📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পরিবার-পরিজনদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা

📄 পরিবার-পরিজনদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভালবাসা


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুসতাফা (স)-এর পারিবারিক জীবন ছিল খুবই শান্তিময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। পরিবার-পরিজনদের প্রতি তাঁহার ভালবাসা ছিল অত্যন্ত সুগভীর। তাঁহার প্রথম স্ত্রী উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা)-এর সঙ্গে তাঁহার ভালবাসা ছিল সীমাহীন। তাঁহাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় নবী করীম (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ এবং হযরত খাদীজা (রা)-এর বয়স ছিল চল্লিশ বৎসর। বিবাহের পর হযরত খাদীজা (রা) পঁচিশ বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁহার জীবদ্দশায় রাসূলুল্লাহ্ (স) আর কোন বিবাহ করেন নাই। তাঁহাদের দুইজনের মধ্যকার ভালবাসার গভীরতা এত বেশী ছিল যে, হযরত খাদীজা (রা)-এর ইন্তিকালের পর বাড়িতে যখনই কোন পশু যবেহ করা হইত তখনই রাসূলুল্লাহ্ (স) খুঁজিয়া খুঁজিয়া হযরত খাদীজা (রা)-র বান্ধবিগণের বাড়িতে হাদিয়াস্বরূপ সেই গোশতের অংশ পাঠাইতেন (সহীহ মুসলিম-৭খ., পৃ. ১৩৪)।
হযরত খাদীজা (রা)-র ইন্তিকালের পর তাঁহার বোন 'হালা' নবী করীম (স)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করিতে আসিয়া নিয়মানুযায়ী গৃহে প্রবেশ করার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন।¹ তাহার কন্ঠস্বরের সঙ্গে খাদীজা (রা)-এর কন্ঠস্বরের এত মিল ছিল যে, নবী করীম (স)-এর কানে সেই স্বর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার অন্তরে হযরত খাদীজা (রা)-এর স্মৃতি জাগিয়া উঠিল। তিনি ব্যাকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, "হয়ত হালা হইবে।" ঐ সময় উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) সেইখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করিতে পারিলেন না। তিনি বলিলেন, 'আপনার কী হইয়াছে? একজন বৃদ্ধা, তাও আবার মৃতা, তাঁহার কথা সব সময় আপনার মনে পড়ে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে তাঁহার চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করিয়াছেন”। সহীহ বুখারীতে এই পর্যন্ত বর্ণনা করা হইয়াছে। কিন্তু ইসতী'আব-এ বর্ণিত আছে যে, ইহার উত্তরে নবী করীম (স) বলিলেন, "কখনও না, হে 'আইশা! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলিয়াছিল তখন খাদীজাই আমাকে সত্যবাদী বলিয়া মানিয়া লইয়াছিল; মানুষ যখন কাফির ছিল তখন খাদীজাই ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিল। যখন আমার কোন সাহায্যকারী ছিল না তখন খাদীজাই আমাকে সাহায্য করিয়াছিল" (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৯)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, যদিও আমি হযরত খাদীজা (রা)-কে কখনও দেখি নাই, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তাঁহার প্রতি আমার যতটুকু হিংসা হইত আর কাহারও প্রতি তাহা হইত না। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (স) সর্বক্ষণ তাঁহার কথা আলোচনা করিতেন। হযরত 'আইশা (রা) আরও বলিয়াছেন, আমি একবার হযরত খাদীজা (রা) প্রসঙ্গ লইয়া নবী করীম (স)-এর মনে কষ্ট দিয়াছিলাম। অতঃপর তিনি বলিলেন, আল্লাহ তা'আলাই আমার অন্তরে তাহার প্রতি গভীর ভালবাসা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন (সহীহ মুসলিম, ফাযায়েলে খাদীজা, বরাতে আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৯)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) কখনও একই রাত্রিতে সকল সহধর্মিনীর ঘরে যাতায়াত করিতেন। তিনি সহধর্মিনিগণের সঙ্গে অবস্থানের জন্য পালা নির্ধারণ করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি রাত্রিসমূহ এবং খোরপোষ জীবন-সঙ্গিনিগণের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তবুও তাঁহার মনের টান সকলের প্রতি সমান ছিল এমন কথাও নিঃসন্দেহে বলা যায় না। তাই তিনি সর্বদা বলিতেন, "হে আল্লাহ! আমার আয়ত্তাধীন যাহা আছে তাহাতে আমি সমতা রক্ষা করিয়াছি, আর আমার আয়ত্ত বহির্ভূত যাহা আছে তাহাতে তুমি আমাকে অভিযুক্ত করিও না" (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৪)।
নবী করীম (স)-এর সঙ্গে উম্মাহাতুল মু'মিনীন বা তাঁহার সহধর্মিনিগণের আচার-আচরণ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ। তাঁহাদের সঙ্গে তিনি সদাসর্বদা মধুর আচরণ করিতেন। তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর নিকট আনসার বালিকাদেরকে যাতায়াত করিতে দিতেন যাহাতে তাহারা তাঁহার সঙ্গে খেলা-ধুলা করিতে পারে। তাঁহার সহধর্মিনিগণ যখন কোন জিনিসপত্রের আকাঙ্ক্ষা করিতেন এবং তাহা যদি শরীয়তসম্মত হইত তবে তিনি যথাসাধ্য তাহা পূর্ণ করিতেন। হযরত 'আইশা (রা)-কে তিনি অত্যন্ত ভালবাসিতেন। তিনি যখন পানি পান করিতেন তখন নবী করীম (স) পানপাত্রের ঐ স্থানে ওষ্ঠদ্বয় লাগাইতেন যেই স্থানে 'আইশা (রা)-এর ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করিত। হযরত 'আইশা (রা) যদি কোন হাড় হইতে গোশত খসাইয়া খাইতেন, তবে তিনি সেই হাড়ের ঐ স্থানটি চুষিতেন, যেই স্থানে 'আইশা (রা)-এর মুখ লাগিত। তিনি অনেক সময় হযরত 'আইশা (রা)-এর কোলে তাঁহার মাথা রাখিয়া বিশ্রাম করিতেন। তাঁহার কোলে মাথা রাখিয়া তিনি মাঝে মাঝে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করিতেন। কখনও বা হযরত 'আইশা (রা) ঋতুবতী অবস্থায় থাকিতেন, অথচ নবী করীম (স) তাঁহার কোলে মাথা রাখিয়া কুরআন করীম তিলাওয়াত করিতেন (আসাহ্হুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৪-৬৫)।
একবার মসজিদে নববীতে কতিপয় হাবশী লাঠিয়াল লাঠিখেলা দেখাইতেছিল। নবী করীম (স) স্বয়ং হযরত 'আইশা (রা)-কে দীর্ঘক্ষণ সেই খেলা দেখান। তিনি নবী করীম (স)-এর কাঁধে তাঁহার চিবুক রাখিয়া উহা উপভোগ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অভ্যাস ছিল যে, প্রতিদিন আসরের নামায আদায় করার পর উম্মাহাতুল মুমিনীনের গৃহে যাইতেন এবং তাঁহাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিতেন। তবে রাত্রিকালে সেই ঘরেই অবস্থান করিতেন যাহার ঘরে সেইদিন পালা নির্ধারিত থাকিত। হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাত্রির পালার ব্যাপারে তিনি কাহাকেও প্রাধান্য দিতেন না এবং কদাচিৎ সকলের গৃহে তাঁহার এক চক্কর ঘুরিয়া আসার ব্যতিক্রম হইত না (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৫)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার সহধর্মিনিগণের মধ্যে রাত্রিযাপনের পালা বণ্টন করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা (রা) এই পালা বণ্টনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। দৈহিক দিক হইতে অক্ষম ছিলেন বিধায় তিনি স্বেচ্ছায় তাঁহার নিজের পালা হযরত 'আইশা (রা)-কে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। সহীহ্ মুসলিমের বর্ণনামতে হযরত 'আতা বলিয়াছেন যে, উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা) এই পালায় শামিল ছিলেন না। কিন্তু কাযী আয়ায এবং ইমাম তাহাবীর মতে ইহা সঠিক নহে। আর ইহার কারণ হইতেছে, একবার রাসূলুল্লাহ্ (স) কোন কারণে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। অতঃপর তিনি হযরত 'আইশা (রা)-কে বলিলেন, আপনি যদি নবী করীম (স)-এর এই অসন্তুষ্টি নিবারণ করিয়া দিতে পারেন তবে আমার এইবারের পালা আমি স্বেচ্ছায় আপনাকে ছাড়িয়া দিব। হযরত 'আইশা (রা) তাঁহার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন এবং কর্ম সম্পাদনের পর হযরত সাফিয়্যার পালার দিন তিনি নবী করীম (স)-এর পাশে গিয়া বসিলেন। নবী করীম (স) হযরত 'আইশা (রা)-এর উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, হে 'আইশা! তুমি সরিয়া বস। কেননা আজ সাফিয়্যার পালা, তোমার নয়। এই কথা শুনিয়া হযরত 'আইশা (রা) বলিলেন, ইহা আল্লাহ্ দান, তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহাকে তাহা দান করেন। এই ঘটনা হইতে হযরত 'আতা-এর ধারণা হইয়াছিল যে, হযরত সাফিয়্যা (রা) হয়ত বা তাঁহার পালা চিরতরে হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাহা ঠিক নয়। কারণ তিনি কেবল একবারের পালাই তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৫)।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত হাফসা (রা) কিছুটা গরম তবিয়তের মহিলা ছিলেন। এইজন্য নবী করীম (স) একবার তাঁহাকে তালাক দিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার পিতা হযরত উমার (রা)-এর মনোকষ্টের কথা বিবেচনা করিয়া নবী করীম (স) পরে তাঁহাকে ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন। উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাওদা (রা) নবী করীম (স)-এর সঙ্গে রাত্রি যাপনের পালা বণ্টনে শামিল ছিলেন না। তিনি স্বেচ্ছায় তাঁহার পালা হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়াছিলেন। বিষয়টি লইয়া মতভেদ রহিয়াছে। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, তাঁহার বয়সের আধিক্যের কারণে নবী করীম (স) তাঁহাকে তালাক দিয়াছিলেন এবং হযরত 'আইশা (রা) তাঁহাকে ফিরাইয়া আনার জন্য নবী করীম (স)-কে রাযী করাইয়াছিলেন। অথবা তিনি কেবল তালাক দেওয়ার ইচ্ছাই করিয়াছিলেন, কিন্তু তালাক দেন নাই কিংবা তালাক দিবেন এইরূপ ধারণা করা হইয়াছিল। এই বিষয়ে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য রিওয়ায়াত হইতেছে, হযরত সাওদা (রা) মনে মনে আশংকা করিতেছিলেন যে, নবী করীম (স) তাঁহাকে তালাক দিবেন। তখন তিনি তাঁহাকে অনুরোধ করিলেন যে, অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা হইতে বঞ্চিত করিবেন না। আমি আমার পালা স্বেচ্ছায় হযরত 'আইশা (রা)-কে দান করিয়া দিতেছি। এই