📄 ইয়াতীম কন্যার অধিকার
বর্বর যুগে ইয়াতীম কন্যাদের মানবাধিকার চরমভাবে হরণ করা হইত। ইয়াতীম কন্যা সুন্দরী হইলে অথবা তাহাদের কিছু ধন-সম্পদ থাকিলে অভিভাবকগণ নামমাত্র মহর উল্লেখ করিয়া তাহাদেরকে তাহাদের অসম্মতিতে জোরপূর্বক বিবাহ করিত অথবা নিজেদের সন্তান বা আত্মীয়ের সহিত বিবাহ দিত। ইহাতে তাহাদের উদ্দেশ্য হইত কেবল ইয়াতীম কন্যার সম্পদ গ্রাস করা। রাসূলে কারীম (স) ইয়াতীম কন্যাদের প্রতি এই অবিচার ও যুলুমের মূলোৎপাটন করিয়া তাহাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেন।
'আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুগে ঠিক এই ধরনের ঘটনা সংঘটিত হইয়াছিল। জনৈক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে একটি ইয়াতীম কন্যা ছিল। লোকটির একটি বাগান ছিল। উক্ত বাগানে ইয়াতীম কন্যাটিরও অংশ ছিল। লোকটি মেয়েটির বাগানের অংশ গ্রাস করার হীন উদ্দেশ্যে মেয়েটিকে যবরদস্তি বিবাহ করিল। সে মেয়েটিকে তাহার বিবাহের মহর তো প্রদান করেই নাই, বরং তাহার বাগানের অংশটিও দখল করিয়া লইল। রাসূলে কারীম (স) বিষয়টি অবগত হইয়া এই সমস্ত কূট-কৌশল নিষিদ্ধ ঘোষণা করিলেন এবং এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলার নিম্নোক্ত বিধান জারি করিলেন :
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَى فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلُثَ وَرُبَعَ .
"তোমরা যদি আশংকা কর, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করিতে পারিবে না, তবে বিবাহ করিবে নারীদের মধ্যে যাহাকে তোমাদের ভাল লাগে দুই, তিন অথবা চার" (৪:৩)।
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِي النِّسَاءِ قُلِ اللهُ يُفْتِيْكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي الْكِتٰبِ فِي يَتْمَى النِّسَاءِ الَّتِي لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُتِبَ لَهُنَّ وَتَرْغَبُونَ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الوِلْدَانِ وَأَنْ تَقُومُوا لِلْيَتَمَى بِالْقِسْطِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِهِ عَلِيمًا
"এবং লোকে তোমাকে বিধান জিজ্ঞাসা করে নারীদের বিষয়ে। বল, আল্লাহ তোমাদেরকে তাহাদের বিষয়ে ব্যবস্থা জানাইয়াছেন এবং ইয়াতীম মেয়েদের সম্পর্কে, যাহাদের প্রাপ্য তোমরা প্রদান কর না, অথচ তোমরা তাহাদেরকে বিবাহ করিতে চাও এবং অসহায় শিশুদের সম্বন্ধে এবং ইয়াতীমদের প্রতি ন্যায়বিচার সম্পর্কের যাহা কিতাবে তোমাদেরকে শুনান হয়। তোমরা যাহা কিছু সৎকর্ম কর, আল্লাহ্ তাহা সবিশেষ অবহিত" (৪: ১২৭)।
উপরিউক্ত আয়াত দুইটিতে ইয়াতীম কন্যাদের বৈবাহিক জীবনের যাবতীয় অধিকারের স্বীকৃতি এবং উহার সংরক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে।
📄 ইয়াতীম শিশুদের মানবীয় অধিকার সংরক্ষণ
রাসূলে কারীম (স)-এর দৃষ্টিতে মৌলিক মানবাধিকার তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি প্রাপ্তিতে প্রত্যেক শিশুর যে অধিকার রহিয়াছে, একজন ইয়াতীম শিশুরও সেই সকল অধিকার রহিয়াছে; বরং তাহারা পিতৃহীন অনাথ বিধায় অধিকতর যত্ন ও সহানুভূতির অধিকার রাখে। তাঁহার বক্তব্যে এই কথা বারবার উচ্চারিত হইয়াছে যে, ইয়াতীমকে লালন- পালন এবং তাহার ব্যয়ভার বহন করাই তাহার প্রাপ্ত হক আদায়ের জন্য যথেষ্ট নহে বরং তাহাদেরকে আদর-স্নেহ এবং সম্মানও করিতে হইবে। এমনকি নিজেদের সন্তানের মুকাবিলায় ইয়াতীমকে কোন অংশে হেয় প্রতিপন্ন করা যাইবে না। তাহাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে ঠিক ততটুকু তৎপর থাকিতে হইবে নিজ সন্তানের জন্য যতটুকু করা হয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلْيَخْشَ الَّذِينَ لَوْ تَرَكُوا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعْفًا خَافُوا عَلَيْهِمْ
