📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তার গুরুত্ব

📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তার গুরুত্ব


আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا .
"তোমরা আল্লাহর ইবাদত করিবে ও কোন কিছুকে তাঁহার শরীক করিবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সংগী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের সহিত সদ্ব্যব্যবহার করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ পসন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে" (৪:৩৬)।
উক্ত আয়াতে আত্মীয়-স্বজনদের সহিত সদ্ব্যবহারের তাকীদ দেওয়া হইয়াছে এবং সদ্ব্যবহার প্রাপ্তি তাহাদের মৌলিক অধিকার বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ.
“লোকে কি ব্যয় করিবে সে সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বল, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করিবে তাহা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরদের জন্য” (২: ২১৫)।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَابْتَائِي ذِي الْقُرْبَى . “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন” (১৬ : ৯০)।
فَاتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ . “অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাহার প্রাপ্য দিও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। যাহারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে তাহাদের জন্য ইহা শ্রেয় এবং তাহারাই সফলকাম” (৩০ : ৩৮)।
উপরে উল্লিখিত কুরআনের আয়াতসমূহের সারমর্ম এই যে, আত্মীয়-স্বজনদের আর্থিক সহযোগিতা করা, তাহাদের অর্থ-সংকট ও অসচ্ছলতা দূরীকরণে আগাইয়া আসা এবং তাহাদের জন্য উদার হস্তে ব্যয় করা আত্মীয়তার সম্পর্কের অন্যতম হক।
মৃত আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে মীরাছের অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকা আত্মীয়তার অন্যতম হক। ইহাতে প্রত্যেক আত্মীয়ের শরীয়ত স্বীকৃত হক অবশ্যই প্রদান করিতে হইবে। নারী হওয়ার কারণে অথবা অন্য কোন অজুহাতে মীরাছের অধিকার হইতে কোন আত্মীয়কে বঞ্চিত রাখা যাইবে না। ইরশাদ হইয়াছে:
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَنِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدُنِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا . “পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, উহা অল্পই হউক অথবা বেশীই হউক, এক নির্ধারিত অংশ” (৪: ৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তা প্রসঙ্গ

📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তা প্রসঙ্গ


রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অসংখ্য বাণীতে আত্মীয়তা রক্ষার ফযীলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য, তাহাদের নানাবিধ অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাহাদের সহিত ঘনিষ্ঠজনের বিভিন্ন দিক ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে তুলিয়া ধরিয়াছেন।
১. হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেন :
اسرع الخير ثوابا البر والصلة و اسرع الشر عقوبة البغى وقطيعة الرحم .
"শীঘ্র প্রতিদান পাওয়ার মত পুণ্য হইল আনুগত্য ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা এবং শীঘ্রতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হইল বিদ্রোহ ও আত্মীয়-স্বজনদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ" (মুসতাদরাক হাকেম)।
২. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে ভয় কর, আত্মীয়তা রক্ষা কর। কেননা আত্মীয়তা রক্ষার ছওয়াবের চাইতে দ্রুততম ছওয়াব প্রাপ্তির আর কোন আমল নাই। তোমরা বিদ্রোহ হইতে সতর্ক থাক, কেননা বিদ্রোহের শাস্তি শীঘ্রই কার্যকর হয়। তোমরা মাতা-পিতার প্রতি অসদাচরণ হইতে সাবধান হও। জানিয়া রাখ, জান্নাতর সুঘ্রাণ হাজার বৎসরের দূরত্ব হইতেও অনুভূত হইয়া থাকে। কিন্তু উহা হইতেও বঞ্চিত থাকিবে যাহারা মাতা-পিতার সহিত অসদাচরণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, বৃদ্ধ ব্যভিচারী এবং অহংকারবশত গোড়ালীর নিচে ঝুলাইয়া কাপড় পরিধানকারী। অথচ শ্রেষ্ঠত্ব তো একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই উপযুক্ত (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২২৫)।
৩. হযরত উকবা ইব্‌ন আমের (র) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে আত্মীয়তার সম্পর্কের সুষ্ঠু লালন ও সংরক্ষণকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সমস্ত আমলের মধ্যে সর্বোত্তম আমল বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে। তিনি বলেন, একদা আমি মহানবী (স)-এর হাত ধরিয়া বলিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সর্বোত্তম আমল কি তাহা আমাকে অবহিত করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
يا عقبة صل من قطعك واعط من حرمك واعف عمن ظلمك .
“হে উকবা! যে তোমার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তাহার সহিত সম্পর্ক বহাল রাখিবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তুমি তাহাকে দান করিবে এবং যে তোমার প্রতি অবিচার করে তুমি তাহাকে মার্জনা করিবে" (মুসতাদরাক হাকেম ৪খ., পৃ. ১৬২)।
৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা যখন সমস্ত সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করিলেন, তখন রাহিম )رحم = আত্মীয়তার বন্ধন) উঠিয়া দাঁড়াইল। আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি হইয়াছে বল? সে নিবেদন করিল, আমাকে ছিন্ন করণ হইতে আপনার আশ্রয় চাহিতেছি। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সহিত যে ব্যক্তি সম্পর্ক রক্ষা করিবে আমি তাহার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখিব, আর যে ব্যক্তি তোমার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিবে, আমি তাহার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিব? রাহিম বলিল, হাঁ। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, এই হাদীছটিতে মূলত আল-কুরআনের এই আয়াতটির মর্মই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ .
"তবে কি তোমরা আধিপত্য লাভ করিলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিবে” (৪৭ঃ ২২; দ্র. বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৫)।
৫. আত্মীয়তা রক্ষার ফলে মানুষের তওবা কবুল হয়। একদা এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি মারাত্মক অপরাধ করিয়াছি। আমার কি তওবার সুযোগ আছে? মহানবী (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার মাতা জীবিত আছে কি? সাহাবী বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি খালা আছে? সাহাবী বলিলেন, হাঁ। মহানবী (স) বলিলেন, তাহার সহিত সদাচারণ কর, তাহার সেবা-যত্ন কর” (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১২)।
৬. হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (স) বলিয়াছেন:
الرحم شجنة من الله من وصلها وصله الله ومن قطعها قطعه الله .
"রাহিম (আত্মীয়তার বন্ধন) আল্লাহ্ নামেরই একটি শাখাবিশেষ। যে উহাকে রক্ষা করিবে আল্লাহ তাহাকে রক্ষা করিবেন। আর যে উহাকে ছিন্ন করিবে, আল্লাহ তাহাকে ছিন্ন করিবেন” (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৬, ৩৯)।
৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে (হাদীছে কুদসী) বলিতে শুনিয়াছি, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি আত্মীয়তার বন্ধনকে (রাহিম) সৃষ্টি করিয়াছি এবং আমার নাম রহমান হইতে উহার নাম নির্গত করিয়াছি। সুতরাং যে উহাকে রক্ষা করিবে, আমি তাহাকে রক্ষা করিব, আর যে উহাকে ছিন্ন করিবে, আমি তাহাকে আমার রহমত হইতে দূরে সরাইয়া দিব (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৫)।
৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বলেন, নবী করীম (স) মদীনায় আগমনের প্রায় সাথেসাথেই আমি তাঁহার খেদমতে হাযির হইলাম। সর্বপ্রথম আমার কর্ণে তাঁহার যে কথাটি প্রবেশ করিল, তাহা হইল:
يايها الناس افشوا السلام واطعموا الطعام وصلوا الارحام وصلوا والناس ينام فادخلوا الجنة بسلام .
"হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালামের আদান-প্রদানের প্রচলন কর, খাদ্যদান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর, রাত্রিতে তোমরা সালাত আদায় কর যখন লোকজন ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে, তাহা হইলে নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করিবে” (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১০২)।
আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অন্তরে ভালবাসা ও অনুরাগ পোষণ করা আত্মীয়তার অন্যতম হক। রাসূলে কারীম (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের প্রতি কী পরিমাণ স্নেহ ও ভালবাসা রাখিতেন তাহা নিম্নের কয়েকটি দৃষ্টান্ত হইতে অনুমান করা যায়।
১. রাসূলে কারীম (স)-এর চাচা এবং তাঁহার দুধভাই হযরত হামযা (রা) উহুদের যুদ্ধে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার শাহাদাতের সংবাদ পাইলেন। তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত ও চরমভাবে আহত। তৎক্ষণাত তিনি চাচার লাশের তালাশে বাহির হইয়া গেলেন। দীর্ঘ সময় অনুসন্ধানের পর তিনি দেখিতে পাইলেন, হযরত হামযা (রা)-এর দেহ ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। তাঁহার কর্ণ ও নাসিকা কর্তিত, পেট বিদীর্ণ। কুরায়শ রমণী হিন্দ তাঁহার কলিজা বাহির করিয়া চর্বণ করিয়াছে। চাচার লাশ দেখিয়া মহানবী (স)-এর দুই চোখ হইতে অশ্রুধারা বহিয়া গেল। তাঁহার হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল। অতিশয় ব্যথিত হইয়া মহানবী (স) বলিলেন, আহ্! তোমার মত নৃশংসভাবে আর কেহই নিহত হয় নাই। অতঃপর নিজের চাদর দ্বারা চাচার লাশ ঢাকিয়া দিলেন এবং লাশকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “তোমার উপর আল্লাহ্র রহমতের ধারা বর্ষিত হউক। তুমি ছিলে নেক কাজের প্রতি অতিশয় অনুরক্ত এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি খুবই আন্তরিক।"
উহুদ হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর শহীদদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যা এবং আত্মীয়-স্বজন আপনজনকে হারানোর বেদনায় মাতম করিতেছিলেন। তাহাদের ক্রন্দন শুনিয়া মহানবী (স)-এর হৃদয় বেদনায় ভরিয়া গেল। তিনি ব্যথিত কণ্ঠে বলিলেন, সকলের জন্য কাঁদিবার লোক আছে, কিন্তু হামযার জন্য কাঁদিবার কেহ নাই। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে মৃত ব্যক্তির জন্য মাতম করা নিষিদ্ধ হইয়া যায়।
হযরত হামযা (রা)-এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ (স) কী নিদারুণ আঘাত পাইয়াছিলেন উহার আরও কিছুটা অনুমান করা যায় মক্কা বিজয়ের পরবর্তী একটি ঘটনা হইতে। হযরত হামযাকে হত্যাকারী হাবশী গোলাম ওয়াহশী মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পর মুসলমান হয়। মহানবী (স) ওয়াহশীকে ডাকিয়া বলিলেন, "তুমি আমার সামনে আসিও না। তোমাকে দেখিলে আগার চাচা হামযার কথা মনে পড়ে, তখন আমি বিচলিত হইয়া পড়ি" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়‍্যা, ২খ., পৃ. ৯৯)।
২. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কন্যা ফাতিমার সন্তান হযরত হাসানকে চুমা দিতেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৭)। হযরত ইবন উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিয়াছি যে, তিনি আদর করিয়া বলিতেন, হাসান-হুসায়ন হইল আমার দুনিয়ার দুইটি ফুল (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮২) মহানবী (স)-এর ভৃত্য হযরত যায়দ ইব্‌ হারিছার ছেলে উসামা ইব্‌ন যায়দ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার এক রানের উপর এবং হাসানকে অপর রানের উপর বসাইতেন এবং আমাদের উভয়কে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতেনঃ হে আল্লাহ! আমি তাহাদেরকে যেই রকম স্নেহ করি, তুমিও সেই রকম স্নেহ কর (বুখারী, ৪খ., পৃ. ২২৫)। আয় আল্লাহ! এই দুইজনকে যাবতীয় অনিষ্ট হইতে রক্ষা কর। কেননা আমি তাহাদেবকে ভালবাসি (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৮)।
৩. রাসূলে কারীম (স) তাঁহার সন্তান-সন্ততিকে আদর করিয়া চুমা দিতে দিতে গলাগলি করিতেন। তাহাদের ঘ্রাণ লইতেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৬)। রাসূলুল্লাহ (স) -এর পুত্র হযরত ইবরাহীম (রা)-এর মৃত্যুর সময় তিনি ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলিলেন, ইহা কি? আপনি কাঁদিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা অন্তরের স্নেহ-মমতা। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলে আরও স্পষ্ট করিয়া বলিলেন,
ان العين تدمع والقلب يحزن ولا نقول الا ما يرضى به ربنا وانا بفراقك يا
ابراهيم لمحزونون .
"চক্ষু অবশ্যই অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিয়াছে, অন্তরও ব্যথায় পূর্ণ হইয়াছে। তবে আল্লাহ্ সন্তুষ্টিমূলক বাক্য ছাড়া অন্য কিছু আমরা বলিতে পারি না। হে ইবরাহীম! তোমার বিরহে আমরা দুঃখিত" (বুখারী, ১খ., পৃ. ১৭৪)।
৪. একবার মহানবী (স) যয়নব (রা)-এর শিশু কন্যার অসুস্থতার সংবাদ শুনিয়া তাঁহার বাড়ীতে গমন করিলেন। তাঁহার সাথে কতিপয় সাহাবীও গেলেন। তিনি দেখিলেন, শিশু কন্যাটি মরণাপন্ন। রাসূলুল্লাহ (স) শিশুটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন। শিশুটির তখন মুমূর্ষু অবস্থা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত চলিতেছিল। মহানবী (স)-এর দুই চোখ জুড়িয়া অশ্রু বহিতে শুরু করিল। হযরত সা'দ (রা) তাঁহার খেদমতে আরয করিলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদিতেছেন? তিনি বলিলেন, ইহা রহমত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার যে বান্দার দিলে বর্ষণ করিতে চাহেন, অকাতরে বর্ষণ করেন। আসলে আল্লাহ তাঁহার সদয় ও মমতাশীল বান্দাদের অন্তরেই ইহা বর্ষণ করিয়া থাকেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ১৭১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নব অষ্টম হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তিনি স্বয়ং তাঁহার কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করিলেন। তাঁহার লাশ যখন কবরের পার্শ্বে দাফনের জন্য রাখা হইল তখন মহানবী (স)-এর দুই নয়ন অশ্রুতে প্লাবিত হইয়া গেল (সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ৫৪৬)।
৫. রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাতো ভাই হযরত জা'ফার (রা) এবং পালক পুত্র হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা) তাঁহার বিশেষ প্রিয় ও ভালবাসার পাত্র ছিলেন। মৃতার যুদ্ধে তাঁহারা উভয়ে শহীদ হন। তাঁহাদের শাহাদাতের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তাঁহার দুই নয়ন অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১১)।
৬. রাসূলে কারীম (সা) তাঁহার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অত্যন্ত সদাচারী ও ভালবাসাপ্রবণ ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তাঁহার এই ঘনিষ্ঠতা ও ভালবাসা কত যে গভীর ও সুবিদিত ছিল উহার বিবরণ পাওয়া যায় হযরত খাদীজা (রা)-এর সেই সান্ত্বনা বাক্যে যাহা তিনি ওহীর সূচনা ক্ষণে ভীতসন্ত্রস্ত স্বামী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে বলিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, আপনার এইরূপ ভয়ের কোন কারণ নাই। কেননা:
انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم و تقرى الضيف وتعيين على نوائب الحق .
"কেননা আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সহিত সদাচরণ করিয়া থাকেন, পরের দুঃখভার বহন করিয়া থাকেন, আপনি দুঃস্থজনের সেবা করিয়া থাকেন, আপনি অতিথি আপ্যায়ন করিয়া থাকেন, আপনি নিঃস্ব-অসহায় ও বিপন্নদের সাহায্য করিয়া থাকেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ২)।
রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিও অত্যন্ত সদাচারী ছিলেন। তাঁহার আদর্শ মোতাবেক মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজন যদি অমুসলিমও হয়, তথাপি তাহাদের সহিত আত্মীয়তাসুলভ ঘনিষ্ঠ আচরণ করিতে হইবে, সাধ্যমত তাহাদের সেবা-যত্ন করিতে হইবে, তাহাদের পার্থিব হকসমূহ আদায়ে সচেষ্ট থাকিতে হইবে। হাঁ, দীনের বিপক্ষে তাহাদের কোন কামনা-বাসনা পূরণ করা যাইবে না।
হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা) বলেন, আমি রাসূলে কারীম (স)-কে আস্তে নহে বরং আওয়াজ করিয়া বলিতে শুনিয়াছি, অমুক বংশের লোকদের সহিত আমার কোন বন্ধুত্ব নাই। আমার বন্ধু তো হইতেছেন মহান আল্লাহ এবং নেককার মু'মিনগণ। হ্যাঁ, তাহাদের সহিত আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রহিয়াছে। আমি তাহাদের সহিত আত্মীয়তার সম্ভাব রক্ষা করিয়া যাইব (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৬)। হযরত আসমা বিনতে আবূ বকর (রা) বলেন, নবী কারীম (স)-এর যমানায় আমার অমুসলিম মাতা আমার নিকট আসিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, আমি কি তাহার সহিত রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ন্যায় সদাচরণ করিতে পারিব? তিনি বলিলেন, হাঁ। হযরত ইবন 'উয়ায়না (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাহারই সম্বন্ধে এই আয়াতটি নাযিল করেন:
لَا يَنْهُكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ .
"আল্লাহ তোমাদেরকে এমন লোকদের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে এবং ন্যায়ানুগ আচরণ করিতে নিষেধ করেন নাই যাহারা তোমাদের বিরুদ্ধে দীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করে নাই এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হইতে বহিষ্কার করে নাই। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন" (৬০:৮-৯; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৩১৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের সহিত রাসূলূল্লাহ (স)-এর সদ্ব্যবহার ও ভদ্রোচিত আচরণের কিছু দৃষ্টান্ত

📄 অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের সহিত রাসূলূল্লাহ (স)-এর সদ্ব্যবহার ও ভদ্রোচিত আচরণের কিছু দৃষ্টান্ত


১. রাসূলে কারীম (স) তাঁহার শৈশবে মাতৃদুগ্ধ পানকালে ছুওয়ায়বা নাম্নী এক মহিলার দুধ পান করিয়াছিলেন। উক্ত মহিলা ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আবু লাহাবের দাসী। এই ছুওয়ায়বা মুসলমান হন নাই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) আজীবন তাহার প্রতি দুগ্ধপানজনিত আত্মীয়তার সম্মান প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। তিনি প্রায়ই তাহার নিকট বস্ত্রাদি ও অন্যান্য সামগ্রী উপঢৌকন হিসাবে প্রেরণ করিতেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৭৬৪; আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৬; ইব্‌ন সা'দ, ১খ., পৃ. ৬৭)।
২. আওতাসের যুদ্ধে মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়ার গোত্র বানূ সা'দের বজাদ নামক এক ব্যক্তিকে স্বপরিবারে বন্দী করিল। বন্দী পরিবারের এক বৃদ্ধা বলিল, আমি তোমাদের পয়গাম্বরের ভগিনী। তোমরা আমাকে বন্দী করিতেছ কেন? বৃদ্ধার এই বক্তব্য শুনিয়া মুসলমানগণ তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির করিলেন। বৃদ্ধা স্বীয় পিঠ খুলিয়া একটি দাগ দেখাইয়া বলিল, এই যে দেখুন! আপনি শৈশবে আমার পিঠে কামড় দিয়াছিলেন। আমি আপনার ভগিনী, হালিমার কন্যা শায়মা। মহানবী (স) দেখিলেন, শৈশবে তিনি যাহার কোলে চড়িয়া বেড়াইতেন, এই বৃদ্ধা সত্য সত্যই সেই শায়মা। শ্রদ্ধেয়া দুধ-ভগ্নির পরিচয় পাইয়া মমতাবশে তাঁহার নয়ন যুগল হইতে অশ্রুধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। তিনি তৎক্ষণাত বসিবার জন্য তাঁহার চাদর বিছাইয়া দিলেন। অতঃপর তাঁহাকে উপঢৌকনস্বরূপ কয়েকটি উট ও দাস-দাসী প্রদান করিলেন এবং বলিলেন, আপনি ইচ্ছা করিলে আমার বাড়িতে চলুন। আমি সসম্মানে আপনার খেদমত করিব। আর যদি আপনি নিজ বাড়িতে যাইতে চাহেন তবে আমি আপনাকে সেখানেই পৌঁছাইয়া দিব। তিনি নিজ বাড়িতে ফিরিয়া যাওয়ার মত প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাঁহাকে অতি সম্মানের সহিত তাঁহার নিজ বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিলেন (ইব্‌ন কাছীর, ৩খ., পৃ. ৬৮৯)।
৩. রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমাতা হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা)-এর গোত্র বানু সা'দ বস্তুত আরবের ঐতিহাসিক হাওয়াযিন সম্পদ্রায়ের একটি শাখা। হাওয়াযিনের যুদ্ধে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ছয় হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। যথারীতি বন্দীদেরকে মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেওয়া হইল। ইহার প্রায় দুই সপ্তাহ পর যুহায়র ইব্‌ন সুরাদের নেতৃত্বে সা'দ গোত্রের বারজন লোকের একটি প্রতিনিধি দল মহানবী (স)-এর খিদমতে আসিয়া উপস্থিত হইল। প্রতিনিধি দলটিতে তাঁহার দুধচাচা আবূ বরকানও ছিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে সকল বন্দীর মুক্তি দাবি করিল। দলপতি যুহায়র বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হাওয়াযিন গোত্র আজ মহাবিপদে আছে। আপনি আমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন। দয়া করিয়া আমাদের ধন-সম্পদ ও স্ত্রী-কন্যাদেরকে আমাদের নিকট ফেরত দিন। এই বন্দীদের মধ্যে আপনার ফুফু, খালা এবং এমন অনেক মহিলাও আছেন যাহারা শৈশবে আপনাকে কোলে লইয়া আদর চুম্বন করিয়াছেন। আত্মীয়তার এই পরিচয় শুনিয়া রাসূলে কারীম (স)-এর মন বিগলিত হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, 'দেখ, গনীমত কেবল আমার নহে, ইহা মুজাহিদদের প্রাপ্য। তবে যে সমস্ত বন্দী আমার ও আমার বংশ বানু আবদুল মুত্তালিব-এর প্রাপ্য, তাহাদেরকে আমি মুক্তি দিলাম। আর অবশিষ্ট বন্দীদের মুক্তির জন্য আমি মুসলমানদের নিকট সুপারিশ করিব।'
যুহরের নামাযের সময় মহানবী (স) সাহাবীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, মুসলিমগণ! আমার ও আমার বংশ বানু আবদুল মুত্তালিবের সকল বন্দীকে আমি মুক্ত করিয়া দিলাম। আর সকল মুসলমানের নিকট আমি তাহাদের প্রাপ্য নিজ নিজ বন্দীদেরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করিতেছি। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ঘোষণা শুনিয়া সকল আনসার ও মুহাজির একবাক্যে তাহাদের প্রাপ্ত সকল বন্দীকে মুক্তির ঘোষণা দিলেন। মহানবী (স) তাঁহাদের এই কুরবানীর জন্য খুশী হইয়া ঘোষণা করিলেন, "ইহার পর যখনই কোন যুদ্ধ-বন্দী আমার হাতে আসিবে, আমি সর্বপ্রথম তোমাদেরকে একটির বিনিময়ে চারটি বন্দী দান করিব। আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে রাসূলে কারীম (স) তাহাদের ছয় হাজার বন্দীকে মুক্তি দিয়াছিলেন। অথচ তাহারা ছিল অমুসলিম এবং তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহত্ত্ব ও উদারতা প্রত্যক্ষ করিয়া প্রতিনিধি দলের সকলেই মুসলমান হইয়া গেলেন (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ৪৮৯; যাদুল-মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৪৭৫)
৪. বনূ মুস্তালিকের সহিত কুরায়শদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে রাসূলে কারীম (স)-এর সহিতও তাহাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। পঞ্চম হিজরীতে কুরায়শদের প্ররোচনায় বানু মুস্তালিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মহানবী (স) এই সংবাদ অবগত হইয়া তাহাদের প্রতিরোধের জন্য একদল সৈন্যসহ বানু মুস্তালিকের আবাসিক এলাকা অভিমুখে যাত্রা করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হইল। প্রায় ছয় শত নারী, শিশু ও পুরুষ মুসলমানদের নিকট বন্দী হইল। যুদ্ধের পর মদীনায় ফিরিয়া বন্দীদেরকে যথারীতি মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেওয়া হইল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর কোমল হৃদয় আত্মীয়-গোত্রকে দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ দেখিয়া অত্যন্ত ব্যথিত হইয়া উঠিল। বন্দীদের মধ্যে মুস্তালিক গোত্রের সর্দার হারিছের কন্যা বাররাও ছিলেন। তিনি হযরত ছাবিত ইব্‌ন কায়সের ভাগে পড়িলে মহানবী (স) ছাবিতের নিকট হইতে তাহাকে চড়ামূল্যে ক্রয় করিয়া আযাদ করিয়া দিলেন। বাররা ইসলাম গ্রহণ করিলেন। তিনি তাঁহার নাম পরিবর্তন করিয়া জুওয়ায়রিয়া রাখিলেন এবং তাঁহাকে বিবাহ করিলেন। মদীনায় যখন প্রচারিত হইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) হারিছের কন্যা জুওয়ায়রিয়াকে বিবাহ করিয়াছেন, তখন মুসলমানগণ পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিলেন, এখন তো জুওয়ায়রিয়া উম্মুল মু'মিনীন-এর অন্তর্ভুক্ত হইয়াছেন। ফলে মুস্তালিক গোত্র হইল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শ্বশুরকুল। কাজেই তাহাদেরকে গোলাম-বাঁদী বানাইয়া রাখা আমাদের জন্য কিছুতেই শোভা পায় না। এই আলোচনার পর কালবিলম্ব না করিয়া মুসলমানগণ মুস্তালিক গোত্রের সকল বন্দীকে মুক্ত করিয়া দিলেন, গোত্রের আটককৃত সমস্ত সম্পদ ফেরত দিলেন এবং তাহাদেরকে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করিলেন। বন্দীগণ মুসলমানদের আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রতি এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়া অভিভূত হইল এবং সকলেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিল (ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৯-২৯০)
