📄 সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম প্রচারে অবিচলতা
রাসূল কারীম (স) যখন মক্কা মুকাররামায় সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম ইসলামের দাওয়াত ও প্রচারকার্যে প্রকাশ্যে অবতীর্ণ হইলেন তখন কুরায়শ সম্প্রদায়ের কিছু লোক ব্যতীত সকলেই তাঁহার প্রতি বিদ্বেষ শুরু করিল এবং তাঁহার প্রকাশ্য বিরোধিতায় ঝাঁপাইয়া পড়িল। আবূ জাহল, আবু লাহাব, উতবা, শায়বা, আবূ সুফ্যান ছিল সত্যবিরোধীদের শীর্ষ নেতা। অপর দিকে রাসূল কারীম (স)-এর পিতৃব্য আবূ তালিব তাঁহাকে অকৃত্রিম স্নেহ করিতেন ও ভালবাসিতেন। গোটা কুরায়শ যখন তাঁহার বিরুদ্ধে ঐকমত্য পোষণ করিয়া শত্রুতা শুরু করিল তখনও আবূ তালিব তাঁহার সাহায্যে এবং রক্ষণাবেক্ষণে অটল থাকিলেন (ইবন সা'দ, তাবাকাত, ১খ., পৃ. ২০১)।
কাফির-কুরায়শরা সাধারণ জনগোষ্ঠীকে রাসূল কারীম (স) হইতে দূরে সরাইয়া রাখিবার হীন উদ্দেশ্যে তাঁহার সম্পর্কে অপমানজনক বিভিন্ন মন্তব্য করিল। তাহারা তাঁহাকে পাগল, জাদুকর, গণক, কবি ইত্যাদি বলিয়া আখ্যায়িত করিতে লাগিল (দ্র. ৫৩: ২; ৬৮ : ২; ৮২: ২২; ৭: ১৮৪; ৩৬: ৬৯; ৬৯: ৪১-৪২)। কাফিরদের এই সকল অমূলক কথাবার্তা, মিথ্যা অপবাদ ও অন্যায় সমালোচনার কোন কিছুই রাসূল কারীম (স)-কে তাঁহার সত্য ও ন্যায়ের দাওয়াতী কর্মতৎপরতা হইতে বিন্দুমাত্র ফিরাইয়া রাখিতে সক্ষম হয় নাই। আপন আদর্শ ও নীতিতে অনড় ও অটল থাকিয়া অবিচলিত চিত্তে তিনি তাঁহার দা'ওয়াত অব্যাহত রাখিয়াছেন।
অবশেষে কাফিররা তাঁহার আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক পিতৃব্য আবূ তালিবের নিকট হাযির হইল। তাহারা বলিল, "আবূ তালিব! আপনি একজন প্রবীণ ও বয়োবৃদ্ধ নেতা। আমাদের সকলের সম্মানিত ব্যক্তি। আমরা ইহার পূর্বেও আপনাকে কয়েকবার অনুরোধ করিয়াছি এবং এখন চূড়ান্ত অনুরোধ করিতেছি, আপনি আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদকে ইসলাম প্রচার হইতে বিরত রাখুন, নিষেধ করুন। অন্যথা আল্লাহর শপথ! আমরা আর ধৈর্য ধরিব না। আমরা আপনাকে পরিষ্কার বলিতেছি, হয় আপনি তাহাকে এই প্রয়াস হইতে বিরত রাখিবেন, আর না হয় সে ধ্বংস হইবে, নতুবা আমরা ধ্বংস হইব।"
পিতৃব্য আবূ তালিবের পক্ষে একদিকে যেমন আপন জাতিগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতা মানিয়া লওয়া কষ্টকর ছিল, তেমনিভাবে আপন ভ্রাতুষ্পুত্র রাসূল কারীম (স) হইতে নিজের সাহায্য ও সমর্থনের হাত গুটাইয়া লইতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। সুতরাং তিনি রাসূল কারীম (স)-কে ডাকিয়া বলিলেন, "তোমার জাতিগোষ্ঠী আমার কাছে আসিয়াছে। তাহারা এই কথা বলিতেছে। এখন তুমি আমার প্রতি একটু দয়া কর। আমার উপর এত বড় বোঝা চাপাইয়া দিও না যাহা আমি বহন করিতে পারিব না।" ইহা শ্রবণে রাসূল কারীম (স)-এর ধারণা হইল যে, পিতৃব্য আবূ তালিব সম্ভবত তাঁহার সাহায্য-সমর্থন পরিত্যাগ করিবেন অথবা শত্রুর হাতে তাঁহাকে সমর্পণ করিবেন। সত্য ও ন্যায়ের উপর অবিচলতার এই পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। তিনি পিতৃব্য আবূ তালিবকে সম্বোধন করিয়া জোরালো ভাষায় বলিলেন:
والله لو وضعت الشمس في يمينى والقمر في يساري ما تركت هذا الأمر حتى يظهره الله او اهلك فيه ما تركته .