রিওয়ায়াতটি হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে জামে তিরমিযীতে এবং হযরত 'আইশা (রা) সূত্রে সুনান আবু দাউদে বর্ণিত হইয়াছে (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার সহধমিনিগণের যাবতীয় অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তাঁহাদের নিকট অবস্থানের পালা কঠোরভাবে অনুসরণ করিতেন। এমনকি অন্তিম রোগের সময় কঠিন পীড়ার যাতনা সত্ত্বেও যতটুকু সম্ভব সেই নিয়ম তিনি কঠোরভাবে পালন করিয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত যখন নিতান্তই দুর্বল ও অক্ষম হইয়া পড়িয়াছিলেন তখন যথারীতি সকল সহধর্মিনীর নিকট হইতে অনুমতি লইয়া হযরত 'আইশা (রা)-এর গৃহে এক সোমবার হইতে পরবর্তী সোমবার পর্যন্ত অবস্থান করিয়া সেইখানেই ইন্তিকাল করেন (আসাহহুস-সিয়ার, পৃ. ৫৬৭)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম যে তাহার স্ত্রীর সহিত উত্তম আচরণ করে এবং আমি আমার স্ত্রীদের সহিত সর্বাপেক্ষা উত্তম আচরণকারী (সুনান তিরমিযী, ৩খ., পৃ. ৩২২)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সঙ্গে নিজ স্ত্রীগণের প্রগাঢ় ভালবাসার ভিত্তি ছিল আল-কুরআনুল করীমের এই আয়াত: তাহারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের অঙ্গাবরণস্বরূপ, আর তোমরা (স্বামীগণ) তাহাদের অঙ্গাবরণ” (২: ১৮৭)। নবী করীম (স) কুরআন হাকীমের এই নীতি দর্শনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন। আদর, সোহাগ, খোশালাপ, অনুরাগ, বিরাগ, তুষ্টকরণ, আনন্দদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং তাঁহাদের পক্ষে বা বিরুদ্ধে মতামত গ্রহণ করা ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় যাহা দাম্পত্য জীবনে সাধারণত সংঘটিত হইয়া থাকে, তিনি এই সকল বিষয়ে ছিলেন উত্তম আদর্শ (সহীহ মুসলিম, ৭খ, পৃ. ১৩৫)।
সন্তান-সন্ততির প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সীমাহীন ভালবাসা ও স্নেহ-মমতা ছিল। তৎকালে আরবের লোক সন্তানদের চুম্বন ও আদর-সোহাগ করাকে তাহাদের নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার জন্য অশোভনীয় মনে করিত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদের এই কুপ্রথার নিন্দা করিয়াছেন। তিনি নিজ সন্তানদেরকে কোলে নিতেন, কখনও কাঁধে চড়াইতেন, সওয়ারীর উপর নিজের সাথে পশ্চাতে তাহাদেরকেও বসাইতেন, তাহাদের ললাট চুম্বন করিতেন এবং তাহাদের কল্যাণ ও বরকতের জন্য দু'আ করিতেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৩)।
নবী করীম (স) তাঁহার সন্তানদেরকে জান্নাতের পুস্পস্তবক বলিতেন, তাহাদের দেহের ঘ্রাণ লইতেন এবং বক্ষদেশে জড়াইয়া ধরিতেন। আকরা ইব্‌ন হাবিস নামক জনৈক সরদার রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে একদিন শিশুদেরকে চুম্বন করিতে দেখিয়া বলিল, আমার দশটি সন্তান আছে, আজ পর্যন্ত তাহাদের একজনকেও চুম্বন করি নাই। ইহা শুনিয়া নবী করীম (স) বলিলেন, যেই ব্যক্তি কাহারও প্রতি দয়া করে না, তাহার প্রতি দয়া করা হয় না (সহীহ মুসলিম, ৪খ., পৃ. ৮০৮; জামে তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৩১৮)। আর যদি আল্লাহ তা'আলা তোমার অন্তর হইতে মায়া-মমতা উঠাইয়া নিয়া থাকেন তবে আমি কি করিতে পারি (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ১১৪)?
