📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আত্মীয়তা রক্ষার অর্থ

📄 আত্মীয়তা রক্ষার অর্থ


আত্মীয়তা রক্ষার অর্থ হইল, আত্মীয়-স্বজনদের যেই সমস্ত হক ও অধিকার রহিয়াছে, তাহা যথাযথ আদায় করা, যথাসাধ্য আত্মীয়-স্বজনদের সর্বপ্রকার কল্যাণ ও উপকার সাধনের চেষ্টা করা এবং যাবতীয় অনিষ্ট, উৎপীড়ন ও যাতনা হইতে তাহাদেরকে মুক্ত রাখিবার প্রচেষ্টা চালানো।
আল্লামা ইব্‌ন আবী জামরাহ (র) বলেন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা ও ঘনিষ্ঠকরণ কয়েক ধরনের হইতে পারে: (১) আত্মীয়-স্বজনদের আর্থিক প্রয়োজন মিটানো; (২) তাহাদের যে কোন সমস্যার সমাধানে আগাইয়া আসা; (৩) তাহাদের যে কোন ক্ষতি ও অনিষ্ট প্রতিহত করা; (৪) তাহাদের সহিত হাসিমুখে অন্তরঙ্গভাবে মিলিত হওয়া; (৫) তাহাদের অনুপস্থিতিতে তাহাদের সর্ব প্রকার কল্যাণ কামনা করিয়া দু'আ করা; (৬) তাহাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া, ধর্ম-কর্মে উৎসাহিত করা।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শর'ঈ দৃষ্টিতে আত্মীয়তা রক্ষার গুরুত্ব

📄 শর'ঈ দৃষ্টিতে আত্মীয়তা রক্ষার গুরুত্ব


ইমাম কুরতুবী (র) লিখিয়াছেন:
اتفقت الملة على ان صلة الرحم واجبة وان قطعها حرمة
"গোটা উম্মত একমত যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব, ইহা ছিন্ন করা হারাম" (কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৬)।
আল্লামা কাযী 'ইয়ায (র) বলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ও তাহাদের সহিত ঘনিষ্ঠাচরণ ওয়াজিব। ইহার পরিপন্থী যে কোন কাজ ও আচরণ কবীরা গুনাহ। তিনি আরও বলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কয়েকটি স্তর রহিয়াছে। উহার সর্বনিম্ন স্তর হইল তাহাদের সহিত উঠাবসা ও মেলামেশা ত্যাগ না করা। তাহাদের সহিত অন্ততপক্ষে কথাবার্তা এমনকি দেখা-সাক্ষাতে সালামের মাধ্যমে হইলেও সদ্ভাব বজায় রাখা (মিরকাত, শরহে মিশকাত, ৯খ., পৃ. ১৯৬, শু'আবুল ঈমান, টীকা, পৃ. ১১৩)।
হযরত কুলায়ব ইব্‌ন মানফা'আ (র) বলেন, আমার আব্বা জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আল্লাহ্ রাসূল! সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ ব্যবহার পাওয়ার যোগ্য কে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার পিতা-মাতা, তোমার ভাই-বোন এবং এতদসঙ্গে তোমার সেই গোলাম যে তাহাদের সহিত সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে। অতঃপর মহানবী (স) বলিলেন, حَقَّ وَاجِبُ وَرَحْمُ مَوْصُول "এইসব হইতেছে ওয়াজিব, অবশ্য পালনীয় হক এবং নিকটাত্মীয়দের সহিত ঘনিষ্ঠাচরণ অবশ্যই রক্ষা করিতে হইবে" (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তার গুরুত্ব

📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তার গুরুত্ব


আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে: وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا .
"তোমরা আল্লাহর ইবাদত করিবে ও কোন কিছুকে তাঁহার শরীক করিবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সংগী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের সহিত সদ্ব্যব্যবহার করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ পসন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে" (৪:৩৬)।
উক্ত আয়াতে আত্মীয়-স্বজনদের সহিত সদ্ব্যবহারের তাকীদ দেওয়া হইয়াছে এবং সদ্ব্যবহার প্রাপ্তি তাহাদের মৌলিক অধিকার বলিয়া স্বীকৃত হইয়াছে। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلْ مَا أَنْفَقْتُمْ مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ وَالْيَتَمَى وَالْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ.