"আল্লাহ্র শপথ! যদি তাহারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্রও তুলিয়া দেয় আর ইহা চাহে যে, আমি এই কাজ ছাড়িয়া দেই, তবুও আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এই কাজ ছাড়িব না যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে বিজয়ী করেন অথবা এই পথে আমি ধ্বংস হইয়া যাই" (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৬৮)।
রাসূল কারীম (স)-এর মুখ নিঃসৃত বাণী, অন্তরের অটল ও অবিচল সংকল্প এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখিয়া আবূ তালিব আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। তিনি অশ্রুসিক্ত, আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন:
يا ابن اخي امض على امرك وافعل ما احببت فوالله لا اسلمك لشئ ابدا .
"হে ভ্রাতুষ্পুত্র আমার! তোমার প্রয়াস চালাইয়া যাও। তোমার যাহা পছন্দ তাহা নির্বিঘ্নে করিয়া যাও। আল্লাহ্র শপথ! আমি কখনও তোমাকে শত্রুর হাতে সমর্পণ করিব না" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৪৭)।
কাফিররা দীনে হক প্রচারের কারণে রাসূল কারীম (স)-কে অবর্ণনীয় নির্যাতন করিয়াছিল। এই ক্ষেত্রে তাহারা নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছিল। স্বয়ং রাসূল কারীম (স) বলেন:
لقد أوذيت في الله وما يوذى احد وأخفت في الله وما يخاف احد .
"আল্লাহ্র রাহে সত্যের প্রচারে আমি যেইভাবে নিপীড়িত হইয়াছি, সেইরূপ আর কেহ হয় নাই এবং আমাকে যেইভাবে ভীতি প্রদর্শন করা হইয়াছে, আর কাহাকেও তদ্রূপ করা হয় নাই" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫২)।
📄 প্রলোভনের মুখে দৃঢ়তা ও অবিচলতা
সত্য ও ন্যায়ের প্রচার হইতে রাসূল কারীম (স)-কে বিরত রাখার জন্য কাফিররা সম্ভাব্য সকল পন্থাই অবলম্বন করিয়াছে। কিন্তু কোন চেষ্টাই তাহাদের সফল হয় নাই। অবশেষে তাহারা মনে করিল, ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও পার্থিব ভোগ-বিলাসের লোভ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে মানুষ এত কষ্ট-নিপীড়ন সহ্য করিতে পারে না। অতএব তাহারা কুরায়শ নেতা 'উতবাকে রাসূল কারীম (স)-এর নিকট প্রেরণ করিল। চতুর 'উতবা তাঁহার খিদমতে হাযির হইয়া বলিল, আপনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি তাহা বলুন। আপনি নেতৃত্ব চাহিলে আমরা আপনাকে সারা আরবের নেতারূপে বরণ করিতে প্রস্তুত আছি। আর যদি কোন উচ্চ বংশীয় সুন্দরী নারীর পাণি গ্রহণ করিতে চাহেন, তাহার ব্যবস্থা করিতেও আমরা প্রস্তুত। অথবা যদি আপনি বিশাল ধন-ঐশ্বর্যের অধিকারী হইতে চাহেন তবে তাহাও পরিষ্কার করিয়া বলুন। আমরা আপনার সকল দাবি ও চাহিদা পূরণে প্রস্তুত আছি, তবুও আপনাকে আমাদের ধর্মের বিপরীত প্রচারণা হইতে বিরত থাকিতে হইবে।
ভোগবাদী ও বস্তুবাদী 'উতবা ভাবিয়াছিল, আমার এই প্রলোভন মুহাম্মাদ কিছুতেই প্রত্যাখ্যান করিবে না। কারণ ধন-দৌলত, প্রভাব, নেতৃত্ব ও রমণী আসক্তি প্রত্যেক ব্যক্তিরই কাম্য। এত বড় প্রলোভন কি কেহ ছাড়িতে পারে! কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের অবিচলতার প্রতীক রাসূল কারীম (স) 'উতবার অনুরোধের উত্তরে কুরআনুল কারীমের নিম্নের আয়াতগুলি পাঠ করিলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الْهُكُمْ الهُ واحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ وَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِينَ : الَّذِينَ لَا يُؤْتُونَ الزَّكَوٰةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ كَفِرُونَ، إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّلِحَتِ لَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ قُلْ أَئِنَّكُمْ لَتَكْفُرُونَ بِالَّذِي خَلَقَ الْأَرْضَ فِي يَوْمَيْنِ وَتَجْعَلُونَ لَهُ أَنْدَادًا ذَلِكَ رَبُّ الْعُلَمِينَ.