আল্লাহ তা'আলা নবী করীম (স)-কে শেষ জীবনে একটি পুত্র সন্তান দান করিয়াছিলেন। ইহাতে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাহার নাম রাখেন ইবরাহীম। তাহাকে দুগ্ধপান করান জনৈক কর্মকার পত্নী উম্মু সায়ফ (উম্মু বুরদা বিনতুল মুনযির: ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৩১-৩৭; বরাতে হযরত রাসূল করীম (স), জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৬৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার স্নেহাস্পদ পুত্র ইব্রাহীমকে দেখিবার উদ্দেশ্যে মাঝে-মধ্যে উন্মু সায়ফের গৃহে গমন করিতেন এবং ধুম্র আচ্ছন্ন কুটিরে বসিয়া তাঁহার শিশুপুত্রকে আদর-সোহাগ করিতেন। শৈশবকালেই ইব্রাহীম (রা)-এর ইন্তিকাল হয়। তাহার ইন্তিকালে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর অশ্রুবিগলিত চক্ষু দেখিয়া জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ক্রন্দন করিতেছেন! তিনি বলিলেন, ইহা তো স্নেহ-মমতার অভিব্যক্তি। আমি বিলাপ করিতে নিষেধ করি। অতঃপর তিনি তাহাকে দাফন করিবার সময় বলিয়াছিলেন, "হৃদয় ব্যথিত, চক্ষু অশ্রুবিগলিত। কিন্তু আমরা তাহাই বলি, যাহা আল্লাহ পছন্দ করেন। হে ইব্রাহীম! আমরা তোমার বিরহে মর্মাহত" (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৩৮-৩৯; বরাতে হযরত রাসূলে করীম (স) : জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ২৬৮)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কোন পুত্র সন্তান জীবিত ছিলেন না। শুধু চারিজন দুহিতা বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন। বিবাহের পরে তাঁহাদের ইন্তিকাল হয়। তিনি তাঁহাদেরকে এবং তাঁহাদের সন্তান-সন্ততিগণকে অতিশয় স্নেহ করিতেন। হযরত যয়নব (রা)-এর কন্যা উমামাকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। একবার উমামা তাঁহার কাঁধে সওয়ার ছিল। তিনি এই অবস্থায় সালাত আদায় করেন। যখন রুকূতে যাইতেন তখন নিচে নামাইয়া দিতেন, আবার যখন সিজদা করিতেন তখন তাঁহাকে উঠাইয়া লইতেন (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ১৪০)।
হযরত ফাতিমা (রা) ব্যতীত অন্য সকল দুহিতা নবী করীম (স)-এর জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করেন। তাঁহার সর্বকনিষ্ঠা ও সর্বশেষে ইন্তিকালকারী কন্যা হযরত ফাতিমা (রা)-এর প্রতি তাঁহার স্নেহ-ভালবাসার অন্ত ছিল না। তিনি তাঁহাকে নিজ কলিজার টুকরা বলিয়া উল্লেখ করিতেন (সহীহ বুখারী, ২খ, ৫২৬; জামে তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৬৯৯)। নবী করীম (স) সফরে যাইবার প্রাক্কালে সর্বশেষে এবং প্রত্যাবর্তনের পর সর্বাগ্রে হযরত ফাতিমা (রা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতেন (মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২৭৫)। হযরত ফাতিমা (রা) যখন নবী করীম (স)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করিতে আসিতেন তখন তিনি অগ্রসর হইয়া ফাতিমা (রা)-কে খোশআমদেদ জানাইতেন এবং তাঁহার হাতে স্নেহের চুম্বন করিয়া নিজ আসনে বসাইতেন (জামে' তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৭০০)।
