আপনি কোন দৃঢ় সংকল্প করিলে আল্লাহ্ উপর নির্ভর করুন। আল্লাহ নির্ভরশীলদেরকে ভালবাসেন” (৩৪১৫৯)।
রাসূল কারীম (স)-এর সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল থাকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধিতে। মক্কার কুরায়শদের সহিত দীর্ঘ আলোচনার পর কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্থির হইল, তন্মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত এই ছিল: “যে সকল মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না।” এই সিদ্ধান্ত স্থির হওয়ার পর মুহূর্তেই কুরায়শ প্রতিনিধি সুহায়লের পুত্র হযরত আবু জান্দাল (রা) শৃংখল বেষ্টিত অবস্থায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাযির হইলেন। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে সুহায়ল তাঁহাকে দীর্ঘকাল যাবৎ এইভাবে চরম নিপীড়ন করিতেছিল। আবূ জান্দাল (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মদীনায় যাওয়ার অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু রাসূল কারীম (স) উভয় পক্ষের মধ্যে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন। তিনি আবু জান্দালের আবদার ফিরাইয়া দিলেন এবং তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "আমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করিতে পারি না। তুমি মক্কায় ফিরিয়া যাও। মহান আল্লাহ অচিরেই তোমাদের জন্য মুক্তির রাস্তা খুলিবেন" (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 বিচারকার্যে

📄 বিচারকার্যে


সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা বিচারকার্যে রাসূল কারীম (স) ধর্ম, বর্ণ, বংশ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের জন্য সত্য ও ন্যায়ের ফায়সালা করিতেন। বিচারকার্যে সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা ছিল তাঁহার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মদীনায় 'বিশর' নামক জনৈক মুসলিম ও এক ইয়াহুদীর মধ্যে এক খণ্ড জমি লইয়া বিরোধ ছিল। ইয়াহুদী বলিল, চল এই বিচারের ভার তোমাদের নবীর উপর অর্পণ করি। বিশ্র ছিল অন্যায় ও মিথ্যা দাবিদার। যেহেতু নবী কারীম (স) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ফায়সালা করিবেন, এমনকি তাহা ইয়াহুদীর পক্ষে গেলেও, তাই বিশ্ব বলিল, না, তোমাদের নেতা কা'ব ইব্‌ন আশরাফের নিকট বিচার লইয়া চল। কিন্তু ইয়াহুদী কোনভাবেই ইহাতে সম্মত হইল না। অবশেষে ইয়াহূদীর পীড়াপীড়িতে বিশর রাসূল কারীম (স)-এর সমীপে বিচার পেশ করিল। রাসূল কারীম (স) উভয়ের দাবি দাওয়া ও যুক্তি-প্রমাণ পর্যালোচনা করিয়া ইয়াহূদীর পক্ষে রায় প্রদান করিলেন (তাফসীরে জালালায়ন, ১খ., পৃ. ৭৯)। ইসলাম ও ইসলামের নবীর ঘৃণ্যতম শত্রু ইয়াহূদীর প্রতি অন্তরে পুঞ্জীভূত ঈমানী ক্ষোভ ও ঘৃণাবোধ তাঁহাকে সত্য ও ন্যায় হইতে বিচ্যুত করে নাই; বরং সাম্প্রদায়িকতা প্রীতির এই নাযুক মুহূর্তেও তিনি সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন। বস্তুত ইহা ছিল তাঁহার আল-কুরআনের নিম্নোক্ত নির্দেশের প্রতি সবিশেষ আনুগত্য ও বাস্তব আমল:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ لِلهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى آلَا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকিবে; কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করিবে। ইহা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত আছেন" (৫:৮)।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبَيْنَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَولَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا .
"হে মু'মিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকিবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও ইহা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হউক অথবা বিত্তহীনই হউক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করিতে প্রবৃত্তির অনুগামী হইও না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কাটাইয়া যাও, তবে তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক খবর রাখেন" (৪: ১৩৫)।
একবার চুরির দায়ে এক সম্ভ্রান্ত কুরায়শ মহিলা দোষী সাব্যস্ত হয়। কিছু লোক কুরায়শ বংশের মর্যাদার কারণে তাহাকে শাস্তি হইতে বাঁচাইবার চেষ্টা করে। তাহারা রাসূল কারীম (স)-এর নিকট সুপারিশ করার জন্য তাঁহার অতি প্রিয়ভাজন হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-কে অনুরোধ করিল। তিনি রাসূল কারীম (স)-এর নিকট মহিলার শাস্তি মওকুফের জন্য আবেদন করিল। রাসূল কারীম (স) অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া বলিলেন, "আল্লাহ্ দণ্ডবিধি মওকুফের সুপারিশ করিতেছ? এইজন্যই বনু ইসরাঈল ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। তাহারা দুর্বল গরীবদের বেলায় আইনের শাসন প্রয়োগ করিত, কিন্তু সবল ধনীদের রেহাই দিত” (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ১০০৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা

📄 সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা


নীতি ও আদর্শে অবিচলতা

📘 সীরাত বিশ্বকোষ 📄 নীতি ও আদর্শে অবিচলতা

📄 নীতি ও আদর্শে অবিচলতা


নীতি ও আদর্শের ব্যাপারে রাসূল কারীম (স) সদা আপোষহীন ও দৃঢ়পদ ছিলেন। এমনকি চরম শত্রুর ব্যাপারে বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি নীতি ভঙ্গ করিতেন না। রাসূল কারীম (স)-এর জীবদ্দশায় ইয়ামামার বনূ হানীফা গোত্রের জনৈক মুসায়লামা নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করে। হিজরী নবম সালে মুসায়লামার পক্ষ হইতে একটি প্রতিনিধিদল মদীনায় রাসূল কারীম (স)-এর নিকট হাযির হইয়া বলিতে লাগিল, মুহাম্মাদ যদি তাঁহার পরে মুসায়লামাকে উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন তবে সে তাঁহার বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইবে। মিথ্যা নবী দাবি করাই তো ছিল চরম ও অমার্জনীয় অপরাধ। তদুপরি রাসূল কারীম (স)-এর সম্মুখে হাযির হইয়া তাহা বলা তো ছিল আরও ক্ষমাহীন অপরাধ। এইরূপ অপরাধে তাহাদের মৃত্যুদণ্ড ছিল অনিবার্য। কিন্তু রাসূল কারীম (স)-এর আদর্শ ও নীতিতে রাষ্ট্রীয় বা গোত্রীয় প্রতিনিধিকে হত্যা করা নিষিদ্ধ, তাই তিনি এমন অসহ্যকর পরিস্থিতিতেও নিজেকে পূর্ণ সংযত ও নীতির উপর অটল ও অবিচল রাখিলেন। এই সময় তাঁহার হাতে খেজুর গাছের একটি ছড়ি ছিল। তিনি মুসায়লামা- প্রতিনিধিদের সম্বোধন করিয়া শুধু এতটুকু বলিলেন, "এই ছড়িটি চাহিলেও আমি তাহা তাহাকে দিব না। যদি সে আমার অনুসরণ না কর, তবে আল্লাহ তা'আলা তাহাকে অচিরেই ধ্বংস করিবেন" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১০)।
দশম হিজরীতে মুসায়লামা কায্যাব রাসূল কারীম (স)-এর নিকট একটি পত্র লিখে। পত্রের বক্তব্য ছিল এই: مسيلمة رسول الله الى محمد رسول الله اما بعد فان لنا نصف الارض ولقريش نصفها ولكن قريشا لا ينصفون والسلام عليك .
"আল্লাহ্র রাসূল মুসায়লামার পক্ষ হইতে আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদের নিকট। প্রকাশ থাকে যে, পৃথিবীর অর্ধাংশ আমাদের আর অর্ধাংশ কুরায়শদের। কিন্তু কুরায়শগণ ন্যায়বিচার করে না। আপনাকে সালাম" (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৬১১)।
ইবনুল যাওয়াহা ও ইব্‌ন উসাল নামক দুই ব্যক্তি এই পত্র লইয়া রাসূল কারীম (স)-এর নিকট আসিল। রাসূল কারীম (স) তাহাদেরকে বলিলেন, "তোমরা বল, لا اله الا الله محمد رسول الله; তাহারা বলিল, لا اله الا الله مسيلمة رسول الله (নাউযুবিল্লাহ)। রাসূল কারীম (স) বলিলেন, "যদি আইনানুযায়ী দূতকে হত্যা করা নিষিদ্ধ না হইত তবে নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে হত্যা করিতাম” (মুসনাদে আবু দাউদ, ১খ., পৃ. ২৩৮)। কিন্তু ইহার বিপরীতে দেখা গেল, রাসূল কারীম (স) মুসায়লামার পত্রের উত্তর লিখিয়া সাহাবী হযরত হাবীব ইব্‌ন যায়দ (রা)-কে তাহার নিকট প্রেরণ করিলেন। ভণ্ড পাপিষ্ঠ মুসায়লামা রাসূল কারীম (স)-এর পত্রবাহক সাহাবীর হস্ত-পদ চতুষ্টয় কর্তন করিয়া তাঁহাকে চিরতরে পঙ্গু করিয়া দিল (ফুতূহুল বুলদান, পৃ. ৯৫)।