৫. বদরের যুদ্ধে যে সমস্ত কাফির ও মুশরিক মুসলমানদের হাতে বন্দী হইয়াছিল তাহাদের অধিকাংশই মহানবীর নিজ বংশীয় আত্মীয়-স্বজন অথবা কোন না কোন মুহাজির সাহাবীর ঘনিষ্ঠ ছিল। রাসূলে কারীম (স) মদীনায় পৌছিয়া বন্দীদেরকে সেবাযত্ন করিবার জন্য সাহাবায়ে কিরামের মাঝে বণ্টন করিয়া দিলেন এবং যত্নের সহিত তাহাদের মেহমানদারী করিতে আদেশ দিলেন। মদীনায় তখন অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজমান ছিল। তথাপি সাহাবীগণ তাহাদের পরম শত্রু আত্মীয়-স্বজনের প্রতি যেই সদাচার ও আদর্শ ব্যবহার দেখাইলেন ইতিহাসে উহার নজীর বিরল। হযরত মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর ভাই আবূ আযীয বলেন, আমি যেই সাহাবীর গৃহে বন্দী ছিলাম তাহারা সকাল-বিকাল আহারের জন্য আমাকে রুটি দিতেন আর তাঁহারা শুধু খেজুর খাইয়া থাকিতেন। আমি লজ্জিত হইয়া অনেক সময় খেজুর খাওয়ার চেষ্টা করিতাম। কিন্তু তাঁহারা রুটি গ্রহণ করিতেন না বরং আমাকেই রুটি খাইতে বাধ্য করিতেন (ইব্‌ন কাছীর, আসা-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৪৭৫)।
৬. বদরের বন্দীদের মধ্যে হযরত যয়নব (রা)-র স্বামী আবুল আসও ছিল। সে তখনও মুশরিক ছিল। বন্দীদের ব্যাপারে সকলের পরামর্শে রাসূলে কারীম (স) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদেরকে মুক্ত করা হইবে। কিন্তু আবুল-আসের মুক্তিপণ আদায়ের সামর্থ ছিল না। অগত্যা তাহার স্ত্রী হযরত যয়নব (রা) তাহাকে মুক্ত করার জন্য নিজের গলার হার রাসূলে কারীম (স)-এর দরবারে পাঠাইয়া দিলেন। এই হারটি তাঁহার বিবাহের সময় হযরত খাদীজা (রা) তাঁহাকে উপহার দিয়া ছিলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা)-এর স্মৃতি বিজড়িত হারখানার উপর দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবী করীম (স)-এর পবিত্র নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। তিনি আর্দ্রকণ্ঠে সাহাবীগণকে বলিলেন, তোমরা যদি সকলে সম্মত হও তবে যয়নবের এই হারখানা যয়নবকে ফেরত দিতে পার এবং দরিদ্র আবুল আসকে বিনা মুক্তিপণে মুক্ত করিয়া দিতে পার। সাহাবীগণ (রা) সকলেই ইহাতে একমত হইলেন (ইব্‌ন হিশাম, আসা-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৬৫১)।
৭. বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাসূলে কারীম (স)-এর চাচা হযরত আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব। তিনি তখনও মুশরিক ছিলেন। যখন তাঁহাকে বন্দী করিয়া আনা হইল তখন হইতেই তাঁহার মমতায় রাসূল কারীম (স)-এর মন অস্থির হইয়া উঠিল। একদিন রাত্রিকালে আব্বাস তাঁহার আঁটানো বাঁধনের যন্ত্রণায় কাতরাইতেছিলেন। তাঁহার এই অবস্থা উপলব্ধি করিতে পরিয়া রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিদ্রা আসিতেছিল না। তিনিও অস্থির হইয়া অপেক্ষাকৃত অধিক ছটফট করিতেছিলেন। তাঁহার এই অবস্থা দেখিয়া জনৈক সাহাবী আব্বাসের বাঁধন ঢিলা করিয়া দিলেন। যেহেতু আত্মীয়তার কারণে সম-অপরাধীদের শান্তি কমাইয়া দেওয়া ইসলামের বিধান বহির্ভূত, এইজন্য মহানবী (স) বলিলেন, তোমরা সকল বন্দীর বাঁধনই ঢিলা করিয়া দাও (সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ৩৩৩)।
৮. রাসূলে কারীম (স) ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ না করিয়া সকল আত্মীয়-স্বজনের সহিত সদ্ব্যবহার ও ঘনিষ্ঠ আচরণ করিতেন এবং তাঁহার অনুসারীদেরকে ইহার নির্দেশ প্রদান করিতেন। তাঁহার এই সময়ে অন্যতম শত্রু কুরায়শ সরদার আবূ সুফ্যানের মুখে ইহার স্বীকৃতি পাওয়া যায়। ৭ম হিজরীতে তিনি রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াস-এর দরবারে বক্তৃতা করেন। পারস্য-সম্রাট তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, মুহাম্মাদ তোমাদেরকে কি শিক্ষা দেন? আবূ সুফয়ান বলিলেন, তিনি আমাদের শিক্ষা দেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নাই। কাহাকেও তাঁহার সমকক্ষ মনে করিও না। তোমরা নামায পড়, সত্য কথা বল, চরিত্রবান হও এবং সদ্ব্যবহার দ্বারা আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখ (বুখারী, ১খ., পৃ. ৪)।
আত্মীয়-স্বজন যদি অন্যায়-অবিচার এবং যুলুমও করে, তথাপি তাহাদের সহিত রাসূলে কারীম (স) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ভদ্রোচিত আচরণ করিতেন। তিনি বলিতেন:
ليس الواصل بالمكافى ولكن الواصل الذي اذا قطعت رحمه وصلها .
"প্রতিদানে আত্মীয়ের সহিত ঘনিষ্ঠ আচরণকারী প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নহে; বরং প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী হইতেছে ঐ ব্যক্তি যাহাকে ছিন্ন করিয়া দিলেও এবং দূরে ঠেলিয়া দিলেও সে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে" (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৬)।
হযরত উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) বলেন, একদা মহানবী (স) আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে উবাদা! আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় বলিয়া দিব কি যাহা তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করিবে? আমি বলিলাম, অবশ্যই হে আল্লাহ্র রাসূল। তিনি বলিলেন, যে তোমার সহিত অসদাচরণ করিবে, তুমি তাহার প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করিবে। যে তোমার প্রতি অবিচার করিবে, তুমি তাহাকে মার্জনা করিবে। যে তোমাকে বঞ্চিত করিবে, তুমি তাহাকে দান করিবে (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন তাঁহাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া তাঁহাদের হাতে বন্দী হইত, তাহাদেরকে মুক্ত করিয়া দেওয়ার জন্য মহানবী (স) সাহাবাগণকে উদ্বুদ্ধ করিতেন।
হযরত আনাস (রা) বলেন, মদীনায় আনসারদের মধ্যে খেজুর সম্পদে সর্বাপেক্ষা ধনী ছিলেন হযরত আবূ তালহা (রা)। মসজিদে নববী সংলগ্ন বিপরীত দিকে তাঁহার 'বিরে হা' নামক একটি বাগান ছিল। বাগানে একটি মিঠা পানির কূপও ছিল। বাগানটি ছিল হযরত আবূ তালহার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। মহানবী (সা) কখনও কখনও বাগানে যাইতেন এবং এখানকার মিঠা পানি পান করিতেন। যখন কুরআন শরীফে আয়াত নাযিল হইল: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ .
"কস্মিন কালেও তোমরা কল্যাণ লাভ করিতে পারিবে না যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু হইতে ব্যয় না কর" (৩:৯২) তখন এই আয়াত শুনিয়া হযরত আবূ তালহা মহানবী (সা)-এর খেদমতে হাযির হইয়া নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা বলিয়াছেন প্রিয় বস্তু দান করিতে। 'বিরে হা' বাগানটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। কাজেই আমি উহা আল্লাহর পথে সাদাকা করিতে চাই। অতএব আপনি আমার এই বাগান গ্রহণ করুন এবং আপনার যেইভাবে খুশী খরচ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: ইহা তো তোমার বড় লাভজনক সম্পদ। তুমি যাহা করিয়াছ তাহা আমি শুনিয়াছি। আমার পরামর্শ এই যে, তুমি উহা তোমার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দাও। আবু তালহা বলিলেন, আপনি যাহা বলিয়াছেন আমি তাহাই করিব। অতঃপর তিনি বাগানটি তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও চাচাতো ভাইদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৫৪)।
একবার উম্মুল মু'মিনীন হযরত মায়মূনা (রা) তাঁহার একটি বাঁদীকে মুক্ত করিয়া দিলেন। পরে নবী কারীম (স)-এর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি বলিলেন, তুমি যদি বাঁদীটি তোমার মামাকে দিয়া দিতে তাহা হইলে অধিক পুণ্য লাভ করিতে পারিতে (মিশকাত, পৃ. ১৭১)।
এই হাদীছে লক্ষণীয় যে, ইসলামে দাস-দাসী আযাদ করার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ প্রদান করা হইয়াছে এবং ইহাকে অতীব পুণ্যের কাজ বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজনকে উপহার-উপঢৌকন প্রদানকে উহার চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক নেকীর কাজ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। ইহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আত্মীয়তা সম্পর্ক সুদৃঢ় করার কত যে গুরুত্ব ছিল উহা স্পষ্ট বুঝা যায়।
রাসূলে কারীম (স) আত্মীয়-স্বজনের সহিত আর্থিক সহযোগিতাকে সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠতম অনুদান বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, চারটি দীনারের একটি তুমি কোন নিঃস্বকে দান করিয়াছ, একটি দ্বারা গোলাম আযাদ করিয়াছ, একটি আল্লাহর পথে তথা জিহাদে দান করিয়াছ এবং একটি তুমি তোমার আপনজনদের জন্য খরচ করিয়াছ। তন্মধ্যে যেই দীনারটি তুমি তোমার আপনজনদের জন্য খরচ করিয়াছ উহাই সর্বোত্তম (মুসলিম, ১খ., পৃ. ৩২২)। হযরত ছাওবান (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সর্বোত্তম দীনার হইতেছে উহা যাহা কোন ব্যক্তি তাহার আপনজনদের জন্য ব্যয় করিয়া থাকে (মুসলিম, ১খ., পৃ. ৩২২)।