"তাহারা যেন ভয় করে যে, অসহায় সন্তান পিছনে ছাড়িয়া গেলে তাহারাও তাহাদের সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন হইত" (৪:৯)। অর্থাৎ তোমাদের মৃত্যুর পর তোমাদের সন্তান অসহায় অবস্থায় পড়িলে তোমরা কেমন উদ্বিগ্ন হইতে, সেই কথা চিন্তা করিয়া তোমাদের তত্ত্বাবধানে পালিত ইয়াতীম শিশুদের প্রতি যত্নবান হও।
অসহায় ইয়াতীমদের লালন-পালন এবং তাহাদের সার্বিক অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্য রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অনেক বাণীতে উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন। তিনি বলেনঃ
১. "ইয়াতীমের প্রতিপালনকারী ব্যক্তি যেন সর্বদা রোযা পালনকারী রোযাদার" (আত-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৫)।
২. "যে ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্য হইতে কোন ইয়াতীমের দায়িত্বভার গ্রহণ করে এবং তাহাকে নিজের সহিত খাবার ও পানাহার করায় আল্লাহ্ তা'আলা তাহাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন। হাঁ, যদি সে ক্ষমার অযোগ্য কোন পাপ না করিয়া থাকে" (মিশকাত, ২খ., পৃ. ৪২৩)।
৩. "আমি এবং ইয়াতীমের ভরণ-পোষণকারী জান্নাতে এই দুইটি আঙ্গুলের মত একত্রে অবস্থান করিব। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মধ্যমা ও তর্জনী আঙ্গুলের প্রতি ইঙ্গিত করেন" (আল-আদাবুল মুফরাদ, ১খ., পৃ. ১৩৮)।
৪. "যদি কেহ একটি ইয়াতীম শিশুর মাথায় হাত বুলায় এবং সে উহা কেবল মহান আল্লাহ্ জন্যই করিয়া থাকে তবে তাহার হাত শিশুর মাথার যতগুলি চুলের উপর পড়িবে, উহার প্রতিটির জন্য সে রহমত লাভ করিবে। আর কেহ যদি তাহার আশ্রিত ইয়াতীম বালক-বালিকার প্রতি সদয় আচরণ করে তবে সে এবং আমি জান্নাতে হাতের দুই আঙ্গুলের অনুরূপ নিকটবর্তী হইয়া অবস্থান করিব" (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৭)।
৫. "একবার জনৈক ব্যক্তি তাহার অন্তরের কাঠিন্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তিনি লোকটিকে বলিলেন, ইয়াতীমদের মাথায় হাত বুলাও এবং গরীবদেরকে খাবার দাও” (মিশকাত, ২খ., পৃ. ৪২৫)।
৬. "মহান আল্লাহর শপথ করিয়া বলিতেছি, আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামত দিবসে ঐ ব্যক্তিকে আযাব দিবেন না যে ইয়াতীমকে দয়া করিয়াছে" (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৭)।
৭. "ইয়াতীমের ফরিয়াদ হইতে তোমরা নিজেদেরকে বাঁচাও। ইয়াতীম গভীর রাতে তাহার অসহায়ত্বের জন্য কাঁদিয়া থাকে। মানুষ তখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়" (আত্-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৭)।
৮. "আমি এবং ঐ বিধবা নারী কিয়ামত দিবসে পরস্পর অতি নিকটে অবস্থান করিব যে ইয়াতীম শিশুদের লালন-পালনে নিজেকে আবদ্ধ রাখিয়াছে, অথচ সে ছিল রূপ-সৌন্দর্যে ও মান-মর্যাদায় সম্ভ্রান্তা" (মিশকাত ২খ., পৃ. ৪২৩)।
৯. "আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খুলিব। তখন একজন নারী আমার পশ্চাত অনুসরণ করিবে। আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিব, কে তুমি? সে উত্তরে বলিবে, আমি একজন নারী। আমি আমার ইয়াতীম শিশুদের লালনের জন্য নিজেকে আবদ্ধ রাখিয়াছিলাম" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ৩খ., পৃ. ২৩৬)।
১০. "ইয়াতীমকে বঞ্চিত রাখিয়া যখন আহার করা হয়, শয়তান তখন সেখানে উপস্থিত হয়" (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৬)।
📄 ইয়াতীম শিশুদের পুনর্বাসনের স্থায়ী বন্দোবস্ত