নীতি ও আদর্শে রাসূল কারীম (স)-এর অটল ও অবিচলতার আরেকটি দৃষ্টান্ত রহিয়াছে বানু জাযীমার অভিযানে। মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের তাবলীগ ও প্রচারের জন্য কয়েকটি ক্ষুদ্র কাফেলা রাসূল কারীম (স) মক্কার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রেরণ করেন। এই সময় হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে সাড়ে তিন শত সাহাবীর একটি কাফেলা বানু জাযীমার উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়। তাঁহারা যখন এই গোত্রে পৌছিলেন তখন জাযীমাবাসী চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন : আমরা বেদীন হইয়াছি, আমরা বেদীন হইয়াছি। ইহার দ্বারা তাহাদের উদ্দেশ্য ছিন, আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। আমাদের পূর্ব ধর্ম ত্যাগ করিয়াছি। কিন্তু আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি এই কথাটি সরাসরি না বলাতে হযরত খালিদ (রা) মনে করিলেন, তাহারা অমুসলিম, তিনি তাহাদের উপর আক্রমণ শুরু করিলেন। অথচ রাসূল কারীম (স) তাহাকে যুদ্ধের নির্দেশ দেন নাই, কেবল তাবলীগের জন্য প্রেরণ করিয়াছেন। যাহাই হউক এই যুদ্ধে বানু জাযীমার কয়েকজন নিহত হইল, বাকী পুরুষগণ বন্দী হইল। পরের দিন সেনাপতি খালিদ (রা) প্রত্যেক মুজাহিদকে নির্দেশ দিলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ অধীনস্ত বন্দীকে হত্যা কর। কয়েকজন সাহাবী তাহার এই নির্দেশ পালনে বিরত রহিলেন। তাহারা ঘটনার বিবরণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আলোচনা করিলে রাসূল কারীম (স) ক্রুদ্ধ হইলেন এবং ব্যাকুল কণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিলেন:
اللهم اني ابرأ اليك مما صنع خالد .
“হে আল্লাহ! খালিদ যাহা করিয়াছে উহার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করিতেছি না” (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২২)।
হযরত খালিদ (রা)-এর কর্মকাণ্ড যদিও ভুলবশতই হইয়াছে, কিন্তু নীতি বহির্ভূত এই কর্মের কারণে রাসূল কারীম (স) চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। তিনি দ্রুত নিহতদের জান-মালের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য হযরত আলী (রা)-কে বানু জাযীমার নিকট প্রেরণ করিলেন। বানু জাযীমার লোকজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ন্যায়নীতি দেখিয়া অত্যন্ত মুগ্ধ হইলেন (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৪২৮-৪৩১)।
রাসূল কারীম (স) তাঁহার সাহাবীগণকে সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতার শিক্ষা দিয়াছেন। একদা হযরত আবূ উমারা (রা)-কে তিনি বলেন: قل امنت بالله ثم استقم বল, আমি মহান আল্লাহতে ঈমান আনিলাম, অতঃপর অবিচল থাক" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৪৮)।
তিনি মু'মিনদেরকে অবিচলতা ও দৃঢ়তার তাওফীক চাহিয়া এইভাবে মহান আল্লাহ্ সমীপে প্রার্থনা করিতে শিক্ষা দিয়াছেন।
ربَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য দান কর, আমাদের কদম অবিচলিত রাখ এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য দান কর" (২: ২৫০)।
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
“হে আমাদের রব! আমাদের পাপ এবং আমাদের কার্যে সীমালংঘন তুমি ক্ষমা কর, আমাদের কদম সুদৃঢ় রাখ এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য কর" (৩ঃ ১৪৭)।
