📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শোকে-দুঃখে অবিচলতা

📄 শোকে-দুঃখে অবিচলতা


রাসূল কারীম (স) শোকে-দুঃখে সকল পরিস্থিতিতেই ছিলেন ধৈর্য ও অবিচলতার প্রতীক। নবুওয়াতের ১০ম বৎসরটি ছিল তাঁহার জন্য অত্যন্ত শোকার্ত বৎসর। ইতিহাসে এই বৎসরটিকে তাঁহার জীবনের "আমুল হুযন" বা শোকের বৎসর বলিয়া চিহ্নিত করা হয়। কারণ এই বৎসর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তাঁহার পরম স্নেহপরায়ণ হিতৈষী ও আশ্রয়দাতা প্রিয় পিতৃব্য আবু তালিব এবং সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী সহধর্মিণী প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা) ইন্তিকাল করেন। জীবনের প্রতিকূলতার নাযুক মুহূর্তে এই দুই প্রিয়তমকে হারানোর বেদনা ও শোক যে কত ভীষণ তাহা অনুমান করাও অসম্ভব। কিন্তু ধৈর্য ও অবিচলতার নিদর্শন রাসূল কারীম (স) জীবনের এই কঠিন মুহূর্তেও তাঁহার সত্য ও ন্যায়ের প্রয়াসকে অবিচলিত চিত্তে অব্যাহত রাখিলেন। শোক তাঁহাকে কাতর করিয়াছে সত্য; কিন্তু তাঁহার অবিচলতায় বিন্দুমাত্র দুর্বলতা আনিতে পারে নাই। তিনি পূর্ণ উদ্যমে তাঁহার অভীষ্ট লক্ষ্যে অনড় থাকিয়া তাঁহার কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন।
কাফির কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শোকের সময়টাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণে প্রয়াসী হইয়াছিল। তাহারা এই সময় তাহাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা অনেক গুণ বাড়াইয়া দিয়াছিল। তাঁহার ঘরের দরজায় কাঁটা ও আবর্জনা ফেলিয়া রাখিত। তাঁহার শরীরে অপবিত্র ও দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু নিক্ষেপ করিত। তিনি রাস্তায় বাহির হইলে দুরাচাররা তাঁহার পিছনে পিছনে হৈ চৈ করিত, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করিত, পাথর-ঢিলা ও ধূলা-বালি ছুড়িয়া মারিত। প্রতি দিনই এইরূপ লাঞ্ছনা ও নিগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে, তাঁহার পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। তিনি মক্কা ছাড়িয়া তাইফের উদ্দেশে রওয়ানা করিলেন; তথাপি সত্য ও ন্যায়ের আদর্শে বিন্দুমাত্র নমনীয় ও আপোসকামী হন নাই (ইব্‌ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৪১৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মৃত্যুর দুয়ারেও সত্যে অবিচলতা