রাসূলে কারীম (স) ইয়াতীম শিশুদের জীবন নির্বাহ এবং অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান করিবার লক্ষ্যে কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছিলেন যাহার মধ্যেমে তাহাদের সকল বিড়ম্বনার অবসান ঘটিয়াছিল এবং তাহাদের পুনর্বাসনের স্থায়ী বন্দোবস্ত হইয়াছিল। তিনি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করিবার মধ্য দিয়া এই সমস্ত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করিয়াছিলেন। তাঁহার গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচীগুলি ছিল:
১. অভিভাবকহীন ইয়াতীম শিশুর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় লালন-পালনের ব্যবস্থা করা। মদীনায় হিজরতের পর যখন তিনি মদীনার রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে বরিত হন তখন কোন সাহাবীর ইন্তিকাল হইলে তিনি সেখানে গমন করিতেন এবং জানাযার প্রাক্কালে মৃত ব্যক্তির রাখিয়া যাওয়া সন্তানের খোঁজখবর লইতেন। তিনি এই মর্মে ঘোষণা করিতেন, যে ব্যক্তি অসহায় সন্তান রাখিয়া গিয়াছে তাহাদের লালন-পালন ও তত্ত্বাবধান আমাদের উপর ন্যস্ত (মিশকাত, বুখারী, মুসলিমের বরাতে, ১খ., পৃ. ২৬৫)।
২. ইয়াতীমদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যেই আয়ের খাত ও ফাণ্ড প্রতিষ্ঠা করা। ইয়াতীমগণ যাহাতে সচ্ছল জীবন যাপন করিতে পারে সেই লক্ষ্যে তাহাদের আর্থিক সংগতি বিধানের জন্য রাসূলে কারীম (স) তাহাদের কল্যাণে কতিপয় আয়ের খাত নির্ধারণ করিয়া দেন। যথাঃ
(ক) গনীমত: যুদ্ধলব্ধ সম্পদে ইয়াতীম-অনাথদের জন্য একটি অংশ সংরক্ষিত। যথা আল-কুরআনে বিবৃত হইয়াছে: وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ اللَّهَ خُمُسَهُ وَالرَّسُولُ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ . "আরও জানিয়া রাখ যে, যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ কর তাহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্ রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, দরিদ্রদের এবং মুসাফিরদের" (৮:৪১)।
(খ) ফায়: যুদ্ধ ব্যতিরেকে অর্জিত শত্রু সম্পত্তিতে ইয়াতীমের জন্য একটি অংশ নির্ধারিত এবং সংরক্ষিত। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: مَا أَفَاءَ اللهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ "আল্লাহ্ এই জনপদবাসীদের নিকট হইতে তাঁহার রাসূলকে যাহা কিছু দিয়াছেন তাহা আল্লাহ্, তাঁহার রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের এবং ইয়াতীমদের, মিসকীনদের ও মুসাফিরদের" (৫৯:৭)।
উল্লেখিত দুইটি খাত ছাড়াও অন্যান্য খাতগুলি যথা যাকাত, ফিতরা, সাদাকা, মান্নত, কাফ্ফারা ইত্যাদি খাতগুলিতেও ইয়াতীম পিতৃহীন শিশুদের অধিকার রহিয়াছে—যদি তাহারা অভাবগ্রস্ত হয়।
৩. স্বতস্ফূর্ত দান: যে সকল খাতে আইনগত কারণে ইয়াতীম শিশুদের হক প্রাপ্তি নির্ধারিত নাই, সেই সকল ক্ষেত্রে ইয়াতীম শিশুদেরকে স্বতস্ফূর্ত দান করিবার জন্য রাসূলে কারীম (স) উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন। যথাঃ
(ক) বেহেস্তবাসীদের সদগুণাবলীর আলোচনা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বিবৃত হইয়াছে: وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مسكينًا وَّ يَتِيمًا وَأَسِيراً "আর তাহারা আহার্যের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে" (৭৬:৮)।
(খ) নিকটাত্মীয় ইয়াতীম শিশুকে আহার্য দান করার কল্যাণ ও উপকারিতাকে ধর্মের ঘাঁটিতে আশ্রয় গ্রহণ করার সহিত তুলনা করা হইয়াছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَمَا أَدْرَكَ مَا الْعَقَبَةُ ، فَكُ رَقَبَةٍ أَوْ إِطْعَمْ فِي يَوْمِ ذِي مَسْغَبَةٍ ، يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ أَوْ مِسْكِينَا ذَا مَتْرَبَةٍ . "আপনি জানেন কি ধর্মের ঘাঁটি কি? উহা হইল দাসমুক্তি, দুর্ভিক্ষের দিনে অনুদান, ইয়াতীম আত্মীয়কে, ধূলিধূসরিত মিসকীনকে" (৯০: ১২-১৬)।