সত্য ও ন্যায়ে অবিচলিত ও দৃঢ়পদ থাকার এই শিক্ষা সাহাবায়ে কিরাম (রা) মনেপ্রাণে গ্রহণ করিয়াছিলেন। ফলে কঠিন হইতে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও তাহারা সত্য ও ন্যায়ে ছিলেন অবিচল। মহান আল্লাহ তাঁহার এই অনুগ্রহের কথা এইভাবে ব্যক্ত করিয়াছেন:
إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى المَلْئِكَةِ أَنَّى مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا سَأَلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانِ:
"স্মরণ কর! তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, আমি তোমাদের সহিত আছি। সুতরাং তোমরা মুমিনদের অবিচলিত রাখ। আমি কাফিরদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিব। সুতরাং তোমরা তাহাদের স্কন্ধে ও সর্বাংগে আঘাত কর" (৮:১২)।
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا .
"বল, তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে রূহুল কুদুস (জিবরীল) সত্য কুরআন নাযিল করিয়াছে মু'মিনদের চিত্তকে অবিচলিত রাখার জন্য" (১৬ঃ ১০২)।
সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা ও দৃঢ়তা মহান আল্লাহ্র মহৎ অনুগ্রহবিশেষ। রাসূল কারীম (স)-এর সত্য ও ন্যায়ে নজীরবিহীন অবিচলতা সেই ইলাহী অনুদানেরই একটি অংশ। কুরআনুল কারীমে তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁহার প্রতি এই অমূল্য অনুদানের বারবার উল্লেখ করিয়াছেন:
وَلَوْ لَا أَنْ ثَبَّتْنَكَ لَقَدْ كِدْتُ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلاً.
"আমি তোমাকে অবিচলিত না রাখিলে তুমি তাহাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকিয়া পড়িতে" (১৭ঃ ৭৪)।
وَكُلاً نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ .
"রাসূলদের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করিতেছি, যদ্বারা আমি তোমার চিত্তকে দৃঢ় করি" (১১ঃ ১২০)।
كَذلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْتُهُ تَرْتِيلاً .
"আমি ক্রমে ক্রমে কুরআন নাযিল করিয়াছি তোমার হৃদয়কে উহা দ্বারা দৃঢ় মযবুত করিবার জন্য এবং তাহা ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করিয়াছি” (২৫ঃ ৩২)।
সত্য ও ন্যায়ে দৃঢ়পদ ও অবিচল থাকার তাওফীকপ্রাপ্তি নির্ভর করে মহান আল্লাহ্র দীনের সাহায্য ও সহযোগিতার উপর।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرُكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ. "হে মু'মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করিবেন এবং তোমাদের অবস্থান দৃঢ় করিবেন" (৪৭ : ৭)।
রাসূল কারীম (স)-এর প্রচারিত ওহীতে সত্য ও ন্যায়ে অবিচল থাকার প্রতি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে এবং উহার বিনিময়ে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হইয়াছে :
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَاهُمْ يَحْزَنُونَ. أُولَئِكَ أَصْحَبُ الْجَنَّةِ خَلِدِينَ فِيهَا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. "নিশ্চয় যাহারা বলে, আল্লাহ আমাদের রব, অতঃপর অটল থাকে, তাহাদের কোন ভয় নাই, তাহারা দুঃখিও হইবে না। ইহারাই জান্নাতী, সেথায় তাহারা স্থায়ী হইবে। ইহা তাহাদের কর্মের পুরস্কার" (৪৬ : ১৩-১৪)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px