আর্থিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত নিকটাত্মীয় দূরাত্মীয়ের চেয়ে অগ্রাধিকার পাইবে। হযরত ইবন উমার (রা) বলেন, কোন ব্যক্তি যাহা তাহার নিজের জন্য ও নিজ পরিবার- পরিজনের জন্য পুণ্য লাভের আশায় ব্যয় করিবে, সে তাহার প্রতিটি দানের জন্যই আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাইবে। সে তাহার পরিবারবর্গ হইতে ব্যয় করা আরম্ভ করিবে, অতঃপর অবশিষ্ট থাকিলে পরবর্তী ঘনিষ্ঠজনকে প্রদান করিবে, তৎপর অবশিষ্ট থাকিলে হস্ত আরও সম্প্রসারিত করিবে (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৮)।
রাসূলে কারীম (স) মাঝে মাঝে তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের সহিত সৌজন্য- মূলক সাক্ষাত করিতেন। হযরত আনাস (রা) বলেন, নবী কারীম (স) ছিলেন তাঁহার পরিবার ও আপনজনের প্রতি সর্বাধিক দয়া ও ভালবাসাপ্রবণ। তাঁহার এক পুত্র হযরত ইবরাহীম মদীনার এক প্রান্তে এমন এক মহিলার দুগ্ধপোষ্য ছিলেন যাহার স্বামী ছিল কর্মকার। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে প্রায়ই সেখানে যাইতাম। সেই মহিলার ঘরটি ধোঁয়া দ্বারা সব সময় পূর্ণ থাকিত। মহানবী (স) তাঁহার পুত্রকে চুম্বন করিতেন, নাক লাগাইয়া আদর করিতেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১৩৭)।
রাসূলে কারীম (সা)-এর নয়জন স্ত্রী একই সময়ে জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁহাদের মধ্যে দিন ভাগ করিয়া দিয়াছিলেন। তথাপি তিনি প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁহাদের সকলের সহিত সৌজন্য সাক্ষাতের উদ্দেশে তাঁহাদের সকলের বাসগৃহে পৃথক পৃথকভাবে গমন করিতেন। তিনি এই সৌজন্য সাক্ষাতে প্রত্যেকের নিকট কিছু সময় অবস্থান করিতেন এবং তাঁহাদের খোঁজ-খবর লইতেন (আবূ দাউদ, পৃ. ২৯০)।
রাসূলে কারীম (স) তাঁহার সাহাবীগণকেও তাঁহাদের নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনের সহিত সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হইবার জন্য একাধিক হাদীছে উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন। তিনি সাহাবী হযরত আবূ রূযায়ন (রা)-কে বলেন, হে আবূ রূযায়ন। তুমি জান কি, যখন কোন ব্যক্তি তাহার ভাইয়ের সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশে ঘর হইতে বাহির হয় তখন সত্তরজন ফেরেশতা তাহাকে অভ্যর্থনা প্রদান করেন এবং তাহার জন্য দু'আ করেন? ফেরেশতাগণ বলেন, হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দা তোমার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখিতেছে, তুমিও তাহার সহিত তোমার সম্পর্ক অটুট রাখ। হে আবূ রূযায়ন! তুমি নিজেকে এই আমলের উপর যথাসম্ভব বহাল রাখ (মিশকাত, পৃ. ৪২৭)।
অপর একটি হাদীছে মহানবী (স) ইরশাদ করেন: এক ব্যক্তি তাহার এক ভাইয়ের সহিত সাক্ষাত করার উদ্দেশে গ্রামে গেল। আল্লাহ তা'আলা তাহার পথে একজন ফেরেশতা মোতায়েন করিলেন। ফেরেশতা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কোথায় যাইতেছেন? সেই ব্যক্তি বলিল, ঐ গ্রামে আমার একজন ভাই আছেন, তাহার সহিত সাক্ষাতের উদ্দেশে যাইতেছি। ফেরেশতা বলিলেন: আপনার উপর তাহার কি এমন কোন অবদান আছে যাহার জন্য আপনি যাইতেছেন? সেই ব্যক্তি বলিল, না, আমি তাহাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসি। ফেরেশতা তখন স্বীয় পরিচয় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, আমি আল্লাহর পক্ষ হইতে আপনার নিকট প্রেরিত হইয়াছি। আল্লাহ আপনাকে সুসংবাদ দিতেছেন যে, তিনি আপনাকে ঠিক সেইরূপ ভালবানিবেন যেইরূপ আপনি ঐ ব্যক্তিকে ভালবাসিয়াছেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১২৮)।
অপর একটি হাদীছে আসিয়াছে, আল্লাহ তা'আলা সাক্ষাৎকারীকে সম্বোধন করিয়া বলেন, তুমি তোমার স্থান জান্নাতে নির্ধারণ করিয়া লইয়াছ (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১২৬-১২৭)।
সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে একটি হইল, কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহাকে দেখিতে যাওয়া। রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অসুস্থ আত্মীয়-স্বজনকে দেখিতে যাইতেন। একবার তাঁহার এক কন্যার মুমূর্ষু অবস্থার সংবাদ শুনিয়া তিনি বেশ কয়েকজন সাহাবীসহ কন্যার বাড়িতে গমন করেন। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত সা'দ ইবন উবাদা (রা)-ও তাঁহার সাথে ছিলেন। মহানবী (স) মুমূর্ষু শিশুটিকে তুলিয়া কোলে নেন। তাহার বুকে তখন পুরাতন মশকের আওয়াযের মত ধুক ধুক আওয়ায হইতেছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর চক্ষু যুগল অশ্রু সজল হইয়া উঠিল। হযরত সা'দ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহা কি? আল্লাহর রাসূল হইয়াও আপনি কাঁদিতেছেন? তিনি বলিলেন, আমি তাহার প্রতি মমতাপরবশ হইয়া কাঁদিতেছি। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের মধ্যে দয়ার্দ্র হৃদয়ের অধিকারীদের প্রতি দয়া করেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১৭৮-১৭৯)।
মহানবী (স)-এর নিকট কোন আত্মীয়ের অসুস্থতার সংবাদ পৌছিলে তাহার খোঁজ-খবর লওয়ার জন্য মাঝে মাঝে পরিবারস্থ আপনজনদেরকেও পাঠাইতেন। হযরত 'আইশা (রা) বলেন, তাঁহার মদীনায় আগমনের পর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক ও হযরত বেলাল (রা)-এর জ্বর হইল। আমি তাঁহার নির্দেশে তাঁহাদের খোঁজ-খবর লইবার জন্য তাঁহাদের বাড়িতে গমন করিলাম এবং তাঁহাদের অসুস্থতার খোঁজ-খবর লইয়া ফিরিয়া আসিলাম এবং তাঁহাকে অবহিত করিলাম (আল-আদাবুল মুফরাদ, সংক্ষেপিত, পৃ. ১৮৪)।
রাসূলে কারীম (স) অসুস্থ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের খোঁজ-খবর রাখিবার জন্য সর্বদা সাহাবায়ে কিরামকে তাকীদ করিতেন। তিনি ইরশাদ করেন, এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক রহিয়াছে। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাহা কি হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বলিলেন, তাহা হইল-(১) যখন তুমি কোন মুসলমানের সাক্ষাত পাও তখন তাহাকে সালাম কর; (২) যখন কোন মুসলমান তোমাকে ডাকে তখন তুমি তাহার ডাকে সাড়া দাও; (৩) যখন সে তোমার নিকট পরামর্শ চাহে তখন তাহাকে সুপরামর্শ দিবে, (৪) যখন সে হাঁচি দেয় এবং আলহামদু লিল্লাহ বলে তখন তুমি 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বল; (৫) যখন সে অসুস্থ হইয়া পড়ে তখন তুমি তাহার খোঁজ-খবর লও এবং (৬) যখন তাহার মৃত্যু হয় তখন তাহার জানাযায় শরীক হও (সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ২১০)।
আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে, তাহাদের সাক্ষাতে ভালবাসা ও আনন্দ প্রকাশ করা এবং তাহাদেরকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানানো আত্মীয়তার হকসমূহের অন্যতম। রাসূলে কারীম (সা) তাঁহার আপনজনদের আগমনে অত্যন্ত আনন্দিত হইতেন এবং তাহাদেরকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভ্যর্থনা জানাইতেন। তাঁহার মুবারক জীবনে ইহার অগণিত দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। যেমন-
১. হযরত 'আইশা (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) হাঁটিতে হাঁটিতে তাঁহার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার হাঁটার পদ্ধতি ছিল মহানবী (স)-এর হাঁটার অনুরূপ। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন, মারহাবা, মারহাবা, কন্যা আমার! অতঃপর তাঁহাকে স্বীয় ডান পার্শ্বে অথবা বাম পার্শ্বে বসাইলেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৪৫)।
২. হযরত হালীমা সা'দিয়া (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমাতা। তিনি তাঁহাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন এবং প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর হযরত হালীমা একবার মক্কা শরীফে তাঁহার নিকটে আগমন করিলেন। তখন তিনি তাঁহাকে আম্মাজান বলিয়া জড়াইয়া ধরিলেন (শারহুল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ৩খ., পৃ. ১৬৬)।
৩. হযরত জা'ফার (রা) মহানবী (স)-এর চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাবশায় হিজরত করেন। খায়বার বিজয়ের পর মহানবী (স) যখন খায়বার প্রান্তর হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি লইতেছিলেন তখন তিনি হাবশা হইতে প্রত্যাবর্তন করেন। হযরত জা'ফারের সাক্ষাৎ পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) যারপরনাই আনন্দিত হইলেন এবং তাঁহাকে জড়াইয়া ধরিয়া তাঁহার ললাটে চুম্বন করিলেন। তিনি আনন্দের আতিশয্যে বলিয়া উঠিলেন, আমি জানি না, খায়বার বিজয়ে অধিক আনন্দিত হইয়াছি, নাকি জা'ফরের আগমনে (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৩৯)।