আয়াতের সারমর্ম এই যে, মাটি যেমন শত্রুর আক্রমণ ও কবল হইতে রক্ষা করে, তেমনিভাবে এই সমস্ত সৎকর্ম পরকালীন আযাব হইতে রক্ষার উপায়।
(গ) আল্লাহ্ তা'আলা বনী ইসরাঈলের নিকট ইয়াতীম শিশুদের সহিত ন্যায় ও সহানুভূতির আচরণ করার অঙ্গীকার লইয়াছিলেন (দ্র. ২:৮৩)।
(ঘ) ইয়াতীমের কল্যাণে স্বতস্ফূর্তভাবে সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে আল-কুরআনে। ইরশাদ হইয়াছে: يَسْتَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتْمى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ . "তাহারা আপনার নিকট জিজ্ঞাসা করে, কি ব্যয় করিবে? বলুন, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করিবে তাহা পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যাহা কিছু তোমরা কর না কেন, আল্লাহ্ সে সম্বন্ধে অবহিত।" (২: ২১৫)।
(ঙ) ইয়াতীমকে সাহায্য-সহযোগিতা করা একটি উল্লেখযোগ্য সৎকর্ম। ইরশাদ হইয়াছে: "পূর্ব ও পশ্চিমদিকে তোমাদের মুখ ফিরানোতে কোন পূণ্য নাই, কিন্তু পুণ্য আছে কেহ আল্লাহ্, পরকাল, ফেরেস্তাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণে ঈমান আনয়ন করিলে এবং আল্লাহপ্রেমে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত মুসাফির, সাহায্য প্রার্থিগণকে এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থদান করিলে, সালাত আদায় করিলে, যাকাত প্রদান করিলে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়া তাহা রক্ষা করিলে, অর্থসংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম সংকটে ধৈর্য ধারণ করিলে। ইহারাই তাহারা, যাহারা সত্যপরায়ণ এবং ইহারাই মুত্তাকী" (২: ১৭৭)।
📄 সর্বদা ইয়াতীমের কল্যাণের প্রতি নযর রাখার নির্দেশ
ইয়াতীমের অভিভাবককে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে যে, তাহারা যেন সর্বদা ইয়াতীমের কল্যাণের প্রতি নযর রাখিয়া তাহাদের তত্ত্বাবধান করে। ইসলাম-পূর্ব যুগে ইয়াতীমের সম্পদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা হইত। এই অন্যায়ের মূলোৎপাটন করার জন্য রাসূলে কারীম (স) আল্লাহর এই বাণী শুনাইলেন: "ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাত করা দোযখের অগ্নিশিখা নিজের উদরে ভর্তি করারই নামান্তর।"
এই বাণী শুনিয়া ইয়াতীমের অভিভাবকগণ এমন ভীত সতর্ক হইলেন যে, তাহারা ইয়াতীমের খাওয়া, রান্না-বান্না সব কিছুই পৃথক করিয়া দিলেন। ইহাতে ইয়াতীম শিশুদের চরম বিড়ম্বনা দেখা দিল। অতঃপর বিষয়টির প্রতি রাসূলে কারীম (স)-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইলে তিনি আল্লাহ্ এই বাণী পড়িয়া শুনাইলেন যে, "ইয়াতীমদের সম্পদ খাওয়া নিষেধ করার উদ্দেশ্য হইল তাহাদের সম্পদ যেন নষ্ট না করা হয়। তাহাদের কল্যাণ ও মঙ্গলের প্রতি খেয়াল রাখিয়া যেন তাহা খরচ করা হয়। সুতরাং ইয়াতীমদের খাবার ও অন্যান্য ব্যয় যৌথ রাখিলে যদি তাহাদের জন্য মঙ্গল হয় তবে তাহাই করিবে। কেননা তাহারা তো তোমাদের ধর্মীয় ভাই। আর যদি তাহাদের খাবার ও অন্যান্য ব্যয় ভিন্ন রাখিলে তাহাদের মঙ্গল হয় তবে তাহাও করিতে পার। মূল বিষয় হইল ইয়াতীমের কল্যাণ ও মঙ্গল সাধন। নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা জানেন কে মঙ্গলপ্রার্থী এবং কে অনিষ্টকারী। মহান আল্লাহ্ ইচ্ছা করিলে ইয়াতীমদের বিষয়ে আরও কঠিন বিধি-বিধান আরোপ করিয়া তোমাদেরকে কষ্টে ফেলিতে পারিতেন। বস্তুত আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়" (দ্র. ২ঃ ২২০)।