“লোকে কি ব্যয় করিবে সে সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বল, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করিবে তাহা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত এবং মুসাফিরদের জন্য” (২: ২১৫)।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَابْتَائِي ذِي الْقُرْبَى . “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন” (১৬ : ৯০)।
فَاتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ ذَلِكَ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ . “অতএব আত্মীয়-স্বজনকে তাহার প্রাপ্য দিও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। যাহারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে তাহাদের জন্য ইহা শ্রেয় এবং তাহারাই সফলকাম” (৩০ : ৩৮)।
উপরে উল্লিখিত কুরআনের আয়াতসমূহের সারমর্ম এই যে, আত্মীয়-স্বজনদের আর্থিক সহযোগিতা করা, তাহাদের অর্থ-সংকট ও অসচ্ছলতা দূরীকরণে আগাইয়া আসা এবং তাহাদের জন্য উদার হস্তে ব্যয় করা আত্মীয়তার সম্পর্কের অন্যতম হক।
মৃত আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে মীরাছের অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকা আত্মীয়তার অন্যতম হক। ইহাতে প্রত্যেক আত্মীয়ের শরীয়ত স্বীকৃত হক অবশ্যই প্রদান করিতে হইবে। নারী হওয়ার কারণে অথবা অন্য কোন অজুহাতে মীরাছের অধিকার হইতে কোন আত্মীয়কে বঞ্চিত রাখা যাইবে না। ইরশাদ হইয়াছে:
لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَنِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدُنِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا . “পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, উহা অল্পই হউক অথবা বেশীই হউক, এক নির্ধারিত অংশ” (৪: ৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তা প্রসঙ্গ

📄 আল-কুরআনে আত্মীয়তা প্রসঙ্গ


রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অসংখ্য বাণীতে আত্মীয়তা রক্ষার ফযীলত, গুরুত্ব ও তাৎপর্য, তাহাদের নানাবিধ অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাহাদের সহিত ঘনিষ্ঠজনের বিভিন্ন দিক ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে তুলিয়া ধরিয়াছেন।
১. হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেন :
اسرع الخير ثوابا البر والصلة و اسرع الشر عقوبة البغى وقطيعة الرحم .
"শীঘ্র প্রতিদান পাওয়ার মত পুণ্য হইল আনুগত্য ও আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা এবং শীঘ্রতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হইল বিদ্রোহ ও আত্মীয়-স্বজনদের সহিত সম্পর্কচ্ছেদ" (মুসতাদরাক হাকেম)।
২. হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের উদ্দেশ্যে বলিলেন, হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে ভয় কর, আত্মীয়তা রক্ষা কর। কেননা আত্মীয়তা রক্ষার ছওয়াবের চাইতে দ্রুততম ছওয়াব প্রাপ্তির আর কোন আমল নাই। তোমরা বিদ্রোহ হইতে সতর্ক থাক, কেননা বিদ্রোহের শাস্তি শীঘ্রই কার্যকর হয়। তোমরা মাতা-পিতার প্রতি অসদাচরণ হইতে সাবধান হও। জানিয়া রাখ, জান্নাতর সুঘ্রাণ হাজার বৎসরের দূরত্ব হইতেও অনুভূত হইয়া থাকে। কিন্তু উহা হইতেও বঞ্চিত থাকিবে যাহারা মাতা-পিতার সহিত অসদাচরণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, বৃদ্ধ ব্যভিচারী এবং অহংকারবশত গোড়ালীর নিচে ঝুলাইয়া কাপড় পরিধানকারী। অথচ শ্রেষ্ঠত্ব তো একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই উপযুক্ত (আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৩খ., পৃ. ২২৫)।
৩. হযরত উকবা ইব্‌ন আমের (র) হইতে বর্ণিত একটি হাদীছে আত্মীয়তার সম্পর্কের সুষ্ঠু লালন ও সংরক্ষণকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সমস্ত আমলের মধ্যে সর্বোত্তম আমল বলিয়া গণ্য করা হইয়াছে। তিনি বলেন, একদা আমি মহানবী (স)-এর হাত ধরিয়া বলিলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সর্বোত্তম আমল কি তাহা আমাকে অবহিত করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন:
يا عقبة صل من قطعك واعط من حرمك واعف عمن ظلمك .
“হে উকবা! যে তোমার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তাহার সহিত সম্পর্ক বহাল রাখিবে, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তুমি তাহাকে দান করিবে এবং যে তোমার প্রতি অবিচার করে তুমি তাহাকে মার্জনা করিবে" (মুসতাদরাক হাকেম ৪খ., পৃ. ১৬২)।
৪. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা যখন সমস্ত সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করিলেন, তখন রাহিম )رحم = আত্মীয়তার বন্ধন) উঠিয়া দাঁড়াইল। আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞাসা করিলেন, কি হইয়াছে বল? সে নিবেদন করিল, আমাকে ছিন্ন করণ হইতে আপনার আশ্রয় চাহিতেছি। আল্লাহ তা'আলা বলিলেন, তুমি কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সহিত যে ব্যক্তি সম্পর্ক রক্ষা করিবে আমি তাহার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখিব, আর যে ব্যক্তি তোমার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিবে, আমি তাহার সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিব? রাহিম বলিল, হাঁ। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, এই হাদীছটিতে মূলত আল-কুরআনের এই আয়াতটির মর্মই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ .
"তবে কি তোমরা আধিপত্য লাভ করিলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিবে” (৪৭ঃ ২২; দ্র. বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৫)।
৫. আত্মীয়তা রক্ষার ফলে মানুষের তওবা কবুল হয়। একদা এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইয়া আরয করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি মারাত্মক অপরাধ করিয়াছি। আমার কি তওবার সুযোগ আছে? মহানবী (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার মাতা জীবিত আছে কি? সাহাবী বলিলেন, না। রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার কি খালা আছে? সাহাবী বলিলেন, হাঁ। মহানবী (স) বলিলেন, তাহার সহিত সদাচারণ কর, তাহার সেবা-যত্ন কর” (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১২)।
৬. হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (স) বলিয়াছেন:
الرحم شجنة من الله من وصلها وصله الله ومن قطعها قطعه الله .
"রাহিম (আত্মীয়তার বন্ধন) আল্লাহ্ নামেরই একটি শাখাবিশেষ। যে উহাকে রক্ষা করিবে আল্লাহ তাহাকে রক্ষা করিবেন। আর যে উহাকে ছিন্ন করিবে, আল্লাহ তাহাকে ছিন্ন করিবেন” (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৬, ৩৯)।
৭. হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে (হাদীছে কুদসী) বলিতে শুনিয়াছি, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি আত্মীয়তার বন্ধনকে (রাহিম) সৃষ্টি করিয়াছি এবং আমার নাম রহমান হইতে উহার নাম নির্গত করিয়াছি। সুতরাং যে উহাকে রক্ষা করিবে, আমি তাহাকে রক্ষা করিব, আর যে উহাকে ছিন্ন করিবে, আমি তাহাকে আমার রহমত হইতে দূরে সরাইয়া দিব (আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৫)।
৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালাম (রা) বলেন, নবী করীম (স) মদীনায় আগমনের প্রায় সাথেসাথেই আমি তাঁহার খেদমতে হাযির হইলাম। সর্বপ্রথম আমার কর্ণে তাঁহার যে কথাটি প্রবেশ করিল, তাহা হইল:
يايها الناس افشوا السلام واطعموا الطعام وصلوا الارحام وصلوا والناس ينام فادخلوا الجنة بسلام .
"হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর সালামের আদান-প্রদানের প্রচলন কর, খাদ্যদান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর, রাত্রিতে তোমরা সালাত আদায় কর যখন লোকজন ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে, তাহা হইলে নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করিবে” (তিরমিযী, ২খ., পৃ. ১০২)।
আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অন্তরে ভালবাসা ও অনুরাগ পোষণ করা আত্মীয়তার অন্যতম হক। রাসূলে কারীম (স) তাঁহার আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের প্রতি কী পরিমাণ স্নেহ ও ভালবাসা রাখিতেন তাহা নিম্নের কয়েকটি দৃষ্টান্ত হইতে অনুমান করা যায়।
১. রাসূলে কারীম (স)-এর চাচা এবং তাঁহার দুধভাই হযরত হামযা (রা) উহুদের যুদ্ধে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার শাহাদাতের সংবাদ পাইলেন। তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত ও চরমভাবে আহত। তৎক্ষণাত তিনি চাচার লাশের তালাশে বাহির হইয়া গেলেন। দীর্ঘ সময় অনুসন্ধানের পর তিনি দেখিতে পাইলেন, হযরত হামযা (রা)-এর দেহ ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। তাঁহার কর্ণ ও নাসিকা কর্তিত, পেট বিদীর্ণ। কুরায়শ রমণী হিন্দ তাঁহার