"বল, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই। আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ একমাত্র ইলাহ্। অতএব তোমরা তাঁহারই পথ দৃঢ়ভাবে অবলম্বন কর এবং তাঁহারই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। দুর্ভোগ অংশীবাদীদের জন্য-যাহারা যাকাত প্রদান করে না এবং উহারা আখিরাতেও অবিশ্বাসী। যাহারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাহাদের জন্য রহিয়াছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার। বল, তোমরা কি তাঁহাকে অস্বীকার করিবেই যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করিয়াছেন দুই দিনে এবং তোমরা কি তাঁহার সমকক্ষ দাঁড় করাইতেছ? তিনি তো জগতসমূহের প্রতিপালক” (৪১: ৬-৯; ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৯৩-২৯৪)। তিনি আরও বলিলেন:
مابي ما تقولون ما جئتكم بما جئتكم به اطلبه اموالکم ولا اشرف فيكم ولا الملك عليكم ولكن الله بعثنى اليكم رسولا وانزل على كتابا وأمرني ان اكون لكم بشيرا ونذيرا فبلغتكم رسالة ربى ونصحت لكم فان تقبلوا منى ما جئتكم به فهو حظكم من الدنيا والآخرة وان تردوه على اصبر لامر الله حتى يحكم الله بيني وبينكم .
"তোমরা যাহা বলিয়াছ উহার সহিত আমার কোন সম্পর্ক নাই। আমি যাহা লইয়া আসিয়াছি উহার উদ্দেশ্য তোমাদের ধন-সম্পদ করায়ত্ব করা নহে এবং না তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা করা; বরং আমাকে আল্লাহ তোমাদের প্রতি নবী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছেন এবং আমার উপর কুরআন নাযিল করিয়াছেন যেন আমি তোমাদেরকে সুসংবাদ দেই এবং সতর্ক করি। তোমরা আরও শুনিয়া লও, আমি তোমাদের নিকট আমার রবের পয়গাম পৌঁছাইয়া দিয়াছি এবং তোমাদেরকে সার্বিক কল্যাণের পথ নির্দেশ করিয়াছি। এখন তোমরা যদি আমার আনীত পয়গাম গ্রহণ কর, তবে ইহাতে তোমাদেরই কল্যাণ হইবে ইহ-পরকালে। আর তোমরা যদি তাহা প্রত্যাখ্যান কর, তবে আমি অবিচলিত চিত্তে আমার প্রয়াস অব্যাহত রাখিব যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তোমাদের ও আমার মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালা করেন" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৫৬)।
📄 নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে অবিচলতা
কাফির কুরায়শরা তাহাদের সর্বাবিধ কূটকৌশল, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও নানা প্রকার প্রলোভন দ্বারা যখন কোনভাবেই রাসূল কারীম (স)-কে বশীভূত করিতে পারিল না, তাহাদের সকল চেষ্টাই তাঁহার দৃঢ়তা ও অবিচলতার কাছে পরাজিত হইল, তখন তাহারা যুলুম-নির্যাতন ও নিপীড়নের পথ অবলম্বন করিল এবং তাঁহাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও নাজেহাল করিতে লাগিল। তিনি যখন সালাত আদায় করিতেন, তাঁহার উপর উষ্ট্রের নাড়িভুঁড়ি চাপাইয়া দিত। তাঁহার সম্পর্কে ঘৃণাত্মক অপপ্রচার ছড়াইতে লাগিল। কিন্তু রাসূল কারীম (স)-এর সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নজীরবিহীন দৃঢ়তা ও অবিচলতার কারণে তাহাদের সকল প্রচেষ্টা ও সমস্ত ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হইয়া গেল। কাফির কুরায়শরা রাগে, ক্ষোভে ও ঘৃণায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল। তাহারা এইবার রাসূল কারীম (স)-কে, তাঁহার সমর্থক মুমিনদেরকে ও তাঁহার প্রতি সহানুভূতিশীল বানু হাশিম ও বানু আবদুল মুত্তালিবের