রাসূলে কারীম (স)-এর শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও তাহাদের হক আদায় করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই বরং তিনি তাঁহার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও তাহাদের আপনজন ও প্রতিবেশীদের প্রতিও সদাচরণ ও সদ্ব্যবহার করিয়াছেন।
হযরত আনাস (রা) বলেন, যখনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে কোথাও হইতে কোন হাদিয়া আসিত তখন তিনি প্রায়ই বলিতেন, অমুক মহিলাকে ইহা দিয়া আস। কেননা সে খাদীজার বান্ধবী ছিল। যাও, ইহা অমুক গোত্রের অমুক মহিলাকে পৌঁছাইয়া দাও। কেননা সে খাদীজাকে ভালবাসিত (আল-মুসতাদরাক, ৪খ., পৃ. ১৭৫)।
হযরত 'আইশা (রা) বলেন, খাদীজার উপর আমার যতটা ঈর্ষা হইত ততটা ঈর্ষা আর কাহারও উপর হইত না, অথচ আমার বিবাহের তিন বৎসর পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করেন। আমার ঈর্ষার কারণ এই যে, আমি নবী কারীম (স)-কে প্রায়শ তাঁহার কথা স্মরণ করিতে শুনিতাম। তিনি বলিতেন, আল্লাহ তাঁহাকে এই মর্মে নির্দেশ দিয়াছেন যে, তিনি যেন খাদীজাকে জান্নাতে একটি হীরা বা মোতির মহলের সুখবর প্রদান করেন। আর রাসূলুল্লাহ (স) যখনই বকরী যবেহ করিতেন তখন উহার কিছু অংশ খাদীজা (রা)-এর বান্ধবীদেরকে হাদিয়া পাঠাইতেন। (বুখারী, ১খ., পৃ. ৫৩৮)।
হযরত আবূ বুরদা (রা) বলেন, আমি যখন মদীনায় আসিলাম তখন ইবন উমার (রা) আমার বাড়িতে আসিলেন। তিনি বলিলেন, জান কেন আমি তোমার বাড়িতে আসিয়াছি? আমি বলিলাম, না। তিনি বলিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, কোন ব্যক্তি যদি তাহার কবরস্থ পিতার সহিত উত্তম আচরণ করিতে মনস্থ করে তবে তাহার উচিৎ পিতার বন্ধু- বান্ধবদের সহিত ঘনিষ্ঠ আচরণ করা। আবূ বুরদা! আমার পিতা ও তোমার পিতার মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব ছিল। আমি সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিতে আসিয়াছি (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২২২)।
একদা জনৈক বেদুঈনের সহিত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)-এর সাক্ষাৎ হইল। সেই বেদুঈনের পিতা ও তাঁহার পিতা হযরত উমার (রা)-এর মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। হযরত ইবন উমার একটি গাধা এবং তাঁহার নিজ শিরস্ত্রাণ খুলিয়া বেদুঈনকে দান করিলেন। ইবন উমারের সফরসঙ্গী জনৈক ব্যক্তি বলিল, আরে ভাই! ইহাকে দুইটি দিরহাম দিলেই কি যথেষ্ট ছিল না? ইবন উমার বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, পিতার বন্ধুত্বকে অটুট রাখ, উহাকে ছিন্ন করিও না নতুবা আল্লাহ তা'আলা তোমার (ঈমানের) আলো নির্বাপিত করিয়া দিবেন (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩১৪)।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম, কবীরা গুনাহ। রাসূলে কারীম (স) বলেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করিব না? সাহাবীগণ বলিলেন, হ্যাঁ অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র সহিত শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করা। এই সময় তিনি হেলান দিয়া বসা ছিলেন। অতঃপর উঠিয়া বসিলেন এবং বলিলেন, শুনিয়া লও, মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। এই কথাটি তিনি একাধারে বলিয়া যাইতেছিলেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ৩৬২)। মহানবী (স) ইরশাদ করেন:
تفتح ابواب الجنة ليوم الاثنين ويوم الخميس فيغفر لكل عبد لا يشرك بالله شيأ إلا رجل كانت بينه وبين اخيه شحناء فيقال انظروا هذين حتى يصطلحا .
"প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হয় এবং এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই মার্জনা করা হয় যে আল্লাহ্র সহিত কাহাকেও শরীক করে না। কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে মার্জনা করা হয় না যাহার অপর কোন মুসলমান ভাইয়ের সহিত ঝগড়া-বিবাদ রহিয়াছে। তাহাদের দুইজনের সম্পর্কে বলা হয়, তাহাদের মধ্যে আপোস-মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তাহাদের ব্যাপার স্থগিত রাখ (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১৪৮)।
ইমাম বুখারী (র) বর্ণনা করিয়াছেন, তাবেয়ী হযরত আবূ আয়্যব সুলায়মান বলেন, কোন এক বৃহস্পতিবার হযরত আবূ হুরায়রা (রা) আমার বাড়িতে সন্ধ্যাবেলা আসিলেন এবং বলিলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদনকারীকে আমি ভালবাসি না, এমন কেহ এই মজলিসে থাকিলে সে যেন উঠিয়া যায়। তিনি তিনবার এই কথা বলিলেন। তখন এক যুবক উঠিয়া দাঁড়াইল এবং তাহার ফুফুর বাড়িতে যাইয়া উপস্থিত হইল। যুবকটি তাহার এই ফুফুর সহিত দুই বৎসর যাবত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। তাহার ফুফু তাহাকে দেখিয়া বলিল, ভ্রাতপুত্র! তুমি হঠাৎ কি মনে করিয়া? যুবক বলিল, আমি হযরত আবূ হুরায়রাকে এমন এমন বলিতে শুনিয়াছি। ফুফু বলিল, আচ্ছা, তুমি পুনরায় আবূ হুরায়রার কাছে যাও এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা কর যে, তিনি কি কারণে এরূপ বলিলেন? জবাবে আবূ হুরায়রা বলিলেন, আমি রাসূলে কারীম (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি: আদম সন্তানের আমলসমূহ প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রজনীতে আল্লাহর সমীপে পেশ করা হয়, তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল গৃহীত হয় না (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২২২)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলেন, আসমানের দরজাসমূহ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছেদনকারীর সামনে বন্ধ হইয়া যায় অর্থাৎ তাহার দু'আ কবুল হয় না (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৪)।
অপর একটি হাদীছে মহানবী (স) ইরশাদ করেন:
لا يزال يستجاب للعبد مالم يدع باثم او قطيعة رحم .
"বান্দার সকল দু'আই-কবুল হয় যতক্ষণ না সে কোন গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন দু'আ করে” (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫২)।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে আল্লাহ তা'আলা মার্জনা করেন না। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, হযরত জিবরীল (আ) আমার নিকট আসিয়া বলিলেন, আজ শা'বানের পনরতম রজনী। এই রজনীতে আল্লাহ তা'আলা বান্দাকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি দিয়া থাকেন কাল্ব গোত্রের মেষপালের পশমের সমপরিমাণ সংখ্যা। তবে এই রজনীতেও কতিপয় বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলা রহমতের দৃষ্টি দেন না। যথাঃ মুশরিক, হিংসুক, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, পায়ের গোছার নীচে কাপড় পরিধানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য ও মদ্যপ ব্যক্তি (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার অপরাধ এতই গুরুতর ও অমার্জনীয় পাপ যে, উহার শাস্তি আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেই কার্যকর করিয়া থাকেন। রাসূলে কারীম (স) বলেন,
كل ذنوب يؤخر الله منها ماشاء الى يوم القيامة الا البغى وعقوق الوالدين او قطيعة رحم يعجل لصاحبها في الدنيا قبل الموت .
"যে কোন গুনাহের শাস্তি আল্লাহ যদি চাহেন কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করিয়া থাকেন। তবে বিদ্রোহ, মাতা-পিতার অবাধ্যতা ও রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার অপরাধ এমন পর্যায়ের যে, উহার শাস্তি আল্লাহ মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতেই কার্যকর করিয়া থাকেন" (ইবন কাছীর, তাফসীর, ৪খ., পৃ. ১৬১)।
রাসূলে কারীম (স) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর নানাবিধ পার্থিব- শান্তির কথা তাহার বাণীতে বিবৃত করিয়াছেন! এখানে কয়েকটি বাণী পেশ করা হইল:
১. হযরত ইব্‌ন আবী আওফা (রা) বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মজলিসে বসা ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: আজ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি যেন আমাদের মজলিসে না বসে। কথা শ্রবণে জনৈক যুবক উঠিয়া দাঁড়াইল এবং তাহার খালার কাছে গেল। যুবকটির তাহার খালার সহিত কিছু মনোমালিন্য ছিল। সে তাহার খালার নিকট ক্ষমা চাহিল। খালা বলিল, রাসূলুল্লাহ (স) কেন এমন কথা বলিলেন তাহা জিজ্ঞাসা করিও। যুবক রাসূলুল্লাহ (স)- কে ইহার হেতু জিজ্ঞাসা করিলে তিনি জবাবে বলিলেন,
ان الرحمة لا تنزل على قوم فيهم قاطع رحم .