কলিজা বাহির করিয়া চর্বণ করিয়াছে। চাচার লাশ দেখিয়া মহানবী (স)-এর দুই চোখ হইতে অশ্রুধারা বহিয়া গেল। তাঁহার হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল। অতিশয় ব্যথিত হইয়া মহানবী (স) বলিলেন, আহ্! তোমার মত নৃশংসভাবে আর কেহই নিহত হয় নাই। অতঃপর নিজের চাদর দ্বারা চাচার লাশ ঢাকিয়া দিলেন এবং লাশকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “তোমার উপর আল্লাহ্র রহমতের ধারা বর্ষিত হউক। তুমি ছিলে নেক কাজের প্রতি অতিশয় অনুরক্ত এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি খুবই আন্তরিক।"
উহুদ হইতে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর শহীদদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যা এবং আত্মীয়-স্বজন আপনজনকে হারানোর বেদনায় মাতম করিতেছিলেন। তাহাদের ক্রন্দন শুনিয়া মহানবী (স)-এর হৃদয় বেদনায় ভরিয়া গেল। তিনি ব্যথিত কণ্ঠে বলিলেন, সকলের জন্য কাঁদিবার লোক আছে, কিন্তু হামযার জন্য কাঁদিবার কেহ নাই। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে মৃত ব্যক্তির জন্য মাতম করা নিষিদ্ধ হইয়া যায়।
হযরত হামযা (রা)-এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ (স) কী নিদারুণ আঘাত পাইয়াছিলেন উহার আরও কিছুটা অনুমান করা যায় মক্কা বিজয়ের পরবর্তী একটি ঘটনা হইতে। হযরত হামযাকে হত্যাকারী হাবশী গোলাম ওয়াহশী মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পর মুসলমান হয়। মহানবী (স) ওয়াহশীকে ডাকিয়া বলিলেন, "তুমি আমার সামনে আসিও না। তোমাকে দেখিলে আগার চাচা হামযার কথা মনে পড়ে, তখন আমি বিচলিত হইয়া পড়ি" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়‍্যা, ২খ., পৃ. ৯৯)।
২. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কন্যা ফাতিমার সন্তান হযরত হাসানকে চুমা দিতেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৭)। হযরত ইবন উমার (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখিয়াছি যে, তিনি আদর করিয়া বলিতেন, হাসান-হুসায়ন হইল আমার দুনিয়ার দুইটি ফুল (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮২) মহানবী (স)-এর ভৃত্য হযরত যায়দ ইব্‌ হারিছার ছেলে উসামা ইব্‌ন যায়দ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে তাঁহার এক রানের উপর এবং হাসানকে অপর রানের উপর বসাইতেন এবং আমাদের উভয়কে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতেনঃ হে আল্লাহ! আমি তাহাদেরকে যেই রকম স্নেহ করি, তুমিও সেই রকম স্নেহ কর (বুখারী, ৪খ., পৃ. ২২৫)। আয় আল্লাহ! এই দুইজনকে যাবতীয় অনিষ্ট হইতে রক্ষা কর। কেননা আমি তাহাদেবকে ভালবাসি (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৮)।
৩. রাসূলে কারীম (স) তাঁহার সন্তান-সন্ততিকে আদর করিয়া চুমা দিতে দিতে গলাগলি করিতেন। তাহাদের ঘ্রাণ লইতেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৬)। রাসূলুল্লাহ (স) -এর পুত্র হযরত ইবরাহীম (রা)-এর মৃত্যুর সময় তিনি ক্রন্দন করিতে লাগিলেন। হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) বলিলেন, ইহা কি? আপনি কাঁদিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইহা অন্তরের স্নেহ-মমতা। পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলে আরও স্পষ্ট করিয়া বলিলেন,
ان العين تدمع والقلب يحزن ولا نقول الا ما يرضى به ربنا وانا بفراقك يا
ابراهيم لمحزونون .