হযরত ফাতিমা (রা)-এর পুত্রদ্বয় হযরত হাসান (রা) ও হযরত হুসায়ন (রা)-কেও নবী করীম (স) অপরিসীম স্নেহ করিতেন, তাঁহাদেরকে কোলে বসাইতেন, চুম্বন করিতেন এবং দু'আ করিতেন : হে আল্লাহ। আমি যেমন তাহাদেরকে ভালবাসি, তুমিও অনুরূপ তাহাদেরকে ভালবাস (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৩)। একদিন জুমু'আর নামাযের খুৎবার প্রক্কালে তাঁহারা উভয়ে দৌঁড়াইয়া মসজিদে উপস্থিত হইলে তিনি তাঁহাদেরকে দেখিয়া মিম্বর হইতে নিচে নামিয়া আসিয়া তাঁহাদের দুইজনকেই কোলে তুলিয়া নিলেন। অতঃপর বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা যথার্থই বলিয়াছেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো তোমাদের জন্য পরীক্ষা (আল কুরআন, ৬৪: ১৫; সুনানে আবূ দাউদ, ১খ., পৃ. ৬৯৩-৯৪)।
নবী করীম (স) কখনও কখনও হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে চাদরে জড়াইয়া লইতেন, কখনও কোলে বহন করিতেন (জামে' তিরমিযী, ৪খ., পৃ. ৬৫২)। একবার নবী করীম (স) হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-কে কাঁধে বহন করিয়া বাহিরে আসিলে জনৈক ব্যক্তি বলিলেন, তোমরা কত ভাগ্যবান যে, অতি উৎকৃষ্ট সওয়ারী পাইয়াছ! নবী করীম (স) বলিলেন, আরোহীরাও তো কত উত্তম (জামে' তিরমিযী, ৫খ., পৃ. ৬৬)! নবী করীম (স) এক উরুতে হযরত হাসান (রা) এবং অন্য উরুতে হযরত উসামা (রা)-কে বসাইতেন। অতঃপর তাঁহাদেরকে একত্র করিয়া বলিতেন, আয় আল্লাহ! আমি তাহাদেরকে যেই রকম স্নেহ করি, তুমিও সেই রকম স্নেহ কর (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ২২৫)।
নবী করীম (স) একবার এক যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিয়া দেখিলেন, হযরত ফাতিমা (রা) তাঁহার দুই শিশুপুত্র হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর হাতে রৌপ্যের কঙ্কন পরাইয়াছেন এবং ঘরের দরজায় রঙিন পর্দা ঝুলাইয়া রাখিয়াছেন। ইহা দেখিয়া নবী করীম (স) অসন্তুষ্ট হইলেন এবং হযরত ফাতিমা (রা)-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন না। তিনি বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়া সন্তানদের হাত হইতে কঙ্কন খুলিয়া লইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে মহানবী (স)-এর নিকট আসিলেন। অতঃপর মহানবী (স) সেই কঙ্কন বাজারে পাঠাইয়া দিয়া বলিলেন, এইগুলি বিক্রয় করিয়া হাতীর দাঁতের কঙ্কন আনিয়া দাও (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৪)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা হযরত যয়নব (রা)-এর স্বামী বদরের যুদ্ধে যখন বন্দী হইয়া আসিলেন তখন তাহার মুক্তিপণ দেওয়ার মত কোন সম্পদ তাহার হাতে ছিল না। এই সংবাদ পাইয়া হযরত যয়নব (রা) তাঁহার গলার হার খুলিয়া পাঠাইয়া দিলেন। এই হারটি হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার কন্যাকে বিবাহের সময় উপহার দিয়াছিলেন। প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা)-এর স্মৃতি বিজড়িত হারখানার উপর দৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবী করীম (স)-এর পবিত্র নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। তিনি আর্দ্রকণ্ঠে সাহাবীগণকে বলিলেন, যদি তোমরা হারখানা যয়নবকে ফিরাইয়া দাও তবে ভাল হয়। সাহাবীগণ অত্যন্ত আনন্দ মনে হারখানা হযরত যয়নব (রা)-এর নিকট ফেরৎ পঠাইয়া দিলেন (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৬)।