📄 মৃত্যুর দুয়ারেও সত্যে অবিচলতা


সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম ইসলাম প্রচার হইতে রাসূল কারীম (স)-কে যখন নিরস্ত করিতে কুরায়শদের সকল প্রকার চেষ্টা ব্যর্থ হইল, তখন তাহারা তাঁহাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত করিল। কিন্তু তিনি সত্যের প্রচারে পূর্ববৎ অগ্রসর হইতেই থাকিলেন। জীবননাশের ভয়-ভীতিও তাঁহাকে অবদমিত করিতে পারিল না। অবশেষে তিনি ন্যায় ও সত্যকে সমুন্নত রাখিবার জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করিয়া মদীনায় হিজরত করেন। তবুও ন্যায় ও সত্যের উপর দৃঢ়তা ও অবিচলতায় এক চুল পরিমাণও ছাড় দেন নাই (দ্র. ৮: ৩০; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৫২)।
রাসূল কারীম (স) তাঁহার সাহাবায়ে কিরামকেও সত্য ও ন্যায়ে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাই দেখা যায়, হিজরত-পূর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মক্কার মুসলিমগণের উপরই চরম নিপীড়ন ও অত্যাচারের খড়গ পতিত হইয়াছে। তাঁহারাও সাধ্যমত সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচল থাকিবার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন। কাফিরদের নির্যাতন ও উৎপীড়নে কোন মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করিয়াছেন ইতিহাসের পাতায় এমন একটি নজীরও পাওয়া যাইবে না। ইহা কেবল পৃথিবীর বুকে ইসলামেরই ঐতিহ্য।
রাসূল কারীম (স) তাঁহার সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে সত্য ও ন্যায়ে অবিচলতার কিরূপ দীক্ষা দিয়াছিলেন তাহার একটি উদাহরণ চিন্তা করা যায় নিম্নোক্ত রিওয়ায়াত হইতে। একদিন হযরত খাব্বাব (রা) কুরায়শদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হইয়া রাসূল কারীম (স)-এর খিদমতে আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাফিরদের জন্য বদ-দু'আ করুন। এই কথা শ্রবণে তাঁহার মুখমণ্ডল রক্ত বর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, তোমাদের পূর্বে এমন লোকও অতীত হইয়াছেন যাহার মাথায় করাত রাখিয়া চিরিয়া ফেলা হইয়াছে, তথাপি তিনি নিজের কর্তব্য পালনে বিরত হন নাই। আল্লাহ তা'আলা এই কাজ (ইসলাম)-কে অবশ্যই পূর্ণ করিবেন, এমন একদিন আসিবে, একা একজন উষ্ট্রারোহী মহিলা সান'আ হইতে হাদারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণ করিবে এবং তাহার জন্য এক আল্লাহ ব্যতীত আর কাহারও ভয় থাকিবে না (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৫৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রণাঙ্গনে অবিচলতা

📄 রণাঙ্গনে অবিচলতা


সত্য ও ন্যায়ের উপর রাসূল কারীম (স)-এর দৃঢ়তা ও অবিচলতার বলিষ্ঠ উপস্থিতি আমরা দেখিতে পাই তাঁহার জীবদ্দশায় সংঘটিত সবকয়টি রণাঙ্গনে। সত্যের পথে কণ্টক দেখিয়া পশ্চাৎপদ হওয়া তাঁহার শিক্ষা ও আদর্শ বিরোধী। ভীরু হৃদয়ের মিনতি বা কাপুরুষতা তিনি পছন্দ করিতেন না। তাই প্রত্যেকটি রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন অটল ও অবিচল। উহুদের যুদ্ধে তিনি সাহাবায়ে কিরামের সহিত পরামর্শ করিলেন, মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়া যুদ্ধ করা হইবে, নাকি নগর ছাড়িয়া বাহিরে গিয়া শত্রুর মুকাবিলা করা হইবে? আলোচনা পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত হইল, মদীনা হইতে বাহির হইয়া শত্রুর মুকাবিলা করা হইবে। রাসূল কারীম (স) যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির জন্য গৃহে প্রবেশ করিলেন এবং রণসজ্জায় সজ্জিত হইয়া বাহিরে আসিলেন। এই সময় কয়েকজন সাহাবী আরয করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রস্তাব ছিল মদীনা প্রাচীরের ভিতরে থাকিয়া শত্রুর মুকাবিলা করা। যদিও আপনি আমাদের প্রস্তাবে রায় দিয়েছেন। আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। আপনার প্রস্তাবই কার্যকর হউক। আমরা মদীনার অভ্যন্তরে থাকিয়াই লড়াই করিব। রাসূল কারীম (স) বলিলেন, না তাহা হয় না। যুদ্ধের পোশাক পরিধান করার পর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে তাহা খুলিয়া ফেলা নবীর জন্য সমীচীন নহে। এখন প্রস্তুত হও এবং আল্লাহ্‌ নামে অগ্রসর হও (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ১০৯৫; ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ৬৪-৬৬)।
ঐতিহাসিক হুনায়নের যুদ্ধের ঘটনা। মুসলিম সৈন্যদের কিছুটা অপ্রস্তুত ও সঙ্কট অবস্থায় কাফিররা অতর্কিত আক্রমণ করিয়া বসিলে প্রায় বার হাজার মুসলিম সৈন্যের মধ্যে কয়েকজন ব্যতীত সকলেই দিশাহারা হইয়া দিকবিদিক পলায়ন করিতে লাগিল। এমনকি রণাঙ্গন প্রায় মুসলিম সৈন্যশূন্য হইয়া গেল। হযরত আনাস (রা) বলেনঃ
فادبروا عنه حتى بقى وحده
"তাহারা তাঁহাকে রাখিয়া পশ্চাৎপদ হইল, এমনকি তিনি একাই অবশিষ্ট রহিলেন" (সহীহুল বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২১)।
বার হাজার যোদ্ধা রণে ভঙ্গ দিয়া পশ্চাৎপদ হওয়ার পর শুধু একা সহস্র শত্রুর বিরুদ্ধে অবিচলিত চিত্তে অটল থাকিয়া যুদ্ধে রত রহিয়াছে-পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সেনাপতির কথা কোথাও আছে কি? শুধু ইহাই নহে, নবী (স) তখন নির্ভিক চিত্তে বলিলেন:
انا النبي لاكذب انا ابن عبد المطلب.
৮৯ “আমি নবী, ইহা মিথ্যা নহে। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান” (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৪০১)

