📄 মৃত্যুর দুয়ারেও সত্যে অবিচলতা
সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম ইসলাম প্রচার হইতে রাসূল কারীম (স)-কে যখন নিরস্ত করিতে কুরায়শদের সকল প্রকার চেষ্টা ব্যর্থ হইল, তখন তাহারা তাঁহাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত করিল। কিন্তু তিনি সত্যের প্রচারে পূর্ববৎ অগ্রসর হইতেই থাকিলেন। জীবননাশের ভয়-ভীতিও তাঁহাকে অবদমিত করিতে পারিল না। অবশেষে তিনি ন্যায় ও সত্যকে সমুন্নত রাখিবার জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করিয়া মদীনায় হিজরত করেন। তবুও ন্যায় ও সত্যের উপর দৃঢ়তা ও অবিচলতায় এক চুল পরিমাণও ছাড় দেন নাই (দ্র. ৮: ৩০; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৫২)।
রাসূল কারীম (স) তাঁহার সাহাবায়ে কিরামকেও সত্য ও ন্যায়ে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাই দেখা যায়, হিজরত-পূর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মক্কার মুসলিমগণের উপরই চরম নিপীড়ন ও অত্যাচারের খড়গ পতিত হইয়াছে। তাঁহারাও সাধ্যমত সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচল থাকিবার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন। কাফিরদের নির্যাতন ও উৎপীড়নে কোন মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করিয়াছেন ইতিহাসের পাতায় এমন একটি নজীরও পাওয়া যাইবে না। ইহা কেবল পৃথিবীর বুকে ইসলামেরই ঐতিহ্য।
রাসূল কারীম (স) তাঁহার সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতার কিরূপ দীক্ষা দিয়াছিলেন তাহার একটি উদাহরণ চিন্তা করা যায় নিম্নোক্ত রিওয়ায়াত হইতে। একদিন হযরত খাব্বাব (রা) কুরায়শদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হইয়া রাসূল কারীম (স)-এর খিদমতে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাফিরদের জন্য বদ-দু'আ করুন। এই কথা শ্রবণে তাঁহার মুখমণ্ডল রক্ত বর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, তোমাদের পূর্বে এমন লোকও অতীত হইয়াছেন যাহার মাথায় করাত রাখিয়া চিরিয়া ফেলা হইয়াছে, তথাপি তিনি নিজের কর্তব্য পালনে বিরত হন নাই। আল্লাহ তা'আলা এই কাজ (ইসলাম)-কে অবশ্যই পূর্ণ করিবেন, এমন একদিন আসিবে, একা একজন উষ্ট্রারোহী মহিলা সান'আ হইতে হাদারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণ করিবে এবং তাহার জন্য এক আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও ভয় থাকিবে না (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৫৪৩)।
📄 রণাঙ্গনে অবিচলতা