একদিন নবী করীম (স) দাওয়াত খাইতে যাইতেছিলেন। পথিমধ্যে তিনি হযরত হুসায়ন (রা)-কে খেলায় রত অবস্থায় দেখিতে পাইলেন এবং হাত বাড়াইয়া তাঁহাকে কাছে ডাকিলেন। এই অবস্থায় শিশু হুসায়ন (রা) লুকোচুরি খেলার মত কাছে আসিয়া আবার দূরে চলিয়া গেলেন। অতঃপর নবী করীম (স) হাত বাড়াইয়া তাহার কাঁধ এবং চিবুক ধরিয়া ফেলিলেন এবং দুই হাতে তাহাকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতে লাগিলেন : হুসায়ন আমার এবং আমি হুসায়নের। অনেক সময় নবী করীম (স) তাঁহার মুখ হুসায়নের মুখে লাগাইয়া আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলিতেন : হে আল্লাহ! আমি তাঁহাকে ভালবাসি, তুমিও তাহাদেরকে ভালোবাসিও এবং যাহারা তাঁহাকে ভালবাসে তাহাদেরকেও তুমি ভালবাস (আল্লামা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন-নবী, বঙ্গানুবাদ, পৃ. ৩৯৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচা আবু তালিবের খান্দানের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি তাঁহার যেই ভালবাসা এবং অনুগ্রহ ছিল উহা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বজায় রাখিয়াছিলেন। হযরত আলী (রা)-এর জননী হযরত ফাতিমা বিন্ত আসাদ (রা) ইন্তিকাল করিলে নবী করীম (স) স্বীয় জামা খুলিয়া তাঁহাকে পরিধান করান এবং কিছুক্ষণ কবরে অবস্থান করেন। তিনি হযরত আলী (রা)-কে স্বীয় খান্দানের একজন সদস্য করিয়া লইয়াছিলেন। হযরত উম্মু হানী (রা) ও তাঁহার জননীর গৃহে তিনি প্রায়ই গমন করিতেন এবং সেইখানে বিশ্রাম করিতেন। এক বর্ণনামতে, মি'রাজের রাত্রিতেও তিনি সেইখানে বিশ্রাম করিতেছিলেন। একবার হযরত উম্মু হানী (রা) তাঁহার নিকট আসিলে তিনি 'মারহাবা' বলিয়া তাঁহাকে সাদর সম্ভাষণ জানাইয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ৪খ., পৃ. ১৫৪)।
হযরত জাফর ইব্‌ন আবী তালিব (রা) কয়েক বৎসর আবিসিনিয়ায় অবস্থানের পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) খায়বারের যুদ্ধ হইতে ফিরিতেছিলেন। জা'ফর (রা)-কে দেখিয়া তিনি এই বলিয়া আনন্দ প্রকাশ করেন যে, আমি বুঝিতে পারিতেছি না খায়বার বিজয়ে অধিক আনন্দিত হইয়াছি, নাকি জা'ফরের প্রত্যাবর্তনে! একবার জা'ফর (রা) সাক্ষাৎ করিতে আসিলে তিনি তাঁহাকে আলিংগন করেন এবং তাঁহার ললাটে চুম্বন করেন (সুনান আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৯২)।
রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার চাচাত ভাই হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা)-কে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিতেন, হে আল্লাহ! তাঁহাকে দীনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান কর (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৪৪৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় দুগ্ধ সম্পর্কীয় মাতা-পিতাকে আপন পিতা-মাতার মত যত্ন করিতেন। মক্কা বিজয়ের পর তিনি যখন যি'ইররানা নামক স্থানে অবস্থান করিতেছিলেন, তখন তাঁহার দুধপিতা আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি স্বীয় চাদর বিছাইয়া সেইখানে তাঁহাকে সসম্মানে বসাইলেন। সেখানে তাঁহার দুধমাতা (কিংবা অনুরূপ অন্য কোন মহিলা) আসিয়াছিলেন। তিনি তাঁহাকেও চাদরের অপর কিনারায় বসাইলেন। অতঃপর তাঁহার দুধভাই আবদুল্লাহ ইবনুল হারিছ আসিলে তিনি উঠিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানাইলেন এবং নিজের স্থানে তাঁহাকে বসাইলেন (সุนান আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৫৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00