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সিদ্ধান্তে অবিচলতা

📄 সিদ্ধান্তে অবিচলতা


কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থির করিবার পর উহাতে অটল ও অবিচল থাকা অত্যন্ত মহৎ গুণ। পরিস্থিতি ও পরিবেশ যতই প্রতিকূল হউক, সমালোচনা, আপত্তি, অভিযোগ যতই তীব্র হউক, সর্বাবস্থায় নিজ সিদ্ধান্তে অনড় ও অবিচল থাকিতেন রাসূলে কারীম (স)। ইহা ছিল পবিত্র কুরআনের নির্দেশের প্রতি তাঁহার পরিপূর্ণ আনুগত্য। ইরশাদ হইয়াছে:
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ المتوكلين..
“আপনি কাজ-কর্মে তাহাদের সহিত পরামর্শ করুন। অতঃপর আপনি কোন দৃঢ় সংকল্প করিলে আল্লাহ্ উপর নির্ভর করুন। আল্লাহ নির্ভরশীলদেরকে ভালবাসেন” (৩৪১৫৯)।
রাসূল কারীম (স)-এর সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল থাকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহিয়াছে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধিতে। মক্কার কুরায়শদের সহিত দীর্ঘ আলোচনার পর কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্থির হইল, তন্মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত এই ছিল: “যে সকল মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না।” এই সিদ্ধান্ত স্থির হওয়ার পর মুহূর্তেই কুরায়শ প্রতিনিধি সুহায়লের পুত্র হযরত আবু জান্দাল (রা) শৃংখল বেষ্টিত অবস্থায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাযির হইলেন। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে সুহায়ল তাঁহাকে দীর্ঘকাল যাবৎ এইভাবে চরম নিপীড়ন করিতেছিল। আবূ জান্দাল (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মদীনায় যাওয়ার অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু রাসূল কারীম (স) উভয় পক্ষের মধ্যে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তের উপর অটল ও অবিচল রহিলেন। তিনি আবু জান্দালের আবদার ফিরাইয়া দিলেন এবং তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "আমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করিতে পারি না। তুমি মক্কায় ফিরিয়া যাও। মহান আল্লাহ অচিরেই তোমাদের জন্য মুক্তির রাস্তা খুলিবেন" (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00