আত্মীয়-স্বজনদেরকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। হিজরী ৭ম সাল হইতে ৯ম হিজরীসহ দীর্ঘ তিন বৎসর কাল তাহারা ইহাদেরকে শি'ব আবী তালিব (আবূ তালিবের গিরিসঙ্কট)-এ অবরুদ্ধ ও বয়কট করিয়া রাখে। তাহারা ইহাদের সহিত সকল প্রকার লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক আচার-আচরণ ও চলাফেরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে পানীয় ও খাদ্য সংকটের কারণে শি'ব আবী তালিবে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হইয়া তাহারা বৃক্ষ-পত্র খাইয়া জীবন নির্বাহ করেন। কিন্তু ধৈর্যের পাহাড় রাসূল কারীম (স) ইহাতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হইলেন না। সুদীর্ঘ তিন বৎসর কাল এই যুলুম-নিপীড়ন ও অবরুদ্ধ জীবন অতিবাহিত হয়। সীরাতের কিতাবসমূহে এইসব অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা ও কুরায়শদের নৃশংসতার ইতিহাস পাঠে একদিকে যেমন শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠে, অপর দিকে তেমনই রাসূল কারীম (স)-এর সত্য ও ন্যায়ে অসাধারণ ধৈর্য, অটলতা ও অবিচলতা দর্শনে অবাক হইয়া থাকিতে হয় (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ২১৬; ইব্ হিশাম, ১খ., পৃ. ৩৫০-৩৭৭)।
📄 শোকে-দুঃখে অবিচলতা
রাসূল কারীম (স) শোকে-দুঃখে সকল পরিস্থিতিতেই ছিলেন ধৈর্য ও অবিচলতার প্রতীক। নবুওয়াতের ১০ম বৎসরটি ছিল তাঁহার জন্য অত্যন্ত শোকার্ত বৎসর। ইতিহাসে এই বৎসরটিকে তাঁহার জীবনের "আমুল হুযন" বা শোকের বৎসর বলিয়া চিহ্নিত করা হয়। কারণ এই বৎসর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তাঁহার পরম স্নেহপরায়ণ হিতৈষী ও আশ্রয়দাতা প্রিয় পিতৃব্য আবু তালিব এবং সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী সহধর্মিণী প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা) ইন্তিকাল করেন। জীবনের প্রতিকূলতার নাযুক মুহূর্তে এই দুই প্রিয়তমকে হারানোর বেদনা ও শোক যে কত ভীষণ তাহা অনুমান করাও অসম্ভব। কিন্তু ধৈর্য ও অবিচলতার নিদর্শন রাসূল কারীম (স) জীবনের এই কঠিন মুহূর্তেও তাঁহার সত্য ও ন্যায়ের প্রয়াসকে অবিচলিত চিত্তে অব্যাহত রাখিলেন। শোক তাঁহাকে কাতর করিয়াছে সত্য; কিন্তু তাঁহার অবিচলতায় বিন্দুমাত্র দুর্বলতা আনিতে পারে নাই। তিনি পূর্ণ উদ্যমে তাঁহার অভীষ্ট লক্ষ্যে অনড় থাকিয়া তাঁহার কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন।
কাফির কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই শোকের সময়টাকে সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে গ্রহণে প্রয়াসী হইয়াছিল। তাহারা এই সময় তাহাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা অনেক গুণ বাড়াইয়া দিয়াছিল। তাঁহার ঘরের দরজায় কাঁটা ও আবর্জনা ফেলিয়া রাখিত। তাঁহার শরীরে অপবিত্র ও দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু নিক্ষেপ করিত। তিনি রাস্তায় বাহির হইলে দুরাচাররা তাঁহার পিছনে পিছনে হৈ চৈ করিত, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করিত, পাথর-ঢিলা ও ধূলা-বালি ছুড়িয়া মারিত। প্রতি দিনই এইরূপ লাঞ্ছনা ও নিগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে, তাঁহার পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। তিনি মক্কা ছাড়িয়া তাইফের উদ্দেশে রওয়ানা করিলেন; তথাপি সত্য ও ন্যায়ের আদর্শে বিন্দুমাত্র নমনীয় ও আপোসকামী হন নাই (ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ৪১৮)।