সত্য ও ন্যায়ের উপর রাসূল কারীম (স)-এর দৃঢ়তা ও অবিচলতার বলিষ্ঠ উপস্থিতি আমরা দেখিতে পাই তাঁহার জীবদ্দশায় সংঘটিত সবকয়টি রণাঙ্গনে। সত্যের পথে কণ্টক দেখিয়া পশ্চাৎপদ হওয়া তাঁহার শিক্ষা ও আদর্শ বিরোধী। ভীরু হৃদয়ের মিনতি বা কাপুরুষতা তিনি পছন্দ করিতেন না। তাই প্রত্যেকটি রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন অটল ও অবিচল। উহুদের যুদ্ধে তিনি সাহাবায়ে কিরামের সহিত পরামর্শ করিলেন, মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া যুদ্ধ করা হইবে, নাকি নগর ছাড়িয়া বাহিরে গিয়া শত্রুর মুকাবিলা করা হইবে? আলোচনা পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হইল, মদীনা হইতে বাহির হইয়া শত্রুর মুকাবিলা করা হইবে। রাসূল কারীম (স) যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির জন্য গৃহে প্রবেশ করিলেন এবং রণসজ্জায় সজ্জিত হইয়া বাহিরে আসিলেন। এই সময় কয়েকজন সাহাবী আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রস্তাব ছিল মদীনা প্রাচীরের ভিতরে থাকিয়া শত্রুর মুকাবিলা করা। যদিও আপনি আমাদের প্রস্তাবে রায় দিয়েছেন। আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। আপনার প্রস্তাবই কার্যকর হউক। আমরা মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়াই লড়াই করিব। রাসূল কারীম (স) বলিলেন, না তাহা হয় না। যুদ্ধের পোশাক পরিধান করার পর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে তাহা খুলিয়া ফেলা নবীর জন্য সমীচীন নহে। এখন প্রস্তুত হও এবং আল্লাহ্ নামে অগ্রসর হও (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ১০৯৫; ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৬৪-৬৬)।
ঐতিহাসিক হুনায়নের যুদ্ধের ঘটনা। মুসলিম সৈন্যদের কিছুটা অপ্রস্তুত ও সঙ্কট অবস্থায় কাফিররা অতর্কিত আক্রমণ করিয়া বসিলে প্রায় বার হাজার মুসলিম সৈন্যের মধ্যে কয়েকজন ব্যতীত সকলেই দিশাহারা হইয়া দিকবিদিক পলায়ন করিতে লাগিল। এমনকি রণাঙ্গন প্রায় মুসলিম সৈন্যশূন্য হইয়া গেল। হযরত আনাস (রা) বলেনঃ
فادبروا عنه حتى بقى وحده
"তাহারা তাঁহাকে রাখিয়া পশ্চাৎপদ হইল, এমনকি তিনি একাই অবশিষ্ট রহিলেন" (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২১)।
বার হাজার যোদ্ধা রণে ভঙ্গ দিয়া পশ্চাৎপদ হওয়ার পর শুধু একা সহস্র শত্রুর বিরুদ্ধে অবিচলিত চিত্তে অটল থাকিয়া যুদ্ধে রত রহিয়াছে-পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সেনাপতির কথা কোথাও আছে কি? শুধু ইহাই নহে, নবী (স) তখন নির্ভিক চিত্তে বলিলেন:
انا النبي لاكذب انا ابن عبد المطلب.
৮৯ “আমি নবী, ইহা মিথ্যা নহে। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান” (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৪০১)
📄 সিদ্ধান্তে অবিচলতা
কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থির করিবার পর উহাতে অটল ও অবিচল থাকা অত্যন্ত মহৎ গুণ। পরিস্থিতি ও পরিবেশ যতই প্রতিকূল হউক, সমালোচনা, আপত্তি, অভিযোগ যতই তীব্র হউক, সর্বাবস্থায় নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ও অবিচল থাকিতেন রাসূলে কারীম (স)। ইহা ছিল পবিত্র কুরআনের নির্দেশের প্রতি তাঁহার পরিপূর্ণ আনুগত্য। ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ المتوكلين..