"যে সম্প্রদায়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী কোন ব্যক্তি থাকে তাহাদের উপর আল্লাহ্ রহমত নাযিল হয় না।"
এই হাদীছে রহমত নাযিল না হওয়ার অর্থ হইল অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়া অর্থাৎ আত্মীয়তা ছিন্নকারীর কারণে যমিনে রহমতের বৃষ্টি বন্ধ হইয়া যায় (ফয়যুল কালাম, পৃ. ৪০৩)।
২. হযরত আবূ উমামা (রা) বলেন, রাসূলে কারীম (স) বলিয়াছেন, এই উম্মতের একদল লোক খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ-স্ফূর্তির মধ্যে রাত্রিতে ঘুমাইতে যাইবে, কিন্তু প্রভাতে তাহাদের দেহাকৃতি বানর ও শূকরের রূপ ধারণ করিবে। ইহা হইবে তাহাদের মদ্যপান, রেশমী পোশাক পরিধান, গায়িকাদের প্রতি আসক্তি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার অপরাধে (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২৩৩)।
৩. রাসূলে কারীম (স) বলেন, আরশের একটি খুঁটিতে মোহর লটকানো আছে। যখন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয় অথবা কোন নাফরমানী করা হয় এবং আল্লাহ্ বিরুদ্ধে দুঃসাহসিকতা প্রদর্শিত হয় তখন আল্লাহ তা'আলা সেই মোহর প্রেরণ করেন এবং অপরাধীর কলবের উপর মোহর মারিয়া দেন। রাসূলে কারীম (স) বলেন:
لايد خل الجنة قاطعة "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করিবে না” (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৫)।
১. আত্মীয়তা রক্ষায় জীবিকা ও আয়ু বৃদ্ধি পায়। রাসূলে কারীম (স) বলেন: من سره أن يبسط له في رزقه وان ينسأ له في اثره فليصل رحمه "যে ব্যক্তি চাহে যে, তাহার জীবিকা প্রশস্ত হউক এবং তাহার আয়ু বৃদ্ধি হউক, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সহিত সদাচরণ করে" (বুখারী, ২খ, পৃ. ৮৮৫)।
২. আত্মীয়-স্বজনের সহিত সম্ভাবের ফলে ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। রাসূলে কারীম (স) বলেন, যে বক্তি তাহার প্রতিপালককে ভয় করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে তাহার আয়ু বৃদ্ধি করা হয়, তাহার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং তাহার পরিবার-পরিজন তাহাকে ভালবাসে (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৭)।
৩. আত্মীয়তা রক্ষায় দু'আ কবুল হয়। রাসূলে কারীম (স) বলেন, তিন ব্যক্তি কোথাও যাইতেছিল। এমন সময় হঠাৎ বৃষ্টিপাত হইলে তাহারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় লইল। তখন পাহাড়ের একটি বিরাট প্রস্তর খণ্ড গুহার মুখে আসিয়া পড়িল। ফলে গুহার মুখ বন্ধ হইয়া গেল। তাহারা ভিতরে আটকা পড়িয়া রহিল। অবশেষে তাহারা একজন অপরজনকে বলিতে লাগিল, তুমি খাস আল্লাহ্ উদ্দেশে যে সমস্ত নেক আমল করিয়াছ সে সমস্ত নেক আমলের উসীলায় আল্লাহর নিকট দু'আ কর। হয়ত আল্লাহ তা'আলা পাথরটি সরাইয়া দিতে পারেন। তাহাদের একজন বলিল, হে আল্লাহ! তুমি জান, আমার মাতা-পিতা অতি বৃদ্ধ ছিলেন এবং আমার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও ছিল। আমি তাহাদের জন্য পশু চরাইতাম। সন্ধ্যায় যখন ফিরিয়া আসিতাম ঐ পশুগুলি দোহন করিতাম এবং নিজের ছেলেমেয়েদের আগে মাতা-পিতাকে দুধ পান করিতে দিতাম। একদিন বনের মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত আমি পশুগুলি চরাইতে লইয়া গেলাম। ফিরিয়া আসিতে আমার রাত হইয়া গেল। দেখিলাম, মাতা-পিতা দুইজনই ঘুমাইয়া আছেন। আমি যথারীতি দুধ দোহন করিলাম এবং দুধ লইয়া তাঁহাদের শিয়রের কাছে দাঁড়াইয়া রহিলাম। তাঁহাদেরকে ঘুম হইতে জাগ্রত করাও ভাল মনে করিলাম না, আবার তাঁহাদের আগে ছেলেমেয়েদেরকে পান করাইতেও মন চাহিতেছিল না, অথচ ছেলেমেয়েরা আমার পায়ের কাছে আসিয়া কান্নাকাটি ও চেঁচামেচি করিতেছিল। ভোর পর্যন্ত আমার ও আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই অবস্থা বিরাজ করিতেছিল। হে আল্লাহ! যদি আমি ইহা শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্যই করিয়া থাকি, তাহা হইলে এই পাথরটি সরাইয়া দাও যাহাতে আমরা আকাশ দেখিতে পাই। তখন আল্লাহ তা’আলা পাথরটি সামান্য সরাইয়া দিলেন, অবশেষে তাহারা আকাশ দেখিতে পাইল (বুখারী, ২খ, পৃ. ৮৮০)।
৪. আত্মীয়তা রক্ষার অন্যতম পার্থিব পুরস্কার এই যে, ইহার প্রতিদানে আত্মীয়তা রক্ষাকারীর অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনও তাহার সহিত সদাচরণ করে এবং তাহার প্রাপ্য হকসমূহ আদায় করে।
৫. আত্মীয়তা রক্ষার কল্যাণে পার্থিব সুখ-সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। মহানবী (স) বলেন, আল্লাহ তা’আলা কোন কোন কওমের আবাসনকে আবাদ রাখেন এবং তাঁহাদের ফল-ফলাদির উৎপাদন বাড়াইয়া দেন, অথচ তিনি তাঁহাদের প্রতি তাঁহাদের দুনিয়াতে আগমন কাল হইতে এই পর্যন্ত একটি বারের জন্য সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে তাকান নাই। কারণ তিনি তাঁহাদের প্রতি ক্রুদ্ধ। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইহা সম্ভব হইল কি করিয়া? তিনি বলিলেন, ইহা তাঁহাদের আত্মীয়তা রক্ষার কল্যাণে (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ, পৃ. ২ Webb)।
পার্থিব জগতে আত্মীয়তা রক্ষার প্রতিদানে আল্লাহ তা’আলা পরকালে জান্নাত দান করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেন : তিনটি জিনিস এমন যাহা কোন ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া গেলে তাহার হিসাব-নিকাশ আল্লাহ তা’আলা অত্যন্ত সহজভাবে লইবেন এবং তাঁহার নিজ রহমতে তাহাকে বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন। জিজ্ঞাসা করা হইল, তাহা কি হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বলিলেন, যে তোমাকে বর্জিত করিবে তুমি তাহাকে দান করিবে। যে তোমার সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিবে, তুমি তাহার সহিত তাহা যুক্ত রাখিবে বা সদাচরণ করিবে। যে তোমার প্রতি অবিচার করিবে তুমি তাহার প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করিবে। যদি তুমি ইহা করিতে পার তবে আল্লাহ তা’আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ, পৃ. ২৩১)।
যদি কখনও কোন কারণে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয় তখন তাহা দ্রুত নিষ্পত্তি করিয়া লওয়া উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব। যদি তাহারা নিজেরা ইহার নিষ্পত্তিতে সক্ষম না হয় তখন সমাজের অন্যদেরও কর্তব্য হইয়া যায় দ্রুত তাহাদের মাঝে উহার মীমাংসা করিয়া দেওয়া ও তাহাদের মধ্যে পুনঃ সম্পর্ক স্থাপন করিয়া দেওয়া।
রাসূলে কারীম (স) আপনজনকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসিতেন। এতসত্ত্বেও যখন কোন ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রশ্ন আসিত, তখন তিনি কোন পক্ষপাতিত্ব করিতেন না বরং ন্যায় ও ইনসাফের স্বার্থে যদি একান্ত আপনজনের বিপক্ষেও তাহাকে রায় দিতে হইত, তিনি নিঃসংকোচে ও নির্দ্বিধায় তাহাই করিতেন। ইহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রহিয়াছে বদরের যুদ্ধবন্দীদের ইতিহাসে। বদরের যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাসও ছিলেন। সিদ্ধান্ত হইল যে, মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদেরকে মুক্তি দেওয়া হইবে। আনসার সাহাবীগণ আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আব্বাস আমাদের ভাগিনা। আমরা তাহাকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করিয়া দিতে চাই। নবী কারীম (স) ইহাতে সম্মত হইলেন না। কারণ, বিচারের বেলায় ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলেই সমান। তাহাদের ভাগিনা আর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাই ছিলেন হযরত আব্বাস। ইহা ছাড়া হযরত আব্বাস (রা) মক্কী জীবনে ইসলাম গ্রহণ না করিলেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ ছিলেন। তথাপি ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক হযরত মুহাম্মাদ (সা) বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্ব করেন নাই (সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ৩৩৩)।
ফুসায়লা নাম্নী জনৈক মহিলা বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার পিতাকে বলিতে শুনিয়াছি, আমি রাসূলে কারীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! অন্যায় কাজে নিজ সম্প্রদায়ের লোকজনকে সাহায্য করা কি জাহিলী যুগের আসাবিয়্যাত তথা গোত্রপ্রীতির অন্তর্ভুক্ত? নবী করীম (স) বলিলেন, হাঁ।
মক্কা বিজয়ের সময় মাখযূম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরি করিয়া ধরা পড়িল। ইসলামী বিধান অনুসারে তাহার হাত কাটার নির্দেশ জারী হইল। এই নির্দেশ শুনিয়া তাহার গোত্রের লোকেরা খুবই বিচলিত হইয়া পড়ল। তাহারা এই দণ্ড মওকুফের সুপারিশের জন্য হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট প্রেরণ করিল। তিনি তাহার কথায় অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইলেন। তিনি বলিলেন, উসামা! তুমি আল্লাহর দণ্ডবিধানের বিরুদ্ধে সুপারিশ করিতে আসিয়াছ? হযরত উসামা ক্ষমা চাহিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) একটি সমবেত জনমণ্ডলীর মধ্যে বক্তৃতা দানকালে বলিলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করিলে তাহাকে কোন শান্তি দেওয়া হইত না। পক্ষান্তরে কোন দুর্বল লোক চুরি করিলে তাহাকে যথারীতি শাস্তি দেওয়া হইত। এইজন্যই উক্ত জাতিসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। যাঁহার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, সেই আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি, আজ যদি মুহাম্মাদ (স)-এর কন্যা ফাতিমাও চুরি করিত তবে নিশ্চয় তাঁহার হাত কাটিয়া ফেলিতাম (বুখারী, ১খ., পৃ. ৫২৮; আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ১৪৩)।
আত্মীয়-স্বজনদের যেমন বৈষয়িক অধিকার রহিয়াছে, তেমনি রহিয়াছে তাহাদের ধর্মীয় অধিকার। আত্মীয়তা রক্ষায় উভয়বিধ অধিকার আদায়ের সবিশেষ তাকীদ রাসূলে কারীম (স) প্রদান করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে :
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَاراً وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلْئِكَةٌ غِلاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُوْنَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُونَ .
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন হইতে রক্ষা কর যাহার ইন্ধন হইবে মানুষ ও পাথর। উহাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। তাহারা আল্লাহ যাহা আদেশ করেন তাহা অমান্য করে না এবং যাহা করিতে আদেশ করা হয় তাহারা তাহাই করে” (৬৬ঃ ৬)
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিজেদেরকে জাহান্নাম হইতে রক্ষার ব্যাপারটি তো কিছুটা বুঝিতে পারি। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদেরকে জাহান্নাম হইতে রক্ষা করিবার উপায় কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহার উপায় এই যে, আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যাহা করিতে নিষেধ করিয়াছেন, তোমরা তাহাদেরকে সেই সমস্ত করিতে নিষেধ কর আর তোমাদেরকে যাহা করিতে আদেশ করিয়াছেন, তোমরা তাহাদেরকেও তাহা করিতে আদেশ কর। এই কর্মপন্থা তাহাদেরকে জাহান্নাম হইতে রক্ষা করিবে (তাফসীর রূহুল মা'আনী, ১৫খ., পৃ. ৩৫১)।
রাসূলে কারীম (স)-এর আদর্শে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে ফরয কর্মসমূহ ও হালাল-হারামের বিধান শিক্ষা দেওয়া এবং তাহা পালন করানোর চেষ্টা করা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি অধিক কষ্টে থাকিবে যাহার পরিবার-পরিজন ধর্মীয় কর্তব্য সম্পর্কে মূর্খ ও উদাসীন হইবে (তাফসীর রূহুল মা'আনী, ১৫খ., পৃ. ৩৫১)।
রাসূলে কারীম (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের ধর্মীয় অধিকার আদায়ে এবং তাহাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন। নবৃওয়াত প্রাপ্তির প্রথমদিকে তাঁহাকে তাঁহার নিজ আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের মধ্যেই ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন : وَأَنْذِرْ عَشِيْرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়-স্বজনদেরকে সতর্ক করুন” (২৬ : ২১৪)।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সকল আত্মীয়-স্বজনকে একত্র করেন এবং তাহাদেরকে সত্যের পয়গাম শুনাইয়া দেন। তিনি তাঁহার নিকটাত্মীয় গোত্রগুলির নাম ডাকিয়া ডাকিয়া বলিলেন : হে বনী কা'ব ইব্‌ন লুওয়াই! হেনী-আব্দ মানাফ! নিজেদেরকে জাহান্নামের অগ্নি হইতে রক্ষার কর ইত্যাদি নতুবা আমি তোমাদেরকে শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিব না (মুসলিম, ১খ., পৃ. ১১৪)।
রাসূলে কারীম (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজনদের ধর্মীয় বিষয়ে কী পরিমাণ উদগ্রীব ছিলেন উহার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁহার চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর ঘটনা হইতে। আবূ তালিব আজীবন রাসূলের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি সর্বদা রাসূলের সহায়ক হইয়া কুরায়শদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিয়া গিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচার এই অবদানের প্রতিদান প্রদানে এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের ব্যাপারে সদা প্রস্তুত ও সচেতন থাকিতেন। তাঁহার অন্তরের একান্ত কামনা ছিল, তাঁহার চাচা ঈমান আনয়ন করুক যাহাতে তিনি তাঁহার সকল অবদানের প্রতিদান ও তাহার সহিত তাঁহার আত্মীয়তার হক আদায় করিতে পারেন। যখন আবূ তালিবের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হইল তখন মহানবী (স) তাহাকে বলিলেন, চাচাজান! মৃত্যুকালে একবার "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করুন, আমি আল্লাহ তা'আলার দরবারে আপনার ঈমান আনয়নের সাক্ষ্য দিব। তখন তাহার শিয়রে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবন উবায়িয় বসা ছিল। তাহারা বলিল, আবূ তালিব! আপনি কি আপনার পিতা আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া ভ্রাতুষ্পুত্রের ধর্ম গ্রহণ করিবেন? আবূ তালিব মৃত্যুশয্যা হইতে বলিলেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের ধর্মাদর্শের উপর অটল থাকিয়াই মৃত্যুবরণ করিতেছি। অতঃপর আবূ তালিব বলিলেন, আমি কলেমা পাঠ করিতাম, কিন্তু এরূপ করিলে কুরায়শগণ বলিত, আবূ তালিব মৃত্যুভয়ে কলেমা পড়িয়াছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিষেধ না করিবেন সেই পর্যন্ত আমি আপনার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করিয়া যাইব (বুখারী, ১খ., পৃ. ৫৪৮)।
রাসূলে কারীম (সা) সর্বদা তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের জন্য দু'আ করিতেন এবং তাঁহার সাহাবাগণকেও তাঁহাদের নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনের জন্য দু'আ করিতে উৎসাহ প্রদান করিতেন। মহানবী (স) বলেনঃ অনুপস্থিত কোন ভাইয়ের জন্য মুসলমানের দু'আ আল্লাহর দরবারে কবুল হইয়া থাকে। দু'আকারীর মাথার উপর একজন ফেরেশতা মোতায়েন থাকেন। যখনই সে তাহার মুসলমান ভাইয়ের জন্য দু'আ করে তখন ঐ ফেরেশতা বলেন, আমীন! তোমার জন্যও ঐরূপ কল্যাণ হউক (মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫১-৩৫২)।
একবার রাসূলে কারীম (স) তাঁহার চাচা হযরত আব্বাস (রা)-কে বলিলেন, হে আল্লাহ্ রাসূলের চাচা আব্বাস! আপনি আল্লাহ্র দরবারে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করুন (আল-আদাবুল মুফরাদ)।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি আকাঙ্ক্ষা করিতাম, আমার মাতা ইসলাম গ্রহণ করুন, কিন্তু তিনি তাহাতে সম্মত হইতেন না। একদা আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলাম এবং তাঁহার জন্য দু'আ করিতে অনুরোধ করিলাম। অতঃপর যখন আমি বাড়িতে ফিরিলাম, দেখি আমার আম্মা তাঁহার ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া ভিতরে অবস্থান করিতেছেন। তিনি ঘর হইতে বলিলেন, আবূ হুরায়রা! আমি মুসলমান হইয়াছি। আমি এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে অবগত করিলাম এবং বলিলাম, আমার ও আমার মাতার জন্য দু'আ করুন। তিনি তাহাদের জন্য দু'আ করিলেন (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ২৯-৩০)।
পবিত্র কুরআনে 'মু'মিনগণকে তাহাদের আত্মীয়-স্বজনের জন্য দু'আ করিতে শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا .
"হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমনও স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন যাহারা হইবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানাও” (২৫:৭৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00