"চক্ষু অবশ্যই অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিয়াছে, অন্তরও ব্যথায় পূর্ণ হইয়াছে। তবে আল্লাহ্ সন্তুষ্টিমূলক বাক্য ছাড়া অন্য কিছু আমরা বলিতে পারি না। হে ইবরাহীম! তোমার বিরহে আমরা দুঃখিত" (বুখারী, ১খ., পৃ. ১৭৪)।
৪. একবার মহানবী (স) যয়নব (রা)-এর শিশু কন্যার অসুস্থতার সংবাদ শুনিয়া তাঁহার বাড়ীতে গমন করিলেন। তাঁহার সাথে কতিপয় সাহাবীও গেলেন। তিনি দেখিলেন, শিশু কন্যাটি মরণাপন্ন। রাসূলুল্লাহ (স) শিশুটিকে কোলে তুলিয়া লইলেন। শিশুটির তখন মুমূর্ষু অবস্থা এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত চলিতেছিল। মহানবী (স)-এর দুই চোখ জুড়িয়া অশ্রু বহিতে শুরু করিল। হযরত সা'দ (রা) তাঁহার খেদমতে আরয করিলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদিতেছেন? তিনি বলিলেন, ইহা রহমত। আল্লাহ তা'আলা তাঁহার যে বান্দার দিলে বর্ষণ করিতে চাহেন, অকাতরে বর্ষণ করেন। আসলে আল্লাহ তাঁহার সদয় ও মমতাশীল বান্দাদের অন্তরেই ইহা বর্ষণ করিয়া থাকেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ১৭১)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নব অষ্টম হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তিনি স্বয়ং তাঁহার কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা করিলেন। তাঁহার লাশ যখন কবরের পার্শ্বে দাফনের জন্য রাখা হইল তখন মহানবী (স)-এর দুই নয়ন অশ্রুতে প্লাবিত হইয়া গেল (সীরাতুন-নবী, ১খ., পৃ. ৫৪৬)।
৫. রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাতো ভাই হযরত জা'ফার (রা) এবং পালক পুত্র হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা) তাঁহার বিশেষ প্রিয় ও ভালবাসার পাত্র ছিলেন। মৃতার যুদ্ধে তাঁহারা উভয়ে শহীদ হন। তাঁহাদের শাহাদাতের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে তাঁহার দুই নয়ন অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল (বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১১)।
৬. রাসূলে কারীম (সা) তাঁহার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অত্যন্ত সদাচারী ও ভালবাসাপ্রবণ ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তাঁহার এই ঘনিষ্ঠতা ও ভালবাসা কত যে গভীর ও সুবিদিত ছিল উহার বিবরণ পাওয়া যায় হযরত খাদীজা (রা)-এর সেই সান্ত্বনা বাক্যে যাহা তিনি ওহীর সূচনা ক্ষণে ভীতসন্ত্রস্ত স্বামী হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে বলিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন, আপনার এইরূপ ভয়ের কোন কারণ নাই। কেননা:
انك لتصل الرحم وتحمل الكل وتكسب المعدوم و تقرى الضيف وتعيين على نوائب الحق .
"কেননা আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সহিত সদাচরণ করিয়া থাকেন, পরের দুঃখভার বহন করিয়া থাকেন, আপনি দুঃস্থজনের সেবা করিয়া থাকেন, আপনি অতিথি আপ্যায়ন করিয়া থাকেন, আপনি নিঃস্ব-অসহায় ও বিপন্নদের সাহায্য করিয়া থাকেন (বুখারী, ১খ., পৃ. ২)।
রাসূলে কারীম (স) তাঁহার অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিও অত্যন্ত সদাচারী ছিলেন। তাঁহার আদর্শ মোতাবেক মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজন যদি অমুসলিমও হয়, তথাপি তাহাদের সহিত আত্মীয়তাসুলভ ঘনিষ্ঠ আচরণ করিতে হইবে, সাধ্যমত তাহাদের সেবা-যত্ন করিতে হইবে, তাহাদের পার্থিব হকসমূহ আদায়ে সচেষ্ট থাকিতে হইবে। হাঁ, দীনের বিপক্ষে তাহাদের কোন কামনা-বাসনা পূরণ করা যাইবে না।
হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা) বলেন, আমি রাসূলে কারীম (স)-কে আস্তে নহে বরং আওয়াজ করিয়া বলিতে শুনিয়াছি, অমুক বংশের লোকদের সহিত আমার কোন বন্ধুত্ব নাই। আমার বন্ধু তো হইতেছেন মহান আল্লাহ এবং নেককার মু'মিনগণ। হ্যাঁ, তাহাদের সহিত আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রহিয়াছে। আমি তাহাদের সহিত আত্মীয়তার সম্ভাব রক্ষা করিয়া যাইব (বুখারী, ২খ., পৃ. ৮৮৬)। হযরত আসমা বিনতে আবূ বকর (রা) বলেন, নবী কারীম (স)-এর যমানায় আমার অমুসলিম মাতা আমার নিকট আসিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলাম, আমি কি তাহার সহিত রক্ত-সম্পর্কীয় আত্মীয়ের ন্যায় সদাচরণ করিতে পারিব? তিনি বলিলেন, হাঁ। হযরত ইবন 'উয়ায়না (রা) বলেন, আল্লাহ তা'আলা তাহারই সম্বন্ধে এই আয়াতটি নাযিল করেন:
لَا يَنْهُكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّيْنِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ .
"আল্লাহ তোমাদেরকে এমন লোকদের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে এবং ন্যায়ানুগ আচরণ করিতে নিষেধ করেন নাই যাহারা তোমাদের বিরুদ্ধে দীনের ব্যাপারে যুদ্ধ করে নাই এবং তোমাদেরকে স্বদেশ হইতে বহিষ্কার করে নাই। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন" (৬০:৮-৯; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৩১৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00