“আপনি কাজ-কর্মে তাহাদের সহিত পরামর্শ করুন। অতঃপর আপনি কোন দৃঢ় সংকল্প করিলে আল্লাহ্ উপর নির্ভর করুন। আল্লাহ নির্ভরশীলদেরকে ভালবাসেন” (৩৪১৫৯)।
রাসূল কারীম (স)-এর সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল থাকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধিতে। মক্কার কুরায়শদের সহিত দীর্ঘ আলোচনার পর কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্থির হইল, তন্মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত এই ছিল: “যে সকল মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না।” এই সিদ্ধান্ত স্থির হওয়ার পর মুহূর্তেই কুরায়শ প্রতিনিধি সুহায়লের পুত্র হযরত আবু জান্দাল (রা) শৃংখল বেষ্টিত অবস্থায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাযির হইলেন। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে সুহায়ল তাঁহাকে দীর্ঘকাল যাবৎ এইভাবে চরম নিপীড়ন করিতেছিল। আবূ জান্দাল (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মদীনায় যাওয়ার অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু রাসূল কারীম (স) উভয় পক্ষের মধ্যে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন। তিনি আবু জান্দালের আবদার ফিরাইয়া দিলেন এবং তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "আমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করিতে পারি না। তুমি মক্কায় ফিরিয়া যাও। মহান আল্লাহ অচিরেই তোমাদের জন্য মুক্তির রাস্তা খুলিবেন" (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
📄 বিচারকার্যে
সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা বিচারকার্যে রাসূল কারীম (স) ধর্ম, বর্ণ, বংশ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের জন্য সত্য ও ন্যায়ের ফায়সালা করিতেন। বিচারকার্যে সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতা ছিল তাঁহার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মদীনায় 'বিশর' নামক জনৈক মুসলিম ও এক ইয়াহুদীর মধ্যে এক খণ্ড জমি লইয়া বিরোধ ছিল। ইয়াহুদী বলিল, চল এই বিচারের ভার তোমাদের নবীর উপর অর্পণ করি। বিশ্র ছিল অন্যায় ও মিথ্যা দাবিদার। যেহেতু নবী কারীম (স) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ফায়সালা করিবেন, এমনকি তাহা ইয়াহুদীর পক্ষে গেলেও, তাই বিশ্ব বলিল, না, তোমাদের নেতা কা'ব ইব্ন আশরাফের নিকট বিচার লইয়া চল। কিন্তু ইয়াহুদী কোনভাবেই ইহাতে সম্মত হইল না। অবশেষে ইয়াহূদীর পীড়াপীড়িতে বিশর রাসূল কারীম (স)-এর সমীপে বিচার পেশ করিল। রাসূল কারীম (স) উভয়ের দাবি দাওয়া ও যুক্তি-প্রমাণ পর্যালোচনা করিয়া ইয়াহূদীর পক্ষে রায় প্রদান করিলেন (তাফসীরে জালালায়ন, ১খ., পৃ. ৭৯)। ইসলাম ও ইসলামের নবীর ঘৃণ্যতম শত্রু ইয়াহূদীর প্রতি অন্তরে পুঞ্জীভূত ঈমানী ক্ষোভ ও ঘৃণাবোধ তাঁহাকে সত্য ও ন্যায় হইতে বিচ্যুত করে নাই; বরং সাম্প্রদায়িকতা প্রীতির এই নাযুক মুহূর্তেও তিনি সত্য ও ন্যায়ের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন। বস্তুত ইহা ছিল তাঁহার আল-কুরআনের নিম্নোক্ত নির্দেশের প্রতি সবিশেষ আনুগত্য ও বাস্তব আমল:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ لِلهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى آلَا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকিবে; কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করিবে। ইহা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহা সম্যক অবগত আছেন" (৫:৮)।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبَيْنَ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَولَى بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَى أَنْ تَعْدِلُوا وَإِنْ تَلُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا .
"হে মু'মিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকিবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ; যদিও ইহা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; সে বিত্তবান হউক অথবা বিত্তহীনই হউক আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করিতে প্রবৃত্তির অনুগামী হইও না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কাটাইয়া যাও, তবে তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক খবর রাখেন" (৪: ১৩৫)।
একবার চুরির দায়ে এক সম্ভ্রান্ত কুরায়শ মহিলা দোষী সাব্যস্ত হয়। কিছু লোক কুরায়শ বংশের মর্যাদার কারণে তাহাকে শাস্তি হইতে বাঁচাইবার চেষ্টা করে। তাহারা রাসূল কারীম (স)-এর নিকট সুপারিশ করার জন্য তাঁহার অতি প্রিয়ভাজন হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে অনুরোধ করিল। তিনি রাসূল কারীম (স)-এর নিকট মহিলার শাস্তি মওকুফের জন্য আবেদন করিল। রাসূল কারীম (স) অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া বলিলেন, "আল্লাহ্ দণ্ডবিধি মওকুফের সুপারিশ করিতেছ? এইজন্যই বনু ইসরাঈল ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। তাহারা দুর্বল গরীবদের বেলায় আইনের শাসন প্রয়োগ করিত, কিন্তু সবল ধনীদের রেহাই দিত” (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ১০০৩)।